এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  ঘুমক্কড়

  • সহ্যাদ্রির অঙ্গনে - ২ - ঝরে গেল সঞ্চিত স্নেহ

    সমরেশ মুখার্জী লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | ঘুমক্কড় | ০৩ মে ২০২৬ | ৮০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • |
    অক্টোবর ২০০৪ অবধি চার বছর রিলায়েন্স ইনফোকম প্রকল্পে পাঞ্জাবে লুধিয়ানা‌ সার্কেল ইনচার্জ হিসেবে কনস্ট্রাকশন এক্সিকিউশনের দায়িত্বে ছিলাম। কাজের ভৌগলিক ক্ষেত্র ছিল উত্তরে জলন্ধরের দিকে ফিল্লৌর, দক্ষিণে রোহতাকের দিশায় মালেরকোটলা, পশ্চিমে ফিরোজপুর অভিমুখে জাগরাঁও, পূবে আম্বালার পথে রাজপুরা, উত্তর-পূবে চন্ডীগড়ের দিশায় সামরালা হয়ে শতদ্রু নদী অবধি মাচ্ছিওয়াড়া। লুধিয়ানা সিটি OFC নেটওয়ার্ক নির্মাণে‌ও ছিল নানা জটিলতা। কাজ তুলতে এই বিস্তৃত এলাকায় প্রচুর ঘোরাঘুরি করতে হলেও বিভিন্ন রকম সিচুয়েশন, বহু বিচিত্র ধরনের পাবলিক হ্যান্ডলিং করতে হয়েছে। সেই কাজে বেশ থ্রিলিং চার্ম উপভোগ করেছি।

    নভেম্বর ২০০৪এ জয়েন করলাম এসার প্রোজেক্টে - এসার অয়েল ভাদিনার রিফাইনারি নির্মাণ প্রকল্পে। এবার দায়িত্ব পেলাম - সিভিল কন্সট্রাকশন ডিপার্টমেন্টের প্ল্যানিং, MIS, ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এইসবে। অফিস বেসড্ ওয়ার্ক, সাইটে ছোটাছুটি নেই, মাথা ঘামানোর সুযোগ আছে। লুধিয়ানার বাড়িতে স্ত্রী ও সাত বছরের পুত্রকে রেখে প্রথমে একা গেলাম জামনগর। HR জানালো জামনগরে এসারের নিজস্ব যে কটা এ্যাপার্টমেন্ট আছে তাতে ফ্ল্যাট খালি নেই, আপনি হপ্তা দুয়েকের মধ্যে আপনার পছন্দ‌মতো কোনো ফ্ল্যাট দেখে নিন। ততদিন গেস্টহাউসে থাকতে পারেন। কোম্পানির এনলিস্টেড প্রপার্টি ডীলার রমেশভাইয়ের ওপর আমায় বাড়ি দেখানোর দায়িত্ব পড়লো।

    জামনগরে পার্ক কলোনির কাছে দৃষ্টিনন্দন প্রতাপ বিলাস প্যালেস‌টি ১৯০৭~১৫ সালে নির্মাণ করিয়েছিলেন তদানীন্তন নয়ানগরের মহারাজা জামসাহেব রণজিৎ সিং‌ (1)। দক্ষ ক্রিকেট খেলোয়াড় রণজিৎ সিং‌য়ের স্মৃতি‌তে‌ই হয় রণজি ট্রফি টুর্নামেন্ট। আমি রমেশভাইকে জানিয়েছিলাম, আমার প্রয়োজন খুবই সামান্য। ছোট্ট মারুতি গাড়িটার জন্য কভার্ড পার্কিং আর মেন রোড থেকে একটু ভেতরে নিরিবিলি জায়গা হলেই চলবে। তিনতলা অবধি লিফট না হলেও চলবে। বেশ বড় প্যালেস গ্ৰাউন্ডের (2) পশ্চিমে সুভিন এ্যাপার্টমেন্টের (3) তিনতলায় রমেশভাই একটি ফ্ল্যাট দেখালেন।

    প্যালেস গ্ৰাউন্ডের দক্ষিণে একটি বৃক্ষময় বিশাল জমি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সেখানে হরিন চরে বেড়ায়। অনেক পাখি ও ময়ুরের নিরাপদ আশ্রয়। তার পূর্বদিকে বর্তমানে অব্যবহৃত অতীতের সামার প্যালেস (4)। ব্রিটিশ পরিবেশবিদ স্যার পিটার স্কটের সাথে মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের বন্ধু‌ত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ঐ জায়গা‌টির নাম স্যার পিটার স্কট নেচার পার্ক (5)।

    রমেশভাইয়ের দেখানো ফ্ল্যাটটির সামনে বড় খোলা ছাদ। ওখানে ভোরে, বিকেলে বা চাঁদনী রাতে চেয়ার নিয়ে বসলে মনে হবে যেন কোথাও বেড়াতে এসেছি। দেখে এতো পছন্দ হয়ে গেল যে ফাইনাল করে দিলাম। রমেশভাই‌ খুশি হয়ে বলেন, আপনার মতো একটা ফ্ল্যাট দেখেই কেউ ফাইনাল করে না। আরো দেখতে চায়, নানা ফ্যাঁকড়া বার করে। কোম্পানির স্টাফ, কিছু বলতেও পারি না।

    আসলে রমেশভাই প্রথমেই এমন একটা মন ভালো করা ফ্ল্যাট দেখালেন, আরো দেখার কোনো মানে হয় না। পার্কিং আছে, মেন রোড থেকে একশো মিটার ভেতরে, সামনে অনেক দূর অবধি খোলা জায়গা, একপাশে রাজকীয় প্যালেস, এতো সবুজ, এতো শান্তি - আর কী চাই! Life is not about chasing best of many worlds. ১০/০৭ সুভিন এ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে সুকৃতি এ্যাপার্টমেন্টে (6) একটা ফ্ল্যাট কিনে চলে এলাম। সেটার অবস্থা‌ন‌ও সুন্দর।


    জামনগরে আটটি বছর যেখানে কাটিয়েছি তার Satellite View (Refer 1~6)


    সুদৃশ্য প্রতাপ বিলাস প্যালেস - সুভিনের তিনতলায় ওপেন টেরাস থেকে প্যালেস গ্ৰাউন্ড পার করে উত্তর-পূর্বে তাকালে পাওয়া যায় এই দৃশ্য সুখের স্বাদ - ওল্ড ওয়ার্ল্ড চার্ম। প্যালেসে কখনো থাকিনি - পারবো‌ও না কখনো থাকতে - পারলে কেমন লাগবে তা নিয়ে অবশ্য খেয়ালী পোলাও চাখা যেতে পারে। ভোরে বা চাঁদনী রাতে ঐ প্যালেসে‌র দিকে তাকিয়ে একান্ত অন্তরে ঘুরে বেড়িয়েছি তার অন্দরে, অলিন্দে। যেমন কথায় বলে - ঘ্রাণেন অর্ধং ভোজনম্ - তেমনি, তস্য প্রাসাদস্য দর্শনেন অর্ধং নিবাসঃ।

    সকাল আটটা নাগাদ কোম্পানির বাসে চড়ে যেতাম ৩৮ কিমি দূরে প্রোজেক্ট অফিসে। প্রত্যেকের জন্য ঘোষিত নির্দিষ্ট বাস ছিল। মসৃণ রাস্তা ধরে 2x2x38 পুশব্যাক সীটের ভারী বাস চলতো রাজহাঁসের মতো। এক ঘন্টা‌য় পৌঁছে যেতাম অফিস। মধ্যবয়সী ড্রাইভার হসমুখভাই খুব ভালো চালাতেন - হঠাৎ ব্রেক কষা নেই, অযথা প্যাঁ প্যাঁ করে হর্ণ‌ দেওয়া নেই। The steady purring of the engine had a sedative effect. তাই বাসে উঠে‌ই চোখে রুমাল দিয়ে সীট হেলিয়ে লটকে পড়তুম। দিব্যি একটা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় চলে যেতাম। অফিসে গিয়ে মুখে চোখে জল দিয়ে এক কাপ কফি নিয়ে কাজটেবিলে বসতুম ফ্রেশ মুডে।‌

    বিকেলে ছটার বাসে বাড়ি ফেরার সময় আবার চোখে রুমাল দিয়ে হেলতুম। তখন কানে ইয়ার প্লাগ‌ও লাগাতুম কারণ অনেকে ফেরার সময় চলন্ত বাসে গলা তুলে নানা গল্প, আলোচনা করতো। সহকর্মী বিপুল বলতো, মুখার্জী‌সাব তো বাসে উঠেই এমন লাইট এ্যান্ড এয়ার টাইট মোডে চলে যান, যে কথাই বলা যায় না। আমি মৃদু হাসতাম। যখন কিছু বলার নেই চাপা হাসির জবাব নেই।‌ বুদ্ধদেব গুহ‌ও কোথায় যেন লিখেছিলেন, সারা জীবনে আমরা যতো কথা বলি, তার অধিকাংশই অযথা।

    জীবনে পেশাগত বা শখ, কোনো ক্ষেত্রে‌ই ‘বিশেষ’ কোথাও পৌঁছানোর উচ্চাশা বা উদ্যম ছিল না। ‘দিল হ্যায় ছোটাসা - ছোটি সি আশা’ কেস। তাই বিভিন্ন ঘটনা‌চক্রে জীবন যে দিশায় নিয়ে গেছে, আমিও বয়ে গেছি - went with the flow কেস আরকি। বহুদিন আগে কোথাও অস্কার ওয়াইল্ডের একটি উক্তি পড়ে বেশ লেগেছিল - “We are all in the gutter, but some of us are looking at the stars.” L&T তে চাকরি করার সময় ৯৫ সালে চেন্নাই হেডকোয়ার্টারে একটি ছয় দিনের ট্রেনিং‌ প্রোগ্ৰামে গেছি‌লাম। সেখানে কোনো কথা প্রসঙ্গে গ্যাডগিল স্যারের একটি কথা‌য় অস্কার ওয়াইল্ডের ঐ উক্তি‌টির ছায়া দেখেছিলাম, তাই মনে রয়ে গেছে। “Look for the reflection of a rainbow - even in a stagnant pool.” আমি‌ও জীবনে কিছু কঠিন পরিস্থিতিতে যেভাবে যতটুকু আনন্দ নিতে পেরেছি, নিয়েছি। জীবনে কয়েকবার অমাবস্যা এসেছে - নিয়তি‌ম্যামের কৃপায় আবার সোনালী সকাল‌ দেখেছি।

    মধ্য বয়সে (৪৪~৫২) জামনগরে সেই আটটি বছর কেটেছিল আনন্দে ও শান্তি‌তে। জামনগর বেঙ্গলি এ্যাসোসিয়েশনের সাথে যুক্ত থেকে সরস্বতী পূজা, দূর্গা পূজা, পয়লা বৈশাখ, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী, বার্ষিক পিকনিকের ভরপুর আনন্দ নিয়েছি। কয়েকজন ঘনিষ্ঠ‌দের সাথে বাড়িতে আড্ডা, খাওয়া দাওয়া, হোম থিয়েটারে পছন্দের সিনেমা দেখা, আশপাশে বেড়াতে যাওয়া, এসব করেও কেটেছে বহু সুন্দর সময়।

    কাজে‌ও আনন্দ ছিল। কোম্পানির পলিসি ছিল এমপ্লয়ি ফ্রেন্ডলী। শশী রু‌ইয়া সাহেবের লার্নিং এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নিয়ে বিশেষ প্যাশন ছিল। হাজিরা ও জামনগরে লার্নিং সেন্টার ছিল। ১১/০৪ এসারে জয়েন করেই কোম্পানি ০২/০৫ হাজিরা লার্নিং সেন্টারে পাঁচ দিনের একটি Experiential learning সেশনে পাঠালো। অপূর্ব সেই অভিজ্ঞতা। আরো কিছু ট্রেনিংয়ে গেছি। জামনগরে নালান্দা নলেজ সেন্টারে নিয়মিত নানা ইন্টারেস্টিং ইনহাউস সেশন হোতো। লাইব্রেরীতে কেজো হ্যান্ডবুক, ম্যানুয়াল ছাড়াও নানা ব‌ই ছিল। বাড়িতেও ব‌ই আনতাম। বৌয়ের ব‌ই পড়ার শখ। ওর লটারি লেগে গেল।

    ২০১০~১১ দু’টি বছর কোম্পানির হয়ে বেশ কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে গেছি ফাইনাল ইয়ার ছাত্রদের ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ নিতে। HR টিম তাদের ফর্মালিটি পূরণ করে অনলাইন টেস্ট, GDতে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের তালিকা আমায় দিতো। আমায় নিতে হোতো পার্সোনাল ইন্টারভিউ। সিলেক্ট হলে তারা GET (Graduate Engineer Trainee) হিসেবে জয়েন করতে পারবে। বেশ আকর্ষণীয় ছিল সেইসব অভিজ্ঞতা। বস বলেছিলেন, তুমি বেড়াতে ভালোবাসো, ইন্টারভিউ শিডিউললের আগে বা পিছে দিন দুয়েক রেখে ট্র্যাভেল ডেস্কে ফ্লাইট বুক করতে বোলো। পুরোটাই আমি অফিসিয়াল ট্যুর হিসেবে এ্যাপ্রুভ করে দেবো। তবে বেড়ানোর খরচ ট্যুর এক্সপেন্সে দেখিও না। এমন উদার বস পেয়ে সেই সুযোগে কয়েকটি একাকী ভ্রমণ করে নিয়েছি।

    সলিলদার কথায়, সুরে ও অনুপদার অনুপম গায়কীতে শুনেছি - এমনি চিরদিন তো কভু যায় না। তবে সে গানে দিনগুলি ছিল সর্বনাশা নিরাশার। জামনগরে আমার আটটি বছর কেটেছিল তার বিপরীত - অতীব আনন্দ‌ময়। তবে তাও তো আর চিরকাল কপালে সয় না। তাই ঘটলো ছন্দপতন, ৮/১২ এসারের হেড অফিসে বদলি হ‌য়ে। সৌরাষ্ট্রের এক কোনে বিশাল লাখোটা সরোবর, অনেক বাগিচা, বহু মন্দিরময় শান্ত সুন্দর এক হেরিটেজ শহর থেকে যেতো হোলো মুম্বাইতে - The city that never sleeps - where people always run. এবার কর্মক্ষেত্র বান্দ্রা কুরলা কমপ্লেক্সে এসার গ্ৰুপের নিজস্ব কমপ্লেক্স - ইকু‌ইনক্স বিজনেস পার্ক।

    ওখানেও প্রথমে একা গেলাম। কিছুদিন কোম্পানির গেস্টহাউসে থেকে নবী মুম্বাইয়ের অন্তিম নোড খারঘরে একটি ফ্ল্যাট ফাইনাল করলাম। এবার আর রমেশভাই নেই। লোকাল এক প্রপার্টি ডীলার গনেশভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করে নিজেই সব ঠিক করলাম। একমাত্র পুত্র জামনগরে এসারের নিজস্ব স্কুল নন্দ বিদ্যানিকেতনে পড়ছে। 10th বোর্ডের পরীক্ষার পর আসবে। স্ত্রী ও পুত্র রয়ে গেল জামনগরে। চল্লিশ ফ্ল্যাটের সুকৃতি এ্যাপার্টমেন্টে সবাই পরিচিত। জনা দশেক ফ্ল্যাট মালিক এসারের। জামনগর বেঙ্গলি এ্যাসোসিয়েশনের অনেক বন্ধু আছে। কাছেই দোকান‌পাট।‌ তাই চিন্তা‌র কিছু নেই।

    বোর্ডের পরীক্ষার পর ৪/১৩ জামনগরের ফ্ল্যাট লক করে স্ত্রী, পুত্রকে নিয়ে আসা ইস্তক নয় মাস একা‌ই ছিলাম খাড়ঘরে। সকালে হারবার লাইনে পানভেল CSTM লোকালে খারঘর থেকে যেতাম কুরলা। ফার্স্ট ক্লাসের মান্থলি নিতাম। তাতেও বেশ ভীড়। কুরলা স্টেশন থেকে অফিস হেঁটেই চলে যেতাম। বারো মিনিট লাগতো। সন্ধ্যা ছটা নাগাদ অফিস থেকে বেরিয়ে আবার হেঁটে‌ই কুরলা স্টেশনে চলে আসতাম। ট্রেন এলে রাগবি প্লেয়ারের মতো গেটে ধস্তাধস্তি করে ট্রেনে উঠতে হোতো। তখন ন্যাপস্যাকটা বুকের দিকে ঘূরিয়ে নিতাম, না হলে ধাক্কাধাক্কি‌র সুযোগে ভেতর থেকে মোবাইল বা অন্য কিছু ঝাড়খণ্ড হয়ে যেতে পারে। রোজকার এই ধস্তাধস্তি ভালো না লাগলেও মেনে নিয়েছিলাম as part of the life, when you can't avoid - endure it.

    পেশাগত জীবনের প্রেক্ষাপটে হার্ডশিপে‌ নুয়ে পড়া আমার স্বভাবে নেই। কিন্তু জামনগরে আট বছরের মধুমাসে শরীরে ও মনে অজান্তে‌ই সঞ্চিত হয়েছিল শান্তি‌র স্নেহ। তবে শরীরের নাম মহাশয় …। তাই অতোদিন আয়েশে কাটিয়ে‌ও বাহান্নতে খাড়ঘরে এসে ভাবলাম, এতো মানুষ যদি নিত্যদিন লোকাল ট্রেনে কুস্তোকুস্তি করে কাজে যেতে পারে - আমি‌ই বা পারবো না কেন?

    সপ্তাহে ছয় দিন, প্রায়শই অর্ধেক পথ দাঁড়িয়ে, প্রতিদিন আপ ডাউন ৬৪ কিমি / ২ ঘন্টা‌র ট্রেন জার্নি করে দুমাসেই আমার হাত, পায়ের জং ছেড়ে গেল। মন থেকে ঝরে গেল নিশ্চিন্ত আরামে সঞ্চিত স্নেহ। ফলে পরবর্তীতে যখন ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী মারাঠি ট্রেকমেটদের সাথে ট্রেকে গেছি - আমার জন্য দলের গতি ধীর হয়ে যায়নি।

    ২০১২’র বড়দিনে গেছি‌লাম সহ্যাদ্রিতে তিনদিনের একটা ট্রেকে। মুম্বাই হাইকার্স সাইটে সেই ট্রেক নোটিশে বলা ছিল - Difficulty Level - High, Endurance Level - High. এ‌ও বলা ছিল ওটা রেঞ্জ ট্রেক। মানে এক জায়গা থেকে শুরু হয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে শেষ হবে। ঐ ট্রেকে গেলে দলের সাথেই শেষ অবধি যাওয়া বাঞ্ছনীয়। মাঝপথে একটা জায়গা‌ থেকে না পোষালে ফিরে আসা যায় - তবে ফিরতে হবে নিজ দায়িত্বে ও ঝুঁকি‌তে। সেই জায়গাটি - Point of No Return. সেখান থেকে দড়িদড়া দিয়ে নেমে দড়ি গুটিয়ে দল এগিয়ে গেলে সেই পথে একা ফেরা - রক ক্লাইম্বিং‌য়ে দক্ষ না হলে, আনাড়ী‌দের পক্ষে অসম্ভব। সেই ট্রেকে দ্বিতীয় দিনটা ছিল টাফ।‌ সন্ধ্যায় দলের বয়স্ক‌তম সদস্য হিসেবে সেদিনের অন্তিম গন্তব্য - পাহাড়ে কাটা কেভ শেল্টারে‌র দিকে এগিয়ে যাচ্ছি - পিছনে ৪৫+ দ্বিতীয় বয়স্ক সদস্য হতক্লান্ত হয়ে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে পড়েছিল।

    বেশ কয়েকটি ট্রেকে শুক্র বা শনিবার অফিস করে বাড়ি ফিরে রাতে আবার গেছি থানে বা কল্যাণ। সেখান থেকে ট্রেনে কাসারা, মানমাড বা পুনে। তারপর জীপে ৩০ থেকে ৮০ কিমি দূরে বেস ভিলেজে পৌঁছানো। সে সব দিনের স্মৃতি অবিস্মরণীয়! শরীরের ক্লান্তি মিলিয়ে গেছে মানসিক আনন্দে।

    জামনগরে থাকতে পশ্চিমঘাটের হিল ফোর্ট ট্রেক সম্পর্কে কিছু খোঁজ নিয়ে‌ছিলাম। সহ্যাদ্রির অঙ্গনে এসে বিশদে জানার জন্য জাল ঘাঁটতে লাগলুম। একটা কাজের ওয়েব‌সাইট পেলাম - Mumbai Hikers - Trek Aggregator Site. ওখানে বিভিন্ন ট্রেক অর্গানাইজিং সংস্থা তাদের আগামী ট্রেকের শিডিউল আপলোড করে। তাতে থাকে কোথায় ট্রেক, কবে যাওয়া, কতজন যেতে পারে, কোথায় মিটিং পয়েন্ট, ডে-ট্রেক না একদিনে‌র বেশি, ডিফিকাল্টি লেভেল কতো, এনডিওরেন্স লেভেল কেমন বাঞ্ছনীয়, মাথাপিছু খরচ ইত্যাদি তথ্য। এসব দেখে আগ্ৰহীজন তার সুযোগ, সামর্থ্য অনুযায়ী আবেদন করতে পারে।‌

    সেই মুম্বাই হাইকার সাইট থেকেই যোগাযোগ করলাম অনিকেত সিন্ধের সাথে। শুরু হোলো আমার সহ্যাদ্রিতে পায়ে খড়ি।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    |
  • ভ্রমণ | ০৩ মে ২০২৬ | ৮০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • dc | 2402:e280:2141:1e8:2994:688c:4819:***:*** | ০৩ মে ২০২৬ ১১:১৬740467
  • খুব ভালো লাগলো পড়তে, আর পুরানো সেই দিনের কথা মনে পড়ে গেলো। আমি কলেজ থেকে পাশ করে ঐ গ্র‌্যাগুয়েট ইঞ্জিনিয়ার ট্রেনির চাকরি পেয়েছিলাম, তবে সেটা মোটাভায়ের কোম্পানিতে (তখনো অবশ্য সেটা ধিরুভায়ের কোম্পানি ছিল)। মুম্বাইতে ছয় মাস ইনিশিয়েশান ট্রেনিং হয়েছিল, তারপর আমাদের কয়েকজনকে সুরাট পাঠিয়ে দিয়েছিল। সেখানে তখন হাজিরা রিফাইনারির পোস্ট-কমিশনিং চলছিল, আর জামনগর রিফাইনারির প্রি-কমিশনিং। আমি কাজ পেয়েছিলাম পাইপিং অ্যান্ড ইনস্ট্রুমেন্টেশানে। আমাদের একটা দল, হাজিরায় বেসড হলেও, মাসে অন্তত দুতিনবার জামনগর যেতাম। মোটাভাই এর বাসে করে জামনগর যেতাম, আমিও ঠিক আপনার মতো সকাল বেলা জানলার ধারের সিটে বসে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে যেতাম। আর সন্ধেবেলা বাসে গান চালিয়ে দিত, শুনতে শুনতে ফিরতাম। জামনগর শহরটা, রাস্তাঘাট খুব ভালো লাগতো, কতো পুরনো পুরনো সব বাড়িঘর দেখতাম! একবার অফিসের কয়েকজন মিলে প্রতাপ বিলাস প্যালেসের মিউজিয়াম দেখতে গেছিলাম, আরও এদিক ওদিক ঘুরেছি। মোটে দুবছর গুজরাটে ছিলাম, তারপর ফিরে এসেছিলাম, কিন্তু সেই প্রথম চাকরির অনেক কিছু এখনও মনে আছে :-)
  • হীরেন সিংহরায় | ০৩ মে ২০২৬ ১২:১৪740473
  • অসাধারণ। ওদিকে কিছুই দেখি নি। কত ঘোরা হয়ে গেল
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন