এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  প্রবন্ধ

  • আজকের সঞ্জীবনী - শুশ্রূষা, বনাম শোষণ 

    শর্মিষ্ঠা রায় লেখকের গ্রাহক হোন
    প্রবন্ধ | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২৮ বার পঠিত
  • জেনেরিক ওষুধ ব্যাপারটা কি? এটা আসলে একটি ওষুধের সারা পৃথিবীতে স্বীকৃত নাম। ওষুধটি যে গণের অন্তর্ভুক্ত, সেই গণের নাম। কোনো কোম্পানির দেওয়া নাম নয়। যেমন প্যারাসিটামল। এই নামে পৃথিবী ওই ওষুধটিকে চেনে; যাকে আমরা ওষুধের দোকানে কিনতে গিয়ে ক্রোসিন, ক্যালপল কিংবা অন্য নামে পাই। ফলে জেনেরিক বলতে কোনো আলাদা গোত্রের ওষুধ বোঝায় না। এটা একটা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত তার গণের নাম। 

    ওষুধ কিভাবে তৈরি হয় সেটা প্রথমে জেনে নেওয়া দরকার। ওষুধ প্রথমে কেউ আবিষ্কার করবেন। এই আবিষ্কার করবেন বিজ্ঞানীরা। কোনো কোম্পানির  রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট উইং, কোনো নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে ওষুধ তৈরির জন্য বিজ্ঞানীদের বরাত দেয়। ঠিক যেমন কোভিডের সময় আমরা দেখেছি যে বিভিন্ন কোম্পানিরা বিজ্ঞানীদের বরাত দিয়েছিল ভ্যাকসিন তৈরি করার জন্য। এই আবিষ্কারের পর্যায়ে জৈব বা অজৈব উৎস থেকে কোন রাসায়নিক পদার্থকে চিহ্নিত করা হবে যা কোন নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। দ্বিতীয় পর্যায়ে এই রাসায়নিক পদার্থকে কোন মনুষ্যেতর প্রাণী, যেমন ইঁদুর, গিনিপিগ, ভেড়া ইত্যাদির মধ্যে প্রয়োগ করে দেখা হবে যে তার কোনো খারাপ প্রভাব পড়ছে কিনা। যদি তা না পড়ে তাহলে তা পরবর্তী পর্যায়ে প্রয়োগ করা হবে মানুষের শরীরে। এটাকে বলা হয় ট্রায়াল। এই ট্রায়ালের কিছু নিয়ম বিধি আছে। যেমন, যে মানুষের দেহে ওষুধটি প্রয়োগ করা হবে, তাকে জানাতে হবে এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে। ততদিন অবধি সেই ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে যা যা জানা গেছে, তা অবগত করতে হবে এবং সবকিছু শোনার পরে সেই ব্যক্তি রাজি হলে তবেই তার শরীরে এই ট্রায়াল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন কোন শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হলে তার জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এই বিধিনিয়মগুলো আজকের কর্পোরেটরা কিছুই মানে না। আমাদের আশপাশে যেসব ঝাঁ চকচকে কর্পোরেট বা প্রাইভেট হাসপাতালগুলো রয়েছে, সেখানে খোঁজ নিলেই দেখা যাবে যে কিছু দরিদ্র পরিবারের রোগীও সেখানে রয়েছেন, যাদের প্রায় ৮/১০,০০০ টাকা মাসিক ওষুধের খরচ থাকে। এদের বিনা পয়সায় ওষুধ দেবার লোভ দেখিয়ে , 'চিকিৎসা' চলে। এত দামি দামি ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাতায়াতের ভাড়াও তাদের দেওয়া হয় বলে এরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ থাকেন। তাদেরকে এটা বলে বোঝানো যায় না যে তাদের অজান্তেই তাদের উপর ট্রায়াল হয়ে যাচ্ছে! বাড়ির লোক যদি বুঝতেও পারেন আসল ব্যাপারটা, তবুও সবকিছু মেনে নেন এই ভেবে, যে এত খরচসাপেক্ষ চিকিৎসা তাদের চালানোর ক্ষমতা নেই। এইভাবে সম্পূর্ণ আন-এথিক্যাল উপায়ে হাসপাতালের এথিক্স কমিটিকেও কিছু না জানিয়ে বেআইনিভাবে এসব করা হয়ে থাকে। মানবদেহে প্রয়োগের পর যদি কোন উল্লেখযোগ্য খারাপ প্রভাব দেখতে না পাওয়া যায়, তাহলে রাসায়নিক পদার্থটিকে ওষুধ হিসেবে বাজারে বিক্রির জন্য ধার্য করা হয়। কখনো কখনো খারাপ প্রভাবের কথা চেপে 'রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট' এর খরচ তোলার জন্য ক্ষতিকর ওষুধও বাজারে ছাড়া হয়, তারপর বহু মানুষের ক্ষতি করে তা নিষিদ্ধ হয়। ততদিনে কোম্পানির টাকা উঠে আসে।

    একটা ওষুধ তৈরি করতে গেলে, যে পদার্থগুলো ব্যবহার করা হবে, সেই পদার্থের মধ্যেকার অ্যাক্টিভ ইনগ্রেডিয়েন্টগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। যেমন আমরা জানি যে কালমেঘের পাতা থেকে ডায়াবেটিসের ওষুধ তৈরি হয়। আয়ুর্বেদে কাল মেঘের পাতা বেটে ডায়াবেটিসের রোগীকে খাওয়ানোর নিদান আছে কিন্তু মডার্ন মেডিসিনে এই কালমেঘের পাতার মধ্যেকার রাসায়নিক পদার্থকে চিহ্নিত করে এক্সট্র্যাক্ট করে তাতে আরও কিছু রাসায়নিক মিশিয়ে তবে তাকে ক্যাপসুলে ভরা হয়। এই সমস্ত পর্যায় পেরিয়ে ওষুধ বাজারে আসে। একটি ওষুধকে রোগীর দেহে কিভাবে প্রয়োগ করা হবে, সেই অনুযায়ী তার ফর্মূলেশন তৈরি হয়। ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল মুখ দিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। এবার ওষুধটি যদি পাকস্থলীতে প্রচুর পরিমাণ অ্যাসিড তৈরি করে, তাহলে তাকে মুখ দিয়ে খাওয়ানো উচিৎ নয়। অন্য কোন রুটে প্রয়োগ করা উচিৎ। সেটা ইনজেকশন মারফৎ দেওয়া যেতে পারে, রক্তে কিংবা চামড়ার তলায়। কিছু ওষুধ জিহ্বার তলায় দিয়ে দেওয়া হয়। জিহ্বার তলায় রক্ত সঞ্চালন অনেক বেশি হয় এবং চামড়াও অনেক পাতলা হয়। ফলে অভিস্রবণ (osmosis) প্রক্রিয়ায় তা অনায়াসেই রক্তে চলে যেতে পারে। মুখ দিয়ে খাওয়ালে পাকস্থলীতে পৌঁছে সেখান থেকে রক্তে মেশার ক্ষেত্রে যা সময় লাগবে তার অনেক আগেই জিহ্বার তলায় তাকে বসালে তা রক্তে মিশে যেতে পারে। যে ওষুধ জরুরি পরিস্থিতিতে দিতে হয়, তার ক্ষেত্রে এই রুট কার্যকরী।একে বলা হয় ফর্মুলেশন, যা নির্ধারণ করে কতটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীনভাবে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি ও এফেক্টিভভাবে ওষুধ শরীরে প্রবেশ করে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। এতগুলো পর্যায় পেরিয়ে প্যাকেজিং মারফৎ যখন ওষুধ বাজারে আসে, তখন আমরা তাকে বলি ফার্মাসিউটিক্যাল ড্রাগ। এই ড্রাগ তৈরির ক্ষেত্রে কোম্পানি অর্থ দিয়েছে আর বিজ্ঞানী তার সময় এবং বৌদ্ধিক ও মানসিক শ্রম দিয়েছে। এর প্রাপ্য হিসেবে তাদের জন্য ধার্য হয় পেটেণ্ট। এই পেটেণ্টের মেয়াদ কুড়ি বছর। কিন্তু একটা ড্রাগকে বাজারে এনে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে অনেকটা সময় লেগে যেতে পারে। সে কারণে পরবর্তী সময়ে কোম্পানি আবেদন করলে আরো পাঁচ বছর মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, ২৫ বছর পর্যন্ত পেটেণ্টের মেয়াদ থাকে। এই মেয়াদ শেষ হবার পর থেকে ওই ড্রাগকে আমরা জেনেরিক ড্রাগ হিসেবে ধরে নিতে পারি। প্রধানমন্ত্রীর নামাঙ্কিত ওষুধের দোকানে যে ওষুধ পাওয়া যায় সেটাই একমাত্র জেনেরিক ড্রাগ এমনটা কিন্তু নয়। যেমন ধরে নিন, পেনিসিলিন ১৮২৮ সালে আবিষ্কৃত হয়েছিল, এবং তার কুড়ি বছর পর্যন্ত তার পেটেণ্টের মেয়াদ ছিল। ফলে এরপর থেকে আজ পর্যন্ত যতগুলো ওষুধ পেনিসিলিন হিসেবে বিক্রি হচ্ছে, সবই জেনেরিক ড্রাগ। কিন্তু তাহলে রানব্যাক্সি বা সান ফার্মা নামের বড়ে বড়ো কোম্পানিগুলো কি করছে? পেটেণ্টের যে শর্ত থাকে তা হল, যে ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির পেটেণ্ট রয়েছে তার বাইরে আর কেউ ম্যানুফ্যাকচার করতে পারবে না। কিন্তু পেটেণ্টের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে সেই ওষুধ হয়ে যায় জনগণের সম্পদ। অর্থাৎ সরকার তা ডিস্ট্রিবিউট করতে পারে বা অন্য যে কোনো ব্যক্তিও তা ডিস্ট্রিবিউট করতে পারে। প্রাথমিকভাবে যারা প্রথম ওষুধটিকে আবিষ্কার করেছিল তাদের আবিষ্কারের জন্য যে খরচ, সেটি ওঠাতেই এই ২৫ বছরের পেটেন্টের মেয়াদ ধার্য হয়। এই সময়ের মধ্যেই আবার তার কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণ জনগণ ওয়াকিবহাল হয়ে গেছে। ফলে পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যারা ড্রাগটি ডিস্ট্রিবিউট করবে, তাদের গবেষণা জনিত খরচ করতে হচ্ছে না। ওষুধকে জনপ্রিয় করার দায় নিতে হচ্ছে না। ফলে এটা আশা করা হয় যে যখন এই জেনেরিক ড্রাগ তৈরি হবে, তার দাম কম হবে। ঠিক যেমন ছোটো মোবাইল ফোন। এক সময় যার দাম ছিল ৫ হাজার বা ৭ হাজার টাকা, আজ ১০০০ টাকায় পাওয়া যায়। শুরুতে বলা হত যে ওই ফোন তৈরির টেকনোলজি আবিষ্কারের ক্ষেত্রে যে খরচ হয়েছে, তা তোলা হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীকালে টেকনোলজি আরও উন্নত হয়ে যাওয়ায় আর ওই আবিষ্কারের খরচ উঠে আসার ফলে, ওই মোবাইলের দাম কমে যায়। পেটেণ্ট-এর মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সেই ওষুধের ক্ষেত্রে বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে কম্পিটিশন শুরু হয় কিন্তু শর্ত একটাই - প্রথম যারা গবেষণার মাধ্যমে ওষুধটি তৈরি করেছিল, তারা যেভাবে সেটি তৈরি করেছিল, রাসায়নিকের পরিমাণ বা অন্যান্য কোন বস্তু তার মধ্যে যতটুকু মেশানো হয়েছিল, তা প্রতিটা কোম্পানিকে মেনে চলতে হবে। কিন্তু তারা নির্দিষ্ট কমিটির কাছে যুক্তিসম্মতভাবে বুঝিয়ে এর দেহে প্রয়োগের পদ্ধতি বা ফর্মূলেশন পরিবর্তন করতে পারে। ওষুধের রঙ বা আকার নির্ধারণ করতে পারে, যা ক্রেতার কাছে চটকদার এবং আকর্ষণীয় করে তুলবে। এই ওষুধ বিক্রি করার জন্য ডাক্তারদের বিভিন্ন উপঢৌকন দেওয়া হয় যাতে তারা সেই ওষুধই প্রেসক্রাইব করেন এবং এর জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। আমাদের ছোটোবেলায় একটি অ্যান্টিবায়োটিককে ২৪ টাকা প্রতি ট্যাবলেট বিক্রি হতে দেখেছি, কিন্তু ট্যাবলেট প্রতি উৎপাদন খরচ ছিল মাত্র ৩৭ পয়সা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বাকি কোম্পানিগুলোকে নিজেদের ওষুধ বিক্রি করতে হলে ডাক্তার মারফৎ রোগীর পরিবারকে বোঝাতে হবে যে নতুন ওষুধ আগের খ্যাতনামা অ্যান্টিবায়োটিকের থেকে বেশি কার্যকর। এর জন্য ডাক্তারদের উপঢৌকন দিতে হয় এবং এই অতিরিক্ত খরচ কোম্পানিগুলো তাদের ক্রেতাদের থেকেই তুলে নেয়।

    আমাদের দেশে ঠিকঠাক রেগুলেটারি বডি না থাকলেও বিদেশে তা রয়েছে। এরকম একটি সংস্থা হল ‘ইউনাইটেড স্টেটস অ্যাডপটেড নেম’। অন্যটি ‘ইন্টারন্যাশনাল নন-প্রোপ্রাইটেরি নেম’। এই সংস্থাগুলোর কাছে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি গুলোকে তাদের ওষুধের জন্য পরীক্ষা দিতে হয় যে সেগুলো নিয়ম মেনে তৈরি হচ্ছে কিনা। পরীক্ষায় পাশ করলে তবে ওষুধগুলো বাজারে আনা যাবে এবং না করলে সেগুলোকে বাতিল করে দেওয়া হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি সংস্থা ‘এফডিএ’। এটাও চেক করে যে ওষুধটি মানবদেহে প্রবেশ করার পর কোনো বিক্রিয়া ঘটাচ্ছে কিনা বা মানব দেহ ওই ওষুধের ওপর কোনো বিক্রিয়া সৃষ্টি করছে কিনা। তার ভিত্তিতেই স্থির হয় যে ওষুধটি ব্যবহারযোগ্য কিনা। এতগুলি পর্যায় পার হওয়ার পরে ওষুধটি তৈরি হল। সাধারণত তার রোগীর শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করার ক্ষমতা থাকার কথা নয়।

    বাকি রইল ব্র্যান্ডেড ড্রাগস। এগুলো আসলে ব্র্যান্ডেড জেনেরিক। জেনেরিক ওষুধগুলোকেই কোম্পানিগুলো নাম ও মোড়ক বদল করে এমন ভাবে বিক্রি করে যেন সেটা কোনো গবেষণা মারফৎ আবিষ্কার করেছে তারা। এটাকেই বলে ব্র্যান্ডিং। কিন্তু ব্র্যান্ডেড বা নন-ব্র্যান্ডেড সব ড্রাগই কুড়ি বছর মেয়াদ পার হয়ে যাওয়ার পর থেকে জেনেরিক ড্রাগ। 

    ওষুধের দাম নির্ধারণ হয় কিভাবে? দাম নির্ধারণ করে প্রস্তুতকারক, হোলসেলার, ইন্সিওরার (মেডিকেল ইনসিওরেন্সের সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য যে খরচ হয়েছে তাও ঢুকে যায়), এমনকি ব্রাঞ্চ স্টোর। যার ফলে ৩৭ পয়সার ওষুধের দাম হয় ২৪ টাকা। ২০১৪ সালে ‘জেনেরিক ফার্মাসিউটিকাল এসোসিয়েশন’ সংস্থা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪.৩ বিলিয়ন প্রেসক্রিপশনের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে সেখানকার ৮৮ শতাংশ মানুষ জেনেরিক ওষুধ খায়। অর্থাৎ গরিব দেশের মানুষই শুধু নয়, বড়লোক দেশের মানুষেরাও জেনেরিক ওষুধ খায়। প্রথম বিশ্বের দেশে রেগুলেটারি বডির ঘেরাটোপ এড়িয়ে বিশেষ কিছু করে উঠতে না পারলেও, তৃতীয় বিশ্বের দেশে কোম্পানিগুলো একটি ওষুধের সাথে আরেকটি ওষুধকে মিশিয়ে বিক্রি করে, যাকে আমরা বলি ফিক্সড ডোজ কম্বিনেশন। এগুলো তৈরির পদ্ধতি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। এই ধরনের ড্রাগের মধ্যে পরিচিত হল প্যান ডি। অনুষ্ঠান বাড়িতে গিয়ে খাওয়া-দাওয়ার পর গ্যাসের ভয়ে পরের দিন সকালেই খেতে বেশ পছন্দ করি আমরা। কিন্তু এই ধরনের ড্রাগ নেওয়ার ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। এতে থাকে প্যানটাপ্রাজোলের সঙ্গে ডোমপেরিডোনের মিশ্রণ। যার প্রথমটার ডোজ দিনে একবার, দ্বিতীয়টি দিনে তিনবার। তাহলে প্রশ্ন ওঠে এই ওষুধটির ক্ষেত্রে আমরা কার ডোজ ফলো করব? আর এটা অত্যন্ত সাংঘাতিক সমস্যায় পরিণত হয়ে যায় অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে, যেখানে সঠিক ডোজে ওষুধ খাওয়া অত্যন্ত জরুরি। 

     আজ অবধি হু-এর তরফ থেকে মাত্র দু'টি ওষুধকে ফিক্সড ডোজ অ্যান্টিবায়টিক হিসাবে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে, যার একটা কোট্রিমক্সাজোল, অন্যটি অ্যামক্সিসিলিন ও ক্ল্যাভুলিনিক অ্যাসিডের মিশ্রণ। কোট্রাইমক্সাজোল যা ব্যবহার করা হয় সালফার যুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে। এটি দুটি ওষুধের মেলবন্ধনে তৈরি যারা রোগ সারাতে পারে। কিন্তু এদের বাজারজাত নাম ব্যাকট্রিম, কট্রিম ইত্যাদি, যাদের দাম অতিরিক্ত কম হওয়ায় তাদের সালফারজাত ড্রাগ বলে ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার করে কোম্পানিগুলো এদের ব্যবহার যথেষ্ট কমিয়ে রেখেছে, বা বাজার থেকে উধাও করে দেওয়া হয়েছে। কারণ এতে তাদের বিশেষ লাভ হয় না। আমরা যারা এখনও খাই এবং পেশেন্টদেরও দিই, তাদের এই ওষুধ সম্পর্কে ধারণা ভালো। কিন্তু ওষুধের কোম্পানিগুলির প্রচারের গুণে এসব ওষুধ হারিয়ে গেছে, চিকিৎসা শুরুই হয় থার্ড ডিগ্রির অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে। যার দাম অত্যন্ত বেশি। এবং বহু ক্ষেত্রেই তা অবৈজ্ঞানিক ফিক্সড ডোজ কম্বিনেশন। যার কোনো স্বীকৃতি চিকিৎসাশাস্ত্রে নেই।  গত ৩৫ বছর আগে নাইস বলে একটি ওষুধ ব্যান করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই ওষুধ আজও তৃতীয় বিশ্বের বাজারে পাওয়া যায়। সিডিএসসিও বা সেন্ট্রাল ড্রাগ স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন কাজ করতে গিয়ে দেখেছে যে মাসে প্রায় ২৫০টির ওপর ওষুধ ধরা পড়ছে যেগুলো আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে তৈরি হয়নি! অর্থাৎ ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়।

     ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো প্রথম বিশ্বের জন্য এক ধরনের ওষুধ এবং তৃতীয় বিশ্বের জন্য আরেক ধরনের ওষুধ তৈরি করে থাকে নিজেদের ব্যবসায়িক লাভের উদ্দেশ্যে। 

    বলা হয় যে জেনেরিক ওষুধ খারাপ জিনিস। কিন্তু ব্র্যান্ডেড ওষুধ, বিশেষ করে তার ফিক্সড ডোজ কম্বিনেশন আরও খারাপ। জেনেরিক ওষুধ খেলে বিশেষ কোন ক্ষতি নেই, বরং তা সহজলভ্য। আমাদের দেশে রেগুলেটরি বডির অভাবের কারণে যেটা হতে পারে যে ওষুধের পরিমাণটা একটু কমিয়ে দিয়েছে প্রস্তুতকারক সংস্থা। এর থেকে বেশি কিছু হবে না। আবার ডাক্তার যদি তার প্রেসক্রিপশনে শুধু জেনেরিক ওষুধের নাম লিখে দেয়, সমস্যা এটাই যে একটা ফার্মাসিস্টের নামে দশটা দোকান চলে এবং এখানে মালিকের মর্জি মাফিক কর্মচারীরা একটা জেনেরিক ওষুধের নামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দামী ওষুধটাই দিয়ে দেবে।

    আমি আগেই বলেছি যে জেনেরিক ওষুধ প্রেসক্রিশনে লিখে দিলে, সবচেয়ে বেশি দামের জেনেরিকটাই দেওয়ার প্রবণতা থাকে ওষুধের দোকানের কর্মচারীদের। তাই আমরা ‘ড্রাগ টুডে’ ইত্যাদি বুলেটিন পড়ে সবচেয়ে কম দামের জেনেরিক ড্রাগের বাজারজাত নাম প্রেসক্রিপশনে লেখার চেষ্টা করি যাতে পেশেন্টরা ঠকে না যায়। প্রচার আছে যে জেনেরিক ওষুধ কাজ করে না। আমি ২৫ বছর প্র্যাকটিস করছি এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জেনেরিক ওষুধের বাইরে অন্য ওষুধ না লেখার চেষ্টা করেছি। আমাকে আজ অবধি কোন পেশেন্ট এসে বলেনি যে তাদের ওষুধ কাজ করেনি। 

    সবশেষে এটুকুই বলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অধিকার যে মানুষের সংবিধনপ্রত্ত, তাকে আজকের রাষ্ট্র স্বীকারই করে না। কিন্তু ওষুধের যুক্তিসম্মত ব্যবহার মানুষের জন্য স্বাস্থ্য স্লোগানকে সার্থক করে তুলতে পারে ।
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • প্রবন্ধ | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল প্রতিক্রিয়া দিন