১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অ্যালান টুরিং এই চিঠিটি লিখেছিলেন তাঁর বন্ধু এবং সহকর্মী গণিতবিদ নরম্যান রুটলেজকে।
প্রিয় নরম্যান,
চাকরিবাকরির ব্যাপারে আমি সত্যি বলতে খুব একটা জানি না, যুদ্ধের সময় যেটা করতাম সেটা ছাড়া, তবে সেই চাকরিটায় ঘোরাঘুরির কোন ব্যাপার ছিল না। আমার মনে হয় ওরা বাধ্যতামূলক জবরদস্তি নিয়োগও করে। সেখানে প্রচুর কঠিন চিন্তার কাজ ছিল বটে, কিন্তু তোমার কাছে সেটা পছন্দের হবে কিনা আমি জানি না। ফিলিপ হলও একই দলে ছিল এবং মোটের উপর বলতে পারি, সে এটা মোটেই পছন্দ করেনি। যাইহোক, এই মুহূর্তে আমি নিজেই এমন একটা অবস্থায় আছি যে ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারছি না - কারণটা পরের অনুচ্ছেদে ব্যাখ্যা করছি।
আমি এখন এমন এক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছি যেটাকে আমি সবসময়ই আমার জন্য বেশ সম্ভব বলে মনে করতাম, যদিও আমি সাধারণত এর সম্ভাবনা ১০:১-এর বিপরীতে ধরতাম। আমি শীঘ্রই এক তরুণ পুরুষের সাথে যৌন অপরাধের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হতে চলেছি। ব্যাপারটা কীভাবে ফাঁস হয়ে গেল তা একটা দীর্ঘ ও মনোগ্রাহী ঘটনা, যেটা নিয়ে একদিন একটা ছোটগল্প লিখে ফেলতে হবে - কিন্তু এখন তোমাকে সেটা বলার সময় নেই। সন্দেহ নেই যে এই সব মিটে যাবার পর আমি একজন ভিন্ন মানুষ হয়ে উঠব, কিন্তু সেই ভিন্ন মানুষটা ঠিক কে হবে সেটা এখনো জানি না।
তুমি যে সম্প্রচারটা উপভোগ করেছ সেটা জেনে ভালো লাগল। তবে জেফারসন অবশ্যই বেশ হতাশাজনক ছিল। আমি ভয় পাচ্ছি যে ভবিষ্যতে কেউ কেউ নিম্নলিখিত যুক্তিটা ব্যবহার করবে:
টুরিং বিশ্বাস করেন যন্ত্র ভাবতে পারে
টুরিং পুরুষের সাথে শয্যা নেন
অতএব যন্ত্র ভাবতে পারে না
তোমার অসহায় বন্ধু,
অ্যালান
সেই এখানে একটু ধরিয়ে দেওয়া যাক চিঠিতে উল্লিখিত জেফারসন কে ছিলেন। স্যার জিওফ্রে জেফারসন (১৮৮৬–১৯৬১) ছিলেন ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জারির অধ্যাপক, মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার বিশেষজ্ঞ। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ নিউরোসার্জারির প্রতিষ্ঠাতা পুরুষদের একজন। ১৯৪৯ সালের ৯ জুন, লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অফ সার্জনস-এ জেফারসন তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা দিয়েছিলেন যার শিরোনাম ছিল “যান্ত্রিক মানুষের মন” ("The Mind of Mechanical Man")। এই বক্তৃতাটি ছিল সরাসরি তখনকার টুরিংয়ের কাজের বিরুদ্ধে। জেফারসন সেই বক্তৃতায় বলেছিলেন,
“যতক্ষণ না কোনো যন্ত্র অনুভূতি থেকে একটা সনেট লিখতে পারবে বা ক্লাসিক্যাল মিউজিক কম্পোজিশন রচনা করতে পারবে, ........., ততক্ষণ আমরা বলতে পারব না যে যন্ত্র মস্তিষ্কের সমান। কোনো যন্ত্র তার সাফল্যে আনন্দ অনুভব করতে পারে না, ব্যর্থতায় দুঃখ পায় না, প্রশংসায় উষ্ণ হতে পারে না, ভুলে বিষণ্ণ হতে পারে না, যৌনতায় আকৃষ্ট হতে পারে না।"
মজার ব্যাপার হল, তখন এই বক্তৃতাটি পড়ে টুরিং এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে পরের বছরই, ১৯৫০ সালে, তিনি তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ "Computing Machinery and Intelligence" লিখলেন। সেই প্রবন্ধে জেফারসনের এই উক্তিটি সরাসরি উদ্ধৃত করে তার জবাব দিলেন। অর্থাৎ, টুরিং টেস্টের ধারণাটি আংশিকভাবে জেফারসনকে জবাব দেওয়ার জন্যই তৈরি।
যাই হোক আরো বছর দুয়েক কেটে গেল – যন্ত্র কি ভাবতে পারে, সেই নিয়ে আলোচনা এবং বিতর্ক জমে উঠল আরো। ১৯৫২ সালের ১০ জানুয়ারি BBC তাদের চ্যানেলের জন্য একটি আলোচনা রেকর্ড করল, যেটি ১৪ এবং ২৩ জানুয়ারি দুবার সম্প্রচারিত হলো। অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল: "Can Automatic Calculating Machines Be Said To Think?", মানে "স্বয়ংক্রিয় গণনা যন্ত্রকে কি ভাবতে পারে বলা যায়?" চারজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন সেই আলোচনায়, অ্যালান টুরিং নিজে, ম্যাক্স নিউম্যান (টুরিংয়ের পুরনো বন্ধু ও সহকর্মী), রিচার্ড ব্রেইথওয়েট (কেমব্রিজের দর্শনের অধ্যাপক), এবং জেফারসন। এটি ইতিহাসের প্রথম রেকর্ড করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিতর্ক বলে ধরা হয় এখনো। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক ছিলেন ব্রেইথওয়েট। একদিকে টুরিং ও নিউম্যান যন্ত্রের চিন্তাশক্তির পক্ষে, অন্যদিকে জেফারসন বিপক্ষে।
তো চিঠিতে টুরিং এই অনুষ্ঠানের সম্প্রচারের কথাই লিখেছিলেন। টুরিং মনে করেছিলেন যে জেফারসন সেই অনুষ্ঠানে তাঁর যুক্তিগুলোকে কার্যকরভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারেননি। সেটাই তাঁর কাছে হতাশজনক লেগেছিল। টুরিং চেয়েছিলেন জেফারসন সরাসরি, যুক্তিপূর্ণভাবে তাঁর সাথে লড়াই করুন। কিন্তু জেফারসন তাঁর বিরোধিতায় যুক্তির চেয়ে বেশি নির্ভর করেছিলেন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আবেদনের উপর।
অ্যালান টুরিং কে সেই নিয়ে আর বেশী কিছু লিখছি না – কারণ আজকের দিনে তাঁর নাম জানেন না এমন লোক কি পাওয়া যাবে যাঁরা লেখাটা পড়ছেন? তবুও রিক্যাপ টাইপের কিছু খেই ধরিয়ে দেওয়া যাক। আজকের দিনের এ আই এর পিছনের যে গভীর প্রশ্ন, "Can machines think?" অর্থাৎ, "যন্ত্র কি ভাবতে পারে?" সেই প্রশ্ন ১৯৫০ সালে যে মানুষটা প্রথম করেছিলেন, তিনিই টুরিং। তাঁকে ‘ফাদার অফ মর্ডান কম্পিউটিং’ ও বলা হয় যেটার মত যুক্তিযুক্ত উপাধি খুব একটা দেখা যায় না!
ইতিহাস মাঝে মাঝেই নিষ্ঠুর হয়, কিছু কিছু সময় একটু বেশীই। ভাগ্য জিনিসটা যদি মানেন, তাহলে সেই সূত্র ধরে বলতে হয়, ভাগ্যের কি পরিহাস দেখুন যে, "যন্ত্র কি ভাবতে পারে?" এমনটা ভাবতে পারার মত মানুষ, সেই প্রশ্নটা প্রথম বার জিজ্ঞেস করার মাত্র দুই বছর পরেই, ১৯৫২ সালে, আদালতে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর প্রেমের কারণে! এবং ১৯৫৪ সালে, মাত্র ৪১ বছর বয়সে, তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। আরো অনেক চিঠির মত রেখে গেলেন উপরে দেওয়া চিঠিটাও যেটা আজও পড়লে বুকের ভেতরে কোথাও একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। বিশেষ যখন দেখি টুরিং চিঠি শেষ করছেন ”Yours in Distress” লিখে।
এনিগমা কোড ভাঙার গল্পও আমরা জানি আজ – দেখেছিও তার উপর ভিত্তি করে বানানো টুরিং এর জীবনি ভিত্তিক সিনেমাও, দ্যা ইমিটেশন গেম। ১৯৩৯ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। জার্মানির নাৎসি বাহিনী সমুদ্রে পাঠাচ্ছে U-boat ডুবোজাহাজ, যেগুলো মিত্রবাহিনীর সব সরবরাহ জাহাজ ডুবিয়ে দিচ্ছিল। তাদের সব যোগাযোগ হতো একটা গোপন মেশিনের মাধ্যমে, "এনিগমা" যার নাম। এনিগমা মেশিন এমন সাংকেতিক ভাষায় বার্তা পাঠাত যেটা ভাঙা ছিল কার্যত অসম্ভব। মিলিয়ন মিলিয়ন সম্ভাব্য সমন্বয়ের মধ্যে একমাত্র সঠিকটি খুঁজে বের করা, মানুষের পক্ষে তা করা ছিল অসাধ্য।
ইংল্যান্ডের ব্লেচলি পার্কে একটা গোপন দল কাজ করছিল এই কোড ভাঙার জন্য। সেই দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র যাকে বলে সেটি ছিলেন অ্যালান টুরিং। তিনি তৈরি করলেন এমন একটি যন্ত্র যেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনিগমার কোড ভাঙতে পারত। এই আবিষ্কারের ফলে মিত্রবাহিনী জার্মান নৌ-বাহিনীর সব গোপন বার্তা পড়তে শুরু করল। ইতিহাসবিদরা বলেন, টুরিংয়ের এই কাজ যুদ্ধকে অন্তত দুই থেকে চার বছর এগিয়ে এনেছিল, এবং বাঁচিয়েছিল এক কোটি চল্লিশ লক্ষ থেকে দুই কোটি দশ লক্ষ মানুষের প্রাণ। জেনারেল আইজেনহাওয়ার যুদ্ধ শেষে বলেছিলেন যে ব্লেচলি পার্কের কাজ "হাজার হাজার ব্রিটিশ ও আমেরিকান জীবন বাঁচিয়েছে।" অথচ গোপনীয়তার শপথের কারণে টুরিং কখনো নিজের মুখে বলতে পারেননি যে তিনি কী করেছিলেন।
টুরিং আপাত অসম্ভব সেই জার্মান কোড ভেঙে সাহায্য করলেও, নিজের বানানো কোড কয়েক বছর পরে নিজে আর ভাঙতে না পেরে ৯০ কেজি রুপো হারিয়েছিলেন! সেই গল্পটা বেশ মজার আবার হালকা দুঃখেরও, যতই হোক এত পরিমাণ রুপো হাতছাড়া করা! হয়েছিল কি, যুদ্ধের সময়, মানে ১৯৪০-এর দশকে টুরিং ভয় পেলেন যদি জার্মানি ইংল্যান্ড দখল করে নেয়, তাহলে তো ব্যাংকের টাকা সব বাজেয়াপ্ত হয়ে যেতে পারে! তাই তিনি প্রায় ৯০ কেজি ওজনের দুটো রুপোর বার কিনলেন, তখনকার হিসাবে ২৫০ পাউন্ড মূল্য এবং ব্লেচলি পার্কের কাছের বনে সেগুলো পুঁতে রাখলেন। যুদ্ধের পর তিনি এক বন্ধুকে নিয়ে গেলেন সেই রুপা খুঁজতে। নিজেই একটা মেটাল ডিটেক্টর বানিয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যা হলো, যেখানে পুঁতেছিলেন সেটার ম্যাপ তিনি এমন জটিল সাংকেতিক ভাষায় লিখেছিলেন যেটা পরে আর নিজেই পড়তে পারলেন না! রুপা নাকি আর কখনো পাওয়া যায়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে টুরিং ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন। ১৯৫০ সালে তিনি "Mind" নামের একটি দার্শনিক পত্রিকায় "Computing Machinery and Intelligence" প্রবন্ধটি লিখলেন যার প্রথম বাক্যটিই ছিল, "Can machines think?", যার উল্লেখ খানিক আগেই করেছি।
বর্তমান সময়ে বসে হয়ত এই চিন্তার বিশালত্ব নিয়ে তেমন কিছু মনে হবে না - কিন্তু মনে রাখবেন, তখনও "Artificial Intelligence" বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শব্দটাই তৈরি হয়নি। কম্পিউটার বলতে মানুষ বুঝত বিশাল, কক্ষ-ভর্তি ভ্যাকুয়াম টিউবের যন্ত্র যেটা শুধু সংখ্যা যোগ করতে পারে। এবার ভাবুন সেই সময়ে বসে টুরিং স্বপ্ন দেখছিলেন এমন একটা যন্ত্রের, যেটা মানুষের মতো ভাবতে পারবে, শিখতে পারবে!
সেই সময়েই টুরিং প্রস্তাব করলেন "ইমিটেশন গেম" এর কথা যেটা পরে পরিচিতি পেয়েছে "টুরিং টেস্ট" নামে। পরীক্ষাটা আপাত সহজ, একজন মানুষ একটি পর্দার পেছনে বসে কথা বলছে। সে জানে না সামনে আরেকজন মানুষ আছে, নাকি একটি কম্পিউটার। যদি সে বুঝতে না পারে তার সামনে কে, যন্ত্র নাকি মানুষ, তাহলে সেই যন্ত্রকে "বুদ্ধিমান" বলা যাবে। এই নিয়ে আর বেশী কিছু লিখছি না, কারণ দিস্তে দিস্তে লেখা পেয়ে যাবেন এই নিয়ে কয়েকটা ক্লিকেই।
আবার ফিরে আসা যাক ১৯৫২ সালে লেখা উপরের চিঠিটায়। টুরিং যেখানে লিখছেন “...ব্যাপারটা কীভাবে ফাঁস হয়ে গেল তা একটা দীর্ঘ ও মনোগ্রাহী ঘটনা, যেটা নিয়ে একদিন একটা ছোটগল্প লিখে ফেলতে হবে...”। কি সেই ঘটনা যা টুরিং এর কাছে মনোগ্রাহী মনে হয়েছিল? এটা কি বিদ্রুপ করে লেখা ছিল নাকি টুরিং সত্যিই ভাবতেন তাঁকে কয়েকদিন পরে আদালতে উঠতে হলেও তিনি নির্দোষ ছাড়া পাবেন? এখন আমরা জানি মেশিন ভবিষ্যতে কি পারবে সেই নিয়ে টুরিং অনেক কিছু সঠিক ভাবে অনুমান করে গেলেও, মানুষের ব্যাপারে তাঁর অনুমান শক্তি তেমন ছিল না।
টুরিং যেমন লিখেছিলেন, গল্পটি সত্যিই আসলে একটু অদ্ভুত, প্রায় উপন্যাসের মতো ঘটনাক্রম দেখতে গেলে। চুরি, প্রেম, মিথ্যা, পুলিশের চালাকি, এবং শেষে একজন মানুষের অকপট স্বীকারোক্তি। কি হয়েছিল আসলে?
১৯৫১ সালের ডিসেম্বর মাসে ম্যানচেস্টারের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এক রেস্তোরাঁর কাছে টুরিং-য়ের সাথে আলাপ হয়ে যায় আর্নল্ড মারে নামে এক ১৯ বছরের এক তরুণের সাথে। আর্নল্ড তখনো বেকার - তার রোগা চেহারা, নীল চোখ টুরিং মুগ্ধ হয়ে গেলেন এবং একসাথে দুপুরে খাবার আমন্ত্রণ জানালেন। সেদিন নাকি খেতে খেতে টুরিং "ইলেকট্রনিক মস্তিষ্ক" নিয়ে কি কাজ করছেন তা মারে-কে বিস্তারে শুনিয়েছিলেন। মারে কতটা বুঝতে পেরেছিল জানা নেই, কিন্তু মন দিয়ে শুনেছিল। সেই শোনার বহর দেখে টুরিং আরো ইমপ্রেসড, বললেন আবার দেখা করা যাক তাহলে। সেই মত প্ল্যান হল - কিন্তু মারে আর আসেনি তখনকার মত। তারপর ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে হঠাৎ দেখা হলো, এবং ১২ জানুয়ারি মারে প্রথমবার টুরিং-য়ের বাড়িতে এল। সেবারে দু-রাত একসাথে কাটল তাদের - ততদিনে সম্পর্ক অন্য মাত্রা নিয়েছে।
কিন্তু মানব সম্পর্কে প্রায়শঃই যা হয়, টুরিংয়ের ক্ষেত্রেও তাই হল। মারে-র সাথে সম্পর্কের মধ্যে এলো অস্বস্তি। মারে টুরিংয়ের পকেট থেকে ১০ পাউন্ড চুরি করল। টুরিং অভিযোগ করলে মারে অস্বীকার তো করলই এবং উল্টে ৩ পাউন্ড ধার চাইল। কিন্তু মারে-র প্রেমে টুরিং এতই হাবুডুবু যে তারপরেও সম্পর্ক ছাড়লেন না।
এর পর এল সেই দিনটি - ২৩ জানুয়ারি, ১৯৫২। টুরিং বাড়ি ফিরে দেখলেন ঘরে ডাকাতি হয়েছে। তাঁর বাবার রেখে যাওয়া সোনার ঘড়ি এবং আরও কিছু জিনিস হাওয়া। তাঁর সন্দেহ হলো মারে বা তার বন্ধু এই কাজ করেছে। টুরিং মারেকে ডেকে চ্যালেঞ্জ করলেন। মারে শেষে স্বীকার করল যে ডাকাতিটা করেছে হ্যারি নামে তার এক বেকার বন্ধু। কিন্তু সাথে সে একটা হুমকিও দিল এই মর্মে যে যদি টুরিং পুলিশে যান, তাহলে সে তাদের সম্পর্কের কথা ফাঁস করে দেবে। যাই হোক সেদিনও রাতটা সে টুরিংয়ের বাড়িতে কাটাল।
টুরিং মারের ফাঁস করে দেবার হুমকিতে দমেন নি বরং নিজেই আরেকটু জটিলতা করে ফেললেন পরদিন সকালে পুলিশ স্টেশনে বাড়িতে ডাকাতির রিপোর্ট করে দিয়ে। পুলিশকে টুরিং ডাকাতির বিবরণ দিলেন, কিন্তু মারের সাথে তাঁর সম্পর্কের কথা চাপা দিতে গিয়ে কিছু তথ্য বানিয়ে বললেন। এমনকি মারের আঙুলের ছাপ লাগা একটি গ্লাস তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন, যেটা পরে পুলিশকে দিলেন, কিন্তু সেটা কীভাবে পেয়েছেন তার জন্য একটা বানানো গল্প বললেন।
এদিকে হয়েছে কি পুলিশ ঘরে পাওয়া আঙুলের ছাপ থেকে হ্যারিকে সনাক্ত করে ফেলেছে কয়েকদিন পর, কারণ সে আরেকটি মামলায় আটক। পুলিশ দেখলো হ্যারির জবানবন্দীর সাথে টুরিং-য়ের বানানো গল্প মিলছে না! তখন পুলিশ একটি পুরনো কৌশল ব্যবহার করল যা তারা প্রায়ই করে থাকে এমন সব ক্ষেত্রে। দুদিন পরে তারা টুরিংকে ডেকে বলল আগের দিন কি বলেছিলেন আবার বলুন। ব্যাস! যে মানুষ জার্মান নৌ-বাহিনীর সাংকেতিক বার্তা ভেঙেছিলেন, সেই মানুষ নিজের বলা মিথ্যার বিবরণ মনে রাখতে পারলেন না। পুলিশ জানালো তারা মনে করছে টুরিং এই ব্যাপারে মিথ্যা বলছেন। এতক্ষণে টুরিং বুঝলেন তিনি ধরা পড়ে গেছেন!
এবার আর টুরিং কোন লুকোছাপায় গেলেন না। পুলিশকে পাঁচ পাতার বিস্তারিত লিখিত বিবরণ দিলেন, যেখানে মারের সাথে সম্পর্কের পুরো বিস্তারিত ছিল। মনে রাখতে হবে সেই সময়ের ইংল্যান্ডে সমকামিতা ছিল আইনত অপরাধ। ১৮৮৫ সালের একটি পুরনো আইন অনুযায়ী, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের মধ্যে সম্মতিমূলক যৌন সম্পর্কও ছিল "গ্রস ইন্ডিসেন্সি" বা চরম অশালীনতার অপরাধ। স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর টুরিং নাকি এক পুলিশ অফিসারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন "এর পরে কী হবে? এটা বৈধ করার জন্য কি একটা রাজকীয় কমিশন বসছে না?" তলিয়ে দেখলে এই একটি প্রশ্নে টুরিংয়ের স্বভাব ধরা পড়ে। তিনি ভাবছিলেন সমকামিতা বেআইনি থাকাটাই অস্বাভাবিক, এবং শীঘ্রই আইন বদলে যাবে। কিন্তু টুরিং-ইয়ের অনুমান ব্যার্থ করে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত সমকামিতা বেআইনিই রয়ে গেল ইংল্যান্ডে।
নরম্যানকে লেখা চিঠিটা যদি একটু মনোযোগ দিয়ে পড়েন তাহলে একটু অবাক হতে হয় এটা দেখে যে, একজন মানুষ যে জানে যে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাকে আদালতে দাঁড়াতে হবে, বিচার হবে তার প্রেমের জন্য, সেটা সে কিভাবে ক্যাজুয়ালি লিখছে, "হ্যাঁ, একটু ঝামেলায় পড়েছি বটে।" কোনো আতঙ্ক নেই, কোনো কান্না নেই! বরং চিঠির শেষে রয়েছে একটি অসাধারণ রসিকতা।
তিনি লিখছেন যে ভবিষ্যতে কেউ হয়তো এই যুক্তি দেবে: "টুরিং বিশ্বাস করেন যন্ত্র ভাবতে পারে। টুরিং পুরুষের সাথে শয্যা নেন। অতএব যন্ত্র ভাবতে পারে না।" এখন আমরা জানি যে এটি একটি ভুল যুক্তিবিন্যাসের (Syllogism) নিদর্শন। দর্শনে এরকম ভুল যুক্তিকে "অ্যাড হোমিনেম" বলে, যেখানে বক্তার চরিত্র আক্রমণ করে তাঁর যুক্তি খণ্ডন করার চেষ্টা হয়।
টুরিং যেন বলছেন: "দেখো, আমার বিরুদ্ধে যা করা হচ্ছে, এর মধ্যে কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু তারপরও মানুষ এই যুক্তি দেবে।" এই রসিকতার পেছনে হয়ত ছিল এক অসম্ভব গভীর যন্ত্রণা এবং সেটার মধ্যেই বন্ধুকে চিঠি লেখা। আচ্ছা, একটা কথা বলে নিই – এই তিনটে লাইন নিয়ে আরো পড়াশুনার ইচ্ছে ছিল। মানে অন্য পন্ডিতরা এটাকে কি ভাবে ব্যাখ্যা করছেন, সেই সব আর কি। কিন্তু গোটা ছয়েক রেফারেন্সে যা ব্যাখ্যার বহর দেখলাম, তাতে আর এগুত সাহস হল না। যে যার মত করে ব্যাখ্যা করেছে – কোনটাই প্রায় বুঝতে পালাম না ঠিকঠাক, তাই বেশী বোঝার চেষ্টা কাটিয়ে দিলাম। তবে এটা হালকা জানিয়ে রাখি, টুরিংয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ Alan Turing: The Enigma-এর লেখক অ্যান্ড্রু হজেস এই তিনটি লাইনকে “অসাধারণ ব্ল্যাক হিউমার” বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর মতে এই লাইনগুলো সক্রেটিসের সেই বিখ্যাত সিলোজিজমের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে, যেখানে সক্রেটিসকে হেমলক বিষ পান করিয়ে মারা হয়েছিল তাঁর চিন্তার কারণে। আর হেমলকের বদলে টুরিংয়ের মৃত্যু হয়েছিল সায়ানাইডে, যেটা নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করব। হজেসের আরও দাবি এই সিলোজিজমটি একইসাথে দেখায় কীভাবে টুরিং তাঁর জীবনের দুটো অংশ, বৈজ্ঞানিক সত্তা এবং যৌন সত্তাকে, একসাথে মিলিয়ে দেখতে পারতেন! দাবি-দাওয়া কনফিউজিং কিনা, তাই বলছিলাম এর ভিতরে বেশী ঢুকে আর লাভ নেই!
মূল ঘটনায় ফিরে আসা যাক আবার। ১৯৫২ সালের ৩১ মার্চ নটিংহামশায়ারের এক আদালতে বিচার হলো টুরিংয়ের। তিনবার সম্পর্কের কথা স্বীকার করায় আইন অনুযায়ী ছয়টি আলাদা অপরাধ হলো, কারণ ১৮৮৫ সালের পুরনো আইনে প্রতিটি ঘটনা দুটি করে অপরাধ গণনা হতো! বিচারক টুরিংকে দুটি পথ দিলেন: কারাগার, অথবা হরমোন চিকিৎসা - যেটাকে বলা হতো "কেমিক্যাল কাস্ট্রেশন" বা রাসায়নিক পুরুষত্বহরণ। টুরিং বেছে নিলেন দ্বিতীয়টা। তাঁকে ইস্ট্রোজেন হরমোনের ইনজেকশন দেওয়া শুরু হলো, যেন তাঁর যৌন আকাঙ্ক্ষা দমন করা যায়। এর শারীরিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ।
এই অপমানের সাথে এলো আরও একটি আঘাত। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা যেখানে টুরিং যুদ্ধকালীন কাজ করেছিলেন, তাঁর নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল করে দিল। কারণ সরকার মনে করল, এক সমকামী মানুষকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্ল্যাকমেল করতে পারে, তাই সে নিরাপদ নয়। যে মানুষ পুরো দেশকে যুদ্ধজয়ে সাহায্য করেছিলেন, তাঁকেই দেশ সন্দেহের চোখে দেখল!
হরমোন চিকিৎসার পর টুরিং শারীরিকভাবে অনেক পাল্টে গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি কাজ ছাড়েননি। গণিত ও বিজ্ঞানের গবেষণা চালিয়ে গেছেন। ১৯৫২ সালের গ্রীষ্মে তিনি নরওয়েতে বেড়াতে গিয়েছিলেন, কারণ সেখানে সমকামিতার প্রতি একটু বেশি সহনশীলতা ছিল। ও হ্যাঁ, আর একটা কথা। ওই যা চিঠিতে টুরিং লিখেছেন এই গল্প একদিন ছোটগল্পে লেখার ইচ্ছা, সেটা সত্যিই তিনি করেছিলেন। চিকিৎসা চলাকালীন টুরিং একটি অসম্পূর্ণ ছোটগল্প লিখেছিলেন যার নাম "Pryce's Buoy"। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী অ্যালেক প্রাইস, যিনি তাঁর কুড়ি বছর বয়সে এক অসাধারণ আবিষ্কার করেছিলেন, যেটা "Pryce's buoy" নামে পরিচিত। বুঝতেই পারছেন এটা টুরিং মেশিনের রূপক মাত্র।
গল্পে প্রেমিকের নাম রন মিলার। এই "Ronald" হলো "Arnold" এর অ্যানাগ্রাম অর্থাৎ অক্ষরগুলো পুনর্বিন্যস্ত করলে একই কথা। গল্পে অ্যালেক রনকে ঠিক সেভাবে লাঞ্চে নিয়ে যান যেভাবে টুরিং মারেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। গল্পটি শেষ করেন নি টুরিং। কিন্তু এতটুকুতেই বোঝা যায় যে টুরিং এই পুরো পরিস্থিতিটাকে একজন লেখকের চোখ দিয়ে একটু দূর থেকে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। একটি বেকার তরুণের সাথে পরিচয়, টাকা চুরি, বাড়িতে ডাকাতি, নিজের মিথ্যা, পুলিশের ফাঁদ, তারপর সব খুলে বলা – যদি ভেবে দেখেন এই নাটকীয় ঘটনাক্রম সত্যিই একটা সার্থক গল্পের মতই!
এর পর আরো কিছু দিন কেটে গেল। ১৯৫৪ সালের ৮ জুন উইলমসলোতে টুরিং-য়ের বাড়িতে কাজের লোক এসে দেখল তিনি মৃত। পাশে ছিল একটি আধখাওয়া আপেল। ময়নাতদন্তে সায়ানাইড বিষক্রিয়া ধরা পড়ল। সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল যে এটা আত্মহত্যা। কিন্তু টুরিংয়ের মা এবং অনেক কাছের মানুষ বিশ্বাস করতেন এটি একটি দুর্ঘটনা ছিল, কারণ টুরিং রসায়নের অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। হয়ত সেখান থেকেই অসাবধানে সায়ানাইড খেয়ে ফেলেছিলেন! তখন টুরিং-য়ের বয়স মাত্র ৪১।
তবে অনেক দেরীতে হলেও বৃটিশ রাষ্ট্র হিসেবে টুরিংয়ের উপর ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চেয়েছিল। ২০০৯ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইলেন, “যেভাবে তাঁকে অসম্মান করা হয়েছিল তার জন্য”। ২০১৩ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁকে মরণোত্তর রাজকীয় ক্ষমা প্রদান করলেন। ২০১৭ সালে ব্রিটেনে “অ্যালান টুরিং আইন” পাস হলো, যেটি এই একই পুরনো আইনে দণ্ডিত হাজার হাজার মানুষকে ক্ষমা করল। ২০১৯ সালে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড ঘোষণা করল যে ৫০ পাউন্ডের নোটে থাকবে অ্যালান টুরিংয়ের ছবি। যে দেশ তাঁকে অপমান করেছিল, সেই দেশই তাঁর মুখ ছাপাল তাদের বড় মূল্যমানের কাগজের টাকায়।
সেই ভাবে দেখলে টুরিংয়ের গল্প শুধু একজন প্রতিভাধর মানুষের গল্প নয়। এটি এমন একটি সমাজের গল্প যে সমাজ তার সবচেয়ে মেধাবী সন্তানকে তার ভালোবাসার জন্য শাস্তি দিয়েছিল। এটি সেই সব মানুষের গল্প যারা ভিন্ন ছিলেন, যাদের সমাজ বুঝতে পারেনি - অথচ তারাই বদলে দিয়েছেন পৃথিবীটাকে তাঁদের অমিত প্রতিভা দিয়ে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।