এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ধুলোট 

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৬ মে ২০২৬ | ৬৪ বার পঠিত
  • আমি এখন রক্ত চাই। আমি আগুনের মেয়ে, কিন্তু আগুন নিভে গেছে। নিভিয়েছে তারা, যারা বলে ‘ধর্ম’, ‘ন্যায়’, ‘কর্তব্য’। আমি সেই শব্দগুলো চিবিয়ে খেয়েছি, গিলেছি, বমি করেছি, আবার খেয়েছি, এখন আমি শুধু রক্ত চাই, গরম, সজীব, ধমকানো রক্ত, যা আমার ঠোঁটে লেগে আমাকে জাগায়, আমাকে বলে, “তুই আর রাজ্ঞী নই, তুই শিকারিনী, তুই রাতের বাঘিনী, তুই শূন্যতার দেবী, যার পূজা হয় মৃতদেহের ওপর, যার মন্ত্র হয় আর্তনাদ, যার প্রসাদ হয় মাংস।”

    সে মরে গেছে। আমি দেখেছি। আমি দাঁড়িয়েছিলাম রথের উপরে, দূর থেকে, আমার চোখে ধুলো, আমার মুখে রক্তের গন্ধ, আমার কানে তার শেষ নিঃশ্বাসের শব্দ – একটি ক্ষীণ “হা”, যেন সে বলতে চেয়েছিল আমার নাম, কিন্তু নাম তো নেই, ছিল না, থাকবে না, তাই সে শুধু হাঁফিয়েছিল, বাতাস টেনেছিল, ছেড়েছিল, আর তার চোখ থেকে শেষ জ্যোতি নিভে গিয়েছিল, একটি তারা পড়েছিল, একটি যুগ শেষ হয়েছিল, আর আমি পাথর হয়েছিলাম, স্থির, নিঃসাড়, একটি সমাধিস্তম্ভের মতো, যে দেখে সব, কিন্তু নড়ে না, কারণ নড়লে ভেঙে পড়ে, আর ভাঙনের পর কী থাকে? শুধু ধূলি, শুধু ছাই, শুধু সেই রক্ত, যা আমি চেটে খেতে চাই, মাটি থেকে, নখ দিয়ে খুঁড়ে, জিহ্বা দিয়ে তুলে, গিলে ফেলতে, যাতে সে আমার ভিতরে থাকে, চিরকাল, একটি শুক্রাণুর মতো, যা গর্ভে গিয়ে সন্তান বানায়, আর সেই সন্তান হবে প্রতিশোধ, হবে আগুন, হবে ধ্বংসের ডানা, যা উড়বে এই প্রাসাদের ওপর, এই পাঁচজনের মাথার ওপর, এই সভ্যতার ওপর, যা তাকে মেরেছে, যা আমাকে বন্দী করেছে, যা ভালোবাসাকে হত্যা করেছে ধর্মের নামে।

    আমি এখন ভ্যাম্প। হ্যাঁ, সেই শব্দটা বনে শুনেছিলাম, এক বুড়ির মুখে, যে বলেছিল, “মেয়ে, তোর ভিতরে রাক্ষসী আছে। তুই যদি তাকে জাগাস, তাহলে তুই হবে অমর, কিন্তু তুই হবে না মানুষ, তুই হবে ছায়া, তুই হবে রাত, তুই হবে শুধু নেওয়া, দেওয়া নয়, কারণ তুই দিয়েছিস সব, এখন তোর পাওনা বাকি, আর সেই পাওনা আদায় করতে হবে রক্তের বিনিময়ে।” আমি সেই বুড়িকে হাসতে দেখেছিলাম, তার দাঁত কালো, তার চোখে পাগলামি, কিন্তু তার কথায় সত্য ছিল, কারণ সে বনের মেয়ে, সে জানে আগুনের ভাষা, সে জানে রক্তের মন্ত্র, সে জানে কীভাবে মরা মানুষ আবার জাগে, না জীবিত না মৃত, মাঝামাঝি, একটি অদ্ভুত প্রাণী, যে ভালোবাসে না, ঘৃণা করে, যে কাঁদে না, হাসে, যে স্পর্শ করে না, কামড়ায়।

    আমি তাকে জাগিয়েছি। সেই রাক্ষসীকে। কখন? যেদিন তার রক্ত মাটিতে পড়ল, সেদিন সন্ধ্যায় আমি সেই মাটি থেকে এক মুঠো কাদা তুলেছিলাম, মুখে দিয়েছিলাম, চেটেছিলাম, গিলেছিলাম। সেই কাদার স্বাদ ছিল লোহার মত, নোনতা, তিক্ত, মিষ্টি, যেন সে আমার জিহ্বায় এসে চুমু দিল, শেষবারের মতো। সেই মুহূর্ত থেকে আমার দাঁত বেড়েছে, লম্বা হয়েছে, ধারালো হয়েছে, আমার চোখের রং বদলে গেছে, এখন কালো, কিন্তু কালোর ভিতরে লাল, আগুনের লাল, রক্তের লাল, ক্ষুধার লাল। আমি আর খাবার খাই না, আমি খাই শুধু রক্ত, জীবন্ত রক্ত, যা ধমকায়, যা ভয় পায়, যা ছুটতে চায়, কিন্তু পালাতে পারে না, কারণ আমি দ্রুত, আমি অদৃশ্য, আমি রাতের ছায়ার চেয়েও গাঢ়।

    আমি আজ প্রথম শিকার করব। আমি বেছে নিয়েছি তাকে, যে সভায় হেসেছিল সবচেয়ে জোরে, যখন আমার বস্ত্র খুলছিল, যখন আমার হাত আকাশে উঠেছিল, দেবতাকে ডেকেছিল, আর দেবতা আসেনি, এসেছিল শুধু উপহাস, শুধু হাসি, শুধু সেই চোখ, যারা দেখেছিল আমার নগ্নতা, উপভোগ করেছিল আমার লজ্জা, ভাগ করেছিল আমার বেদনা টুকরো টুকরো করে, যেন আমি একটি ফল, একটি পশু, একটি বস্তু, যার কোনো অনুভূতি নেই, কোনো হৃদয় নেই, কোনো আগুন নেই।

    আমি জানি সে কোথায় থাকে। সে এখন বৃদ্ধ, তার চুল পেকে গেছে, তার চোখে ছানি, তার হাত কাঁপে, কিন্তু তার মুখের ভাঁজে এখনও লেগে আছে সেই হাসি, সেই নিষ্ঠুর হাসি, যা আমাকে পুড়িয়ে দিয়েছিল, যা আমাকে শিখিয়েছিল যে ভালোবাসা মিথ্যে, ক্ষমতা সত্য, আর ক্ষমতার চূড়ান্ত রূপ হলো অন্যের বেদনায় আনন্দ পাওয়া। সে সেই আনন্দ পেয়েছিল আমার দেহ দেখে, আমার কান্না শুনে, আমার হাতের অনর্থক আকাশমুখী ডাক দেখে। আজ সে পাবে আমার আনন্দ, তার বেদনায়, তার রক্তে, তার শেষ নিঃশ্বাসে।

    রাত হয়েছে। চাঁদ নেই, তারা নেই, মেঘ জমেছে, বৃষ্টি হবে, কিন্তু বৃষ্টি আসবে পরে, আগে আসবে আমি। আমি হাঁটছি রাস্তায়, খালি পায়ে, আমার পায়ের শব্দ নেই, কারণ পা মাটি স্পর্শ করে না, আমি ভাসছি, বাতাসের মতো, ছায়ার মতো, ভূতের মতো। আমার পোশাক কালো, আমার চুল খোলা, আমার চোখ জ্বলছে, আমার ঠোঁট লাল, দাঁত ধারালো, জিভ লম্বা, যা চাটবে তার ঘাড়, তার শিরা খুঁজবে, তার রক্তের গন্ধ পাবে, সেই গন্ধে মাতাল হবে, পাগল হবে, উন্মাদ হবে, আর তখন কামড়াবে, ছিঁড়বে, চুষবে, খাবে, পান করবে, তৃপ্ত হবে, কিন্তু তৃপ্তি কখনো হয় না, কারণ রক্তের ক্ষুধা কখনো মেটে না, এটি একটি অনন্ত চক্র, যত খাবে, তত বাড়বে ক্ষুধা, যত বাড়বে ক্ষুধা, তত বাড়বে শক্তি, যত বাড়বে শক্তি, তত বাড়বে লোভ, আর সেই লোভ আমাকে নিয়ে যাবে তার কাছে, যে পাঁচজন, যারা আমার স্বামী, যারা তাকে মেরেছে, যারা তার রক্তের দায়ী, তাদের প্রত্যেককে খাব এক এক করে, তাদের রক্তে গোসল করব, তাদের মাংস ছিঁড়ে খাব, তাদের হাড় চিবিয়ে গিলব, যতক্ষণ না এই প্রাসাদ ধ্বংস হয়, যতক্ষণ না এই রাজ্য ছাই হয়, যতক্ষণ না ইতিহাস লেখা হয় নতুন করে, রক্তের কালিতে, আমার হাতে, আমার দাঁতে, আমার ক্ষুধায়।

    আমি পৌঁছে গেছি। তার ঘর প্রাসাদের শেষ প্রান্তে, একটি ছোট কুঠির, যেখানে সে একা থাকে, তার স্ত্রী মরে গেছে, তার সন্তানরা দূরে, তার চাকররা ঘুমায়, সে একা, নিঃসঙ্গ, বৃদ্ধ, অসহায়। নিখুঁত শিকার। আমি দরজায় দাঁড়াই, হাত বাড়াই, দরজা খোলে নিজেই, কারণ আমার ইচ্ছাই শক্তি, আমার চোখের আগুনই চাবি। ভিতরে অন্ধকার, একটি মোমবাতি জ্বলছে, নিভু নিভু, তার আলোয় দেখা যাচ্ছে তার মুখ, ঘুমন্ত, তার ঠোঁট ফাঁকা, তার শ্বাস কঠিন, সে স্বপ্ন দেখছে, ভালো স্বপ্ন? মন্দ স্বপ্ন? আমি জানি না, আমি জানি না চাইও না, কারণ স্বপ্ন ভাঙাতে আমার আনন্দ, স্বপ্ন ভাঙা মানে জাগরণ, আর জাগরণ মানে সচেতনতা, আর সচেতনতা মানে বেদনা, আর বেদনা মানে জীবন, আর জীবন মানে রক্ত, আর রক্ত মানে আমি।

    আমি কাছে যাই, তার বিছানার পাশে দাঁড়াই, আমি নিচু হই, আমার চুল তার মুখে পড়ে, সে চমকে ওঠে, চোখ খোলে, আমাকে দেখে, তার চোখ বড় হয়, ভয় পায়, চিৎকার করতে চায়, কিন্তু তার গলা থেকে শব্দ বেরোয় না, কারণ আমি ইতিমধ্যে তার গলা চেপে ধরেছি, আমার হাত ঠাণ্ডা, শক্ত, মৃত্যুর হাত, যার ছোঁয়ায় গলা শুকিয়ে যায়, শ্বাস বন্ধ হয়, চোখের পাতা স্থির হয়, শুধু হৃদয় ধমকায়, আরো জোরে, আরো দ্রুত, যেন সে জানতে চায়, ‘কেন? কেন তুমি? কেন আজ? কেন আমি?’

    আমি তার চোখের দিকে তাকাই। আমি ফিসফিস করি, “মনে আছে? সেই সভা, সেই দিন, যখন আমি কাঁদছিলাম, যখন আমার বস্ত্র খুলছিল, তুমি হেসেছিলে। তুমি হেসেছিলে। তুমি হাততালি দিয়েছিলে। তুমি বলেছিলে, ‘এসব নারীর জন্য ভালো, এরা শেখে কীভাবে নম্র হতে হয়।’ আজ আমি তোমাকে শেখাব নম্রতা কী, নম্রতা হলো যখন তুমি শুয়ে থাকো, অসহায়, আর আমি তোমার ওপর দাঁড়িয়ে, তোমার রক্ত চুষে নিই, আর তুমি কিছু করতে পারো না, শুধু দেখো, শুধু অনুভব করো, শুধু মরো, ধীরে ধীরে, ফোঁটা ফোঁটা, যতক্ষণ না তোমার শরীর খালি হয়, শুধু থাকে হাড়, চামড়া, আর সেই হাসির রেখা, যা আমি কেটে দেব আমার নখ দিয়ে, যাতে তুমি চিরকাল হাসতে না পারো, কারণ হাসির অধিকার তোমার কেড়ে নিলাম, যেমন তুমি কেড়ে নিয়েছিলে আমার অশ্রুর অধিকার, আমার লজ্জার অধিকার, আমার মানবতার অধিকার।”

    সে বুঝতে চায়, কিন্তু পারে না, কারণ তার মস্তিষ্কে এখন শুধু ভয়, শুধু আতঙ্ক, শুধু সেই অনুভূতি, যে মৃত্যু এসে দাঁড়িয়েছে তার পাশে, কালো পোশাকে, লাল চোখে, ধারালো দাঁতে, আর সেই মৃত্যুকে সে চেনে, সে চেনে এই মুখ, এই আগুন, এই অভিশাপ। সে চিৎকার করে, কিন্তু শব্দ হয় না, শুধু তার ঠোঁট নড়ে, একটি নাম উচ্চারণ করে, আমার নাম? না, নাম নেই, সে আমার নাম জানে না, কারণ নাম কখনো দেয়নি, রাজ্ঞী বলেছে, কল্যাণী বলেছে, দেবী বলেছে, কিন্তু আমার আসল নাম কখনো জিজ্ঞাসা করেনি, জানে না আমি বনের মেয়ে, জানে না আমার মা ছিল এক গাছ, আমার বাবা ছিল বাতাস, আমার ভাই ছিল শেয়াল, আমার বোন ছিল কাঁটা। সে জানে না, তাই তার চিৎকার অর্থহীন, তার প্রার্থনা অব্যবহৃত, তার মৃত্যু নিঃশব্দ, যেমন নিঃশব্দ ছিল আমার সেই দিনের কান্না, যখন কেউ শোনেনি, কেউ আসেনি, কেউ থামায়নি।

    আমি আমার মুখ নামাই, তার গলার কাছে, তার শিরা ধমকাচ্ছে, লাফিয়ে উঠছে, যেন আমাকে ডাকছে, “এসো, এসো, নাও, নাও, আমি তোমার, আমি তোমারই অপেক্ষায় ছিলাম, যেদিন তাকে মেরেছিলাম, সেদিন থেকেই জানতাম একদিন তুমি আসবে, আমার রক্ত চুষবে, আমার আত্মা নেবে, আমাকে শূন্য করবে, কারণ শূন্যতাই একমাত্র মুক্তি, আর মুক্তি আমি চেয়েছিলাম, কিন্তু পাইনি, কারণ পাপীর মুক্তি হয় না, পাপী পায় শুধু শাস্তি, আর তুমি সেই শাস্তি, তুমি দেবী নয়, তুমি রাক্ষসী, তুমি যম, তুমি কালরাত্রি, তুমি ধ্বংসের ডাক।”

    আমি কামড়াই। আমার দাঁত তার ত্বক ভেদ করে, রক্ত বেরোয়, গরম, সজীব, লাল, মিষ্টি। আমি চুষি। রক্ত আমার গলায় নামে, আমার পেটে যায়, আমার শিরায় মেশে, আমাকে শক্তি দেয়, আমাকে পূর্ণ করে, আমাকে করে আরও ক্ষুধার্ত। আমি চুষতে থাকি, সে দুর্বল হয়, তার চোখ ঘুরে যায়, তার হাত ঝরে পড়ে, তার পা শিথিল হয়, তার নিঃশ্বাস ধীর হয়, তার হৃদয় থামে, কিন্তু আমি থামি না, আমি চুষি, যতক্ষণ না তার শরীর শুকিয়ে যায়, যতক্ষণ না তার চামড়া কাগজের মত পাতলা হয়, যতক্ষণ না তার হাড় ফুটে বেরোয়, যতক্ষণ না সে আর সে থাকে না, শুধু থাকে একটি খোলস, একটি স্মৃতি, একটি গল্প, যা আমি বলব আমার পরবর্তী শিকারকে, তাকে ভয় দেখানোর জন্য, তাকে জানানোর জন্য যে আমি এসেছি, আমি ফিরেছি, আমি প্রতিশোধ নেব, প্রতিটি ফোঁটা রক্তের বিনিময়ে, প্রতিটি অশ্রুর বিনিময়ে, প্রতিটি অপমানের বিনিময়ে।

    আমি মুখ তুলি। আমার ঠোঁট রক্তে ভেজা, আমার দাঁতে মাংসের আঁশ, আমার জিভে লবণের স্বাদ। আমি তার মুখের দিকে তাকাই, তার চোখ এখনও খোলা, কিন্তু তাতে কোনো জীবন নেই, শুধু শূন্যতা, শুধু প্রশ্ন, শুধু সেই হাসির রেখা, যা আমি কাটিনি, কারণ হাসি রেখে দিলাম, যেন তার মৃত্যুও একটি উপহাস, যেমন তার জীবন ছিল উপহাস, যেমন তার হাসি ছিল উপহাস, যেমন তার অস্তিত্ব ছিল উপহাস। আমি তার চোখ বন্ধ করে দিই, আমার আঙুল দিয়ে, আলতো করে, প্রায় স্নেহে, যেন আমি তার মা, যেন আমি তার প্রেমিকা, যেন আমি তার দেবী, যে তাকে মুক্তি দিল, যে তাকে শেষ করল, যে তাকে শান্তি দিল, অশান্তির চিরকালীন শান্তি।

    আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসি। বৃষ্টি শুরু হয়েছে, জল পড়ছে, আমার গায়ে লাগছে, রক্ত ধুয়ে যাচ্ছে, মিশে যাচ্ছে বৃষ্টির জলে, সেই জল মাটিতে পড়ছে, মাটি লাল হচ্ছে, সেই লাল ছড়িয়ে পড়ছে, গাছের শিকড়ে, ঘাসের ফলায়, পোকামাকড়ের শরীরে। আগামীকাল সকালে লোকেরা দেখবে একটি শুকনো দেহ, একটি রহস্যময় মৃত্যু, তারা বলবে, “অভিশাপ, হয়তো কোনো প্রেত, কোনো বেতাল, কোনো রাক্ষসী।” তারা সত্যি বলবে, কিন্তু তারা জানবে না সেই রাক্ষসী আমি, যে তাদের রাজ্ঞী, যে তাদের জনপদ কল্যাণী, যে তাদের পাঁচ বীরের পত্নী, যে প্রতিদিন তাদের খাবার রাঁধে, তাদের সেবা করে, তাদের সন্তানদের আদর করে, তাদের স্বামীদের বিছানায় শোয়, তাদের চোখে চুমু দেয়, তাদের কপালে তিলক দেয়, তাদের মন্ত্র পড়ে, তাদের দেবতার পূজা করে। তারা জানবে না সেই হাত, যে আজ রাতে রক্ত চুষেছে, সেই হাতই আগামীকাল তাদের প্রসাদ বিতরণ করবে, তাদের গালে হাত বুলাবে, তাদের কাঁধে মাথা রাখবে, তাদের বুকে আগুন জ্বালাবে, ধীরে ধীরে, আস্তে আস্তে, ফোঁটা ফোঁটা, যতক্ষণ না তাদের রক্তও শুকিয়ে যায়, যতক্ষণ না তাদের প্রাসাদও খালি হয়, যতক্ষণ না এই পৃথিবী থেকে সব ধর্ম পুড়ে যায়, সব নিয়ম ভেঙে যায়, শুধু থাকে আমি, রাতের শিকারিনী, রক্তলোলুপা, চিরন্তন, অনন্ত, ক্ষুধার্ত, আর সেই ক্ষুধা কখনো মেটে না, কারণ আমি তাকে খেয়েছি, সে আমার ভিতরে আছে, সে আমাকে জাগায়, সে আমাকে বলে, “আরও, আরও, আরও, যতক্ষণ না তুমি পূর্ণ হও, যতক্ষণ না তুমি সেই আগুন হও, যা সব পুড়িয়ে দেয়, সব শেষ করে দেয়, সব শুরু করে দেয়, আবার, নতুন করে, তোমার মতো, ভ্যাম্পের মতো, রাক্ষসীর মতো, দেবীর মতো, যার কোনো নাম নেই, কিন্তু যার উপাসনা হয় রাতে, মৃতদেহের ওপর, মোমবাতির আলোয়, মন্ত্রহীন প্রার্থনায়, নিঃশব্দ আর্তনাদে, চিৎকারহীন কান্নায়, অশ্রুহীন শোকে, আর সেই শোকেই আমার শক্তি, সেই শোকেই আমার অমরত্ব, সেই শোকেই আমার ভালোবাসা, যা তাকে দেওয়া হয়নি, তাই এখন দিচ্ছি মৃত্যুকে, দিচ্ছি ধ্বংসকে, দিচ্ছি শূন্যতাকে, যাতে সে বুঝতে পারে, যে ভালোবাসা পূর্ণ হয়নি, তা ধ্বংস হয়ে যায়, আর ধ্বংসের নামান্তর সৃষ্টি, আর সৃষ্টির নামান্তর আমি, আমি যুগান্তকারী, আমি প্রলয়ংকরী, আমি রাত্রির শেষ তারা, যা পড়ে গিয়ে আকাশ করে ফাঁকা, আর সেই ফাঁকায় আমি হাঁটি, খালি পায়ে, রক্ত মাখা পায়ে, দাঁত বের করা মুখে, চুল উড়তে দেওয়া মাথায়, চোখে আগুন, বুকে শূন্যতা, পেটে ক্ষুধা, আর সেই ক্ষুধা মেটাতে আমি খাব সব, খাব এই পৃথিবী, খাব এই ইতিহাস, খাব এই সভ্যতা, যতক্ষণ না কিছুই বাকি থাকে, শুধু আমি, শুধু আমার ছায়া, শুধু আমার গান, যা গাইব একা, রাতে, বৃষ্টির জলে, রক্তের গন্ধে, মৃতদেহের শীতলতায়, আর সেই গানের সুরে কেঁদে উঠবে দেবতারা, ভয় পেয়ে যাবে অসুররা, স্তব্ধ হয়ে যাবে মানুষরা, আর আমি হাসব, কর্কশ হাসি, ভাঙা কাঁচের হাসি, যা কেটে ফেলবে তাদের কান, তাদের চোখ, তাদের হৃদয়, যতক্ষণ না তারা বুঝতে পারে, যে তারা আমাকে মেরেছিল, আজ আমি তাদের খাচ্ছি, ন্যায়ের নামে, ধর্মের নামে, ভালোবাসার নামে, যার কোনো নাম নেই, কারণ নাম দিলে সে বন্দী হয়, আর আমি বন্দী নই, আমি মুক্ত, আমি রাত, আমি শূন্যতা, আমি সেই আগুন, যা সব পুড়িয়ে দিয়েছে, এখন নিজেই নিভে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে, ফোঁটা ফোঁটা, অশ্রু ফোঁটা, রক্ত ফোঁটা, সেই ফোঁটাগুলো জড়ো করব আমি, বানাব মালা, পরাব গলায়, সেই মালার গন্ধে চিনব তোমাকে, যে এসেছিলে একদিন নদীর ধারে, জল দিয়েছিলে, হাত দিয়েছিলে, ভালোবেসেছিলে, মরেছিলে, আর আজ আমি বাঁচছি, তোমার মৃত্যুকে ধন্যবাদ, তোমার রক্তকে প্রণাম, তোমার স্মৃতিকে আলিঙ্গন, আর সেই আলিঙ্গনে আমি পুড়ছি, আমি জ্বলছি, আমি নিভে যাচ্ছি, আবার জ্বলে উঠছি, চিরকাল, এক মুহূর্তের জন্য, যে মুহূর্তে আমি কামড়াই, চুষি, খাই, তৃপ্ত হই, আবার ক্ষুধার্ত হই, আর এই চক্রের নাম জীবন, আর এই জীবনের নাম মৃত্যু, আর এই মৃত্যুর নাম ভালোবাসা, আর এই ভালোবাসার নাম আমি, রক্তলোলুপা, রাতের শিকারিনী, আগুনের মেয়ে, যে এখন ভ্যাম্প, যে চিরকাল ভ্যাম্প থাকবে, যতক্ষণ না এই পৃথিবীতে কোনো ধর্ম বাকি থাকে, কোনো নিয়ম বাকি থাকে, কারণ আমি সব খেয়ে ফেলব, সব চুষে ফেলব, সব শূন্য করে দেব, যতক্ষণ না শুধু থাকে আমি, আর আমার ছায়া, আর সেই ছায়ার নাম কর্ণ, যে নেই, কিন্তু আছে, আমার ভিতরে, আমার রক্তে, আমার দাঁতে, আমার ক্ষুধায়, আমার ভালোবাসায়, আমার অভিশাপে, আমার মুক্তিতে।

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন