না, আমি ঠিক কোনো একটি বিষয়বস্ত ধরে এখানে লিখছি না, তাই ভাটেই পোস্ট করছিলাম। এমনকী কোনোরকম জুজুও দেখাচ্ছি না। কিন্ত বর্তমান পরিস্থিতিতে নানা দিক থেকে যে নানা রকমের আশংকা উদ্বেগ আবার তার বিপরীতে যে সব যুক্তি উঠে আসছে সেগুলোকে আমার অভিজ্ঞতা, নানা ঘটনা যা দেখেছি শুনেছি বা একদম হালে যা দেখছি এসবের ভিত্তিতে কত কী যৌক্তিকতা আছে তা নিজের মত করে বুঝতে চেষ্টা করছি। আমার কলকাতা থেকে যাওয়া ও কাল রাতে আসার মাঝে এক ভোট, তার ফলাফল এবং পালাবদল ঘটে গেছে। আমারা যখন শুক্রবার রাতের ফ্লাইট বুক করেছিলাম তখন রাজ্যে পরিবর্তনের ডংকা ও তদজনিত ঐতিহাসিক শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের কোনো আভাস কোথাও ছিলনা। শুক্রবার রাতে এলে দুদিন পুরো পাওয়া যাবে কাজ সারতে, তাই এত রাতে আসা।
রাত সাড়ে দশটায় কলকাতা এয়ারপোর্টের সন্ধ্যা মনে হচ্ছিল। লোকে লোকারণ্য, পুলিশ, প্রচুর টিভিতে দেখা চেনা মুখ দেখলাম, এমনকি যাদের আর তেমন দেখা যেতনা অনেকদিন তাদেরও। যারা বাইরে থেকে আসছিল তাদের অভ্যর্থনা করে ভি আই পি লাউঞ্জে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
আমরা এক কোণে দাঁড়িয়ে এসব দেখতে বাধ্য হচ্ছিলাম, কারণ কিছুতেই ক্যাব বুক করতে পারছিলাম না। একটার পর একটা ক্যানসেল করতে হচ্ছিল কারণ ড্রাইভাররা ফোন করে বলছিল যে এয়ারপোর্টে ঢুকতে দিচ্ছে না। শেষকালে প্রিপেড কিছু পাওয়া যায় কিনা দেখব বলে বাইরে এসে দেখি, গাড়িতে গাড়িতে ছয়লাপ এয়ারপোর্ট চত্বর। তার মধ্যে এমনি গাড়ি, মাথায় বাতি লাগানো, অ্যাম্বুলেন্স এমনকি একটা পেট অ্যাম্বুলেন্সও দেখলাম। হয়ত ডগ স্কোয়াড এসেছে, তবে চোখে পড়ল না। যা চোখে পড়ল তা হল সাধারণ লোক ফোনের দিকে তাকিয়ে অসহায় ক্যাবের পথ চেয়ে।
এর চেয়ে এরা তো কাল রাতের ফ্লাইট গুলো ক্যানসেল করে দিতে পারত, এত হয়রানি হত না!
বলতে বলতে মনে পড়ছে ডাবল ইঞ্জিনে, কলকাতার কাছে আর একটা এয়ারপোর্ট হোক, যেটা সময় বিশেষে ভি আইপি চলাচলের জন্যে সংরক্ষিত হবে!
আমি হাল না ছেড়ে ক্রমাগত এ অ্যাপ ও অ্যাপ ঘুরে ঘুরে চেষ্টা জারি রেখেছিলাম। শেষকালে সোয়া এগারোটা নাগাদ একটি র্যাপিডো পেলা, দেখাচ্ছিল সাত মিনিট। ড্রাইভার তৎক্ষণাৎ ফোন করে জানালো যে সে এয়ারপোর্টের পার্কিং এ আছে তবে খুব স্লো মুভমেন্ট, আমরা যেন ধৈর্য্য ধরে একটু অপেক্ষা করি।
আধঘণ্টা পরে তাও বুদ্ধি করে ও গাড়িটা প্রাইভেট গাড়ির লেনে ঢুকিয়ে দিয়েছিল বলে আমরা অবশেষে বেরোতে পারলাম।
আমি অ্যাপে ড্রাইভারের নাম খেয়াল করে দেখিনি, গলা শুনে অল্পবয়সী মনে হল। কী ভিড় ঢোকার রাস্তা বন্ধ এসব জানিয়ে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম, আপনারা এতক্ষণ অপেক্ষা করলেন। আমাদের আর উপায় ছিল না সেকথা না বলে আমি এমনিই মন্তব্য করলাম কাল সরকারের শপথগ্রহণ তো তাই এত লোক আসছে, এটুকু ভিড় তো হবেই।
তারপর যা হল তার জন্যে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। ছেলেটা একটা হাহাকারের গলায় বলে উঠল " আর সরকার, আমাদের কী হবে? কী করবে? ওরা তো বলছে ওরা মুসলমানের সরকার নয়। কী করবে আমাদের সাথে ? "
ওই মুহূর্তে ওর কী হচ্ছে বা কেমন সে অনুভূতি তা আমাদের বোঝা সম্ভব নয়, তবু আর্তনাদ টা তীরের মত বিঁধল। এমনকি আমার সঙ্গী যে হয়ত বাংলায় বলা কথা পুরোপুরি বুঝল না, সেও একটু অপ্রস্তুত হাসি হেসে মাথাটা সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বলল, " আরে কুছ নহী হোগা, আপ চিন্তা মত করো, কুছ নহী হোতা"।
ছেলেটি একটু সামলে নিয়ে হয়ত ওই সান্ত্বনার স্বরেই দ্রব হয়ে আবার শুরু করল, হয়ত আরো একটু আশ্বাসের আশায়।
"দিদি, আপনার কী মনে হয়, পুরনো মুখ্যমন্ত্রী ( সে অবশ্য নাম নিয়েছিল) জেলে পুরে দেবে? "
" না, তা কেন? সেরকম কিছু তো শুনিনি। "
" না, সবাই বলছে। আমাদের ওখানে তো ওরা জিতেছে, কিন্ত কাউকে আর দেখা যাচ্ছে না। বিধায়ক তো বিজেপির সঙ্গে ছবি তুলছে।
আমি জানেন তো সবাইকে বলেছিলাম বামেদের নাহলে আই এস এফ কে ভোট দিতে। আমাকে বাড়ির লোকেরা পাড়ার লোকেরা কী বকাবকি করল বলল দিদিকে না দিলে ওরা এসে পড়বে। সেই তো ওরা এসে গেল। কী হবে এবার?"
বড় রাস্তায় বাঁক নিয়ে বলল,
" আমি ভেবেছিলাম বাম আর আই এস এফ মিলে একশটা সিট পাবে। এরা কখনোই আসবে না। "
বাড়ির প্রায় কাছে চলে এসেছে, আমি যদিও সবসময় ক্যাব ড্রাইভার যদি সেরকম গপ্পি হয় তার সাথে উৎসাহ সহকারেই গল্প করি কিন্ত এই আবহে, এত রাতে আর ইচ্ছে করছিল না। তবু একটু উৎকণ্ঠা নিয়েই বললাম,
" বাবু, তুমি এইরকম কথাবার্তা আলাপ প্যাসেঞ্জারের সাথে করছ কেন? তুমি আমাদের চেন না জানো না, এরকম করে কথা বলে কেউ? আমরা তো যে কেউ হতে পারি। আমরা যে কট্টর অমুক দলের লোক বা সমর্থক নই তার কী গ্যারান্টি আছে। তোমার নাম ফোন নাম্বার সব আমাদের কাছে। এদিকে বলছ ভয়ে আছো, ওদিকে মিনিমাম সাবধানতা অবলম্বন করবে না? এত কথা এত মতামত তাও আবার অচেনা লোকের সাথে, বলতে নেই। "
গেটে গাড়ি ঢুকছে, ছেলেটির চোখেমুখে দৃশ্যত আশংকা। বলল,
" না, সে তো ঠিকই বলছেন। আমার এসব কথা বলা উচিত হয় নি। কিন্ত দিদি আপনার মুখ দেখে মনে হল আপনি খুব ভালো।"
পিছনের সিটে তখন আমাদের দুজনের মাঝে কে ছেলেটাকে কত টাকা বেশী দেবে, মানে অক্ষমতার ক্ষতিপূরণ, তার কম্পিটিশন চলছে। ওইটুকুই পারি, ওর কথার জবাব আমার জানা নেই।
তবু একটু কড়া হয়েই বলি, " বাবা, তুমি বাম আর আই এস এফ একশ সিট পাবে ভেবেছিলে, এই বুদ্ধি নিয়ে কখনো ভেবোনা যে তুমি প্যাসেঞ্জারের মুখ দেখেই বুঝতে পারবে সে কেমন।
তবে বেশী চিন্তা কোরোনা। কিছু হবে না। ওরকম রাজনীতিতে অনেক কথা নেতারা মুখে বলে, সব কথা ধরতে নেই। নিয়মকানুন আছে আইন আছে, তুমি ঠিক থাকলে সব ঠিক থাকবে।"
ছেলেটার চোখদুটো কেমন দেখাচ্ছিল বাড়ির সামনের আলোয়, চকচকে গ্লাসের মত। গাড়ি স্টার্ট করে বলল, আপনারা খুব ভালো।
খুব খুব গিল্ট ফিল হচ্ছিল। ভালো হবার মত কী আর করলাম, একটু কথা শুনেছি, দুটো টাকা বেশী দিয়েছি। আশাকরি ছেলেটা এইসব কথাবার্তা সামলে বলবে বা বলবেই না কখনো। ও যেরকম ভাবছে সেসব কিছুই হয়ত ও অন্তত ফেস করবে না, ওর ভয়টা অমূলক প্রমানিত হবে। কিন্ত ভয়টা আছে, একটা ভয় আপাতত এদের, এইসব সাধারণ সংখ্যালঘু মানুষদের মধ্যে চারিয়ে যাচ্ছে, নানাদিকে নানা বক্তব্য শুনে। এবং কোথাও কোনোদিকেই সম্ভবত এদের প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছে না, বিপদে পড়লে কাদের পাশে পাবে বিরোধীদের তরফে আশ্বাস নেই। সরকারের হেভিওয়েট রা প্রকাশ্যে যা বক্তব্য রাখছে তা চিন্তার।
সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ নাগরিক সমাজ এবং আমাদের মত যারা তাদের পক্ষে এই বিপন্নতা সম্যক উপলব্ধি করা সম্ভব নয়, অনেকেই এগুলো বাড়াবাড়ি অপপ্রচার মনে করছে, বাকীরা তো এই ভয় পাওয়ানোর এজেন্ডাকে সমর্থন করেই মতদান করেছে। মিডিয়া কিছু অন্যায় হলেও কোথাও দেখাবেনা। মেন মিডিয়া ভোট পরবর্তী গন্ডগোল, হিংসা দেখানোর ব্যাপারে যা দেখা যাচ্ছে টাইম ডিলে মোডে আছে। এতদিনে ২০১১ র সন্ত্রাস হিংসা নিয়ে দেখাচ্ছে কথা বলছে, ২০২৬ হয়ত আরো ১৫ বছর পরে দেখাবে।
ন্যাশনাল লেভেলে যে ভালো একটা অল্টারনেট মিডিয়া তৈরি হয়েছে, সেটা বাংলায় অনুপস্থিত। ট্র্যাভেল আর ফুড ভ্লগ বাদ দিলে যেটুকু নিউজ বা পডকাস্ট দেখা যায় তা প্রত্যেকেই কমবেশী বায়াসড, বাম ডান মধ্য।