যে ঢঙেই হোক বাংলাদেশ নির্বাচন রাস্তায় উঠে গেছে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও হবে এবার। এবং এই বস্তু যে আসলে কী তা বহু মানুষর অজানা। সরকার থেকে প্রচুর বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে। না ভোট দিলেই শেষ, হ্যাঁ ভোটেই বাংলাদেশ। ৮৪টা মতামতের জন্য একটা ভোট, হ্যাঁ অথবা না! এমন আশ্চর্য বুদ্ধি আলী রিয়াজের মাথা থেকে বের হয়েছে। শুধু তাই না, না দিলে বা নায়ের পক্ষে কিছু বললে তাকে ভারতের দালাল, লীগের দোসর ইত্যাদি বলে ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। দারুণ না?
যে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দলের নেতা, তাদের ছাত্র নেতারা সকলে মিলেমিশে গিয়ে তারেক রহমানের সাথে দেখা করে আসে, সবাই মিলে দেশ চালানোর ঘোষণা দেয় সেই নির্বাচন নিয়ে আসলেই কি মাথা ঘামানোর দরকার আছে? এইটা মনে হয় না যে এইটা একটা দেখানো নির্বাচন? প্রচুর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখানো হচ্ছে ভোট সুষ্ঠু হয়েছে, লীগ ছাড়াও জমজমাট নির্বাচন হয়েছে এইটা বুঝানোর জন্য? আসলে কী হচ্ছে? আসলে তো নির্বাচন হচ্ছে সাবেক চার দলীয় ঐক্যজোটের মধ্যে। নিজেরাই বাট করে খেলতেছে! যেমন বাংলাদেশ ক্রিকেট দল, বিশ্বকাপে না গিয়ে নিজেরাই ভাগাভাগি করে তিনটা দল বানাইছে, এখন ওরা ওরাই প্রচুর ক্রিকেট খেলবে! নির্বাচনও তাই হচ্ছে।
নিজেরা হোক আর যাই হোক, এখান থেকে পাস করেই তো সংসদে যেতে হবে, তাই না? সেই কারণে প্রার্থীদের লম্ফঝম্ফের কমতি নেই কোন। আমাদের আসনের কথাই বলি। এখানে জামাতের সাথে বিএনপি আছে, সাথে বিএনপির একজন বিদ্রোহী প্রার্থী আছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিদ্রোহী প্রার্থী লীগের লোকজনেরও সমর্থন পাচ্ছে। এতে করে নির্বাচন জমে উঠেছে। আমার মত নিতান্তই ছাপোছা লোকেও ফোন দিয়েছে। তারা ধরেই নিয়েছে যেহেতু আমি বিএনপি বা জামাতের দিকে যাব না তাই বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দিব আমি! কেমনে বুঝাই এই নির্বাচনের আশেপাশেও যাওয়ার কোন ইচ্ছা আমার নাই। কিন্তু ওদের, বিশেষ করে বিএনপি করে বন্ধুরা যারা এই বিদ্রোহী প্রার্থিত নির্বাচন করছে তারা আমি এবং আমাদের বন্ধুদের সবাইকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে যাচ্ছে!
আমাদের বাড়ি যে জায়গায় সেখানটায় লীগের ভোট বেশি। আমাদের যে কেন্দ্র সেখানে ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি লীগ পাশ করে। ৯৬ সাল থেকে নির্বাচন দেখার অভিজ্ঞতা আমার। কোনদিন আমাদের কেন্দ্রে হারতে দেখিনি নৌকাকে। তাই এখানে যারাই ভোট চাইতে আসে তারা এইটা মাথায় নিয়েই আসে। আমাদের মহল্লার অতি উৎসাহী কে জানি জামাতের নির্বাচনী অফিস ভেঙ্গে একেবারে তুলে দিয়েছে! এখানে আবার আরেক রাজনীতি। আমাদের মহল্লায় বিশিষ্ট রাজাকারের শ্বশুরবাড়ি। তাই কিছু জামাতের ভোট তো ছিলই। এরাও জামাতের পক্ষে না। কারণ যে রাজাকারকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল তার ছেলেকে এখান থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় নাই! তাই এরা সবাই ওই স্বতন্ত্র প্রার্থী বা ধানের শিষের নির্বাচন করছে! জামাত এখানে পানি খাওয়ার সময় পাবে না।
কিন্তু আমাদের কেন্দ্রই তো শেষ কথা না। আমাদের এখানে মানে আমাদের আসনে এবার জামাত জিতেও যেতে পারে! মানুষের মুখেমুখে শুনি একবার দিয়েই দেখি! আমাদেরই এক বন্ধু যে এতদিন ছুপা জামাত ছিল ও একদিন আমাদেরকে বুঝাল যে তুই তো স্বতন্ত্র দিয়েই বাঁচতে পারবি না! কেন? কারণ স্বতন্ত্র প্রার্থী যদি পাশ করেও পরে তো ও আর বিদ্রোহী থাকবে না। ওকে ফুলের মালা দিয়ে আবার পার্টি তাকে বরন করে নিবে। তখন তো যেই লাউ সেই কদুই হবে! ও এখানে চাঁদাবাজির কথা বলতে চাইছে। কারণ বিএনপি থেকে যাকে দিয়েছে তার চাঁদাবাজিতে মানুষ অতিষ্ঠ। চব্বিশের ৫ আগস্টর পরে এরা একদম চক্ষুলজ্জা ছাড়া খাইছে! এই কারণে এই আসনে বিএনপি প্রার্থী তিন নাম্বার হওয়ার সম্ভবনা প্রচুর। আর যেহেতু বিএনপিরই বিদ্রোহী প্রার্থী শক্তিশালী হয়ে আছে, তার মানে ভোট ভাগ হবে বিএনপিরই। এই ফাঁকে জামাত বের হয়ে যাওয়ার প্রচুর সম্ভবনা আছে। এইটা আমার আসনের কথা বললাম। অন্য দিকেও এমন হচ্ছে বলে শুনছি।
এই মিলেঝুলে নির্বাচনের মধ্যেও একজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে মানুষ। জামাতের এক নেতাকে বিএনপির লোকজন মারছে। এই নিয়ে সারাদেশ উত্তাল। আরে ভাগাভাগি করে খাবি, মারামারি করস কেন আবার? বুঝলাম না ব্যাপার! কুমিল্লায় দেখেন, মহান জুলাই যোদ্ধা হাসনাত আব্দুল্লাহর যে প্রতিদ্বন্দ্বী তাকে নির্বাচন কমিশন ঋণ খেলাপির জন্য প্রার্থিতা বাতিল করে। সে আদালতে যায়, আদালতে যাওয়ার ফলে তাকে প্রার্থিতা ফিরিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। বিএনপির প্রার্থী, বেশ ঝানু রাজনীতিবিদ। বেশ ভালো। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পরে আদালত থেকে রায় আসে, তার প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়! কী হল? হাসনাত আব্দুল্লাহ সংসদ সদস্য হয়ে গেল আনঅফিসিয়ালি! মজাটা হচ্ছে এত বড় একটা কাণ্ড হয়ে গেল, কোথাও কোন উচ্চবাচ্য নাই। বিএনপির মত দলের একজনের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে গেল অথচ আপিল নিয়ে আলাপ নাই, প্রতিবাদ নাই, কিছু না। কোন ঢঙের নির্বাচন হচ্ছে একটু বুঝা যাচ্ছে?
জামাতের আমির সরাসরিই বলছে যে তাদের দলে নারীরা কোনদিন ক্ষমতার শীর্ষে যেতে পারবে না। তাদের নিয়মেই নাই। এইটা ভালো হল না? ভনিতা না করে বলেই দিছে যে এগুলা এখানে চলবে না। জামাতের নারী শাখার একজন, নাকমুখ কঠিন করে কাপড় দিয়ে প্যাচ মেরে আমাদেরকে জানাল যে তারাও এইটা মেনেই জামাতের রাজনীতিতে আসছে। আল্লা নারীদেরকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তৈরি করে নাই। পুরুষ নারীকে চালায় নিয়ে যাবে এইটাই হচ্ছে নারীর নিয়তি! পরিচিত লাগে এগুলা? আমাদের অতি পরিচিত আফগান জিলাপির মত লাগে? এক সময় এগুলা বহুদূরর মনে হত। এখন আর তা মনে হয় না। কারণ দূরে আর নাই। এখন প্রতিনিয়ত শরিয়া আইনের আলাপ শুনি চায়ের দোকানে! মানুষের মুখে মুখে এই সব কথাবার্তা। এক সময় এই দেশের মানুষ মিছিল করছে আমরা সবাই তালিবান, দেশ বানাব আফগান! তখন হাসছি হা হা করে। এখন নিজেদের হাসি আমাদের দিকেই ব্যাঙ্গ করছে সকাল বিকাল! জামাতের ইশতেহারে আবার আরেক তামশা করা হয়েছে। তারা ভারতের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করতে চায়! এ আবার কোন চাল?
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ হবে হ্যাঁ জিতলে। উচ্চ কক্ষে পিআর পদ্ধিতিতে আসন ভাগ হবে। যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে উচ্চ কক্ষে ততগুলো আসন পাবে তারা। এখন হিসাবটা দেখুন, জামাত যদি নির্বাচনে হেরেও যায় তবুও উচ্চ কক্ষে আসন পাবে যদি আমার মত লোকজন ভোট কেন্দ্রে না যায়। এইটা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হ্যাঁ পাশ করবেই বা বলা ভালো পাশ করাবে হ্যাঁকে। তাহলে আমি যে ভোট দিতে যাব না, এতে লাভ জামাতে হবে না? কারণ ওদের ভোটাররা তো খায়া না খায়া ভোট দিবেই। এতে উচ্চ কক্ষে তাদের আসন বেড়ে যাবে। ভালো যন্ত্রণা না?
জামাত কি ক্ষমতায় আসতেছে? আমার পরিচিত, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব সবাই মনে করছে যে হ্যাঁ এবারই জামাত আসতেছে ক্ষমতায়! আমার কেন জানি বিশ্বাস হয় না। আমার নজর স্বচ্ছ না? আমি কি যা দেখতে চাচ্ছি না তা দেখতে পারছি না? জানি না। আমার কাছে মনে হয় না, এত সহজেই হেরে যাবে বাংলাদেশ? ভয় হচ্ছে অন্য জায়গায়। বাংলাদেশকে কি লড়তে দিবে? লড়তে দিলে না হারা জেতার প্রশ্ন! জামাত যে পরিমাণ গুছিয়ে নামছে বাকিরা তেমন করে নামে নাই এবার। জামাতের বুদ্ধির কাছে বাকিরা শিশু। তারা কী করছে একটু বলি। যেখানে তাদের দুর্বল প্রার্থী সেখান থেকে ভোটার টান দিয়েছে। যেখানে তুলনামূলক শক্তিশালী প্রার্থী, যার জেতার সম্ভবনা বেশি সেখানে ভোটার বানিয়ে দিয়েছে এদেরকে। তার জিতাটা নিশ্চিত করেছে। মির্জা আব্বাসের মত লোক বলতেছে তার এলাকার ভোটার কমে গেছে কয়েক লাখ! ভোটার কমে কেমনে? এই চাল বুঝা বিএনপির মত নবিসের পক্ষে একটু কষ্টকরই।
এবার প্রথম পোস্টাল ভোট চালু করেছে নির্বাচন কমিশন। এই পোস্টাল ভোটের কী হবে? এগুলা সঠিক গণনা হবে? সঠিক ভাবে ভোট হবে? প্রশাসনের এ টু জেড জামাতের নিয়ন্ত্রণে। আমাদের জেলার টপ টু বটম জামাতের হাতে। এদিকে সরকার ঘোষণা দিয়েছে ভোট গণনা হতে দেরি হবে এবার। দুই তিনদিনও লাগতে পারে! কয় কোটি ভোট যে দুই তিনদিন লাগবে? আমাদের অভিজ্ঞতা বলে যত দেরি তত কারচুপির সম্ভবনা।
আজকে ৫ ফেব্রুয়ারি। ২০১৩ সালের এইদিনে ইতিহাস রচিত হয়েছিল ঢাকার বুকে। সম্পূর্ণ অর্গানিক এক আন্দোলনের সূচনা হয় এই দিনে। মানুষ অবাক হয়ে দেখেছে যে এই দেশের মানুষ কী প্রবল ঘৃণা করে রাজাকারদের। মানুষের ঢল নামে শাহবাগের বুকে। দিনের পর দিন গেছে, রাত পার হয়েছে, মানুষের বিন্দুমাত্র ক্লান্তি আসেনি। মানুষের স্রোত থামেনি। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায়। মানুষের স্রোত একদিকে চলে গেছে কাঁটাবনের দিকে, আরেকদিকে সেই মৎস্য ভবনের দিকে। এদিকে শেরাটনের মোড় পার হয়ে বাংলা মোটর ধরে ফেলছে প্রায়, অন্যদিকে টিএসসি! মানুষ একত্রিত হয়েছিল বহু পুরাতন এক হিসাব বুঝে নিতে। সারা বাংলাদেশ সেদিন এক সুতায় বাধা ছিল। আজকে, ২০২৬ সালে এসে এগুলো কল্পকাহিনী মনে হয়। এখন আমি সেদিন শাহবাগে ছিলাম এইটা বলার আগে আশেপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হতে হয়। ২৪ পরবর্তী অনেক কর্মকাণ্ডের সূত্রই ১৩ সালের শাহবাগের সাথে জড়িত। শাহবাগের প্রতিশোধ নিতেই এমন অনেক কিছুই করা হয়েছে যা অন্য কিছু দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। ৩২ নাম্বার ভাঙা বা শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চ তৈরি করা, জামাতের সমাবেশ করা এগুলা সবই শাহবাগের প্রতি তীব্র ঘৃণা থেকেই।
আশা নাই। ধিকধিক করে একটাই আশার প্রদীপ জ্বলছে, তা হচ্ছে সেই মানুষ গুলো যারা কোন কারণ ছাড়াই, কোন দলীয় স্বার্থ ছাড়াই দিন রাত পার করেছে শাহবাগে। সেদিন এই লাখ লাখ মানুষ যে এসে হাজির হয়েছিল তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটা কী নিভে গেছে? একটু হলেও তো থাকার কথা, তাই না? তারাও তো দেশেই আছে? আছে না? এখন নিভু নিভু করেই না হয় থাকল। থাকলেই হবে। একটা স্ফুলিঙ্গ থাকলেই চলবে। তাহলেই আরেকদিন হবে গণ বিস্ফোরণ। সেই আশায় টিকে আছি এখন পর্যন্ত।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।