এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অধ্যায় ১১: সংগ্রহ এবং সিদ্ধান্ত

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ৮২ বার পঠিত
  • 0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13
    ফাইলটা ওপেন করতেই থমকে দাঁড়ানো। পিসির স্ক্রিনে নাম দেখতে পাওয়া: "Masks_Off.rar"। আর্কাইভের ভেতর কত যে ফোল্ডার। ফোল্ডারগুলোর নাম: "শহরের শ্বাস", "গণমাধ্যমের গলার স্বর", "পাঠশালার পাপ", "বাড়ির ভেতরের বোবাকান্না"। প্রতিটা ফোল্ডারে ঢুকতে যেন শব্দের স্রোতে ভেসে যাওয়া।

    প্রথম ফাইল: "ভয়েস_০০১.mp3"। হেডফোন কানে গুঁজে দেওয়া। চাপ দেওয়া প্লে বাটনে।

    একটি গলার স্বর... চাপা, ভয়ে কাঁপা। একজন তরুণীর কণ্ঠ। বলতে থাকা: "...আমি যে হোস্টেলে থাকি, ওখানে তো জানালার গ্রিল... বাইরে তাকালেই দেখা যায় আরেকটি বিল্ডিং... সেখানে কার্ফিউর পরে আলো জ্বলে... এক রুমে... তারা সারাদিন বসে... কী দেখে, কাকে দেখে... আমার বন্ধুকে একদিন ধরে নিয়ে গেল... ফেরত এল তিন দিন পরে... মুখে কোনো কথা নেই... চোখে ভয়... ভয় যে কী জিনিস, আমি এখন বুঝি... বুঝি যে ভয়েরও মুখ আছে... কালো মাস্ক পড়া একটা মুখ..."

    ভয়েস রেকর্ডিং শেষ হওয়া। পরেরটা চালু করা। একজন বুড়োর আওয়াজ, গলাটা যেন মরিচের গুঁড়া মাখা: "...হুজুর তো বলছে টিভিতে, সব ঠিক আছে... আল্লাহর রাজ্য হবে... কিন্তু আমার নাতির ফি দিতে না পেরে ওকে কলেজ থেকে উঠিয়ে আনলাম... এখন ধানের ক্ষেতে কাজ করে... সন্ধ্যাবেলা মোবাইল নিয়ে বসে থাকে... কী দেখে, আমি জানি না... জানে না যে ধানের দাম আর বাড়বে না... জানে না যে তার ভবিষ্যৎ ধানের চেয়েও ভিজা... হুজুর বলে, সব আল্লাহর ইচ্ছা... কিন্তু আল্লাহ কি এইসব চান? আমার নাতি যখন কাঁদে, তখন আল্লাহও কি কাঁদেন না?"

    ফাইলের পর ফাইল। ভয়েস নোট। মানুষের হাপিত্যাশা, ভাঙ্গন, প্রশ্নের রেকর্ড। Faceless_07 শুধু সমাজবিজ্ঞান পড়েনি, সে মানুষের বুকের ভেতর মাইক্রোফোন ঢুকিয়ে দিয়েছে। যন্ত্রণার নৃতাত্ত্বিক নমুনা সংগ্রহ করেছে।

    ছবির ফোল্ডার ওপেন করা। হাজার হাজার ছবি। স্ক্রিনশট। স্ট্যাটাস আপডেট। মেমস। কার্টুন। সবই দেশের প্রেক্ষাপটে। সবাই মুখোশ পড়ে আছে।

    একটা ছবি: একটি পোস্টার। "স্মার্ট দেশ" লেখা। তার নিচেই রাস্তার ধারে বসে থাকা একজন ভিক্ষুক, হাতে স্মার্টফোন। ক্যাপশন: "ভিক্ষুকের স্মার্টফোনে কী দেখায়? হয়তো নিজেরই ভিক্ষার ছবি।"

    আরেকটা ছবি: স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রদের সারি। মুখ গম্ভীর। চোখে স্বপ্ন নেই, ভয় আছে। পেছনের দেয়ালে স্লোগান: "জ্ঞানই আলো"। কিন্তু ছেলেগুলোর চোখে কোনো আলো নেই।

    তৃতীয় ছবি: একটি গ্রাম্য বাজারে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে স্থানীয় নেতা। মুখ লাল, গলা ফোলানো। হাতে মাইক্রোফোন। আরেক হাতে মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে। ক্যাপশন: "একসাথে দুটো মাইকে কথা বলা যায়... একটা মানুষকে শোনায়, আরেকটা পাওয়ারকে।"

    গ্রাফ, চার্ট, ডাটা সেট। Faceless_07 কি শুধু ছাত্রী? না, সে একজন গেরিলা গবেষক। সে সংখ্যা জোগাড় করেছে। গ্রাফের লাইন দেখাচ্ছে শিক্ষা ব্যয় বাড়ছে, মান বাড়ছে না। আরেকটি গ্রাফ দেখাচ্ছে মোবাইল ডাটা ব্যবহার বাড়ছে, বই পড়া কমছে। পাই চার্টে দেখা যাচ্ছে ৭০% যুবক মনে করে তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এইসব সংখ্যা শুধু সংখ্যা না... এগুলো হৃদয় ভাঙার অঙ্ক।

    আমার নিজের "Notes_for_Project" এর ফাইলগুলো ওপেন করা। আমার লেখাগুলো এতটাই খণ্ডিত, এতটাই ব্যক্তিগত। আর Faceless_07 এর সংগ্রহ এতটাই বিশাল, এতটাই সামাজিক। দুইয়ে মিলে কি হবে? ব্যক্তি ও সমাজের এক কোলাজ? না... এটা হবে রুগ্ণ সময়ের ডাক্তারি রিপোর্ট।

    মিলার ফোন । সে এখন তার বান্ধবীর বাড়িতে আছে। ফোনে কথা বলতে থাকা: "ফাইলটা পেয়েছিস? কী আছে ভেতরে?"
    বলতে থাকা: "সব আছে। মানুষের কান্না আছে। মানুষের রাগ আছে। মানুষের নিশ্বাস আছে।"
    মিলা চুপ করে থাকা। তারপর বলতে থাকা: "আমারও কিছু জিনিস দিতে চাই। আমার ডায়েরি। যখন থেকে শহরে আসছি, লিখি। কবিতা না... গদ্য না... শুধু যন্ত্রণার খতিয়ান।"

    পরের দিন মিলা আসা। একটি পুরনো নোটবুক হাতে করে আনা। পাতা উল্টাতে থাকা। হাতের লেখা, কখনো কাঁচা, কখনো জোরালো। একটি পাতায় লেখা: "আজ প্রথম নাচলাম। দর্শক ছিল পাঁচজন। তাদের চোখে আমি মানুষ না, জিনিস। জিনিসের দাম আছে, মানুষের অসম্মান।" আরেক পাতা: "বাবা ফোন দিয়েছে। টাকা চাইছে। আমি কাঁদিনি। টাকা পাঠিয়েছি। কাঁদলাম যখন মা বলল, 'মা, তুই ভালো আছিস তো?' ভালো আছি মানে কি? দেহ আছে, তাই ভালো আছি?"

    আমার নিজের ফাইলগুলোর সাথে মিলার ডায়েরি মেলানো। আমার পর্যবেক্ষণ, Faceless_07 এর তথ্য, মিলার অভিজ্ঞতা... তিনটা স্রোত একসাথে মিশে যাওয়া। একটা পাগলা নদী তৈরি করা। যে নদীতে মুখোশ ভাসছে, ভেসে যাচ্ছে সমুদ্রের দিকে।

    "ছায়া ও মুখশ্রী" নামটাই ঠিক আছে। কিন্তু এটা শুধু বই না... এটা হবে আয়না। যে আয়নায় আমরা আমাদের নিজেদের মুখ দেখব... যে মুখ আমরা ভুলতে বসেছি।

    রাইসের প্রেসে ফোন করা। কথা বলতে থাকা: "চাচা, বইটা বানাতে চাই। কিন্তু... বিপদ আছে।"
    রাইস চুপ করে থাকা। তারপর বলতে থাকা: "বিপদ তো সবসময় আছে। ৯২  সালে আমরা যে বই ছাপাতাম, টাইপসেট করে, রাতের অন্ধকারে বিলি করতাম... তখনও বিপদ ছিল। এখন বিপদ পাল্টেছে। তখন বোমা পড়ত, এখন ডাটা চুরি হয়। কিন্তু কথা বলার ইচ্ছাটা একই থাকে।"

    তাঁর কথা শুনে সাহস পাওয়া। রাইস আসলে কোন যুগের মানুষ? তিনি বলেন, "আমি এখনো লিনোটাইপ মেশিন রাখি। নতুন প্রেস আছে, পুরনো প্রেসও আছে। পুরনোটা কাজ করে ,  দেখলে মনে পড়ে... শব্দও আছে, ছাপার শব্দ... ক্লিক ক্লিক..."

    তাঁর সাথে দেখা করার দিন ঠিক করা। মিলা আর আমি যাব।

    কিন্তু কীসের ভয়? ফোনে আবার ডিজিটাল সুস্থতা অ্যাপের নোটিফিকেশন আসা: "আপনার সাম্প্রতিক ব্রাউজিং প্যাটার্নে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা গেছে। আমরা আপনাকে সাহায্য করতে চাই।" সাহায্য? কীসের সাহায্য? চুপ করিয়ে দেওয়ার সাহায্য?

    আরেকটি মেসেজ আসা: "আপনার বন্ধু (Faceless_07) হয়তো মানসিক কষ্টে আছে। তাকে পেশাদার সাহায্য নিতে উৎসাহিত করুন।" তারা জানে। তারা সব জানে। তারা শুধু নাম না জানা।

    মিলার সাথে কথা বলতে থাকা: "ফাইলগুলো যদি ছাপাতে যাই... তারা ধরবে না?"
    মিলা মাথা নাড়া: "ধরবে যদি চায়। কিন্তু আমরা যদি না বলি... তাহলে আমাদের মুখ থাকবে কেন? মুখের দরকারই বা কি?"

    সে তার ব্যাগ থেকে একটি পুরনো ফটো বের করা। গ্রামের বাড়ির ছবি। আম, জাম, কাঁঠাল গাছ। দোতলা ঘর। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছোট মিলা, স্কুল ড্রেস পরা, হাসিমুখে। বলতে থাকা: "এই ছবির মেয়েটার মুখ ছিল। এখনো আছে। ওই মুখটাকে আমি হারাতে দেব না। তুইও হারাস না।"

    রাইসের প্রেসে যাওয়ার আগের রাত। ঘুম আসছে না। কম্পিউটার স্ক্রিনে ফাইলগুলো দেখতে থাকা। একটা একটা করে পড়া। Faceless_07 এর কিছু লেখা:

    "গবেষণা নোট: সাক্ষাৎকার ৪৭। বিষয়: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সে বলে, 'আমরা প্রজেক্ট তৈরি করি। কপি করি। পেস্ট করি। মনে হয় না কিছু শিখি। শুধু সার্টিফিকেটের জন্য। সার্টিফিকেটটা একধরনের মাস্ক। যে মাস্ক পরে চাকরি পাওয়া যায়।' প্রশ্ন: তুমি কি মুখোশ পরো? উত্তর: 'প্রতিদিন। নিজেকে বোঝাতে পারি না যে এই মুখোশ আমার না।'"

    "ফিল্ড নোট: আজ গিয়েছিলাম শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায়। চায়ের দোকানে বসে কথা শুনেছি। এক শ্রমিক বলছে, 'স্যার, আমাদের তো সময় নেই মুখোশ পরার। আমরা মুখ মুছি রুমাল দিয়ে, সেই রুমালেই ময়লা থাকে। কিন্তু টিভিতে দেখি, বড়লোকেরা কত সুন্দর মুখোশ পরে। আমাদের মুখোশ জোটে না।'"

    "উপলব্ধি: এই শহরে দুধরনের মানুষ। যারা মুখোশ পরে চিনতে পারে। আর যারা মুখোশ পরার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। দ্বিতীয় গ্রুপটাই বেশি বিপদে। কারণ তাদের চেহারা আসল, কিন্তু কেউ দেখে না।"

    এইসব নোটের পাশাপাশি আমার নিজের লেখা রাখা: "আমি বেশ্যালয়ে যাই। সেখানে মেয়েরা তাদের মুখোশ খুলে রাখে। কারণ সেখানে মুখের দরকার নেই। দেহের দাম আছে। কিন্তু বাইরে আমরা মুখোশ পরে থাকি, কারণ সেখানে দেহের দরকার নেই, মুখের দাম আছে।"

    দুটো জগত। একটায় মুখোশ খোলা, একটায় মুখোশ পরা। আমরা কোন জগতে বাস করছি? না... আমরা দুই জগতেই বাস করছি। একই সময়ে।

    সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই বিশাল আর্কাইভের মধ্যে থেকে কী নিয়ে বই বানাব? সবটা না? কিছু অংশ? Faceless_07 কি চাইবে? সে তো অনুমতি দিয়েছে না।

    মিলা বলছে: "সব নিয়ে বই বানাও। কিন্তু নাম দিও না। শুধু বলো, 'এইসব কথা যার, তার নিজের।' মানুষ নিজেই বুঝে নেবে।"

    সকাল হওয়া। রাইসের প্রেসে যাওয়ার জন্য তৈরি হওয়া। ফাইলগুলো একটি পেনড্রাইভে কপি করা। ব্যাকআপ ক্লাউডে রাখা (এনক্রিপ্টেড)। পুরনো ফোনটা বাড়িতেই রাখা। নতুন একটা সাধারণ ফোন নেওয়া, যাতে শুধু কল করা যায়।

    বাইরে বের হওয়ার আগে আয়নায় নিজের মুখ দেখা। মুখটা কি আমার? নাকি আমি নিজেই এক ধরনের মুখোশ? যাকে "আরিয়ান" বলে ডাকা হয়?

    রাস্তায় নামা। অটো ধরতে যাওয়া। ড্রাইভার মোবাইলে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালাচ্ছে। বলছে: "হ্যাঁ স্যার, পৌঁছে দিচ্ছি... কি বললেন? ওটা ঠিক আছে... হ্যাঁ স্যার, মাস শেষে টাকা দিব..."

    তার কন্ঠে একটা অসহায়ত্ব। সে কি তার বসের সাথে কথা বলছে? নাকি শুধু ভান করছে? অন্য কেউ শুনছে কিনা, তার জন্য ভান?

    অটো থামানো। রাইসের প্রেসের গলির মুখে নামা। গলিটি সরু। দুই পাশে পুরনো দালান। দেয়ালে শেওলা। পায়ের নিচে পানি জমে আছে।

    হঠাৎ পেছন থেকে আওয়াজ শুনতে পাওয়া: "এই যে, আরিয়ান!"

    ঘুরে দাঁড়ানো। সেই সহপাঠী। তার সাথে আরও দুজন। মুখ গম্ভীর।

    "কোথায় যাওয়া এত সকাল?"
    "ঘুরতে।"
    "কাগজ-কলম নিয়ে ঘুরো? দেখি তো ব্যাগে কী আছে?"

    মনটা দ্রুত স্পন্দিত হওয়া। কথা জোগাড় না হওয়া।

    ঠিক তখনই মিলার কণ্ঠ শুনতে পাওয়া। সে গলির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে, জোরে জোরে হাসতে থাকা: "অই, তুমি এখানে! আমি তো বললাম আমার সাথে দেখা করবে! দেরি হয়ে গেছে!"

    সে দ্রুত আমার হাত ধরে টানতে থাকা। সহপাঠী আর তার সঙ্গীরা একটু পিছু হটে দাঁড়ানো। মিলা তাদের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকা: "আরে, আপনারা... একটু সরে দাঁড়ান... আমাদের হুরি হুরি..."

    সে আমাকে জোরে টেনে গলির ভেতরে নিয়ে যাওয়া। দৌড় শুরু করা। পেছনে তাদের পদশব্দ শুনতে পাওয়া না। লুকিয়ে একটি বাড়ির পেছনে দাঁড়ানো। শ্বাস নিতে নিতে।

    "তারা... তারা কী চায়?"
    "তারা চায় আমরা কথা না বলি। তুই যা করছিস... তারা জানতে পেরেছে।"

    "কীভাবে?"
    "ফোন... ইন্টারনেট... অথবা তোর সেই সহপাঠী... যে বেশ্যালয়ে দেখেছিল।"

    মনটা হঠাৎ ভারী হওয়া। এইটাই কি শেষ? এখনই ধরিয়ে দেবে?

    মিলা আমার হাত চেপে ধরতে থাকা: "ভয় পাস না। রাইস চাচার প্রেস এগিয়ে। আমরা পারি।"

    আবার হাঁটা শুরু করা। গলির শেষে একটি লোহার গেট। গেটের পাশে নামপ্লেট: "রাইস প্রিন্টিং প্রেস। স্থাপিত ১৯৫৮।"

    গেট ঠেলা। ভেতরে ঢোকা। একটি খোলা জায়গা। একপাশে নতুন ডিজিটাল প্রেস মেশিন। আরেকপাশে পুরনো লিনোটাইপ মেশিন, ধুলোয় ঢাকা। রাইস চাচা দাঁড়িয়ে আছেন, চশমার পিছনে চোখে এক ধর্নের জ্বালা।

    "এসো বাবারা। সময় কম।"

    তার সামনে বসা। পেনড্রাইভটা দেওয়া। তিনি কম্পিউটারে লাগানো। ফাইলগুলো ওপেন করতে থাকা।

    দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকা। শুধু স্ক্রল করা। কখনো থামা। কখনো একটু নিশ্বাস ফেলা।

    শেষে মুখ তুলে তাকানো। "এগুলো... এগুলোতো ............."
    "চাচা, পারবেন?"
    "পারব না? কেন পারব না?  বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছি। এখন ডিজিটাল বুলেটের সামনে ?"

    তিনি উঠে দাঁড়ানো। লিনোটাইপ মেশিনের দিকে হাঁটা। হাত বুলিয়ে দিতে থাকা: "এই মেশিনটা এখনো কাজ করে ।  এর আওয়াজ আমি এখনো শুনতে পাই। ক্লিক ক্লিক। সেই ক্লিকের মধ্যে সত্যি কথা লুকানো থাকে। এখনকার মেশিনে আওয়াজ নেই। নীরব। কিন্তু নীরব কথাও কেউ শুনতে পায়।"

    ফিরে এসে বলতে থাকা: "বই বানাব। ১০০ কপি। বেশি না। বেশি হলে ধরা পড়ে যাবে। এই ১০০ কপি হাতে হাতে ঘুরবে। কেউ পড়বে। কেউ পুড়িয়ে ফেলবে। কেউ লুকিয়ে রাখবে। কিন্তু কথা ছড়াবে। মুখোশের নিচের মুখগুলোর কথা।"

    "নাম দিবো কি?"
    "তোমার নাম দিও। আরিয়ান। কারণ নাম দিলে মানুষ বিশ্বাস করে। নামহীন কথাকে মানুষ ভয় পায়।"

    "Faceless_07 এর কথা?"
    "তার নাম দিও না। শুধু লেখো: 'একজন মুখহীনের সংগৃহীত।' মানুষ বুঝবে।"

    মিলার ডায়েরির কথা বলতে থাকা। তিনি রাজি হওয়া: "মেয়েটার কথাও থাকবে। তার মুখও আছে।"

    সব ঠিক করা। বইয়ের ফরম্যাট, কাগজ, বাঁধাই। সব কথা বলা। তিনি বলতে থাকা: "এক সপ্তাহ সময় দাও। তারপর এসে নিও। কিন্তু সাবধান। তোমরা এখন লক্ষ্যবস্তু।"

    বের হওয়ার সময় তিনি আবার ডাকা: "আরিয়ান।"

    "তোমার মুখ দেখে আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ছে। আমরাও এমনই ছিলাম। মুখোশ খুলতে চাইতাম। পারিনি সবসময়। কিন্তু চেষ্টা করেছি। এই চেষ্টাটাই জরুরি।"

    প্রেস থেকে বের হওয়া। গলিতে আবারো সেই শূন্যতা। কিন্তু এবার ভয় নেই। একটা উদ্দেশ্য আছে।

    মিলার সাথে রিকশায় করে ফেরা। সে বলতে থাকা: "আমার একটা গান মনে পড়ছে। । 'মুখোশ পরে কে চলেছে রে... আসল মুখ খুঁজে নে...'"

    আমি হাসি। এতদিন পর প্রথম স্বাভাবিক হাসি।

    বাসায় ফেরা। ফোনটা দেখি। সাতটি মিসকল। বাবার, মায়ের, অজানা নম্বর থেকে। সহপাঠীর একটি মেসেজ: "তুমি বিপদে পড়বে। সাবধান।"

    মেসেজ ডিলিট করা। ফোন বন্ধ করা।

    বিছানায় শুয়ে ছাদের ফ্যান দেখতে থাকা। ফ্যানটা আজকে অন্যরকম শব্দ করছে। ক্লিক ক্লিক না... গুঞ্জন না... যেন একটা গান। একটা পুরনো গান, যে গানে মুখোশ খোলার কথা বলা হয়।

    চোখ বন্ধ করা। আবার সেই স্বপ্ন। হলরুম। কিন্তু এবার শুধু আমি একা নই। Faceless_07 আছে, মিলা আছে, রাইস চাচা আছে, বারিস্টার মেয়েটি আছে, বইয়ের দোকানের মালিক আছে। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের মুখে মাস্ক। হঠাৎ মিলা তার মাস্ক খুলে ফেলছে। তার মুখ... উজ্জ্বল, কাঁচা, সত্যি। তারপর আমি আমার মাস্ক খুলছি। পরে একে একে সবাই।

    কিন্তু এবার মাস্ক খুললে কি হবে? আমরা কি আমাদের আসল মুখ দেখতে পাব? নাকি দেখব মাস্কের নিচে আরেকটি মাস্ক? হয়তো... হয়তো মুখোশ খোলার মানেই হলো এই খোলার চেষ্টা করা। শেষ মুখ হয়তো কখনোই দেখা যাবে না। কিন্তু চেষ্টাটাই মুখ।

    এক সপ্তাহ অপেক্ষা। এই এক সপ্তাহ যেন এক জীবন। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় থাকা। মিলার বান্ধবীর বাড়ি, তার অন্য বন্ধুর ফ্ল্যাট। ফোন ব্যবহার না করা। টিভি না দেখা। শুধু জানালা দিয়ে মানুষের মুখ দেখতে থাকা।

    একদিন হঠাৎ দেখতে পাওয়া... রাস্তার পাশের একটি বিলবোর্ড। নতুন মুখ। একজন নেতার। নিচে লেখা: "ডিজিটাল ভারতবর্ষ। মুখে হাসি, মনে বিশ্বাস।" কিন্তু ছবির মুখে হাসি এতটাই নিখুঁত, এতটাই পরিপাটি যে সেটা মুখ না, মাস্ক।

    আরেকদিন একটি চায়ের দোকানে বসে শুনতে পাওয়া দুজন বয়স্ক মানুষের কথা। একজন বলছে: "আমার নাতি সারাদিন মোবাইলে। আমি বলি, বই পড়। সে বলে, বইয়ে কী আছে? সব তো মোবাইলে আছে।"
    অন্য জন বলছে: "আমার নাতি তো বলে, আমরা মুখোশ জেনারেশন। আসল মুখ কি, জানি না।"

    মুখোশ জেনারেশন। এই কথাটা মনে দাগ কাটা। আমরা মুখোশ জেনারেশন। যে জেনারেশন জন্মায় মুখোশ পরে। বড় হয় মুখোশ বদলাতে বদলাতে। মরে যায় মুখোশ নিয়ে।

    কিন্তু এই জেনারেশনের মধ্যে কেউ কেউ তো মুখোশ খুলতে চায়। Faceless_07 চেয়েছে। মিলা চায়। আমি চাইছি। রাইস চাচা চেয়েছিলেন।

    এক সপ্তাহ পরে রাইসের প্রেসে ফোন করা। তিনি বলেন: "হ্যাঁ, হয়ে গেছে। আসো। কিন্তু সাবধান করে দিচ্ছি... কেউ তোমাদের অনুসরণ করছে কিনা, খেয়াল করো।"

    যাওয়ার পথে খুব সতর্ক হওয়া। রিকশা বদলানো। হাঁটা পথে পেছনে তাকানো। কেউ আছে কিনা।

    প্রেসে পৌঁছানো। রাইস চাচা একটি কার্টন বক্স এগিয়ে দিচ্ছেন। ভেতরে বই। কাগজের গন্ধ মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া।

    প্রথম বইটা হাতে নেওয়া। মলাট: সাদা কাগজ। শিরোনাম: ছায়া ও মুখশ্রী। নিচে: আরিয়ান। আরও নিচে: "Faceless_07 ও অন্যান্য মুখহীনদের কণ্ঠস্বর সংগৃহীত। মিলার ডায়েরি সংযুক্ত।"

    পাতা উল্টানো। প্রথম পাতায় লেখা: "এই বইটি কোনো উপন্যাস নয়। এটি একটি আয়না। আপনি যখন পড়বেন, আপনার নিজের মুখ দেখতে পাবেন। যে মুখ হয়তো আপনি ভুলে গেছেন।"

    আমার লেখা, Faceless_07 এর তথ্য, মিলার ডায়েরি... সব মিশে একাকার হয়ে গেছে। কোলাজ। প্যাচেল। জীবনের টুকরো।

    রাইস চাচা বলতে থাকা: "১০০ কপি। ২০ কপি আমি বিলি করব। বাকি ৮০ তুমি নাও। কিন্তু সাবধান। এটা এখন শুধু বই না... এটা এখন দলিল।"

    বাক্সগুলো নিয়ে বের হওয়া। রিকশায় করে মিলার বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়া।

    রাস্তায় যেতে যেতে মিলা বইয়ের একটি কপি খুলে পড়তে শুরু করা। সে চুপ করে পড়তে থাকে। তারপর হঠাৎ কাঁদতে শুরু করা।

    "কাঁদছিস কেন?"
    "কারণ... এই কথাগুলো আমি এতদিন নিজের মনে চেপে রেখেছিলাম... এখন দেখছি অন্যরাও একই কথা ভাবে... আমরা একা নই... আমরা অনেক... অনেক মুখোশ পরা মানুষ... যারা মুখোশ খুলতে চায়..."

    বাসায় পৌঁছে বইগুলো লুকানো। আলমারির নিচে, বিছানার নিচে।

    তারপর অপেক্ষা শুরু করা। প্রথম বইগুলো বিলি করা হবে কখন? কী প্রতিক্রিয়া হবে? কেউ কি পড়বে? নাকি সব পুড়িয়ে ফেলা হবে?

    সন্ধ্যায় মিলা বলছে: "একটা কাজ করবো... আমি নাচের সময় বইয়ের কথা বলবো। যারা আসে, তাদের বলবো।"
    "বিপদ হবে না?"
    "হবে। কিন্তু যদি না বলি... তাহলে আমার নাচের কী অর্থ? নাচটাও তো একধরনের কথা বলা।"

    রাত জেগে বসে থাকা। একটি বই হাতে নিয়ে পাতার পর পাতা পড়তে থাকা। এই যে কথাগুলো... এগুলো কি সত্যি? নাকি শুধু আমাদের বিভ্রম?

    হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া... Faceless_07 এর শেষ মেসেজ: "তাদের টুলস আছে। কিন্তু আমাদের শব্দও আছে।"

    আমাদের শব্দ আছে। এই বইটা সেই শব্দের মূর্ত রূপ। কাগজে বন্দী শব্দ। যে শব্দ হয়তো কোনোদিন জেগে উঠবে।  মনে আগুন ধরাবে। মুখোশ পুড়িয়ে ফেলবে।

    চোখ বন্ধ করা। আবার সেই গান শুনতে পাওয়া: "মুখোশ পরে কে চলেছে রে... আসল মুখ খুঁজে নে..."

    এক সপ্তাহের মধ্যে এই বই ১০০ জায়গায় পৌঁছে যাবে। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়বে। মানুষ পড়বে। কেউ বিরক্ত হবে। কেউ ভয় পাবে। কেউ সাহস পাবে।

    এবং আমি... আমি এখন মুখোশের জগতে মুখোশহীন এক মানুষ। যে মুখ খুঁজছে। নিজের মুখ। সবার মুখ।

    কারণ, শেষ পর্যন্ত, মুখোশের নিচেই থাকে মানুষ। আর মানুষের মুখই শেষ সত্য। এই সত্যটা মনে রেখে... লিখতে থাকা। দেখতে থাকা। বেঁচে থাকা।

    সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে। এখন শুধু চলার পালা। মুখোশের জগতে মুখ খোঁজার পালা।
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত প্রতিক্রিয়া দিন