এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • শুভ নববর্ষ 

    মুহাম্মদ সাদেকুজ্জামান শরীফ লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ৩৮ বার পঠিত
  • বৈশাখের শুরুতেই ঝুম বৃষ্টি হয়ে গেল রাতে। উথাল পাথাল বৃষ্টি। চিরায়িত বাংলার আদি অকৃত্রিম বৃষ্টি। হাজার বছরের পুরনো বাংলায় অঝরে ঝরে যাওয়া বৃষ্টি। সেই শশাঙ্ক থেকে পাল, সেন, সুলতানি আমল, মোঘল থেকে ব্রিটিশ আমল হয়ে পাকিস্তান, এরপরে স্বাধীন বাংলাদেশ। বাংলা নানা দিক পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু বাংলার আদি সৌন্দর্য এখনও একই আছে। একটু বদল হয়নি। ছনের ঘর পরিবর্তন হয়ে হয়ত ফ্ল্যাট বাসায় বসে আছেন কিন্তু বৃষ্টি আগের মতই ঝরছে। বাঙালির রক্তেও সেই একই বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে যা ছিল বহু বছর আগে। কিছু জিনিস বদলায় না। আপনি নিজের জাতি পরিচয় অস্বীকার করতে পারেন কিন্তু তাতে জাতি পরিচয় বদলে যাবে না। বদলানো যায় না।

    আজকে এই যে গা ঝাড়া দিয়ে নিজের জাতি পরিচয়কে ফেলে দিয়ে ধর্মীয় পরিচয়কে আঁকড়ে ধরতে চাচ্ছেন, তা করে কী রক্ষা হবে? কালকে ধর্ম পরিবর্তন করলে বা ধর্মের প্রতি বিশ্বাস হারায় ফেললেই তো সব শেষ। ধরেন কেউ "বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি" বলে বুদ্ধের শরণ নিয়ে নিলো তখন? জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক বলে মাংস খাওয়া বাদ দিয়ে দিলো, তখন? ধর্ম পরিচয় বদলে যাবে না? রাগ কইরেন না। আমি বলতে চাচ্ছি ধর্ম পরিচয় পরিবর্তন করা যায়, করে মানুষ। বহু মানুষ ধর্ম পরিবর্তন করছে। কিন্তু আপনার জাতি পরিচয়? ওইটা কীভাবে মুছবেন? এই দুনিয়ায় বেঁচে আছেন যতদিন, যদি এই ভূখণ্ডেই বিয়ে শাদী করে সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন তাহলে আপনি তো অবশ্যই এবং আপনার সন্তানও কোনদিন নিজের জাতি পরিচয় মুছতে পারবে না। এখন আপনি যতই ঘাউরামি করেন আর যাই করেন।

    আমাদের মধ্যে অনেকেই মনে করে বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে নিশ্চয়ই পশ্চিমের ছাপ রয়েছে কোথাও। অনেকেই তো খাঁটি এরাবিয়ান ঘোড়া দাবি করে নিজেদের! পূর্ব পুরুষ ইরান থেকে আসছে, সৌদি থেকে আসছে, তুরস্ক থেকে আসছে, আমাদের মধ্যে কোন বাঙালি রক্ত নাই! এমন দাবি বহু শুনছি। কিন্তু তথ্য ঘাঁটলে এর খুব একটা সত্যতা পাওয়া যায় না। এখন বিজ্ঞান বহুদূর আগায় গেছে। মানুষের ডিএনএ- তে সব লেখা থাকে। এখন পর্যন্ত যতগুলা গবেষণা হয়েছে বাঙালির জিন নিয়ে তাতে কোথাও এমন কোন মাত্রায় এরাবিয়ান ঘোড়ার উপস্থিতি পাওয়া যায় নাই যাতে বলা চলে যে আমাদের পূর্ব পুরুষ সব এরাবিয়ান ছিল! খুব অল্প, দুই এক শতাংশ উপস্থিতি দেখা যায় বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে মধ্য প্রাচ্যের জিনের উপস্থিতি। আপনে যা কল্পনাও করতে পারবেন না তার উপস্থিতিই বরং বেশি আছে। বাঙালি মুসলিম আর পশ্চিম বঙ্গের বাঙালি হিন্দুর মধ্যে জিনগত খুব একটা পার্থক্য নাই! প্রায় একই জিন বহন করে চলছি আমরা সবাই।

    দুনিয়া চলছে তার নিজস্ব হিসাবে। হাজার হাজার বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষের বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে। শুধু আমাদের না, সব জায়গারই আলাদা হিসাব আছে। আপনি মাছ খেতে ভালোবাসেন, এমনেই? যে হিন্দু ধর্মের লোকেরা অন্যদিকে মাছ সহ্যই করতে পারে না সেই হিন্দু ধর্মেরই মানুষ এই অঞ্চলে মাছ পূজায় ব্যবহার করছে! বিয়ে শাদিতে লাগছে! এগুলা এমনে এমনেই? মূল কাহিনী একটু মাথা খাটালেই পাওয়া যায়। সমুদ্রের তীর ধরে যত জায়গা আছে, সব জায়গায় মানুষ মাছ খায়! ভারত মহাসাগর থেকে আমাদের বঙ্গোপসাগর, সবাই মাছ খায়। ভারতবর্ষের যত ল্যান্ডলক জায়গা দেখবেন তত দেখবেন নিরামিষাশী মানুষের আধিক্য! পৃথিবীর দিকে তাকালেও দেখি এমনই হিসাব। ল্যান্ডলক জায়গায় মাছ খায় না, মাংস খায় তুমুল ভাবে। ওইসব দেশে আবার নিরামিষাশী পাবেন না, কারণ নিরামিষাশী হওয়া পুষায় না সেখানে। শাক সবজি সহজলভ্য না। যেটা বলতে চাচ্ছি তা হচ্ছে আপনার খাদ্যভাসও আসলে আপনার তৈরি করা না। এর পিছনে ভূগোল আছে, সংস্কৃতি আছে। এইটা সহজ সমীকরণ! আপনি ইচ্ছা করে মাছের মুণ্ড দিয়ে মুড়িঘণ্ট খাচ্ছেন না, এর পিছনে হাজার বছরের ইতিহাস আছে দেখেই আপনার মাছ খাইতে মজা লাগে, নিরামিষাশী না আপনি। এই অঞ্চলে যারা নিরামিষাশী তারা পালন করে, নিজেকে পরিবর্তন করে নিরামিষাশী হয়েছেন। ওইটা এখানকার বৈশিষ্ট্য না।

    আপনি কীভাবে জাতি পরিচয় মুছবেন? আপনার জিনের কথা তো বললামই। আপনার রক্তও এই অঞ্চলের কারণে, এই জাতি পরিচয়ের কারণে বদলে গেছে। সারা দুনিয়ায় ও পজেটিভ রক্তের মানুষ সবচেয়ে বেশি, এই অঞ্চলে ও কম। কেন? এইখানেও আপনার জাতি পরিচয় বড় কারণ। এই অঞ্চলে হাজার বছর ধরে কলেরায় মানুষ মারা যেত। ও পজেটিভ রক্তের গ্রুপ কলেরার ব্যাকটেরিয়ায় বেশি আক্রন্ত হত। ন্যাচারাল সিলেকশন তার কাজ করে গেছে, আস্তে আস্তে ও কমে গেছে, বেড়ে গেছে এ, বি গ্রুপের রক্ত। ম্যালেরিয়াও আরেকটা বৈশিষ্ট্য দান করেছে আমাদেরকে। হিমোগ্লোবিন ই! এই জিনিস ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সাহায্য করে। যার কারণে এর উপস্থিতি বেড়ে গেছে আমাদের শরীরে। এমন করে রোগ শোকও আমাদেরকে বৈশিষ্ট্য দান করেছে। হিমোগ্লোবিন ই বা ও পজেটিভ রক্ত অন্য দেশের মানুষেরও আছে, কিন্তু অনেকেই মনে করেন আমাদের এদিকের এইটার জন্য কলেরা, ম্যালেরিয়াই দায়ী। যাই হোক, আপনি কেমনে মাথা ঝাড়া দিয়েই নিজের জাতি পরিচয় মুছে ফেলবেন?

    আপনি আজকে নিজের জাতির নিজস্ব কেলেন্ডারকে অস্বীকার করতে পারেন, নানান তকমা দিয়ে মানুষকে রুদ্ধ করে রাখতে পারেন এইসব দিন পলনে। কিন্তু আপনি নিজের শরীরে, চেহারায়, গায়ের রঙে, রক্তে, আপনার জিনে যে বৈশিষ্ট্য বহন করে চলছেন তা অস্বীকার করবেন কী করে? আপনে ফাইসা গেছেন এই জাতি পরিচয়ে, এর থেকে আপনার রক্ষা নাই। প্রতি বছর এই দ্বন্দ্ব নিয়ে লিখতে হয়। ধুর আর ভালো লাগে না বলে যে বাদ দিব সেই উপায়ও নাই। কারণ প্রতিপক্ষ হাল ছাড়ে না। বরং প্রতিনিয়ত আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। বোম মেরে বর্ষ বরণ অনুষ্ঠান বন্ধ করতে চেয়েছে এই দেশে! যারা বোম মেরেছে তারাই আবার কিছুদিন আগে ছায়ানটকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। এরা কোন অলৌকিক আশায় নিজেদের আত্ম পরিচয় ভুলে পশ্চিম দিকে তাকায় থাকে আমার বুঝে আসে না। নিজেরা তো তাকিয়ে থাকেই অন্যদেরকেও নানা ফতোয়া দিয়ে ভয় দেখায় যেন কেউ বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বাস না দেখায়। দিন দিন এদের শক্তি বাড়ছে। আমাদের অনেককেই এখন দেখি গলার সুর পরিবর্তন হয়ে গেছে। মিনমিন করে বলতে চায় এগুলা হিন্দুয়ানী ব্যাপার! আর জোরেশোরেই শোনা যায় জাতীয় পর্যায়ে, তারা মঙ্গল শব্দতেই সমস্যা খুঁজে পায় তাই শোভাযাত্রা থেকে মঙ্গল বাদ, এবার হবে আনন্দ শোভাযাত্রা! বাংলা মাসের নাম, সপ্তাহের বারের নাম নিয়ে কবে ক্যাচাল শুরু হবে এইটা জন্য অপেক্ষা করছি এখন! যাই হোক, এ নতুন কিছু না, প্রতি বছর শুরুতে এই ক্যাচাল নিয়ে লেখতে হয়। বাংলাদেশের নববর্ষ উদযাপন নিয়ে লিখতে চাই প্রতিবার। কিন্তু লেখা হয় এই দ্বন্দ্ব নিয়ে। কিছু করার নাই, আগেই বলছি থামার সুযোগ নাই আসলে। সমস্ত কিছু গ্রাস করে নেওয়ার জন্য থাবা মেলে বসে আছে তারা।

    শুভ নববর্ষ। মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা… এই তো, এই প্রত্যাশাই নতুন বছরে।

    https://tinyurl.com/mry7ueja

     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ৩৮ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ...  - Srimallar Speaks
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে প্রতিক্রিয়া দিন