এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অধ্যায় ৩: শিক্ষার কারখানা

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১২ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০৩ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • 0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 | 14 | 15
    বাবার ফোন কল । ভোরে ভোরে। রিংটোনটা সেই পুরানো লোকগান—"আমার ঘর খাঁড়া করবে কে"। বাবা অপেশাদার গায়ক, এইটাই সেট করছে। ভাইব্রেশন । হাতে নিয়া দেখি—বাবার ছবি। হ্যাঁ, এটাও সে ফোরস করে দিছে। "আনসার"।

    ঠোঁট শুকাইয়া যাওয়া। কল রিসিভ করা। বাবার গলা ভাঙা ভাঙা, পটেশিয়ামের ঘাটতি। "বাবা?"

    "উই... টিউশন ফি। সেমিস্টার ফাইনালের। কাল ডেডলাইন। কলেজ হইতে এসএমএস আসছে না? তুমি পড় না?"

    আমি পড়ি। কিন্তু দেখি না। অথবা দেখার ভান করি না। ডিজিটাল ব্যাংক অ্যাপ খুলি। বালান্স দেখি—যেমন তেমন। মায়ের সংসার খরচের টাকা। বাবার ওষুধের টাকা। আমার "হলুদ নীলের" ক্যাম্পাসের ফি।

    বাবার ক্যালকুলেশন শুরু হয়। "দেখ, সেমিস্টার ফি এক লক্ষ বিশ হাজার। ডেভেলপমেন্ট চার্জ আট হাজার। লাইব্রেরি ফি পাঁচ হাজার। এসএফ (স্টুডেন্ট  ফান্ড) তিন হাজার... যোগ কর দেখি?"

    আমি যোগ করি না। আমি শুধু শুনি। গলার ভিতর এক গ্লাস গরম দুধ আটকাইয়া যাওয়ার মত লাগে। প্রতিটি সংখ্যা এক একটি ইট। আমার বাবা-মায়ের সারা জীবনের সঞ্চয়ের দালান ভাঙছে। ভাঙছে আমার "ভবিষ্যৎ" বানানোর নামে।

    "বাবা, পরশু দিব।"
    "না, আজকে দিতে হবে। নইলে লেট ফি লাগবে। আরো পাঁচ হাজার।"

    আমার হাতের আঙুল নিজে নিজে ট্যাপ করে। "পে নাউ"। এক ক্লিকে এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার টাকা উড়িয়া যাওয়া। বাবার অ্যাকাউন্ট থেকে। একটি ব্লিঙ্ক। একটি কনফার্মেশন মেসেজ। "পেমেন্ট সাকসেসফুল। আপনার সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করি।"

    বাবা বলে, "দিয়াছ?"
    "হ্যাঁ।"
    "ভাল। পড়াশুনা কর। ভাল নম্বর আন। চাকরির জন্য প্রস্তুত হইও।"

    কল কাট। আমার কান এখনো তার গলার শব্দে ভরা। সেই "পড়াশুনা কর" কথাটা যেন হাজার বছর পুরানো মন্ত্র। কাজ করে না, কিন্তু বলতে হয়।

    কলেজে যাওয়ার পথ। বাসে উঠি। সিট নাই। দাঁড়াইয়া থাকি। জানালার ধারে এক বুড়ার পিঠের কাছে। মোবাইলে  নিউজ চলে। একই মুখ। একই টাই। একই কথা। "শিক্ষাখাতে যুগান্তকারী উন্নয়ন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার নতুন দিগন্ত।" তার নিচে টিকার টেপ: "কলেজ ছাত্রী আটক, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক মন্তব্যের অভিযোগে।"

    লোকগুলার মুখ। ঘুমে ঝিমাইছে। কেউ ফোনে রিলস দেখছে। কেউ হেডফোনে গান শুনছে। কিছু মুখে বিরক্তি। কিছু মুখে ফাকা ভাব। আমার নিজের প্রতিবিম্ব জানালায় দেখা যায়। আমার মুখটাও কি তেমনই ফাকা?

    কলেজ গেট। বিশাল সাইনবোর্ড। "গোল্ডেন স্টেট ইউনিভার্সিটি"। নিচে ইংরেজিতে লেখা—"Where Leaders Are Made"। গেটের পাশেই সিকিউরিটি ক্যাবিন। তারা ফেস রিকগনিশন ক্যামেরা দিয়া আমাদের ঢুকতে দেখে। প্রতিদিন আমার ডাটা স্টোর হয়। আমি কোথায় যাই, কখন যাই।

    ক্যাম্পাসে ঢুকি। সবুজ ঘাস। ফুলের বাগান। বিশাল বিশাল ভবন। কাচের দেয়ালে আকাশের প্রতিবিম্ব। মনে হয়, স্বর্গ। কিন্তু এই স্বর্গে ঢুকতে টিকেট লাগে। মাসিক টিকেট।

    ক্লাসরুমে ঢুকি। এয়ার কন্ডিশনের ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে লাগে। সিট খুঁজি। পিছনের সারিতে বসি। সামনের সারিতে মেয়েরা। তাদের ব্যাগ থেকে মোবাইল, ট্যাব, ম্যাকবুক বাহির হয়। সাজসজ্জা নিখুত। মুখে এক ধরনের আত্মবিশ্বাসের মাস্ক।

    স্যার ঢুকেন। ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক। তার স্যুট, টাই, চকচকে জুতো। তিনি তার ল্যাপটপ খোলেন। প্রজেক্টরে স্লাইড ওঠে। "মডার্ন মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিস।" স্লাইডগুলো ইংরেজিতে। শব্দগুলো বিদেশি। তিনি পড়তে থাকেন। কন্ঠস্বর একঘেয়ে। মনে হয় রোবট।

    আমি খাতা খুলি। কলম নিয়ে বসি। কিন্তু লিখি না। শুধু দেখি। তার মুখ দেখি। তিনি পড়ার সময় তার চোখ কখনো আমাদের দিকে তাকায় না। স্লাইডের দিকে তাকায়। তিনি কি বিশ্বাস করেন না এই পড়ায়? নাকি তিনি নিজেও এই মুখোশ পরে আছেন?

    স্লাইডে একটি কেস স্টাডি—"হাউ টু সেল সোপ টু দ্য রুরাল পুওর।" ছবি আছে। একটি গ্রামের মা, হাসিমুখে সাবান কিনছে। ক্যাপশন: "এমপাওয়ারিং দ্য বটম অফ দ্য পিরামিড।"

    আমার মায়ের মুখ মনে পড়ে। আমাদের গ্রামের বাড়ির উঠানে পানি নিয়ে যাইতে যাইতে তার মুখ। তিনি কি এই "বটম অফ দ্য পিরামিড"-এর সদস্য? তিনি কি "এমপাওয়ার্ড" মনে করেন নিজেকে?

    হাত উঠাই। আঙুল উচু করি। গলা শুকাইয়া যায়।
    স্যার থামেন। "হ্যাঁ?"
    "স্যার, এই কেস স্টাডিটা... এই যে লেখা আছে, গ্রামের গরীব মানুষদেরকে 'বটম অফ দ্য পিরামিড' বলা... এটা কি... নৈতিক?"

    সারি ভর্তি ছাত্রছাত্রীরা ঘুরে আমার দিকে তাকায়। কিছু মুখে অবাক ভাব। কিছু মুখে বিরক্তি। "আবার শুরু করল," কেউ ফিসফিস করে।

    স্যারের মুখে এক সেকেন্ডের ঝাঁকুনি। তারপর পেশাদার হাসি ফোটান। "ভাল প্রশ্ন। কিন্তু দেখ, মার্কেটিংয়ের ভাষা আলাদা। আমরা টার্গেট অডিয়েন্সকে ক্যাটেগরাইজ করি। এটা কোনো মানসিক অবজেক্টিফিকেশন না।"

    "কিন্তু স্যার, গ্রামের মানুষরা যদি জানত তারা 'বটম অফ দ্য পিরামিড', তারা কি খুশি হত?"
    ক্লাসে একটু হাসির রোল উঠে। স্যার হাসি চাপেন। "আরিয়ান, পরীক্ষায় এই প্রশ্ন আসবে না। সিলেবাসে যা আছে, তাই পড়। বাস্তব জীবন আর বইয়ের জীবন এক না।"

    বাস্তব জীবন। বইয়ের জীবন। এই ক্যাম্পাস কি বাস্তব? এই চকচকে ফ্লোর, এই এয়ারকন্ডিশন, এই ল্যাপটপ—এগুলো কি বাস্তব? নাকি  গ্রামের বাড়ির টিনের চালা, কাঁচা পায়খানা, সেগুলো বাস্তব?

    আমি নিশ্চূপ হই। হাত নামাই। স্যার আবার পড়া শুরু করেন। আমি কলমটা ঘুরাই। খাতায় আঁকিবুঁকি করি। একটি পিরামিড আঁকি। নিচে লিখি—"বটম"। তারপর সেখানে অনেক ছোট ছোট মানুষ আঁকি। তারা উপরে তাকাইয়া আছে। উপরে একজনের মুখ—স্যারের মুখ।

    ক্লাস শেষ। বের হই। করিডোরে দাঁড়াইয়া কফি ভেন্ডিং মেশিন থেকে এক কাপ কফি নিই। কাপে লেখা—"বি দ্য চেঞ্জ।" হাসি পায়। কোন পরিবর্তন? কফি খাওয়ার পরিবর্তন?

    বন্ধু রিফাত আসে। সে আমার ক্লাসমেট। শহরের ছেলে। তার ফ্যাশন, তার কথাবার্তা—সবই আমার চেয়ে আলাদা।
    "কি হল? আবার স্যারের সাথে ডিবেট করছিলা?"
    "ডিবেট না। প্রশ্ন করছিলাম।"
    "ভাই, এইসব প্রশ্ন করে লাভ নাই। মুখ বন্ধ করি, নোট তৈরি করি, পরীক্ষা দিই, ভাল রেজাল্ট করি, ভাল চাকরি পাই। এই তো সিস্টেম।"

    সিস্টেম। শব্দটা তার মুখে খুব সহজে বের হয়। সিস্টেম। যার ভিতর আমরা সবাই চাকা। ঘুরি।

    "তুমি কি সত্যি বিশ্বাস কর এই সিস্টেমে?" আমি জিগাই।
    রিফাত কফির চুমুক দিয়া বলে, "বিশ্বাস করি কি না সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। সিস্টেম আছে। সিস্টেম চলে। আমরা যদি নাচি, তাহলে সিস্টেমের সাথে নাচতে হবে। নইলে পিষ্ট হইব।"

    পিষ্ট হইব। কথাটা ঠিক। আমার বাবা-মা পিষ্ট হইছে। তারা নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিছে। আমার জন্য। যাতে আমি এই সিস্টেমের ভিতর ঢুকতে পারি। যাতে আমি "পিষ্ট" না হই।

    লাইব্রেরিতে যাই। বিশাল হল। শেল্ফে শেল্ফে বই। কিন্তু বেশিরভাগই টেক্সটবুক। থিসিস পেপার। রেফারেন্স বই। সমালোচনামূলক বই? খুব কম। এক কোণে "নিষিদ্ধ বইয়ের" শেল্ফ। তালা দেওয়া। নোটিশ—"শুধু ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের জন্য।"

    একজন লাইব্রেরিয়ান বসে আছেন। বৃদ্ধ মানুষ। চশমার পিছনে চোখ ছোট। আমি কাছে যাই।
    "স্যার, এই শেল্ফের বই দেখতে পারি?"
    তিনি আমার দিকে তাকান। আমার আইডি কার্ড দেখেন। তারপর মাথা নাডান। "না বাবা। অনুমতি নাই।"
    "কেন?"
    "নিষিদ্ধ।"
    "কিসে নিষিদ্ধ?"
    "উপরোক্ত কর্তৃপক্ষ।" তিনি সহজ করে বলেন, "যে বই রাষ্ট্র বা ধর্ম বা নৈতিকতার বিরুদ্ধে, সেগুলো এখানে নাই।"

    নৈতিকতা। কে নির্ধারণ করে নৈতিকতা? যারা পিরামিডের উপরে আছে?

    আমি হতাশ হয়ে একটি টেবিলে বসি। আমার সামনে একজন মেয়ে বসে। সে একাগ্র হয়ে বই পড়ছে। তার হাতে একটি পুরানো বই—"সমাজবিজ্ঞানের রূপরেখা"। লেখক একজন বামপন্থী দার্শনিক। বইটা এই ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ না, কিন্তু অবাঞ্ছিত।

    আমি তার দিকে তাকাই। সে আমার তাকানো টের পেয়ে মুখ তুলে। আমাদের চোখে চোখ পড়ে। সে এক সেকেন্ডের জন্য হাসে। তারপর আবার বইয়ে ডুব দেয়।

    এই মুহূর্তটা কি স্বাধীনতা? এই চোখে চোখ পড়া? এই নিঃশব্দ বোঝাপড়া?

    ক্যাফেটেরিয়ায় যাই। লাঞ্চ করার টাকা নাই। শুধু এক গ্লাস জল  নিই। টেবিলে বসে ফোন বাহির করি। স্ক্রল করি। নোটিফিকেশন আসে—"তোমার জন্য: শিক্ষার্থী ডিসকাউন্ট! নতুন ল্যাপটপ, ২০% ছাড়!" ছবিতে এক সুন্দর মডেল ল্যাপটপের সামনে হাসছে। তার পিছনে এই ক্যাম্পাসেরই ছবি।

    আমার ল্যাপটপটা পুরানো। বাবার উপহার। তিন বছর আগের। এখনো চলে। কিন্তু নতুনটা চাই? না চাই। কিন্তু দেখতে থাকি। "এড টু কার্ট"-এ ক্লিক করি। তারপর কার্ট খালি করি। এই আনক্লিক করাটাও এক ধরনের বিদ্রোহ?

    হঠাৎ ক্যাফেটেরিয়ার টিভিতে খবর আসে। শিক্ষা মন্ত্রী বলছেন—"আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানের। আমরা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করছি।" তার পাশে বসা একজন বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতা। তিনি হাসিমুখে বলেন—"শিক্ষার সাথে নৈতিকতা জড়িত। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ শেখায়।"

    মুখের ভাব। দুজনারই মুখে আত্মতুষ্টির ভাব। তারা বিশ্বাস করেন তাদের কথা। নাকি তাদের বলা শেখানো হয়েছে?

    আমার পাশের টেবিলে দুজন ছাত্র কথা বলছে। একজন বলছে—"আমি তো সিঙ্গাপুর চাকরি পাইলে চলে যামু। এই দেশের সাথে আর কি করমু?"
    অন্যজন বলে—"ভাই, বিদেশে যাওয়ার আগেও তো এখান থেকে ডিগ্রি লাগবে। ভাল জিপিএ লাগবে। তারপর টোফেল, জিআরই। এইসবের জন্য কোচিং করতে হবে। টাকা লাগবে।"

    টাকা। জিপিএ। ডিগ্রি। বিদেশ। চাকরি। এগুলো শব্দ না, মন্ত্র। আমরা এই মন্ত্র জপি। আশা করি, এর ফলে কিছু একটা ঘটবে।

    আমি উঠি। ক্যাম্পাসের পেছনের দিকে যাই। ছোট একটা বাগান আছে। সেখানে কেউ যায় না। একটা বেঞ্চে বসি। একটা চুরুট বাহির করি। সিগারেট না। চুরুট। বাবার পুরানো অভ্যাস। আমি মাঝে মাঝে ধরি। ধোঁয়া ওড়াই। আকাশের দিকে তাকাই।

    এখান থেকে ক্যাম্পাসের সবচেয়ে উঁচু ভবনটা দেখা যায়। "অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ব্লক"। সেখানে বসে চেয়ারম্যান স্যার। তিনি এই শিক্ষা কারখানার মালিক। তার গাড়ি—বিএমডাব্লিউ। তার বাচ্চারা পড়ছে আমেরিকায়।

    আমার ফোন বেজে উঠে। মায়ের কল।
    "হ্যাঁ মা?"
    "বাবা টাকা পাঠাইছে তো?"
    "হ্যাঁ মা।"
    "ভাল। খাওয়াদাওয়া করিও। শরীরের যত্ন নিও। বড় হইয়া চাকরি করিবা, আমাদের উদ্ধার করিবা।"

    উদ্ধার করিবা। শব্দটা ভারী। আমার পুরো পরিবারের ভার আমার কাঁধে। আমি তাদের "বটম অফ দ্য পিরামিড" থেকে উপরে তোলার দায়িত্ব নিই। কিন্তু উপরে উঠতে গেলে আমাকেও তো এই পিরামিডের নিয়ম মেনে উঠতে হবে। আমাকেও তো অন্যের মাথায় পা দিয়া উঠতে হবে?

    মাকে সান্ত্বনা দিই। "ঠিকাছে মা। চিন্তা করো না।"

    কল কাট। চুরুটের শেষ টান দিই। নিঃশ্বাস ছাড়ি।

    হঠাৎ দেখি, সেই লাইব্রেরির মেয়েটি এই দিকে আসতেছে। সে একলা। হাতে সেই বই। সে আমাকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। তারপর হাসে। এগিয়ে আসে।

    "তুমি এখানে নেশা করো?" সে জিগায়।
    "চুরুট। নেশা না। অভ্যাস।"
    "অভ্যাসও তো নেশাই।"

    সে বেঞ্চে আমার পাশে বসে। তার নাম জিজ্ঞাসা করি।
    "তৃষা।"
    "আরিয়ান।"
    "জানি। তুমি সেই যে স্যারের সাথে তর্ক করো। সবাই জানে।"

    লজ্জা পাই। না, গর্ব পাই।
    "তুমি কি মনে কর, এই করোয়া উচিত?"
    "উচিত-অনুচিত জানি না। কিন্তু করি। কারণ... করলে ভাল লাগে।"

    তৃষা বইটা খুলে। একটা প্যাসেজ দেখায়। "পড়ো।"

    লেখা আছে—"শিক্ষা হচ্ছে সেই অস্ত্র, যা দিয়ে আমরা আমাদের চিন্তার শৃঙ্খল ভাঙতে পারি। কিন্তু যখন শিক্ষাই শৃঙ্খল হয়ে দাঁড়ায়, তখন বিপ্লব অনিবার্য।"

    আমি পড়ি। পড়ে তাকাই তার দিকে।
    "এই বই নিষিদ্ধ না?" জিগাই।
    "আনঅফিসিয়ালি নিষিদ্ধ। লাইব্রেরিয়ান আমাকে দিছে। গোপনে। কারণ সে আমার বাবার বন্ধু।"
    "তোমার বাবা?"
    "ওই যে বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান।"

    আমার বুঝতে বাকি থাকে না। এই ক্যাম্পাসের ভিতরেও একটা গোপন নেটওয়ার্ক আছে। যারা মুখোশ পরে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে বিদ্রোহ করে।

    "তুমি কি বিশ্বাস কর এইসব কথা?"
    তৃষা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, "বিশ্বাস করি। কিন্তু বিশ্বাসে কি হয়? কাজ করতে হয়। লুকিয়ে কাজ।"

    "কেমন কাজ?"
    "লেখা। সংগ্রহ করা। অন্যকে জানানো। তুমিও লেখো না? আমি দেখছি তোমার খাতা। শুধু আঁকিবুঁকি না, লেখাও আছে।"

    আমি অবাক হই। সে নজর রাখে।
    "আমি... শুধু নোট করি।"
    "নোটই তো শুরু। নোট থেকে নিবন্ধ। নিবন্ধ থেকে বই। বই থেকে... যাহোক।"

    সে উঠে দাঁড়ায়। "আমি চলে যাই। দেখি, যদি কথা বলতে চাও... আমি সাধারণত এই বাগানে বিকেলে থাকি।"

    সে চলে যায়। আমি বসে থাকি। তার কথাগুলো মাথায় ঘুরে। "লুকিয়ে কাজ।"

    হঠাৎ লাউডস্পিকার থেকে ঘোষণা আসে। "সব শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করিয়া জানানো যাইতেছে, আগামীকাল ক্যাম্পাসে একটি বিশেষ কর্মশালা হইবে—'ক্যারিয়ার প্ল্যানিং অ্যান্ড পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং'। সবাইকে অংশগ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করা হইল। উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।"

    বাধ্যতামূলক। শব্দটা বাজে। আমরা কি ছাত্র, না সৈন্য?

    আমি উঠি। ক্যাম্পাসের দিকে হাঁটি। সূর্য অস্ত যাইতেছে। ভবনগুলার কাঁচে রক্তরাগ লেগেছে। মনে হয়, সবকিছু রক্তে রাঙানো।

    আমার ফোনে আবার নোটিফিকেশন আসে। এবার কলেজের অফিসিয়াল অ্যাপ থেকে। "আপনার অ্যাটেন্ডেন্স ৮৫%। অনুগ্রহ করে ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত হোন। নইলে শিক্ষাবৃত্তি বাতিল করা হতে পারে।"

    হুমকি। নরম হুমকি। তারা জানে আমার শিক্ষাবৃত্তি লাগে। তারা জানে আমি গরিব। তাই এই সুতোয় বাঁধে।

    আমি বাসায় ফিরি। রাস্তায় মানুষের মুখ দেখি। বিক্রেতার মুখ। রিকশাওয়ালার মুখ। অফিসার মুখ। সবাই ক্লান্ত। সবাই এক ধরনের ভার বইতেছে।

    বাসায় ঢুকি। আমার রুম। ছোট। একটি খাট, একটি ডেস্ক, । বাবা-মায়ের ছবি দেয়ালে। তারা হাসছে। আমি কি তাদের হাসি রাখতে পারতেছি?

    কম্পিউটার চালু করি। আমার গোপন ফোল্ডার খুলি। "Notes_for_Project.txt" খুলি। আজকের দিনের লেখা শুরু করি।

    "আজ শিক্ষক বললেন, বটম অফ দ্য পিরামিড। আমি জিগাইলাম, নৈতিক কি? তিনি বললেন, পরীক্ষার প্রশ্ন না। বুঝলাম, নৈতিকতা শুধু পরীক্ষার সিলেবাসে থাকে। বাস্তবে থাকে ক্যাটেগরাইজেশন। টার্গেটিং। এক্সপ্লয়টেশন।"

    আমি টাইপ করিতে থাকি। আঙুল দ্রুত চলে। শব্দগুলো যেন নিজে নিজে বের হয়। আমার ভিতরের ক্ষোভ, হতাশা, প্রশ্ন—সবকিছু এই টেক্সট ফাইলে জমা হয়।

    "একটি মেয়ে পাইলাম। নাম তৃষা। সেও জানে। সেও লুকায়। আমরা সবাই লুকাই। কারণ খোলামেলাভাবে কথা বললে শিক্ষাবৃত্তি যায়। ডিগ্রি যায়। ভবিষ্যৎ যায়। তাহলে কি ভবিষ্যৎ এইসবের গোলাম? আমরা কি স্বাধীন নাকি ভবিষ্যতের দাস?"

    টাইপ করা শেষ করি। ফাইল সেভ করি। পাসওয়ার্ড দিই। তারপর শুইয়া পড়ি।

    ছাদের ফ্যান ঘুরে। ক্লিক ক্লিক শব্দ করে। আমার মাথায় ঘুরে স্যারের মুখ। তৃষার মুখ। লাইব্রেরিয়ানের মুখ। বাবার মুখ।

    আমি চোখ বন্ধ করি। স্বপ্ন দেখি। আমি আমার গ্রামের বাড়ির উঠানে দাঁড়াইয়া আছি। সামনে আমার বাবা। তিনি বলতেছেন, "পড়, বাবা। লেখাপড়া কর। বড় মানুষ হইও।"

    আমি জিগাই, "বাবা, বড় মানুষ মানে কি?"
    বাবা হাসে। "বড় মানুষ মানে... যে অনেক টাকা উপার্জন করে। যে সম্মান পায়।"

    "তুমি কি বড় মানুষ, বাবা?"
    বাবার হাসি মিলায়ে যায়। "না, বাবা। আমি ছোট মানুষ। তুমি বড় হইও।"

    আমি উঠানের ধুলায় বসে পড়ি। "বাবা, আমি ছোট মানুষই থাকতে চাই। বড় হইলে মুখোশ পরতে হয়।"

    বাবা কিছু বলে না। শুধু আমার মাথায় হাত বুলায়। তার হাতের স্পর্শ গরম।
    ভোরের আলো ফুটলে ঘুম ভাঙে। আবার সেই রিংটোন। "আমার ঘর খাঁড়া করবে কে।"

    আমি জানি, আজও আমাকে সেই শিক্ষার কারখানায় যেতে হবে। আজও আমাকে মুখোশ পরতে হবে। আজও আমাকে পিরামিডের একটা পাথর হইতে হবে।

    কিন্তু হয়তো... হয়তো আমি সেই পাথরেই লুকিয়ে কিছু কথা খোদাই করে রাখতে পারব। যাতে পরে কেউ পড়ে। যাতে পরে কেউ জানে, এই কারখানার ভিতরেও মানুষ ছিল। শুধু যন্ত্র না।
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 | 14 | 15
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন