কিছু হায়দ্রাবাদী সমস্যা । ( চতুর্থ পর্ব। )
কী নামে ডাকবো তাকে? নিজামের শহর? সুক্তির বুক চিরে খুঁজে আনা মুক্তার শহর? খুশবুদার বিরিয়ানির শহর? জিভে জল আনা রকমারি কাবাবের শহর? আকাশছোঁয়া অট্টালিকার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া সাবেক খানদানি যাপনের শহর ? পুষ্পিত টেকোমা আর বোগেনবেলিয়ার ঝলকানিতে বিমোহিত এক শহর? নাকি বাহারি মডেলের গাড়িতে ঠাসা জ্যাম জমাট রাস্তার শহর? কথায় বলে গোলাপকে যে নামেই ডাকো,তা সবসময়ই সুন্দর! এক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটাই সেই রকম হায়দ্রাবাদকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন তা হায়দ্রাবাদই থাকবে। এখানে ফেলে আসা দিনের নিজামী বৈভবের স্মৃতি আছে, সাইবারাবাদের চোখ টাটানো উঠতি নগর স্থাপত্য আছে, করাচি বেকারির মন এবং রসনা উন্মন করা কুকিজ আছে, আর আছে রাস্তায় স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির সারি – চাকা আছে, তবে চলন নেই। কিম্ আশ্চর্যম্!
শেষ দিনের কথা বলি। হায়দ্রাবাদকে টাটা করে ফিরে আসবো আমাদের অতি পরিচিত ডেরায় - কলকাতায়। ঠিক বেলা বারোটায় আমাদের জন্য নির্ধারিত বিমানের উড়ান। এখন তো আর সড়ক বা রেলপথে গতায়াত নয়! হুশ করে ডানা মেলে একেবারে গ গ ন পথে! ক্যাবে যাবো শুনে বাপ্পা আগবাড়িয়ে বললো – চিন্তা করবেন না। আমি সাড়ে আটটার সময় গাড়ি নিয়ে আসবো। বেশ! নাছোড়বান্দা মোগলের হাতে পড়লে আর ট্যা ফু করার সুযোগ থাকেনা , আমাদের দশা অনেকটা তেমনই। ঘড়ির কাটা সাতটার সীমানা পেরিয়ে আটের ঘরে এসে আটকাতেই চোপাচাপকান এঁটে আমরা তৈরি। শকটের প্রতীক্ষায় সময় কাটে। আমাদের প্রত্যাশা ছাপিয়ে ঘড়ি তখন চুড়ান্ত চালে চলছে। আমাদের উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছে একটু একটু করে। বাপ্পার তখনও দেখা নেই। মাঝে হোয়াটসঅ্যাপ করে বাপ্পা অবশ্য জানিয়েছে – জ্যামে আটকে গেছি।প্রায় এসে গেছি। চিন্তা করবেন না। ঠিক সময়েই এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাব।
এমন কথায় চিন্তা বাড়ে। আসলে রাস্তা জ্যাম জমাট হয়ে ওঠার ব্যাপারে ব্যাঙ্গালুরুর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে একমাত্র হায়দ্রাবাদ। সেদিন পাল্কি শর্মার এক রিপোর্টে দেখছিলাম মুম্বই থেকে পুনের তিন ঘন্টার পথ পাড়ি দিতে সেদিন সময় লেগেছে পাক্কা ৩২ ঘন্টা !! ভাবতে বসলে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। হায়দ্রাবাদের দূষণ পরিস্থিতি নিয়ে লিখতে গিয়ে বলেছি যে হায়দ্রাবাদ এমন এক হাইটেক স্মার্ট সিটি যার স্থায়ী আবাসিকের সংখ্যা এবং সবরকমের গাড়ির সংখ্যা সমান, অর্থাৎ যত জন মানুষ, ঠিক ততগুলো গাড়ি। এই মুহূর্তে হায়দ্রাবাদের জনসংখ্যা ১.১৩ কোটি এবং সেই সংখ্যাকে ছাপিয়ে গাড়ির সংখ্যা ১.৭৩ কোটি ; অর্থাৎ গাড়ির সংখ্যা মানুষের সংখ্যাকে পেছনে ফেলে তড়তড়িয়ে এগিয়ে চলেছে। হায়দ্রাবাদে গেলেই চোখে পড়বে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সারি। একতলা, দোতলা, তিন তলা – সবখানেই কেবল গাড়ি আর গাড়ি। এতো সব করেও সদর রাস্তার দৈর্ঘ্য মেরেকেটে ১০০০ কিলোমিটার। এই বিপুল সংখ্যক গাড়ির কারণে বাড়ছে জ্যাম, দূষণের মাত্রা , বিপর্যস্ত হচ্ছে শহরের পরিষেবা পরিকাঠামো । দিল্লি, মুম্বাই, কোলকাতা, ব্যাঙ্গালুরুর সঙ্গে সমানতালে চলছে হায়দ্রাবাদ। এই মুহূর্তে হায়দ্রাবাদের প্রধান সড়কগুলোতে গাড়ির ঘনত্ব প্রতি কিলোমিটারে ৯০০০+,যা ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ! বছর ছয়েক আগে এই সংখ্যাটি ছিল ৬৫০০ । এর মধ্যেই নতুন রেকর্ড গড়েছে এই হায়দ্রাবাদ। এই সংখ্যাটি আরও বাড়ছে দুরন্ত গতিতে। পূর্ববর্তী পরিসংখ্যানকে পেছনে ফেলে গাড়ির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে কিলোমিটার পিছু ৯৫০০+। মোটর ভেহিকেলস্ এর তথ্য অনুযায়ী হায়দ্রাবাদে প্রতিদিন ১৫০০ থেকে ২০০০ গাড়ির নবীকরণ হচ্ছে যার অর্থ হলো আরও জ্যাম জমাট হবে শহরটি। সবার কাছেই গাড়ি? কিন্তু এসব গাড়ি চলবে কোথায়?এই ভাবনার শরিক কেউই নয়।
রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট অথরিটির আধিকারিকদের মতে মটোর সাইকেল, স্কুটার বিকোচ্ছে জলের মতো। মোট বিক্রিত গাড়ির সিংহভাগই হলো টু হুইলার এবং ব্যক্তিগত মালিকানাধীন চার চাকার মটোর গাড়ি।এরাই জোট বেঁধে ধাবমান ট্রাফিকের ৯০% দখল করে আছে। বাকিরা এদের পেছনে পেছনে চলছে। দু চাকা গাড়ি মানেই রাস্তায় সার্কাসের খেলা – কখনো মেসি, কখনো নেইমার হয়ে ডাইনে বাঁয়ে করে তাঁরা ড্রিবলিং করে চলেছেন - মাথায় হেলমেটের বালাই নেই,যাত্রী সংখ্যা বহনের বিধিনিষেধ নেই ( থাকলেও তা মানছে কে ? ) সব নিয়মের বাইরে তাঁরা। সবাই মনে করছে হাম কিসিসে কম নহী! অথচ সরকারি পরিবহনের ব্যবস্থা নেই এমনটাও নয়। ঝা চকচকে চেহারার সরকারি বাস চলাচল করছে নিয়মিতভাবেই কিন্তু তাতে যাত্রীর চাপ নেই। অথচ একসময় ভাবা হয়েছিল পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চালু হলেই সমস্ত সমস্যার সমাধান হবে! হয়নি। সবার দেখাদেখি শহরে মেট্রো রেল পরিষেবা চালু করা হয়েছে তবে তাতেও পরিস্থিতির ইতর বিশেষ ফারাক হয়নি। আরে বাবা! নিজের গাড়ির সঙ্গে কার তুলনা?
সেন্ট্রাল রোড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পূর্বতন আধিকারিক এবং এক পরিবহন পরিকল্পক টি. এস. রেড্ডির মতে – “ হায়দ্রাবাদের সড়ক ও গণ পরিবহন পরিকাঠামো এই মুহূর্তে গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছে । একসময় মনে করা হয়েছিল মেট্রো পরিষেবা চালু হলেই বুঝি গাড়ি কেনার ধুম কমে যাবে। কিন্তু অপর্যাপ্ত পরিষেবা এবং দুর্বল পরিচালনার কারণে এই ব্যবস্থা মূল সমস্যার সমাধানে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে নি। হায়দ্রাবাদ যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই পথ হাতড়ে বেড়াচ্ছে।”
রেড্ডি সাহেবের মতে – যাত্রী সংখ্যার সর্বোচ্চ অবস্থায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে কোনো শহরের নগর পরিবহনের কার্যকর ভূমিকার বিষয়টি। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা সেই ধরনের উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছি। নাগরিক সমাজ সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বাস রাখতে পারছেন না। তাঁরা নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করছেন এবং তা হলো নিজেকে একটি গাড়ির মালিক হিসেবে দেখা। তাই গাড়ির সংখ্যা সমানে বেড়ে চলেছে। এক একজন একাধিক গাড়ি কিনছেন নিজের সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে বিধিনিষেধ আরোপ করা খুব জরুরি ছিল, অথচ উন্নয়নের লক্ষ্যে বুঁদ হয়ে থাকা সরকার সে বিষয়ে কোনো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চায়নি। শহরে পর্যাপ্ত সংখ্যক পার্কিং লটের অভাব রয়েছে। অনেক বাণিজ্যিক ভবনের নিজস্ব পার্কিং এর বন্দোবস্ত নেই।সব গাড়ি এসে উপচে পড়ছে রাস্তায়। সেখানে তখন গাড়ি উগরে দেওয়ার পর্ব চলছে। এ যেন হড়পা উন্নয়নের ধাক্কা!
সমস্যার গভীরতা কতটা তা বুঝতে একটা সহজ পরিসংখ্যান দিই। গোটা তেলেঙ্গানা রাজ্যে সড়কপথের দৈর্ঘ্য ২৬০০০ কি.মি., এই রাস্তায় গাড়ি চলে ১.৭ কোটি নথিভূক্ত গাড়ি যার অর্থ হলো কিলোমিটার পিছু ৬৫৩ টি গাড়ি। অন্যদিকে হায়দ্রাবাদে ও এক কিলোমিটার দূরত্বে গাড়ি চলাচল করে ৯৫০০টি অর্থাৎ রাজ্যের হারের তুলনায় ১৫ গুণের বেশি। সাদা চোখে দেখলে অবস্থাটা ভয়াবহ।
নগর পরিকল্পনাবিদদের আশঙ্কা, খুব দ্রুত কিছু ব্যবস্থা নেওয়া না হলে হায়দ্রাবাদের পরিবহন পরিষেবা একদম ভেঙে পড়বে, যাতায়াত করা আরও কষ্টকর, সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠবে। এটা মনে রাখতে হবে যে গাড়ির সংখ্যা বাড়লে কেবলমাত্র যাতায়াতের সময় বেড়ে যাবে তা নয়,গাড়ি বেড়ে যাওয়ায় অর্থ হলো আরও বেশি করে জীবাশ্ম জ্বালানির দহন, আরও বেশি করে বাতাসের গুণমানের অবনমন, আরও বেশি সংখ্যায় মানুষের বায়ু দূষণ ঘটিত রোগে আক্রান্ত হওয়া, আরও ভেঙে পড়বে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা। বিষয়গুলোর প্রতিটি পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত, ফলে একটা বাড়লে অন্য সমস্যাগুলোও বাড়বে গাণিতিক নিয়মে।
এই সমস্ত সমস্যার সমাধান কোন পথে? প্রশ্নটা সবার কিন্তু উত্তরটা কেউই জানেনা। কতগুলো উপায়ের কথা বলেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা যেমন –
অবিলম্বে কঠোরতর পরিবহন আইন লাগু করতে হবে। বিশেষকরে গাড়ি কেনার ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।
মেট্রো রেল পরিষেবা আরও প্রসারিত করতে হবে যাতে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ এই পরিষেবার সুযোগ গ্রহণে আগ্রহী হয়।
আন্তঃনগর বাস পরিবহন পরিষেবা উন্নত করতে হবে।
একক ভ্রমণের পরিবর্তে সামুহিক ভ্রমণে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
এ সবই হলো কপিবুক পরামর্শ, সুতরাং এসবে চিঁড়ে ভিজবে না। আসলে একালে একটা গাড়ি থাকার অর্থই হলো সামাজিকভাবে অন্যদের থেকে অন্ততঃ দু কদম এগিয়ে থাকা। এই মুহূর্তে এমন সুযোগ হাতছাড়া করবে কোন্ আহাম্মক। আজকের হায়দ্রাবাদ অতীত নিজামী শাসনের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। হায়দ্রাবাদের সপ্তম নিজাম মীর ওসমান আলী খান তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ৪০০টি বহুমূল্য গাড়ি রেখেছিলেন। আজও সেই সব বহুমূল্য গাড়ির কিছু নিদর্শন নিজামের সংগ্রহশালায় রক্ষিত আছে। সেই ধারাবাহিকতায় কোনোভাবেই ছেদ পড়তে দেননি, আজকের হায়দ্রাবাদের মানুষেরা। সুতরাং আগামী দিনে গোটা রাস্তাই যদি একটি সংগ্রহশালায় পরিণত হয়, তাহলে আমার আপনার আমাদের কি এমন ক্ষতি?
** হায়দ্রাবাদ নিয়ে আমার কথাবলা আপাতত শেষ। এমন সব সমস্যা থেকে আমার আপনার প্রিয় শহর কোলকাতা সম্পূর্ণ মুক্ত তা তো নয়। আসলে এই অবস্থায় রয়েছে ভারতের প্রতিটি শহর বা নগর। হায়দ্রাবাদের মধ্যে যদি নিজের শহরকে খুঁজে পান তাহলে জানবো ঠিক পথেই পথিক হয়েছে আমার কলম। পড়ুন ও ছড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ রইলো।
প্রাথমিক তথ্যসূত্র
Times of India পত্রিকা ও অন্যান্য পত্রিকার প্রতিবেদন।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।