এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ‘ছায়া ও মুখশ্রী’

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ৬৪ বার পঠিত
  • 0 | 1 | 2 | 3
    বাইরে থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ আসা। স্ক্রলিং থামানো। জানালা দিয়ে উঁকি দেওয়া। নিচে একটা অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত চলে যাওয়া। তার সাইরেনের শব্দ কানে বাজা। শহরের নিয়মিত সঙ্গীত।

    ফিরে এসে ফোনের স্ক্রিন দেখতে পাওয়া। নতুন নোটিফিকেশন। একটা শপিং অ্যাপ থেকে। "আপনার কার্টে থাকা আইটেমের দাম কমেছে! এখনই কিনুন!" হাসি পেতে চেষ্টা করা। পারা না। শুধু একটা ভারী নিঃশ্বাস ফেলা।

    টেবিলের উপর রাখা পুরোনো ডায়েরির দিকে তাকানো। কাগজের ডায়েরি। লাল মলাট। তাতে কিশোর বয়সের কবিতা লেখা। এখন সেসব পড়লে লজ্জা লাগে। কিন্তু সেসব সময়ে কথা বলতে ভয় পেতাম না। এখন কথা বলার আগে  ভাবতে হয়।

    ডায়েরিটা হাতে নেওয়া। পাতা উল্টানো। একটা লাইন চোখে পড়া: "আমার মুখ আছে, তোমার মুখ আছে, আমরা সবাই মুখোশ পরে আছি।" কিশোর বয়সে এটা লিখেছিলাম। তখন বুঝিনি কতটা সত্যি।

    মুখোশ। আমরা সবাই মুখোশ পরে আছি। স্ক্রিনের সামনের হাসির মুখোশ। অফিসের সুশীল মুখোশ। বাড়ির সদয় মুখোশ। কলেজের বুদ্ধিমান মুখোশ। প্রতিটি জায়গায় আলাদা মুখোশ। আসল মুখটা কোথায়? হয়তো হারিয়ে গেছে। হয়তো কখনোই ছিল না।

    ফোনটা আবার হাতে নেওয়া। ক্যামেরা খোলা। সেলফি তোলার চেষ্টা করা। হাসি দেওয়ার চেষ্টা করা। পারা না। মুখটা কাঠের মতো লাগা। শুধু তাকিয়ে থাকা। স্ক্রিনে নিজের চোখ দেখা। সেই চোখেই সেই ফাঁকা ভাব। সেই সাদা চাউনি। আমি নিজেও তো একই।

    সেলফি ডিলিট করা। গ্যালারি খোলা। "Faces" অ্যালবামে ঢোকা। সেখানে শত শত ছবি। অচেনা মানুষের মুখের ভাব। ক্লান্তি, হাসি, উদাসীনতা, রাগ। প্রতিটি ছবির সাথে তারিখ ও সময় লেখা। একটা আর্কাইভ তৈরি করেছি। মানুষের আবেগের আর্কাইভ। কিন্তু কেন? কি হবে এর থেকে?

    নিজেকে উত্তর দেওয়া: হয়তো একদিন বোঝা যাবে। হয়তো একদিন এই সব ছবি কথা বলবে। হয়তো একদিন কেউ দেখবে, আর বুঝবে আমরা কী ছিলাম।

    বাইরে বেরোনোর সিদ্ধান্ত নেওয়া। ফোন পকেটে রাখা। দরজা খোলা। লিফটে দাঁড়ানো। লিফটের দেয়ালে স্ক্রিন। বিজ্ঞাপন চলছে। একটি নতুন সাবস্ক্রিপশন সার্ভিসের। "আপনার জীবনকে সাজান।" লিফটের অন্য যাত্রীর দিকে তাকানো। সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। পরোয়া নেই বিজ্ঞাপনের। শুধু কিছু দেখছে। হয়তো তারও অভ্যাস।

    রাস্তায় পা রাখা। গরম হাওয়া লাগা। ধোঁয়া আর ধুলোর গন্ধ নাকে আসা। সামনে বিলবোর্ড। তাতে মানুষের মুখ। ক্রেতার হাসি। মডেলের নিখুঁত ত্বক, কোনো লোম নেই, কোনো রোমকূপ নেই। দাঁত এত সাদা যে বিলবোর্ড আলো ছড়াচ্ছে। লিপস্টিক লাল, রক্তের মতো নয়, ক্যান্ডির মতো। "আপনিও এমন হাসতে পারেন।" "আপনার জীবনেও এই উজ্জ্বলতা আনুন।"

    হাসির চেষ্টা করা। পারা না। শুধু তাকিয়ে থাকা। বিলবোর্ডের মুখটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ফাঁকা চোখে। ফাঁকা হাসি দিয়ে।

    হাঁটা শুরু করা। দোকান-পাটের সামনে দিয়ে যাওয়া। সবাই কিছু না কিছু বিক্রি করছে। কাপড়, জুতো, খাবার, ফোন। আর মানুষ কিনছে। তাদের হাতে ব্যাগ ভর্তি। মুখে ক্লান্তি। কিন্তু হাতে ফোন। স্ক্রলে আঙুল বুলানো।

    কফি শপে ঢোকা। ঠাণ্ডা হাওয়া। একঘেয়ে সঙ্গীত। কাউন্টারে বারিস্টার মেয়েটির দিকে তাকানো। তার মুখে পেশাদার হাসি। "স্যার, আপনার অর্ডার?" তার চোখে ক্লান্তি। স্ক্রিনের আলোয় জ্বলা রাতের ছাপ। তার হাতে একটা ছোট ট্যাটু, শুধু অংশ দেখা যাচ্ছে ইউনিফর্মের হাতা থেকে। তবু হাসি বজায় রাখা। মুখের ভাব বজায় রাখা। গ্রাহক সেবার মুখোশ।

    কফি নিয়ে একটা কোণার টেবিলে বসা। চারপাশের মানুষদের পর্যবেক্ষণ করা। জোড়ায় জোড়ায় কথা বলা। কিন্তু মাঝে মাঝে ফোন চেক করা। কথার মাঝে বিরতি নেওয়া। একটা নোটিফিকেশনের জন্য অপেক্ষা করা। প্রত্যেকে একে অপরের মুখ দেখছে, কিন্তু আসলে দেখা হচ্ছে পর্দা। পর্দায় নিজের প্রতিচ্ছবি। পর্দায় অন্যের জীবন।

    একটা দম্পতি দুই টেবিল দূরে। মেয়েটি ছেলেটির দিকে তাকিয়ে কথা বলছে। তার হাত টেবিলের উপর, খোলা। ছেলেটির আঙুল ফোনের স্ক্রিনে। তিনি হয়তো শুনছেন। হয়তো না। মাথা নড়াচ্ছেন, "হুম" বলছেন। মেয়েটির মুখে এক ধরনের অনুরোধ। একটা নিঃশব্দ আকুতি: "আমাকে দেখো। আসলে দেখো। শুধু এই মুহূর্তের জন্য ফোনটা নামাও।" কিন্তু ছেলেটির দৃষ্টি আটকে আছে অন্য একটা বিশ্বে। একটা বানানো বিশ্বে, যেখানে সবকিছু নিয়ন্ত্রণযোগ্য, স্ক্রলযোগ্য, লাইকযোগ্য।

    আমার নিজের ফোন বের করা। সাইলেন্ট মোডে। ক্যামেরা খোলা। জুম করা। দম্পতিটির একটা সুক্ষ্ম ছবি তোলা। তাদের মুখের ভাব ধারণ করার চেষ্টা করা। আমার গ্যালারিতে "Faces" অ্যালবামে সেভ করা। আমার কালেকশন যোগ করা: "ডিজিটাল প্রেম।"

    বাইরে বেরিয়ে আবার হাঁটা। একটা বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়ানো। স্কুলের পাঠ্যবইয়ের রঙিন মলাট। রোমান্টিক উপন্যাসের নগ্ন বুক কভার। সেলফ হেল্প গাইড। "আপনার জীবন বদলে দিন ৭ দিনে।" "সফলদের ১০টি অভ্যাস যারা ভোরে ৪টায় ওঠে।" সমালোচনামূলক কোনো বই নেই। ইতিহাসের বই সরলীকৃত। রাজনৈতিক গ্রন্থের তাক ফাঁকা। একটা ছোট, হাতে লেখা নোটিশ: "নির্বাচিত বই শুধু বিশেষ অনুরোধে। দোকান মালিকের সাথে কথা বলুন।"
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    0 | 1 | 2 | 3
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে প্রতিক্রিয়া দিন