এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  •  অধ্যায় ২ : মুখের বাজার

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | ৭০ বার পঠিত
  • 0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5
    বাসার দরজা খোলা। লকটা শিকায় আটকে যাওয়ার চেষ্টা করা। ঠেলে দেওয়া। বের হওয়া। করিডোরের ফ্যান অফ থাকা। গুমোট গরম।

    লিফটে দাঁড়ানো। নিঃশব্দে নামা। চতুর্থ তলা থেকে প্রথম তলায়। মাঝখানে থামা না। লিফটের দেয়ালে স্ক্রিন। চলমান ছবি। একটি নতুন সাবস্ক্রিপশন সার্ভিসের বিজ্ঞাপন। "আপনার জীবনকে সাজান, মাসে মাত্র পাঁচশ টাকায়।" একজন মডেলের মুখ, অতিরিক্ত সাদা করা। হাসি দেখানো। দাঁতের মাড়ি পর্যন্ত দেখা যাওয়া। লিফটের অন্য যাত্রী-বুড়ো কাকু। চোখ স্ক্রিনের দিকে আটকে থাকা। দেখতে থাকা। কিছু না বলা। কিছু না ভাবা। শুধু দেখাই কাজ।

    রাস্তায় পা রাখা। গরম আস্ফাল্টের গন্ধ। গাড়ির ধোঁয়া। হকারদের চিৎকার। "আইসক্রিম... ঠাণ্ডা আইসক্রিম..." "চাইনিজ মনুচি..." প্রতিটি বিলবোর্ডে মানুষের মুখ। বিশালাকার। দশ ফুট উঁচু হাসি। ক্রেতাদের মুখ, তারা যে পণ্য কিনছে, তাতে পরম তৃপ্তিতে ভেসে যাওয়া। মডেলের নিখুঁত ত্বক। কোনো লোম নেই। কোনো রোমকূপ নেই। শুধু মসৃণ প্লাস্টিকের আবরণ, যেন মানুষের ছাঁচে ফেলা জেলি। দাঁত এত সাদা যে দিনের বেলায়ও আলো ছড়াচ্ছে। লিপস্টিক লাল, টমেটো স্যুপের মতো। না, ক্যান্ডির মতো। চুষে খাওয়ার মতো। "আপনিও এমন হাসতে পারেন। মাত্র দুই হাজার টাকায় এই টুথ পেস্ট কিনুন।" "আপনার জীবনেও এই উজ্জ্বলতা আনুন। এই ফেস ক্রিম মাত্র এক সপ্তাহে ফল দেবে।" একটি ক্রিম। একটি লোশন। একটি সার্জারির ছবি, আগে-পরে। ভয়ঙ্কর রূপান্তর।

    হাঁটতে থাকা। ফুটপাথের গ্রিলের উপর পা ফেলা। কদম ফেলা। এক গ্লাস পানি খোঁজা। গলা শুকিয়ে আসা। কফি শপের সামনে দাঁড়ানো। কাঁচের দরজা। ভিতরে ঠাণ্ডা হাওয়া দেখা যাওয়া। এসি চালু থাকার নিশান। ঢোকা।

    ঠাণ্ডা হাওয়া শরীরে লাগা। কাঁপুনি দেওয়া। একরকমের ইংরেজি গান, যার সুর মনে থাকে না। বীট শুধু বুকে ধাক্কা দেওয়া। কাউন্টারে বারিস্টার মেয়েটি দাঁড়ানো। ইউনিফর্ম-সাদা শার্ট, কালো এপ্রোন। তার মুখ দেখা। একটি পেশাদার হাসি। ঠোঁটের কোণে টানা। চোখে হাসি না। "স্যার, অর্ডার?" তার চোখের নিচে কালি। স্ক্রিনের আলোয় জ্বলা রাতের ছাপ। তার হাতের কব্জিতে একটি ছোট ট্যাটু, শুধু অংশ দেখা যাচ্ছে ইউনিফর্মের হাতা থেকে। ফুলের মত কিছু। তবু হাসি বজায় রাখা। মুখের ভাব বজায় রাখা। গ্রাহক সেবার মুখোশ। মাস্কের উপর মাস্ক।

    "একটা কোল্ড কফি।"
    "সুগার?"
    "একটু।"
    "সাইজ?"
    "মিডিয়াম।"

    টাকা দেওয়া। রিসিট নেওয়া। অপেক্ষা করা। দাঁড়িয়ে থাকা। তার হাতের কাজ দেখতে থাকা। মেশিনে শট দেওয়া। বরফ ভাঙা। সিরাপ মেশানো। শেক করা। ঝাঁকানো। একটি প্লাস্টিকের কাপে ঢালা। ঢাকনা দেওয়া। ন্যাপকিন দেওয়া। "স্যার, আপনার অর্ডার রেডি।" আবারও একই হাসি। চোখে একই ক্লান্তি।

    কফি নিয়ে একটি কোণার টেবিলে বসা। জানালার পাশে। বাইরে রাস্তা দেখা যাওয়া। মানুষ হাঁটা। চারপাশের মানুষদের পর্যবেক্ষণ করা। জোড়ায় জোড়ায় বসা। দম্পতি। বন্ধু। কলিগ। কথা বলা। মাঝে মাঝে ফোন চেক করা। কথার মাঝে বিরতি নেওয়া। একটি নোটিফিকেশনের  অপেক্ষা করা। আঙুলের একটা টোকা দেওয়া। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা। মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে যাওয়া। তারপর আবার কথা শুরু করা। কিন্তু সেই কথার ধারা ভেঙে যাওয়া। প্রত্যেকে একে অপরের মুখ দেখছে, কিন্তু আসলে দেখা হচ্ছে পর্দা। পর্দায় নিজের প্রতিচ্ছবি। পর্দায় অন্যের জীবন। একটি ত্রিমাত্রিক জীবন, দ্বিমাত্রিক পর্দায় দেখানো। সমতল।

    একটি দম্পতি দুই টেবিল দূরে। মেয়েটি ছেলেটির দিকে তাকিয়ে কথা বলছে। তার হাত টেবিলের উপর, খোলা। আঙুলগুলো ছড়ানো। ছেলেটির আঙুল ফোনের স্ক্রিনে। টাইপ করতে থাকা। তিনি হয়তো শুনছেন। হয়তো না। মাথা নড়াচ্ছেন, "হুম" বলছেন। "আচ্ছা" বলছেন। মেয়েটির মুখে এক ধরনের অনুরোধ। একটি নিঃশব্দ আকুতি। চোখে একটা জল জল ভাব। "আমাকে দেখো। আসলে দেখো। শুধু এই মুহূর্তের জন্য ফোনটা নামাও। এই কফির স্বাদ নাও। আমার কথাগুলো শুনো।" কিন্তু ছেলেটির দৃষ্টি আটকে আছে অন্য একটি বিশ্বে। একটি বানানো বিশ্বে। যেখানে সবকিছু নিয়ন্ত্রণযোগ্য। স্ক্রলযোগ্য। লাইকযোগ্য। শেয়ারযোগ্য। সেভযোগ্য। কিন্তু স্পর্শযোগ্য নয়।

    আমার নিজের ফোন বের করা। সাইলেন্ট মোডে। ক্যামেরা খোলা। জুম করা। দম্পতিটির একটি সুক্ষ্ম ছবি তোলা। তাদের মুখের ভাব ধারণ করার চেষ্টা করা। মেয়েটির ঠোঁটের কোণের কাঁপুনি। ছেলেটির ভ্রু কুঁচকানো। আমার গ্যালারিতে "Faces" নামের অ্যালবামে সেভ করা। আমার কালেকশন যোগ করা: "উদাসীনতা।" "নিরাশা।" "প্রতীক্ষা।" "ডিজিটাল প্রেম।" "একতরফা কথোপকথন।"

    একটি পুশ বিজ্ঞপ্তি ভেসে আসা। ভাইব্রেশন হওয়া। "আপনি 'কফি কর্নার'-এর কাছাকাছি আছেন! আজই চেখে দেখুন তাদের নতুন আভোকাডো ল্যাটে, ৫০% ছাড় শুধু আজ!" গুগল ম্যাপস খোলা থাকতে হবে। লোকেশন সার্ভিস অন থাকতে হবে। তারা জানে আমি কোথায় আছি। তারা আমার গতিপথ ট্র্যাক করছে। তারা অনুমান করে আমি কি খেতে চাই। তারা আমার স্বাদ সম্পর্কে ডাটাবেস তৈরি করছে। আমার মুখের ভাব সম্পর্কে না জেনেই। আমার ভিতরের ক্ষুধা সম্পর্কে না জেনেই।

    বাইরে বেরিয়ে আবার হাঁটা। রোদ চড়া। কপালে ঘাম জমা। একটি বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়ানো। পাঠ্যবইয়ের রঙিন মলাট। "দশম শ্রেণির রসায়ন।" "বাংলা সহপাঠ।" রোমান্টিক উপন্যাসের  বুক কভার। বুকের টাইটেল ইংরেজিতে। "Love in the Rain." "Forever Yours." সেলফ হেল্প গাইড। "আপনার জীবন বদলে দিন ৭ দিনে।" "সফলদের ১০টি অভ্যাস যারা ভোরে ৪টায় ওঠে।" "লাখ টাকা আয়ের উপায়।" সমালোচনামূলক কোনো বই নেই। ইতিহাসের বই সরলীকৃত। "মহান নেতা"-এর ছবি। গভীর বিশ্লেষণ নেই। রাজনৈতিক গ্রন্থের তাক ফাঁকা। একেবারে খালি। একটি ছোট, হাতে লেখা নোটিশ সাঁটা: "নির্বাচিত বই শুধু বিশেষ অনুরোধে। দোকান মালিকের সাথে কথা বলুন।"

    মালিকের দিকে শুধু তাকানো।  তিনি দোকানের ভিতরে একটা টুলে বসে আছেন। একটা পুরনো বই  হাতে। পাতা উল্টাতে থাকা। তিনি জানেন। তিনি কিছু বলেন না। শুধু একটি  মাথা ঝাঁকানো ম্লান হাসি। বইয়ের ভিতরে ঢুকো না। বাইরে থাকো। স্ক্রিন দেখো। এটাই সহজ।

    হাঁটতে শুরু করা। হকারদের ডাক শোনা। "দাদা, একটু দাঁড়ান। এই শার্টটা দেখুন না। একদম আসল কটন।" "ভাই, এই সানগ্লাসটা তো আপনার জন্যই বানাইছে।" তাদের মুখে চাপা হতাশা। রোজগারের চাপ। মুখে জোর করে হাসি আনা। চোখে ভবিষ্যতের কোন হদিস না থাকা।

    একটা মোড়ে আসা। একটা পুরনো বাড়ি। দেয়ালে পোস্টার। রাজনৈতিক দলের মুখ। বড় বড় হাসি। "আপনার ভোট আমাদের হক।" "উন্নয়নের রথ চালিয়ে যাওয়া।" পোস্টারের নিচে ছোট হরফে লেখা: "ডিজাইন্ড এন্ড প্রিন্টেড বাই: আলফা প্রিন্টার্স।" মুখগুলো একই রকম। একই পোজ। একই প্রতিশ্রুতি। একই আশেপাশের গলিগুলোতে কাদা। ড্রেনের দুর্গন্ধ- বাতাসে ভাসা।

    একটা ফুটপাথের চা দোকান। সস্তা চায়ের কাপ। ধোঁয়া ওঠা। পাশে একজন রিকশাওয়ালা বসে চা খাওয়া। তার মুখ কালো। রোদে পোড়া। ঘামে ভেজা। সে একটা সস্তা সিগারেট ধরাইয়া। ধোঁয়া ছাড়তে থাকা। আমার দিকে তাকানো। একটু হাসি দেওয়া। "কই গো, এই গরমে বাহির হইছেন?" আঞ্চলিক ভাষা। গ্রামীণ সুর।

    "হাঁ, একটু ঘুরছি।"
    "ঘুরেন... আমাদের তো ঘুরতে হয় সারাদিন। রিকশা চালাইতে চালাইতে। পেটের তাগিদে।"

    তার মুখের ভাব দেখা। ক্লান্তি। কিন্তু এক ধরনের গর্বও। নিজের শ্রমের উপর গর্ব। মুখোশ না। সত্যি মুখ। ময়লা। ধুলো। কিন্তু সত্যি?

    "আপনার ফোনটা কি দেখাইতে পারেন? সময় কটা হইছে?"
    ফোন বের করে সময় দেখা। "বেলা তিনটা বেজে পনের মিনিট।"
    "ধন্যবাদ। এখনই আরেকটা রাউন্ড দিতে হবে। নাহলে ক্যাঃটা উঠব না।"

    সে উঠে দাঁড়ানো। রিকশায় চড়া। প্যাডেল ঘুরানো। ধীরে ধীরে দূরে যাওয়া। তার পিঠ দেখতে থাকা। মাথার উপর একটা ময়লা কাপড়। ঘাড় মুছতে থাকা।

    আমার ফোনে আবার বিজ্ঞপ্তি আসা। "আপনার আশেপাশেই: 'মাঠা কিং'! গরমে স্বস্তি পেতে আজই ভিজিট করুন।" লোকেশন আবার ট্র্যাক করা। আমি যে চায়ের দোকানে বসে আছি, সেটা তারা জানে না। শুধু জানে আমি এই এলাকায় আছি। তারা অনুমান করে আমি মাঠা খেতে চাইতে পারি। তাদের ডাটাবেসে হয়তো লেখা আছে: "গরমে মানুষ মাঠা খায়।"

    ফোন বন্ধ করার ইচ্ছা করা। কিন্তু পারা না। মাথায় চলে আসা: ফোন বন্ধ করলে কি হবে? যদি কেউ কল করে? যদি জরুরি কিছু হয়? যদি বাবা-মা ডাকে? যদি কলেজ থেকে কোনো নোটিশ আসে? এই "যদি" গুলোই শেকল।

    ফোনটা পকেটে পুরা। চায়ের দাম শোধ দেওয়া। আবার হাঁটা শুরু করা।

    একটা পার্কের সামনে আসা। গেট খোলা। ভিতরে কিছু বৃদ্ধ মানুষ বসা। তাস খেলা। গল্প করা। তাদের মুখে হাসি। প্রকৃত হাসি। দাঁত নেই। চোখে ঠিকরে পড়া আনন্দ। তারা ফোন ব্যবহার করে না। হয়তো করেন, কিন্তু এই মুহূর্তে করেন না। তারা একে অপরের মুখ দেখছে। ঠাট্টা করছে। "রে আব্দুল, তোর রাজা তো মরল আজ!" "তুই চুপ কর, আমি তোকে মাত দিমু এখন।"

    পার্কের বেঞ্চিতে বসা। তাদের খেলা দেখতে থাকা। তাদের মুখের ভাব দেখতে থাকা। ঈর্ষা। উল্লাস। হতাশা। সব স্পষ্ট। কোনো মাস্ক না। তাদের হয়তো মাস্ক পরার প্রয়োজন পড়ে না। কিংবা তারা মাস্ক খুলে ফেলেছে।

    হঠাৎ একটা শিশু কান্না শোনা। মেয়ে শিশু। কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসা। তার মা পিছনে ছুটতে থাকা। "মন্টু, থাম। দাঁড়া।" শিশুটি আমার কাছের বেঞ্চিতে আসা। লুকাতে চাওয়া। কান্না থামানো। তার মুখ দেখতে পাই। লাল হয়ে যাওয়া। চোখে পানি। নাক দিয়ে সর্দি পড়া। সে তার মায়ের দিকে তাকায়। ভয় পায়। তার মা এসে ধরে ফেলা। "কেন দৌড় দিলি? বলি নাই রাস্তায় দৌড় দিতে নাই?" শিশুর মুখে অপরাধবোধ। কিন্তু সত্যি। কোনো ভান? না। সে যা তাই দেখায়।

    মা তাকে কোলে তুলে নেয়। চুমু খায়। "চল বাসায় যাই। আইসক্রিম দিমু।" শিশুর মুখে হাসি ফুটে উঠা। অঝোর কান্নার পর পরই হাসি। এই রূপান্তর। এই সত্যি।

    আমার ফোন আবার বের করা। শিশুটির একটা ছবি তোলার লোভ সংবরণ করা। এই মুহূর্তটা ক্যামেরাবন্দি না করা। শুধু মনে রাখা। আমার কালেকশনে যোগ করা: "শিশুর সততা।"

    বেলা পড়তে শুরু করা। পার্ক থেকে বের হওয়া। রাস্তার বাতি জ্বলতে শুরু করা। দোকানগুলোতে নিওন সাইন জ্বলা। আরেকটা বিলবোর্ড। সেখানে একটা পরিবারের ছবি। বাবা, মা, দুটি সন্তান। সবার মুখে হাসি। তারা একটা নতুন কারখানার প্রোডাক্ট কিনছে। "পরিবারের সুখ, আমাদের অঙ্গীকার।" কিন্তু ছবিতে তাদের চোখ খালি। জবুথবু। হাসি মুখের মাস্কের নিচে খালি চোখ।

    হাঁটতে হাঁটতে একটা পুলিশ বক্সের সামনে আসা। সেখানে দুই পুলিশ অফিসার দাঁড়ানো। একজনের মুখ গম্ভীর। অন্যজন ফোনে কথা বলছে। হাসছে। তারপর মুখ গম্ভীর করা। উর্দি পরা কর্তৃত্বের মুখোশ।

    রাস্তা পার হওয়া। একটা শপিং মলের সামনে আসা। বিশাল কাঁচের দরজা। ভিতরে ঝলমলে আলো। এসির শীতল হাওয়া বাইরে বের হওয়া। দরজার সামনে দাঁড়ানো। ভিতরে মানুষ। শপিং ব্যাগ হাতে। তাদের মুখ দেখা। কেনাকাটার উল্লাস। নতুন জিনিস পাওয়ার আনন্দ। কিন্তু সেই আনন্দেও একটা তাড়না। "আরেকটা দরকার। আরেকটা কিনতে হবে। এইটার পর সেইটা।" তাদের চোখে লোভ। মুখে তৃপ্তি না।

    মলে ঢোকা না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকা। একটা কাঁচের বাক্সে বন্দী জীবনের খেলা দেখতে থাকা। যেন অ্যাকোয়ারিয়াম। আমরা সবাই মাছ। সারাদিন স্রোতে ভাসা। খাবার দেখলে লাফানো। আলো দেখলে এগোনো।

    হঠাৎ মনে পড়া গ্রামের কথা। ছোটবেলা। বর্ষাকাল। মাঠে জল জমা। দাদুর সাথে হাঁটা। দাদুর মুখ। তামাক খাওয়ার দাগ। গল্প বলতে বলতে চোখ উজ্জ্বল হওয়া। "আমার সময়ে... তখন এই রাস্তা ছিল না। " দাদুর মুখের মাস্ক, কুঁচকানো চামড়া। গভীর রেখা। জীবন দিয়ে আঁকা রেখা।

    এখন নেই। গ্রামে এখন মোবাইল নেটওয়ার্ক। ছেলেমেয়েরা ফোনে বুঁদ। দাদুর মতো গল্প বলা লোক নেই। মুখের ভাব বদলাচ্ছে। গ্রামেও এখন মুখোশ।

    ফিরে যাওয়ার পথ নেওয়া। বাড়ির দিকে হাঁটা। রাস্তায় ভ্যান চালানো মানুষের চিৎকার। "পানিফল... গরম পানিফল..." একটা ঠেলাগাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া। সেখানে একটা পরিবার। মা, বাবা, তিনটি ছেলে মেয়ে। তারা ভ্যান থেকে চিপ্স কিনছে। শিশুরা আনন্দে নাচছে। তাদের মুখ উজ্জ্বল। দরিদ্র, কিন্তু এই মুহূর্তে খুশি। বাবা-মায়ের মুখে ক্লান্তি, কিন্তু সন্তানের আনন্দ।
    এই সব মুখ। এই সব ভাব। ধনী-দরিদ্র। শহুরে-গ্রামীণ। শিক্ষিত-অশিক্ষিত। সবাই কোনো না কোনো মুখোশ পরে আছে। কেউ পেশাদারির। কেউ দারিদ্র্যের। কেউ আনন্দের। কিন্তু কেউ কেউ, ক্ষণিকের জন্য, খুলে ফেলে। সেই খোলা মুখগুলো দেখাই যেন প্রকৃত কাজ।

    বাসায় ফেরা। লিফটে উঠা। একই স্ক্রিন। একই বিজ্ঞাপন। "আপনার জীবনকে সাজান।" এবার হাসি দেওয়ার চেষ্টা না। শুধু তাকিয়ে থাকা।

    দরজা খোলা। ভিতরে ঢোকা। নিঃশব্দতা।

    ফোনটা টেবিলে রাখা। স্ক্রিনটা নিচে করা।

    জানালার পাশে দাঁড়ানো। নিচে শহরের আলো দেখতে থাকা। হাজার হাজার মুখ। হাজার হাজার মুখোশ।

    আজকের মুখগুলো মনে পড়া। বারিস্টার মেয়েটির পেশাদার হাসি। বইয়ের দোকান মালিকের চাপা সতর্কতা। রিকশাওয়ালার ক্লান্ত কিন্তু গর্বিত মুখ। তাস খেলোয়াড় বৃদ্ধের উল্লাস। শিশুটির অঝোর কান্না থেকে হাসিতে রূপান্তর। পুলিশ অফিসারের কর্তৃত্বের ভান। শপিং মলে লোভের মুখ। গ্রামের স্মৃতি।

    এই সবটা লিখতে বসা। কম্পিউটার খোলা। নতুন ফাইল তৈরি করা: "Masks_of_the_City.txt."

    আঙুল চলতে শুরু করা। অসমাপিকা ক্রিয়ায়। আঞ্চলিক শব্দ মিশিয়ে। যেমন: "ছেলেমানুষি করা।" "পইড়া থাকা।" "মাত দেওয়া।" "ক্যাঃটা উঠা।"

    লিখতে থাকা:

    "শহরটা মুখের বাজার। কিনতে বেচতে। নিজের মুখ বেচা। পরের মুখ কিনা। বারিস্টার মেয়েটির হাসি বেচা, মাসিকেও, বেতনের বিনিময়ে। রিকশাওয়ালার ক্লান্তি বেচা, ভাত কাপড়ের বিনিময়ে। আমার পর্যবেক্ষণ বেচা... কিচ্ছার বিনিময়ে না। ফ্রিতে। আর ফ্রি জিনিসের কেউ কদর করে না।

    গ্রামে গেলে দেখি, সেখানেও এখন বাজার লাগছে। মুখের বাজার। পোলাপানেরা ফোনে মুখ গুঁজা। বুদ্ধিরা টেলিভিশনের সামনে মুখ পোড়া। হাসি-কান্না সব স্ক্রিন থেকে শিখা। দাদুর গল্পের মুখ এখন হারাইয়া যাওয়া।

    কিন্তু আজ একটা শিশুর কান্না দেখলাম। সত্যি কান্না। মায়ের চুমু খাওয়ার পর হাসি। সত্যি হাসি। এই সত্যি মুখগুলাই এখন দুষ্প্রাপ্য জিনিস। এইগুলার দাম কত? এইগুলা বাজারে কিনতে পাওয়া যাবে? নাকি এইগুলাই একমাত্র জিনিস যা বেচা যায় না? যা কিনতে হয় না?

    আমি নিজের মুখটা খোঁজা শুরু করছি। বাজারে যেখানে সেটার কোন দাম নাই। হয়তো সেটাই আমার আসল সম্পদ। যেটা বেচলে ফুরায় না। কিনলে মেলে না।"

    সেভ করা। ফাইল বন্ধ করা।

    বিছানায় শুয়ে পড়া। আজকের সব মুখ মনে পড়া। তারা একটা কোলাজ তৈরি করে। শহরের পোট্রেট। মুখোশের পোট্রেট।

    চোখ বন্ধ করা। স্বপ্নে আবারও সেই হলরুম। কিন্তু এবার শুধু শহুরে মুখ না। রিকশাওয়ালা, বইয়ের দোকানদার, শিশু, বৃদ্ধ তাস খেলোয়াড়... তারাও সেখানে। সবাই মুখের মাস্ক খুলে ফেলছে। নিচে ফেলছে। তাদের মুখ মিশে যাচ্ছে এক আলোর মধ্যে।

    সেই আলোটা কি গ্রামের দাদুর মুখ? নাকি শিশুটির হাসি? নাকি আমার নিজের না-দেখা মুখ?

    জেগে উঠার আগে পর্যন্ত এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাওয়া।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন