আমার ধারণা ছিল মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পরিবার আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বুঝি কারো কোন ক্ষতি হয় নাই। আমরা শুধু আব্বা পাকিস্তানে আটক ছিল এইটাই জানতাম। ফিরতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে এই দায় দিয়ে যে তিনি সব পাকিস্তানিদের ছেড়ে দিয়েছে! কিন্তু এই সত্য হুট করেই বদলে গেল। চোখের সামনেই এমন উদাহরণ ছিল অথচ জানা হয়ে উঠেনি। বাস্তবতা বড় কঠিন জিনিস। সময় আরও বড় কঠিন জিনিস এইটাই বুঝলাম আমি।
আমার ফুফু, আব্বার চাচাত বোন। ফুফুর প্রতি সবার যেন একক অধিকার। ফুফুর আবার কী কাজ? আমাদের যখন দরকার তখন ফুফু হাজির। বহু আগেই ফুফু একা, ফুফুর দুই মেয়ে, বিয়ে দিয়ে তাদেরকে জমিজামা ভাগ করে দিয়ে ঝাড়া হাত পা, তাই আমাদের অধিকারের জায়গাটার একটা যুক্তিও আছে। ছোট বেলায় শুনছিলাম ফুফুর এক ভাই আছে, কই জানি হারায় গেছে। এই পর্যন্তই। এরচেয়ে বেশি জানা আমার হয় নাই।
বেশ কিছুদিন আগে সকালের খাবার খাচ্ছি। ফুফু আসছে। খাবার সাধা হল, তিনি খাবেন না, খাওয়া দাওয়া শেষ। বললাম তাহলে চা খাইয়াই জান। চাও খাব না। কিন্তু বসল, এই আলাপ ওই আলাপ চলছে। ডিসেম্বর মাস, মুক্তিযুদ্ধ, বর্তমান সময় এগুলা নিয়াই কথা হচ্ছিল। এর মধ্যেই ফুফু আমাকে চমকে যাওয়া তথ্যটা দিল।
ফুফু - হুসেনরেও তো ধইরা নিয়া গেছিলগা!
আমি - মানে? আপনের ভাই? কই থেকে কে ধরছিল?
ফুফু - আরে ও ঘাওরা আছিল ম্যালা। ও তো যুদ্ধে যায় নাই। এমনেই বসে ছিল, বদরেরা আইসা কয় আমাগোর বস্তাডি টাইন্না দে তো। হোসেন কয় আমি তোগর কামলা? আমি বস্তা টানমু কেন? টানতাম না! এরপরে বদরেরা ধইরা দিছে মাইর, মাইরা বিছায় ফেলছে। শক্তিও আছিল হুসেনের, মাইর খাইয়াও কয় টানমু না!
তিনি জাত ঘাওরা, মাইর খাবে তাও কামলা খাটবে না! এরপরে তাঁকে ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। এই শেষ খবর হোসেন কাকার। জিজ্ঞাস করলাম কোন খোঁজ পান নাই? কেউ খোঁজ নেয় নাই? ফুফুর ভাষ্য হচ্ছে তারা পরে লোকমুখে শুনছে যে গাড়ির পিছনে বেঁধে তাঁকে টেনে টেনে শেরপুর থেকে জামালপুর নিয়ে গেছে! এরপরে কী হল, মরে গেছে না বেঁচে আছে কেউ জানে না।
চোখের সামনে একজন শহীদের কথা শুনলাম, আমি রীতিমত ধাক্কা খেলাম একটা। এমন করেই গেছে কিন্তু কেউ আর ফিরেনি। হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষের মধ্যে মিশে গেছেন হোসেন কাকাও।
এমন সত্য চোখের সামনে বছরের পর বছর ধরে ছিল আর আমরা বেখাল হয়ে থাকলাম। কত বড় একটা সুযোগ নষ্ট হল। এত বছর সুযোগ ছিল তাঁকে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি এনে দেওয়ার। এখন? এখন সম্ভবত এই গল্প লুকিয়ে রাখতে পারলেই ভালো হবে সবার জন্য।
এমন কত কত ইতিহাস হারিয়ে গেছে। শেরপুরে একটা গ্রামের সব পুরুষকে মেরে ফেলে, পরে এই গ্রামের নামই হয়ে যায় বিধবাপল্লী। কত এমন আছে? বিধবাপল্লীর গল্প তো আমার জেলাতেই, জানছি কত পরে। অথচ মানুষ প্রথমেই এগুলা নিয়া চলে না আর। চেতনা ব্যবসা আর কত? এমন নানা কথা বলা শুরু করে দেয়। এখন আমাদেরকে জানানো হয় কামরুজ্জামান জেলা রাজাকার কমান্ডার ছিলেন কিন্তু তিনি বিধবাপল্লী ম্যাসাকারের সাথে জড়িত না! কারণ তিনি তো সেখানে উপস্থিত ছিলেন না! দারুণ না? বলা হয় ষড়যন্ত্র করে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে কামরুজ্জামানকে, মিথ্যা ষড়যন্ত্রে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে তাকে। কামরুজ্জামান রাজাকার এইটা জেলার প্রতিটা মানুষ জানে তবুও এইটা প্রায় প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে তারা যে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে তাকে।
পৃথিবীর বুকে আর একটা এমন রাষ্ট্রও নাই যারা নিজ দেশের স্বাধীনতাকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করে চলে। নানা মতপার্থক্য থাকে, প্রবল বিরোধিতা থাকে। কিন্তু দিন শেষে সবাই নিজদের স্বাধীনতার প্রশ্নে এক হয়ে যায়। আমরা এখন এই সময়ে দাঁড়িয়ে তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখছি ইরানে ইরানের মানুষ এতদিন সরকার পতনের জন্য হাজারে হাজার জীবন দিল অথচ সার্বভৌমের প্রশ্নে সবাই এক। ভারতে, আমেরিকায় রাজনৈতিক দলের ভিতরে নানা দ্বন্দ্ব আছে। কিন্তু তারা কেউ নিজের স্বাধীনতা প্রশ্নে দ্বিমত পোষণ করে? আমাদের এখানে করে। কেউ ভিডিও ক্লিপ খুঁজে পাকিস্তান বাহিনীর নির্যাতনের। কেউ শহীদদের তালিকা চায়, ত্রিশ লক্ষ লোকের নামের তালিকা দেন ওদেরকে!
এখন আরেক অদ্ভুত সময় চলে আসছে। গতকাল ২৫ মার্চ কালরাত স্মরণে প্রধানমন্ত্রী একটা বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে সে নানা ভালো ভালো কথা বলার পাশাপাশি বলেছেন ২৫ মার্চ ম্যাসাকার কেন হল, কেন সেই সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই ম্যাসাকার রোধ করতে পারল না তা নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত! হুম, রাজনৈতিক নেতৃত্ব খুব খারাপ ছিল তখন, একমাত্র আর্মির একজন মেজর ছিল সঠিক!
নতুন জামানায় স্বাগত!
স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা সকলকে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।