এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  বইপত্তর

  • কাঠগড়ায় বিজ্ঞানীরা

    রূপালী গঙ্গোপাধ্যায়
    বইপত্তর | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৮৭ বার পঠিত
  • quoteStart
    বিজ্ঞানীর নীতিবোধ ও দায়বদ্ধতা

    বিজ্ঞানীর নীতিবোধ: কারে কয়?


    সেই দিনটার কথা মনে পড়ে? ক্রিকেটপ্রেমীদের নয়নের মণি হ্যান্সি ক্রোনিয়ে যেদিন বেটিং-এ জড়িয়ে পড়ার জন্য অভিযুক্ত হয়েছিলেন, গোটা ক্রিকেট জগৎ সেদিন ব্যথাহত বিস্ময়ে যেন বলে উঠেছিল – ‘হ্যান্সি, তুমিও!’ ঘটনাটা বেদনার মতো বেজেছিল, কিন্তু অসম্ভব মনে হয়নি। অভিনেতা থেকে জননেতা, খেলোয়াড় থেকে গায়ক – ঐশ্বর্য ও প্রতিপত্তির জগতে যাঁদের আনাগোনা, তাঁরা কেউ কাঠগড়ায় উঠলে সাধারণ মানুষ যেন ততটা অবাক হন না। অথচ, নামকরা কোনো বিজ্ঞানী কোনো রকম অসদাচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন শুনলে লোকের প্রথমেই মনে হয় ‘অসম্ভব!’; কারণ, সাধারণের চোখে বিজ্ঞানী মানেই কাজপাগল, আত্মভোলা এক মানুষ, যাঁর কাজ – জ্ঞানের চর্চা ও সত্যের সন্ধান। অর্থাৎ বিজ্ঞানচর্চার রীতির মধ্যেই যেন এক রক্ষাকবচ লুকোনো আছে, যার সুবাদে একজন বিজ্ঞানী অসদাচরণ করা বা তার জন্য অভিযুক্ত হওয়া থেকে মুক্ত থাকেন। তার মানে কি বিজ্ঞানীদের অপকর্ম বিষয়ে সাধারণ মানুষ একেবারেই অন্ধ? ঠিক তা নয়, বরং একজন বিজ্ঞানী কী কী ধরনের অন্যায় করতে পারেন, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের মনে একটা ধারণা আছে; বিজ্ঞানীর সেইসব অপকর্ম হতে পারে ব্যক্তিগত কোনো কেলেঙ্কারি, আর্থিক নয়ছয়, বড় জোর দেশদ্রোহ—মানে গোপন তথ্য পাচার। কিন্তু গবেষণার সময়ে তিনি জ্ঞানত কোনো অসততা করেননি, অর্থাৎ যে ফলাফল পেয়েছেন, তাই তিনি প্রকাশ করেছেন – এটা ধরে নিয়েই বিজ্ঞানের জগৎ এগিয়ে চলে আর সাধারণ মানুষও সেটাই বিশ্বাস করেন।

    এর কারণ হল, বিজ্ঞানের গবেষণা কথাটা শুনলেই গল্পে পড়া আর চলচ্চিত্রে দেখা এক ধরনের ছবি মনে ভেসে আসে: বিচিত্র যন্ত্রপাতি-ঠাসা একটা ঘর, দেওয়াল-ব্ল্যাকবোর্ড জুড়ে দুর্জ্ঞেয় কিছু আঁকিবুকি, টেবিলের ও-পারে কিংবা কম্পিউটারের সামনে নিমগ্ন, কিছুটা পাগলাটে এক মানুষ। ছবিগুলোতে কিছুটা কল্পনা থাকলেও কখনো বাস্তবের সঙ্গেও কিছুটা মেলেও বৈকি! কিন্তু, কোনো গবেষণার ফলাফল সাধারণ মানুষের কাছে একটি বাস্তব ছবি হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে – এমনটা খুব কম দেখা যায়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন একটি ছবি যদি হয় ডি.এন.এ-র প্যাঁচানো সিঁড়ির মতো গঠন, আরেকটি হল হিরোশিমায় নিউক্লীয় বিস্ফোরণের পরের মুহূর্তের ছবি: ‘ছাতার মতন আকাশে ভস্ম ধুলো, পথ নেই পালাবার’ [‘মা নিষাদ’ – জয় গোস্বামী], ইংরেজিতে যাকে বলে ‘Mushroom Cloud’। গবেষণার সার্থকতার এমন বাস্তব ও হৃদয়বিদারক ছবি খুব কমই হয়। এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান (Richard Feynman) তাঁর আত্মকথা ‘The Pleasure of Finding Things Out’-এ এই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। সে দিন সন্ধেয় ওঁরা সাফল্যের আনন্দে পানভোজনে মেতে উঠেছিলেন। ওঁদের সাফল্যের মাশুল দিতে যে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ গেছে – এই সত্যিটা ওঁদের সেদিন সেভাবে স্পর্শ করেনি।

    ফাইনম্যান জানিয়েছেন,
    “৬ই অগস্ট ১৯৪৫, যেদিন হিরোশিমায় বোমা ফেলা হয়েছিল, আমার শুধু এইটুকুই মনে পড়ে—হয়তো নিজের প্রতিক্রিয়ায় অন্ধ হয়ে গেছিলাম—একটা দারুণ উত্তেজনা আর অভিভূত হয়ে যাওয়ার কথা; আমাদের সাফল্যের উদযাপনে পার্টি চলছিল, লোকজন মাতাল হয়ে উঠেছিল। লস অ্যালামসে যা হচ্ছিল আর হিরোশিমায় যা চলছিল তার মধ্যে কী বিপুল বৈপরীত্য! আমিও আনন্দেই ছিলাম, মদ খাচ্ছিলাম, মাতাল হয়ে জিপের হুডের ওপর, বনেটের ওপর বসে ড্রাম বাজাচ্ছিলাম। গোটা লস অ্যালামস আনন্দে ভেসে যাচ্ছে, ওদিকে হিরোশিমায় মানুষ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।”

    এর বেশ কিছু দিন পরে একদিন মায়ের সঙ্গে রেস্তোঁরায় খেতে খেতে ওঁর হঠাৎ বোধোদয় হয়েছিল; যা মনে হয়েছিল, তা অনেকটা এইরকম – যে রকম শক্তিশালী বোমা হিরোশিমায় পড়েছিল, তা যেকোনো দিন এইখানেও (আমেরিকায়) পড়তে পারে। এই ৫৯ নম্বর রাস্তায় একটা, ৩৪ নম্বরে আর একটা আর তক্ষুনি চারপাশের এই সব কিছু ‘ছিল নেই, মাত্র এই’ হয়ে যাবে। সব মানুষ মরে যাবে। তাহলে এই সব বানানো কীসের জন্য! তিনি এও বলেছেন, যে, বোমা তৈরি যখন সম্ভব হয়েছে, তখন মানুষ শুধু একটা বোমা বানিয়েই থেমে যাবে না; শুধু যে বানানো হবে, ব্যবহার হবে না – এমনও নয়। অর্থাৎ এই ধ্বংসলীলা চলবেই। এইসব চিন্তায় তিনি কিছুটা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন।

    যেকোনো গবেষণা-কর্মের নৈতিকতা (গ্রহণযোগ্যতা) বিষয়ে একটা সময় অবধি চারটি শর্ত স্বীকৃত ছিল – কাজটি মানবজাতির পক্ষে মঙ্গলজনক হওয়া চাই, কাজটি সেই বিজ্ঞানীর দেশের পক্ষেও হিতকর হওয়া চাই, কাজটির মাধ্যমে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না এবং কাজটি মানুষ ও পশু-পাখির মৌলিক অধিকারের বিরোধী হবে না। বলা বাহুল্য, এই সময়ে দাঁড়িয়ে গবেষণায় নীতিবোধের এই প্রাথমিক শর্তগুলো প্রত্যেকটাই কিছুটা সংশয় এবং পরস্পর-বিরোধিতার মধ্যে ঝাপসা হয়ে পড়ে। যেমন, যে কাজ মানবজাতির পক্ষে মঙ্গলকর, তাকে কি আলাদা করে একটি দেশের জন্য হিতকর হয়ে উঠতে হয়? উলটো দিক থেকে ভাবলে, যা একটি দেশের পক্ষে হিতকর, তা কি মানবজাতির জন্যে হিতকর না-ও হতে পারে? অভিজ্ঞতা বলে, সত্যিই তা না-ও পারে। যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ তো গোটা মানবজাতির পক্ষেই ভয়ঙ্কর, শুধু যে দেশ সেটা ব্যবহার করেছে, তারা ভেবেছে তাদের পক্ষে মঙ্গলজনক। সেখানে মানুষেরই বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার বজায় থাকেনি – গাছপালা, পশু-পাখি তো কোন ছার! আবার বোমা হিসেবে ব্যবহার না করে তা যদি বিকল্প শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে আবার তা সকলের পক্ষেই হিতকর। বিভিন্ন ওষুধ, এমনকি প্রসাধনীও মানুষের ত্বকের পক্ষে উপযুক্ত কিনা – তার পরীক্ষা করতে এই সেদিন অবধি নির্বিচারে তা প্রয়োগ করা হত খরগোশের চোখে। তাছাড়া গবেষণায় ‘গিনিপিগ’ তো একটা রূপকেই পরিণত হয়েছে—যাদের ওপরে নির্বিচারে যা কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়। অথচ ওষুধপত্র তো মানুষের জন্য (এমনকি পশু-পাখিদের জন্যেও) অবশ্য প্রয়োজনীয়—যার পরীক্ষা না করে তাকে ব্যবহার করা যায় না। শুধু পরমাণু বোমাই নয়, বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কার ও তাদের মাত্রাছাড়া ব্যবহারই পরিবেশের যাবতীয় ধ্বংসের মূলে আছে – সে কথাও আজ আর বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি প্রযুক্তির হাত ধরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য জলবায়ু বদলে দেওয়ার চেষ্টাও এখন আর কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়। মেঘে কৃত্রিমভাবে ঘনীভবন (Cloud Seeding) ঘটিয়ে পরিকল্পনামাফিক অতি বৃষ্টিপাত ঘটানো, ধস নামানো, শত্রুর (?) লুকিয়ে থাকার জায়গা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে গোটা জঙ্গল উড়িয়ে দেওয়া অথবা আকাশ থেকে রাসায়নিক বৃষ্টি ঘটানোর মতো ঘটনা – সম্মিলিতভাবে যাকে Ecocide বলা হয়, সে-ও তো কোনো না কোনো দেশের স্বার্থে কোনো বিজ্ঞানীরই কাজ! ভিয়েতনামের ওপর এই পদ্ধতির প্রয়োগের কুখ্যাত উদাহরণ ‘অপারেশন পপ্-আই’ (Operation Popeye) । আর এই সূত্রে হিটলারের কুখ্যাত আউশভিৎজ় (Auschwitz) শিবিরের কথাও মনে পড়বেই; সবচেয়ে কম সময়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারার যে রাসায়নিক পদ্ধতির উদ্ভাবন, সে-ও তো বিজ্ঞানীদেরই গবেষণার ফল। তাহলে কোনো গবেষণা নৈতিক না অনৈতিক – তা কী করে ঠিক হবে? অর্থাৎ বিজ্ঞানচর্চার নৈতিকতা বিষয়ে এই চারটি শর্তের সারবত্তাই এখন প্রশ্নের মুখে।

    কিন্তু এইটাও সব নয়। গবেষণাগারের চার দেওয়ালের মধ্যে বিজ্ঞানীর নিজের যে জগৎ, সেখানেও কি তিনি সর্বদা সৎ থাকেন? এইখানে সৎ থাকাও কিন্তু তাঁর নীতিবোধের একটা পরিচয়। সঠিকভাবে বললে, সেটাই তাঁর নীতিবোধের প্রথম পরীক্ষা – যা প্রাথমিকভাবে শুধু তাঁর ওপরেই নির্ভর করে। একজন বিজ্ঞানী তাঁর পরীক্ষার এবং গণনার ফলাফল কতটা সঠিকভাবে প্রকাশ করছেন, সেখানে তাঁর সৎ থাকার দায় কতখানি – সত্যি বলতে এই বইয়ের আলোচনার মুখ্য বিষয় সেটাই। বিষয়টা যে বিভিন্নদিক থেকেই খুব গুরুত্বপূর্ণ – আলোচনা যত এগোবে, ততই সেটা পরিষ্কার হবে।

    বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই বিষয় নিয়ে আগেও অনেকভাবে আলাপ আলোচনা হয়েছে। তবু বিষয়টাতে ঢোকার আগে গবেষণার ব্যাপারটা কিছুটা বুঝিয়ে বলার দরকার আছে। বিজ্ঞানীর কর্মপন্থাটাই এমন, যে মানুষের কাছে তাঁর মূল্যায়নটা গায়ক, খেলোয়াড় বা অভিনেতার মতো সরাসরি হয় না, হয় পরোক্ষভাবে। একজন বিজ্ঞানী যখন কোনো একটি বিষয় নিয়ে কাজ করেন, তাঁর একটা লক্ষ্য থাকে। তাঁকে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা-গণনার মধ্যে দিয়ে বারবার চেষ্টা করে সেই লক্ষ্যে বা কোনো একটা অর্থপূর্ণ ফলাফলে পৌঁছোতে হয়। নিজের কাজের ফলাফল যাচাই করে, গোড়ায় নিজেকেই তার গুণমান বিষয়ে নিশ্চিত হতে হয়। অতঃপর বিজ্ঞানী তাঁর ফলাফলের বিস্তারিত বিবরণ গবেষণাপত্র বা ‘পেপার’-এর আকারে লিখে কোনো জার্নালে ছাপার জন্য পাঠিয়ে দেন। গবেষণার বৃত্তান্ত প্রকাশের জন্য এইরকম অসংখ্য জার্নাল আছে; বলা বাহুল্য, তাদের সকলের গুণমান সমান নয়। তবে প্রকাশের আগে সব জার্নালের সম্পাদকই সেই বিষয়ের এক বা একাধিক বিশেষজ্ঞকে দিয়ে সেই গবেষণা-নিবন্ধটি পড়িয়ে তার কাজের গুণমান যাচাই করে নেন। কাজের ভালোমন্দ বিচার করে, ‘ছাপার যোগ্য’ বলে সবুজ সঙ্কেত মিললে, তবেই সেই কাজ সেই জার্নালে প্রকাশিত হয়, অন্যান্য গবেষকরা এবং সাধারণ মানুষও ইচ্ছে করলে সেই কাজের কথা জানতে পারেন। বিশেষজ্ঞ-পরীক্ষকদের কিছু সংশয় থাকলে বা কিছু সংশোধনের প্রস্তাব থাকলে, সে সব পূরণ হবার পরই নিবন্ধটি প্রকাশিত হতে পারে। এখনও অবধি কম-বেশি সব জার্নালেই এই রীতি চালু আছে। আপাতদৃষ্টিতে এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, কারণ এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার কোনো স্তরেই পরীক্ষকদের কারুর সঙ্গে বিজ্ঞানীর সরাসরি যোগাযোগ হয় না, সবটাই ঘটে সম্পাদকের মাধ্যমে। তাই গবেষকের পক্ষে পরীক্ষককে প্রভাবিত করার ও কোনো জালিয়াতি করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ কম।

    কিন্তু এই প্রক্রিয়ার ভেতরেও একটা বড় ফাঁক থেকে যায়। কোনো পরীক্ষকের পক্ষেই গবেষণাপত্রের কাজ হাতেকলমে পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব হয় না। তাই, যে ফলাফল জার্নালে পাঠানো হচ্ছে – তা কতটা সঠিক, তা তখনই কেউ পুরোপুরি বুঝে ফেলতে পারেন না, আন্দাজ করতে পারেন মাত্র। কাজেই, যে মান—ধরা যাক—১০ বলে জানানো হচ্ছে, তা আসলে কত – তা শুধু সেই বিজ্ঞানী ছাড়া কেউ জানে না। এইখানে এসে বিশুদ্ধ বিজ্ঞান কিছুটা ব্যক্তি-নির্ভর হয়ে পড়ে আর বিজ্ঞানীর সততা (অসততাও!) এবং পরীক্ষকের দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
    প্রশ্ন হল, গবেষণার বিষয়ে বিজ্ঞানী খামোখা মিথ্যে কথা বলবেন কেন? উত্তরটা সহজ। কাব্যে যেমন মনে করি, কবিরা তেমন হন না; বিজ্ঞানীরাও গল্পে-পড়া চরিত্রের মতো হন না। যে কোনো ‘পারফর্মার’-এর মতো তাঁদেরও নানা রকম চাপ, প্রলোভন ও প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে এগোতে হয়, নিজেকে প্রমাণ করে যেতে হয় নিরন্তর, যার ফলাফল হল নানা রকম বিচ্যুতি ও শেষ পর্যন্ত পদস্খলন। বিজ্ঞানীদের নানাবিধ অসততার ধারাবাহিক উদাহরণগুলো কিন্তু বৈচিত্র্যে মাঝে মাঝে রহস্যগল্পকেও ছাপিয়ে যায়। এরই নানা দিক আলোচিত হবে এই বইয়ে। তবে এ যে শুধু আধুনিক যুগের মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফল নয়, আদ্যিকাল থেকে চলে আসা ব্যাপার – উদাহরণগুলো দেখলেই তা পরিষ্কার হবে।

    এ ছাড়া নীতিবোধের কিছু খুচরো হিসেব আছে, তা মূলত গবেষণার কৃতিত্বের ভাগাভাগি নিয়ে, পেপারে নাম দেওয়া-না-দেওয়া নিয়ে। গবেষণার জগতের পরিপ্রেক্ষিতে এগুলোকে কিন্তু তুচ্ছ বলা যায় না, কারণ এসব দিয়েই একজন তরুণ গবেষকের জীবনের অনেক কিছু ঠিক হয়। এর বাইরে, বিজ্ঞানী যখন সামাজিক মানুষ, সেখানে তিনি বিজ্ঞানকে কীভাবে ব্যবহার করছেন, নিজের আচরণে বিজ্ঞানকে কতটা অনুসরণ করছেন, নিজের ধারণা ও বিশ্বাসকে বিজ্ঞানের আলোয় কতটা পরিশোধন করে নিতে পারছেন, নিজের ও অন্যের কাজের ব্যাপারে (পরীক্ষক হিসেবে) কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারছেন – সেগুলো তাঁর নীতিবোধের এক-একটা দিক। তাছাড়া বিজ্ঞানী যখন নীতি-নির্ধারক হয়ে ওঠেন, তখন বিভিন্ন সামাজিক বিষয়, যেমন – বর্ণবৈষম্য, লিঙ্গসাম্য, ইত্যাদির ব্যাপারে দিকে কতটা সচেতন থাকতে পারছেন – সেটাও বিচার্য; তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে কোথাও কোথাও বিজ্ঞানী যদি বৈষম্যমূলক বিষয়কে প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন, সেটাও তাঁর নীতিবোধের অভাব। যেহেতু সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞানী একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন, তাই তাঁর নিজের ব্যক্তিত্বের মধ্যেও বিজ্ঞানের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকা দরকার। না হলে সেটাও নীতিবোধের অভাব হিসেবে ধরা হতেই পারে। প্রথিতযশা বিজ্ঞানীদের এইরকম কিছু বিচ্যুতির উদাহরণও এই প্রসঙ্গে আলোচনা করা হবে।





    বিজ্ঞানীর দায়বদ্ধতা


    বিশুদ্ধ বিজ্ঞানচর্চার রীতিনীতি ও আদর্শ নিয়ে বহু চিন্তাভাবনা হয়েছে। এই নিয়ে বিজ্ঞানীরা যত ভেবেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি ভেবেছেন দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানীরা। এঁদের মতে বিজ্ঞানের জগত পরিবর্তনশীল – নিজেকেই ক্রমাগত বদলাতে বদলাতে চলে। এখানে স্থির সত্য বলে কিছু হয় না। বিষয়টাকে তাঁরা একটা ভারি সুন্দর রূপকের সাহায্যে ব্যাখ্যা করেন, যার নাম প্লেটোর কুঠার (Plato’s Axe); এর ফলাটা ক্ষয়ে গেলে বদলে নেওয়া হয়, আবার কাঠের হাতলটা ভেঙে গেলে সেটাও বদলে নেওয়া হয়। এইভাবে গোটা কুড়ুলটাই বদলে গেলেও তার কাঠ কাটার কাজ অব্যহত থাকে। অনেকেরই কয়েক বছর আগের (২০১২) একটি ছায়াছবি ‘Ship of Theseus’ (পরিচালক আনন্দ গান্ধী)-এর কথাও মনে পড়ে যাবে। একটি মানুষের শরীরে অন্য কারুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংস্থাপন করলে তার সত্তা বদলে যায় কিনা – সেই খোঁজ সেখানে ছিল। এই উপমা থেকে বিজ্ঞানের জগতের পরিবর্তনশীল রূপটি বোঝা যায়। আবিষ্কার যাই হোক, কাল বা পরশু কেউ তাকে খণ্ডন করবে। কেউ তত্ত্বে ভুল বা সীমাবদ্ধতা বার করবে বা নতুন সংযোজন করবে, কেউ পরীক্ষায় নতুন ফলাফল পাবে – তাকে ব্যাখ্যা করতে আবার নতুন তত্ত্ব আসবে। কিন্তু বিজ্ঞান থেমে থাকবে না, এগিয়েই যাবে। অর্থাৎ বিজ্ঞানের জগতে পরিবর্তনশীলতা এক সাধারণ সত্য। সব তত্ত্ব যেহেতু দু-দশ বছরের মধ্যে বদলে যেতেও পারে, তাই বিজ্ঞানের জগতে জালিয়াতির (শব্দটা কঠোর হলেও আমরা নাচার)—মানে যা ঘটেনি তাকে প্রতিষ্ঠার—কোনো মানেই হয় না। একটু কাব্যিকভাবে বললে, এক একটি তত্ত্বের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে বিজ্ঞান এগোয়, তার একটি নিজস্ব আত্ম-সংশোধন (Self-correction) পদ্ধতি আছে, যার হাতে সমস্ত ভুল-ভ্রান্তি-কারচুপি আপনিই ধরা পড়ে যায়। বিজ্ঞানীরাও সেকথা জানেন; নাহলে আর জালিয়াতি কেন?

    ১৯১৮ সালে জার্মান সমাজবিজ্ঞানী মাক্স ওয়েবার (Max weber) মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বিজ্ঞানের আদর্শ’ বিষয়ে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীকালে অত্যন্ত বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। এই বক্তৃতার শিরোনাম ছিল ‘বিজ্ঞান যখন বৃত্তি’। সেখানে বলা হয়েছিল – বিজ্ঞানচর্চা কোনো একটি ‘পেশা’ নয়, এক জীবনজোড়া বৃত্তি—যাকে সাধনা বললেই ঠিক বলা হয়। এই বক্তব্য বুঝতে গেলে পেশা আর বৃত্তির মধ্যে পার্থক্যটা খুব ভালো করে বোঝা দরকার। পেশা জীবনধারণের উপায়, কিন্তু বৃত্তি হল জীবনকে একভাবে উৎসর্গ করা, যার সঙ্গে অনেকরকম অঙ্গীকার মিশে থাকে। যেমন, পৌরোহিত্য (যে কোনো ধর্মের) একটা বৃত্তি – যা একজন মানুষের পেশা না-ও হতে পারে, কিন্তু যিনি নিয়মিত পৌরোহিত্য করেন, তিনি সেই ধর্মের বিশ্বাসগুলোকে, প্রতিটি আচার, প্রতিটি মন্ত্রের বক্তব্যকে অন্তরে লালন করেন। প্রয়োজনে কোনো আচার সংশোধনও করতে পারেন, কিন্তু ধর্মাচরণের মৌলিক বিষয়গুলোকে অস্বীকার করতে পারেন না। একইভাবে এক সৃষ্টিশীল মনের দাবিতে শিল্প বা সাহিত্যচর্চা একজন মানুষের বৃত্তি হয়ে উঠতে পারে। সহজাত নেতৃত্বের এবং ক্ষমতার আকর্ষণে মানুষ রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠে। তাই মানুষ পেশা বদলাতে পারে, কিন্তু বৃত্তি – বদলাবার বিষয়ই নয়। সেই বিচারে বিজ্ঞান তো বৃত্তি বটেই, কারণ বিজ্ঞানচর্চার প্রাথমিক শর্ত যে যুক্তিবাদী মনন – জীবনে তাকে লালন করতেই হয়। কে কোন মাত্রা-অবধি সেটা বজায় রাখতে পারছেন, তা আলোচনার বিষয়। কিন্তু ওয়েবারের মতে, বৃত্তি হিসেবেও বিজ্ঞান অন্যান্য বৃত্তির থেকে আলাদা। কারণ, অন্যান্য ক্ষেত্রে মানুষ একটি স্থির বিন্দুর দিকে এগোয়। একটি সাহিত্য সৃষ্টি হলে বা একটি ছবি আঁকা হলে – সেটাই সেই বৃত্তির শেষ কথা। তা কালজয়ীও হতে পারে, হারিয়েও যেতে পারে – যার সবটাই সময়ের হাতে ছাড়া থাকে, লেখক বা শিল্পীর তাতে স্পষ্ট কোনো দায়িত্ব নেই, মাথাব্যথাও নেই। যাজক বা পুরোহিত তো ধর্মের বিধানকেই ধ্রুব সত্য বলে মানেন, তাই তাঁদের ক্ষেত্রে উত্তরটা জানা; তাঁদের কাজ হল মানুষকে জানানো আর বোঝানো, তাঁরা সেটাই কর্তব্য মনে করেন। এঁদের কারুরই কোনো সংশয় নেই – যা করতে চাইছেন, তা করে ফেলাতেই তাঁদের সার্থকতা। সেখানে ছাপিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা গৌণ। অজস্র নতুন ছবি আঁকা হওয়ার পরও মোনালিসা বা গের্নিকার আবেদন একটুও কমে না; লোকে এখনো ইলিয়াড, মহাভারত, মার্চেন্ট অফ ভেনিস এবং রক্তকরবী আগ্রহ নিয়ে পড়ে। কিন্তু বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মানুষ এটা জেনেই কাজ করে, যে – আজ সে কোনো প্রশ্নের যে উত্তর খুঁজে পাবে, তা কাল আরো অনেক প্রশ্নের জন্ম দেবে, আর আজ সে যা আবিষ্কার করবে তা—যত বড়ই হোক—শেষ কথা নয়; কিছু বছরের মধ্যে কেউ না কেউ তাকে ছাপিয়ে যাবে। সেটা না হলে বিজ্ঞানী কাজ করার প্রেরণাই পাবেন না। কয়েকশো বছর ধরে চলে আসা পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বের ধারণা কোপার্নিকাস, গ্যালেলিও-র হাতে পড়ে বাতিল হয়ে গেল। চার্চ যতই চেষ্টা করুক, ঠেকাতে তো পারল না! আবার নিউটনের বলবিদ্যার পাশাপাশি মাথা তুলে দাঁড়াল কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, যার মৌলিক ধারণাগুলি আপাতদৃষ্টিতে ‘উদ্ভট’। এই পরিবর্তনশীলতাকে মেনে নেওয়াই অন্যান্য বৃত্তির সঙ্গে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় তফাৎ। তাছাড়া, বিজ্ঞানের যে সদাসতর্কতা—আসলে কার্যকারণ সম্পর্কের ওপর বিশ্বাস নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলা—যেখানে অলৌকিকের কোনো স্থান নেই, এমনকি ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধিরও তেমন সুযোগ নেই – সেটাও এই বৃত্তির একটা দাবি। অর্থাৎ, কোনো কথাই এখানে শেষ-কথা নয়, কেউ বললেও নয়। তার মানে, বিজ্ঞান মানে একটা সামগ্রিক অঙ্গীকার, যাকে ওয়েবার ‘বৌদ্ধিক আত্মদান’ (Intellectual Sacrifice) বলে উল্লেখ করেছেন।

    তার মানে, ওয়েবারের কাছে বিজ্ঞানচর্চা আসলে অন্তরাত্মার এক আহ্বান (যা একধরনের উৎসর্গে গিয়ে পরিণতি পায়) এবং যা অন্যান্য আহ্বানের থেকেও চরিত্রে অনেকটা আলাদা। এই আলাদা হবার শর্তই বিজ্ঞানের আদর্শ (norm) – যার সংজ্ঞা, চরিত্র, ইত্যাদি নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। এত ভারী ভারী শব্দের মধ্যেকার আসল কথাটি অবশ্য খুবই সরল – যুক্তি, প্রমাণ ও স্বচ্ছতাকে সঙ্গে নিয়ে সত্যের সন্ধান করা। সমাজবিজ্ঞানীরা পরবর্তীকালে বিজ্ঞানের মূল কর্মোদ্যোগের মধ্যে আদর্শের সন্ধান করেছেন – যা ব্যক্তিগত স্তরে জ্ঞানের চর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করে; এই আদর্শই সমষ্টিগতভাবে বিজ্ঞান গবেষণার উপজাত তথ্য ও তত্ত্বের সততাকে নিশ্চিত করে। এইখানে আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি কথা আমাদের রাস্তা দেখায়। তিনি বলেছিলেন,
    ‘দিনে শতবার আমি নিজেকে এই কথা স্মরণ করাই, যে, আমার গোটা জীবনটাই নির্ভর করে আছে অপরের পরিশ্রমের ওপর; তাঁরা কেউ জীবিত, কেউ মৃত এবং তাঁদের কাছ থেকে আমি যা পেয়েছি ও আজও পাচ্ছি, ঠিক সমানভাবে তার প্রতিদান আমাকেও দিতে হবে।’
    এই আদর্শের বিষয়টি আমাদের এই বইয়ের মূল বিষয়বস্তু যা পরবর্তী আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

    বিজ্ঞানচর্চার রীতিনীতি নিয়ে এর পরে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মার্টন (Robert K. Merton)। ১৯৪২ সালে লেখা তাঁর প্রবন্ধে তিনি ‘বিজ্ঞানের সততার ওপর নানারকম আক্রমণের প্রতিক্রিয়া’ জানিয়েছেন। এই প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘Science and Technology in a Democratic Order’ যা পরে অনেকবার ‘The Normative Structure of Science’ শিরোনামে পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধে তিনি বিজ্ঞানচর্চার বিভিন্ন আদর্শ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন, যার থেকে বিচ্যুতিই তাঁর মতে বিজ্ঞানের সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ। তাঁর ভাষায় বিজ্ঞানের লক্ষ্য হল ‘প্রত্যয়িত জ্ঞানের প্রসারণ’ (Extension of certified knowledge)। এখানে প্রত্যয়িত জ্ঞান বলতে অভিজ্ঞতা-সঞ্জাত (অর্থাৎ প্রমাণিত), বিভিন্ন নিয়মের যুক্তিগ্রাহ্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম এবং সেই সূত্রে কিছু বিষয়ে সঠিক পূর্বাভাস করতে পারে – এমন জ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে। নিয়ম বলতে এখানে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনাচক্রের অন্তর্নিহিত নিয়মের কথা (দিন ও রাতের চক্র, ঋতুবদলের চক্র ইত্যাদি) বুঝতে হবে, কারণ যে কার্যকারণ সম্পর্কের ওপর বিজ্ঞানের ভিত গাঁথা হয়, প্রকৃতিই তার উৎস।

    মার্টনের বক্তব্যের সার প্রতিপাদ্য হল এইরকম: কাজের ক্ষেত্রে সততা রক্ষা করা বিজ্ঞানীর পক্ষে একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ, যে যে কারণে মানুষ কর্মক্ষেত্রে অসৎ হয়, বিজ্ঞানীর ক্ষেত্রটি সেই সবের বাইরে। তাঁর মতে, বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানচর্চা একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। এর চারটি চরিত্রগুণ তিনি শনাক্ত করেন। সেগুলো একটু সহজ ভাষায় বুঝে নেওয়া যাক।

    প্রথমত, Universalism বা সর্বজনীনতা।
    বিজ্ঞানের এই ধর্মটি নিশ্চিত করে, যে, গবেষণার ফলাফল প্রাক্‌নির্ধারিত নৈর্ব্যক্তিক ও নিরপেক্ষ কিছু বৈশিষ্ট্যের দ্বারা প্রত্যয়িত। কোনো নতুন ধারণা বা গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞানের জগতে গৃহীত হবে, না হারিয়ে যাবে – তার বিচার হবে দেশ, ধর্ম, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ইত্যাদির থেকে নিরপেক্ষভাবে; তা নির্দিষ্ট বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে পারছে কিনা – সেটাই একমাত্র বিচার্য। বিজ্ঞানের কোনো আবিষ্কার তার আবিষ্কারকের নামে পরিচিত হতেও পারে, কিন্তু তাকে গ্রহণ করা বা না করার ক্ষেত্রে কেউ মনে রাখবে না, যে, সে হিন্দু না মুসলিম, চৈনিক না ফরাসি। আপাতদৃষ্টিতে এই শর্ত খুব স্বাভাবিক (প্রায় স্বতঃসিদ্ধের মতো) মনে হয়, কিন্তু গবেষণার জগতে এই অলিখিত শর্ত যে প্রায়ই অঘোষিতভাবেই লঙ্ঘন করা হয়, সে কথা আমরা এর পরে বিভিন্ন উদাহরণে দেখতে পাব।

    দ্বিতীয়ত, Communism বা সাধারণতান্ত্রিকতা।
    এই ক্ষেত্রে এই শব্দটির সঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক নেই। এই শর্তটির অর্থ – বিজ্ঞানের গবেষণা একটি বিশ্বব্যাপী যৌথ উদ্যোগ; তাই গবেষণার ফলাফলও বিশ্বমানবের সম্পদ, এতে সকলের অধিকার। এখানে ব্যক্তিগত মালিকানার প্রশ্নটি প্রায় অর্থহীন। বিজ্ঞানী তাঁর মেধাসম্পদের ফলে যে জ্ঞান অর্জন করেন, সমাজের কাছে—বিশেষভাবে বিজ্ঞানী-সমাজের কাছে—যে বিশেষ সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করেন – সেটাই তাঁর পুরস্কার। কিন্তু গবেষণার ফলাফল তিনি কুক্ষিগত করে রাখতে পারেন না। বিজ্ঞানচর্চার এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই একটি বিষয়ে কেউ গবেষণা শুরু করে ভালো ফলাফল পেলে, সেই বিষয়ে গবেষণার জোয়ার আসে; কে প্রথম কাজ শুরু করেছেন – সে কথা মনে রাখলেও, সেই কাজের জগত তাঁর একার লীলাভূমি হয়ে থাকে না, সেই প্রথম বিজ্ঞানীও সেইরকম কিছু দাবি করেন না। এইখানে সাহিত্য বা চিত্রকলার সঙ্গে বিজ্ঞানের একটা বিরাট তফাত লক্ষ্য করা যায়। একটু অপরিচিত কোনো বিষয়ে কেউ প্রথম সাহিত্য রচনা করলে, সেই বিষয়ের ওপর তাঁর যেন একটা অধিকার জন্মে যায়; পরবর্তীকালে অন্য কেউ সেই বিষয়ে লিখলে তাঁকে প্রায়ই অনুকরণের অভিযোগ খণ্ডন করতে হয়। বিজ্ঞানে এইটি হয় না, তবে গবেষণাপত্র লেখার সময় পুরোনো কাজের ‘রেফারেন্স’ দিতে হয়, সেটা নিয়মের মধ্যেই পড়ে।

    তৃতীয়ত, Dis-interestedness বা বৈষয়িক উদাসীনতা।
    এটা আগের বৈশিষ্ট্যের সুদূরপ্রসারী ফলাফল। যেহেতু গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত মালিকানা নয়, তাই এর সঙ্গে বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত স্বার্থ সরাসরি সম্পর্কিত নয়। গবেষণার ফলফলের প্রতি তাই বিজ্ঞানীর কিছুটা নিঃস্বার্থ এবং উদাসীন দৃষ্টি থাকা উচিৎ। বলা ভালো, বিজ্ঞানীর দৃষ্টি হওয়া উচিৎ বস্তুকেন্দ্রিক (Objective), বিষয়কেন্দ্রিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক (Subjective) নয়। এই বিষয়টি বাস্তবে যে কিছুটা কষ্টকল্পিত, সেটা আমরা ক্রমে ক্রমে বুঝতে পারবো। তবে বিজ্ঞানীরা এই নীতিতে কিছুটা সম্পৃক্ত থাকেন বলেই গবেষণাপত্র মূলত ভাববাচ্যে লেখা হয়; ‘আমি/আমরা এইটা করেছি বা এই ফলাফল পেয়েছি’ লেখার বদলে প্রায় সর্বদাই ‘এই পরীক্ষা করা হয়েছে’ বা ‘এই ফলাফল পাওয়া গেছে’ এইরকম লেখা হয়। এইখানে এসে আমাদের মনে পড়ে যায় মেরি কুরি-র কথা। রেডিয়াম আবিষ্কারের পর পেটেন্টের প্রস্তাব এলে তিনি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন: রেডিয়াম একটি মৌলিক পদার্থ, তার ওপর সকলের সমান অধিকার; কারুর ঐশ্বর্য বৃদ্ধি করা রেডিয়ামের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের জগদীশচন্দ্র বসুও তাঁর রেডিও তরঙ্গের কাজের জন্য আমেরিকান পেটেন্টের প্রস্তাব অস্বীকার করেছিলেন। সুতরাং, একটা সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা নিজেদের জীবনে বৈষয়িক উদাসীনতা কিছুটা মেনে চলতেন – এটা ঠিক; বিজ্ঞানীদের আত্মভোলা ভাবমূর্তির পেছনে সম্ভবত এই আদর্শের একটা ভূমিকা ছিল (এর পাশাপাশি, সেকালেও বিজ্ঞানীরা অনেকেই অনেক কিছুর পেটেন্ট নিয়েছেন, তাতে অনৈতিকও কিছু নেই, কিন্তু মানুষের মনে এই ব্যতিক্রমগুলোই হয়তো বেশি ছায়া ফেলেছে)।

    চতুর্থত, Organised Scepticism বা সংগঠিত সংশয়বাদ।
    বিজ্ঞানের বা গবেষণার কর্মপদ্ধতির প্রতি একটা সংশয় – যা একজন বিজ্ঞানীকে ক্রমাগত নিজের কাজকে প্রশ্ন করে যেতে, ক্রমাগত সংশোধন করে যেতে, ‘যথাসাধ্য ভালো’-কে ‘আরো ভালো’ করে তুলতে উৎসাহিত করে। এইখানে এসে আবার ওয়েবারের উল্লিখিত ‘বিজ্ঞান যখন বৃত্তি’ এই ধারণার কথা মনে পড়বে। একজন শিল্পী বা সাহিত্যিক যখন কাজ শেষ করে কলম/তুলি নামিয়ে রাখবেন, বিজ্ঞানী তখন নিজেকেই বার বার প্রশ্ন করে চলবেন, আগের ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন, নিজের ব্যাখ্যার ফাঁকফোকর নিজেই সারিয়ে তুলে ‘বৌদ্ধিক আত্মদান’-এর ধারণাকে সত্য করে তুলবেন। অর্থাৎ এই সংশয়বাদ একটি পদ্ধতি, যা অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলোকে অনিবার্য করে তোলে। এই প্রসঙ্গে নোবেল পুরস্কারজয়ী জীববিজ্ঞানী ম্যাক্স ডেলব্রুক (Max Delbrück)-এর একটি কথা মনে করা যায়। নোবেল পুরস্কারের বক্তৃতায় উনি যা বলেছিলেন, তা সংক্ষেপে এইরকম: একজন শিল্পী ও একজন বিজ্ঞানী তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছোতে চান। বিজ্ঞানী নৈর্ব্যক্তিক ও নিরপেক্ষ সত্যের সন্ধান দেন, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাজকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়, দরকারে সংশোধন করতে হয়, অন্যদের কাজের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে তা জ্ঞানের ধারার সঙ্গে মিশে যায় – যাকে আমরা সংস্কৃতি বলি। কিন্তু গ্রন্থাগারে তাঁর রচিত বইয়ের ওপর ক্রমাগত ধুলো জমতে থাকে। অথচ, শিল্পী বা সাহিত্যিকের কাজ তাঁর নিজের নামে, নিজের রূপেই বেঁচে থাকে। বিজ্ঞানীকে এটা মেনে নিতে হয়; এটাই বিজ্ঞানীর বৌদ্ধিক আত্মদান।

    হার্ভার্ডের পদার্থবিদ্যার ছাত্র টমাস কুন (Thomas Kuhn; ১৯২২-১৯৯৬); পরবর্তীকালে বিজ্ঞানের দর্শন ও ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছিলেন। তাঁর মতে বিজ্ঞানের আসল অগ্রগতি বা ‘Paradigm Shift’ হয় এক একটা বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে, যেগুলো আসলে আকস্মিকের খেলা বা ‘Chance Discovery’। তাই রোজকার গবেষণা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়; তা আসলে বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটা ‘গট-আপ ম্যাচ’-এর মতো; এক একটা ধাঁধার উত্তর বের করার খেলা, এর মধ্যে মৌলিক কোনো ভাবনা নেই। কিছু সমস্যার সমাধান করার জন্য এক একটা নিয়ম তৈরি হয়, দীর্ঘদিন ধরে তার মধ্যে নানা অসঙ্গতি জমে জমে এক সময় সেটা ভেঙে পড়ে। তখন নতুন এক বৈজ্ঞানিক বিপ্লব এসে নতুন বিজ্ঞানযুগের সূচনা করে। বোঝাই যাচ্ছে, এই মতবাদ সমাজবিজ্ঞানীদের প্রিয়, কারণ এই ধারণা সমাজবিপ্লবের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ।

    বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানচর্চার বিষয়ে ওয়েবার, মার্টন ও কুন-এর এই বিধানগুলো পর পর পড়লে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়, যে, এই প্রস্তাবগুলো মূলত আদর্শবাদী, দার্শনিক এবং কিছুটা পুরোনো-পন্থীও বটে। যে কারণে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার অন্তর্নিহিত প্রকৃত সংশয়গুলোর অস্তিত্বই এখানে স্বীকৃত নয়। আবার, যেসব কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তাবিত হয়েছে, সেগুলো প্রকৃত বিচারে তেমন বড় সংশয়ই নয়। যেমন, মার্টন ও ওয়েবার দুজনেই বলেছেন – বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত স্বার্থের যোগ নেই, তাই প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে নেমে বিজ্ঞানীর কোনো লাভ নেই। কিন্তু, পেশাদার বিজ্ঞানীর ক্ষেত্রে গবেষণা তো শুধু বৃত্তি নয়, পেশাও বটে! একই সঙ্গে বিজ্ঞানের গবেষণার পেছনে বেশিরভাগ সময়েই একটা সামাজিক দাবি বা চাহিদাও থাকে। এই কারণে যে কোনো বিষয়ের গবেষণা সব যুগেই এক তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়; যিনি প্রথম প্রকাশ করেন, ফলাফলটা তাঁর নামেই পরিচিতি পায়। গবেষণার সাফল্য বিজ্ঞানীকে এনে দিতে পারে খ্যাতি বা যশ, সেইসুত্রে অর্থ এবং ক্ষমতা ইত্যাদি। সুতরাং, বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত স্বার্থ অবশ্যই গবেষণার সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত আর তাই অসততা—যতই অন্যায় হোক—বিজ্ঞানীর ক্ষেত্রে আদৌ অসঙ্গত নয়। অন্যদিকে, আধুনিককালে বিজ্ঞানের গবেষণার শর্তই হল স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশ করা আর প্রকাশিত কাজের সূত্র ধরে গবেষণার রাস্তা উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া। তাই প্রকাশিত গবেষণাকর্মের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার বিষয়টা বিজ্ঞানীর কাছে সর্বদা তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেসব কাজের ক্ষেত্রে সেটা গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের বিধিসম্মত উপায় আছে। মেধাস্বত্ব এবং মেধাসম্পদ সংরক্ষণের দাবি অসত বা নীতি-বহির্ভূত বিষয় নয়।

    সোজা কথা হল, বিজ্ঞান এভাবে চলে না। বিশেষভাবে, ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে বেরিয়ে বিজ্ঞানচর্চা যখন থেকে সরকারি/বেসরকারি অনুদান-নির্ভর হয়ে উঠেছে, যখন থেকে বিজ্ঞানীদের ‘নিয়োগ’ করার দরকার হয়ে পড়েছে, তখন থেকে বিজ্ঞানীদের যোগ্যতা অনেকটাই নির্ভরশীল হয়েছে প্রকাশিত কাজের ওপর। সেই ‘ভারপ্রাপ্ত’ বিজ্ঞানী কীভাবে নীতির পথ থেকে সরে আসেন, তার হিসেব কিন্তু ওয়েবার বা মার্টনের প্রস্তাব থেকে পাওয়া যায় না (বিধ্বংসী বোমা থেকে রাসায়নিক অস্ত্র – সবই তো এই বিজ্ঞানীদের কাজ)। এ-ও সত্যি, বিজ্ঞানের সব কাজ পদে পদে মিলিয়ে দেখে এগোনো যায় না। এমন অনেক কাজ আছে, অনেক দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহ করার পদ্ধতি আছে, যা সেই বিজ্ঞানীর নিজের পক্ষেই মিলিয়ে দেখা সম্ভব নয়—তাহলে তিনি একই কাজে আটকে থাকবেন। সেই ফলাফল প্রকাশিত হলে, অন্য কেউ যখন সেই তথ্য থেকে কাজ শুরু করে পরের ধাপে এগিয়ে যেতে পারেন, তখনই আগের কাজটির যাথার্থ্য প্রমাণিত হয়। আসলে সমাজবিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে দেখেছেন বাইরে থেকে, তাই এর নীতিগত দিকটিই তাঁদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে; কিন্তু হাতেকলমে বিজ্ঞানের গবেষণা না করায় এই জগতের সত্যিকারের সমস্যাগুলো তাঁদের কাছে ধরা দেয়নি। তাঁরা নীতিবোধ অবধি ভেবেছেন, অসততার প্রকৃত মাত্রা অবধি পৌঁছোতেই পারেননি, যেটা তাঁদের প্রায় এক শতক আগে করে গিয়েছেন এমন একজন, যাঁকে আমরা জানি কম্পিউটারের জনক বলে।



    চার্লস ব্যাবেজ ও প্রবঞ্চনার রকমফের

    ভদ্রলোক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, গণিত থেকে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন শাখা ছিল তাঁর কাজের ঘোষিত ক্ষেত্র। দীর্ঘ বারো বছর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের লুকাসিয়ান প্রফেসরের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন—যে পদের আরও দুটি চেনা নাম – স্যার আইজ়াক নিউটন আর স্টিফেন হকিং। রাশিবিজ্ঞানের নিয়ম ব্যবহার করে কারখানার উৎপাদনের আন্দাজ পেতে চাওয়া, গাছের কাণ্ডের মধ্যেকার গোল দাগগুলো থেকে প্রাচীন যুগের জলবায়ুর ধারণা করা – এই সব বহুবিচিত্র কাজের পাশাপাশি জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন এমন একটা যন্ত্র তৈরি করতে – যা নিজে থেকে নিখুঁত গণনা করতে পারবে। ভদ্রলোকের নাম চার্লস ব্যাবেজ (Charles Babbage), যাঁর গবেষণার বিষয়ে এই কম্পিউটারের ব্যাপারটাই আমরা জানি। এমনকি এটাও আমরা জানি না, যে, ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানচর্চার মানের অধোগতি নিয়েও উনি বিশেষ চিন্তিত ছিলেন। ১৮৩০ সালে এই বিষয়ে তিনি ছয় অধ্যয়ের এক বই লেখেন, তার শিরোনাম: ‘Reflections on the Decline of Science in England and on Some of Its Causes’। এই প্রবন্ধে তিনি বিজ্ঞানচর্চার অনেকগুলো সমস্যার দিকে নজর দেওয়ার কথা বলেছেন, যেমন – বিজ্ঞানের প্রতি প্রশাসক ও অভিজাতশ্রেণির মানুষের অজ্ঞতা ও ঔদাসীন্য, বিজ্ঞানচর্চায় অনুদানের (টাকা ঢালার) অভাব, বিজ্ঞানীদের যথেষ্ট সামাজিক স্বীকৃতির অভাব, ইত্যাদি। এই বইয়ের পঞ্চম অধ্যয়ে তিনি ‘The Frauds of Observers’ শিরোনামে যা লিখেছেন, তাকেই মোটামুটি বিজ্ঞানীদের প্রবঞ্চনার স্বীকৃত মডেল বলা যেতে পারে।

    ব্যাবেজের পর্যবেক্ষণ অনুসারে স্থূল বিচারে বিজ্ঞানীদের ‘অ্যাকাডেমিক জালিয়াতি’ প্রধানত তিনপ্রকার। প্রথমত, কাজ করার পর ফলাফলটা ভালো দেখাবার জন্য একটু-আধটু জল মেশানো; কিছু অপছন্দের ফলাফল বাদ দেওয়া বা দু-একটা কাল্পনিক তথ্য জুড়ে দেওয়া। ব্যাবেজ একে বলেছেন ‘Trimming’ বা ছাঁটা। দ্বিতীয়ত, বানিয়ে বলা, অর্থাৎ পরীক্ষায় পাওয়া যায়নি এমন কিছু মনগড়া তথ্য/ফলাফল প্রকাশ করা; ব্যাবেজ একে বলেছেন ‘Cooking’। আর তৃতীয়ত, হোক্স, মানে ধাপ্পা বা নির্জলা মিথ্যে, অর্থাৎ পুরোটাই বানিয়ে বলা। যে কাজ আদৌ করা হয়নি, তার বানানো বর্ণনা ও ফলাফল প্রকাশ করা। এর বাইরে আছে আর একরকম জালিয়াতি, যাকে বলে প্লেজিয়ারিজ়্ম (plagiarism) বা কারুর গবেষণা থেকে টুকে লেখা। এইগুলো কীভাবে বিজ্ঞানীদের কাজের মধ্যে ঢুকে পড়ে তাঁদের কতদুর বিচ্যুত করে – সেইটাই আমরা ধাপে ধাপে দেখতে পাবো। ব্যবেজের এই শ্রেণিবিন্যাস এতটাই যথার্থ, যে বিজ্ঞানীদের প্রায় সবরকম প্রবঞ্চনা এর মধ্যে ঢুকে যায়। তাই জালিয়াতির এই শ্রেণিবিভাগই এখনও প্রামাণ্য বলে ধরা হয়। তবে নামগুলো সামান্য বদলে এখন ট্রিমিং-কুকিং-কে যথাক্রমে falsification ও fabrication বলা হয়। সত্যি বলতে কি, শব্দের বিচারে ট্রিমিং-কুকিং-কে আমার ফলসিফিকেশন-ফ্যাব্রিকেশন-এর চেয়ে বেশি যথাযথ মনে হয়, কারণ কথাগুলো শুনলেই বিষয়টা আন্দাজ করা যায় এবং তফাৎটা ভালোভাবে বোঝা যায়। এই লেখায় আমরা এদের আমরা কারচুপি (ফলসিফিকেশন/ট্রিমিং) আর জালিয়াতি (ফ্যাব্রিকেশন/কুকিং) বলে উল্লেখ করব। কুম্ভীলকবৃত্তি বা প্লেজিয়ারিজ়্‌ম এখন অনেকটা বেশি গুরুত্ব পায় আর ধাপ্পাকে ধাপ্পা-ই (Forgery) বলা হয়। সবদিক বিচার করে গবেষণায় জালিয়াতির প্রায় আইনসম্মত যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা এইরকম:

    “Research misconduct means fabrication, falsification, or plagiarism in proposing, performing, or reviewing research, or in reporting research results.
    (a) Fabrication is making up data or results and recording or reporting them.
    (b) Falsification is manipulating research materials, equipment, or processes, or changing or omitting data or results such that the research is not accurately represented in the research record.
    (c) Plagiarism is the appropriation of another person's ideas, processes, results, or words without giving appropriate credit.
    (d) Research misconduct does not include honest error or differences of opinion.”

    — The Office of Research Integrity
    (U.S. Dept. of Health & Human Services)

    অর্থাৎ গবেষণাকর্মের প্রস্তাবনা, সম্পাদনা, মূল্যায়ন অথবা প্রকাশনার যে কোনো পর্যায়ে ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্যের পরিবর্তন, অপলাপ, বিকৃতি, নকল করা, গোপন করা, কাউকে তার প্রাপ্য কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত করা – সবই ঘোষিতভাবে নানারকমের অসদাচরণের মধ্যে পড়ে যায়। এর সঙ্গে আস্তে আস্তে জুড়ে যাবে স্বজনপোষণ, মানে পছন্দের ছাত্র কাজ না করলেও প্রকাশনায় তার নাম দেওয়া, ক্ষমতাবান বিজ্ঞানীদের ‘হাতে রাখার জন্য’ গবেষণাপত্রে তাঁদের নাম (উপহার) দেওয়া, ইত্যাদি খুচরো কিছু বিষয় – যা এই তালিকায় হয়তো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা নেই। কিন্তু অনিচ্ছাকৃত ভুল এবং মতানৈক্য কখনোই অসদাচরণের মধ্যে পড়ে না। এইভাবে কম্পিউটারের জনকের হাত ধরে আমরা বিজ্ঞানীদের প্রতারণার মূল আখ্যানে ঢুকে পড়লাম।


    quoteEnd



    আগামী বইমেলায় প্রকাশিতব্য বইটির প্রথম অধ্যায় এটি। নীরস তত্ত্বালোচনা নয়, বিজ্ঞানের বিপুল ইতিহাস ঘেঁটে প্রাঞ্জল গল্পের পর গল্পের উদাহরণে প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করেছেন লেখক। পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে উঠোনের কলকাতা-অবধি, ডারউইন থেকে শুরু করে আমাদের শহরের এই সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ - বইয়ের পরিধি যেমন বৃহৎ, ভারতীয় বিজ্ঞানের গৈরিকীকরণ আর বেসরকারিকরণের তুমুল আয়োজনের মধ্যে এর প্রকাশের প্রয়োজনও ঠিক ততটাই।
    প্রচ্ছদ নিয়ে সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত নয়, সঙ্গেরগুলি খসড়ামাত্র।

    বই: কাঠগড়ায় বিজ্ঞানীরা : বিজ্ঞানীদের নীতিবোধ ও কিছু দুঃসাহসিক জালিয়াতির কাহিনী
    লেখক: রূপালী গঙ্গোপাধ্যায়
    প্রকাশক: গুরুচণ্ডা৯
    প্রকাশ: ২০২৬
    প্রচ্ছদ: রমিত চট্টোপাধ্যায় ও রজতশুভ্র গঙ্গোপাধ্যায়

    যাঁরা গুরুর বইপ্রকাশের পদ্ধতিটা জানেন, তাঁরা অবগত আছেন, যে, গুরুর বই বেরোয় সমবায় পদ্ধতিতে। যাঁরা কোনো বই পছন্দ করেন, চান যে বইটি প্রকাশিত হোক, তাঁরা বইয়ের আংশিক অথবা সম্পূর্ণ অর্থভার গ্রহণ করেন। আমরা যাকে বলি 'দত্তক'। এই বইটি যদি কেউ দত্তক নিতে চান, আংশিক বা সম্পূর্ণ, জানাবেন। এই লেখার নিচে। অথবা guruchandali@gmail.com -তে ইমেল করে।

    দত্তক প্রসঙ্গে - কী ও কেন >> (https://www.guruchandali.com/comment.php?topic=28892)



    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • বইপত্তর | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৮৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন