এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  স্মৃতিচারণ

  • মা

    শর্মিষ্ঠা রায় লেখকের গ্রাহক হোন
    স্মৃতিচারণ | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২৫ বার পঠিত
  • তোমার বয়স কত, মা? প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে জিজ্ঞাসা করলাম। 

    কত আর? তা, পঁয়ত্রিশ তো হয়েছেই!

    আঁতকে উঠে তাকালাম রোগিণীর দিকে। পাশে বসে তাঁর ৪৮ বছর বয়সী ছেলে হাসছে। মা'কে সে মৃদু ধমক দিয়ে আমাকে বলল, পঁয়ষট্টি লিখুন।

    মায়ের মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। তাঁর কাছে পঁয়ত্রিশ আর পঁয়ষট্টির ব্যবধানটা ঠিক কত, তা জানা নেই। 

    কি করে থাকবে? স্কুলে যান নি কোনোদিন। প্রত্যন্ত গ্রামের গরিব পরিবারের অনেক ভাইবোনের সংসারে তিনি সবার ছোটো। ১২/১৩ বছর হতে না হতেই বেড়াল পার করার মত করে পার করেছিল বাবা। সংসারে হাঁড়ি ঠেলা, আর সন্তানের জন্ম দেওয়ার বাইরে আর কোনো কাজ থাকতে পারে ভাবেনই নি কোনোদিন। ওসব ভাবার জন্য আছে পুরুষেরা। বাল্যে পিতা, যৌবনে স্বামী, বার্ধক্যে ছেলে। ফলে পঁয়ত্রিশ আর পঁয়ষট্টির তফাৎ গোটা জীবনে বোঝা হয় নি।

    সেই মা, সন্ধ্যেবেলায় তুলসিতলায় গলায় আঁচল দিয়েই হোক বা আল্লাকে স্মরণ করেই হোক, সারা জীবনে সন্তান সহ জগতের মঙ্গল ছাড়া আর কোনো কিছু কামনা করেন নি, তাঁকে রাষ্ট্র এবার তুলল কাঠগড়ায়। বলল, এবার তুমি প্রমাণ করো তোমার মৃত বাবা, তোমার মৃত মা তোমারই বাবা মা ছিলেন। না পারো তো ডিটেনশন ক্যাম্পে যাও।

    কি করে প্রমাণ করবে? কেন, জন্মের সার্টিফিকেট দেখাও। কিন্তু মায়ের জন্ম যে ১৯৬৪ সাল। ভারতে জন্ম মৃত্যুর রেজিষ্ট্রেশনের আইনটাই তৈরি হয়েছে ১৯৬৯ সালে। আর তার প্রয়োগ হতে হতে ১৯৭৮ থেকে ৮০। '৮০ সালের আগে জন্মানো মানুষটা কিভাবে দেবে জন্মের শংসাপত্র? আর স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট? স্বাধীনতার পর থেকে কত মেয়েকে স্কুলে পড়িয়েছো তোমরা?

    ভোটবাবু, তুমি এত বোঝো, আর এটা বোঝো না? তোমাদের সকলের মায়েদের জন্মের সার্টিফিকেট আছে তো? কিংবা স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট? 

    বয়স ৩৫ আর ৬৫ র মধ্যে কত তফাৎ, তোমাদের সকলের মায়েরা বোঝেন? 

    তাহলে, ২০০৩ সালে লোকসভা, রাজ্যসভা মিলে সব দলের সমস্ত সাংসদ মিলে হাত তুলে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনীতে সমর্থন জানিয়ে দেশসুদ্ধ লোকের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার সনদে সই করেছিলে, নিজের মায়ের মুখটা একবার মনে পড়ে নি?

    যাকগে, এসব কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ হয় না। আগে ভোর হলে মানুষ জাগত, এখন মানুষ জাগলে তবেই ভোর হয়। আমরা প্রতীক্ষায় থাকব, কবে মানুষ জাগবে?

    ফিরে আসি বানেসা বেগমের কথায়। জন্ম শালচাপাড়ায়। বর্তমানে উধারবন্দ, জিলা কাছাড়, অসম। ২০১৮ সালে বয়স ছিল ৫৬ বছর। স্বামীর নাম বটু মিঞা। কেস লড়ার জন্য বিয়ের সার্টিফিকেট, ২০০৫ এর ভোটার তালিকা, রেশন কার্ড সহ বাবা জুনাইদ আলির ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা ও লিগ্যাসি কোড জমা দেওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র জন্মের সার্টিফিকেট না দিতে পারার জন্য বানেসাকে ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। একবার কেউ ভাবল না, যার জীবিত বাবা মা দুজনেই ভারতীয়, তাদের মেয়ে বিদেশি হয় কি করে? 

    অসহায় বটু মিঞা হাউহাউ করে কাঁদেন। যাকে পান তার হাতে পায়ে ধরেন। বাড়িতে ক্লাস এইটে পড়া ছোটো মেয়েকে রেখে কাজে যেতে হয়। শরীর প্রতিদিন খারাপ হচ্ছে। মলমূত্রের সঙ্গে রক্ত বের হয়। ডাক্তার দেখানোর সংগতি নেই। মাঝে মাঝে মেয়েটাকে নিয়ে শিলচর ডিটেনশন ক্যাম্পে আসেন বটু মিঞা। স্ত্রীকে একবার চোখের দেখা দেখতে হলেও ৫০ টাকা দক্ষিণা দিতে হয়। সে সংস্থানটুকুও যে তার নেই। 

    অতঃপর গৃহপালিত পশু বিক্রি করে, বাড়ি বন্ধক দিয়ে হাইকোর্টের পথে পা বাড়ান বটু।

    আদালতে কেস চলে। ২০১৮ সালে বিচারক রায় দেন বানেসা বেগমকে যেন গ্রেফতার করা না হয়, এবং ফাইনাল অর্ডার বের না হওয়া পর্যন্ত যেন বাংলাদেশে না পাঠানো হয়। অথচ বানেসা তার অনেক আগেই গ্রেফতার হয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে বাস করছেন। হাইকোর্টের দামি উকিলবাবু এত ব্যস্ত, যে এই রায়ের পরও বানেসাকে মুক্ত করতে পারলেন না। 

    অবশেষে কোভিডের ঢেউ এল এখানে আশীর্বাদের মত। ২০২০ সালের ১৫ মে নিঃশব্দে মুক্তি পেলেন বানেসা কোভিডের কারণে। যা তার স্বামীর আপ্রাণ চেষ্টাতেও হয় নি। 

    লিখতে লিখতে হাত অবশ হয়ে আসে। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • স্মৃতিচারণ | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 2601:84:4600:5410:5482:8e7c:d83:***:*** | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:৪৫738838
  • ভয়াবহ sadsad
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন