মানেসরের নেহা ও পৃথিবীর বেড়ে ওঠা তাপমাত্রা।
আজ আপনাদের নেহার কথা শোনাবো। নেহার বয়স ২৫। নেহা এদেশের মাঠে ময়দানে, অফিস কাছারিতে , কল কারখানায় কর্মরতা লাখো লাখো মেয়েদের একজন। এই মুহূর্তে সে হরিয়ানা রাজ্যের মানেসর’ এ একটি বেশ বড়সড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ওয়্যারহাউসে কর্মরতা। মাসের শেষে নেহা যে মাইনে পায় তার থেকে নিজের খরচ বাঁচিয়ে কিছুটা পয়সাকড়ি বাড়িতে পাঠাতে পারে। সেই অর্থে তাঁর পরিবারের কিছুটা সাহায্য হয় বৈকি! গতবছর থেকেই নেহার কাজের পরিবেশ ক্রমশই যেন অসহনীয় হয়ে উঠেছে দ্রুতহারে বেড়ে যাওয়া উষ্ণতার কারণে। বিশ্ব উষ্ণায়ন এখন আর বিজ্ঞানীদের বিলাসী ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বিশ্ব উষ্ণায়ন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের এক জ্বলন্ত সমস্যা। বিগত কয়েকবছর ধরেই পৃথিবীর অন্যান্য অংশের সাথে তাল মিলিয়েই বাড়ছে এ দেশের তাপমাত্রা। দেশের উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত রাজ্যগুলোতে হিট ওয়েভ বা তাপ প্রবাহের দাপট বেড়ে চলেছে ধারাবাহিকভাবে। দেশের দক্ষিণে থাকা ভারত মহাসাগরের জল এরফলে আরও গরম হয়ে উঠে আবহাওয়ার চেনা ছন্দটাকে বিলকুল বদলে দিয়েছে শেষ কয়েক বছরে। এতে সমস্যা বেড়েছে বৈ কমেনি। বাড়ি ছেড়ে তাপদগ্ধ হরিয়ানায় একলা থাকা নেহা এসব অনেকটাই ঠেকে শিখেছে। নেহার মুখ থেকেই আমরা শুনবো তার কষ্টের রোজনামচা।
“ রোজ সকালে ৫ - ৩০ টা থেকে ৬-০০টার মধ্যেই আমাকে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়তে হয়। সাড়ে আটটার সময় আমার শিফট চালু হয়। তার আগেই আমাকে রান্না করে নিতে হয়। নিজের টুকিটাকি কাজগুলো সেরে নেবার তাড়া থাকে খুব। মানেসরের পরবাসে এই হলো আমার রোজকার একঘেয়ে রুটিন। এবছরের গ্রীষ্মকালীন মাসগুলোতে মানে ,জুন, জুলাই আর আগস্ট মাসে এসে এই রুটিন মেনে চলা আর সম্ভব হলোনা টানা তাপপ্রবাহের কারণে।এ সময় প্রায় প্রতিদিনই তাপমাত্রা ছিল ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কোনো কোনো দিন যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ভাবা যায়!”
একটা দোতলা বাড়িতে ভাড়া নিয়ে নেহা আর তার বন্ধু থাকে।গরম বেড়ে গেলে রাজ্যজুড়ে বাড়ে বিদ্যুতের চাহিদা, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় লোডশেডিং এর লাগাতার দাপট। কারেন্ট কখন যাবে তা কেউই জানেনা। সারাদিনের ধকল সহ্য করে রাতে যদি কেউ ঠিকমতো ঘুমাতে না পারে তাহলে শরীর টেকে? এভাবেই গরমের সময়টা কাটাতে বাধ্য হয় নেহা আর মহল্লার বাকি লোকজন। রাতটা যেমন তেমন করে কাটিয়ে সেই সকাল ছ’টায় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়তে হয় ওদের, ফিরতে হয় প্রতিদিনের অভ্যস্ত রুটিনে। ট্যাঙ্কের জল তেতে ওঠার আগেই স্নান সেরে নিতে হয়, কেননা বেলা বাড়লেই তা বক্রেশ্বরের উষ্ণ প্রস্রবণ হয়ে ওঠে। কোনো রকমে সামান্য কিছু মুখে গুঁজেই অফিসের জন্য বেরিয়ে পড়ে ওঁরা।
গরমের এই দিনগুলোতে শহরের সরব হতে অনেকটাই সময় লাগে। তাই রাস্তায় বেরিয়ে মনে হয় বুঝি কোনো জনহীন জনপদে এসে হাজির হয়েছে। নেহার বাড়ি থেকে অফিস ৩ কিমি দূরে। অটোরিকশা না মেলায় এই রাস্তাটুকু হেঁটেই যেতে হয়। সকাল হলেই সূয্যি ঠাকুর অকৃপণ তাপ বিলোতে শুরু করে দেন। তাই শরীরে মেখে পথ চলতে হয় নেহাদের। পথটুকু পেরোতে প্রায় আধঘন্টা সময় লেগে যায়। গোটা পথের কোথাও ক্ষণিকের জন্য একটু জিরিয়ে নেবার সুযোগ নেই।বেবাক এলাকা বিলকুল সুনশান । ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে ফ্যাক্টরির ভেতরে ঢুকলে অবশ্য কিছুটা স্বস্তি মেলে।
বাইরের তুলনায় ফ্যাক্টরির ভেতরে খানিকটা ঠান্ডা। ঢকঢকিয়ে বেশ করে জল গলায় ঢেলে কাজে লেগে পড়ে তারা।
নেহার কাহিনিকে আপাতত সরিয়ে রেখে আমরা বরং বিষয়টাকে একটু ছড়িয়ে দিই সমস্যার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে। ভারতবর্ষ ক্রান্তীয় মণ্ডলের দেশ,ফলে গরমের প্রকোপ এই মুলুকে অনেকটাই বেশি। মুশকিল হলো পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় গরমের প্রকোপ , বিশেষকরে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা ক্রমশই আমাদের চেনা অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। এই বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রার কারণে ভারতবর্ষ সহ পৃথিবীর ক্রান্তীয় অঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের জীবন বিশেষ করে যারা এই তেতে আগুন গরম হয়ে ওঠা বাইরে থাকতে বাধ্য হন সেই সব শ্রমজীবী মেহনতি মানুষেরা এক অভূতপূর্ব শরীরী বিপন্নতার শিকার। প্রশ্ন হলো কেন এবং কীভাবে ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে যখন একজন মানুষকে এমন অসহ্য গরমের মধ্যে থেকে কাজ করতে হয় তখন তার শরীর যন্ত্র দেহকে ঠাণ্ডা করতে দেহের ত্বকের অংশে অতিরিক্ত রক্ত সঞ্চালন করে। এই প্রয়াসের প্রভাব এসে পড়ে মস্তিষ্ক সহ দেহের অন্যান্য আভ্যন্তরীণ অঙ্গ যেমন হৃৎপিণ্ড ও কিডনির ওপর। এই বাড়তি চাপ সইতে হয় বলে এগুলোর ওপর বিপর্যয়ের লক্ষণচিহ্ন প্রকাশ পেতে থাকে। এমনই অভিমত বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য বিভাগের গবেষক জোনাথন লী’র। এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে যে স্বল্প সংখ্যক বিজ্ঞানী আমাদের শরীরের ওপর দীর্ঘস্থায়ী তাপদাহের প্রভাব নিয়ে নিরলসভাবে গবেষণা করে চলেছেন জোনাথন লী তাঁদের মধ্যে একেবারে প্রথম সারির গবেষক। আমাদের মধ্যে এমন বহুসংখ্যক মানুষ আছেন যাঁদের রুটি রুজির জন্য বাধ্য হয়ে তীব্র তাপীয় পরিবেশের মধ্যে কাজ করতে হয়। সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এইসব মানুষেরা আরও প্রতিকুল তাপীয় পরিবেশের সঙ্গে যুঝতে বাধ্য হচ্ছেন ,ফলে এইসব মানুষের জীবনের ঝুঁকি বেড়ে চলেছে। লী’র গবেষণা থেকে জানা গেছে এই সত্যটি।
গত মে মাসে প্রকাশিত এক সমীক্ষা রিপোর্ট থেকে জানা গেছে যে, পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ কমপক্ষে ৩০ দিন অসহনীয় তাপীয় পরিবেশের মধ্যে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। সমীক্ষা রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে যে ১৯৯১- ২০২০ এই তিন দশকের সময়সীমায় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই বেশি হওয়ায় তাপীয় প্রতিক্রিয়ায় অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ প্রভাবিত হয়েছেন। ফলে তার প্রভাব পড়েছে তাদের রুজি রোজগারের ওপর । ফলে স্রেফ টিকে থাকার জন্যও মানুষকে অনেক কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
নেহার মতো উষ্ণ ক্রান্তীয় মণ্ডলের অধিবাসীদের অনেক বেশি সংখ্যায় এমন অসহ্য তাপদাহের শিকার হতে হয় বাধ্য হয়ে। এদের মধ্যে তাৎক্ষণিক শারীরিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ডি- হাইড্রেশন এবং হিট স্ট্রোক। সদগতি সিনেমার সেই অন্ত্যজ বর্গের হতভাগ্য মানুষটির কথা স্মরণ করুন। কীভাবে অত্যধিক তাপমাত্রায় কাজ করতে বাধ্য হওয়ায় প্রাণ হারাতে হয়েছিল। এমন ঘটনা গ্রামীণ ভারতের অধিবাসীদের কাছে কিছু নতুন অভিজ্ঞতা নয় । এসব খবর বিচ্ছিন্ন বা স্বাভাবিক বলেই মেনে নিতে আমরা সবাই কেমন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। যে সমস্ত মানুষকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে কাত কাজ করতে হয়, তাঁদের মধ্যে এমন সমস্যার প্রকোপ অনেক বেশি। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণে পরিসংখ্যানের অভাবে এই সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারা বেশ কঠিন। এই অসহনীয় তাপীয় পরিবেশের মধ্যে যারা একরকম বাধ্য হন সময় কাটাতে তাদের মধ্যে এই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেকটাই বেশি। - হকার, রাস্তার ধারে বসে থাকা সবজি বা অন্যান্য বিক্রেতারা,ইট ভাটায় কাজ করা পুরুষ ও মহিলা শ্রমিকেরা , নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সাধারণ শ্রমিকেরা - এরা বাধ্য হয়েই তাপদাহের মধ্যে বাইরের খোলা আকাশের নিচে বিভিন্ন শ্রমসাধ্য কাজ করেন। উষ্ণায়নের ফলে আবহমণ্ডলের ভারসাম্যে যে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে,এইসব খেটেখাওয়া মানুষেরা তার বিরূপ ফলভোগী। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে বিকাশমান দেশগুলোতে এই ক্রমশই বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রার কারণে বহুসংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্যহানির পাশাপাশি কর্মহানিও ঘটেছে। ভারতের মতো কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস প্রভৃতি দেশেও এমন প্রবণতা লক্ষ করা গিয়েছে। আগামীদিনে এই বিষয়টি একটি দ্রুত বর্ধনশীল সমস্যায় পরিণত হতে চলেছে।
তা হলে নিষ্কৃতির উপায় কী হবে? উত্তর দেওয়া বেশ কঠিন। কেন বলছি এমন কথা? সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া বছরটিকে বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেছেন সর্বাধিক উষ্ণ বছর হিসেবে ।এই মুহূর্তে যখন বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রার ভয়ঙ্কর পরিণতি নিয়ে কথা বলছি তখন অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাংশের ভিক্টোরিয়া প্রদেশের একটা বড়সড় এলাকা জুড়ে চলছে বুশ্ ফায়ারের দাপাদাপি। ভিক্টোরিয়ার তাপমাত্রা এখন ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে। বিষয়টিকে আকস্মিক ঘটনা বলে ছেড়ে দিলেও এই ঘটনার পরবর্তী প্রক্রিয়াগুলোকে কখনোই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের বাসভূমি ক্রমশই গরম হয়ে উঠছে। এর ফলে বাড়ছে ভূক্ত ভোগীদের সংখ্যা। উদ্বেগের কথা হলো এই যে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের শতকরা ৯০ ভাগই হলো উন্নতিশীল গ্লোবাল সাউথের অধিবাসী। আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা সহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর বহুসংখ্যক মানুষ, যাঁরা রুটি রুজির প্রয়োজনেই বাইরের রোদ জল বৃষ্টির মধ্যে কাজ করতে একরকম বাধ্য হন তাদের সুরক্ষার জন্য গভীর চিন্তা ভাবনা শুরু করার দাবি উঠছে আজ আন্তর্জাতিক স্তরে। বলা হচ্ছে এই সব খেটে খাওয়া মানুষের সুরক্ষার কথা আরও আন্তরিকভাবে ভাবতে হবে সংশ্লিষ্ট সবমহলকে। উন্নত দেশগুলোতে এমন মানুষদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ভাবা হয়। প্রশ্ন হলো তাহলে কেনো আমরা এই ব্যাপারে পিছিয়ে থাকবো। সরকার যখন by the people, of the people তখন for the people's sake সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না কেন?
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।