বিজ্ঞান জিতেছে নাকি কুসংস্কার ?
পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার কৃষ্ণনগরে সন্নিকটে মায়ের মৃতদেহ থেকে চক্ষুদান (কর্নিয়া) করানোর অপরাধে আমীরচাঁদ শেখকে ( যিনি একজন স্কুলশিক্ষক ও সমাজসেবী ) তিন দিন জেল খাটতে হয়েছে। আজ এই নিয়ে এক গভীর বিষাদ ও বিচলন নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই (যা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ)। মরণোত্তর দেহদানের মতো একটি নিঃস্বার্থ ও মহৎ কাজ যখন আমাদের সমাজে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় এবং একটি শোকাতুর পরিবারকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করার বদলে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, তখন বুঝতে হবে আমাদের সামাজিক কাঠামো কতটা গভীর সংকটে নিমজ্জিত। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এই বিড়ম্বনাটি কেবল কিছু মানুষের উন্মাদনা নয়, বরং সামষ্টিক বিশ্বাস বনাম ব্যক্তিগত আধুনিকতার এক চরম মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত। গ্রামবাসীদের মধ্যে যে মারমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, তাকে সমাজ-মনস্তত্ত্বের ভাষায় এক ধরণের গণ-হিস্টিরিয়া বলা যেতে পারে। দীর্ঘদিনের লালিত প্রথা বা ধর্মীয় আবেগের বাইরে কোনো আধুনিক পদক্ষেপকে যখন মানুষ অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখে, তখন তাঁরা ব্যক্তিগত যুক্তিবোধ হারিয়ে এক ধরণের আউট-গ্রুপ বায়াস বা রক্ষণাত্মক হিংস্রতায় মেতে ওঠে।
তবে এই সংকটের মূলে কেবল কুসংস্কার নেই, রয়েছে এক বিশাল Comunication Gap। প্রথা ভাঙার দীর্ঘ লড়াইয়ে সমাজকর্মীদের মধ্যে যে সংগত কারণেই এক ধরণের রক্ষণাত্মক ভঙ্গি তৈরি হয়, তা অনেক সময় স্থানীয় মানুষের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। নথিপত্র দেখানো বা স্বচ্ছতা নিয়ে যখন আস্থার অভাব তৈরি হয়, তখন আদর্শ আর বাস্তবতার মাঝে তৈরি হয় এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। এই আস্থার অভাবই শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। এটি আমাদের শেখায় যে, বড় পরিবর্তনের পথে কেবল উন্নত আদর্শ থাকলেই চলে না, বরং স্থানীয় মানুষের অনুভূতি আর সংস্কৃতির প্রতি গভীর সহমর্মিতা এবং ধৈর্যশীল আলাপচারিতার মাধ্যমে আবেগ ও আস্থার মধ্যে একটি সেতু নির্মাণ করাও সমান জরুরি।
সবচেয়ে বিড়ম্বনার বিষয় হলো প্রশাসনের কৌশলগত দ্বন্দ্ব। পুলিশ যখন পরিবারটিকে উদ্ধার করে নিরাপদ হেফাজতে নেয়, তখন তাঁদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল পরিবারটির জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা, কিন্তু আইনের নিজস্ব যান্ত্রিকতা ও প্রথাগত ধারার মারপ্যাঁচে যখন সেই সুরক্ষাই তিন দিনের হাজতবাসে রূপ নেয়, তখন জনমানসে এক ধরণের কনফার্মেশন বায়াস তৈরি হয় ফলত মানুষ ভুলবশত মনে করতে থাকেন যে, প্রগতিশীল কাজটিই আসলে হয়তো অপরাধ ছিল! আইনের এই যান্ত্রিক প্রয়োগ পরিবারটির শোকাতুর মনে যে "কগনিটিভ ডিসোনেন্স" বা অবিশ্বাসের ক্ষত তৈরি করেছে, তার দায় কে নেবে?
যখন একটি মহৎ কাজকে অপরাধের মাপকাঠিতে বিচার করা হয় এবং "প্রক্রিয়াই যেখানে শাস্তি" (Process is the Punishment) হয়ে দাঁড়ায়, তখন সমাজ ও প্রশাসনের কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা পৌঁছায়। এই আইনি বিড়ম্বনা কেবল একটি পরিবারকে লাঞ্ছিত করে না, বরং সামাজিক বিবর্তনের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। পরিশেষে, এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, প্রগতির পথটি কেবল যুক্তির ইট দিয়ে নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, প্রশাসনিক সংবেদনশীলতা এবং বিচারবিভাগের মানবিক ব্যাখ্যা দিয়ে তৈরি হওয়া প্রয়োজন। তবেই সমাজ ও ব্যক্তির মধ্যকার এই ব্যবধান ঘুচে গিয়ে এক নতুন ও বিজ্ঞানমনস্ক ভোরের সূচনা হবে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।