অনেক মাঠ তখন এলাকা জুড়ে রয়েছে সেখানে আমরা খেলে খেলে বেড়াই। ফুটবল আর টেনিস বলে ক্রিকেট খেলা হয়। একটু একটু করে জমি প্লটিং শুরু হয়েছে। মাঠেরা, বাগানেরা তখনো অনেকটাই আছে। সেবার প্রগতি সংঘ ক্লাবের হয়ে আমরা কজন চাঁদা তুলতে বেরিয়েছি। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে বেশ ভালো লাগছিলো। আমাদের টিম লিডার ছিল সমরদা। সেই যা কথা বলার সব বলবে, আমাদের কাজ সঙ্গে সঙ্গে থাকা, একটু পেছনে পেছনে দাঁড়িয়ে বিল কাটা। বেরিয়েছি যখন আকাশ পরিস্কার। ক্রমে মেঘ করে এসেছিল হয়ত টের পাইনি নিজেদের মধ্যে গল্প গুজব করছিলাম, হাসাহাসি। সামনের একটা বাগানে কড়কড় করে বাজ পড়লো। বাজের শব্দ শুনতে পাওয়া মানে বেঁচে যাওয়া। যাদের ওপর বাজে পড়ে তারা নাকি শব্দ শুনতেই পাবে না। আলো এসে বিদ্যুৎ হয়ে তাদের গায়ের ভেতর ঢুকে বসে থাকবে। সেই চলমান বিদ্যুৎ মাটির ভেতর লক্ষগুণ শক্তিশালী যে অসংখ্য বার বাজে পড়ে পড়ে অসীম স্থির বিদ্যুৎ ভাঁড়ার হয়ে আছে, তাতে ঢুকবে আর দেহটাকে মাটির ওপর আছড়ে ফেলে, প্রাণটাকে নিয়ে চলে যাবে। কিন্তু আমরা বিকট আওয়াজ শুনে এ ওকে আঁকড়ে ধরে বসে পড়েছিলাম। তার পর উঠে দাঁড়িয়ে বাগানের দিকে তাকালাম। সমরদা বলল, “গাছে আগুন ধরে গেছে !’’
- কোন গাছে ?
- যে গাছে পড়লো।
- আগুন কোথায় ?
- যা জঙ্গল হয়ে আছে। ভেতরে কোথাও আছে। কেউ যাবি না। চল এখন থেকে চলে যাই, চল।
এই বলে সমরদা তাড়াতাড়ি আমাদের নিয়ে চলে আসে। আমরা অন্য পাড়ায় চলে গিয়ে সেখানে চাঁদা তুলতে থাকি। নিশ্চয়ই কোথাও কোন গাছে বাজ পড়ে আগুন আর ধোঁয়া বেরিয়েছিল গল গল গল গল। ধোঁয়া আর কী রকম করে আর বেরোবে, যেমন উনুন থেকে বেরোয় সেরকমই হবে। তবে আমরা বেঁচে ফিরে ছিলাম বাজ, আগুন আর ধোঁয়ার হাত থেকে, পাঁচিল ঘেরা জঙ্গল হয়ে থাকা জায়গাটা বাজের ধাক্কা সহ্য করে করে শেষমেশ নিশ্চয়ই প্লটিংয়ের খপ্পরে পড়ে আর বেঁচে থাকে না। সেখানে আর বাজ পড়বে না, তাকে অন্য জায়গা খুঁজে নিতে হয়েছে।
সখেরবাজারের ভাড়াবাড়িতে আমার জীবনের কয়েকটা বছর কেটেছে। বেশ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ বছর। ক্লাস নাইন থেকে হায়ার সেকেন্ডারির পরীক্ষার আগে পর্যন্ত। ছোট বোনের ফাইভ থেকে নাইন। গুনে দেখেছি আধাগ্রাম মহেশতলায় নিজের বাড়িতে থিতু হবার আগে মোট সতেরো আঠেরোটা বাড়ি বদল করতে হয়েছিল আমাদের। সব বাড়িই প্রথম প্রথম ভালো থাকত, তারপর কিছু না কিছু নিয়ে নিয়ে বাড়িওলার সঙ্গে খিটিমিটি লেগে অন্য বাড়ি খুঁজে পেতে নিতে হয় আরকি। ওই বাড়িটাও সেরকম ভাবেই ছাড়তে হয়, ওই রাস্তার ধারের, পুকুরের ধারের বাড়ি। সেখানের রান্নাঘর দিয়ে তার একমাত্র দরজা দিয়ে উনুনের ধোঁয়া বের হয় গল গল গল গল। মহালয়ার কিছু আগে থেকে পুজো পুজো ভাবটা এসে পড়ে, তখন আরো পড়তো। পুকুরের জল টলটল করতে করতে গাছের তলায় রস বাড়িয়ে দিয়েছিল ফলে টগর আর শিউলি গাছের তলায় অজস্র ফুল পড়ে থাকা শুরু হয় অনেক আগে থেকে কিন্তু আমাদের টের পেতে পেতে মহালয়ার কদিন আগে হয়ে যেত। সকালের উনুন জ্বালানোর যখন তোড়জোড় চলতে থাকে, আমি ভাড়াবাড়ির পেছনের দিকে ফাঁকা উঠোনের পাশে গাছের তলায় অকারণে ফুল কুড়োচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যে পড়তে বসে, তারও কিছুক্ষণের মধ্যে খেয়েদেয়ে স্কুল যেতে হবে সেদিকে ভ্রূক্ষেপ ছিল না। পুজো মানে অকারণে কিছু বা অনেক কিছু করতে থাকা আরকি।
কিছুদিনের মধ্যে মা আবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বাবা মেডিকেল কলেজের বড় ডাক্তার লালুবাবুর কাছে নিয়ে গেল। মাদের পরিবারে টিবি হয়ে দুজন মারা যায়, বাকিদেরও টিবি হয়েছিল । অনেক পরে মারও টিবি হয় চোখে। এই বাড়িতে চাপা রান্নাঘরে থেকে ধোঁয়া খেয়ে যা হবার হতে থাকে। না, মুখ দিয়ে রক্ত টক্ত বেরয়নি শুধু ঘুষঘুষে জ্বর আসে যায়। মা বাবা আর ছোট বোন বড় ঘরটায় খাটে তক্তপোষে মিলিয়ে মিশিয়ে শুতো। আমি ছোট ঘরটায় বইয়ের আলমারিদের সঙ্গে থাকি, বইদের সঙ্গ করি। পরীক্ষা করে দেখা যাচ্ছে এবার মায়ের লাংসে টিবি হয়েছে। কিছুদিন বড়দি এসে রান্নাঘর উনুন সামলায়। বন্ধ চাপা রান্নাঘরের একমাত্র দরজা দিয়ে ধোঁয়া ধোঁয়ার মতো বেরতে থাকে গল গল গল গল। পাশের ঘর থেকে মায়ের কাশির আওয়াজ আসে খক খক খক খক, ওষুধে কাশি কমবেই - লালুবাবু বলে কথা। বাবা তার লালুদার প্রশংসা করতে থাকে কতো গল্প বলে- কথা ! জ্বরও আর আসছে না, মা আবার রান্নাঘরে ঢুকছে। সেই রান্নাঘর যেখানে একমাত্র মাই ঢুকবে আর ঢুকবে বড়দি। টিবির কথাটা কাউকে বলার কি ? তাই কেউ রোগের কথা জানতেও পারে না। জানলে কী হতো ? কী কী হতে পারত ? আজও কি বিশেষ বিশেষ রোগ সব জানা যায় ? রোগের কথা উন্নয়নের অপর হয়ে পাশেপাশে বহমান থাকে নদীর মতো ? দুটো নদী একটা উন্নয়নের, নতুন নতুন সব বাড়ি আর রান্নাঘরের, যেখানে গ্যাসে রান্না হবে উন্নয়ন হবে, দেশ আর রোজগার এগোবে তার পাশে পাশে বইতে থাকবে উনুনের ধোঁওয়া গল গল গল গল আর রোগ হবে। সে রোগ গোপন করা হবে। মার মুখ দিয়ে রক্ত বেরনোর আশংকায় আমরা দিন গুনতে থাকবো, যদি মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে একটা ভীষণ কিছু ঘটে সেই অপেক্ষায় থাকব আর কাউকে কিছু বলা চলবে না। পাশের ঘরের মাসিমা মায়ের অসুখের সময় আমাদের এটা সেটা পাঠাবেন কিন্তু তাকেও কিছু বলা হবে না।
এসব অবশ্য বেশিদিন চলে না, আবার পরের পুজো এসেছিল। আমি ভালো ভাবে মাধ্যমিক পাস দিয়েছিলাম। তারও অনেক আগেই একটু সামলে নিয়েই মাকে ওই চাপা রান্নাঘরেই আবার রান্না বাড়া করতে দেখা যেতে থাকে। পাশেই ডায়মন্ড হারবার রোডের চওড়া করার কাজ যেটুকু বাকি ছিল তা শেষ হবার মুখে চলে এলো। দুঘর ভাড়াটের দুটো রান্নাঘর আর তাতে দুই উনুন, তার থেকে ধোঁয়া বেরচ্ছে গল গল গল গল গল। । আর হ্যাঁ, বাবা আর কোন কথা বাড়ায় না গ্যাসের জন্য আবেদন করে দিয়েছে। কয়লার উনুন বিদেয় করার তোড়জোড় চলে।
শেষে ওই বাড়িটা ছেড়েও আমাদের চলে যেতে হলো একটা ঘটনায়। সেদিন ছোটবোন, যে ক্লাস নাইনে পড়ে আর অনেকটা বড় হয়ে গেছে, এক ছুটির দিনই হবে বাথরুম থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। ওর কান্না থামছে না দেখে আমি অন্য ঘরে চলে যাই আর ভুলেও যাই। আমাকে কেউ কিছু বলে না তবে সবার মুখ থেকে হাসি কয়েক দিনের জন্য চলে গিয়েছিল। আমি স্কুল গিয়ে, বারো ক্লাসের টিউশন পড়ে পড়ে হাবুডুবু খেতে খেতে কয়েকদিন পরে ব্যাপারটা জানতে পারি। ফিসফিস ফিসফিস করে ঘরের মধ্যে আমরা কথা বলছিলাম, এমনকি বাবাও যে গলা ছেড়ে ছাড়া কথা কইত না সেও ফিসফিস করে মাকে বলছে, " গ্যাসের এপ্লাইটা করে দিলাম এই ঠিকানায়। এখন এই বাড়ি ছেড়ে গেলে এলটমেন্টের চিঠিটা ফেরত যাবে। " জানলাম আমরা মহেশতলায় চলে যাব সামনের মাসেই। প্রথমে ওখানে ভাড়াবাড়িতে ওঠা হবে, তারপর বাবা বাড়ি শুরু করে দেবে কিছুদিন আগে কেনা জমিতে। জমিটা একটা মাঠের মধ্যে, চারদিক ফাঁকা ফাঁকা – গ্রাম আর রাতে সেখানে আঁধার গভীর হয়ে আসবে। ''এতো তাড়াতাড়ি কেন ?"এই বলে জিজ্ঞেস করতে যাব আর ঠিক তখনই আমি আস্তে আস্তে সব জানতে পারলাম মায়ের কাছ থেকে। এই বাড়িটা আমাদের ছেড়ে দিতে হবে তার কারণ একটা অকারণ কিছু। সেই অকারণটা বোনের পক্ষে খুবই নিদারুণ হয়েছিল, আস্তে আস্তে মার কথায় বুঝতে পারলাম। নিদারুণ হয়েছিল কারণ বোন ক্লাস নাইনে পড়ে বেশ বড় হয়ে উঠেছে আর মেয়েদের বড় হওয়া কি নিদারুণ নয় ? না হলে কেন বাথরুমের টিনের দরজা দিয়ে, নাকি জাফরির অনেকটা ফাঁক দিয়ে দিয়ে যেখান দিয়ে আলো আসে সেখানে আলোর বদলে একটা মোটা ফ্রেমের চশমায় ঢাকা পুরু হাই পাওয়ার লেন্সের আড়ালে দুটো চকচকে চোখ দেখা যাবে কেন ? সেটা অবশ্যই বোন দেখেছিল, ওই চকচকে চোখদুটো আর সেটা যে দোতলার বাড়িওলার সদ্য বিয়ে হওয়া মোটাসোটা ছোটছেলের তাতে তার সন্দেহ ছিল না। কয়েকদিন আগের বোনের ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার কথা মনে পড়ে গেল যা সেদিন ভালো করে খেয়াল করিনি। মা –বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাউকে কিছু বলা যাবে না। জানাজানি করা যাবে না তাই আমাকেও জানানো হয়নি। বাবা শুধু বারবার, বলছিল গ্যাসের এলটমেন্টের চিঠিটা ফেরত যাবার কথা। সেটা হলে কী হবে বাবা বুঝতে পারছিল না। আমি বুঝলাম আবার একটা নতুন পাড়ায় অনেকটা গ্রামের মতো কোন জায়গায় গিয়ে পড়তে হবে, নতুন বন্ধু পাতাতে হবে, নতুন খেলার মাঠ, যাতায়াতের অসুবিধে এইসব ভেবে ভেবে আমিও খানিকটা চুপ মেরে গেলাম। রাগও যে হয়নি তা নয় কিন্তু পাড়ার দাদা বাড়িওলা আর তার ছোট ছেলের চারপাশে যারা ছিল তাদের রাগের বহর যে অনেক বড় সে কথা বুঝতে হয়েছিল। ছোটবোনকে বাড়িটা ছাড়া অবধি সারাক্ষণ মায়ের কাছে লেপটে থাকতে দেখি। ঘটনাটা আমি জানার পর সে আমার সঙ্গে চোখাচোখিই করে না। ওইটুকু জায়গার মধ্যে কে কাকে কতোটা এড়িয়ে চলতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলছিল। আমারা সবাই সবাইকে এড়িয়ে চলতে চলতে রাস্তার পাশে, পুকুরের ধারের বাড়িটা ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে থাকি। মায়ের টিবি রোগের মতো বাথরুমের জাফরি বা দরজার ফাঁক দিয়ে জেগে থাকা চোখটার কথা খুবই গোপনে রাখার সিদ্ধান্ত করে আমারা গর্তের মধ্যে ঢুকে যাই।
একান্ত হবার জায়গা হিসেবে টিনের দরজা ঘেরা বাথরুমটার যে জুড়ি নেই সেটা এ ঘটনাটা না ঘটলে আমি হয়ত বুঝতেই পারতাম না। সেদিন আমি ওই বেআব্রু বাথরুমের ভেতরে নিজেকে দেখার চেষ্টা করি। জাফরির ফাঁকগুলো দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তাকিয়ে আমার এই একান্ত দেখাদেখি চলছিল, দরজায়, টিনের দরজায় যে এতগুলো ফুটো থাকতে পারে আগে কখনো চোখেও পড়েনি। কিন্তু আমি ছেলে বলে নেহাতই ছেলে বলে উল্টো দিকে আমাকে দেখার কোন চকচকে চোখ কোথাও দেখতে পাব না এমনটা যখন স্থির করেই ফেলতে যাচ্ছি - চোখ পড়ে গেল দরজার ঠিক বাইরের রান্নাঘরের ভেতর। সেখানে না আছে জানলা, না ঘুলঘুলি শুধু দরজা দিয়ে উনুনের ধোঁয়া বের হচ্ছে গল গল গল গল আর সে ধোঁয়ার মধ্যে পরস্পরকে আষ্টেপিষ্ঠে জড়িয়ে জড়িয়ে ধরে ক্রমশ আবছা হতে লেগেছে মা আর ছোটবোন। পরতে পরতে ধোঁয়া আর ধোঁয়া হয়ে তারা মিলিয়ে গিয়েছিল। শুধু যাবার আগে মুখে আঙ্গুল চেপে মা কাউকে কিছু না বলতে, কিছু না করার ইশারা করতে করতে সেঁধিয়ে সেঁধিয়ে আরো সেঁধিয়ে গেল এমনটা সেদিন আমার চোখে পড়তেও পারে, পারে না কি ?
(নান্দীমুখ পত্রিকায় ইতিমধ্যে প্রকাশিত )