

‘আধ জনম হাম নিদে গোঙায়লুঁ/জরা শিশু কতদিন গেলা’ --- আক্ষেপ করেছিলেন কবি বিদ্যাপতি। সত্যিই আমরা অনেকেই খেয়াল করেও দেখিনি কোনোদিন যে, জীবনের অর্ধেক না হলেও অন্তত এক তৃতীয়াংশ সময় আমরা জাস্ট ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিই। জেগে থাকার বাকি দিনগুলোতেও কত কত ঘন্টা নষ্ট হয় ‘আন-প্রোডাকটিভ’ কাজে। প্রায় দুই দশক স্কুল শিক্ষক হিসেবে কাটানোর পর তেমনই আরেকটা অদ্ভুত অঙ্কের সামনে মাঝেমাঝেই এসে দাঁড়াই আর শিহরিত হই আতঙ্কে। এইভাবে পড়াশুনা হয়? হতে পারে আদৌ?
রাজ্যজুড়ে সবেমাত্র শেষ হয়েছে মাধ্যমিক পরীক্ষা। পরদিন থেকেই হইহই করে শুরু হয়ে গেছে উচ্চ-মাধ্যমিক। দুটো মিলিয়ে মোটামুটি এক মাসের ধাক্কা। একই স্কুলে দুটো পরীক্ষার সিট পড়ে না বটে, কিন্তু এর জন্য ভোগে কমবেশী সমস্ত স্কুলই। পরীক্ষায় ইনভিজিলেশন ডিউটি করার জন্য আশেপাশের বিভিন্ন স্কুল থেকে শিক্ষকদের তুলে নেওয়া হয়। যে স্কুলে সিট পড়ে, তাদের তো পঠন-পাঠন পুরোপুরি বন্ধই থাকে, বাকিদেরও পড়শুনা ভালরকম ধাক্কা খায়। আগে উচ্চ-মাধ্যমিক হত বছরে একবার, এখন দু-দুটো সেমেস্টার। যে উর্বর মস্তিষ্কের বিদ্যা-দিগগজেরা এই অদ্ভুতুড়ে ব্যবস্থাটা চালু করলেন, তারা একবারও স্কুলের নীচু ক্লাসের বাচ্চাদের ক্ষতির দিকটা বিবেচনা করে দেখলেন না। উক্ত শিক্ষা-নিয়ামকদের জন্য নীচে আরেকটা অঙ্ক সাজিয়ে দিই, পারলে উত্তরটা মিলিয়ে দেবেন তাঁরা।
বছরে তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যে বাহান্নটা থাকে রোববার। আর পঁয়ষট্টিটা থাকে তালিকাভুক্ত ছুটি। একুনে হল একশো সতের। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বিগত বছর দশেক ধরেই অতিরিক্ত গরমের কারণে দেড় থেকে দুমাস অতিরিক্ত গরমের ছুটি দেওয়াটাকে রেওয়াজ বানিয়ে ফেলেছেন। মোটামুটি ৪৫ দিন ধরলেও মোট ছুটির সংখ্যা দাঁড়াল ১৬২ দিন। তাহলে এই সংখ্যাটা হাতে নিয়ে পড়াশুনা শুরু করা যাক, কেমন?
দাঁড়ান দাঁড়ান, এক্ষুণি খাতা বন্ধ করবেন না। এবার লিখুন, মাধ্যমিক আর উচ্চ-মাধ্যমিক মিলিয়ে চলে যায় মোটামুটি এক মাস। স্কুলের নিজস্ব তিনটি পরীক্ষার যায় মোটামুটি আরও এক মাস। অর্থাৎ সব মিলিয়ে হাতে রইল কমবেশি একশো দিন। এই একশো দিনের কাজ প্রকল্পে বিস্তর খুচরো দুর্নীতি শুরু হয়। যেমন বছরে শুরুতে মোটামুটি দিন পাঁচেক বইপত্র না থাকার কারণে পড়াশুনা হয় না, আর বার্ষিক পরীক্ষার পর দিন পনেরো এমনিই ছুটি থাকে। মানে কুড়ি দিন। সঙ্গে ধরুন সরস্বতী পুজোর জন্য দিন তিনেক, স্পোর্টসের জন্য দুদিন, প্রতি বছরই মোটামুটি কোনো-না-কোনো নির্বাচন থাকে, তার জন্য স্কুলও নেওয়া হয়। মানে মোটামুটি দিন তিনেকের ধাক্কা। (আর স্কুলে নিরাপত্তা বাহিনী ঢুকে গেলে তো সোনায় সোহাগা)। এর সঙ্গে যোগ করুন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর আচমকা ঘোষণা করা তালিকার বাইরের দুই বা তিনদিনের ছটি। হিসেব কষে দেখুন, মোটামুটি আরও একমাস গেল। মানে পাঠদিবসের সংখ্যাটা এসে দাঁড়াল সত্তর দিনে।
এবারে হাফ-ছুটি। বছরে বাহান্নটা শনিবার। আর সঙ্গে যোগ করুন অন্তত আরও দিন দশেক – বিভিন্ন অজুহাতে। সেই অজুহাতের তালিকায় পড়ে --- অতিরিক্ত বৃষ্টি বা গরম, পরীক্ষার আগে প্রস্তুতি, স্কুলের নানা রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি অনেক কিছুই। এই অর্ধ-দিবসগুলোকে যোগ করে তার অর্ধেক পরিমাণকে পূর্ণদিবস হিসেবে ধরে নিলে হয় মোটামুটি তিরিশ দিন। হিসেবটা আর লম্বা করা বোধহয় ঠিক হবে না। শূন্য অথবা মাইনাসে চলে গেলে লজ্জার একশেষ হবে।
আমরা জানি শিক্ষকের পাশাপাশি আমাদের রাজ্যের স্কুলগুলো করণীক আর চতুর্থ শ্রেণির কর্মীর অভাবেও মারাত্মক ভুগছে। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরই ভাগাভাগি করে যাবতীয় ‘ক্লারিকাল’ কাজ তুলে দিতে হয়। এর তালিকায় শিক্ষাশ্রী-কন্যাশ্রী-ঐক্যশ্রীর মত অসংখ্য অনুদান বিলির পাশাপাশি পরীক্ষা পরিচালনা, ভর্তি প্রক্রিয়া সামলানো, হরেক পোর্টালে ডেটা আপলোড ইত্যাদি সবই রয়েছে। ফলে ছেলেমেয়েরা বসে থাকে, স্যর-ম্যাডামের দেখা মেলে না। বোঝার ওপর শাকের আঁটির মত রয়েছে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অনুপস্থিতিগুলো --- ক্যাজুয়াল লীভ, মেডিক্যাল লীভ, থেকে শুরু করে মহিলাদের এক লপ্তে অন্তত পনেরো দিনের সি সি এল (চাইল্ড কেয়ার লীভ) ইত্যাদি অনেক কিছুই। এগুলো নিয়ে কিছু বলা যাবে না, কারণ এগুলো সরকারী কর্মচারীদের ‘অধিকার’। মুশকিল হল, শিক্ষার্থীদেরও যে কিছু অধিকার আছে – গোটা ব্যবস্থাটাই সেকথা বেমালুম ভুলে বসে আছে।
এ বছর এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এস আই আর। ‘প্রতীচী’ ট্রাস্টদের অভীজ্ঞ গবেষকরা অঙ্ক কষে দেখিয়েছেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে যে বিপুল পরিমাণ শিক্ষক-শিক্ষিকাকে স্কুলগুলো থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে, তার ফলে নষ্ট হয়েছে এক কোটি ষোল লক্ষ ঘন্টা ‘শিক্ষা-সময়’। প্রশ্ন জাগে, হাতে কি অঙ্ক কষার মত পেনসিলটাও আর রইল?
ইদানীং এ রাজ্যের শিক্ষক-মহলে কান পাতলেই একটা আক্ষেপ শোনা যায় -- গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে স্কুলগুলোতে ছাত্রদের উপস্থিতির হার ভয়ানক রকম কমে গেছে। সদর-মফসসলের নামী স্কুল হোক বা প্রত্যন্ত গ্রামের অখ্যাত কোনো স্কুল --- কোনদিন কোনো ক্লাসেই মেরেকেটে তিরিশ-চল্লিশ শতাংশের বেশি ছেলেমেয়ে হাজির থাকে না। তুলনামূলক উঁচু ক্লাসে সংখ্যাটা আরও কম থাকে। মাধ্যমিক বা উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা তো প্রাকটিক্যাল বা প্রোজেক্টের ক্লাস ছাড়া স্কুল-মুখোই হয় না। প্রাইভেট টিউশন কিন্তু আগেও ছিল, কিন্তু তখন ওরা সবাই স্কুলের সময়ের আগে অথবা পরে, মানে সকালে অথবা সন্ধ্যায় ‘প্রাইভেট পড়তে’ যেত। এখন সেসব বালাই ঘুচে গেছে। কোচিং সেন্টারগুলো এখন হামেশাই ‘স্কুল আওয়ারেও’ পড়ার ‘সিডিউল’ রাখে। কারণ – সবাই জানে – স্কুলে আজকাল আর পড়াশুনা হয় না, থুড়ি, স্কুলই আজকাল আর হয় না।
খেয়াল করে দেখবেন, মাধ্যমিক বা উচ্চ-মাধ্যমিকের মেধা-তালিকায় স্থান পাওয়া ছাত্রছাত্রীরা প্রায় প্রত্যেকেই সাংবাদমাধ্যমের সামনে বলে যে, তাদের আট-দশজন করে প্রাইভেট টিউটর ছিলেন। তার সঙ্গে নেহাৎ-ই বলতে হয় তাই বলা হয়, ‘স্কুলের মাস্টারমশাই-দিদিমণিরাও সাহায্য করেছেন’।
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা-ব্যবস্থায় স্কুলগুলোর অবদান এখন ঠিক ওইটুকুই।
. | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০১:৪৯738452