এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অধ্যায় ১২ : আলো এবং ছায়া

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ৫৯ বার পঠিত
  • 0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 | 14
     বইটা বের হওনের পর একরকম শূন্যতা। হাত পা ঝিমঝিম করা। ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা। নিচের গলিতে লোকজনের হাটাহাটি। কেউ জানে না। কেউ টের পায় না। এই ইটপাথরের শহরের বুকে এক টুকরো কাগজে আটকে পড়া আমাদের হাঁপানি।

    তারপর... তারপর ফিসফিস ধ্বনি। পানির নিচে প্রথম বুদবুদের মতো। একটা ব্লগ পোস্ট। শিরোনাম: "নতুন এক কণ্ঠস্বর: কে এই মুখহীনরা?" লেখক: "অজ্ঞাতনামা পাঠক"। তিন প্যারা। তারপরেই সাইট থেকে উধাও। ৪০৪। "পৃষ্ঠাটি পাওয়া যাচ্ছে না।"

    তারপর আরেকটা। ফেসবুকে একটা শেয়ার। এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে ট্যাগ করে: "একবার দেখ তো, এই বইটা কিনতে পাওয়া যাবে? 'ছায়া ও মুখশ্রী' নাম।" কমেন্টে কেউ লিখছে: "কই, শুনিনি তো।" আরেকজন: "নিষিদ্ধ না তো?" শেয়ারটা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। বিশ, পঞ্চাশ, একশ। তারপর হঠাৎ পোস্টটাই গায়েব। শুধু একটা জায়গায় লেখা: "এই কন্টেন্টটি সম্প্রদায় নির্দেশিকা লঙ্ঘন করেছে।"

    কিন্তু ছবি তো উঠে গেছে আগেই। কভারের ছবি। সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে কালো লেখা: "ছায়া ও মুখশ্রী"। মানুষের আঙুল সেভ করে রাখছে। ডাউনলোড লিঙ্ক ছড়াচ্ছে টেলিগ্রামে, হোয়াটসঅ্যাপে। জলছাপ মারা ছবি। "ফরওয়ার্ড অ্যাজ রিসিভড।"

    মিলার ফোন বেজে উঠছে। অচেনা নম্বর। সে রিসিভ না করেই কাটা দিচ্ছে। "ওরা ট্র্যাক করতাসে," সে বলে, তার মুখে একধরনের কুটিল জ্ঞান, যে জ্ঞান বই পড়ে আসে না,  হাড়ে হাড়ে শেখে। "ফোনটা বন্ধ করবি না?"
     
    কলেজে যাওয়া। প্রথম দিন বই বের হওয়ার পর। ক্যাম্পাসের গেট পার হওয়া। চারপাশে স্বাভাবিক হৈচৈ। কিন্তু কানে আসছে ভিন্ন সুর। কেউ কানে কানে কথা বলছে। "ঐ যে... ঐ যে লেখক..." "সাহস তো..." "পাগল নাকি?"

    হোস্টেলের সামনে দাঁড়িয়ে একদল ছেলে। তাদের একজন, যে নৃত্যের হলে দেখেছিল, সে সিগারেট টানছে। আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসি। ঠোঁটের কোণে ওঠা ধোঁয়া। সে হাত নাড়ে। আসেনা, বন্ধু আসেনা। কি ব্যাপার?

    অধ্যাপক সাহেবের অফিসে ডাক আসে। সেক্রেটারির ফোন। "স্যার এখনই দেখতে চাইছেন।"

    দরজা খোলা। তিনি বসে আছেন। টেবিলের উপর বইয়ের একটা প্রিন্ট আউট কপি। কালো-সাদা। কিন্তু শব্দগুলো যেন সজীব। নড়ছে।

    "বসো, আরিয়ান।"

    বসা। হাত ঘামতে থাকা।

    "এটা... তোমার কাজ?"

    চুপ করে থাকা। নড়াচড়া না করা। মুখের ভাব বজায় রাখার চেষ্টা। কিন্তু ভিতরে কাঁপুনি। দাঁতের নিচে দাঁত লেগে থাকা।

    "জবাব দাও, ছেলে। এটা কি তুমি লিখেছ?"

    "স্যার..."

    "স্যার না। হ্যাঁ না বল।"

    "হ্যাঁ।"

    শব্দটা বেরোতে এক সেকেন্ড সময় লাগে। কিন্তু বেরোলে... বেরোলে মনে হয় পাহাড় সরে গেল। মনে হল বাবা-মায়ের সামনে প্রথম ধূমপান করাকে স্বীকার করলাম।

    অধ্যাপক সাহেব চশমাটা খুলে রাখেন। চোখ মুছেন। ক্লান্ত চোখ। "কেন, আরিয়ান? ভালো ছেলে তো তুমি। নিয়মিত ক্লাস করো। রেজাল্টও ভালো। এমন স্টুপিড... এমন বোকামি কেন করলে?"

    "স্টুপিড? স্যার?"

    "হ্যাঁ, স্টুপিড!" তিনি জোরে বললেন, কিন্তু তারপরই চারপাশে তাকালেন। দরজা বন্ধ কি না চেক করলেন। আবার নিচু গলায়, "তুমি কি বুঝ না? জীবনটা সহজ করতে পারতে। চুপচাপ পড়াশুনা করতা। চাকরি পাইতা। বিয়ে করতা। বাচ্চা নিতা। এত কষ্টের জীবন... এর মধ্যে ঝামেলা ডাকাতে যাওয়ার কি দরকার ছিল?"

    তার মুখে রাগ নেই। ভয় আছে। গভীর, ধূসর ভয়। একজনের ভয় যে আরেকজনকে সংক্রামিত করে।

    "স্যার," বলতে গিয়ে গলা শুকিয়ে আসে, "সত্যি কথা লিখলে... তা স্টুপিডি হয়?"

    "সত্যি?" তিনি হাসেন। করুণ হাসি। "সত্যি আবার কি? সত্যি হলো, তুমি ক্লাসে বসবা। পরীক্ষা দিবা। পাস করবা। চাকরি করবা। টাকা কামাইবা। এটাই সত্যি। আর তুমি যে সব লিখাছ... এগুলো ভুতের বুলি। বিভ্রান্তি।"

    "আপনি কি... পড়েছেন, স্যার?"

    চুপ। দীর্ঘ চুপ। তিনি বইয়ের দিকে তাকান। পৃষ্ঠা উল্টান। একটি লাইন তাঁর ঠোঁটে নড়ে। "'শিক্ষক বলেন: প্রশ্ন করো। তার চোখ বলেন: করো না। আমি চোখকে বিশ্বাস করি।' এইটা... এইটা খুব বিপজ্জনক, আরিয়ান। খুব।"

    "কিন্তু সত্যি না? স্যার, আপনার চোখেই তো আমি দেখি... আমরা ক্লাসে প্রশ্ন করলে আপনি বিরক্ত হন।"

    তিনি চমকে ওঠেন। তার মুখের মাস্ক একসেকেন্ডের জন্য খসে পড়ে। দেখি এক বুড়ো মানুষ, ভীত, ক্লান্ত, যিনি হয়তো এক সময় নিজেও কিছু লিখতে চেয়েছিলেন। হয়তো তিনিও মুখের ভাব দেখেছেন।

    "আরে ছাইপাশ," তিনি হঠাৎ আঞ্চলিক স্বরে ফেটে পড়েন, "তোকে কে শিখাইল এইসব? তুই জীবন চালাতে পারবি না এইসব ভাবনা ভাবলে। তোর বাপ-মায়ের অবস্থা তো জানি। গ্রাম থেকে উঠে আসছে। টিউশন ফি জোগাড় করতে তাদের ঘাম ঝরতাসে। আর তুই... তুই বই লিখছিস 'বেশ্যা খানাই যাওয়া' নিয়ে? উলঙ্গ নাচানো নিয়ে? তোর লজ্জা নাই?"

    লজ্জা। হ্যাঁ, লজ্জা আছে। কিন্তু সেই লজ্জার নিচে আরেকটা জিনিস। জ্বালা। "স্যার, লজ্জা তো অনেক কিছুতেই থাকে। চুপ করে থেকেও থাকে। কথা বললেও থাকে। তবে কথা বললে অন্তত... শ্বাস নেওয়া যায়।"

    তিনি আবার চুপ। তারপর হঠাৎ বলে, "বেরিয়ে যাও। আমার অফিস থেকে বেরিয়ে যাও। কলেজ থেকে হয়তো... সাময়িক বরখাস্তের নোটিশ পাবা। নিজেকে প্রস্তুত রাখ।"

    বেরিয়ে আসা। করিডোরে হাঁটা। পা তুলতে কষ্ট হয়। কিন্তু চোখে দেখি... অন্যান্য ক্লাসরুমের দরজার ফাঁক থেকে তাকানো মুখ। কিছু মুখে অবাক ভাব। কিছু মুখে ঈর্ষা। কিছু মুখে সহানুভূতি। একটা মেয়ে, যে কখনো কথা বলে না, সে হঠাৎ চোখের ইশারা করে। একটি থাম্বস আপ। তারপর দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নেয়।

    মিলার কাছে ফেরা। সে রান্না করছে। সাধারণ আলু ভাজা। ভাত। "কি হল?" সে জিজ্ঞেস করে না। আমার মুখ দেখেই বুঝে নেয়।

    "বরখাস্তের কথা বলছে," আমি বলি।
    "তাতে কি?" সে বলে, কড়াই নেড়ে, "পড়াশুনা করবা কেন? শিখবা কি? মুখোশ বানানো?"

    "তুমি পারো বলেই এমন বলছ," আমি বিরক্ত হয়ে বলি।
    সে হাসে। উষ্ণ, গলার ভিতর থেকে ওঠা হাসি। "আরে, আমি পাঝি না? আমি গ্রামের মেয়ে। আমাদের শেখানো হয়: সংসার চালাতে হয়। পেট চালাতে হয়। মুখোশ না, রুটির দরকার। তুই তো রুটির কথা ভাবছিস না। ভাবছিস মুখের কথা। এটা বিলাসিতা। সাহসের বিলাসিতা।"

    সে ঠিক। আমার বিলাসিতা। আমার শহুরে, শিক্ষিত বিলাসিতা, যে মুখের সত্যি খুঁজে বেড়ায় যখন পেট ভরানোর চিন্তা অন্যরা করে।

    ফোন বেজে ওঠে। মায়ের নম্বর। গলা শুকিয়ে যায়।
    "মা?"
    "বাবা, তুই কি করলি রে?" মায়ের কান্না। "পুলিশ আসছে বাড়িতে। তোর বইয়ের কথা জিগাইতাসে। তুই কি লিখলি? কি লিখলি বল তো মায়েরে?"

    মাথা ঘুরে যায়। বাবা-মায়ের মুখ, যারা সারাজীবন পরিশ্রম করে শুধু আমাকে শহরে পড়াবার জন্য। আর এখন... পুলিশ?

    "কিছু না, মা। কিছু না। একটা বই লিখেছি। সত্যি কথা লিখেছি।"
    "সত্যি কথা?" মায়ের কণ্ঠে হতবুদ্ধি ভাব, "সত্যি কথা আবার কই? সত্যি কথা হলো চুপ থাকা। মুখ বুঝে থাকা। তোর বাবা তো কখনো কিছু বলে না। বলে কি? বললে চাকরি যাইতো। জমি যাইতো। তুই... তুই কেন বললি?"

    মায়ের কথায় অধ্যাপকের কথার প্রতিধ্বনি। চুপ থাকা। মুখ বুঝে থাকা। এটাই বেঁচে থাকার মন্ত্র। এটাই সত্যি।

    "মা, আমি... আমি..."
    "ফিরে আয়, বাবা।  আয়। সব ভুলে যাই। ওদের মাফ চাই। বইগুলো ফেলে দি।"

    কিন্তু বই তো আর ফেরানো যায় না। শব্দ তো আর কাগজ থেকে মুছে ফেলা যায় না। একবার বলা কথা বাতাসে মিশে যায়।

    ফোন কাটা। মিলা আমার দিকে তাকায়। "কষ্ট হবে," সে বলে সরাসরি, "খুব কষ্ট হবে। তোর পরিবার, তোর ভবিষ্যৎ... সব ঝুকির মধ্যে পড়বি। তুই পারবি?"

    জবাব নেই। জানি না।

    রাত নামে। শহরের লাইট জ্বলে। আমরা বারান্দায় বসি। মিলা বলতে শুরু করে তার শৈশবের কথা।

     সে বলে, "বড় একটা গাছ ছিল। বটগাছ। তার নিচে বুড়োরা গল্প করত। রাজা-রানীর গল্প না। নিজেদের গল্প। কার জমি কে কেড়ে নিল। কার ছেলেকে পুলিশে ধরল। কার মেয়ের বিয়ে দিতে পারল না টাকার অভাবে। এইসব গল্প। মুখে মুখে। লেখা না।"

    "কেন লেখা না?"
    "কারণ লেখা মানে চিহ্ন রাখা। চিহ্ন রাখলে শত্রু টের পায়। মুখে মুখে গল্প... সেটা বাতাসের সাথে মিশে যায়। ঝড়ে উড়ে যায়। কিন্তু রয়ে যায় মানুষের মনে। মনে মনে পাক খায়। একসময়... ফুটে ওঠে।"

    "তাহলে আমাদের বই... এটা চিহ্ন রাখা। বিপজ্জনক।"
    "হ্যাঁ। কিন্তু কখনো কখনো চিহ্ন রাখতেই হয়। নইলে ভুলে যাই আমরা কে।"

    হঠাৎ নিচের গলিতে শব্দ। গাড়ির ব্রেকের শব্দ। কয়েকজন মানুষের পদচারণা। মিলা সতর্ক হয়ে উঠে দেয়ালের পাশে দাঁড়ায়। নিচে উকি মারে।

    "ওরা," সে ফিসফিস করে, "দুইজন। সাধারণ পোশাক। কিন্তু চালচলন... পুলিশ না হলেও ওদের কাজ পুলিশের মতো।"

    হৃদয় দ্রুত স্পন্দন। তারা কি আমার খোঁজে? বইএর খোঁজে?

    তারা নিচেই দাঁড়িয়ে কথা বলে। একজন ফোনে কথা বলে: "হ্যাঁ স্যার, ঠিকানা নিশ্চিত। উপরে আছে বলে মনে হচ্ছে। এখন কি করব?"

    চুপ। অপেক্ষা।
    তারপর তারা গাড়িতে উঠে। চলে যায়।

    "ওরা শুধু দেখতে আসছে," মিলা বলে, "ডর দেখাতে আসছে। তোর মন ভাঙাতে আসছে।"

    ডর দেখানো। মন ভাঙানো। এটাই তো প্রথম ধাপ।

    পরের কয়েক দিন। ফিসফিস ধ্বনি বাড়ে। বই এর ডিজিটাল কপি ছড়ায় আগুনের মতো। ছাত্রদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে লিঙ্ক শেয়ার হয়। সেন্সর করা হয়। আবার নতুন লিঙ্ক ওঠে। "ছায়া ও মুখশ্রী PDF" সার্চ ট্রেন্ড হয়। তারপর আবার অদৃশ্য।

    কিছু মানুষ সামনে আসে। কলেজের লাইব্রেরিয়ান, এক ভদ্রমহিলা, তিনি একদিন পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বললেন, "ভালো লেখা। সাবধান থাকবেন।" এবং চলে গেলেন।

    একটা টিচার্স ক্যান্টিনে, এক অধ্যাপিকা, যিনি কখনো আমার ক্লাস নেননি, তিনি চা খেতে খেতে বললেন, "তোমার বই এর ওই অংশ... গণমাধ্যম নিয়ে... সেটা খুব স্পট অন।" এবং তারপর দ্রুত টপিক বদলালেন আবহাওয়া নিয়ে।

    এটা কী? এরা কী বলতে চায়? সমর্থন? নাকি শুধু নিজের কথা বলার সুযোগ খোঁজা?

    মিলা বলে, "ওরা নিজেদের ছায়া দেখতে পায় তোর বইয়ে। তাই এত ভয়। আর এত আকর্ষণ।"

    গ্রাম থেকে বাবার ফোন। তিনি কাঁদছেন না। শক্ত স্বরে বলছেন, "লিখছিস? যাই লিখছিস, সত্যি লিখছিস তো?"
    "হ্যাঁ, বাবা।"
    "তবে লিখ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিখ। অর্ধেক পথে থেমে যাস না। আমাদের ভয় কিসের? আমরা তো আগে থেকেই গরিব। হারাবার কিছু নাই।"

    বাবার কথা শুনে আশ্চর্য হই। সারাজীবন চুপ থাকা মানুষ... তিনি এটা বলছেন?

    "বাবা, তুমি..."
    "আমি কিছু বুঝি না, বাবা। তবে এটা বুঝি: মিথ্যা বললে পেটে ব্যথা করে। তুই সত্যি বলছিস বলে পুলিশ আসছে? আসুক। আমরা দেখব।"

    এই সরলীকরণ। এই  যুক্তি। মিথ্যা বললে পেটে ব্যথা করে। সত্যি বললে পুলিশ আসে। সহজ সমীকরণ।

    এক সপ্তাহ পরে। বই এর প্রিন্ট কপি হাতে হাতে ঘুরতে শুরু করে। একটি ছোট বই এর দোকান, যে দোকানটি আগে "নির্বাচিত বই" এর নোটিশ দিত, সেখানকার মালিক একটি কপি শেল্ফের একদম নিচে রাখেন। যারা জানে, শুধু তারাই চেয়ে দেখে।

    একটি কফি শপ, যেখানে আমি বসতাম, সেখানে বারিস্টার মেয়েটি, যার ট্যাটু ছিল, সে একদিন হাসিমুখে বলে, "স্যার, আপনার অর্ডার।" এবং কফির ন্যাপকিনের নিচে একটা ছোট নোট রাখে: "পড়েছি। ধন্যবাদ।"

    একটা নতুন ফিসফিস ধ্বনি: "ফেসলেসদের নেটওয়ার্ক"।

    অনলাইনে কোনো সংগঠন না। শুধু চিহ্ন। একটি কোড। কেউ কমেন্ট করে: "ফ্যানের শব্দ ক্লিক করে।" জবাব আসে: "ধুলো জমেছে।" এটাই পরিচয়। এটাই হ্যান্ডশেক।

    মিলা বলে, "দেখছিস? তুই একা নই। তোর আওয়াজে আওয়াজ মিলাইছে অনেকেই।"

    কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখনো নীরব। সম্পূর্ণ নীরব। কোনো বক্তব্য নেই। কোনো টিভি আলোচনা নেই। কোনো সংবাদ নেই। এটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। নীরবতা চাপ তৈরি করে। শূন্যতা ভয় তৈরি করে।

    একদিন সকালে, মোবাইল ফোনে (সাধারণ ফোন) একটি এসএমএস আসে। অচেনা নম্বর থেকে।
    "তোমার বই পড়লাম। আমাদের মুখও আছে। — Faceless_∞"

    এটা কী? নতুন কারও বার্তা? নাকি Faceless_07 ই অন্য নম্বর থেকে পাঠিয়েছে?

    মিলা সন্দেহ করে। "রিপ্লাই দিস না। ফোনটা বদলে ফেল।"

    কিন্তু বদলালে কি হবে? বার্তা তো পৌঁছে গেছে। বীজ তো পড়ে গেছে।

    কলেজ থেকে অফিসিয়াল লেটার আসে। "অনুশাসনিক কারণ দেখিয়ে তোমাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।" কারণ উল্লেখ নেই। শুধু "অনুশাসনিক কারণ"।

    মা আবার ফোন করেন। "বাবা, ফিরে আয়।"
    "না মা, এখন না।"

    এখন ফিরলে কী হবে? ফিরলে তো পরাজয় স্বীকার করা হবে। ফিরলে তো মুখোশ আবার পড়ে নিতে হবে। চুপচাপ বসে থাকতে হবে।

    মিলা বলে, "তুই কি করবি এখন? টিউশন ফি দিবি কি করে?"
    "কিছু একটা করব," বলি, আত্মবিশ্বাসহীনভাবে।
    "আমার কাছে কিছু টাকা জমা আছে," সে বলে, "নিতে পারবি।"
    "না। তোর টাকা না। তোর তো নিজের..."
    "আরে, টাকা তো টাকা। মানুষি হওয়ার আগে টাকা।"

    এটাই  দর্শন। সরল, অকৃত্রিম। মানুষি হওয়ার আগে টাকা।

    রাত। আবার বারান্দা। শহরের আলোগুলো জ্বলজ্বল করছে। মনে পড়ে স্বপ্নের কথা। হলরুমে মাস্ক খোলার স্বপ্ন।

    "মিলা," বলি, "তুই কি মনে করিস... আমরা জিতব?"
    সে একটু হাসে। "জিত কী? হার কী? আমরা তো শুধু বলতাসি। বলার পর কী হয় সেটা আমাদের হাতে না।"

    "তাহলে কেন বলছিস?"
    "কারণ না বললে... না বললে পেটে ব্যথা করে।"

    আমি হাসি। তার মুখের দিকে তাকাই। সত্যিকার মুখ। কোন মেকআপ নেই। কোন ভান নেই। শুধু একজন মানুষ, যে ক্লান্ত, ভীত, কিন্তু তার মধ্যেও একধরনের জেদ। একধরনের অদম্যতা।

    "তোর মুখ..." বলি।
    "কেমন আছে?"
    "সত্যি।"

    সেও হাসে। "তোরও।"

    আমরা চুপচাপ বসে থাকি। নিচের গলি থেকে ওঠে মানুষের কথাবার্তা। হাসি। রাগ। জীবন। এই সব মুখ। এই সব ভাব। এই সব ছায়া আর আলোর খেলা।

    বইটা হয়তো কালকে নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। হয়তো আমার নামে মামলা হবে। হয়তো জেল হবে। কিংবা হয়তো সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। মানুষ ভুলে যাবে।

    কিন্তু একটা জিনিস হবে না। আমি আর আগের মতো মুখের ভাব দেখব না শুধু। এখন আমি জানি, প্রতিটি মুখের ভাবের নিচে আরেকটা মুখ লুকিয়ে আছে। সেটা হয়তো ভীত। হয়তো ক্ষুব্ধ। হয়তো স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সেটা আছে।

    এবং সেটার জন্য... সেটার জন্য লিখতে হয়। বলতে হয়। চিৎকার করতে হয় নীরবে।

    নিচে আবার গাড়ির শব্দ। আবার ওরা? না, সাধারণ গাড়ি। চলে যায়।

    মিলা বলে, "আস, ভেতরে যাই। রাত ঠাণ্ডা।"

    ভেতরে যাওয়া। কিন্তু জানালা দিয়ে এখনও শহরের আলো দেখা যায়। শত শত জানালা। শত শত মুখ। হয়তো তাদের কেউ কেউ আজ বইটা পড়ছে। হয়তো তাদের কেউ কেউ আজ নিজের মুখ খুঁজে পাচ্ছে।

    এবং আমি... আমি এখন শুধু পর্যবেক্ষক নই। আমি এখন অংশ। এই বিশাল, নীরব, কখনো কখনো ফিসফিস করা সংলাপের অংশ।

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    0 | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 | 14
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন