সিলা দাদা – এক আশ্চর্য ঋজু মানুষ
চলে গেলেন সিলা দাদা। আজ সকালেই খবর পেলাম। তাঁর চলে যাওয়া মানেই এক দ্রুত গতিতে বদলে যাওয়া পল্লির এক অধ্যায়ের সমাপ্তি।
একদিনের কথা বলি। ঘড়ির কাঁটা আটের ঘর ছেড়ে পায়ে পায়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। শীতের কামড় এবার বেশ কড়া। শয্যা ছেড়ে উঠবো উঠবো করে গড়িমসি করছি এমন সময় বাবুলালের হুইসেল বেজে ওঠে। ময়লার বালতি তার হাতে পৌঁছে দিতে উঠতেই হয় এবার। বালতির হাতবদল করে রাস্তার দিকে তাকাতেই দেখা হয়ে যায় সিলা দাদার সঙ্গে।
– আরে দাদা! এই সাতসকালে চললে কোথায়?
– বেঙ্কে যাব।
– দশটার আগে তো ব্যাঙ্ক খুলবে না। এতো তাড়াতাড়ি…?
– ও! টুকটুক করে হাঁটতে হাঁটতে ঠিক সময়মতো পৌঁছে যাবো । মুখে একগাল হাসি ভাসিয়ে দেন। বললাম – একটা টোটোয় উঠে পড়ো। এতোখানি হাঁটবে দাদা?
মুখে কোনো জবাব না দিয়ে কেবল হাত নেড়ে বুঝিয়ে দেন – ও সবের দরকার নেই, আমার চরণের তাকৎ এখনও মোটেই কম নয়।
তাকৎ বা সামর্থ্য কাকে বলে তা আমরা সিলা দাদাকে দেখেই বিলকুল টের পেতাম। আমাদের সঙ্গে পরিচয় সেই ১৯৮৭ সাল থেকে। বাসা বাড়ি ছেড়ে নতুন বসত বাড়ি তৈরি করতে আমাদের এই পাড়ায় আসা। এদিকে তখনও মানুষের ভিড় সেভাবে বাড়েনি, যেদিকে তাকাই সেদিকেই কেবল বাগানের ছড়াছড়ি – পেয়ারা বাগান, বড়ুয়া বাগান, মুখার্জি বাগান, কালু ঘোষের বাগান, সিলার বাগান….. । ব্যস্ত যশোর রোড টপকে পূর্ব দিকে গেলেই আরও বড়ো এলাকা জুড়ে থাকা বিখ্যাত শিশিরকুঞ্জ – সাবেক যুগান্তর পত্রিকার মালিকদের পৈতৃক সম্পত্তি। আমরা পশ্চিম পাড়ের বাসিন্দা হতে সবে ঘাঁটি গাড়ছি সেই ছায়াঘেরা উদ্যান পল্লিতে।
সেখানেই সিলা দাদার সঙ্গে প্রথমবারের জন্য দেখা। কালো ব্যাসল্ট পাথর খোদাই করে তৈরি করা এক দীঘল আদিবাসী মানুষ যেন দাঁড়িয়ে আছে আমার চোখের সামনে। চেহারার এমন সটান গড়নটাই ছিল অনেকের ভিড় থেকে সিলা দাদাকে আলাদা করে চিনে নেবার ইউ এস পি। বহু পুরনো এক বাড়ি কেনা হলো, অনেকটাই ফাঁকা জমি নিয়ে সেই বাড়ি– লালরঙা সেই বাড়িটিকে তল্লাটের সবাই একডাকে চিনতো লালবাড়ি বলে। বেশ মনে আছে, আমাদের তরফ থেকে ঠিকাদারের সামনে বাড়ি তৈরির প্ল্যান মেলে ধরতেই সে সিলা দাদাকে কাছে ডেকে নেয়। তারপর বুঝিয়ে দেয় মাটি কাটার হিসেব নিকেষ। শিলা দাদা মুচকি হেসে খানিকটা আশ্বস্ত হয়ে বলেন –পুরোটা ভাঙচুর হবেনা ? খুব ভালো। সবটুকু ভেঙে ফেললে আমি খুব কষ্ট পেতাম। মাটির গভীরে শুয়ে থাকা সাহেবও দুঃখ পেত। এই ভালো হয়েছে। কাজ কম
হবে হয়তো! মাটি কাটতে কাটতে আমার জীবনের এতোগুলো বেলা বয়ে গেল। ওসব আপনি দেখে নেন । তারপর খানিকটা খুশি হয়েই বোধহয় বলে ওঠেন – যাক্, এতোদিনে এই নির্জন বাড়িটার একটা হিল্লে হলো !
আমার বাবা ছিলেন ভীষণ আমুদে আর কথকী মানুষ। একবার কথা বলতে শুরু করলে চারপাশে ভিড় জমতে বিশেষ সময় লাগতো না। এই বিশেষ গুণের জন্য আড্ডার আসর জমাতে দেরি হতো না। এমনি এক আসরে বাবার করা প্রশ্নের উত্তরে সিলা দাদা বলেছিলেন তার জীবনের অনেক কথা।
– বাবা,কাকার হাত ধরে লাল মাটির দেশ হাজারীবাগ ছেড়ে এই দেশে এসেছিলাম সে অনেকদিন আগে। তখন আমি নেহাতই বোঁচকা বওয়া তল্পিবাহক কিশোর। আমাদের এক দেশওয়ালি কাকা বলেছিল দমদমের দিকে মেলা কলকারখানা আছে সেখানে কাজ জুটিয়ে নিতে অসুবিধা হবে না। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানিতে বাবার সঙ্গে আমরা বেশ কয়েকজন সেই শাল মহুলের দেশ ছেড়ে এখানে এসে হাজির হলাম। বাবা কাকার কাজ জুটে গেল অল্পদিনেই। আমি তখন সবে ডবকা ছোকরা বেলায়। কোম্পানির ভারী ভারী কাজ আমাকে দিয়ে হবেনা,তাই বাগানের দেখভাল, জমি আর চাষের কাজে হাত লাগাতে আমি আমার এক কাকার সঙ্গে চলে এলাম এখানে। তখন আমি ঘোষ বাবুদের বাগানবাড়িতে কাজ করি। খোলা জমিতে ধান চাষ, সবজি চাষ এইসব করে দিন কাটাই। কিছুদিন বড়ুয়া বাগানের ডালডা কোম্পানিতেও কাজ করেছি। সব ছেড়ে শেষে এই পাড়াতে এসে তাঁবু পাতলাম। এই এলাকার সব জামিনের মালিক ছিলেন কন্ট্রাক্টরসাহেব। খুব বড়ো মনের মানুষ, অঢেল পয়সা। তারই তৈরি এই বাড়িটা ছিল এলাকার সবথেকে পুরনো বাড়ি – বাড়ির সামনে আর পেছনে বিরাট খোলা বারান্দা। একালে এমন গোল থামওয়ালা বাড়ি আর দেখা যাবেনা। এই সাহেবের বাগানেই আমার বাগানি হয়ে ওঠার হাতেখড়ি।
মানভূমের মানুষের এমন গতর খাটানো জনমজুর হয়ে ওঠাটা খুব একটা পছন্দের হয়তো ছিলোনা সিলা দাদার। একদিন একথা জিজ্ঞেস করাতে খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে সিলা দাদা বলেছিলেন – এটাকে না মেনেই বা উপায় কি ! হাজারিবাগে থাকলেও হয়তো এই কাজই করতে হতো। যখন ঘর ছেড়েছিলাম তখনও পেটের টান খুব বড়ো ছিল আমাদের কাছে,আজ এতো বছর পরেও সেই টানটা আমাকে ছেড়ে যায়নি। গরীবের ভাগ্য এমনই হয়।
আমাদের এদিকের আদিবাসী পাড়ায় এখনও প্রায় তিরিশটি পরিবার বাস করে। সিলা দাদা এদের মধ্যে সবথেকে বরিষ্ট মানুষদের একজন ছিলেন। গড়পড়তা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে আমাদের মধ্যে এখনও একধরণের নাকউঁচু মনোভাব রয়েছে। মাননীয়া দ্রৌপদী মুর্মু দেশের রাষ্ট্রপতি হবার পর হাসতে হাসতে বলেছিলাম – সিলা দাদা, এবার একজন আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ দেশের এক নম্বর নাগরিক হিসেবে মান্যতা পেয়েছেন। এবার তো তোমাদের পোয়া বারো! সিলা দাদা হেসে হেসেই জবাব দিলেন – এ তো বড়ো অনন্দের কথা ! এবার আমাদের সবার যদি ভালো হয় তাহলে সেটা আরও আনন্দের খবর হবে। তারপর একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন – গরীবের ভাগ্যের পালা বদল আর হবেনা।
আজ সকালে গিয়েছিলাম সিলা দাদার বাড়ি। এবার বহুদিন বাদে গেলাম। সেই জরাজীর্ণ ঘর। একটু ঠাঁই সেই সাহেবের কল্যাণে পাওয়া। এ তল্লাট ছেড়ে চলে যাবার সময় সিলা দাদাকে দিয়ে গিয়েছিলেন এই জমিটা। তাতেই কষ্টেসৃষ্টে মাথা গোঁজার একটা আস্তানা তৈরি করেছেন। তকতকে, নিকানো মেঠো উঠানের একপাশে দুটি পাতা উনোন। এখান থেকে ওখান থেকে কাঠ কুটোজোগাড় করে তাই দিয়েই রান্নার আয়োজন। সিলা দাদার ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে সবাই এখন রোজগেরে হয়ে উঠেছে। তাদের কল্যাণে বোতল ভরা গ্যাস উনুনের ব্যবস্থা হলেও অতীত জীবনের গেরস্থালির অভ্যাস এখনও পুরোপুরি ছাড়তে চাননি। আশপাশের বহু ইমারতের ভিত গড়ে তোলা মানুষটির বাড়ি এমন নড়বড়ে দেখে মনটা ভারী হয়ে ওঠে।
সময়ের সঙ্গে কিছু আক্ষেপ জমেছিল বুকের ভেতর, জমেছিল অনেক কষ্ট। ইদানিং শ্রমসাধ্য মাটি কাটার কাজ আর করতে পারতেন না। সরকারি বার্ধক্য ভাতার টাকায় টেনেটুনে চলতো সংসার। তবে তার জন্য কারও কাছে হাত পাততে দেখিনি তাকে। গায়ে গতরে খাটাখাটনি করতে পারছেন না বলে মনে জমছিল হতাশার মেঘ। আমার খুব ইচ্ছে ছিল সিলাদাদার কাছ থেকে এই জনপদের পুরনো দিনের গল্প শুনবো। অনেকবার তেমন অনুরোধ করলে একগাল হেসে বলতেন – আমি খুব সাধারণ মানুষ। আমার আবার গল্প কিগো দাদা! বড়ো আক্ষেপ রয়ে গেল, সেই গল্প আর শোনা হলোনা। সিলা দাদা আমাদের চেনা সীমানার বেড়া পেরিয়ে অনেক অনেক দূরের এক ঠিকানায় পাড়ি দিলেন। পেছনে ফেলে গেলেন কোদাল,গাঁইতি ,শাবল, বাঁশের তৈরি এক জোড়া ঝুড়ি আর এক বলিষ্ঠ নির্বিরোধী জীবন।
ভালো থেকো সিলা দাদা। তোমার নামে নামাঙ্কিত সিলার বাগান তোমাকে মনে রাখবে আগামীর দিনগুলোতেও।
ফেব্রুয়ারি ২০,২০২৬.
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।