এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বাবুদের সেকাল একাল 

    manojit bose লেখকের গ্রাহক হোন
    ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১১০ বার পঠিত
  • বাবুদের সেকাল-একাল

    "যিনি উৎসবার্থ দুর্গাপূজা করিবেন, গৃহিনীর অনুরোধে লক্ষ্মীপূজা করিবেন, উপগৃহিনীর কথায় সরস্বতী পূজা করিবেন এবং পাটার লোভে গঙ্গাপূজা করিবেন, তিনিই বাবু। "
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (রম্যরচনা - বাবু)

    ঠিক তেমনি নিখিল সুর মশায় তাঁর "সেকালের বাঙালির সাতকাহন" বইতে লিখেছেন...
    "মানিয়া বুলবুল আখড়াই গান
    খোষ পোষাকী যশমী দান
    আড়ি ঘুড়ি কানন ভোজন
    এই নবধা বাবুর লক্ষণ।"

    যদিও এই ছড়া তাঁর নিজের রচিত না কি সেকালে কোলকাতার সামাজিক বাতাসে ভেসে বেড়ানো এরকম বহু ছড়ার মধ্যে একটা সেটা আমার ঠিক জানা নেই।
    "বাবু"
    "বাবু কালচার"

    পুরনো কোলকাতার ঐতিহ্যই বলুন আর কলঙ্কই বলুন, বাবু কালচারকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
    মোটামুটি মোটা দাগে আঠারো - উনিশ শতকের সময়টাকেই সবাই "বাবু সংস্কৃতি" বলে উল্লেখ করেছেন।
    যদিও এই বাবু সম্প্রদায়কে দু ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আঠারো শতকের গোড়ার দিকের বাবুরা বাবু হয়েও ঠিক যেনো বাবু নন। কারণ আদর্শ বাবু তারাই যারা কাজকম্ম করতেন না, শুধু বিলাসিতা করতেন। কিন্তু এই বাবুরা নিজেদের উদ্যম ও বুদ্ধি , তার সাথে নবাব এবং ইংরেজদের তোষামোদ করে বিভিন্ন ব্যবসা বানিজ্য করেছেন রমরমিয়ে। আর অঢেল অর্থ রোজগার করেছেন। তারপর সমাজে নিজেদের প্রতিপত্তি বজায় রাখতে দু হাতে সেই অর্থ ব্যয় করেছেন। বলা ভালো নিজেদের বৈভবের বহিঃপ্রকাশে কোনো ত্রুটি রাখেননি। বিলাসিতার চূড়ান্ত নিদর্শন রেখেছেন তারা গর্বের সাথে।

    কিন্তু দ্বিতীয় প্রকার বাবুরা অর্থাৎ যারা সত্যিই বাবু বলে কলঙ্কের ভাগীদার হয়েছেন তারা শুধুমাত্র বাপ ঠাকুরদার রোজগারের অর্থ পায়ের ওপর পা তুলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

    শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয় 'বাবু'দের সম্পর্কে লিখেছেন, ''বাবু মহাশয়েরা দিনে ঘুমাইয়া, ঘুড়ি উড়াইয়া, বুলবুলির লড়াই দেখিয়া, সেতার, এস্রাজ, বীণা প্রভৃতি বাজাইয়া, কবি, ফুল আখড়াই, হাফ আখড়াই, পাঁচালী প্রভৃতি শুনিয়া রাত্রিকালে বারাঙ্গণাদিগের গৃহে গৃহে গীতবাদ্য ও আমোদ-প্রমোদ করিয়া কাল কাটাইত এবং খড়দহের ও ঘোষপাড়ার মেলা এবং মাহেশের স্নানযাত্রা প্রভৃতির সময়ে কলিকাতা হইতে বারাঙ্গণাদিগকে সঙ্গে লইয়া দলে দলে নৌকাযোগে আমোদ করিতে যাইতেন। "

    এই বাবুদের নিয়ে, তাদের জীবন ধারণের ইতিহাস, তাদের নেশা, তাদের সখ আহ্লাদ, তাদের পরকীয়া, বারমুখো স্বভাব, তাদের কলঙ্ক সবিস্তারে লিখতে গেলে একটা ছোটখাটো মহাকাব্য লিখে ফেলা যায়।

    তবে সেসব লেখার আগে বাবুদের নিয়ে একটা কথা বলা প্রয়োজন। যার অনেক আছে সে বিলাসিতা করতেই পারে। প্রশ্নটা ন্যায় অন্যায়ের নয়, স্বভাবের। বাবুদের বাবুয়ানি তাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছিলো। এবং সেই দেখনদারির প্রতিযোগিতায় ছুটতে ছুটতে যেদিন বাবুরা মুখ থুবড়ে মাটি ধরতেন সেদিনও সেই অতীতের অহঙ্কার, উন্নাসিকতা, রোয়াব ছাড়তে পারতেন না। এব্যাপারে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এর একটি গল্পের উল্লেখ করা প্রয়োজন। গল্পটির নাম ব্রজলাট। গল্পের শুরু আর শেষের দুটি অনুচ্ছেদ উল্লেখ করলেই আশা করি বাবুদের মনস্তত্ত্ব খানিকটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

    "যুবকের বেশভূষা দেখিয়া তাহাকে শৌখিন বাবু বলিয়া বোধ হয়। গায়ে ধোপদস্ত সিল্কের পাঞ্জাবি, পরিধানে দিশী ধুতি। একটা কোঁচানো চাদর বগলের নিচে দিয়া বাঁ কাঁধের উপর ফেলা রহিয়াছে। তৈলহীন ঈষৎ রুক্ষ চুল সযত্নে কপাল হইতে পিছন দিকে বুরুশ করা। পায়ে পেটেন্ট চামড়ার পাম্পশু। যুবকের মুখ বেশ সুশ্রী, একটুখানি পাতলা গোঁফ আছে। দেহ ছিপছিপে হইলেও সুগঠিত। কিন্তু ভালো করিয়া লক্ষ্য করিলে তাহার মুখে একটা অস্বাভাবিক পান্ডুরতা ও শীর্ণভাব লক্ষিত হয়। কপালে ও চোখের কোলে চুলের মতো সূক্ষ্ম রেখা পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে। যাহারা অসংযত স্ফূর্তির তাগিদে দেহের উপর অতিরিক্ত অত্যাচার করে তাহাদের চোখে মুখে এইরূপ শ্রান্তির লক্ষণ প্রায়ই চিহ্নিত থাকিতে দেখা যায়। "
    ........গল্পের শেষের কয়েক পংক্তিতে লেখক ভিন্ন চিত্র এঁকেছিলেন।

    " হাসপাতালের ডাক্তার ব্রজেনের পরীক্ষা শেষ করিয়া হিরনের কাছে আসিয়া বলিলেন, ' আপনার বন্ধু? না এখনো জ্ঞান হয়নি; তবে শিগগির হবে আশা করি। ওঁকে দেখে তো বেশ সঙ্গতিপন্ন বলেই মনে হলো। অথচ - আশ্চর্য - উনি বোধহয় এক মাস কিছু খাননি। শরীরের টিসুগুলো পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে। ......কি ব্যাপার বলুন তো?"

    এটাই বোধহয় বাবুদের আসল পরিচয়। ভাঙবেন তবু মচকাবেন না। যাই হোক.. বাবুদের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় তাদের মোসায়েবদের কথা।

    "সানাইয়ের পোঁ বাজে
    বাবুদের মোসায়েব।"
    মোসায়েব ছাড়া বাবুদের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। যে বাবুর যত মোসায়েব সে তত বড় কেউকেটা। তবে এ কথা বলা মুশকিল যে বাবুদের মোসায়েব জুটে যেত নাকি মোসায়েবরা বাবু জুটিয়ে নিত। আসলে পাকা কাঁঠাল ছাড়ালেই যেমন মাছি ভনভন করে, ঠিক তেমনি বড়োলোকের লায়েক ছেলের পকেট ভারী দেখলেই তার মাথায় কাঁঠাল ভাঙ্গার লোক জুটে যেত। মোসায়েবরা সারাদিন রাত বাবুদের হ্যাঁ তে হ্যাঁ, না তে না; জল উঁচু জল নিচু করে করে বাবুদের তোষামোদ করতো। এই মোসায়েবরাই বিকেল সন্ধ্যেতে বাবুর জন্য নিত্য নতুন নেশার আমদানি করতো, বাঈজী জোগাড় করে দিত। বাবুর মন মেজাজ ও স্বাস্থ্য ভালো রাখতে তিন ম' এর সরবরাহ এরাই করতো। কারণ ভাগ তো এদেরও থাকতো। এখানেই শেষ নয়। ধরুন, বৌবাজারের বাবু তার আদরের মেনি বিড়ালের বিয়ে দিলেন লাখ টাকা খরচা করে। এবার এই খবরটা কে আরো একটু মশলা মাখিয়ে শ্যামবাজারের বাবুর মোসায়েবরা বাবুর কানে তুলে দিলো এবং দায়িত্ব নিয়ে বাবুর পোষা কুকুরের বিয়েতে দু'লাখ টাকা খরচা করিয়ে তবে শান্তি পেলো। মানে বাংলা কথা বাবুদের মধ্যে বিলাসিতার রেষারেষি, বৈভব প্রকাশের প্রতিযোগিতায় ইন্ধন জোগানো এদের প্রধান কাজ ছিল।

    ঠিক তেমনি আজকের কর্পোরেট বাবুদের কিন্তু ওরকম মোসায়েব খুব একটা লাগে না। তারা নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে ইঁদুর দৌড়ে ছুটতে শুরু করে। রামবাবুর সাততলায় দু কামরার ফ্ল্যাট, তাই শ্যমবাবু আটতলায় তিন কামরার ফ্ল্যাট কিনে ফেললেন। অমুক বাবু গতকাল সাতাশ লাখের গাড়ি বুক্ করেছেন শুনে তমুক বাবু আজ ছুটলেন ত্রিশ লাখ টাকার গাড়ি কিনতে।
    সেকালে যেমন ঘুড়ির লেজে হাজার হাজার টাকা বেঁধে উড়িয়ে , নিত্য নতুন সৌখীন জিনিস কিনে, একাধিক রক্ষিতা উপপত্নী পুষে, বাঈজী নাচের আসর বসিয়ে বাবুরা নিজেদের বিত্তের, প্রতিপত্তির, অর্থের উলঙ্গ প্রদর্শন করতেন আজও রেখে ঢেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তেমনটাই হয়। তখন বাবুদের স্ট্যাটাস সিম্বল ছিল ওই কর্মকাণ্ড গুলো, ঠিক যেমন আজ আমাদের স্ট্যাটাস সিম্বল হলো আধ খাওয়া আপেল।

    বাবুদের সম্পর্কে বলতে গেলেই আসে তাদের উপপত্নীদের কথা। সেকালে উপপত্নী রাখাটা কোনো অন্যায় বলে গণ্য হতো না, আসলে ন্যায় অন্যায় বোধটাই সেসময়ে স্থিরতা পায়নি। সেকালের বাবুরা অনেকেই একের বেশি বিবাহ করেছেন, আবার হয়তো কেউ কেউ করেননি। কিন্তু বাবু হয়ে উপপত্নী নেই, রক্ষিতা নেই, বাগানবাড়িতে পোষা মেয়েমানুষ নেই এ যেন কলঙ্কের বোঝা। তাই এ ব্যাপারেও সব বাবুরা প্রতিযোগিতার আসরে নেমেছিলেন। অবশ্য এর মানে এই নয় যে এখন কেউ ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানেন না। ভালোমন্দ সর্বকালে বিদ্যমান। তাই ওনারা সব খারাপ আর আমরা হলাম রাম অবতার এতটা ভাবা মানে মূর্খের স্বর্গে বাস করা। পার্থক্য শুধু আইন ঘটিত। তখন পাপ করে বুক ফুলিয়ে ঘোরা যেত, এখন সেটা করা যায় না। তা বলে কি পাপ হয় না?

    সখ আহ্লাদ বৈভবের বিলাসিতার যে সব চূড়ান্ত নিদর্শন সেকালের বাবু সকল আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছিলেন সে ব্যাপারে একটু নেড়ে ঘেঁটে দেখা যাক।

    বাবুদের সখের সীমা ছিলো না। বেড়াল কুকুরের বিয়ে, বুলবুলি বা মোরগ লড়াইতে টাকা ওড়ানো, দামী দামী আতর আর সুগন্ধী ব্যবহার, বেলজিয়াম কাচের আয়না ছাড়া ওনাদের চাঁদবদন আবার বাঁকা দেখাতো, কাশ্মীরি গালিচা ছেড়ে ফরাসি গালিচায় পা রাখা এমন বহু সখের উদযাপন হতো হাজার হাজার টাকার বিনিময়ে। বসার ঘরে শোভা পেত দামী বিদেশি ঝাড়বাতি। ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চড়ে গঙ্গার হাওয়া খাওয়া। সেসব গাড়িরও আবার রকমফের ছিল। কোনো বাবুর পালকি ঘেরী তো কোনো বাবুর ফিটন। কারো চ্যারিয়ট তো কারো বারুচ্চ - ল্যান্ডোলেট। এসবই ছিল বিত্তের বহিঃপ্রকাশ। প্রিন্স ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর। শুধু নামে নয়, সখ আদব কায়দা সবেতেই তিনি প্রিন্স। বেলগাছিয়া ভিলা তাঁর বাবুয়ানির চূড়ান্ত নিদর্শন বলেই জানা যায়। আবার তাঁর পুত্র দেবেন্দ্রনাথের বাবুয়ানি নিয়ে অবনীন্দ্রনাথ পরে লিখেছেন - "দেবেন্দ্রনাথ স্নান করে নাকি তোয়ালে দিয়ে গা মুছতেন না, চামড়া আহত হবে বলে। মসলিনের থানের টুকরো দিয়ে উনি গায়ের জল মুছতেন। যখন সরবত জাতীয় কিছু খেতেন রুমাল দিয়ে মুখ মুছে সেটা মাটিতে ফেলে দিতেন। চাকরের কাজ হলো সেটা তুলে কেচে রাখা। মানে আমাদের মতো মুখ মুছে পকেটে রেখে দিতেন না।"

    কিছু বাবুর যেমন ছিল দামী জর্দা দিয়ে ভালো পান খাওয়ার সখ। না না, একটা দুটো নয়, দিনে গোটা পঞ্চাশ, কি আরও বেশি। আবার কারো ছিল জুতোর সখ। এক জুতোর আলমারি ভর্তি কয়েকশ জোড়া জুতো। সকালে যেটা পায়ে শোভা পায় সেটা বিকেলে স্থান পায় না। আবার রাতের অভিসারে অন্য জোড়া। বেশিরভাগ বাবুরাই দোকান যেতেন না জুতো কিনতে, গেলেও কালে ভদ্রে। জুতোর দোকান থেকে লোক বাড়ি এসে শ্রীচরণের মাপ নিয়ে যেত। আবার ফরমাশ মতো জুতো তৈরি করে বাড়িতে দিয়েও যেত। সখ বলে কথা বাবা, সে কি যেমন তেমন ব্যাপার। মোদ্দা কথা টাকা ওড়াতে হবে।

    এখনও ওড়াই, আমরা।

    যেমন ধরুন, একটা কাজের আধ খাওয়া আপেল মুঠোফোন, আর একটা অকাজের আপেল। স্ত্রীর ছেলে মেয়ের সবার আপেল। সাথে আবার স্মার্ট না কি সব ঘড়ি হাতে বাঁধা। স্বাস্থ্য সচেতনতা আর কি। টাইটান টাইমেক্স এসবে টাইম টা মনে হয় নির্ভুল হয় না, তাই রোলেক্স রাদো....

    সাউথে দক্ষিণ খোলা পনেরো তলার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট আছে বটে, কিন্তু নিউটাউনের বাংলো টা কিনতেই হলো। না হলে সম্মানের কাঁথায় আগুন লেগে যাচ্ছিল যে। ক্লাবে বিলিয়ার্ড খেলার সঙ্গী মিস্টার সিনহা তো ঐরকম একটা বাংলো কিনেছেন সদ্য, তাই আর কি.....রাজস্থান গুজরাট কাশ্মীর তো পালিয়ে যাচ্ছে না, একবার যাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু সেটা কি স্ট্যাটাস সিম্বল হবে?হবে না। তাই ফি বছর ছুটি নিয়ে ইউরোপ, প্যারিস, ইজিপ্ট, আফ্রিকা এসব করে বেড়াই, ওগুলো পালিয়ে যেতে পারে তো।

    বাবুদের নেশার প্রেম ছিল লায়লা মজনুর মতো। নেশা ছাড়া বাবুদের চলতো না বললেই চলে। আর নেশা তো শুধু তরল নয়, তার সাথে সেকালের সমাজে গাঁজা গুলি চন্ডু আফিম সবই চলতো। কোনো নেশাই তখন সমাজের চোখে নিন্দনীয় ছিল না। সায়েবদের তুষ্ট করতেই বলুন আর নিজেদের রিপু দমনের জন্যই বলুন, সেকালে বাবুরা যে পরিমাণ অর্থ নেশার পিছনে ঢালতেন আর পোড়াতেন সেই টাকায় আজকের দিনে আমার আপনার বাড়ি গাড়ি হয়ে যাবে।

    কবিয়াল গানের লড়াই ছিল বাবুদের আমোদের আর একটি উদাহরণ। অবশ্য এটিকে আমরা ইতিবাচক দিক বলেই ধরে থাকি। মুখে মুখে কথার পিঠে কথা সাজিয়ে একের উত্তরে অন্যকে গান বাঁধতে হতো। সে যে খুব সহজ ব্যাপার তা কিন্তু নয়। যদিও সে সব গানে শিল্পের তুলনায় খিস্তি খেউড়, অন্যকে ছোট দেখানোর প্রচেষ্টাই বেশি ছিলো।

    ইতিহাস বলে নদীয়ার রাজা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় প্রথম দুর্গাপুজোতে বাঈজী নাচের আসর বসান। পরবর্তী সময় এই ধারা কে ধরেই কোলকাতার বাবুরা গা ভাসিয়েছিলেন। কোলকাতাতে প্রথম দুর্গাপুজো হয় নবকৃষ্ণ দেবের বাড়িতে, পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের বিজয়ের আনন্দ উদযাপন করতে। সেই পুজোতে স্বয়ং ক্লাইভ এসে পুজো দিয়েছিলেন বলেও কথিত আছে। তবে পুজো টা নিমিত্ত মাত্র, আসল হলো বাঈজী নাচ আর অঢেল সুরা।

    যেমন আজকাল। হয় না? হয় তো। সুখে দুঃখে আনন্দ উল্লাসে আমরা সবাই হাতে গেলাস তুলে নি। তন্ত্রে মন্ত্রে পরস্ত্রীর সাথে একটু কোমর দোলানো, হাতে রঙিন জল, চোখে রঙিন নেশা। আবার ধরুন আপনি আপনার বন্ধুর বাবার মৃত্যুতে শ্মশান যাত্রী। হরিবোল হরিবোল বলছেন আর খই ছড়াচ্ছেন। একফাঁকে বন্ধুকে কনুই মেরে জেনে নিলেন "ভাই আছে তো?" আপনার বন্ধুটিও খলিফা ছেলে। চোখে একরাশ দুঃখ আর একগাল হাসি নিয়ে বললে দুটো সাড়ে সাতশো আছে। আবার দ্বিগুণ উদ্যমে আপনি হরিবোল হরিবোল করে উঠলেন।

    দেখেছেন তো.. এই জন্য পরনিন্দা পরচর্চা করি না। কি যে নেশা লাগে, কলম থামতেই চায় না। যাই হোক, এখন ভেবে লাভ নেই। আর একটু নিন্দা করেই ছুটি নেবো।

    এক বাবুর কথা কানে বেজে উঠলো....
    "তা বাপু আমরা তো বলছি সব সত্যি। মদ খেয়েছি, পতিতালয় রাত কাটিয়েছি, টাকা উড়িয়েছি, টাকা পুড়িয়েছি, বাপ ঠাকুরদার পয়সায় বসে শুয়ে রসে বশে থেকেছি। তারপর নিঃস্ব হয়ে পথের ভিখারী হয়েছি নয়তো জটিল রোগে গায়েব হয়ে গেছি। কিন্তু তোমরা যে সব নিপাট ভদ্দর লোক সেজে ঘুরে বেড়াও আর আমাদের নিয়ে খিস্তি খেউড় করো, তা বাপু তোমরাও তো গুয়ের ওপিঠ। এই যে দামী দামী বিশাল ফ্ল্যাট, বিশাল গাড়ি সবই তো আরামের জন্য। তোমার আছে তাই করছো। যার নেই সে করছে না। সখ বলো, আরাম বলো, রেষারেষি বলো, করছো তো। বেশ করেছো, করো না। কে বারণ করছে। এই যে বাড়িতে ঠান্ডা যন্ত্র লাগিয়ে পরিবেশের পিন্ডি চটকেছো, নিজের বিদেশি কুকুরের জন্যেও আলাদা ঘর, ঠান্ডা মেশিন, কিন্তু বুড়ো বাপ মা কে বৃদ্ধাশ্রমে রেখেছো। তোমার বউ তোমার বসের সাথে মাঝে মধ্যে অফিস টুরে যায় শুনি। তুমি তখন বসের বউকে নিয়ে শপিং করো মল মুত্রে। বড় রেষ্টুরেন্ট ছাড়া খাওয়া হয় না। কালো টাকা সাদা করতে কোনো কোনো সংস্থা তে চাঁদা দাও, কারণ গরীবের দুঃখে তোমাদের নাকি রাতে ঘুম হয়না। সামাজিক মাধ্যমে আর্তের ভগবান তুমি। এদিকে যখন তোমার আশি নব্বই লাখের ফ্ল্যাটের এলাকায় কোনো সামান্য বিক্রেতা আসে রোজগারের আশায় তাকে কিন্তু ঢুকতে দাও না। বাইরে নোটিশ বোর্ডে বড় করে লেখা থাকে "কুকুর আর সেলসম্যানের প্রবেশ নিষেধ"।
    জানো কি? আমাদের কাপড় কেচে আসতো ধোপা বাড়ি থেকে। সেই কাপড়ে লেগে থাকত চোরকাঁটা। বাড়ির একটা চাকরের কাজ ছিলো ওই চোরকাঁটা বেছে রাখা। যদি কাপড় গায়ে দিয়ে একটা কাঁটাও ফুটতো চাবকে ওই ব্যাটার পিঠের ছাল তুলে দিতাম। তোমরা এখন হয়তো ঠিক তেমনটি করো না, বা করো হয়তো। কিন্তু অন্যের পিছনে কাঠি করতে তোমরা ওস্তাদ। সে ব্যক্তিগত জীবনে হোক বা কর্মজীবনে, তোমাদের সবার হাতে একটা অদৃশ্য কাঠি থাকে। নিজের উন্নতির জন্য, আরো আরো টাকার জন্য কাউকে কাঠি করতে তোমরা ছাড়ো না।
    ভদ্দরলোক বলে কথা। হাসি পায়। "

    কিসব ভুলভাল লিখছি !! তবে ওই চোরকাঁটার গল্প বাবার কাছে শুনেছি। আমার পরম শ্রদ্ধেয় ঠাকুরদা বিলেতি কোম্পানি তে চাকরি করতেন। দু হাতে কামিয়েছেন। কিন্তু উড়িয়েছেন দশ হাতে। বাবা বলতেন, "বাবার যা টাকা ছিল তাতে সেইসময় এ শহরে খান দুই বাড়ি হয়ে যেত।"

    কিন্তু হয় নি। কারণ উনিও বাবুদের থেকে কম ছিলেন না। ইয়ার বন্ধু নিয়ে রোজ সন্ধ্যেতে ঘরে আড্ডা দিতেন। গাওয়া ঘিয়ের লুচি ভাজা চলছে, পান সাজা আছে। তরল নেশা বা চরিত্রের দোষ ছিল না, কিন্তু মেজাজ ছিল। মেজাজটাই তো আসল রাজা, তাই না? জুতোর সখ ছিল। বাড়িতে লোক এসে জুতো অর্ডার নিত । আর ছিল ওই চোরকাঁটা। বাবাকে যদি মিথ্যেবাদী না মনে করি তাহলে ঐ চোরকাঁটা বেছে রাখার দায়িত্ব বেশ কয়েকবার বাবার ঘাড়ে পড়েছে। আর ভুলের মাশুলও ঠাকুরদা পিটিয়ে উসুল করেছেন। শত হোক রাজবাড়ির রক্ত, কথা তো বলবেই।

    যাক গে যাক.....

    বাবুদের মেলা অপরাধ ছিলো সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু একটা দুটো ভালো কাজ কি একেবারেই করেন নি? ইতিহাস কি বলে?

    কোনও বাবু নারীশিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন তো কেউ সতীদাহ প্রথার বিপক্ষে সরব হয়েছেন। কেউ বাল্য বিবাহের প্রতিবাদ করেছেন, আবার কেউ বিধবা বিবাহের প্রচলন করে সমাজকে শিক্ষা দিয়েছেন। এরকম ছোট বড় জনসেবামূলক সামাজিক দায়িত্ব পালন কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়ে টিকে আছে শুধু তাদের জন্য রঙ্গ রসিকতা আর পাহাড়প্রমাণ অপমান। আসলে পাপের বোঝা যে বড্ড ভারী। কিন্তু মহাকালের কাছে একটা প্রশ্ন থেকেই যাবে; যাদের পাপ অপরাধ খোলা চোখে দেখা গেছে ইতিহাসের পাতায় তারাই কি শুধু অপরাধী? আজকের স্বার্থপর সমাজে আড়ালে আবডালে কি সেকেলে বাবুদের মতো মানুষ দেখা যায় না? নাদের বদনাম থাকুক, কোলকাতার ইতিহাসে আঠারো উনিশ শতকের বাবুদের কলঙ্ক লেখা থাকুক পাতায় পাতায়, কিন্তু ভবিষ্যত প্রজন্ম কি আজকের দশকের কদর্য বাবুদের কথা ইতিহাসে খুঁজে পাবে? হয়তো না।

    যাই হোক, যা লিখলাম সেটা ভুল - ঠিক যা খুশি হতে পারে। বিভিন্ন লেখক সাহিত্যিকদের লেখা পড়ে যেটুকু ধারণা হয়েছে তার সাথে আরো কিছু কথা মিশিয়ে নিজের মতো করে এই থোর বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোর রাঁধলাম। পাতে দেওয়ার যোগ্যতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারেন, কারণ বাবুদের নিয়ে নিজস্ব কোনো অভিজ্ঞতা সত্যিই নেই। পূর্বপুরুষের দোষ গুণ কিছু শোনা ছিলো, সেটুকুই নিজের বলতে পারি। তাই এ লেখা কাউকে আহত করলে নিজগুণে ক্ষমা করবেন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন