এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  সমাজ

  • কার্বি বোড়ো সমস্যা .. সাম্প্রতিক সমস্যার প্রেক্ষিত আলোচনা 

    Tuhinangshu Mukherjee লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | সমাজ | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩৪ বার পঠিত
  • ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্র-গঠন, জাতিসত্তা নির্মাণ, স্বায়ত্তশাসন এবং পরিচয়-রাজনীতির এক জটিল পরীক্ষাগার। ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক পুনর্গঠন, স্বাধীনতার পর কেন্দ্র-রাজ্যের সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস, ভাষাভিত্তিক প্রাদেশিকীকরণ, এবং উন্নয়নের অসম বণ্টন—এই সবকিছুর মধ্যে দিয়ে উত্তর-পূর্বের নানা জাতিসত্তা তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য সংগ্রাম করে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে কার্বি আংলং ও বোড়োল্যান্ড—দুটি অঞ্চল এবং তাদের আন্দোলন—সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের জাতিগত রাজনীতির কাঠামোয় নতুন করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।
     
    কার্বি আংলং এবং বোড়োল্যান্ড—উভয় ক্ষেত্রেই দাবি ছিল স্বায়ত্তশাসন, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের। কিন্তু এই দাবিগুলি কখনোই বিচ্ছিন্ন নয়; বরং বৃহত্তর উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজনৈতিক-সামাজিক পরিসরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নাগা, মিজো, কুকি প্রভৃতি জাতিসত্তার দীর্ঘ আন্দোলনের ঐতিহাসিক ছায়া যেমন এই দাবিগুলিকে প্রভাবিত করেছে, তেমনি অসমের অভ্যন্তরীণ ভাষা ও ভূমি-রাজনীতিও এগুলির রূপ নির্ধারণ করেছে। ফলে কার্বি ও বোড়ো আন্দোলন কেবল দুটি ‘আঞ্চলিক অশান্তি’ নয়; বরং এগুলি ভারতীয় ফেডারাল কাঠামোর সীমা, ষষ্ঠ তফসিলের কার্যকারিতা, এবং জাতিসত্তাভিত্তিক রাজনীতির সম্ভাবনা ও সংকটের এক সমগ্র পাঠ।

    স্বাধীনতার পরপরই ভারতীয় রাষ্ট্র একদিকে ভাষাভিত্তিক প্রাদেশিক পুনর্গঠন শুরু করে (১৯৫৬ সালের রাজ্য পুনর্গঠন আইন), অন্যদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উপজাতীয় স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে একটি পৃথক সাংবিধানিক ব্যবস্থা—ষষ্ঠ তফসিল—গৃহীত হয়। এই তফসিল অনুসারে জেলা পরিষদগুলিকে কিছু প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হলেও বাস্তবে আর্থিক ও নির্বাহী ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক দ্বৈততা এবং রাজ্য সরকারের সঙ্গে ক্ষমতার সংঘাত বহু ক্ষেত্রে অসন্তোষের জন্ম দেয়। কার্বি আংলং স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ (Karbi Anglong Autonomous Council, প্রতিষ্ঠা ১৯৫২; পরবর্তীতে ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত) এবং বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল (Bodoland Territorial Council, ২০০৩; ২০২০-এ পুনর্গঠিত Bodoland Territorial Region) — উভয়ই এই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রতিষ্ঠান, কিন্তু উভয়ের আন্দোলনই এই কাঠামোর সীমা অতিক্রমের দাবি তুলেছে।
    ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, কার্বি ও বোড়ো—উভয়ই অসমের ‘পাহাড়ি’ ও ‘সমতল’ উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। ঔপনিবেশিক প্রশাসন অসমে ‘Excluded’ ও ‘Partially Excluded Areas’ শ্রেণিবিভাগ তৈরি করে পাহাড়ি অঞ্চলে প্রত্যক্ষ প্রাদেশিক হস্তক্ষেপ সীমিত রাখে। এই পৃথকীকরণ একদিকে উপজাতীয় সমাজকে মূলধারার রাজনীতির বাইরে রাখে, অন্যদিকে তাদের মধ্যে ‘স্বতন্ত্র জাতিসত্তা’ ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। স্বাধীনতার পর নাগা আন্দোলনের উত্থান (১৯৫০-এর দশক), মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের সশস্ত্র বিদ্রোহ (১৯৬৬), এবং পরবর্তী কালে মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড রাজ্যের সৃষ্টি—এই ঘটনাবলি উত্তর-পূর্বে জাতিসত্তাভিত্তিক রাজনীতির এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। কার্বি ও বোড়ো রাজনৈতিক নেতৃত্বও এই প্রক্রিয়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে নিজেদের সংগঠিত করে। বোড়ো আন্দোলনের ক্ষেত্রে ১৯৮৭ সালে অল বোড়ো স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (ABSU)-এর নেতৃত্বে ‘Divide Assam 50-50’ স্লোগান যে মাত্রা পায়, তা একদিকে অসম আন্দোলনের (১৯৭৯–৮৫) ভাষা-ভূমি রাজনীতির প্রতিক্রিয়া, অন্যদিকে বোড়ো জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক বঞ্চনার অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। ১৯৯৩ সালের বোড়োল্যান্ড স্বায়ত্তশাসিত কাউন্সিল (BAC) চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যর্থতা, ২০০৩ সালের বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল গঠন, এবং ২০২০ সালের তৃতীয় বোড়ো শান্তিচুক্তি—এই ধারাবাহিকতা দেখায় যে কেবল প্রশাসনিক পুনর্গঠন নয়, ভূমি-অধিকার, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, এবং অন্তর্গত জাতিগত বিভাজন আন্দোলনকে বারবার উস্কে দিয়েছে।
    সমকালীন পরিস্থিতিতে—২০২০ সালের বোড়ো চুক্তির পর বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল রিজিয়ন (BTR)-এর পুনর্গঠন এবং ২০২১ সালের কার্বি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের বিস্তার—রাজনৈতিক স্থিতি কিছুটা প্রতিষ্ঠিত হলেও ভূমি-অধিকার, আন্তঃজাতিগত উত্তেজনা (বিশেষত বোড়ো-মুসলিম, বোড়ো-আদিবাসী, কার্বি-ডিমাসা সম্পর্ক), এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ফলে ‘শান্তি’ এখানে প্রক্রিয়াগত, কিন্তু কাঠামোগত সমাধান এখনও অসম্পূর্ণ।
    ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক বিন্যাস – সমস্যার ভিত্তি
    কার্বি আংলং ও বোরোল্যান্ড প্রশ্নকে বুঝতে গেলে কেবল স্বাধীনোত্তর রাজনীতির দিকে তাকালেই চলবে না; এর শিকড় নিহিত ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক বিন্যাসে। উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি ও সমতল অঞ্চলকে ব্রিটিশ শাসন যে পদ্ধতিতে পৃথকীকরণ করেছিল, সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তই পরবর্তী কালে জাতিসত্তাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তি নির্মাণ করে।
    ১৮২৬ সালের ইয়ান্ডাবু সন্ধির মাধ্যমে অসম ব্রিটিশ শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশ প্রশাসন উপলব্ধি করে যে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সমতল ও সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলগুলির সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো এক নয়। ফলে ১৮৭৪ সালে অসমকে পৃথক চিফ কমিশনারশিপে পরিণত করার পর পাহাড়ি অঞ্চলগুলিকে প্রশাসনিকভাবে পৃথকভাবে পরিচালনার প্রবণতা শুরু হয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন (Government of India Act, 1935) অনুসারে উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু পাহাড়ি অঞ্চলকে “Excluded Areas” এবং “Partially Excluded Areas” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই শ্রেণিবিভাগের অধীনে গভর্নর সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেন; প্রাদেশিক আইনসভা বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা সেখানে সীমিত ছিল। বর্তমান কার্বি আংলং (তৎকালীন Mikir Hills) এবং North Cachar Hills অঞ্চল এই বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই নীতির অন্তর্নিহিত যুক্তি ছিল—উপজাতীয় সমাজকে তথাকথিত ‘মূলধারার’ প্রভাব থেকে রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে এটি এক ধরনের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে। উপজাতীয় সমাজ প্রশাসনিকভাবে আলাদা থাকলেও উন্নয়ন, শিক্ষা, অবকাঠামো ও প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়ে। একই সঙ্গে এই পৃথকীকরণ তাদের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তার ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
    স্বাধীনতার পর ভারতের সংবিধান প্রণেতারা উত্তর-পূর্বের বিশেষ পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে একটি পৃথক সাংবিধানিক কাঠামো গঠন করেন—সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল। ১৯৫০ সালে কার্যকর এই তফসিলের অধীনে অসমের নির্দিষ্ট উপজাতীয় এলাকায় স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ গঠনের বিধান রাখা হয়। কার্বি আংলং (তৎকালীন United Mikir and North Cachar Hills District) ১৯৫২ সালে একটি স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ পায়। ষষ্ঠ তফসিল অনুসারে এই পরিষদগুলিকে ভূমি-ব্যবস্থাপনা, বন (সংরক্ষিত বন ব্যতীত), প্রথাগত আইন, সামাজিক রীতি, স্থানীয় কর আরোপ, এবং কিছু প্রশাসনিক বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
    তবে এখানেই একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব ছিল। যে সমস্যাগুলি উঠে আসতে থাকে সেগুলির মূল ভিত্তি হল
    • পরিষদগুলির আর্থিক ক্ষমতা সীমিত।
    • রাজ্য সরকারের সঙ্গে প্রশাসনিক দ্বৈততা ছিল।
    • আইন প্রণয়ন ক্ষমতা গভর্নরের অনুমোদনসাপেক্ষ।
    অর্থাৎ, সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকলেও পূর্ণ রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের সুযোগ ছিল না। এই সীমাবদ্ধতাই পরবর্তী কালে অসন্তোষের উৎস হয়ে ওঠে।
    ১৯৫০-এর দশকে নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল (NNC) স্বাধীনতার দাবি তোলে। ১৯৬৩ সালে নাগাল্যান্ড পৃথক রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৬৬ সালে মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট (MNF) সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে; ১৯৮৬ সালের মিজো শান্তিচুক্তির মাধ্যমে ১৯৮৭ সালে মিজোরাম পূর্ণ রাজ্য হয়। এই ঘটনাবলি উত্তর-পূর্বে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে—দীর্ঘ আন্দোলন ও রাজনৈতিক চাপের ফলে সাংবিধানিক পুনর্গঠন সম্ভব। বোড়ো ও কার্বি নেতৃত্ব এই অভিজ্ঞতা গভীরভাবে লক্ষ্য করে। বিশেষত পাহাড়ি ও সমতল উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ধারণা শক্তিশালী হয় যে, ষষ্ঠ তফসিলভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনে পৃথক রাজ্য বা অধিকতর ক্ষমতাসম্পন্ন স্বশাসিত অঞ্চল দাবি করা যেতে পারে।
    ১৯৬০ সালে অসম সরকার অসমিয়া ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিলে সমতল ও পাহাড়ি উভয় অঞ্চলে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পাহাড়ি জেলাগুলি—যেমন খাসি-জয়ন্তিয়া ও গারো পাহাড়—পৃথক রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, যার ফলস্বরূপ ১৯৭২ সালে মেঘালয়ের সৃষ্টি হয়। এই প্রেক্ষাপটে সমতল অঞ্চলের বোড়ো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন জোরালো হয়। ১৯৬৭ সালে অল বোড়ো স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (ABSU) গঠিত হয়। ১৯৮০-এর দশকে, বিশেষত ১৯৮৭ সালে, ABSU “Divide Assam 50-50” স্লোগান তুলে পৃথক বোরোল্যান্ড রাজ্যের দাবি জানায়। অন্যদিকে কার্বি আংলংয়ে ১৯৭০ সালে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে Mikir Hills-এর নাম পরিবর্তন করে “Karbi Anglong” রাখা হয়। ২০১৬ সালে West Karbi Anglong জেলা পৃথক হয়। কিন্তু প্রশাসনিক নামবদল বা সীমান্ত পুনর্গঠন কার্বি রাজনৈতিক দাবিকে প্রশমিত করতে পারেনি।
    ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে: কার্বি আংলং (বর্তমান দুই জেলা মিলিয়ে) মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬.৬ লক্ষের কিছু বেশি; উপজাতি জনগোষ্ঠী প্রায় ৫৬–৬০ শতাংশ। বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল এরিয়া ডিস্ট্রিক্ট (বর্তমান BTR-এর চার জেলা) মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩১ লক্ষেরও বেশি; বোড়ো জনগোষ্ঠী সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়, বরং বহু অঞ্চলে সংখ্যালঘু। এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি জটিলতা নির্দেশ করে। কার্বি অঞ্চলে যদিও কার্বিরা প্রধান উপজাতি, সেখানে ডিমাসা, কুকি, তিভা ও অন্যান্য গোষ্ঠীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। BTR অঞ্চলে বোড়ো জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ৩০–৩৫ শতাংশ। ফলে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ‘কে সংখ্যাগরিষ্ঠ’—এই বিতর্ক বারবার সামনে আসে। ভূমি-অধিকার, বন-সম্পদ, অভিবাসন (বিশেষত ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম কৃষক সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক বসতি), এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন—এই সবকিছু মিলিয়ে জাতিগত উত্তেজনার ভিত্তি নির্মিত হয়।
    ষষ্ঠ তফসিলভিত্তিক পরিষদগুলির কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। আর্থিক বরাদ্দের জন্য রাজ্য সরকারের উপর নির্ভরশীলতা, প্রশাসনিক ক্ষমতার দ্বৈততা, এবং পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের ক্ষমতার সংঘাত—এই সবকিছু আন্দোলনের পুনরুত্থান ঘটায়। কার্বি আংলংয়ে ১৯৯০-এর দশকে United People’s Democratic Solidarity (UPDS) এবং পরে Karbi Longri NC Hills Liberation Front (KLNLF) সশস্ত্র আন্দোলনে যুক্ত হয়।
    বোড়ো অঞ্চলে National Democratic Front of Bodoland (NDFB) ও Bodo Liberation Tigers (BLT) সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেয়। অর্থাৎ, সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসন কাঠামো একদিকে প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেও, তা পূর্ণ রাজনৈতিক সন্তুষ্টি দিতে ব্যর্থ হয়।
    বোড়োল্যান্ড
    বোড়ো জনগোষ্ঠী তিব্বত-বর্মী ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত একটি বৃহৎ নৃগোষ্ঠী, যাদের বিস্তৃতি অসমের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার উত্তর ও মধ্যভাগে। ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক লেখায় বোড়োদের “Plains Tribes” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে তাদের বিস্তৃত উপনাম ও উপগোষ্ঠী—কচারি, ডিমাসা, সোনোয়াল, রাভা প্রভৃতি—মিলে একটি বৃহত্তর বোড়ো-কচারি ঐতিহ্য গড়ে তোলে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রিটিশ ভূমি-নীতির ফলে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় কৃষি সম্প্রসারণ ঘটে। বিশেষত ১৯০১–১৯৩১ সময়কালে পূর্ববঙ্গ থেকে কৃষিজীবী মুসলিম জনগোষ্ঠীর অভিবাসন এই অঞ্চলের জনসংখ্যা-গঠনে পরিবর্তন আনে। ব্রিটিশ প্রশাসক সি.এস. মুলান (C.S. Mullan) ১৯৩১ সালের জনগণনা প্রতিবেদনে একে “land-hungry immigrants” প্রবাহ বলে বর্ণনা করেন। এই পরিবর্তন বোড়োদের মধ্যে ভূমি-অধিকার ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার পর অসমে ভাষাভিত্তিক ও আঞ্চলিক রাজনীতি তীব্র হয়। বোড়োরা নিজেদের ভাষার স্বীকৃতি ও শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তির দাবিতে সংগঠিত হতে শুরু করে। ১৯৬৭ সালে অল বোড়ো স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (ABSU) প্রতিষ্ঠিত হয়—যা পরবর্তী কালে রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠে।
    ১৯৭৯–৮৫ সালের অসম আন্দোলন, যা মূলত বিদেশি অনুপ্রবেশের প্রশ্নে সংগঠিত হয়েছিল, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় জাতিগত রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দেয়। অসম আন্দোলনের ফলে ১৯৮৫ সালে অসম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও বোড়োদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয় যে তাদের বিশেষ রাজনৈতিক দাবি উপেক্ষিত হয়েছে।১৯৮৭ সালে ABSU-র সভাপতি উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মের নেতৃত্বে পৃথক “বোরোল্যান্ড” রাজ্যের দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হয়। দাবির মূল স্লোগান ছিল—“Divide Assam 50-50”—অর্থাৎ অসমকে দুটি সমান ভাগে বিভক্ত করে উত্তরাঞ্চলে পৃথক বোরোল্যান্ড গঠন। আন্দোলনের দাবিগুলির মধ্যে ছিল:
    • পৃথক রাজ্য,
    • বোড়ো ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি,
    • ভূমি-অধিকার সুরক্ষা,
    • উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার।
    এই পর্যায়ে আন্দোলন গণআন্দোলনের রূপ নেয়—বিক্ষোভ, অবরোধ, এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। একই সময়ে সশস্ত্র সংগঠন National Democratic Front of Bodoland (NDFB) গঠিত হয় (১৯৮৬), যা পরবর্তীকালে বিচ্ছিন্নতাবাদী অবস্থান গ্রহণ করে। ১৯৯৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্র, অসম সরকার ও ABSU-র মধ্যে প্রথম বোড়ো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে Bodoland Autonomous Council (BAC) গঠিত হয়। তবে এই চুক্তির দুটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা ছিল:
    ১. নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়নি।
    ২. সাংবিধানিক স্বীকৃতি ছিল না; এটি ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
    ফলে বাস্তবে BAC পূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। এই ব্যর্থতা আন্দোলনের নতুন পর্যায়ের জন্ম দেয়। ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে সশস্ত্র সংঘর্ষ তীব্র হয়। NDFB এবং Bodo Liberation Tigers (BLT) সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে। এই সময়ে বোড়ো ও অ- বোড়ো সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংসতার ঘটনাও ঘটে—বিশেষত ১৯৯৩, ১৯৯৬ ও ১৯৯৮ সালে কোকরাঝার ও সংলগ্ন অঞ্চলে জাতিগত সংঘর্ষে বহু মানুষের মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুতি ঘটে। ২০০৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্র, অসম সরকার ও BLT-র মধ্যে দ্বিতীয় বোড়ো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে Bodoland Territorial Area District (BTAD) গঠিত হয় এবং Bodoland Territorial Council (BTC) প্রতিষ্ঠিত হয়।
    BTAD চারটি জেলা নিয়ে গঠিত হয়:
    • কোকরাঝার
    • চিরাং
    • বাকসা
    • উদালগুরি
    BTC-কে ৪০টি নির্বাচিত ও ৬টি মনোনীত সদস্যসহ একটি পরিষদ হিসেবে গঠন করা হয়। পরিষদকে ৪০টিরও বেশি বিষয়ের উপর প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া হয়—যার মধ্যে ছিল কৃষি, শিক্ষা (প্রাথমিক স্তর), বন (সংরক্ষিত বন ব্যতীত), গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ইত্যাদি। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা ছিল—BTAD অঞ্চলে বোড়োরা মোট জনসংখ্যার পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী BTAD অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩১ লক্ষের বেশি; বোড়ো জনগোষ্ঠীর অনুপাত আনুমানিক ৩০–৩৫ শতাংশ। ফলে অ- বোড়ো (রাজবংশী, মুসলিম, আদিবাসী, রাভা প্রভৃতি) জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকে। ২০১২ সালে কোকরাঝার ও ধুবড়ি জেলায় বোড়ো ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষে প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় বলে সরকারি তথ্য প্রকাশিত হয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে NDFB (Songbijit faction) এর সশস্ত্র হামলায় ৭০ জনেরও বেশি আদিবাসী গ্রামবাসী নিহত হন। এই ঘটনাগুলি প্রমাণ করে যে প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন থাকা সত্ত্বেও আন্তঃজাতিগত সম্পর্ক স্থিতিশীল হয়নি। ২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি কেন্দ্র, অসম সরকার, ABSU এবং NDFB-র বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে তৃতীয় বোড়ো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে BTAD-এর নাম পরিবর্তন করে Bodoland Territorial Region (BTR) করা হয়।
    চুক্তির প্রধান দিকগুলি:
    • পরিষদের ক্ষমতা বৃদ্ধি;
    • আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধি (প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা);
    • বোড়ো ভাষাকে দেবনাগরী লিপিতে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্তির পুনরায় নিশ্চয়তা (বোড়ো ভাষা ২০০৩ সালে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল);
    • সশস্ত্র কর্মীদের পুনর্বাসন।
    ২০২০–২১ সালে প্রায় ১৬০০-র বেশি সশস্ত্র কর্মী আত্মসমর্পণ করেন বলে সরকারি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে BTR-এ নির্বাচিত পরিষদ কার্যকর রয়েছে। তবে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলি রয়ে গেছে:
    • ভূমি-অধিকার ও বনভূমি প্রশ্ন,
    • অ- বোড়ো সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব,
    • উন্নয়নের বৈষম্য,
    • অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন (UPPL, BPF প্রভৃতি দলের প্রতিযোগিতা)।

    কার্বি আংলং  
    বর্তমান কার্বি আংলং অঞ্চল ঔপনিবেশিক যুগে “মিকির হিলস” নামে পরিচিত ছিল। ১৯৫১ সালে স্বাধীন ভারতের প্রশাসনিক পুনর্গঠনের সময় এটি “United Mikir and North Cachar Hills District” হিসেবে গঠিত হয়। ১৯৫২ সালে ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ সালে মিকির হিলসের নাম পরিবর্তন করে “Karbi Anglong” রাখা হয়—যা স্থানীয় জাতিসত্তার আত্মপরিচয়ের দাবিকে প্রতিফলিত করে। ২০১৬ সালে জেলার পশ্চিমাংশ পৃথক হয়ে “West Karbi Anglong” জেলা গঠিত হয়।
    ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে (বর্তমান দুই জেলা মিলিয়ে) মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ৬.৬ লক্ষের কিছু বেশি। উপজাতীয় জনগোষ্ঠী প্রায় ৫৬–৬০ শতাংশ; তবে এই উপজাতীয় শ্রেণির মধ্যেও কার্বি ছাড়াও ডিমাসা, কুকি, রেংমা নাগা, তিভা, গারো প্রভৃতি গোষ্ঠী রয়েছে। ফলে কার্বি আংলং একটি একজাতিক নয়, বরং বহুজাতিক পাহাড়ি অঞ্চল। Karbi Anglong Autonomous Council (KAAC) ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে ভূমি, বন (সংরক্ষিত বন ব্যতীত), প্রথাগত আইন, স্থানীয় কর, শিক্ষা (প্রাথমিক), কৃষি প্রভৃতি ক্ষেত্রে ক্ষমতা পায়। পরিষদে ২৬ জন নির্বাচিত ও ৪ জন মনোনীত সদস্য থাকার বিধান রয়েছে (সময়ের সঙ্গে সদস্যসংখ্যায় পরিবর্তন হয়েছে)।
    তবে বাস্তবে কয়েকটি সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট ছিল:
    • আর্থিক বরাদ্দের জন্য অসম সরকারের উপর নির্ভরশীলতা;
    • প্রশাসনিক বিষয়গুলিতে রাজ্য সরকারের সমান্তরাল হস্তক্ষেপ;
    • গভর্নরের অনুমোদন ছাড়া আইন কার্যকর না হওয়া;
    • ভূমি-সংক্রান্ত ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগে জটিলতা।
    এই কাঠামো পাহাড়ি সমাজকে আংশিক স্বায়ত্তশাসন দিলেও পূর্ণ রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ দেয়নি। ফলে ষষ্ঠ তফসিলের ভেতরে থেকেই অধিকতর ক্ষমতার দাবি উত্থাপিত হতে থাকে।
    ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে কার্বি নেতৃত্ব পৃথক “Autonomous State” গঠনের দাবি তোলে—সংবিধানের ২৪৪(ক) অনুচ্ছেদের অধীনে। ১৯৮৬–৮৭ সময়ে All Party Hill Leaders’ Conference (APHLC)-এর প্রভাব হ্রাস পেলেও কার্বি ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলি পৃথক প্রশাসনিক মর্যাদার দাবিতে সক্রিয় হয়। ১৯৯০-এর দশকে United People’s Democratic Solidarity (UPDS) নামে একটি সশস্ত্র সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। তাদের প্রধান দাবি ছিল—কার্বি আংলং ও উত্তর কাছাড় (বর্তমান ডিমা হাসাও) নিয়ে পৃথক স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য। একই সময়ে Karbi Longri North Cachar Hills Liberation Front (KLNLF) গঠিত হয় (প্রায় ২০০৪ সালে সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়)।এই সময়ে কার্বি ও ডিমাসা সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ২০০৫ সালে কার্বি-ডিমাসা সংঘর্ষে প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু এবং কয়েক হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটে বলে বিভিন্ন সরকারি ও সংবাদ প্রতিবেদন উল্লেখ করে। এই সহিংসতা প্রমাণ করে যে পাহাড়ি অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন প্রশ্ন কেবল কেন্দ্র-রাজ্য দ্বন্দ্ব নয়; এটি আন্তঃজাতিগত সম্পর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
    ২০১১ সালের ২৫ নভেম্বর কেন্দ্র, অসম সরকার এবং UPDS-এর মধ্যে একটি ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির প্রধান দিকগুলি ছিল:
    • Karbi Anglong Autonomous Council-এর ক্ষমতা বৃদ্ধি;
    • পরিষদের নাম পরিবর্তন করে “Karbi Anglong Autonomous Territorial Council” করার প্রস্তাব (যদিও নামবদল সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি);
    • প্রায় ১০০০-র বেশি সশস্ত্র কর্মীর আত্মসমর্পণ;
    • উন্নয়নমূলক প্যাকেজ ঘোষণা (প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ)।
    তবে এই চুক্তি পৃথক রাজ্যের দাবিকে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে একটি অংশ অসন্তুষ্ট থেকে যায়।
    ২০২১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কেন্দ্র, অসম সরকার এবং পাঁচটি কার্বি সশস্ত্র সংগঠনের (যার মধ্যে KLNLF-সহ একাধিক গোষ্ঠী ছিল) মধ্যে একটি নতুন শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১০০০-র বেশি সশস্ত্র কর্মী আত্মসমর্পণ করেন।
    চুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য:
    • ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে পরিষদের ক্ষমতা সম্প্রসারণ;
    • ১০০০ কোটি টাকার বিশেষ উন্নয়ন প্যাকেজ ঘোষণা (পাঁচ বছরে ব্যয়যোগ্য);
    • প্রশাসনিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস;
    • পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কর্মসূচি।
    এই চুক্তির পর সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে পৃথক রাজ্যের দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহৃত হয়নি; বরং তা রাজনৈতিক আলোচনার স্তরে রয়ে গেছে।
    কার্বি আংলংয়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কার্বিরা কি নিখুঁত সংখ্যাগরিষ্ঠ? যদিও উপজাতীয় জনগোষ্ঠী মিলিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু কার্বিরা এককভাবে পুরো জেলার ৫০ শতাংশের বেশি নয় বলে বহু গবেষণা নির্দেশ করে। ফলে পরিষদ-রাজনীতিতে অন্যান্য উপজাতি ও অ-উপজাতি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই জটিলতা বোড়োল্যান্ড অঞ্চলের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনীয়—যেখানে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের অভ্যন্তরে প্রধান দাবিদার জাতিসত্তা পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। কার্বি আংলং ভৌগোলিকভাবে নাগাল্যান্ড ও ডিমা হাসাও জেলার সংলগ্ন। নাগা শান্তি-প্রক্রিয়া ও “Greater Nagalim” দাবির প্রেক্ষাপটে কার্বি আংলংয়ের কিছু অংশ নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। একইভাবে কুকি ও ডিমাসা সংগঠনগুলির পৃথক স্বায়ত্তশাসনের দাবি পাহাড়ি রাজনীতিকে আরও জটিল করেছে।
    ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে Karbi Anglong ও West Karbi Anglong-এ সংঘটিত সংঘাতটি শুধুমাত্র পুরনো দাবির পুনরুত্থান ছিল না — এটি একটি তীব্র সামাজিক সংঘর্ষ হিসেবে জেলা রাজনীতি এবং রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে। মূলত স্থানীয় সম্প্রদায় ও প্রশাসনের মধ্যে বিজাতীয় সম্প্রদায়, অবৈধ বসতি ও স্বীকৃতি সংক্রান্ত প্রশ্নটিই কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে আর একবার সামনে এসেছে। স্থানীয় একটি ভূমি সংশ্লিষ্ট প্রতিবাদ শুরু হয় যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠী দাবী করছিল যে Village Grazing Reserve (VGR) ও Professional Grazing Reserve (PGR) — সংরক্ষিত ভূমি হিসেবে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে থাকা জমিগুলোতে “অনুপ্রবেশ” হয়েছে এবং তা সুরক্ষিত নীতি অনুসারে উৎখাত করতে হবে। এই দাবিকে কেন্দ্র করে শিশু, প্রবীণ, ছাত্ৰ ও সাধারণ মানুষ মিলিয়ে বৃহৎ বিক্ষোভ উন্নত হয়, বিশেষত কেরোনি (Kheroni) বাজার এলাকা থেকেই। বিক্ষোভ সামলাতে নিরাপত্তা বাহিনীকে মোতায়েন করলেও পরিস্থিতি শিথিল হওয়ার বদলে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্র হয় — ফলস্বরূপ দোকান, বসতঘর এবং ব্যবসায়িক স্থাপনা আহত ও ভাঙচুরের শিকার হয়। ঘটনা যখন তীব্র আকার নেয়, তখন রাজ্য সরকার Section 163 BNSS অনুযায়ী কঠোর জনসমাগম নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং লোকজনের স্বাধীন চলাচল সীমাবদ্ধ করে দেয়। নিষেধাজ্ঞার আওতায় জনসমাবেশ, মিছিল, অহিংস প্রতিবাদ, ব্যানার, মাইক ব্যবহার এবং উদ্দীপক ভাষণও নিষিদ্ধ করা হয়। এটি প্রভাবিত এলাকায় বিকেল ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত বাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত পৌঁছায়। এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা বাহিনী (পুলিশ, রাজ্য পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর কিছু ইউনিটসহ) ভারী মোতায়েন করা হয়। সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনায় একজন স্থানীয় কার্বি যুবক নিহত হয়; পাশাপাশি একটি আগুন ভরা গুদামে আরেকজন নিহত হয়, যার মধ্যে একজন কে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি এই সহিংসতায় বহু নিরাপত্তা কর্মীরও চোট লেগেছে এবং বাহিনী ও পুলিশের ১৭০ জনের বেশি সদস্য আহত হয়েছে বলে জানা গেছে, যা সংঘর্ষের তীব্রতা নির্দেশ করে।
    প্রায় এক সপ্তাহ চলা অস্থিরতার পর মোবাইল ইন্টারনেট সেবা কিছু অংশে পুনরায় চালু করা হলেও, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনিক সোর্স জানায় পরিস্থিতি আস্তে-আস্তে শিথিল হলেও, বাস্তুতন্ত্রে অস্থিরতা এখনও রয়েছে এবং যে কোনো সময় আবার উত্তেজনা ফিরে আসার ঝুঁকি রয়েছে। স্থানীয় ও রাজ্য পর্যায়ের রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও সামাজিক সংগঠনগুলো সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে পুনরায় আলোচনা ও সংলাপের আহ্বান করে—বিশেষত ভূমি-ব্যবহারের সংবিধানিক সুরক্ষা নিয়ে পুনঃবিবেচনার জন্য। এছাড়া বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো পারিবারিক পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির দাবি করে রাজ্য গভর্নর ও প্রশাসনের কাছে যৌথ স্মারক জমা দিয়েছে, এবং দাবি করেছে যে ভূমি সুরক্ষা ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন। স্থানীয়দের একাংশ আন্দোলনের কারণ হিসেবে শুধু “ভূমি অধিকার” এর সমস্যা দেখছেন না; বরং এটি পরিচয় ও স্বীকারোক্তির প্রশ্ন হিসেবেও তুলে ধরা হচ্ছে। কিছু অংশের কাছে প্রশ্নটি কেবল আইনগত পদ্ধতি নয় বরং এখনও একটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। 
    অন্যদিকে, বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল রিজিয়ন (BTR)-এ  শান্তিচুক্তির পর সরাসরি সহিংস ঘটনাগুলি অন্তত ২০২৫ শেষ পর্যন্ত সরকারের পক্ষে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে BTR-তে ৮১টি গ্রামের নতুন সীমান্ত পুনঃনির্ধারণ চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক কার্যকারিতা বাড়ানোর উদ্দেশ্য বহন করে এবং স্থানীয় প্রতিনিধিত্বকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়। সংগঠিত সহিংসতা না থাকলেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক টানাপোড়েন কিছু এলাকায় লক্ষ্য করা গেছে—যেমন সন্দেহবাদ, ভূমিসংক্রান্ত দাবির পুনরাবৃত্তি এবং ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে নির্বাচনী রাজনীতি। BTR সরকারের “Mission Bwiswmuthi 2.0” কার্যক্রমটি ভূমি-অধিকার প্রশ্নে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেও গণ্য হচ্ছে, কারণ এটি প্রায় ৪৭০০০ এর বেশি ভূমিহীন পরিবারকে স্থায়ী ভূমি অধিকার দিয়েছে।  তবে স্থানীয় নৃ-রাজনৈতিক আবেগ এবং নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের দাবির পুনরুত্থান এর শব্দ শোনা যাচ্ছে , বিশেষত কোকড়াঝাড় জেলা ও অন্যান্য বর্ডার এলাকায় সংঘটিত চাপ রয়েছে প্রতিবাদী ইস্যুগুলিতে। উদাহরণস্বরূপ কিছু সম্প্রদায় ST তালিকায় আরও সম্প্রদায় অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতায় প্রতিবাদও সংগঠিত করেছে, যা BTR-এর রাজনৈতিক বাতাবরণকে প্রভাবিত করছে।

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩৪ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ভাষা  - Tanima Hazra
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন