এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  স্মৃতিচারণ  আত্মজৈবনিক

  • ফুলকো আঁখা মা 

    একক লেখকের গ্রাহক হোন
    স্মৃতিচারণ | আত্মজৈবনিক | ০৬ মার্চ ২০২৬ | ১৬১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • এবার দোলের দিন দেওরাজ ফোন করেছিল। কুশল কথা, একথা সেকথা পেরিয়ে ভুটানে দোলের মদ-মস্তির কথা উঠলো। আর সেই থেকে ডোমা শিরিংয়ের গপ্পো। যা হয়, পুরোনো দিনের কথা আড্ডায় উঠে এলে।

    ডোমা আর প্রদীপের প্রপোজ পার্টিতে আমরা পাক্কা আটচল্লিশ ঘণ্টা মোচ্ছব করেছিলুম। সালটা দুহাজার সাত নাকি আট, এই মুহূর্তে পরিষ্কার মনে নেই। এত রাত্তিরে দেওরাজকে আবার হোয়াটসঅ্যাপ করলে লেখা মাথায় উঠবে। তা যাগ্গে, সেই যেবার তোর্সা খোলায় বাড় এলো না? সেইবার! আমার বাড়ির একদিকে ধৌতিখোলা, আরেকদিকে তোর্সা। শীর্ণকায়া ধৌতি সাদা ফ্রিল দেওয়া লং স্কার্ট পরে নাচতে নাচতে সপাট তোর্সায় গিয়ে মিশবে—এইটেই শুনে ও দেখে এসেছি। তা নয়, কোথাও কিছু নেই, দুম করে সতেরো দিনের টানা বারিশ; ও ধৌতি নদীর গাঁটে গাঁটে সুবর্ণজয়ন্তী হয়ে তোর্সার বুকে ঝাঁপিয়ে দুকূল ভাসিয়ে সে এক জাস্সেতাই কাণ্ডাকাণ্ড! শীতকালের হুরুমবৃষ্টি আর কারে কয়।

    আমরা প্রান্তিক মদারুর দল। অর্থাৎ ফি রোজ কাজকাম সেরে তোর্সার শেষ প্রান্তের সুন্থালা গাড্ডিতে বসে শুকনো গরুর চাট দিয়ে চাট্টি হুইস্কিসেবন করে থাকি। সেখানে দিগন্ত জুড়ে শুধু সুন্থালা প্রসেসিং। রূপে গুণে সবচে ভালো গুলো যাবে এক্সপোর্টে। আর আকারে অসম কিন্তু মোটের উপর স্বাদু লেবুগুলোর গতি ফলের রস কোম্পানিতে। বাকিরা, দিশি মধ্যবিত্তের ডিপার্টমেন্টাল স্টোর আলো করবে। লরির পর লরি এসে কমলালেবু ঢেলে দেয় আর ঝাড়াই বাছাইয়ের লোক লেগে পড়ে কাজে। নিলামের লোকজন ও আসে। অস্থায়ী টেন্ট-বার-এ পানীয়ে গলা ভেজাতে ভেজাতে ব্যাবসাপাত্তির কথা কয়।   তো এইরূপ শুখো বাতাসে তীব্র কমলার ঝাঁঝ, আর জল ছাড়া স্পেশাল কোরিয়ার হুইস্কিময় সেই সাত্বিক জীবনে মহা বিপদ নেবে এলো নদী ভেসে যাওয়াতে। সুন্থালা গাড্ডির তো ক্ষয়ক্ষতি হলই, সাধের দারুসেবার ঠেকটি গেলো ভেসে। অতএব চলো আবার ফেরত ক্লাব চত্বর। সেই আবার বার স্টুলে দার্শনিক মুখ করে বসে থাকো। টুংটাং পানপাত্র। নো চেল্লাচিল্লি, নো বাওয়ালবাজি।

    ক্লাবমালিক চোর্তেন লামা তো মহা বিগলিত হয়ে “সুভে কা ভুলা শাম কো লৌট আয়ে……” গোছের আপ্তবাক্যপূর্বক গলায় টেনে নিলো। একপাল মদারু অকস্মাৎ প্রকৃতিপ্রেমী হয়ে জলে ডুবে মরতে বসেছিল—এ ব্যাপারে তার একটা পুনর্বাসনের দায় থেকেই যায়! এমনকি এই আনন্দে একটা লার্জ বিয়ার মাগের পশ্চাদ্দেশে আমার নামের আদ্যক্ষর  লিখিয়ে দিলো গালা দিয়ে। জীবনে কোনো উঁচু বা মাঝারিদরের সার্টিফিকেটে নিজের নাম দেখিনি। বিয়ার মাগের পাছুতে মাতৃদত্ত নাম দেখে ভাবলুম… কী ভাবলুম? নাঃ, ভাবার অবস্থা ছিল না সেদিন। শনিবারের দুপুর থেকে টানা বিয়ার গিল্লে রাত নটা নাগাদ যা হয় তাই হয়েছিল। ইহজগৎ সদ্যভারমুক্ত ব্লাডারের ন্যায় সম্ভাবনাপূর্ন  এবং দায়হীন। 

    তো এমন সময় দেখি, আমাদের ডোমা শিরিং একটা পাথরের টেবিলের ওপর বসে, আপেল-আপেল মুখে, স্কার্ট টেনে ঠিক করছে, আর মাটিতে হাঁটু গেড়ে প্রদীপ লিম্বু! এ সীন নিজের লাইফে কোনোদিন না ঘটলেও, ঘাটিয়া হিন্দি-ইঞ্জিরি সিনেমাতে তো কম দেখিনি।প্রোপোজড এন্ড এক্সেপ্টেড। কাজেই মুহূর্তে সবাই চিয়ার্স! বোলাও শ্যাম্পেন!!
    চারপাশের সকলেই  চেনা জানা। প্রদীপ আর ডোমাকেও একসঙ্গে ইতিউতি ঘনিষ্ঠ দেখছে লোকে প্রায় দুবছর । পাহাড়ে ঠিক, ঘনিষ্ঠ দেখলেই উঁকি দেওয়ার অভ্যেস নেই—তাই বলে এভাবে সবার সামনে প্রপোজ এক্সেপ্টেড হলে পার্টি হবে না—এ হতেই পারে না! শ্যাম্পেন মাত্র এক বোতল ছিল। ওয়াইন বিস্তর। সব বেরিয়ে পড়লো থরে থরে।

    অতএব আমরা নিজেদের ঘোলাটে হয়ে যাওয়া চোখে, কোনোরকমে তাকিয়ে বা না তাকিয়ে  রঙিন স্বচ্ছ সবরকম পানীয় ঢালতে থাকলুম, ও পাল্লা দিয়ে সুঙ্গুর কো ফ্রাই, ফাকসা পা, ব্লাড সসেজ, বীফ চিলির বংশ ধ্বংস হতে থাকলো।
    ডোমা শিরিং নিজে একটি বারের মালকিন। আগে মিনিস্ট্রি অফ ট্রেডে মিডল ম্যানেজমেন্টে চাকরি করতো। ছেড়েছুড়ে তারপর ব্যবসা চালায়। প্রদীপ যে ঠিক কী করতো আমরা জানতুম না, তবে গান গাইতো খাসা। সঙ্গে গিটার। শুনেছি তার থিম্পুতে জমি জিরেত ছিল কিছু। টাকা পয়সা আসতো সেখান থেকে।
    মোদ্দা কথা ব্যাটা গান গেয়ে ছোড়ি পটিয়েছিলো! বা এরকম ভাবতে ভাল্লাগ্লো আমাদের। ব্যাংক ব্যালেন্সে পটায় তো রাজা ভোজেও। সেই না প্রেমিক, যে হাওয়ায় মিনার তৈরি করতে পারে!

    অতএব প্রেমিকযুগলের সম্মানে আমরা সবাই প্রস্তাব দিলুম—ক্লাবে যথেষ্ট মাল খাওয়া হলো, চলো আমরা পাশাখা যাই! ফাঁকা পাহাড়ের মাথায়, খাদের ধারে বসে গান শুনতে শুনতে মস্তি করা যাবে। যত মদ দরকার গাড়িতে লোড করে নাও। বন্ধুরা পে করে দিচ্ছি। তো সেদিন—থুড়ি সে রাতে—চার গাড়ি ভর্তি জনতা, ডিকি ভর্তি বোতল ও মাখনে ভাজা শুকনো মাংস বোঝাই করে পাশাখা চলে গেলুম। সারা রাত গান বাজনা।

    পাশাখা গুমফা থেকে কিছু দূরে এক পাহাড়ের মাথায়  বাস্কেটবল গ্রাউন্ড সমান ঘাসে ঢাকা চত্বর। একপাশে গাড়ি চলা রাস্তা, আরেকপাশে গভীর খাদ নেমে গেছে। তখন অবশ্য সাদা মেঘ ও কুয়াশার চোটে খাদ বলে কিছুই মালুম পাওয়া যাচ্ছিল না।মাঝে মাঝে উঠে হিসি করতে যাওয়া জনতাকে টিপস দিচ্ছিলুম—যে খাদের কিনারে হিসি করো না, বরং মেঘ বরাবর দু’ধাপ নেমে গিয়ে করো—মজা পাবে।সে ঋষিবাক্য কেউ মানেনি, কারণ বোধহয় পেছন থেকে সেলিনা আর ড্রিমি চেঁচিয়ে বারণ করছিল—
    : দেবের কথা শুনো না! মরবে!
    গোটা চত্বর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে বসে ছিলুম আমরা। মধ্যিখানে বসে প্রদীপ একটার পর একটা গান করে যাচ্ছিলো। মাঝে মাঝে বিয়ারে চুমুকের জন্যে যখন সে থামছিল; হঠাৎ সেই স্তব্ধতা—পাহাড়ি চাঁদের আলো—মেয়েদের গলার খিলখিল হাসি—ছেলেদের জড়ানো আলাপ সব মিলে, যেন—

    ডোমা গান ধরলো এবার। আগে ডোমার গলায় অল্পস্বল্প গুনগুন শুনেছি, ওর বারে মদ খাওয়ার সময়। আজ একটা গোটা গান শুনলুম। কথা জানা ছিল। কিন্তু ওই পরিবেশে ও গান আর কোনোদিন কারো কণ্ঠে শুনিনি।

    ফুলকো আঁখা মা
    ফুলই সংসারো

    কাঁড়া কো আঁখা মা
    কাঁড়ই সংসারো

    ঠান্ডার পাহাড়ে একটা নীলচে ফুল হয় ওদিকে। আগে কখনো খেয়াল করিনি, তার ওপর চাঁদের আলো পড়ে কেমন দেখায়। আমাদের চারপাশে অল্পস্বল্প মাথা তুলে সেইসব। ড্রিমির কী একটা বদভ্যেস—খালি বাবলগাম ফাটাবে—সেও খানিক হাঁ মুখ হয়ে গান শুনে চলেছে। হাতে হাতে ঘুরছে বিয়ারের বোতল। চিৎপাত হয়ে ঘাসে শুয়ে সিগারেট টানছিলুম, একটা মেয়েলি হাত এসে একরকম ছেনতাই করে নিলো নিঃশব্দে। টান দিয়ে আবার যখন ফেরত আসছে সে হাত—বাদামি সিল্কের লম্বাটে হাতার ব্লাউজ, রাতের আলোয় কালচে, কালচে তার নখপালিশও—আর তখনই ডোমার গলার সুর পাকিয়ে পাকিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে রাতভোরের গুমফা থেকে আসা গুগ্গুলের ধোঁয়ায়।

    মাঝে গান রুখে বিয়ারে গলা ভেজাল কন্যে । প্রদীপ তাড়াহুড়ো করে তার সিগারেট জ্বালিয়ে দিলো। কিন্তু ডোমাকে গানে পেয়েছিলো। বা, সেও নেশা করেছে কম কী। নাহলে, পার্টির চটুল গান ছেড়ে, আরোপিত হাস্কি মাদকতা সরিয়ে রেখে কেন গেয়ে উঠবে—
    চিত্ত শুদ্ধা হোস মেরো
    বোলি বুদ্ধা হোস

    মেরো পাইতলা লে
    কিরই না মারোস

    আমি হাতে ভর দিয়ে শুয়ে ডোমাকে দেখছিলুম। মেয়েটাকে কেমন সারসের মতো দেখাচ্ছে না! ওকে তো আমি, লোক না এলে, নিজে হাতে ময়লা কাউন্টার সাফা করতে দেখেছি। খদ্দেরের উলটি-ও। বাজারে দাঁড়িয়ে এস্পারাগাসের আঁটি ভেঙে কচি না বুড়ো পরখ করতে। ছুরপিওয়ালার সঙ্গে ঝগড়া করতে। বেঁটেখাটো পাওয়ারহাউস একখানা। সে কেমন এই নীল আলোর মধ্যে, হাল্কা পার্পল রঙের একটা সারসের মতো গলা উঁচু করে সবার থেকে পৃথক হয়ে গেছে হঠাৎ। আর প্রদীপ তার সামনে আভূমি, গিটারে টুঙটাঙ।
    আহা, উহাদের ভালা হৌক!

    ছাব্বিশ তারিখ থিম্পুতে জরুরি  মিটিং ছিল একটা, সে ডেটটা মনে আছে। ওই ডোমাদের প্রপোজাল পার্টির হুল্লোড় কাটিয়ে ফেরার ঠিক দুদিন বাদে। কারণ, আমাকে ঘর থেকে একরকম টেনে তুলে গাড়ি স্টার্ট দিলো দাওয়া নোরবু; সে নিজেও ব্রেকফাস্ট করেনি, আমিও না। নো প্রবলেম, চুখার রাস্তায় ওয়াংখা রেস্টোতে কিছু গিলে নেওয়া যাবে। প্র্যাকটিক্যালি গোটা রাস্তাটা ঝিমোলুম। ওয়াংখা ঢুকে তাতোপানি দিয়ে ডাবল লার্জ পেগ মেরে মাথাটা সুস্থ হলো। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। হিলহিল বাতাস বইছে চুখা ড্যামের ধার ধরে। শরীর চাঙ্গা হলে খিদেও ফেরে। পোর্ক স্টিম মোমো। খাচ্ছি। ফ্যাকাসে হয়ে তাকিয়ে আছি বাইরের দিকে। দাওয়া হঠাৎ বললো—
    : জানো, প্রদীপ থিম্পু ব্যাক করেছে গতকাল!
    : ডোমা?
    : ডোমার কাছেই শুনলাম তো! প্রদীপের কোন আঙ্কল অসুস্থ। যাইহোক ভালোই হলো—অফিসের কাজ মিটলে আবার পাগলটার গান বাজনা শোনা যাবে।

    আমার আর দাওয়ার অফিস আলাদা। আমরা আদতে ব্যাডমিন্টন কোর্টের বন্ধু। সেখান থেকে ক্লাব, আড্ডা। শুধু লোকবসতির হিসেবে ভুটান তো খুব ছোট জায়গা। তবে কর্মক্ষেত্রে একটা মিলিটারি মেজাজ গোছের ব্যাপার আছে, বিশেষ করে যদি আমাদের মতো প্রোডাকশন হাউস হয়। রাত আটটা-নটা অবধি অফিসেই কেটে গেলো পরপর দুদিন।
    তৃতীয় দিনে, খুব ব্যাজার মুখ করে, বাজারের নীচে, ট্যান্ডিন বারে বসে আছি। দাওয়ার আসার কথা, আসছে না কেন কে জানে। চাদ্দিকে টিপিকাল সব সরকারি অফিসাররা ডাশো-ডাশো-লা সো লা লাগিয়ে রেখেছে। এমনকি মদ খেতেও খেতেও এদের প্রভুভক্তির কোনো ছাড় নেই।
    হঠাৎ কানের লতির নীচে তীক্ষ্ণ টোকা ও হুউউউ আওয়াজ—
    : কে র্যা!
    সোনাম লামু। অমন সুন্দর একখান নারীজাতি, কোথায় আলতো করে পরশ দিয়ে ডাকবে, তা নয়—ফক্কুড়ি যত! অফিসের বান্ধবীদের সঙ্গে বসে ওয়াইন প্যাঁদাচ্ছিল। যাহোক ভিড়ে গেলুম তাদের মধ্যে।
    আমার আবার কেস হলো—হুইস্কিতে সেরকম নেশা হয় না, কিন্তু বেশি ওয়াইনে একটু হালকা মতো হয়। কাজেই ঘণ্টা দুই কখন কেটে গেছে, দাওয়া এসেছে কিনা দেখিওনি। বরং ভাবছি সোনমকে যে সেই ওর ভাইয়ের বাড়িতে পৌঁছে দিলুম গেলবার, সেদিন তো আর কথাও বললো না। আবার দেখো এখন এমন ভাব যেন আমি স্কুলবয়েসের ইয়ার। পাশের মেয়েটির সঙ্গে গার্লফ্রেন্ড পাতিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে! ই কী রে ভাই! তোর বয়ফ্রেন্ড হাইকিংয়ে গেছে। প্যারেন্টস গেছে আংকেলের ফার্মহাউসে। এই দুঃসময়ে আমি কি ফাঁকা ফ্ল্যাটে চাট্টি ডল্লে চিলি এন্ড চীজকারী বানিয়ে নট সো গুড সামারিটান হতে পারি না? বা, এই বার থেকে ফেরার পথে থীম্পু লোয়ার মার্কেটের ধার ধরে  জুটতে পারে না কোনো মাতাল-দাঁতাল, বা কবির ইচ্ছে মেনে নিদেন পক্ষে একটা ভদ্রগোছের হিমালয়ান ভাল্লুক?

    দাওয়া নোরবু নাহোক আওয়াজ দিলো মাঝখান থেকে। সে এসে বার স্টুলে বসেছিল; তাকিয়েও দেখিনি ইত্যাদি। আমি অবশ্য তাকে  ধন্যবাদ দিলুম। প্রাপ্য হয়। প্রদীপকে ফোনে পাওয়া গেলো না। আঙ্কেলের বাড়িতে আটকে পড়েছে নিশ্চয়।

    ফেরার সময়েও অফিসের গাড়ি কাটিয়ে দিয়ে দাওয়ার সঙ্গে। ফিরেই গুচ্ছ মিটিং আর রিপোর্টের চক্করে ডুবে গেলুম। সিস্টেমে নাকি ভুল রিপোর্ট আসছে, ইন্টারনাল অডিটে ঝামেলা হয়েছে। দ্রালহা ফ্যাক্টরির ডাইরেক্টর  এই সুযোগে ডিপার্টমেন্টাল নোট পাঠিয়েছে যে, ইআরপির মিসটেকের কারণে কাজ বন্ধ হ্যান ত্যান।
    নেশা-ঘুম সব জলাঞ্জলি দিয়ে টানা দশদিন পড়ে রইলুম। টানা তিনবছরের ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট এফোর্ট লেগে আছে এই ইনহাউস ইয়ারপির পেছনে। সার্ভে করা - ডিএফডি আঁকা দিয়ে শুরু করেছিলুম, টীম বিল্ডিং, নিজে হাতে কোডিং,  ফাইনালি ইম্পলিমেন্টেশন টীম কে হ্যাণ্ডওভার করেছি সদ্য চার মাস। তার মধ্যে রয়াল অডিট পাস করে গ্যাছে। তবু চিন্তা তো থেকেই যায়। অবশেষে  ঠিক জানা গেলো সমস্যা ইআরপিতে নয়। ফ্যাক্টরি একটা বাবা আদম কা জমানার বি-আই টুল ব্যবহার করে, তাতে কনভার্সন রেট নিয়ে একটা ঝোল আছে। খুবই সামান্য ব্যাপার। ওভার ভিডিও কল ইন্সট্রাকশন দিয়ে ঠিক করা খুব বেশি আধঘন্টার কাজ। কিন্তু সেই বাবদ পেপারওয়ার্ক আর মিটিংয়ে এক্সপ্ল্যানেশন, ফ্যাক্টরির জিএম , তারপর ডাইরেক্টরকে  রাজি করানো, পা টানাটানির খেলা, ইগো সন্তুষ্টি, নোটশিট, পালটা নোটশিট—এইসব জঞ্জাল পেরোতে লাগলো ঠিক দু মাস। ক্লান্ত করে দিলো পুরো।

    ড্রিমি একটা বড় হেল্প করলো। আমার জয়েনিং-এর আগে, মানে ঠিক চার বছর আগে, ফ্যাক্টরির বি-আই টুল নাকি একইরকম ভুগিয়েছিলো। তখন গোটা ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট বোর্ডে  লিখিত অভিযোগ জানায়। তারপর সিইও বদলে গ্যাছে। ফ্যাক্টরির ডাইরেক্টর আর এখনকার সিইও আগে মিনিস্ট্রি অফ টেলিকমে কোলিগ ছিলো। সব অভিযোগ চাপা পড়ে যায় স্বাভাবিকভাবেই। সেই তিনটে পুরোনো অফিশিয়াল লেটারের জেরক্স কপি  , ড্রিমি  আর্কাইভ ঘেঁটে এনে টেবিলের ওপর রেখে চলে গেলো একদিন সন্ধেবেলা। কী বিচিত্র গন্ধের কোলন মাখে মেয়েটা, মাথা ধরে যায়।তবুও  কিছু বলিনি সেদিন। হেড অফিসের প্রবল দলাদলির মধ্যে এ-কজন মাত্র হাতে গোণা বন্ধু।

    এই কারণেই সরকারি আপিসে সফ্টওয়্যার বানানোর চে গুখুড়ি কাজ আর নেই। লবিবাজি, আগে পরে পেপারওয়ার্ক আর জবাবদিহিতে নব্বইভাগ সময় কাবার।সব ঝামেলা সালটে গেলে, তেতো-খিঁচড়ে থাকা মেজাজে একাই একটা বারে বসে ছিলুম বিয়ার নিয়ে অফিসের পর। এই দুমাস ব্যাডমিন্টন খেলতেও যাইনি। পাহাড় জিনিসটা যাঁরা ছুটি কাটাতে গিয়ে দেখছেন সে একরকম, আর মাথা ভর্তি চাকরির টেনশন নিয়ে ফাঁকা চোখে পূর্ব হিমালয়ের এই সুন্দরতম গিরিবর্ত্নের দিকে তাকিয়ে থাকা আরেক।
     

    হাঁটতে হাঁটতেই ফিরছিলুম। বাজারের কাছে এসে মনে হলো, একটু ফ্রেশ চীজ কিনে নিয়ে যাই—শালপাতায় মুড়ে বিক্কিরি হচ্ছে। চারপাশে দেখি নেপালিদের মধ্যে মাংস কেনার ধুম! কী, না কালকে দোল! দেওরাজ একটা বড় থলে ভর্তি বাজার করে দাম মেটাচ্ছিলো, আমাকে দেখে সেই থলে আরেকজনের গাড়িতে দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিতে বলে নিজের গাড়িতে আমাকে টেনে তুললো। আমি একটু চেষ্টা করে হেসে বল্লুম—
    : কাল তো হোলি!
    দেওরাজও বললো—
    : হ্যাঁ তো! ভালো হলো অফিসের ঝামেলা মিটে গ্যাছে। এনজয় করা যাবে।
    স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে একটা টার্ন নিয়ে বলে—
    : সোম, এওটা কুড়া থিও!
    : কী ভয়ো সোম? এনি মিসহ্যাপ?
    : মিশ্যাপ হইনা, আলিগটি ওকোয়ার্ড যস্ত লাগছ!
    খাইসে! আবার কী হলো!
    : তপাইলে... ব্রেকআপ পার্টি ভনেকো...  থা ছ ?
    : ব্রেকাপ পার্টি?!! !

    ধীরে ধীরে খোলসা করে দেওরাজ গুরুং। দুদিন আগে ওরা নাকি ক্লাবে নাইন বলস খেলতে গেছিলো। তখন। ওরা মানে দেওরাজ, দাওয়া আর প্রদীপ। তখন ডোমা শপিং সেরে এসে সবে একটা জীন নিয়ে বসেছে। কিছু একটা সুর কাটছে বুঝে, দেওরাজ প্রদীপকে বলতে, সে এড়িয়ে যায়। তখন ডোমাকে জিজ্ঞেস করতে বলে তাদের ব্রেকাপ হয়ে গেছে।
    নাথিং বিগ। প্রেম করবে, ব্রেকাপ হবে—এসব তো আকছার। তো?
    — হইনা...
    দেওরাজ আবার আমাকে বোঝাতে শুরু করে—
    — এস্তো হইনা! মেরো মনমা কে থিও, মৈলে ভন দেই—প্রপোজ কো টাইম মা পার্টি গরেকো! ব্রেক আপ মা পার্টি হুন্দেই না?!
    আর সেই শুনেই নাকি ডোমা লুফে নেয়—
    — হুনছ! পার্টি হুনছ, মৈলে থ্রো গড়সু!!
    লেহ্ এখন, ইয়ার্কি করতে গিয়ে ব্রেকাপ পার্টির নেমন্তন্ন ঘাড়ে করে আমার কাছে মিউ মিউ করছে, দু ছেলের বাপ দেওরাজ গুরুং! গা জ্বলে গেলো প্রথমে। ভাবলুম মালটাকে লাথিয়ে ফেলে দি দরজা খুলে। আমোদগেঁড়েমির একটা সীমা আছে তো নাকি।

    পার্টির সন্ধেতে ডোমা শিরিং-এর বারে ঢুকে অবশ্য অস্বস্তি কেটে গেলো। বাইরে “বার ক্লোজড” টাঙিয়ে সেই সন্ধেটা প্রাইভেট পার্টির মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে ভেতরটুকু। পালডেন, কেজাঙ, সোনম—সবাই হাজির। যদিও দোলের আবীর মেখে কে যে কোনটা কাছে না গেলে বোঝা দায়। দেখি,  লাল রঙের প্যান্ট আর বিকট বাঁদরে রঙ মাখা উর্ধাঙ্গ নিয়ে  দেওরাজ নিজ দায়িত্বে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে ফিরছে আতিথ্যে ত্রুটি আছে কিনা এবং অপর পক্ষ থেকে, মাতালের শিষ্টতা, মাতালের বিস্ময়—সব মিলে হাত মাথা নেড়ে নানান অস্তিবাদী উত্তর আসছে। এবং আরও বিচিত্র কারণ,  কে কোনটা বোঝাই যাচ্ছেনা।
    হোলির সন্ধ্যা বলে জনতা দুপুর থেকেই জলপথে। ব্রেকাপ পার্টিতে নিমন্ত্রিত হয়ে ঠিক কী করা উচিত না বুঝে মদ ও গল্পগুজবের স্বাভাবিকতাতেই ডুবে, অগত্যা। ড্রিমি এখনো বীয়ারপর্বে আছে। অবিশ্রান্ত বাবলগাম ফাটানো শুরু হয়নি। কেজাং জোকস বলছে। ব্রেকাপ জোকস! দু-একটা জোক একটু কান করে শুনি। প্রেম কেটে গেলে বেড়াল পোষা ভালো, তোমার মতো প্রেমিক যেন হ্যালির ধূমকেতু—আগামী ৭৪ বছরে দেখা না হয়—এরকম সব চুটকি। নেটে পাওয়া যায় নাকি এসব? প্রেমে পড়ার জোকস—ব্রেকাপ জোকস—সব মুখস্থ করে রাখে কেজাং ধেন্ড্রুপ?

    প্রদীপ সবচে স্মার্ট। গিটারে বিষাদ তুলেছে সে। ডোমা শিরিং কম যায় কীসে। গ্লাসে বরফ ঢালতে ঢালতে শিস দিচ্ছে! সে আজ সেজেছে গোলাপি টি আর জিনস-এ। রঙ খেলার পর স্নান সেরে এসেছে একপ্রস্থ,  বোঝা যায়। মাথার বান শক্ত করে বাঁধা। সেদিনের সেই আপেল-আপেল মুখ আর নেই, বরং সপ্রতিভ এক নারীর ঘামতেল মাখা প্রতিমা যেন।
    আমিই শুধু তালকানা, সেলিনার কানের কাছে মুখ নিয়ে জিগাই—
    — ঠিক কী হয়েছিলো, জানো কিছু?

    সেলিনা—সেলিনার গপ্প আগে বলেছি না? সেই যে... একবার প্রবল চেঁচামেচি করছিলো ডিপার্টমেন্টের বাকী লোকদের সঙ্গে, আমি মাঝখান থেকে ডেকে ভালোমানুষের মত বলেছি—এতো পেশেন্স লুজ কোরো না, ডেট বুঝে ছুটি নিয়ে নিও। আমি সামলে নেবো।
    কাগজে কলমে আমিই ওর বস। এটুকু সাহায্যের হাত বাড়ানো অপরাধ? তো, কী বিচ্ছু মেয়ে—“ইয়েস স্যার” বলে ঘর থেকে বেরিয়েই যাচ্ছিলো, ঠিক দরজার ল্যাচটা টেনে, আবার ফিরে দাঁড়িয়ে বলে—
    : — আমার নয় পিরিয়ড, তুমি যে ফী রোজ লোকের সঙ্গে মাথা গরম করো, সে বেলা??
    উফফ!

    এহেন হাজির জবাব সেলিনা ওয়াংমো, আমার ঔতসুক্যের উত্তরে, ওয়াইনে চুমুক দিতে দিতে অন্যদিকে তাকিয়েই থাকে। কিছুক্ষণ। অনেকক্ষণ। নেশা হয়ে গেছে নাকি!
     — প্রদীপের একটা রিলেশন আছে থিম্ফুতে। ডিএসপির মেয়ে। তুমি চেনো। টীচার অ্যাট পেলজোরলিং হাই স্কুল। এন্ড ডোমা ইজ নট ওকে উইদ আ টু টাইমার।

    অ এই ব্যাপার। একেবারেই জানতুম না তা নয়। কতজনের সঙ্গে কতজনের সম্পর্ক। তার কতরকম ডাইমেনশন। একাধিক বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড রাখা তো সমস্যা নয়। সমস্যা এই যে, ডোমা শিরিং ইজ নট ওকে উইথ দ্যাট।

    খ্যুল!
    একটু কায়দা করে হেসে বলি। সেলিনা নীল আবির মেখে একটা চিলির বাঁদরের মতো হয়ে বসেছিল। আমার হাসি দেখে মুখ ভ্যাংচায়। ড্রিমিকে ঠেলা দিয়ে বলে—
    — স্যার কুল ভনেকো। প্রদীপলাই ভন্নু। ছোড়ালে মরাল সাপোর্ট পাউন ছ!!

    ড্রিমি নীল নয়, গোলাপি আবীরে ভূত সেজেছিল। সে অদ্ভুত খ্যা খ্যা করে হাসতে থাকে। প্রদীপ একটা নতুন গান ধরার তোরজোর করছে। গীটারকে ড্রপ ডি-তে বেঁধে নিচ্ছে মনে হলো। নিজের ব্রেকআপ পার্টিতে জকির কাজ পেয়েছে ছোকরা। বেশ ফূর্তিতেই আছে মনে হয়।
    ডোমা-ই বা কম কিসে। রঙ মাখা ভুতের দল থেকে কয়েকজন আইস আইস করে হাঁক পাড়ছিল। ডোমা কপালে একটা ফেট্টি বেঁধে এসে প্রদীপের গানে তাল দিচ্ছিল এতক্ষণ। আইসের আবদার শুনে হঠাৎ এদিকে তাকালো—
     — হে দেভ! উড ইউ জয়েন মি ইন দ্য কিচেন? আইস ব্রেক গরনু পরে! প্লিইইজ!

    প্রদীপ গীটার টিউন করতে করতেই আওয়াজ দেয়—
     — ইয়, আইস ব্রেক কো কাম হামরো দেভ স্যার লে রামরো গরছ!

    পাত্তা দিই না। ডোমা আমার কিক বক্সিং ক্লাসের পার্টনার ছিল একসময়। নাম ধরে ডাকা পুরনো অভ্যেস। কিচেনে ঢুকে দেখি একটা প্রমাণ সাইজের বরফের স্ল্যাব আনানোই আছে মদারুদের মোচ্ছবের জন্যে। তিন মাথাওয়ালা আইস-পিক তার পাশে রাখা। হাত বাড়াতে যাচ্ছিলুম। ডোমা থামিয়ে দিলো।
     — উ কাম মইলে সাকছু। তিমি আজু রোল গরনু সোম । মেরো লাগি।

    কিচেনে ঢোকার দরজা পিঠ দিয়ে চেপে কার্পেটে বসে পড়ে ডোমা। আইস স্ল্যাব একটা কাঠের প্লেটের উপর নিয়ে। পা ছড়িয়ে আরাম করে বসে আবদার করে—
    — ইটস বীন লং..

    ইয়া..
    হাত পাতি.. ডোমা তার পাশ থেকে খরগোশ আঁকা কিউট ব্যাগ হাতড়ে একে একে মশলা, কাঁচি, রোলিং পেপার, কটন—সব হাতে তুলে দেয়। এখনো আইলাইনারের ব্র্যান্ড বদলায়নি দেখি। লেড ফ্রি গুলো ভূটানে পাওয়া যায় না। শিলিগুড়ি থেকে আনাতে হয়। এই ঘরে আমরা বিস্তর আড্ডা মেরে আর বীয়ার খেয়ে কাটিয়েছি একসময়। মিনিস্ট্রি অফ ট্রেডের লীডেন ওয়াংমো আসত। তিন পাত্তি খেলতুম।  ডোমার লতায় পাতায় বোন। অফিসিয়াল আওয়ারের পর পাবের পাবলিক এরিয়াতে বসা রিস্কি। কিচেনে বসে খেলে, বন্ধুরা বীয়র টানছি—পুলিশের বাবার কী—এইসব বলে কাটিয়ে দেওয়া যায়। মানে, সেই ইতিহাসও আছে। 

    অনেকদিন পর। সত্যিই। কুচি করে পাতা কাটছিলুম। সিড নেই অলমোস্ট। বিকট চিৎকারে চটকা ভাঙে।

    ওহহহ্, সেই ব্যাটারা এখনো আছে?!
    ডোমার কিচেনের একদম লাগোয়া একটা ফ্ল্যাটের জানলা আছে। যে কাপল থাকে, বেশ বয়স্ক, মোটামুটি সন্ধে থেকে মারপিট করে। আক্ষরিক মারপিট। ডোমা, আগেও আমাদের সামনেই তিনবার পুলিশে খবর দিয়েছে। পুলিশ এসেওছে। কিছুই সমাধান হয়নি। সন্ধে হলেই যেন দুটো ভাগ্যতাড়িত প্রবল অনাত্মীয় এক ছাদের তলায় থেকে যাওয়ার চরম আক্রোশে ছিঁড়ে খায় পরস্পরকে। বছরের পর বছর এক ড্রামা। পাবের হল থেকে আওয়াজ পাওয়া যায় না। কিন্তু কিচেনে এলেই শ্রুতিনাটকের সাক্ষী।

    অনেকদিন বাদে শুনে অবশ্য হেসে ফেলেছিলুম। ডোমা বিরক্তিতে দুদিকে মাথা নেড়ে আইস-পিক দিয়ে স্ল্যাব ভাঙতে মন দেয় । একটা চ্লিক চ্লিক শব্দ আছে বরফ টুকরো করার। আর সোজা ধরে বারবার স্ট্যাব করে যাওয়ার অদ্ভুত ছন্দ। রোল করা হয়ে গেছিলো। ডোমা ইঙ্গিত করে ধরিয়ে টান মেরে তারপর দিতে।
    হমম গুড স্টাফ..!

    এগিয়ে দিই। ডোমা দুটান দেয়। হাত ফিরতে থাকে। চ্লিক চ্লিক চ্লিক চ্লিক—বরফের স্ল্যাব ভেঙে যায় ক্রমশ ছোট ব্লকে। আর একটা ঘুঘুপাখির বুকের মতো নরম কুয়াশা ছড়িয়ে পড়তে থাকে মাথার ভেতর। আর ব্যাকড্রপে পাশের জানলার ভদ্রমহিলা তারস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে—

    কেন কেন কেন এই লোকটা তার জীবনে এসেছিল কেন কেন!!

    আমরা একটু দ্রুত হাত বদল করছিলুম। যাতে এই হট্টগোলের প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে কুয়াশার রেলগাড়িটায় টুক করে উঠে পড়া যায়।
     

    — কী ভয়ে রে তিম্রো? ফুলকো আঁখা মা কাঁড়া পড়েক ছ? অর ইউ ডিন্ট নো হোয়াট কাইন্ড অফ পারসন হি ইজ?

    ফস্ করে বলে বসি।

    ডোমা কিছু বলে না। সিক সিক করে দুটো গাল তোবড়ানো টান দেয় ধোঁয়াতে। চুপ করে বসে থাকে বরফ ভাঙা থামিয়ে কিছুক্ষণ। সরু চোখে আমার দিকে তাকায়। শেষ হয়ে এসেছিল। লাস্ট কাউন্টারটুকু এগিয়ে দেয়। দরজায় টোকা পড়ছিল।

    একটু সরে গিয়ে দরজাটা সিকি পরিমাণ খুলে দেয়। প্রদীপ মাথা গলিয়েই ওহহ স্যরি স্যরি বলে ক্যাবলা হাসি হাসতে থাকে। তাকাই তার দিকে। হাত বাড়িয়ে রোল অফার করি।
     — হইনা দাজু! ড্রাইভ গরনু পরছ!!
    ঢ্যামন আমার! গলা অব্দি মদ গিলে এখন রোলে দুটো টান দিলে নাকি ড্রাইভে অসুবিধে হবে। এনি ওয়ে। বাকেটে বরফের টুকরোগুলো ভরছিলুম । হল থেকে যে পরিমাণ চিৎকার শুরু হয়েছে আইস আইস বলে, তাতে আশু ব্যবস্থা না হলে তারা বসন্তকালে স্নো ফল নামাবে বলে মনে হয়।

    একটা তামার বাকেটে দুহাত দিয়ে বরফের টুকরো ভরছিল ডোমা। ঠেসে ঠেসে। আমার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে। নির্বিকার। হাতে ঠান্ডা লাগবে বলে ফ্রিজারের মাথা থেকে গ্লাভসজোড়া এনে দিই। একটু বেশিই নির্বিকার দেখে মনে হয় তার নেশা হয়ে গেছে। পাঁচ লিটারের বাকেট। আঙুল সাদা হয়ে আসছে দেখে হাত দুটো টেনে নিয়ে গ্লাভস পরিয়ে দিই। সে কিছুই বলে না।
    বাকি বরফের টুকরো কাঠের প্লেট থেকে কাচিয়ে বাকেটে তুলতে তুলতে একবার থামে শুধু—
     — ইউ আর স্টিল সো আনকাইন্ড দেভ!

    কোনো উত্তর শোনার অপেক্ষা করে না ডোমা শিরিং। বাকেট নিয়ে হলে বেরিয়ে যায়। আমার হাতে করে  এতো বরফ ঘাঁটার অভ্যেস নেই। ঠান্ডা লাগছিল। কিচেনের বাইরে এসে সিগারেট ধরাই একটা। জনতা বহু আকাঙ্ক্ষিত আইস পাওয়ার ফুর্তিতে হৈ হৈ করে ওঠে। দেওরাজ একটু আওয়াজ দেওয়ার চেষ্টা করে—
    : — মেরো সাথীহারু কাঁ গাকোথিও! ওল্ড ফ্রেন্ডস এন্ড ওল্ড ফ্রেন্ডস নো নো ফোল্ড ফ্লেম্স নো নো…..

    তার কণ্ঠস্বর ও বক্তব্য দুইই অকাতর বিয়ারপানের প্রকোপে পথ হারিয়ে ফেলে। কিচেনের দরজা অর্ধেক খোলা ছিল। অতটা জোরে না হলেও পাশের ফ্ল্যাটের শুম্ভনিশুম্ভর যাত্রাপালা ভেসে আসে হঠাৎ। ডোমা সেদিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে ড্রিমিকে কিসব বলছিল। তার বাঁ পায়ের দামড়া স্নিকারের ব্যাক-কিকে দরজা আবার ল্যাচশুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায়।

    প্রদীপ গীটার থামিয়ে একটা হুইস্কি নিয়েছে। বরফের বাকেট মাঝখানে বসানো। নতুন গানের উপরোধ ভেসে আসছে ঘরের নানা কোন থেকে। ডোমা জিজ্ঞেস করছে কার কী লাগবে। শিস দিচ্ছে। একটু বেশি-ই।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • স্মৃতিচারণ | ০৬ মার্চ ২০২৬ | ১৬১ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    নাইটো - একক
    আরও পড়ুন
    সিপাহী - একক
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | 2607:fb91:4c1f:10de:44c9:a105:c02a:***:*** | ০৬ মার্চ ২০২৬ ২১:২৩738991
  • আপনার লেখায় কমেন্ট করতে আমার সচরাচর সাহস হয়না। তবু বলেই যাই, অনেকদিন পর গুরুতে এই লেভেলের লেখা পড়লাম। অত্যন্ত ভালো লাগলো।
  • অমিতাভ চক্রবর্ত্তী | ০৬ মার্চ ২০২৬ ২২:১৯738992
  • কেকের মন্তব্যর সাথে শব্দ টু শব্দ সহমত। সংযোগের শুধু এই, একটু বেশি ভাসছিলাম-ডুবছিলাম তোর্সার জন্যও বটে। আমার তার সাথে দেখা দূর শৈশবে, অত্যল্প সময়ের আর আপনার ত শিরায়ধমনীতে বয়ে মগজ চুবিয়ে রেখেছে, আহা, কোন এক জনমে আমিও ... আগুনের পাশে, তোর্সার পাশে, তরল আগুনে ...
    এ লেখা একদিন শব্দ করে পড়বই পড়ব
  • Ranjan | 2001:999:78c:eca5:8fba:7917:537e:***:*** | ০৭ মার্চ ২০২৬ ০১:৩৭738993
  • এ এক অন্য দুনিয়া l
    আমার অচেনা l তাই আগ্রহ  বেশি
    তারপর একক এর লেখা l
     
    অনেক দিন বাদে l
    আরো হবে তো?
     
     
  • একক | ০৭ মার্চ ২০২৬ ০২:২৬738994
  • @ কেকে,  আমি এতো ভীতিপ্রদ?  :( 
     
    @ অমিতাভ দা,  রঞ্জন দা চেষ্টা করব সময় করে আরো লেখা আপ্লোড করার। এইটা লেখা হল দম দির খোঁচা খেয়ে। নইলে দেওয়ারাজের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে মাথার গল্প মাথার মধ্যে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়তুম।  যেমন ফী রোজ যাই। দম দি আওয়াজ দেওয়ায় ভাব্লুম চলো এট্টু ভুটানের স্মৃতি কিছু ধরে রাখা যাক।  
  • aranya | 2601:84:4600:5410:8c4a:5e20:c0f:***:*** | ০৭ মার্চ ২০২৬ ০৮:০৪738995
  • দারুণ 
  • গল্পটা | 108.16.***.*** | ০৭ মার্চ ২০২৬ ১০:০৩738996
  •  এককের এই পটভূমিটার নতুনত্ব আমার মত অনেককেই টানে হয়ত! কিন্তু লেখার জোরতো অন্যত্র! 
    পড়ার পরে মনে হতে থাকে, হয়ত, কোনদিন, আমিও, এরকম, নিরুত্তাপ, রক্তপাতের গল্প, বলতে পারব! 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন