

একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ১৯৮৪। বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল স্কুলের এক ছাত্রের জিটি রোডে গাড়ির ধাক্কায় পা ভাঙ্গে। মিত্র বাড়ির ছেলেটি। পরিবারিটি আর এস এস ঘনিষ্ঠ। কিন্তু স্কুলে ওসব দেখার চল ছিল না। জি টি রোডের গায়েই স্কুল। ছাত্ররা পথ অবরোধ করে। আমি তখন বিদ্যালয়ের ছাত্র। ছাত্র রাজনীতি করি। সামনে উচ্চমাধ্যমিক। কমলসায়রে থাকি। যে বাড়িতে থাকতাম সেখানে ফোন ছিল। ফোনে খবর পেয়ে ছুটি। আমাদের অবরোধে আটকা পড়েন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়। তিনি প্রধান শিক্ষকের ঘরে বসে। আমাদের ডাক পড়ল। প্রধান শিক্ষক আমাদের খুব প্রিয়। তিনিও একটু বেশিই ভালোবাসতেন। খুব বকাবকি করলেন আমাদের। অবরোধ তুলতে বললেন।
আমরা চুপ।
উত্তর দিচ্ছি না।
অবরোধ তোলার ইচ্ছে নেই। দাবি-- জিটি রোডে হাম্প চাই । তখন হাম্প নয়, বলতাম, সবাই, বাম্পার।
সেটা প্রশাসনের পক্ষে মানা কঠিন।
শেষে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুখ খুললেন।
বললেন, মাস্টার মশাই ওদের বকবেন না। ওরা যা করেছে ঠিক করেছে। স্কুলের ছেলের পা ভেঙ্গেছে। এটা তো করবেই । আমি থাকলে আরো বেশি করতাম।
আমরা তো হতভম্ব। বলে কী!
পরে উনি বললেন, তোমরা যা করছো, আমি থাকলে তাই করতাম। কিন্তু আমার জায়গায় তোমরা থাকলে কী করতে?
আমি বীরভূম যাব। তারপর ফিরে দিল্লি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করব। জরুরি বৈঠক আছে। সামনে বাজেট।
কী করে হবে!
আমরা চুপ করে শুনে বললাম, অবরোধ তুলে নিচ্ছি।
উনি বললেন, ডি এমকে বলে দিচ্ছি। হাম্প হবে।
হাম্প হলো।
ঐ মানুষের রাজনীতির প্রবল বিরোধী ছিলাম। কিন্তু শিখলাম-- কীভাবে বিক্ষোভকে পক্ষে আনতে হয়। নাটক না করে।
বেড়ে ওঠা বামপন্থী পরিবারে। সত্যজিৎ ঋত্বিক মৃণাল সেনদের নাম শুনে শুনে। তবে ১৯৭৭-এর আগে এদের ছবি দেখতে পাই নি। ছবির গল্প শুনেছি। বাজারের হলে এদের ছবি আসতো না। চটের পর্দাতেও না। চটের পর্দায় আসতো রোমান্টিক ছবি। সপ্তপদী, ধন্যিমেয়ে, ফুলেশ্বরী, দীপ জ্বেলে যাই, মৌসুমী, পিকনিক। সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল সাড়ে চুয়াত্তর আর ধন্যিমেয়ে এবং ফুলেশ্বরী। চটে ঘেরা হল ভরে যেত। এক টাকা আর দুটাকা টিকিট হতো। চেয়ার দু টাকা। এক টাকার টিকিট মানে মাটিতে বসা। এদের আর্ট ফিল্ম। লোকে পয়সা দিয়ে এসব দেখে না। তবে শুনে এবং পড়ে শ্যাম বেনেগাল, আব্রাহাম, আদুর গোপালকৃষ্ণণদের নাম জানি। রজত রায়ের বই তখন বামপন্থীদের অবশ্য পাঠ্য। আর 'দৈনিক বসুমতী'তে লিখতেন প্রদীপ নামের একজন। (বসুমতী তুলে দেওয়া এক মস্ত ভুল। চরম বুদ্ধুমি। বহু মানুষকে আন্তর্জাতিকতার সন্ধান দিয়েছে বসুমতী। সস্তায় এত ভালো কাগজ।)। দেশ বিদেশের চলচ্চিত্রের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দিতেন প্রদীপ বাবু। কান, কার্লো ভ্যারি না গিয়েও স্বচক্ষে দেখতে পেতাম-- কী ঘটছে। অস্কার, ফিল্ম ফেয়ার নিয়ে ছ্যাবলামি আদেখলাপনা লোকে কল্পনাও করতে পারত না।
বামফ্রন্ট সরকার জেলা শহরে চলচ্চিত্র উৎসব শুরু করায় অনেক ভালো ছবি দেখতে পেরেছি। পরে বন্ধ যে কেন করলেন? সরকার ভালো ছবি বানাতে টাকা দেওয়া শুরু করল। রূপকলা কেন্দ্র, নন্দন গড়লেন। ১৯৯০-এ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব দেখি কলকাতায়। পরে ১৯৯৫ থেকে রাজ্য সরকার এগিয়ে এলেন।
সরকার লোকসান বহু ক্ষেত্রে করে। চলচ্চিত্র সাহিত্য ক্রীড়া সংস্কৃতিতে দান খয়রাত করলে জেলখানা, পুলিশ, অস্ত্র খাতে খরচ কমে।
আইন আদালত ব্যয় কমে।
মৃণাল সেনের ছবি দেখতে পাই ১৯৭৮-এ।
তাঁকে স্বচক্ষে দেখি ১৯৮৪-তে।
'খণ্ডহর' ছবির প্রিমিয়ারে। মেট্রো-তে।
এমন শীতের ডিসেম্বর সেটা। রাত তিনটার সময় উঠে বর্ধমানে তিনটে ৫০ এর লোকাল ধরা। ছটায় হাওড়ায় এসে বাস ধরে মেট্রোর সামনে সারিবদ্ধ। যদি টিকিট না পাই।
আরো কিছু পাগল পেলাম মেট্রোর সামনে।
দুপুরে যতদূর মনে পড়ে ফারুক আবদুল্লাহ সরকার ফেলার প্রতিবাদসভা।
'খণ্ডহর' শেষ।
ছবি দেখে কথা বলতে পারছি না। অবরুদ্ধ বেদনা। গলা বুজে এসেছে।
দেখছি অভ্রংলিহ উচ্চতা। ধবধবে সাদা চুড়িদার পাঞ্জাবি। মৃণাল সেন। শাবানা আজমি।
আমার আগ্রহ বেশি কে কে মহাজনকে দেখার।
তখন স্বপ্ন দেখি-- একটা ছবি বানাবো। ক্যামেরাম্যান কে কে মহাজন।
সে স্বপ্ন কি পূরণ হওয়ার নয়?
মৃণাল সেনের সঙ্গে আলাপ পরে।
১৯৯৮-এ পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ ঘটনায়।
প্রতিবাদ করতে চাননি। সে নিয়ে একটা লেখায় আমি তীব্র কটাক্ষ করি। আসলে ফোন করলেই শুনছিলাম--বাথরুমে। পরে বুঝেছি--সব সময় বাথরুমে থাকা মানে এড়িয়ে যাওয়া।
কিন্তু পরে কার্গিল যুদ্ধ বিরোধী সভায় বাংলা আকাদেমিতে ভাষা ও চেতনা সমিতি আয়োজিত সভায় বলিষ্ঠ বক্তব্য রাখেন। কার্গিল যুদ্ধ বিরোধী মিছিলে হাঁটতে থাকেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মূর্তির তলা থেকে। আমাদের সব মিছিল ওখান থেকেই শুরু হতো।
অরুণ মিত্রের স্মরণ সভায়ও এসেছিলেন।
২০০৭এর ১৪ নভেম্বর নন্দীগ্রাম খেজুরিতে 'অপারেশন সানসাইন' বিরোধী ঐতিহাসিক মিছিলে এলিট সিনেমার সামনে দেখা। গেলাম কাছে, দেখালাম-- সামনে-- বামফ্রন্ট সরকার হঠানোর ব্যানার। উনি থমকে গেলেন। চলচ্চিত্র অভিনেতা ও পরিচালক অঞ্জন দত্ত নিয়ে এসেছিলেন। তিনি আমাকে ধমকালেন। কী দরকার এসব বলার!
আমি বললাম, সরকারি ধমকের বিরোধী মিছিলে এসেও ধমকানি! এটা তো ক্ষমতা দখলের মিছিল নয়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ।
মৃণাল সেন মৃদু হাসলেন।
পরদিন তিনি গেলেন একই বিষয়ে ডাকা বামফ্রন্ট সরকারের পক্ষের মিছিলে। তবে বক্তব্য ভিন্ন।
আমি সেদিন দিল্লিতে। একটা সভায়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অরুণ মাজির ডাকে।
যাঁদের পোস্টার লেখার অভ্যাস আছে বা ছিল, তাঁরা জানবেন, এ এক সাঙ্ঘাতিক নেশা। নতুন নতুন লিখনশৈলী, নিজস্ব শৈলী নির্মাণ-- পাগলা কুকুরের মতো মাথায় তাড়া মারে। কলকাতার কতো রাস্তায় যে হেঁটে হেঁটে ঘুরেছি আর খাতায় মকসো করেছি --ইয়ত্তা নেই। তখন পোস্টার লিখিয়ে হিসেবে বাদশা আলমের খুব নাম। একটা আধা বিদ্যাসাগরী আধা গথিক টাইপ আবিষ্কার করেন বাদশা আলম। সে-যুগ কিন্তু আন্তর্জালের যুগ নয়। ইচ্ছে হল, অনেকগুলো টাইপ দেখে নিলাম এমন নয়। 'গণশক্তি' পত্রিকা এক ধরনের নতুন টাইপ ব্যবহার করে সম্ভবত ৮৬-৮৭ তে। শোনা কথা, সেটাও বাদশা আলমের করা। বোল্ড হরফ। মহাকরণের সামনে গোলদিঘিতেও খুব ভালো দেওয়াল লিখন দেখা যেতো। বালিগঞ্জ পলিটেকনিকের দেওয়ালে, শিয়ালদহেও। বিরাট বড়ো বড়ো করে লেখা হতো । চন্দননগর আর খড়দহেও খুব ভালো দেওয়াল লিখন শিল্পী ছিলেন। এই দেওয়াল লেখার আকর্ষণে চন্দননগর ও খড়দহের প্রতি আজও টান অনুভব করি। ওই শিল্পীদের নাম যদি কেউ জানান।
ইন্দ্রনীলদা (মজুমদার, যাদবপুরের ৮৪-৮৯ বিখ্যাত, জনপ্রিয় ছাত্রনেতা) একবার বালিগঞ্জ পলিটেকনিকের দেওয়াল লিখলো রাত জেগে। বিরাট বিরাট অক্ষরে। এই দেওয়াল লেখার রাতগুলো ছিল খুব মজার। টিকা টিপ্পনি রঙ গড়িয়ে পড়া, ডিম পাঁউরুটি ঘুগনি খাওয়া।
বর্ধমানে একটা দেওয়াল লিখনের কথা মনে আছে। রাজ কলেজের অডূরে ভপাওয়ার হাউস পাড়ায় লম্বা ২০০ ফুট লম্বা দেওয়াল ছিল। কলকাতায় শেখা জিনিস ঝেড়ে দিলাম একটু বৈশিষ্ট্য পাল্টে। এক একটা অক্ষর আড়াই ফুট করি উঁচু দেড়ফুট চওড়া। তো ১৯৮৭ তে বর্ধমানের লক্ষ্মীপুর মাঠের দেওয়াল লিখন হচ্ছে। ওই এলাকায় তখন কংগ্রেসের রাজত্ব। কদিন আগে রেল হকার সমিতি করার জন্য ভবতারণ মণ্ডলের দুটো চোখ উপড়ে নিয়েছে। আমরা পোস্টটা লিখছি মইয়ে চেপে। নীচে অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে পাহারা।
বর্ধমান স্টেশনের সামনের দেওয়ালে লেখা ছিল সবচেয়ে কঠিন। পায়খানা আর পেচ্ছাপে ভর্তি। একটা দিনের কথা মনে আছে ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪। মোবারক বিল্ডিং পার্টি অফিস থেকে ১০ টাকা দিয়েছে টিফিন চা ইত্যাদির জন্য। মেহেদি বাগান বলে একটা কুখ্যাত জায়গা ছিল। কংগ্রেসের ঘাঁটি। সেখানে অসাধারণ সর টোস্ট বানাতো। ডিম টোস্ট আট আনা হল টোস্টও তাই। চা বোধহয় চার আনা করে ছিল। পাঁউরুটি চার আনা। স্লাইস রুটি তখনও আধিপত্য বিস্তার করে নি। তা পোস্টার লেখা চলছে। একটু বাকি। হঠাৎ সাইকেল একজন এসে বললো, এক্ষুণি পার্টি অফিস চলে যেতে। স্বৈরাচারী ইন্দিরা গান্ধী লেখা হয়ে গিয়েছিল, জবাব চাই, লেখা বাকি ছিল। কোনোক্রমে লিখে ছুটলাম সাইকেল নিয়ে। ওখানেই শুনলাম, কলকাতা থেকে খবর এসেছে ইন্দিরা গান্ধী খুন হয়েছেন। সেকালে এতো টিভি নেই। বিবিসি ভরসা। বিবিসিও নিশ্চিত করলো। শহরে দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল। আমার সেই ছোটবেলার অভ্যেস টইটই করে ঘোরা। আমি আমার সাইকেল নিয়ে ঘুরব ভাবছি, এমন সময় রে রে করে মোবারক বিল্ডিংয়ের দিকে ছুটে এলো একদল কংগ্রেসি। পার্টি অফিস নয় শেষ পর্যন্ত গেল আরতি সিনেমার গলিতে পাঞ্জাব ক্লথ টুরিং সেন্টার বলে একটা ছাঁট কাপড়ের দোকান। বিনির ভালো ভালো ছিট পাওয়া যেতো। কম পয়সায়। ১১ টাকা থেকে ১৫ টাকায় জামা করার ভালো ছিট। প্যান্টের ছিটের দাম ১৮-২৫ টাকা। আমি ওই দোকানে কিনতাম। দেখলাম, মুহূর্তে সব লুঠ করে ফেলল উন্মত্তরা। এরপর ওরা ছুটল বর্ধমান স্টেশনের দিকে জি টি রোডের গুরুদোয়ারার দিকে। ফটক বন্ধ। প্রচুর ঢিল ছুঁড়তে লাগলো। না, পুলিশ কোথাও ছিল না। কেউ বাধাও দেয়নি।
ওইদিন রাত থেকেই শহরের জিটি রোডের গায়ে পাঞ্জাবি পাড়ায় শুরু হলো রাত দিন পাহারা। আমরাও নাম লেখালাম স্বেচ্ছাসেবক তালিকায়। ওখানে দু',একজন ছাড়া সবাই ছিলেন কংগ্রেস সমর্থক। রাতারাতি ওঁরা সিপিএম হয়ে গেলেন।
একটা ঘটনা কীভাবে মানুষের জীবন বদলে দেয় দেখলাম। কোথায় দিল্লি, কোথায় কে অপরাধ করেছে, তার জন্য শিখদের সবাইকে দায়ী করা হবে কেন-- এই প্রশ্ন তোলার লোক সে-সময় বেশি সংখ্যায় ছিলেন তাই রক্ষে। তবে বহু লরি ট্রাকের ক্ষতি করে কংগ্রেসিরা।
বর্ধমানে কংগ্রেসের দাপট কমার একটা কারণ পরবর্তীকালে, শিখদের ওপর হামলা।
কৌতূহলী | 115.187.***.*** | ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:০০738308