অনেক সিনেমাই আছে যা দেখতে গিয়ে আবেগে ভেসে গেছি আমি। আমি সিনেমা সিরিজে অল্পেই আবেগে আক্রান্ত হই। খুব বাজে সিনেমাতেও একটু আবেগি দৃশ্য আসলে আমার চোখে পানি চলে আসতে চায়। কিন্তু তারপরেও তীব্র আবেগে পুরো সিনেমা জুড়েই চোখ দিয়ে পানি পড়বে এমন সর্বনাশ কবে সর্বশেষ হয়েছে? মনে নাই আমার। (গ্রেভ অফ দ্য ফায়ারফ্লাইস? ) এতদিন পরে এবার আবার আমার এমন হল। দ্য ভয়েজ অফ হিন্দ রজব সিনেমাটা অস্কারে মনোনয়ন পাওয়ার পরেই দেখার ইচ্ছা রাখছিলাম। সুযোগ পাওয়া মাত্র দেখলাম। আগ্রহ জাগছিল কারণ গল্পটাই এমন যে আগ্রহ না জেগে উপায় ছিল না। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে জুড়ি এওয়ার্ড জিতে এই সিনেমা। আমি ভাবলাম দেখিই তাহলে কী জিনিস বানালও এইটা।
গল্পটা ফিলিস্তিনের, আরও নির্দিষ্ট করে বললে গাজার গল্প। ইজরাইলের প্রবল গোলা বর্ষণের মধ্যে ছয় বছরের এক শিশু আটকে যায় একটা গাড়ির ভিতরে। সেখান থেকে ফোনে সে রেড ক্রিসেন্টের কল সেন্টারে কল দেয়, সাহায্য চায়! রেড ক্রিসেন্ট দেখে তাদের একটা অ্যাম্বুলেন্স মাত্র আট মিনিট দূরত্বে আছে। কিন্তু এই আট মিনিট তো আট মিনিট না। কারণ ইজরাইলই আর্মি জোরেশোরে এই অঞ্চলে বোমা ফেলছে। ইজরাইল আর্মি থেকে অনুমতি নিয়ে তারপরে এই এলাকায় উদ্ধার কাজ করতে পারবে তারা। শুরু হয় গ্রিন লাইট পাওয়ার জন্য নানা জায়গায় তদবির!
সিনেমার গল্প এইটাই। স্পয়লার আছে এরপরে। স্পয়লারের ভয়ে বাকিটুকু পড়া বাদ দিবেন? ফিলিস্তিনের গল্প, ইজরাইলের বোমা, শিশু এইসব পড়ার পরে স্পয়লার আলদা করে আর বলতে হবে? পুরো দুনিয়াকে কি স্পয়লার দিয়ে দেয়নি ইজরাইলিরা? পড়েন। আমার ধারণা পড়ার পরেও দেখবেন সিনেমাটা।
সিনেমার শুরুতে দেখায় রেড ক্রিসেন্টের অফিস, রামাল্লায়, পশ্চিম তীরে। তারা সবাই স্বাভাবিক। এর মধ্যে ফোন কল আসে একটা। সাহায্য চায়। কিছু করার আগেই দুম! সব শেষ! ফোন কল ধরে ওমর নামের একজন অপারেটর। সে আকস্মিক এই ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে যায়। এখন যা হওয়ার হয়ে গেছে ভেবে তাঁকে সবাই সান্ত্বনা দেয়। তাঁকে বুঝানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় আরেকজনকে, রানা হাসান নামের একজন নারীকে। এর মধ্যেই আবার কল আসে ওই নাম্বার থেকে! এবার আরেকজনের গলা। এই হচ্ছে হিন্দ রজব হামাদা। এর আগে ফোন করেছিল তাঁর চাচাত বোন। চাচার পরিবারের সাথে গাড়িতে যাচ্ছিল ওরা। ছয় বছরের হিন্দ রজব ছাড়া বাকি সবাই নিমিষেই শেষ হয়ে গেছে বোমার হামলায়। হিন্দ রজব মৃত্যু কী তাও ঠিকমত জানে না! সে বলে এর আগে যে ফোন করেছে সে ঘুমায় গেছে। ওর চাচার পরিবার সবাই ঘুমায় গেছে! এরপর থেকে চোখে আর পানি ধরে রাখা সম্ভব হয় না। পিচ্চি একটা কণ্ঠস্বর বারবার করে বলছে আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও! আমি মার কাছে যাব! তোমরা কেউ আস, নিয়ে যাও! ওমর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না, তাঁর বসের সাথে ঝগড়া শুরু করে। বসের যুক্তি হচ্ছে আমি গ্রিন লাইট মানে গ্রিন সিগনাল ছাড়া কাওকে সেখানে পাঠাতে পারব না। সে এর আগে কতজন এমন উদ্ধার কাজে গিয়ে মারা গেছে তাদের ছবি দেখায়। বলে এখানে আরও ছবি যুক্ত করতে চায় না সে। ওমরকে বুঝানোর দায়িত্ব নেওয়া রানা এবার ফোন কল ধরে। নিষ্পাপ শিশুর আকুতি তাঁকে স্পর্শ করে। সেও ওমরের মত তীব্র ভাবে আবেগে ভেসে যায়। পুরো অফিস বাচ্চাটার জন্য, তাঁর কণ্ঠ শুনে আবেগে ভাসতে থাকে। কিন্তু বাঁচার উপায় কী? হিন্দ রজব জিজ্ঞাসা করে দেরি হচ্ছে কেন? বলে কোঅর্ডিনেশন জন্য। এইটা আবার কী জিনিস? তাঁকে বুঝায় যে আমাদের বাবা ওদের বাবাকে বলছে যেন একটু বোমা ফেলা বন্ধ করে, ওদের বাবা তার ছেলেকে বলবে বন্ধ করতে। সেই ফাঁকে তাঁকে উদ্ধার করে নিয়া আসবে ওরা। বন্ধ করে না কেন তাহলে? এই উত্তর দিবে কে?
শিশুর প্রতিটা বাক্য শেল হয়ে বুকে বিঁধতে থাকে সবার। কোন জবাব নাই। ফোন কলের ভিতরেই গোলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। যত আওয়াজ হয় হিন্দ রজব তত চমকে উঠে, বাঁচার জন্য আকুতি জানাতে থাকে। আমাকে নিয়ে যাও, বাঁচাও, তোমরা আস কেউ! কে যাবে! এইটা তো জীবন, সিনেমা না! এদিকে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, ছোট্ট শিশু হিন্দ রজব তখন আকুতি করছে যে ওর অন্ধকারে ভয় করে! অন্ধকার হওয়ার আগেই তোমরা কেউ আস! ওমর, রানা, তাদের বস মেহেদি, নাসরিন সবাই তখন কাঁদছে অফিসে কিন্তু কিছুই করার নাই তাদের। রানা চাপ নিতে না পরে মেঝেতে পড়ে যায়! এর মধ্যে একজন আসে অডিও কল গুলো দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিবে! যেন এমন পোস্টে খুব কাজ হবে! ওমর তখনই টিটকারি মারে, বলে এগুলা ইজরাইলিরা দেখেও না। এগুলার কোন মূল্য ওদের কাছে নাই। এক সময় সব আশা যখন শেষ, তখন গ্রিন সিগনাল আসে। ম্যাপে দেখা যায় অ্যাম্বুলেন্স এগিয়ে যাচ্ছে হিন্দ রজবের দিকে। ম্যাপের পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্সের সাথে ফোনেও কথা বলছে মেহেদি। সবাই উৎফুল্ল। অল্প একটু দূরত্ব, গাড়ি যাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স থেকে ফোনে বলল হ্যাঁ সে দেখছে হিন্দ রজবের গাড়ি… এরপরেই স্তব্ধ, কোন শব্দ নাই আর। অন্য ফোনে তখনও হিন্দ রজব বলেই যাচ্ছে কই? অ্যাম্বুলেন্স কই? এক সময় হিন্দ রজবের কণ্ঠও আর শোনা যায় না। বর্বর ইজরাইল আর্মি অ্যাম্বুলেন্সকে অনুমতি দিয়েও তাকে ধ্বংস করে দেয়। ১২ দিন পরে যখন সেখানে রেড ক্রিসেন্ট দল যায় তখন দেখে সেই অ্যাম্বুলেন্স অল্প একটু দূরেই বিধ্বস্ত হয়েছে। আম্বুলন্সে ভিতরে থাকা দুইজন সেখানেই মারা যায়। আর পাওয়া যায় হিন্দ রজবকে। তাঁকে যেভাবে গাড়ির সিটের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে বলছিল ওমর সে সেখানেই ছিল, সেখানেই মারা গেছে ও! সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে বন্ধ হয়ে যায় ওঁর কণ্ঠস্বর। ১২ দিন পরে যখন সেখানে যাওয়া হয় দেখা যায় ৩৫৫টা বুলেট ছোড়া হয়েছে হিন্দ রজবদের গাড়ি লক্ষ করে! কী ভয়ংকর এক জঙ্গি বসে ছিল গাড়িতে, যাকে মারতে এতগুলা গুলি!
সিনেমাটার ভয়ংকর দিক হচ্ছে সিনেমায় হিন্দ রজবের আসল ফোন কল রেকর্ড ব্যবহার করা হয়েছে। বাচ্চাটার নিষ্পাপ কণ্ঠস্বর যে কাওকে স্তব্ধ করে দিবে। একটা সময় হিন্দ রজবকে অন্য দিকে মনোযোগ দেওয়ার জন্য রানা তাঁকে কোরান তেলয়াত করতে বলে। কোরান পাঠ করতে তাঁকে সাহায্য করে রানা, ওই ছোট শিশু যখন বোমার ভয়ে গাড়ির সিটের নিচ থেকে রানার কণ্ঠের সাথে সাথে সুরা ফাতিহা থেকে পাঠ করতে থাকে, - "আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, আর-রাহমানির রাহীম" - অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের পালনকর্তা। যিনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু! তখন আর মাথা কাজ করে না। সুরা ফাতিহা কত সহস্রবার পড়ছি কিন্তু এমন, কোনদিন এমন মনে হয় নাই। মনে হচ্ছিল কই? কোথায় দয়ালু? কোথায় করুণা? ধর্ম বিশ্বাস এমনেই টান পরে মানুষের? ধর্মকে এমনেই পাত্তা দেয় না বিচক্ষণ মানুষেরা?
রানা চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রীর নাম হচ্ছে সাজা কিলানি (Saja Kilani), তার আর ওমর চরিত্রে অভিনয় করা মোতাজ মালহেস (Motaz Malhees) - এর একটা সাক্ষাতকার দেখলাম। সেখানে ওরা বলছে ওরা জানত না যে এখানে অরিজিনাল ফোন কল ব্যবহার করা হবে। তারা যখন মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিয়ে শট দেওয়ার জন্য বসে আর কানের হেডফোনে বেজে উঠে হিন্দ রজবের কণ্ঠস্বর তখন তারা সেই মুহূর্তেই নিজেক আর ধরে রাখতে পারে না, কান্নায় ভেসে যায়। নাসরিন চরিত্রে অভিনয় করা ক্লারা খৌরে (clara khoury) বলছে সে যেহেতু আরবি জানে না তাই তার হয়ত সমস্যা হবে যেমন হয়েছে সাজা বা মোতাজের ক্ষেত্রে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে অডিও কল কানে যাওয়া মাত্র সেও নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি! আমি নিজেও একই বিপদে পড়েছি। আরবি জানা নাই, ইংরেজি সাব টাইটেলে দেখছি সিনেমা। কিন্তু আধো আধো গলায় মিষ্টি সেই কণ্ঠস্বর থেকে আরবিতে যা বের হচ্ছিল তাই আমাকে ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না এমনও হতে পারে! অল্প কয়েকটা চরিত্র। সবাই দুর্দান্ত অভিনয় করেছে। বিশেষ করে ওমর আর রানা চরিত্রে অভিনয় করা দুইজন যেন জীবন্ত করে ফেলছে সব কিছু। সিনেমার শেষের দিকে অরিজিনাল কিছু ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। তখন আর যেন পরিষ্কার হয়েছে যে এরা কতটা অসাধারণ অভিনয় করেছে। রিল আর রিয়েলের পার্থক্য করা মুশকিল হয়ে গেছে তখন। অস্কারের জন্য মনোনীত হওয়ার পরেও মোতাজ মালহেসকে ভিসা দেয় নাই ইউএস সরকার। ট্রাম্পের ফিলিস্তিনিদের ভিসা সুবিধা বাতিল নীতির কারণে অস্কার অনুষ্ঠানে থাকতে পারবে না সে! কিছুই আর থাকবে না মানুষের জন্য? সব নষ্টদের অধিকারে যাবে?
হিন্দ রজবের কণ্ঠস্বরকে পুরো দুনিয়ার কাছে পৌঁছে দিতে পরিচালক কাওথার বেন হানিয়া (kaouther ben hania) তার সমস্ত প্রজেক্ট বন্ধ করে এই সিনেমা বানানো শুরু করে। প্রিমিয়ার হওয়ার পরে যখন বেশ আলোড়ন তৈরি হয় তখন এর সাথে প্রডিউসার হিসেবে যোগ দেয় ব্র্যাট পিট, রুনি মারা, জোকাইন ফিনিক্সসহ আরও অনেকেই। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে রেকর্ড ২৩ মিনিটস্ট্যান্ডিং অভেশন পায় সিনেমাটি! যত জায়গায় গিয়েছে সব জায়গায় মানুষ প্রবল ভাবে সমর্থন করেছে এই সিনেমাকে।
আমি ভীষণ ভাবে আক্রন্ত হয়েছি এই ছবি দেখে। দেখার সময় থেকেই আমার মনে হচ্ছিল এই বয়সই আমার একটা ভাইস্তা আছে, ওর নাম সৌম্য। হিন্দ রজবের কণ্ঠস্বর যেন আমি শুনছিলাম না, মনে হচ্ছিল যেন সৌম্যই বলছে, আমাকে নিয়ে যাও, তোমরা আসছ না কেন আমাকে বাঁচাতে! পাঁচ ছয় বছর বয়সীদের যেমন কণ্ঠস্বর হয়, ঠিক তেমনই তো সবার। আমারা নিরাপদ দূরত্বে বসে আছি। অথচ ঠিক এই মুহূর্তেই হয়ত কত শিশু বাঁচার আকুতি নিয়ে হাত বাড়াচ্ছে আর ইস্পাত কঠিন কোন বুট জুতা হয়ত সেই হাতকে মুচড়ে দিচ্ছে কঠিন ভাবে! তাদের কাছে অন্য কোন কিছুর মূল্য নাই। শিশু নারী এই সব ভাবালুতা দেখানোর সময় কই? আমরা একজন হিন্দ রজবের কণ্ঠ শুনে মেনে নিতে পারছি না। অথচ দৈনিক নিয়ম করে এমন কত হাজার শিশুকে মেরে ফেলেছে তার কোন হদিস নাই। হিন্দ রজবের কণ্ঠস্বর সকলের হয়ে যেন বলছে আমাদেরকে রক্ষা কর, মারছ কেন? বাঁচাও! এই কণ্ঠস্বর আমাদের মত নিরাপদে থাকা লোকজন কতখানি শুনতে পাচ্ছি? দানবের বংশ কোনদিন শুনতে পাবে? পৃথিবীটা দানবের হাতে চলে গেল কবে?
ছবিটা অস্কার জিতেনি। জেতার দরকারও নাই। পুরস্কারের অনেক ঊর্ধ্বের জিনিস এই সিনেমা।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।