এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  বাকিসব  মোচ্ছব

  • আমার বাবার মেটামরফোসিস (২) ( গল্প) 

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    বাকিসব | মোচ্ছব | ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ২৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • আমার বাবার মেটামরফোসিস (২)

     টাইগার! টাইগার!
    -আচ্ছা বাবা, তুমি ছোটবেলায় কোন মৃত্যু দেখেছ? না, না; অসুখে ভুগে বা বুড়ো হয়ে শরীর ছেড়ে দিলে মানুষের চলে যাওয়া নয়, বলতে চাইছি এমন কোন মৃত্যু যা তোমার মনে ছোটবেলা থেকেই ছাপ ফেলেছে—সেরকম কিছু।
     হয়ত নির্মম বা হিংস্র—সেজন্যেই গভীরভাবে শিশু মনে দাগ কেটে বসেছে।
     
     
    --তুই তো জানিস খুকু, রক্ত দেখলে আমার গা গুলোয়। ছোটবেলায় প্রথম লোলজিহ্বা কালীমূর্তি দেখেও আতংক হয়েছিল। খড়্গ থেকে টপ টপ রক্ত পড়ছে, শেয়াল চেটে খাচ্ছে, দু’পাশে দুই ভীষণদর্শনা ডাকিনী যোগিনী! আমি পুজো প্যান্ডেল থেকে বেরিয়ে গেছলাম।
     
    আবার, রাস্তায় খুব মাদারি কা খেল হত। 
    কোলকাতার রাস্তায় এখন আর সাপওলা, বাঁদরওলা দেখি না, মাদারির খেলাও না। 
    রাস্তায় মাদারি আর ওর চেলা—হিন্দিতে জমুরে—মিলে নানান ভেলকি দেখিয়ে ভীড়ের লোকজনের থেকে পয়সা নিয়ে পেট চালাতো। কিন্তু ওদের খেলা বেশিক্ষণ দেখতে পারতাম না। 
    কারণ খেলা শুরু হবার একটু পরেই মাদারি ওর চ্যালার জিভ কেটে ছুঁড়ে দিত মাছের কানকো বের করার মত করে। আর জিভ হারিয়ে চ্যালাটি মুখ দিয়ে ফেনা ফেনা রক্ত তুলে বুক থাপড়ে ছটফট করতে করতে নিথর হয়ে যেত। 
    বুদ্ধি বলত নকল জিভ, নকল রক্ত, কিন্তু ওদের অভিনয়ের গুণে ভয়াল এক দৃশ্য সৃষ্টি হত, 
    কাঁপতে কাঁপতে ঘরের দিকে ছুট লাগাতাম। 
     
      আর একটা ব্যালান্সের খেলা ছিল, রাস্তায় আড়াআড়ি করে দুজোড়া বাঁশের এমাথা থেকে ওমাথায় একটা দড়ি টাঙানো, তার উপরে একজন মহিলা বা বাচ্চা মেয়ে হাতে একটা লাঠি নিয়ে দড়ির উপর এক পা এক পা করে হেঁটে যেত। আমার বুক ধড়ফড় করত। তবু সেটা কোনরকমে দেখতাম।

    ময়মনসিংহ গীতিকা’র “মহুয়া” পড়েছিস? বা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লোকরঞ্জনী শাখার মহুয়া নৃত্যনাট্য দেখেছিস? ও, ওসব তো আজকাল বন্ধ হয়ে গেছে।
     সে যাক, তাতে আছে বাজিকরের পালিতা কন্যা মহুয়া ওরকম দড়ির উপরে চড়ে বালান্সের খেলা দেখাচ্ছে আর সেটা দেখতে দেখতে নইদ্যার ঠাকুর , মানে নদে জেলার ব্রাহ্মণ সন্তান তাঁর প্রেমে পড়ে গেছে।

                     “যখন দেখি বাইদ্যার ছেড়ি বাঁশে দিল  লাড়া,
                     বইস্যা ছিল নইদ্যার ঠাকুর উইঠ্যা হইল খাড়া।
                    যখন দেখি বাইদ্যার ছেড়ি বাঁশে বাজি করে,
                  নইদ্যার ঠাকুর বইল্যা উঠে—পইড়া বুঝি মরে,
                  --পরাণ যায়, যায় রে!
     
    --ধ্যাৎ, এর মধ্যে প্রেমে পড়া কোথায়? এত স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তোমারও দেখলে ওরকম মনে হত, তাই না?
     
    --দাঁড়া, একটু ধৈর্য ধর। খেলার পরে ঠাকুর তো মহুয়াকে প্রপোজ করল। মহুয়ার মন উচাটন।
           “ভিনদেশী পুরুষ দেখি, চান্দের মতন,
                লাজরক্ত হৈলা কইন্যা পরথম যৌবন।
                           --পরাণ যায়, যায় রে!
     
    কিন্তু কৃত্রিম রোষে নায়িকা জবাব কী দিল?
                     “লজ্জা নাইরে নইদ্যার ঠাকুর, লজ্জা নাইরে তর,
                       গলাতে কলসি বাইন্ধা জলে ডুইব্যা মর”।
     
                        কিন্তু ঠাকুর যে প্রেমে দিওয়ানা! তার উত্তরটা দ্যাখঃ
             “কোথায় পাইয়াম কলসি কইন্যা, কোথায় পাইয়াম দড়ি?
               তুমি হইও গহীন গাঙ আমি ডুইব্যা মরি রে কইন্যা,
                               আমি ডুইব্যা মরি”।
     
    -উফ তোমাকে নিয়ে পারা গেল না। ফের ভাট বকছ। 
    কোথায় জানতে চাইছি মানুষের নির্মমতার কোন স্মৃতি , তুমি শুরু করলে ময়মনসিংহের লোকগীতি।
     যদি রেলের ড্রাইভার হতে তাহলে হরদম গাড়ি বেলাইনে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করত। 
    দেখ, আর একবার কফি বানিয়ে আনছি—দাভিদফ, তোমার পছন্দের।
     ততক্ষণ ভেবে ভেবে একটা মারকাটারি নির্মম হত্যালীলার গল্প রেডি করে রাখ। 
    হোক না একটু নেটফ্লিক্স মার্কা।
     
    কফিতে চুমুক দিয়ে বাবা মাথা নাড়ল,-- না রে খুকু, আমার নিজের দেখা অমন নির্মম কিছু নেই। 
    আমার হতাশ চেহারা দেখে বাবা বলল—দাঁড়া, একটা ঘটনা আছে বটে, কিন্তু সেটা মানুষের নয়, কুকুরের।  
    অমন করে মুখ বাঁকিয়ে লাভ নেই। গল্পটা কুকুরের হলেও মানুষের নির্মমতার বটে।
     আজও ভুলতে পারিনি।  
     

     জানিস তো, আমার বাবা, তোর ঠাকুর্দা একসময় ডিভিসি বোকারোয় মেকানিকের কাজ করতেন। 
    সেখানে কয়েক বছর দাপটের সংগে চাকরি করেছেন। লেবার ইউনিয়নের সেক্রেটারি ছিলেন। 
    সবাই একডাকে চিনত। 
    এটা ইস্পাতনগরী বোকারো নয়, দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের পাওয়ার হাউস স্টেশন। আগে বলত দক্ষিণ বিহার, এখন বলে ঝারখন্ড রাজ্য।  

    আমার তখন চার বছর বয়েস। শিশুচোখে জায়গাটা খুব সুন্দর মনে হত।
     পাহাড়ের কোলে ছোট্ট শহর। তার ধাপ কেটে কেটে এক একটা পাড়া।
     যার পোস্ট যত বড় তার বাংলো তত উঁচুতে।
     জেনারেল ম্যানেজারের বাংলো অনেক উঁচু ধাপে, মনে হত মেঘের রাজ্যে।
     
    আমাদের কোয়ার্টার সবচেয়ে নীচের ধাপে, পাহাড় নেমে যেখানে শেষ, সামনে একটা ডোবা বা পুকুর।
    আমাদের দুটো ইউনিট জুড়ে একটা লেবার কোয়ার্টার, অ্যাসবেস্টসের ছাদ, একটা শোয়ার ঘর, রান্নাঘর আর বারান্দা। খেতে হত রান্নাঘরের মাটিতে মায়ের হাতে বোনা আসন পেতে।
     বাথরুম পায়খানা দুটো ইউনিটের জন্যে একটাই। সাপের উৎপাত ছিল।
     সাপের ভয়ে দুটো জোড়া চৌকির পায়ার নীচে ইঁট লাগিয়ে উঁচু করা।তার উপরে আমাদের শোয়ার বিছানা পাতা। রাত্তিরে শোনা যেত হায়েনার হাসি আর শেয়ালের ডাক।
     
    কিন্তু জায়গাটা ছিল দারুণ। 
    শিমূল পলাশ মহুয়া শাল পিয়ালের বন; বসন্তকালে আকাশে যেন আগুন লেগে যেত। 
    গরম হাওয়ায় মহুয়ার ফুল ঝরে পড়ত  টুপটাপ টুপটাপ। 
    মহুয়ার লোভে চলে আসত হরিণ ও ভালুক, রাতের আঁধারে।
     
    --দাঁড়াও, দাঁড়াও! ফের কাব্যি করছ। আমার একটা কথা মনে পড়ছে। ঠাকুমা একটা কথা বলত। 
    তোমার নাকি ছোটবেলায় খুব জ্বর হত। টেমপারেচার লাফিয়ে লাফিয়ে ১০৪ ডিগ্রি হয়ে যেত। 
    ডাক্তারেরা ধরতে পারত না অসুখটা কী! মাথায় আইস ব্যাগ দিতে হত ।
    এবং ওখানকার ছোট হাসপাতালের ডাক্তার জ্বর নামাতে  ইঞ্জেকশন দিতেন। 
    তুমি দু’দিন অজ্ঞান থাকতে। জ্বরের তাড়সে ভুল ভাল বকতে। 
    মাঝে মাঝে টাইগার ! টাইগার! বলে চিৎকার করতে। 
    বলতে –ওই টাইগার এসেছে, দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখছে। আমাকে নিয়ে যাবে।
     
    তখন ঠাকুরমা  জিদ করায় দাদু চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে কোলকাতায় ফিরে এল। 
    পরে অন্য রাজ্যে কোন একটা চাকরি পেল। সত্যি? এটাই কি সেই শহরের গল্প?

    বাবা মাথা নেড়ে সায় দেয়।  
    --কিন্তু বাবা, একটা কথা। টাইগার মানে তো বাঘ।
     ঠাম্মাকে জিজ্ঞেস করতাম বাবাকে কি বাঘে ধরেছিল? ঠাম্মা বলত –ধ্যাৎ। কীসব অলুক্ষুণে কথা!
    --তাহলে টাইগার কে ঠাম্মা?
    ঠাম্মা চুপ করে যেত। কথা ঘোরাতো। 
    খালি বলত যে ওই শহর থেকে চলে আসার পর তোমার টাইগার রোগ সেরে গেছল। 
    আজ বলে ফেল—টাইগার কে? কোন গুণ্ডা? তোমাকে ভয় দেখাতো।

    বাবা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে—না। টাইগার আমায় ভয় দেখাত না, ভালবাসত। আমার বন্ধু ছিল।  
    --খুকু, এটা আমার বড় কষ্টের গল্প। আমি ধীরে ধীরে বলছি। মাঝখানে জিজ্ঞেস করে থামিয়ে দিস না।  

    অল্পবয়সে বন্ধুত্ব হতে বেশি সময় লাগে না। 
    কে কোন পাড়ার কোন বাড়ির তা নিয়ে বাচ্চারা অত ভাবে না। 
    আমাদেরও বন্ধু জুটে গেছল – বাঙালি বাড়ির মঞ্জু আর তাপস, তেলেগু শিউনারায়ণ আমাদের কানে শুনারেণ, পাঞ্জাবি শান্তি ও হরভজন এবং মালয়ালি ভাইবোন কুমার ও বেবি।

    এদের মধ্যে কুমার ও বেবি ছিল একটু আলাদা। কুমার আমাদের থেকে বয়সে বড়।
     কিন্তু তারচেয়ে বড় কথা ওর বাবা কারখানার জেনারেল ফোরম্যান। ওদের কোয়ার্টার আমাদের লাইন থেকে একটু উঁচুতে।
     আমার বাকি বন্ধুরা সব লেবার পাড়ার।  

    ওদের একটা জীপগাড়ি ছিল। বেশ বড়সড়। তার পেছনের সীটগুলো ভাঁজ করলে অনেকটা জায়গা।
     ওটা একটা শেডের নীচে দাঁড়িয়ে থাকত; তাকে বলে গ্যারেজ। 
    মঞ্জুর তখন সামনের দুটো দাঁত পড়ে গেল, সবাই বলল দুধের দাঁত। 
    তখন মুখের সামনে অনেকটা খালি জায়গা হল। 
    আমরা সেই থেকে ওর নাম দিলাম গ্যারেজ, মুখের ভেতরে গ্যারেজ তৈরি হয়ে গেছে যে!  

    তবে বেবিদের বাড়িতে গেলে অনায়াসে ঘরে ঢুকে যেতাম। কেউ কিছু বলত না। 
     চোখে পড়ত ওদের ঘরগুলো কত বড় বড়, বারান্দাটাই আমাদের শোয়ার ঘরের চেয়ে বড়।
     কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠতে হত। ওদের বেশ বড়সড় বাগান ছিল। তাতে ঝুলা টাঙানো। 
    আমরাও গিয়ে ওই দোলনায় চড়ে বসতাম, একজন বসে আর একজন দাঁড়িয়ে।
     দোলনায় প্রথম প্রথম ভয় করত। পরে মজা পেলাম।

    তবে আরেকটা জিনিস চোখে পড়ত।
    আমাদের বাড়িতে কোন কাজের লোক ছিল না। সবকাজ মা একা হাতে করত।
     জিজ্ঞেস করলে বলত-এই তো একটা ঘর, আর তিনজন লোক। কাজের লোকের কী দরকার!
     
     
    ওদের বাড়িতে অনেক কাজের লোক। সুন্দর ভাইয়া, জেকব ভাইয়া, ড্রাইভার ইসমাইল ভাইয়া, লতা মাসি, সুখমনিয়া দিদি। কেউ ঘরের কাজ করে, কেউ বাগান সাফ করে গাছ লাগায়, পাইপ দিয়ে জল দেয়। 
    আর জেকব ভাইয়ার একটাই কাজ—দুটো কুকুরকে সামলানো।
     
     
    হ্যাঁ, ওদের বাড়িতে দুটো বড় বড় কুকুর ছিল। কুচকুচে কালো গোমড়ামুখোটার নাম টাইসন আর যার ধপধপে সাদা গায়ে কালো ছিট ছিট , ও হোল টাইগার।
     আমার গোমড়ামুখোদের পছন্দ নয়। টাইগারের সঙ্গে প্রথম দিন থেকেই দোস্তি।
     ওরও বোধহয় আমাকে পছন্দ, দেখলেই দৌড়ে এসে আমার হাত গাল সব চেটে দিত। 
    খুশি হয়ে মাকে বলায় রেগে গিয়ে এক বালতি ডেটল জল দিয়ে স্নান করালো, আর বলল—ওদের বাড়িতে খেলতে যেতে হবে না। কুকুরের লালায় বিষ আছে। তোর অসুখ হতে পারে।
     
    কিন্তু কয়েক দিন, তারপরেই মাকে লুকিয়ে ওদের বাড়ি গেলাম। টাইগার দৌড়ে এল। 
    দু’পায়ে খাড়া দাঁড়িয়ে ওঠায় আমার মাথা ছাড়িয়ে গেল। জেকব ভাইয়া তখন ওকে মাঠে নিয়ে গিয়ে ট্রেনিং দিচ্ছে। একটা লাল রবারের বল দূরে ছুঁড়ে দিচ্ছে। টাইগার জোড়া পায়ে দৌড়ে মুখে বল কামড়ে ধরে ফেরত আনছে। 
    একটা লাঠি নিয়ে ওর সামনে ধরছে। ও লাফিয়ে সেটা পার করছে—একে নাকি হাইজাম্প বলে।

    আমি জেকব ভাইয়াকে বললাম—আমি একবার বল ছুঁড়ে দেখি?
    ভাইয়া হেসে বল ধরিয়ে দিল। ছুঁড়লাম—ধুৎ, বেশিদূর যায় নি। কিন্তু টাইগার কী খুশি!
    তারপর থেকে আমি রোজ ঘরের বাইরে গেলে অনেকটা সময় টাইগারের সংগে গল্প করতাম।
     টাইগার ঠ্যাং গুটিয়ে আমার পাশে বসে কান নাড়ত, কিছু একটা বুঝত।  তবে মাঝামাঝে হাত টাত চেটে দিলে পকেট থেকে নাক মোছার ন্যাকড়া বের করে সাফ করে নিতাম। মা বকবে যে!  

    একবার সব বন্ধুরা ডাকল—শিগগির চল, কুমার ভাইয়া ডেকেছে। ওদের বাড়িতে কলের গান এসেছে।
    দৌড় ! দৌড়!
    গিয়ে দেখি সাদামত একটা বড় বাক্স জীপ থেকে নামিয়ে ধরাধরি করে তোলা হচ্ছে।
     আন্টি বললেন—তোমরা বিকেলে এস, তখন গান শুনতে পাবে। বিকেলে গিয়ে দেখি ইংরেজি গান বাজছে আর তখন দেখলাম কুমার ভাইয়া, বেবি এবং আন্টি হাত ধরাধরি করে নাচছে।
     
    গান, বাজনা ও নাচ সবই আমার কেমন অচেনা বিজাতীয় মনে হল। আমি চলে এলাম। 
    কিন্তু টাইগার যেই ভৌ ভৌ করে দৌড়ে এল আমার বন্ধুরা ভয়ে পালিয়ে গেল। 
    আমি হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে ওর মাথা চাপড়ে দিলাম। কানের নীচে চুলকে দিলাম। ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিলাম। ইচ্ছে হচ্ছিল ওর রেশমী ঘাড়ে একটা চুমো খাই, কিন্তু  কেমন ভয় হোল।
     
    কুমার ভাইয়া ফুলপ্যান্ট পড়ত। এয়ারগান দিয়ে পাখি মারত। আমাদের বন্দুকটার ঘাড় মুচড়ে পেট খুলে গুলি ভরার জায়গা আর ছোট্ট ছোট্ট সীসের গুলি দেখিয়েছিল; ছুঁতে দিয়েছিল।
     বেবি বাইরে যেত না। ওদের বাগানেই আমাদের খেলতে ডাকত।
     
     আমরা, মানে বাকি বন্ধুরা মিলে খেলতে যেতাম আশপাশের গাছপালা মাঠ আর পাহাড়ের কাছে। 
    একবার সাদা ফটকিরির মত চকচকে পাথর পেয়ে আমরা সবাই এক এক টুকরো বাড়িতে নিয়ে এলাম। মঞ্জু বলেছে এগুলো চকমকি পাথর।  এদিয়ে ঘষে ঘষে আগুন জ্বালানো যায়।
    ভাবলাম, তাহলে মাকে আর উনুন ধরাতে কেরোসিন কিনতে হবে না। 
    কিন্তু বাবা বলল—ওসব নয়, এতে মাইকা আছে, বাংলায় বলে অভ্র।
    তক্ষুণি আমাকে সেলেট পেন্সিল নিয়ে বানানটা লিখতে হোল।
     
     
    রোববার দিন। সকালে ধারাপাত থেকে কড়াকিয়া গণ্ডাকিয়া মুখস্থ করে এক থেকে একশ অব্দি সেলেটে লিখে খেলতে যাব বলে বেরোচ্ছি এমন সময় মা আমার নড়া ধরে টেনে ঘরে ঢুকিয়ে দরজায় ছিটকিনি তুলে দিয়ে বলল—খবরদার ঘর থেকে বেরোবি না।

    আমি অবাক, কী হয়েছে।
    মা হাঁফাতে হাঁফাতে বলল— তোর পেয়ারের টাইগার পাগল হয়ে গেছে। সবাইকে কামড়াচ্ছে। বেবিকে আগে কামড়ে দিয়েছে। ওর বাবা জীপে করে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। সুন্দর, জেকব, ইসমাইল সবাই দড়ি আর লাঠি নিয়ে ওকে ধরার চেষ্টা করছে। ও পালাচ্ছে আর যাকে পাচ্ছে তাকে কামড়াচ্ছে।

    আমি বললাম-মা , আমি গিয়ে ডাকলেই ও চলে আসবে। পাগলামি ঠিক হয়ে যাবে।
    --চুপ কর বোকা ছেলে!

    জানলা দিয়ে দেখি গোটা পাড়া জুড়ে চিৎকার চেঁচামেচি। 
    মায়েরা তাদের বাচ্চাকে বগলদাবা করে ঘরে ঢোকাচ্ছে আর টাইগার কোন দিকে গেছে সে নিয়ে এ ওকে খবর দিচ্ছে। হঠাৎ দেখি টাইগার! 
    মুখ দিয়ে লালা ঝরছে। আমাদের গলিতে দৌড়ে ঢুকছে।  একলহমায় গলি শুনশান। 
    আমি জানলা দিয়ে ডাকলাম—টাইগার!  টাইগার! কাম, কাম!
    টাইগার মাথা ঘোরালো , তবে আমাকে ঠিক দেখতে পেল না। ও ঘাড় ঘুরিয়ে একটা মুরগিকে তাড়া করছে।
    খানিকক্ষণ পরে মঞ্জু আর তাপস এল আমাদের বাড়িতে।
     
    --টাইগার ধরা পড়ে গেছে। ওকে বেঁধে রাখা হয়েছে। চল, গিয়ে দেখে আসি। আমরা সবাই যাচ্ছি।
    দেখলাম মা বাথরুমে ঢুকেছে। জানলায় চড়ে ছিটকিনি খুলে ওদের সাথে চলে গেলাম।

    ওদের বাগানের দরজা খোলা। কিন্তু আমরা ওখানেই আটকে গেলাম। কারণ টাইগার। 
    ও দড়ির ফাঁস সমেত দৌড়ে ওদের হলঘর থেকে বারান্দায় বেরনোর চেষ্টায় দৌড় মেরেছে। সুন্দর ভাইয়ার হাত থেকে দড়ি ছিটকে গেছে। আমরা জমে পাথর।
    কিন্তু বারান্দায় জেকব আর ইসমাইল ভাইয়া খাপ পেতে ছিল। 
    যেই টাইগার ঘরের চৌকাঠ থেকে বারান্দায় গলা বাড়িয়েছে অমনি ওরা দু’পাশ থেকেই দুটো কপাট ওর গলায় চেপে সমানে চাপ দিতে লাগল। টাইগারের চোখ বেরিয়ে আসছে, জিভ লম্বা হয়ে তার থেকে নাল ঝরে পড়ছে। 
    এবার নালের সঙ্গে রক্ত বেরোচ্ছে, দরদর করে।
     
    সুন্দর ভাইয়া ওপাশ দিয়ে ঘুরে এসে ওর গলায় ফাঁস পরিয়ে টানতে লাগল। আর একজন কেউ এসে ওর মাথায় মুখে বাঁশ দিয়ে পেটাতে লাগল। 
     যখন ওর চোখ ঠিকরে আসছে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম—মেরো না, টাইগারকে আর মেরো না। ও মরে যাবে।
     
    সবাই চমকে রাগী রাগী চোখে আমার দিকে তাকালো। 
    ওদের ইশারায় কুমার ভাইয়া আমাকে পাঁজাকোলা করে ওদের বাগানের বাইরে এনে নামিয়ে দিয়ে বলল—সোজা বাড়ি চলে যাও, এখানে দাঁড়াবে না।
     
    আমি বাড়ি যাইনি। একটু দূরে দাঁড়িয়ে এদিকে তাকিয়ে কাঁদছিলাম। 
    বেশিক্ষণ লাগল না। ওরা প্রায় মরে যাওয়া টাইগারকে টানতে টানতে কাছের টিলার নীচের জঙ্গলের দিকে রওনা দিল। টাইগার কোন শব্দ করছে না, নড়ছে না। 
    একটু দূরে একটা পলাশ গাছের নীচে ওকে ফেলে আরও কয়েকবার পিটিয়ে দুরমুশ করে তারপর ওই অবস্থাতেই ফেলে রেখে ফিরে আসতে লাগল।
    এবার আমি দৌড়ুতে লাগলাম।
     
     
    মা আমাকে জড়িয়ে ধরে স্নান করিয়ে ভাত বেড়ে দিল। ভাত মেখে খাইয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু কয়েক দলা খাওয়ার পর হড়হড় করে সব বমি করে দিলাম।
     
    দুটো মাস কেটে গেছে। আমরা কেউ আর জঙ্গল বা টিলার দিকে খেলতে যেতাম না। 
    কেউ মানা করে নি, কিন্তু যেতাম না। 
    নতুন নতুন খেলা, তিন সংখ্যার ভাগ পেরিয়ে চার সংখ্যার ভাগ শেখা, সহজ পাঠে “ছুটির দিনে কেমন সুরে পুজোর সানাই বাজছে দূরে” এসব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।
     বর্ণ পরিচয় আর সহজ পাঠে কোন কুকুরের গল্প ছিল না। আমার পক্ষে টাইগারকে ভোলা সহজ হয়ে গেছল।
     
     
    শীতের বিকেল। হাজারিবাগ জেলার এদিকটায় দ্রুত কুয়াশা নামে। মা বলল-বেশি দূরে যাস না। আমি মিনু কাকিমাদের সঙ্গে বাংলা সিনেমা দেখতে যাব। বাবা বাড়িতে থাকবে।
     
    কোন কিছু করতে মানা করলে সেটাই করতে মন চায়।
     সেদিন বন্ধুরা মিলে খেলতে খেলতে টিলার কাছে চলে গেলাম। মঞ্জু একটা হিট হিন্দি গান আমাদের শোনাল।
     “মেরা দিল নে পুকারে আজা, মেরে গমকে সহারে আজা”।
     
    সুরটা ভাল লাগায় আমি কয়েকবার চেষ্টা করলাম। ওরা বলল এবার ফিরতে হবে, নইলে বাড়িতে চিন্তা করবে। কুয়াশা নামছে।
    আমি বললাম—তোরা যা, আমি এই আসছি। এক দৌড়ে ধরে ফেলব।
    কেন জানি না আমার ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। একটা বড় পাথরের উপরে উঠে গলা ছেড়ে গাইতে লাগলামঃ
    “মেরা দিল নে পুকারে আজা, মেরে গমকে সহারে আজা”।
     
    একটু পরে মনে হোল সামনের ঝোপে কিছু একটা নড়ছে। 
    ভয় পেলাম-হায়েনা? শেয়াল?
     
    ওমা! কুয়াশার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে কে?
     টাইগার!
     
      কাম টাইগার! কাম! কাছে আয়, কতদিন আদর করি নি, ঘাড় চুলকে দিই নি।
    কিন্তু  টাইগার খালি হাসে, কাছে আসে না।
     কেন রে বাবা? রাগ করেছিস? টাইগার জিভ বের করল।
    হয়েছে হয়েছে , আর নাটক করতে হবে না। কাছে আয় ।

    কিন্তু টাইগারের জিভ লম্বা হচ্ছে, নাল ঝরছে। রক্ত বেরোচ্ছে। ওর চোখ ঘোলাটে , চোখের পাশ দিয়ে রক্ত। চেষ্টা করছে কিছু বলার,  মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না।

    বাড়ি না ফেরায় বন্ধুদের মুখে শুনে বাবা আর মৈত্র কাকু একটা পলাশ গাছের নীচে পাথরের চাঁইয়ের পাশ থেকে আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় দেখতে পেলেন।  সেই রাত্তিরে জ্বর এল। ধূম জ্বর। 
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন