এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  দেখেছি পথে যেতে

  • দুই দাপুটের কাশীভ্রমণ - ৬

    লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | দেখেছি পথে যেতে | ২০ মার্চ ২০২৬ | ৭৯ বার পঠিত
  • সারনাথ থেকে রামনগরের দুরত্ব ১৫ কিলোমিটারের মত। এমনিতে ৪৫ মিনিটের বেশী লাগা উচিৎ নয়। তবে রোববারের দুপুরে ভরভরতি জ্যামের ঠ্যালায় পৌঁছাতে লেগে গেল এক ঘন্টার কিছু বেশী। এদিকে উবের সারথী এসে থেকে বলে যাচ্ছেন তেনার ম্যাপ কাজ করছে না ট্রিপ দেখাচ্ছে না। ওদিকে যাত্রীদের অ্যাপে দেখা যাচ্ছে ট্রিপ অ্যাকসেপ্টেড। সারথী পিক আপ পয়েন্টে পৌঁছে গেছেন। মহা মুশকিল। তা তিনি ওটিপিও নিলেন না কারণ ট্রিপ স্টার্ট করার অপশান পাচ্ছেন না। যাত্রীদের ফোন থেকে ম্যাপ বের করে আর ফোনে কোন বন্ধুর সাহায্য নিয়ে তিনি তো রামনগর ফোর্টের সামনে পৌঁছে দিলেন। 


    রামনগর ফোর্ট

    ফোর্টের কাছাকাছি এসে একটা মোড়ে এঁদের নামিয়ে দিতে চেয়েছিলেন সারথী রাস্তা বন্ধ বলে। একজন তক্ষুণি ওই তো এগিয়ে ইউটার্ন নিয়ে আসতে হবে চলিয়ে চলিয়ে করে আবার ঠিক রাস্তায় ফেরান। জায়গামত পৌঁছে আসল কথাটা ভাঙলেন সারথীমশাই। তিনি আসলে মুম্বাইয়ে উবের চালান।, এখানে আত্মীয়বাড়িতে এসেছিলেন। এইবারে বোঝা গেল ইনি নিজেই সম্ভবত ট্রিপটা রেকর্ড হোক সেটা চান নি, যাতে উবেরের কমিশান ওঁকে দিতে না হয়।  তাই ট্রিপ অ্যাকসেপ্ট করে বাকী ঝুলিয়ে দিয়েছেন। তো নেমে দুজনের মনে হল এবারে লস্যি খেতে হবে।  মালাই টোস্ট হজম হয়ে গেছে আর রামনগর ফোর্টের বাইরে লস্যি বিখ্যাত জানা ছিল। 


    লস্যি বানানো হচ্ছে  - শিবপ্রসাদ লস্যি ভান্ডার


    লস্যি রেডি - শিবপ্রসাদ লস্যি ভান্ডার

    দুর্গের ঠিক সামনের লস্যির দোকানের তুমূল ডাকাডাকি  উপেক্ষা করে গুগল ম্যাপ ধরে শিবপ্রসাদ লস্যি ভান্ডার খুঁজে বের করা গেল। রাস্তার পাশেই পরপর ২৫০গ্রামের ভাঁড়ে লস্যি বানানো চলছে। ভেতরে ঢুকে বসার ব্যবস্থা। এরা শুধুমাত্র রাবড়ি-লস্যি বানায়। এদের লস্যির বৈশিষ্ট্য হল মালাই ভরপুর লস্যি বানিয়ে উপরে দুই চামচ রাবড়ি দিয়ে দেয়। স্ট্র দিয়ে বা চুমুক দিয়ে নয় চামচ দিয়ে খেতে হয়। সে অবশ্য গোটা উত্তরভারতেই লস্যি বেশ ভারী হয়। দিল্লির মটকেওয়ালে লস্যি বা পাঞ্জাবের জলেবী লস্যি যেমন এক মটকা ( আধসের) বা এক গ্লাস ( আধসের / একসের) খেলে একবেলার খাওয়া হয়ে যায়। 


    এসে গেল হাতে হাতে

    শিবপ্রসাদের লস্যিটা এতই ভাল যে একভাঁড় খেয়ে ঠিক তৃপ্তি হল না দুই ভাঁড় করে চেটেপুটে খেয়ে দুর্গের দিকে ফেরা গেল। দুর্গে ঢোকার টিকিট ৮০/- টাকা ভারতীয়দের জন্য আর বিদেশীদের খুব সম্ভবত ৩০০/- টাকা। মজা হল টিকিট দেখিয়ে ঢোকার সময়। বিশেষ লোকজন নেই, দুজনে টিকিট দেখাতেই সেদুটো একটু করে ছিঁড়তে ছিঁড়তে টিকিট পরীক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন ‘'আপনারা বিদেশী নয় তো?’ কে জানে হয়ত একজনের নীল চুল দেখে বেচারি ধন্ধে পড়েছিলেন। ১৭৫০ খ্রীস্টাব্দে কাশী নরেশ মহারাজা বলওয়ন্ত সিং এই দুর্গ বানান। চুনারের বেলে পাথরে তৈরী মুঘল স্থাপত্যরীতির এই দুর্গের এক অংশে বর্তমান প্রজন্মও বাস করেন। 


    রামনগর ফোর্টের ভিতরে 

    রাজত্ব ঘুচেছে সেই কবে ১৯৭১ সালে। তবু স্থানীয়দের কাছে সেই বংশের বর্তমান বংশধর অনন্তনারায়ণ সিংহ রাজা নামেই পরিচিত। কাশী রাজবংশের বিপুল সংগ্রহ দিয়ে সাজিয়ে দুর্গের মধ্যেই তৈরী হয়েছে সরস্বতী মিউজিয়াম। মিউজিয়ামের ভেতরে ছবি তোলা বারণ। তার কারণ বোধহয় দ্রষ্টব্যবস্তুসমুহের জরাজীর্ণ হাল। বেনারসী বস্ত্রের বিপুল সংগ্রহ, কিন্তু কাচের শোকেসের ভেতরে, তাদের ধুলিমলিন চেহারা দেখলে দু:খ হয়। নানারকম রাইফেল, গাদাবন্দুক, রিভলবার, ছোরা ইত্যাদি অস্ত্রশস্ত্রের সম্ভার অবশ্য বেশ চকচকে। বের করে নিয়মিত পরিস্কার করা হয় বোঝা গেল।

    কিংখাব জরি মোড়া বেশ কিছু রাজকীয় পালকি,  ফোর্ড আর ক্যাডিলাকের ভিন্টেজ গাড়ি, হাতীর দাঁতের নানা দুষ্প্রাপ্য জিনিষ, সেরামিক ও বোনচায়নার ফুলদানি, পাত্র, ভিন্টেজ দেওয়াল ঘড়ির সংগ্রহ দেখার মত। তবে অধিকাংশই ধুলিমলিন। দুর্গের ভেতরে এক জায়গা থেকে গঙ্গা ও অপর পাড়ে কাশীর অপূর্ব ভিউ পাওয়া যায়। কিন্তু সেদিন ওই অংশে কিছু রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছিল, ফলে দেখা গেল না। সব মিলিয়ে দেখে  সারনাথের মত তৃপ্তি পাওয়া গেল না। বেলা তিনটে বাজে, সেই ভোর সাড়ে চারটেয় বেরোন, এবারে হোমস্টেতে ফেরা যাক। 


    দুষিত ফেনাভরা বরুণা নদী 

    ফেরার সময় আবার ঝামেলা। আগের ট্রিপটা যেহেতু সারথীমশাই পুরো রেকর্ড করেন নি ফলে ওটাই দেখিয়ে চলেছে উবের সিস্টেমে। ক্যান্সেল করতে বলছে। সামনেই অটোওলারা ডাকাডাকি করছে, গাইঘাট যাবো বলায় সাদরে ডেকে নিয়ে একটা অটোতে বসালো। অটোর সারথী একটু বয়স্ক, শুরু করলেন - 
    ~ রাস্তা তো মাঝখানে বন্ধ ওই চৌরাহায় নামিয়ে দেব হেঁটে চলে যাবে। 
    ~ আরে কোন রাস্তা বন্ধ? এখান থেকে গাইঘাট মালব্য ব্রিজ দিয়ে একটুখানি। 
    ~ না বন্ধ তো, যতদূর যেতে দেবে নিয়ে যাবো, পুলিশ আটকালে নামিয়ে দেবো। 
    ~ কি মুশকিল কোথায় বন্ধ? এই তো এলাম একটু আগে ওই পথেই। 

    খানিক ঝকাঝকি করে শোনা গেল গোধুলিয়ার ওদিকটা তো যেতে দিচ্ছে না। দুজনে ছ্যাঁৎ করে ওঠেন, গোধুলিয়া কেন যাবো? মালব্য ব্রিজ পেরিয়ে নীচের রাস্তা ধরে নমো ঘাট পেরিয়ে একটু এগিয়েই স্বামীনারায়ণ মন্দির আর তার পরেই গাইঘাট। সারথী তখন বলেন ও গাইঘাট হ্যাঁ হ্যাঁ চিনি এইতো বোসো নিয়ে যাচ্ছি। ততক্ষণে দাপুটে দুজন গেছেন বেদম ক্ষেপে। ইয়ার্কি পায়া হ্যায়? যা খুশী বলে ভুলভাল রাস্তায় ঘুরিয়ে দেবে! টকাটক নেমে রাস্তা পেরিয়ে এক টোটোওলাকে পাকড়ে উঠে পড়েন। অটোওলা তখনো ছাড়তে রাজী নন, এধারে এসে বারেবারে ফিরতে বলেন। ওনার নাকি বুঝতে ভুল হয়েছিল। 

    তারপরে আর বিশেষ কোন সমস্যা হয় নি। শুধু টোটোওলা নমোঘাটের কাছে এসে একজনকে রাস্তা ঠিক যাচ্ছে কিনা জিজ্ঞাসা করায় তিনি এনাদের টোটো থেকে নামিয়ে নৌকোয় চড়াতে চাইছিলেন কারণ রাস্তা নাকি অনেএএক দূর আর নৌকোয় ৩ মিনিট। তো সেসব এড়িয়ে ট্যান্ডন হাউসে ফিরে ভাল করে স্নান টান করে বসা গেল। সামনের খোলা ছাদে একটা তার টাঙানো আছে, তাতে মুম্বাইয়ের মেয়েরা নিজেদের জামাকাপড় মেলে রেখে গেছে। এক দাপুটে গিয়ে নিজের তোয়ালেটি তার পাশে মেলে এলেন। আজ সন্ধ্যেয় এই ছাদ থেকেই নীচে ডানদিকের গাইঘাটে আরতি দেখা যাবেখনে। মনে আশা  এতটা ওপর থেকে গঙ্গায় প্রদীপের প্রতিফলন দেখা যাবে। 

    খানিক বিশ্রাম নিয়ে অন্যজন ভাবলেন ছাদে গিয়ে একটু গঙ্গার শোভা দেখা যাক। কার্নিশের ধার ঘেঁষে একটা মস্তবড় কাঠের চৌকি পাতা আছে, আর ঘরের দিকে একটা ফাইবারের  টেবল একটা চেয়ার।  ছাদে বসে খাওয়াদাওয়া, কাজ করার জন্য দিব্বি ব্যবস্থা। আগের দিন বাঁদরদ্বয়  দাঁত খিঁচুনি দিয়ে চলে যাবার পরে আঙ্কল একখানা লাঠিও  ছাদে রেখে গেছেন।  ইনি কী ভেবে লাঠিখানা হাতে না নিয়েই কার্নিশের ধারে গিয়ে দু একটা ছবি তুলে চুপচাপ দাঁড়ান খানিক। 
    পাঁচ মিনিটের মধ্যেই হুপহাপ করে দুখানা বাঁদর হাজির ছাদে তাদের পিছুপিছু আরো কয়েকখানা। 

    বাবারে! ইনি তৎক্ষণাৎ যাবতীয় দাপট পকেটে পুরে তিড়িং বিড়িং করে দুই লাফে ছাদ পেরিয়ে বারান্দায় ঢুকে জাল লাগানো দরজা টেনে বন্ধ করে সোজা ঘরে। ইতোমধ্যে গোটা দুই শিশু বাঁদর জানলার গ্রিল ধরে উলটো হয়ে ঝুলে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করছে। অতএব দুমদাম করে ভেতর থেকে  কাচের পাল্লা বন্ধ করে ভাল করে টেনেটুনে দেখা হল কোনভাবে খুলে যাচ্ছে না তো।  অন্যজন বিশ্রাম করতে গিয়ে হঠাৎ জানলায় উল্টোঝোলা বাঁদরশিশু দেখে এমন ট্রমাটাইজড হয়ে গেলেন যে কিছুতেই আর ঘরের  দরজাও খুলতে রাজী নন। ওদিকে সাত আটখানা বাঁদর বাঁদরি আর দুখানা শিশু তারে মেলা সমস্ত জামাকাপড় তোয়ালে নিয়ে মহানন্দে টাগ অব ওয়ার খেলছে, ছিঁড়ে কুটি কুটি করছে। 


    সন্ধ্যে নামার পরে

    সব খেলাই শেষ হয়। সব পাখি ঘরে ফেরে। বাঁদররাও। আধঘন্টা বাদে আঙ্কল বাড়ি ফিরে যতক্ষণে উপরে এলেন ততক্ষণে যাবতীয় কাপড়চোপড় নিয়ে বাঁদরবাহিনী ফেরত চলে গেছে। সেই যে সেদিন এসেছিল আলাপ করতে আর এনারা পাত্তা না দেওয়ায় দাঁত খিঁচিয়ে গেছিল, আজ এসে ভালভাবে শোধ তুলে গেল। জানা গেল গতকাল বিশ্বনাথ মন্দিরে গিয়ে একটি মেয়ের আইফোন চুরি গেছে। সিসিটিভিতে দেখাও গেছে কে নিচ্ছে। ওরা আজ গেছে পুলিশের কাছে চোর আইডেন্টিফাই করতে। পরেরদিন সকালে জানা গেছিল ফোন তখনও পায় নি। আর জামাকাপড়গুলো ওদের কথায় ‘'বান্দরনে প্যহেন লিয়া হোগা।”


    গাইঘাটে গঙ্গারতির প্রস্তুতি

    রাত্রে আর বেরিয়ে বাইরে কোথাও খেতে যাবার এনার্জি ছিল না। তাই জোম্যাটোয় অর্ডার করা হল। এবং জোম্যাটো দেড়ঘন্টা ঝুলিয়ে রেখে যে খাবার ডেলিভারি করল তা অতি অখাদ্য। সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ অবশ্য একজন বেরিয়ে গিয়ে পাড়ার ভেতরের রাবড়ির দোকান থেকে খানিক রাবড়ি এনেছিলেন। সেটা অতি উমদা ছিল সেই যা বাঁচোয়া। ৯ তারিখে ফেরতযাত্রা। কিন্তু ট্রেন মাঝরাত পেরিয়ে অফিশিয়ালি ১০ তারিখ সকালে। ঠিক হল সকাল ১১টায় চেক আউট করে বড় পিঠঠু দুটো আঙ্কলের অফিসে রেখে সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে সন্ধ্যেয় ফিরে ব্যাগ তুলে মুঘলসরাই  যাওয়া যাবে। 

    https://youtube.com/shorts/l1dGYlk99zY?si=dU4NelATU_ldVutI
    গরমাগরম কচুরি ভাজা হচ্ছে

    হ্যাঁ স্টেশানের নাম দীনদয়াল উপাধ্যায় জংশন হলেও জায়গাটার নাম এখনো মুঘলসরাইই আছে। সেই যে ছোকরা OZE Stay র কেয়ারটেকার, অন্ধকুপ থেকে ট্যান্ডন হাউসে পৌঁছে দিয়েছিল,  তাকেই ট্যাক্সির জন্য বলে দিয়ে ঘুরতে বেরোন হল। এর মধ্যে অবশ্য আঙ্কলের পোষ্য কালো ল্যাব জ্যাকি এসে দুজনের সাথে ভাব জমিয়ে বিস্কুট খেয়ে গেছে। বেচারিকে সারাদিন বেঁধে রাখা হয় বলে অচেনা মানুষ দেখলেই পরিত্রাহী চেঁচায়। এঁরা দুজন আবার ভৌ দেখলেই বন্ধু ভাবেন, তারাও সেরকমই ভাবে। তাই ছাড়া পেয়ে প্রথম সুযোগেই জ্যাকি ছাদে হাজির। নেচে, গড়াগড়ি খেয়ে, পেট চুলকিয়ে নিয়ে  জ্যাকি খুশী হয়ে নীচে গেল, এঁরাও বেরোলেন। 


    গরমাগরম জিলিপী

    বেরিয়ে প্রথমেই কচুরি জিলিপী দিয়ে ব্রাঞ্চ সেরে গোধুলিয়ার দিকে যাবার জন্য টোটো ধরা। সেদিন আবার রাস্তায় অনেক ব্যারিকেড। বড়রাস্তা ধরে অল্প খানিকটা যেতে না যেতেই পুলিশ দিল ঘুরিয়ে। টোটোর বাকী দুজন যাত্রী সরকার তথা প্রশাসনের মুন্ডুপাত করতে করতে চললেন। স্বাভাবিক, দিনের পর দিন উন্নয়নের নামে এই ধ্যাস্টামো সহ্য করা কঠিন। টোটো, রিকশা, হন্টন ইত্যাদি করে বিশ্বনাথ গলিতে উপস্থিত  এবং খুচখাচ কেনাকাটি। এখানে একটা কথা না বললেই নয়, কাশীর মানুষজন অসম্ভব ধৈর্য্যশীল এবং মিষ্টভাষী। এই যে এত লোক এত এত দোকানে ঢুকে প্রচুর জিনিষ দেখে কিছুই না কিনে বেরিয়ে যাচ্ছেন তাতে কোন দোকানী সামান্য মুখভারও করছেন না, খ্যাঁচখ্যাঁচ করা তো অনেক দূরের ব্যপার। 


    ট্যাগলাইনটা হেব্বি

    রাস্তায় ঘাটে এত ব্যারিকেডে অসুবিধেয় পড়ে মানুষ গজগজ করে, মুন্ডুপাত করে কিন্তু দাঁত মুখ খিঁচায় না। রূঢ় ব্যবহার একজনেরও দেখিনি। গঙ্গা যমুনি তেহজিবের গভীর প্রভাব এখনো এই অঞ্চলের মানুষের উপরে যথেষ্ট। বিশ্বনাথ গলি থেকে বেরিয়ে যাওয়া হল কচৌরি গলি, ব্লু লস্যি শপে। যদিও কেউ কেউ বলে দিয়েছিল এদের ড্রাইফ্রুট লস্যি খেতে, তবে কোন্নগর ইলিনয় দুজনেই রাবড়ি মালাই লস্যি নিলেন। এও চমৎকার খেতে। বাংলায় যাকে বলে ডেলিইশাস। এদের দোকানের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হল দেওয়াল ছাদ ভর্তি অজস্র নাম ও পাশে ছবি। ফিরে এসে  জানা গেল লস্যি ভাল লাগলে দোকানের দেওয়ালে বা ছাদে নিজের নাম লিখে আসাই প্রথা,  ছবি থাকলে ছবিও সেঁটে দিয়ে আসা। 


    ব্লু লস্যি শপের দেওয়াল

    খেয়েদেয়ে বেরিয়ে ঠিক হল ঘাটে গিয়ে বসা যাক কিছুক্ষণ, হাতে অফুরন্ত সময় এখন।  পথে পে এন্ড ইউজ টয়লেট দেখে এক দাপুটে ভাবলেন আচ্ছা ঘুরেই যাওয়া যাক। তো সেখানে মুখোমুখী দুখানা আলাদা টয়লেট। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে একজন তো ঢুকলেন, অন্যজন যাবেন না তাই একটু দূরে দাঁড়িয়ে মোবাইল ঘাঁটছেন। হঠাৎই কানে এলো তীব্র দাপুটে গর্জন। ‘'আমি তোমার পরিচিত কেউ নই, খবরদার গায়ে হাত ঠ্যাকাবে না।’’ অন্যজন চটপট মোবাইল ব্যাগে পুরে পাশে গিয়ে জানলেন  বেরিয়ে কিছু একটা ব্যপারে আপত্তি করায় টাকা নিচ্ছে যে লোকটি সে পিঠে টোকা দিয়ে সেটা তেমন কোন ব্যপার নয় এই বলতে গিয়েছিল। 


    রাবড়ি মালাই লস্যি - ব্লু লস্যি শপ

    এঁর তীব্র প্রতিবাদে সঙ্গে সঙ্গে সরি বলে দুই কান ধরে মাথা নীচু করেছে। অন্যজনও গর্জে ওঠেন,  আগে তাঁর কানে এসেছে সাধারণভাবে মেয়েদের সম্পর্কে কিছু ডেরোগেটরি মন্তব্য। খানিকটা বিরক্ত হয়েই তিনি দূরে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই প্রতিবাদটাও বেরিয়ে আসে। দুজনের দাপটে উল্টোদিকের টয়লেটের লোকটি পায়ে পায়ে পিছিয়ে গেছে বেশ খানিকটা আর এ তো মাথা নীচু করে সরি বলে চলেছে। রাস্তায় নেমে দুজনে বলাবলি করেন প্রতিবাদের কোন বিকল্প নেই। এই লোক নিশ্চয়ই এটা করে অভ্যস্ত। আর অনেকেই রুখে উঠতে পারে না। এবার থেকে কিছুদিন অন্তত অপরিচিত মানুষের  গায়ে হাত দেবার আগে দুবার ভাববে। 

    এরপরে আর বিশেষ কিছু নেই বলার মত। ফেরার সময় রিকশাওলা ছেলেটি  অন্যদিনের ভাড়ার ঠিক অর্ধেক চায়।  আর একেবারে গলির ভেতরে ঢুকে ওই রাবড়ির দোকান পর্যন্ত এনে নামায়। নিতান্ত বাচ্চা ছেলে, বছর কুড়ি কি একুশ বয়স হবে। ও কি এই পথে চালায় না, এই জিজ্ঞাসার উত্তরে  বলে সদ্য গ্রাম থেকে এসেছে, নভেম্বরে বোনের বিয়ে তাই প্রাণপণে খেটে যতটা সম্ভব বেশী রোজগার করে নিতে চায়। এঁরা রিকশায় বসেই ঠিক করে নিয়েছিলেন অন্যদিন যা দেন সেটাই দেবেন। ওকে  এপথের রেট জানিয়ে ভাড়াটা দেবার পরে ছেলেটির মুখে যে উজ্জ্বল হাসিটা ফোটে তাকে ধরার ক্ষমতা কোন ক্যামেরার নেই। 


    পাড়ার দোকানের রাবড়ি 

    বাড়ির জন্য রাবড়ি কিনে ট্যান্ডন হাউস থেকে ব্যাগপত্র উঠিয়ে মুঘলসরাই পৌঁছানো। একটানে লিখলাম বটে তবে মাঝখানে দুই ঘন্টার একটা গ্যাপ। কারণ যে ছোকরার ট্যাক্সি বুক করে ট্যাক্সিওলাকে সময় জানিয়ে দেবার কথা ছিল, সে বুক করেছে বটে তবে সময় জানাতে ভুলে গিয়েছিল। আর গোটা কাশী জুড়ে সেদিন সাংঘাতিক জ্যাম। তবে তাতে খানিক বিরক্তি ছাড়া আর তেমন কোন অসুবিধে  হয় নি। শেয়ালদা রাজধানী যার রাত সাড়ে বারোটায় দীনদয়াল উপধ্যায় জংশনে আসার কথা সে তিনঘন্টা লেটে চলছিল। তবে দুদিকে লেট করে নি, তিনঘন্টা দশ মিনিট লেটে ঢুকে ওই পরিমাণ  লেটেই শেয়ালদা ঢুকেছে। 

    ডিডিইউজেএর এনকোয়ারি কাউন্টার থেকে জেনে নিয়ে দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসি কামরার লেডিজ ওয়েটিংরুম উপস্থিত হয়ে ঘন্টাখানেক বসাও হয়েছিল। তারপরে শোয়া দূরে থাক, বসারও তেমন সুবিধে হচ্ছে না দেখে বেসরকারি লাউঞ্জে যাওয়া হল। এখানে চল্লিশ টাকা প্রতি ঘন্টা, ব্যবস্থা চমৎকার। দুজনে দুখানা সোফা দখল করে লম্বা হন। অন্যান্য স্টেশানের লাউঞ্জের মতই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, মধ্যরাত হওয়ায় লোকজনও বেশ কম। শুধু একটাই সমস্যা, দিল্লি বা হাওড়ার মত স্টেশানের মধ্যেই লাউঞ্জ নয়। স্টেশান বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে পার্কিং লট পেরিয়ে তবে বেসরকারি লাউঞ্জ। এটা একটু অসুবিধেজনক।

     দুই দাপুটের কাশীভ্রমণ এখানেই শেষ। বেড়ানোর টুকিটাকি ভুলে যাবো আস্তে আস্তে। মনে থেকে যাবে দুজনের কারণে অকারণে হেসে গড়িয়ে পড়া, ভুলভাল কিছু দেখলে একসাথে গর্জে ওঠা, আর হাঁটা হাঁটা আর হাঁটা।  আবার কবে একসাথে বেরোন হবে জানা নেই, তদ্দিনের জন্য এই ব্লগটা  থাকবে সুন্দর মুহূর্তগুলো মনে করাতে। 

    (সমাপ্ত)
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ভ্রমণ | ২০ মার্চ ২০২৬ | ৭৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | 2607:fb91:4c8b:e2ab:f5cf:4c78:b8f1:***:*** | ২০ মার্চ ২০২৬ ২০:০৭739300
  • যাঃ, শেষ হয়ে গেলো! সুদৃশ্য, সুস্বাদু সিরিজটা হয়েছে। সন্ধ্যার পরের ছবিটা এত ভালো লাগলো! নানা রঙের নৌকো বেঁচে থাক। নানা রকম রাবড়ি ও লস্যি বেঁচে থাক। "আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে" করে গুপীবাঘার মত বেরিয়ে পড়া দুই দাপুটের জোশ ও হিম্মত বেঁচে থাক।
  • dc | 2402:3a80:435:65c2:2446:372f:8929:***:*** | ২০ মার্চ ২০২৬ ২০:০৯739301
  • প্রথম ছবিটা, রামনগর ফোর্ট, দারুন হয়েছে। 
     
    আর লস্যি, জিলিপি, রাবড়ির ছবি দেখতে দেখতে এক গামলা জিভের জল ঝরিয়ে ফেল্লাম :-)
     
    প্রতিবাদের গল্পটাও পড়লাম। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন