শ্রীমল্লার বলছি কে?
শ্রীমল্লার বলছি কী? শীতকালে পাড়ার অন্যবাড়িগুলোয় যখন রং করা হ’তো, চান্দ্রেয়ীর বুকে তখন পাথর চেপে ব’সতো। চান্দ্রেয়ী জানতো, রং আসলে পোশাক। পোশাক না প’রে যেমন রাস্তায় বেরোনো যায় না, তেমনই বাড়ির গায়ে রং না চাপালে সেই বাড়িও দিনে দিনে কোণঠাসা হ’তে থাকে। একসময় দেখা যায়, মাথা উঁচু ক’রে সেই বাড়ি আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে হাঁটু মুড়ে মাটিতে ব’সে পড়েছে। দু’চোখে জল বাড়ির। তাদের বাড়িও তেমন পোশাক ছাড়া, মানে গায়ে রং ছাড়া থাকতে থাকতে কবে যে হার স্বীকার ক’রে নিয়েছে, চান্দ্রেয়ী নিজেও তা জানে না। মায়ের মুখে বাবার গল্প শুনেছে চান্দ্রেয়ী। শুনেছে, কেননা চান্দ্রেয়ীর বাবা আগুন নিয়ে খেলতে খুব ভালবাসতো। এমনই একদিন আগুন ... ...
চাঁদের পায়েস দিয়ে সূর্যরুটি খেতে চাইত নীলাক্ষী। মাথায় হেঁটে যেত বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা কুকুরের আবছা ডাক। বাড়িতে মনসা ঠাকুর ছিল। সন্ধেবেলায় মা যখন প্রদীপ জ্বালাতো, নীলাক্ষী পাশে ব’সে দেখত। চিরুনি। সামান্য একটা চিরুনির সঙ্গেই নীলাক্ষী ভাব জমিয়ে ফেলেছিল। নীলাক্ষী তখনও পায়ে আলতা প’রতে শেখেনি। মা প’রিয়ে দিতো দুপুরের শেষদিকে। দু’চারটে বেড়াল মাছের কাঁটা খাওয়া নিয়ে নিজেদের মধ্যেই মারপিট বাঁধিয়ে দিতো। মায়ের মন ছিল নীলাক্ষীর পায়ের দিকে, নীলাক্ষীর মন ছিল হিংসুটে বেড়ালগুলোর দিকে। একটা কাক উড়ে যেত ডাকতে ডাকতে। মা বলত, ‘এই অসময়ে আবার মরণ এলো!’ নীলাক্ষী মনে মনে ভাবত, কাকেরা বুঝি বোবা হ’লেই ভাল হতো? কাককে চুপ করাতে পারলেই ... ...
কলকাতার পেটে একটা বাচ্চা ঢুকে পড়েছে, কী বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা! কলকাতার স্তনের দিকে একমুহূর্ত তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না। কী ভয়ংকর! কলকাতার কোমর অব্দি চুল! আমারটা দাঁড়িয়ে গিয়েছে! জাঙ্গিয়ার দোকান দিয়েছিলাম। কোথায় দিয়েছিলাম? সে যাগ্গে... যখন রাত বাড়ে, তখন আমার খাট কাঁপতে থাকে। ভূমিকম্প! কাকে যেন ডাক্তার বলেছিল, ‘আপনার মাথায় কি বীর্য উঠে গেছে?’ কে যেন প্রশ্ন করে: ‘ও শালিখ! শালিখ তুই শুনতে পারছিস?’ জবাব আসে: ‘হ্যাঁ, পারছি! তবে আমি আর শালিখ নই, আমার নাম এখন থেকে পুঁদু!’ছেলেটা মেয়েটাকে বিরাট ভালবেসেছিল! এত্তটাই ভালবেসেছিল যে, ছেলেটা শেষমেশ গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করল! বুঝুন তাহলে... ওই যেন কে বলছে: ‘তুই খ এর ছেলে! তোকে ... ...
একটাই বাতাস। তার মধ্যেই কেউ বলছে, ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’, কেউ বলছে, ‘শুয়োরের বাচ্চা তোকে ক্যালাব’, কেউ বলছে, ‘আপনার শরীর কেমন আছে এখন?’ কেউ বলছে, ‘কালকে রাতেও হ্যাণ্ডেল মেরেছিস?’ কেউ বলছে, ‘তুই ছেড়ে গেলেও দুপুরে ভাত খাব, তুই থেকে গেলেও দুপুরে ভাত খাব– তোর যাওয়া আসায় আমার কোনও যায় আসে না।’ কেউ বলছে, ‘দে দে আরও দে... বাবা গো! দে দিতে থাক... বাবা গো! আঃ! আঃ! আঃ!’ কেউ বলছে, ‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেলাম। ভীষণ দরকার ছিল। মায়ের শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।’একটাই মন। তারও আবার নানারকম আবদার। কারও কাছে পাঁচটা টাকা পর্যন্ত নেই। পাঁচটা টাকা... খিদের কষ্ট! কারও বাড়িতে একইদিনে তিনরকমের মাছ ... ...
কোমরের কাছটায় মাছবাজার আর ঘাড়ের কাছটায় গুজব ঘুরে বেড়ায় ফুলটুসির। ফুলটুসির বুকের দিকে তাকালে আমাদের মতো ছেলেরাও লজ্জায় ঘামতে থাকে। ফুলটুসি হেসে উঠলেই শহরে উৎসব লেগে যায়। এত চকচকে ওর দাঁতগুলো! এই শহরে এমন কোনও মিষ্টির দোকান নেই, যেখানে ফুলটুসির ঠোঁটের মতোই নরম আর আঠালো মিষ্টি পাওয়া যায়। নেই এমন কোনও মিষ্টির দোকান। ফুলটুসি আমাদের শরীর দেয়নি, আমরাও কেউ ওর কাছে শরীর চাইনি– কিন্তু দু’চোখ দিয়ে আমরা ফুলটুসির গোপন বিছানায় অর্ধেক ঘুমিয়ে এসেছি।ফুলটুসিকে নিয়ে আমরা যারা জেন জ়ি, তারা একটা মজার কোবতে লিখেছি। আপনাদেরকে শোনাই—পাঁউরুটি ভেবে তাকে খেয়ে নেব একদিনঘুমোব না সাতরাত, মুছে যাব একদিনআমাদের নেই দোষ, বেকার যুবক তিন—মুছে ... ...
গাছকে হাওয়া এসে যখন আদর ক’রে যেতো, তখন রাস্তার কুকুরগুলোর জমিয়ে হিংসে হ’তো। ওদের আর ধুলোর মধ্যে শুয়ে থাকা পছন্দ হচ্ছিল না। ততদিনে অনেকেরই ‘বিনা অপারেশানে: অর্শ, একশিরা, রক্তপাত’— বিনা কষ্টে কম খরচে সারানো হ’য়ে এসেছিল। প্রভু যিশু ক্ষমা ক’রে দিয়েছিলেন এক অন্ধকে। যার চোখ কেবল পাপ খুঁজে বেড়াত অন্ধকারে। শোনা যাচ্ছিল, ওই ছেলেগুলো সমাজ-বিরোধী, হস্তমৈথুন যাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। দুপুর আড়াইটের আগে কলেজের সামনে এক টোটো চালক চেঁচাতে থাকছিল এই ব’লে: ‘যাবেন দিদি? টেশান... টেশান... টেশান...’ একসময়ে টোটো চালকের কণ্ঠ নিভে আসে, টাকা এসে হুমড়ি খেয়ে প’ড়েছিল চোখে মুখে!শাহরুখ খানের সঙ্গে কোনওদিন শ্রীদিশা’র দেখা হয়নি। হয়নি কারণ শ্রীদিশা শাহরুখ ... ...
ডুব আরাম এবং দুঃখকে রোজ আদর দিতামনইলে কি আর এই মুহূর্তে ভাঙত পাথর?শিল্প ছেড়ে মায়ের ঠোঁটের অবসাদেশুকিয়ে যেতো গোলাপমলিন দ্বন্দ্বচাদর...চোখের কাছেই নদীর সিঁড়ির ব’সে আঁকায়,মেঘ তেরোমাস ভাবত কেবল নতুনকথা!ঘাসের গালে পৌঁছনো সব বেলুনগুলো–উপায় খুঁজে পেরিয়ে এলো দুর্ঘটনা...কার জীবনে কোন কারণে বন্ধুবারণ—তৃপ্তি এসেও পিছিয়ে গেছে পাতার কানে...আজকে যেমন ইচ্ছে হলো ফিরব আবার,শিল্প ছেড়ে মায়ের ঠোঁটের অবসাদে। ঊর্মিমালা সন্ধে ওড়ে বালিশ ছিঁড়েলেখক বড় মিথ্যেবাদীসময় হারায় নিজের ভিড়েসত্যি যেমন একাই স্বাধীনঝুঁকছে আকাশ মাটির দিকেআসছে খবর নিয়ম মতোমুখের ওপর তাকিয়ে থেকেঅসুখ আমায় বুঝতে হ’তোলেখক বড় মিথ্যেবাদীকথায় কথায় যুক্তি শেখায়শহর তেমন নিজেও স্বাধীনআমার গানের ঊর্মিমালায় ... ...
তিনজন মানুষ। তিনজন মানুষের কথা বলব। প্রথমজন আছেন, দ্বিতীয়জন নেই, তৃতীয়জন আছেন। লেখার সময়ে বিশ্বাস রাখছি, যাঁর মুখ যতবেশি দেখতে পাবো, তাঁর সম্পর্কে ততবেশি বলতে পারব। যদিও এতদিনে বুঝেছি— পৃথিবীতে এমন কোনও বিশ্বাস নেই, যার ওপরে বিশ্বাস করা যায়। বিশ্বাস করতে পারি। এতসব জানার পরেও বিশ্বাসের অভিনয় ক’রে যাওয়া। প্রথমজন: লজেন্স, ছোলা, বাদাম— এইসব বিক্রি করেন উনি। কৃষ্ণনগরের রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে হেঁটে। প্রতিদিন বিকেলে চারটে নাগাদ বেরোন, বাড়ি ফেরেন রাত আড়াইটেয় প্রায়। বয়েস আন্দাজ ৬৭ থেকে ৬৮ র মধ্যে। ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ কবে হয়েছিল, মনে নেই। আমিও ওঁর থেকে কিনে খেয়েছি, ছোলাবাদামলজেন্স। একদিন চায়ের দোকানে ব’সে ছিলাম বিকেলের পর, ... ...
সমস্যা আর বিপদের নিজেরও একটা সমস্যা আছে। সেটা হচ্ছে, এরা দু’জনে সব মানুষকে ধরা দেয় না। কাছাকাছি আসে। কিন্তু দূরত্ব রেখে দেয়। আমার ক্ষেত্রেও তাই। সমস্যা আর বিপদকে আমি যেমন নিজের জীবনে খুব কাছ থেকে দেখেছি, তেমনই ওরাও দু’জনে আমাকে দেখেছে, দেখে এসেছে খুব কাছ থেকে। এখন আমার মনে হয় যে, সমস্যা আর বিপদ আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে অজান্তেই। আমি তো জীবন খুলেই রেখেছিলাম ঘরের জানলার মতো। জীবনে প্রেম এলো বিচ্ছেদ এলো কাজের সুযোগ এলো নতুন লেখার ভাবনা এলো— যেটুকু নেওয়ার সেটুকুই নিয়েছি। বাকীটায় আর দ্বিতীয় কোনও স্পর্শ করিনি। এই তো সামনের মাসেই আমার জন্মদিন। একুশ বছর পূর্ণ ক’রে বাইশে পড়ব। এই মুহূর্তে একটাই সবচাইতে বড় ... ...
ক) কিছু লোক এসেছিল, রাস্তা তৈরি ক’রে পারিশ্রমিক নিয়ে আবার কোনও নতুন কাজের খোঁজে অন্যশহরে, অন্যজীবনে পৌঁছে যাবে ব’লে। খ) কয়েকজন মিলে নতুন একটা পত্রিকা করবে ভেবেছিল। ভেবেছিল। কিন্তু আর করা হয়নি। উদ্যোগ, উদ্যম, বয়েস, আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা, স্বপ্ন— জীবনের সময়ে মিলিয়ে গিয়েছে। তবুও জীবন থেমে থাকেনি, এমনকী সময়ও। গ) দাঁতের ফাঁকে ইলিশ মাছের কাঁটা আটকে ছিল অনেকদিন। ইলিশ আবারও উঠল মাছ বাজারে। কিন্তু দাঁতের ফাঁক থেকে হজম হ’য়ে যাওয়া ইলিশের কাঁটা আর বেরিয়ে এলো না।ঘ) এগারো বছরের একটা ছেলে উনিশ বছরের একটা মেয়েকে পুকুরে চান করতে দেখেছিল। এগারো বছরের সেই ছেলে আজ বাইশের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রয়েছে। উনিশ বছরের সেই মেয়ের বুক ... ...