বৈশাখের শুরুতেই ঝুম বৃষ্টি হয়ে গেল রাতে। উথাল পাথাল বৃষ্টি। চিরায়িত বাংলার আদি অকৃত্রিম বৃষ্টি। হাজার বছরের পুরনো বাংলায় অঝরে ঝরে যাওয়া বৃষ্টি। সেই শশাঙ্ক থেকে পাল, সেন, সুলতানি আমল, মোঘল থেকে ব্রিটিশ আমল হয়ে পাকিস্তান, এরপরে স্বাধীন বাংলাদেশ। বাংলা নানা দিক পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু বাংলার আদি সৌন্দর্য এখনও একই আছে। একটু বদল হয়নি। ছনের ঘর পরিবর্তন হয়ে হয়ত ফ্ল্যাট বাসায় বসে আছেন কিন্তু বৃষ্টি আগের মতই ঝরছে। বাঙালির রক্তেও সেই একই বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে যা ছিল বহু বছর আগে। কিছু জিনিস বদলায় না। আপনি নিজের জাতি পরিচয় অস্বীকার করতে পারেন কিন্তু তাতে জাতি পরিচয় বদলে যাবে না। বদলানো যায় না।
আজকে এই যে গা ঝাড়া দিয়ে নিজের জাতি পরিচয়কে ফেলে দিয়ে ধর্মীয় পরিচয়কে আঁকড়ে ধরতে চাচ্ছেন, তা করে কী রক্ষা হবে? কালকে ধর্ম পরিবর্তন করলে বা ধর্মের প্রতি বিশ্বাস হারায় ফেললেই তো সব শেষ। ধরেন কেউ "বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি" বলে বুদ্ধের শরণ নিয়ে নিলো তখন? জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক বলে মাংস খাওয়া বাদ দিয়ে দিলো, তখন? ধর্ম পরিচয় বদলে যাবে না? রাগ কইরেন না। আমি বলতে চাচ্ছি ধর্ম পরিচয় পরিবর্তন করা যায়, করে মানুষ। বহু মানুষ ধর্ম পরিবর্তন করছে। কিন্তু আপনার জাতি পরিচয়? ওইটা কীভাবে মুছবেন? এই দুনিয়ায় বেঁচে আছেন যতদিন, যদি এই ভূখণ্ডেই বিয়ে শাদী করে সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন তাহলে আপনি তো অবশ্যই এবং আপনার সন্তানও কোনদিন নিজের জাতি পরিচয় মুছতে পারবে না। এখন আপনি যতই ঘাউরামি করেন আর যাই করেন।
আমাদের মধ্যে অনেকেই মনে করে বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে নিশ্চয়ই পশ্চিমের ছাপ রয়েছে কোথাও। অনেকেই তো খাঁটি এরাবিয়ান ঘোড়া দাবি করে নিজেদের! পূর্ব পুরুষ ইরান থেকে আসছে, সৌদি থেকে আসছে, তুরস্ক থেকে আসছে, আমাদের মধ্যে কোন বাঙালি রক্ত নাই! এমন দাবি বহু শুনছি। কিন্তু তথ্য ঘাঁটলে এর খুব একটা সত্যতা পাওয়া যায় না। এখন বিজ্ঞান বহুদূর আগায় গেছে। মানুষের ডিএনএ- তে সব লেখা থাকে। এখন পর্যন্ত যতগুলা গবেষণা হয়েছে বাঙালির জিন নিয়ে তাতে কোথাও এমন কোন মাত্রায় এরাবিয়ান ঘোড়ার উপস্থিতি পাওয়া যায় নাই যাতে বলা চলে যে আমাদের পূর্ব পুরুষ সব এরাবিয়ান ছিল! খুব অল্প, দুই এক শতাংশ উপস্থিতি দেখা যায় বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে মধ্য প্রাচ্যের জিনের উপস্থিতি। আপনে যা কল্পনাও করতে পারবেন না তার উপস্থিতিই বরং বেশি আছে। বাঙালি মুসলিম আর পশ্চিম বঙ্গের বাঙালি হিন্দুর মধ্যে জিনগত খুব একটা পার্থক্য নাই! প্রায় একই জিন বহন করে চলছি আমরা সবাই।
দুনিয়া চলছে তার নিজস্ব হিসাবে। হাজার হাজার বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষের বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে। শুধু আমাদের না, সব জায়গারই আলাদা হিসাব আছে। আপনি মাছ খেতে ভালোবাসেন, এমনেই? যে হিন্দু ধর্মের লোকেরা অন্যদিকে মাছ সহ্যই করতে পারে না সেই হিন্দু ধর্মেরই মানুষ এই অঞ্চলে মাছ পূজায় ব্যবহার করছে! বিয়ে শাদিতে লাগছে! এগুলা এমনে এমনেই? মূল কাহিনী একটু মাথা খাটালেই পাওয়া যায়। সমুদ্রের তীর ধরে যত জায়গা আছে, সব জায়গায় মানুষ মাছ খায়! ভারত মহাসাগর থেকে আমাদের বঙ্গোপসাগর, সবাই মাছ খায়। ভারতবর্ষের যত ল্যান্ডলক জায়গা দেখবেন তত দেখবেন নিরামিষাশী মানুষের আধিক্য! পৃথিবীর দিকে তাকালেও দেখি এমনই হিসাব। ল্যান্ডলক জায়গায় মাছ খায় না, মাংস খায় তুমুল ভাবে। ওইসব দেশে আবার নিরামিষাশী পাবেন না, কারণ নিরামিষাশী হওয়া পুষায় না সেখানে। শাক সবজি সহজলভ্য না। যেটা বলতে চাচ্ছি তা হচ্ছে আপনার খাদ্যভাসও আসলে আপনার তৈরি করা না। এর পিছনে ভূগোল আছে, সংস্কৃতি আছে। এইটা সহজ সমীকরণ! আপনি ইচ্ছা করে মাছের মুণ্ড দিয়ে মুড়িঘণ্ট খাচ্ছেন না, এর পিছনে হাজার বছরের ইতিহাস আছে দেখেই আপনার মাছ খাইতে মজা লাগে, নিরামিষাশী না আপনি। এই অঞ্চলে যারা নিরামিষাশী তারা পালন করে, নিজেকে পরিবর্তন করে নিরামিষাশী হয়েছেন। ওইটা এখানকার বৈশিষ্ট্য না।
আপনি কীভাবে জাতি পরিচয় মুছবেন? আপনার জিনের কথা তো বললামই। আপনার রক্তও এই অঞ্চলের কারণে, এই জাতি পরিচয়ের কারণে বদলে গেছে। সারা দুনিয়ায় ও পজেটিভ রক্তের মানুষ সবচেয়ে বেশি, এই অঞ্চলে ও কম। কেন? এইখানেও আপনার জাতি পরিচয় বড় কারণ। এই অঞ্চলে হাজার বছর ধরে কলেরায় মানুষ মারা যেত। ও পজেটিভ রক্তের গ্রুপ কলেরার ব্যাকটেরিয়ায় বেশি আক্রন্ত হত। ন্যাচারাল সিলেকশন তার কাজ করে গেছে, আস্তে আস্তে ও কমে গেছে, বেড়ে গেছে এ, বি গ্রুপের রক্ত। ম্যালেরিয়াও আরেকটা বৈশিষ্ট্য দান করেছে আমাদেরকে। হিমোগ্লোবিন ই! এই জিনিস ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সাহায্য করে। যার কারণে এর উপস্থিতি বেড়ে গেছে আমাদের শরীরে। এমন করে রোগ শোকও আমাদেরকে বৈশিষ্ট্য দান করেছে। হিমোগ্লোবিন ই বা ও পজেটিভ রক্ত অন্য দেশের মানুষেরও আছে, কিন্তু অনেকেই মনে করেন আমাদের এদিকের এইটার জন্য কলেরা, ম্যালেরিয়াই দায়ী। যাই হোক, আপনি কেমনে মাথা ঝাড়া দিয়েই নিজের জাতি পরিচয় মুছে ফেলবেন?
আপনি আজকে নিজের জাতির নিজস্ব কেলেন্ডারকে অস্বীকার করতে পারেন, নানান তকমা দিয়ে মানুষকে রুদ্ধ করে রাখতে পারেন এইসব দিন পলনে। কিন্তু আপনি নিজের শরীরে, চেহারায়, গায়ের রঙে, রক্তে, আপনার জিনে যে বৈশিষ্ট্য বহন করে চলছেন তা অস্বীকার করবেন কী করে? আপনে ফাইসা গেছেন এই জাতি পরিচয়ে, এর থেকে আপনার রক্ষা নাই। প্রতি বছর এই দ্বন্দ্ব নিয়ে লিখতে হয়। ধুর আর ভালো লাগে না বলে যে বাদ দিব সেই উপায়ও নাই। কারণ প্রতিপক্ষ হাল ছাড়ে না। বরং প্রতিনিয়ত আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। বোম মেরে বর্ষ বরণ অনুষ্ঠান বন্ধ করতে চেয়েছে এই দেশে! যারা বোম মেরেছে তারাই আবার কিছুদিন আগে ছায়ানটকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। এরা কোন অলৌকিক আশায় নিজেদের আত্ম পরিচয় ভুলে পশ্চিম দিকে তাকায় থাকে আমার বুঝে আসে না। নিজেরা তো তাকিয়ে থাকেই অন্যদেরকেও নানা ফতোয়া দিয়ে ভয় দেখায় যেন কেউ বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বাস না দেখায়। দিন দিন এদের শক্তি বাড়ছে। আমাদের অনেককেই এখন দেখি গলার সুর পরিবর্তন হয়ে গেছে। মিনমিন করে বলতে চায় এগুলা হিন্দুয়ানী ব্যাপার! আর জোরেশোরেই শোনা যায় জাতীয় পর্যায়ে, তারা মঙ্গল শব্দতেই সমস্যা খুঁজে পায় তাই শোভাযাত্রা থেকে মঙ্গল বাদ, এবার হবে আনন্দ শোভাযাত্রা! বাংলা মাসের নাম, সপ্তাহের বারের নাম নিয়ে কবে ক্যাচাল শুরু হবে এইটা জন্য অপেক্ষা করছি এখন! যাই হোক, এ নতুন কিছু না, প্রতি বছর শুরুতে এই ক্যাচাল নিয়ে লেখতে হয়। বাংলাদেশের নববর্ষ উদযাপন নিয়ে লিখতে চাই প্রতিবার। কিন্তু লেখা হয় এই দ্বন্দ্ব নিয়ে। কিছু করার নাই, আগেই বলছি থামার সুযোগ নাই আসলে। সমস্ত কিছু গ্রাস করে নেওয়ার জন্য থাবা মেলে বসে আছে তারা।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।