তুমি না জানলেও, তোমাদের ছাদ জানে
তোমার বাসার নীচে প্রতিদিন যে ধোঁয়া ওড়ে
তাতে কোনদিন মাংস সেঁকে দেখেছো?
তাহলে নাহয় ছাদেই পরীক্ষা করো একদিন
পাইন গাছের ডাল টুকরো টুকরো করে খাড়া করে রাখা টিনের ড্রামে রাখবে
উপর থেকে কেরোসিন ঢেলে দেশলাই কাঠি খুঁজতে আবার নেমে আসবে নীচে
পাইন কাঠের প্রতিটি ফাঁকে ততক্ষণে ঢুকবে কারোসিন
তুমি না জানলেও, তোমাদের ছাদ জানে
পাশের বাড়ির কাকলির দেশলাই আনতে কতটা সময় লেগেছিল
তারপর ফিরে এসে লোহার জালতিটি চাপিয়ে দেবে ড্রামের উপরে
উত্তুরে হাওয়াকে তালুতে আড়াল করে জ্বেলে নেবে বারুদ মাখানো কাঠি
কাছ থেকে ফেলে দেবে তেল ভেজা কাঠে
খেয়াল রাখবে তোমার মাথার চুল যেন মুখের সামনে আসে না
তুমি না জানলেও, তোমাদের ছাদ জানে
কাকলির মুখটি চেনা যায় নি
কেউ বলেছিল ডিজেলের জন্যই এটা হয়েছে, কেরোসিনে এতটা হত না
তুমি তাই কেরোসিনই ব্যবহার করো
আগুনের শিখা একসময় নিভে গেলে দূর থেকেও দেখতে পারবে গণগণে আভা
তখনই তুমি মেরিনেট করা মাংসগুলি তারের জালতিটির উপরে চাড়িয়ে দিও
পাইন কাঠের গন্ধ মাংসের মধ্যে ঢুকতে থাকবে ক্রমশঃ
খানিকটা সময় পাবে হাতে টুকরোগুলি উল্টাবার আগে
সেই ফাঁকে চাইলে একটা রবীন্দ্রনাথের গান গেও ওপাশে বসে
তুমি না জানলেও, তোমাদের ছাদ জানে
সেই রাতে কাকলিও একটি রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছিল
রামধনু রঙ হাত বদলায় গভীর রাতে
আমি গাড়ির আসার অপেক্ষায়
পাশে দাঁড়ানো পাহারাদারের সাথে গল্প করি
কত কিছু নতুন জানা হয় – কত কিছু প্রথম
গত রাতে তিনটে নাগাদ বৃষ্টিতে
কদমের মত গাছটার তলায় একটা কুকুর দাঁড়িয়ে ভিজেছিল
কাছে ডাকলেও আসে নি সে – বরং গায়ে বৃষ্টির জল দেখিয়ে
একটা বৃষ্টির গান শুনতে চেয়েছিল পাহারাদারের কাছে
এরপর ভ্যানিটি ব্যাগের গল্প হল
পাহারাদার জানালো রামধনু রঙ কাঁধে ঝুলিয়ে
যে মেয়েটি রোজ কুকুর নিয়ে ঘুরতে বের হয়
তারা দুজনেই বড় লাজুক
বললাম লাজুক কুকুর দেখতে ইচ্ছে করছে
হাসলো পাহারাদার, তার জন্য সন্ধ্যে থেকে দাঁড়াতে হবে
ল্যাম্প পোষ্টের পাশ দিয়ে রাস্তাটি যেখানে বেঁকে গেছে
সেখান দিয়ে বেরিয়ে আসবে কত গাড়ি
বন্ধ কাঁচের ওদিক থেকে আঁচড়াতে থাকবে আদুরে নখগুলি
হয়ত এদিকে চেয়ে জিব বের করে চেটে দেবে জমে ওঠা জলকণা
এই ভাবেই রোমাঞ্চ জমবে বাকি কয়েক ঘন্টা কদমগাছের তলায়
কত কিছু নতুন জানা হয় – কত কিছু প্রথম
কেবল পাহারদারই দেখে কিভাবে রামধনু রঙ হাত বদলায় গভীর রাতে
নবমীর বিকেলে হলুদ ফুল
অসময়ের হলুদ ফুল রাস্তা পারাপার করে
উঁকি দিয়ে দেখি ধার নিয়েছে সে পাখনা
আরো জোরে উড়ে যাবে বলে
হলুদ ফুল – ওপাশে আছে সারি সারি কাপড়ের দোকান
টেবিলে অনায়সে ছুঁড়ে ফেলা সিল্কের শাড়ি
দেখে নাও কোনটা সপ্তমী বা নবমীর বিকেল
চশমার ফাঁক থেকে চোখ বলে এর তো শেষ নেই
চা খেতে না ডেকে হলুদ ফুলেরা সামনে দিয়ে যায়
গন্ধের রেশ রেখে কাঁচের এধারে
সন্ধ্যের দিকে বড় কাছাকাছি আসবে কারো নাভিমূল
আবির মাখানো গহ্বর থেকে কেউ পছন্দের কথা বলবে
টেবিলের এদিকে ছড়িয়ে থাকা একরাশ সুতি, জর্জেট, সিল্কের
মাঝ থেকে মাথা বের করে বলব আমি
এর যেকোনটাই তোমাকে মানিয়ে যাবে হলুদ ফুল
পেখমের রঙের সাথে মিলিয়ে ফুটপাথ দিয়ে
তখনি হেঁটে ফিরবে কেউ চায়ের কেটলি হাতে
আমরা ক্ষণিক বিশ্রাম চাইবো – রঙে মুড়ে থাকো তুমি
কিংবা ছেড়ে নাও হলুদের আবরণ
আজ শুধুই লিকার চা, যার রঙ তোমার ছড়ানো চুলের মত
আদরের সেই পালক
টেবিলে জমা বইয়ে কত হতাহতের গল্প থাকে
মানুষ কত সহজেই মরে যায় – ইচ্ছায়, অনিচ্ছায়
শুধু আমরাই শব্দ খরচ করে চলি প্রকারভেদের ইচ্ছেয়
বিচ্ছেদ ডেকে আনা ভাষায় একদিন বলে ফেলি
পশুরা অকারণ মাথা ঘামায় না মৃত্যুর কারণ নিয়ে
চেনা কয়েকজন কেঁপে উঠে
সভ্যতার বিকাশ নিয়ে তিনটি বইয়ের উল্লেখ করে জানালো
মানুষ আর পশুর তফাত
মৃত্যুর পরিসংখ্যানের পাশে বিকেলের জলখাবার আসে
পেঁয়াজের পকোড়ায় কামড় দিয়ে ভাবি
পশুরা আগুনের ব্যবহার জানলে কি হত?
ভরপেট খেয়ে একদিন তারা রাতের দিকে আগুন জ্বেলে বসত কি গোল হয়ে?
ভাবত কি এবার থেকে তাদেরও একটা হিসেব থাকা দরকার
ইচ্ছার, অনিচ্ছার – ভোর রাতের চিৎকারের
পায়ের ফাঁকে ঢুকিয়ে পালকের বালিশের আড়ালে আদরের
সেই পালক কোথা থেকে এল? কারো চেনা কিনা
একটা টেবিল দরকার, আর তার উপরের রাখবার বইয়ের
মানুষ আর পশু মুখোমুখি বসে
নিজেদের তফাত করতে অপলক তাকিয়ে থাকবে একে অপরের দিকে
তোমার হাতে লেগে থাকা স্বর্ণাভ বালি
প্রায়শঃই স্বপ্ন দেখি হাঁটু জল ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছি গভীরে
আরো গাঢ় হলে দেখি মোমবাতি হাতে কেউ দাঁড়িয়ে আছে
মেহগিনি কাঠের কারুকাজ করা দরজায়
ফিনফিনে সাদা শাড়ি ভেদ করে ওপাশের দেওয়াল আহ্বান জানায়
ভোররাত – তোমার স্বপ্ন সত্যি হয়, শাড়ির নিবিড়তা
গভীরে কি আছে? ভাঙতে ইচ্ছে করে না হাঁটুজল
ঘূর্ণির ডাক ছাড়িয়ে নেমে যেতে হবে নাকি
মোমবাতি আলো নিয়ে, দেখতে হবে এ ঘন বর্ষার দেশে
মমির ঢাকনা খুলে মিনে করা কাজলের পাতা
বন্ধ মুঠি খুলে জেনে নেব শেষ গ্রীষ্মে কে শুনেছিল গান
কাঁঠালি চাঁপার গন্ধ মাখা
কাঠের বাক্স থেকে উঠে এসে
কারুকাজ করা দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়ালে
মরুঝড়ের গল্প করি
তোমার ডান হাতে লেগে থাকা স্বর্ণাভ বালি সরিয়ে
মোমবাতির ফিকে হয়ে আসা ছায়া খুঁজতে খুঁজতে দেখি
ফিনফিনে সাদা শাড়ির ওপাশে ভোররাত শেষ হয়ে
আরো গাঢ় করেছে গভীরতা
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।