বইয়ের কপি হাতে পাওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন। কোনো সাড়া না পাওয়া। নিঃশব্দতা। মনে হচ্ছিল, সব আওয়াজ তলিয়ে গেছে ডিজিটাল সাগরের অতলে। রাইসের ফোনে কেবল একবার রিং আসে। অচেনা নম্বর। তিনি কথা বলেননি। শুনেছেন। নিঃশব্দে রেখে দিয়েছেন।
তারপর, হঠাৎ এক সন্ধ্যায়, মিলার বান্ধবীর ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়া। হৃদয় দ্রুত স্পন্দন। জানালা দিয়ে উঁকি দেওয়া। নিচে রাস্তায় একটি মোটরসাইকেল। দুজন যুবক। হেলমেট পরে। মুখ দেখা যায় না। তারা দরজার সামনে কোনো লিফলেট বা বিজ্ঞাপন রেখে যায় না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। পাঁচ মিনিট। দশ মিনিট। তারপর চলে যায়।
মিলার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া। সে বলে, "ওরা শুধু জানাতে এসেছে... যে ওরা জানে আমরা এখানে আছি।"
আমি বলি, "কিন্তু কিছু করলো না তো।"
"করার দরকার পড়ে না। ভয় দেখানোর জন্য যথেষ্ট।"
ফোনে ফিরে আসার ইচ্ছা প্রবল হয়ে ওঠা। খবর কি? কী বলছে লোক? লাইক-শেয়ার? নাকি সব নিশ্চুপ? কিন্তু সেই সাধারণ ফোনে শুধু কল করা যায়। ইন্টারনেট নেই।
স্ক্রল করার প্রবৃত্তিটা রয়ে গেছে। আঙুল অস্বস্তি বোধ করে।
মিলা বলে, " চলে যাই। নদীর ধারে। সেখানে সিগন্যাল কম।।"
রাইসের সাথে পরামর্শ করা। তিনি বলেন, "যাও। কিছুদিন। বইটা নিজের পথ করে নিক। তোমরা থাকো নিরাপদে।"
রাতে খুব অল্প জিনিসপত্র গুছানো। দুটি ব্যাগ। ল্যাপটপ নেই। নোটবুক আর কলম। বইয়ের দুটি কপি।
ঘরটি ছোট। একটি খাট। একটি টেবিল। জানালা দিয়ে সবুজ ঢোকা। শব্দ: পাখির ডাক, হাঁসের আওয়াজ, দূরে কৃষকের হাঁক।
আমি আমার নোটবুকে লেখা শুরু করি।
"বসিয়া আছি উঠানের চৌকিটায়। পায়ের নিচে মাটি ঠাণ্ডা। হাতের কাছে চায়ের কাপ।
পুরানো গপ্পো। মিলা হাসতেছেন। মুখখান উজ্জ্বল। উজ্জ্বল মুখ দেখি নাই। মুখ সব ঝাপ্সা। আলো-ছায়ার খেলাঘর। এখানে মুখ সোজা। রোদে পুড়ছে। ঘামছে। হাসছে।"
"দূরে মাঠে লোকজন কাজ করে। হাঁটু ভাঙি মাটিতে। ধান রোপন করে। পিঠে কাপড় ভিজে যায় ঘামে। তাদের মুখে ক্লান্তি। শরীর ভাঙার ক্লান্তি। মস্তিষ্ক ভাঙার ক্লান্তি না।"
কিছুদিন পর, মিলার ফোনে একটি মিসড কল আসে। অচেনা নম্বর। সে ফোন করে। ওপাশ থেকে একটি নারীকণ্ঠ। "আপনারা নিরাপদ তো? আমি ফেসলেস_১৮।" মিলা চমকে যায়। আমি টের পাই। ফোনটা স্পিকারে রাখা।
ফেসলেস_১৮, সেই হাউসওয়াইফ। সে বলে, "আমি নিরাপদ। আমার জায়গা বদলাইছে। তোমাদের বই... আমার হাতে পড়ছে। আমার মতো অনেক মায়ের হাতে পৌঁছাইতেছে। আমরা পড়ি। কাঁদি। আমাদেরও তো মুখ আছে। আমরা সারাদিন রান্না-বান্না, বাচ্চা সামলাই। কিন্তু ভেতরে কত কথা। কত বিরক্তি। তোমার বইয়ে সেই কথাগুলোই যেন লেখা আছে।"
আমি কথা বলি। "আপনার কথা আমাদের শক্তিদায়ক।"
সে বলে, "না, তোমরাই আমাদের কণ্ঠ দিয়েছ। একটি জায়গা দিয়েছ।"
ফোন শেষ হওয়ার পর, মিলার চোখে পানি দেখা যায়।
মিলা হঠাৎ বলে, "আমি আর ফিরে যাব না সেই নাচের হলে।"
আমি তাকাই।
"নাচব। কিন্তু অন্য জায়গায়। মানুষের সামনে। রাস্তায়। মাঠে। যেখানে ইচ্ছা। আমার দেহের ভাষায় আমার গল্প বলব। এই মুখোশ খুলে ফেলব।"
তার কথা শুনে সাহস পাওয়া। "আমিও... আমার লেখা থামাব না। যেখানেই থাকি। যেভাবেই থাকি।"
একদিন একটি মোটরসাইকেল আবার আসে। একই দুজন যুবক।
তারা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর চলে যায়। কিন্তু জানিয়ে যায়, তারা ছাড়বে না।
সেই রাতে, আমরা সিদ্ধান্ত নেই। এখানে বেশি দিন থাকলে ঝুঁকি। সবাই সব জানে। আমরা থাকলে সমস্যা বাড়বে।
রাইসকে ফোন করা। তিনি বলেন, "ফিরে আসো। কিন্তু সরাসরি বাসায় না। আমার একটি পুরানো গুদাম আছে। শহরের ধারে। সেখানে থাকতে পারো।"
রাইসের গুদামে পৌঁছানো। একটি বড় হল। পুরানো বই, কাগজ, প্রিন্টিং মেশিনের যন্ত্রাংশে ভর্তি। ধুলো। কিন্তু নিরাপদ।
সেখানেই বসবাস শুরু করা। মিলা তার নাচ চর্চা করে। আমি লেখি। রাইস বই বিতরণের নেটওয়ার্ক বাড়ান। তিনি যোগাযোগ করেন ছোট ছোট বইয়ের দোকানের মালিকদের সাথে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সাহসী ছাত্রের সাথে, শিল্পী-সাহিত্যিকের গোপন চক্রের সাথে।
বইটি এখন ডিজিটাল জগতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পিডিএফ ফাইল। ইবুক। অডিওবুক। মানুষ শেয়ার করে। ডিলিট হয়। আবার ওঠে। একটি কাট-পেস্ট যুদ্ধ।
একদিন, কলেজ থেকে একটি ইমেইল আসে (রাইসের মাধ্যমে)। আমার একাডেমিক স্থিতি "নিরীক্ষাধীন" বলে জানানো হয়। "প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির পরিপন্থী কার্যকলাপ" এর অভিযোগ। জবাবদিহি করতে বলা হয়।
মিলার নাচের হল থেকে খবর আসে: তাকে আর নাচতে দেওয়া হবে না। "অনৈতিক আচরণ" এবং "অপ্রীতিকর যোগাযোগ" এর অভিযোগ।
আমরা হতাশ হই না। রাগ জন্ম নেয়।
মিলা বলে, "আমি এখন রাস্তায় নাচব।"
আমি বলি, "আমি এখন প্রকাশ্যে লিখব। ছদ্মনামে। কিন্তু থাকব এখানেই।"
আমরা একটি ব্লগ খুলি। টর নেটওয়ার্কে। নাম: "ছায়া ও মুখশ্রী: জীবিত পাতা।" সেখানে নিয়মিত পোস্ট করি। আমার লেখা। মিলার নাচের ভিডিও। অন্যান্যদের গল্প। ফেসলেস_১৮ এর রান্নাঘরের ডায়েরি। ফেসলেস_৩৩ এর সংখ্যার পিছনের গল্প।
পাঠক বাড়তে থাকে। মন্তব্য আসে। কিছু উৎসাহব্যঞ্জক। কিছু হুমকিমূলক। কিছু কর্তৃপক্ষের পক্ষের মানুষজন আসে বিতর্ক করতে। আমরা বিতর্কে না গিয়ে শুধু আমাদের গল্প বলি। সরাসরি।
এক সকালে, গুদামের দরজায় একটি চিঠি পড়ে থাকতে দেখা। কোনও ডাকস্ট্যাম্প নেই। হাতে লেখা: "তোমরা ভালো করছ। কিন্তু এখন থামো। নইলে আমরা থামাব। — যারা দেখি"
ভয় আবারও ঘিরে ধরে। কিন্তু এবার ভয়কে স্বীকার করে নেওয়া। সঙ্গে থেকে যায়।
মিলা বলে, "তাদের ভয় দেখানোর জন্য লোক লাগে। আমাদের বলা লাগে শুধু। "
সত্যিই কি জিতছি? কে জানে। কিন্তু হেরেও যাইনি। আমরা রয়ে গেছি। আমাদের কণ্ঠ রয়ে গেছে।
বইটির কয়েকটি কপি বিদেশে পৌঁছানোর খবর আসে। প্রবাসীরা সেগুলো শেয়ার করে। আন্তর্জাতিক কিছু ব্লগে রিভিউ আসে। ছোটখাটো হইচই হয়।
কর্র্তৃপক্ষ এবার সরাসরি রাইসের প্রেসে তল্লাশি চালায়। কিছু বই জব্দ করে। জরিমানা করে। রাইস গ্রেপ্তার হন না, কিন্তু হুমকি পান।
তিনি আমাদের বলেন, "আমি থামব না। আমি বয়স্ক মানুষ। আমার ভয় নাই। তোমরা সাবধানে থেকো।"
আমাদের গুদামের অবস্থান সম্ভবত আর গোপন নেই। আমরা আরেক জায়গায় সরি। শহরের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে, বন্ধুদের সাহায্যে, কয়েক দিন করে থাকি। ডিজিটাল নোম্যাড।
একদিন, ইন্টারনেটের একটি গভীর কোণে, একটি পোস্ট চোখে পড়ে। শিরোনাম: "Faceless_07 থেকে: আমি নিরাপদ। নতুন নামে। নতুন জায়গায়। তোমার সংগ্রহ কাজে লাগছে। আমার গবেষণা চলছে। মুখোশের নিচের মুখগুলোর একটি ডাটাবেস তৈরি করছি। একদিন সব খুলে দেখাব। ধন্যবাদ, যে আমার কণ্ঠ রাখছ।"
পোস্টটি পড়ে চোখ ভিজে আসা। সে বেঁচে আছে। লড়ছে।
মিলা এবং আমি একটি ছোট অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করি। শহরের একটি পরিত্যক্ত গুদামে। শুধু আমন্ত্রিত কিছু মানুষের জন্য। মিলা সেখানে নাচবে। আমি কিছু অংশ পড়ব। অন্যান্যরাও তাদের গল্প বলবে।
সেটা হবে আমাদের প্রকাশ্য মুখোশ খোলা। ঝুঁকি আছে। কিন্তু আমরা স্বীকার করি।
অনুষ্ঠানের দিন, আশ্চর্যভাবে অনেক মানুষ আসে। তরুণ-তরুণী, মধ্যবয়স্ক, এমনকি কিছু বয়স্ক মানুষ। মুখে মাস্ক (কোভিডের না, পরিচয় গোপনের)। কিন্তু চোখে উৎসুকতা।
মিলা নাচে। কোনো স্টেজ নেই। মেঝেতে। দর্শকরা চারপাশে বসে। সে নাচে তার জীবনের গল্প। গ্রামের মাঠ। শহরের অন্ধকার। নাচের হলের আলো। প্রেম। বিরক্তি। বিদ্রোহ। তার দেহ কথা বলে। মুখ বলে। চোখ বলে।
তারপর আমি পড়ি।
আঞ্চলিক শব্দ মিশিয়ে।
"দেখি মানুষের মুখ। শহরে মুখ ঝাপ্সা। গ্রামে মুখ স্পষ্ট। কিন্তু সবখানেই এখন ছায়া পড়ছে। একটা ডিজিটাল ছায়া। সেই ছায়া মুখ ঢেকে ফেলতে চায়। আমরা সেই ছায়ার বিরুদ্ধে লড়ছি। শব্দ দিয়ে। নাচ দিয়ে। আমাদের মুখ দেখাইয়া।"
"আমি বিরক্ত। আমি এখনো বিরক্ত। কিন্তু এই বিরক্তি এখন নিষ্ক্রিয় না। এই বিরক্তি সক্রিয়। এই বিরক্তি লেখে। বলে। দেখায়।"
দর্শকরা নিঃশব্দে শোনে। কেউ কেউ কাঁদে। শেষে সবাই তালি দেয় না। শুধু নিঃশব্দে দাঁড়ায়। একে অপরের দিকে তাকায়। তাদের চোখে একটা বোঝাপড়া।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর, আমরা দ্রুত সেখান থেকে সরে যাই। কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু আমরা জানি, এটা নজরে পড়েছে।
পরের দিন, মিলার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। একটি ছোট ক্লিপ। তার নাচ। মানুষের শেয়ার। "এই নারী কে?" "এই নাচের অর্থ কি?" কর্তৃপক্ষের কিছু পেজ থেকে খবর আসে: "অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রচার।" ভিডিওটি ডিলিট হতে থাকে। আবার আপলোড হয়।
একটি ছোট, স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল (স্বাধীন বলে দাবিদার) সাক্ষাৎকার চায়। আমরা রাজি হই না। কিন্তু রাইস রাজি হন। তিনি টেলিভিশনে যান। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় বই নিষিদ্ধ করার দাবির ব্যাপারে।
রাইস বলেন, "বই নিষিদ্ধ করা যায়। কিন্তু ভাবনা নিষিদ্ধ করা যায় না। মুখোশ খুলে ফেলা যায়। কিন্তু নতুন মুখোশ পরে নেওয়া যায়। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা কী চাই? মুখোশের জীবন, নাকি মুখের জীবন?"
তার কথা সরাসরি সম্প্রচার হয়। তারপর সেই অংশটা কর্তৃপক্ষীয় চ্যানেলে নেয়া হয়, সমালোচনা করে। তারা বলেন, "এইসব অস্থিরতা সৃষ্টিকারী উপাদান দেশের উন্নতিতে বাধা।"
লড়াইটা এখন প্রকাশ্য। আমাদের নামে কোনো মামলা নেই এখনো। কিন্তু আমরা আন্ডারগ্রাউন্ড।
এক বছর কেটে যাওয়া। বইটি এখন অনেকের হাতে। একটি কাল্ট ফলোয়িং তৈরি হয়। মানুষ আমাদের লেখে। তাদের গল্প পাঠায়। আমরা সেগুলো জমা করি। একটি আর্কাইভ বাড়তে থাকে।
মিলা এখন একটি ছোট ডান্স গ্রুপ চালায়। যারা শিল্প হিসেবে শরীরী প্রকাশে বিশ্বাস করে। আমি লিখি। একটি ছদ্মনামে কলাম লেখা শুরু করি একটি অনলাইন পোর্টালে। "মুখের কথা।"
। পাঠক চিনে ফেলে। কিন্তু নাম প্রকাশ হয় না।
জীবন এভাবে চলতে থাকে। এক ধরণের সীমাবদ্ধ স্বাধীনতা। ভয় আছে। কিন্তু ভয়কে পেছনে ফেলে কাজ করি।
একদিন ডাকবাক্সে আরেকটি চিঠি আসে। হাতে লেখা। "আমি তোমাদের বই পড়েছি। আমি একজন পুলিশ অফিসার। আমি মুখোশ পরে থাকি প্রতিদিন। কিন্তু আমারও মুখ আছে। আমি তোমাদের বিপদে পড়লে সাহায্য করব। — একজন মুখোশধারী"
চিঠিটি রাখি। বিশ্বাস করি না আবার বিশ্বাস করি। কিন্তু এটি দেখায়, মুখোশের নিচে সত্যি মুখ আছে। সবার।
আজকে এই মুহূর্তে বসে লেখা। জানলা দিয়ে শহরের আলো দেখা যাচ্ছে। মিলা পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছে। নিরাপদ মনে হচ্ছে।
আমি জানি না আগামীকাল কী আসবে। হয়তো দরজায় কড়া নাড়বে। হয়তো ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাবে। হয়তো আরও কঠিন সময় আসবে।
কিন্তু আমি এখন আর শুধু মুখের ভাব দেখি না। আমি মুখ দেখাই। মিলা মুখ দেখায়। আরিয়ান মুখ দেখায়। ফেসলেস_০৭ মুখ দেখায়। রাইস মুখ দেখায়। নানী মুখ দেখায়।
এবং এই দেখানো থামবে না। কারণ যতক্ষণ একটি মুখোশ খোলা হবে, ততক্ষণ আরেকটি মুখোশ খুলতে কারো না কারো সাহস হবে।
এই লড়াইয়ের কোনো সমাপ্তি নেই। আছে শুধু চলমানতা।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।