এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  সমাজ

  • আজকের ব্রাহ্মণ্যধর্মের চৌপদী - পর্ব ষোল

    রঞ্জন রায়
    আলোচনা | সমাজ | ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০৯ বার পঠিত
  • মনুস্মৃতি, মায়াবাদ, ভগবদ্গীতায় যুদ্ধের নৈতিকতা ও হিন্দুত্বের তত্ত্ব



    আগের কিস্তিতেই বলেছিলাম যে এই সংজ্ঞাটি সাভারকরের রচনা, কিন্তু খুব মৌলিক নয়। এতে মনুস্মৃতির একটি শ্লোককে, যাতে আর্যাবর্তের ক্ষেত্র কতটা তার বর্ণনা রয়েছে, সামান্য বদলে নেওয়া হয়েছে এবং হিন্দু শব্দ জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

    ‘পূর্ব এবং পশ্চিম সাগরের অন্তর্বতী যে ভূমি দুই পর্বতের মধ্যে অবস্থিত, তাহাকেই বিদ্বদজ্জনেরা আর্যাবর্ত বলিয়া থাকেন’,(মনুস্মৃতি ২/২২)।

    এবার উনি ‘পিতৃভূমি’ এবং ‘পুণ্যভূমি’র তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন।

    সাভারকর বলছেন -- পিতৃভূমি অর্থ যে অঞ্চলে (সিন্ধুনদ থেকে সমুদ্র পর্য্যন্ত) পিতৃপুরুষ পরম্পরায় একটি জনগোষ্ঠী বাস করছে এবং যাদের মধ্যে একই রক্তধারা প্রবহমান তারাই হিন্দু। যদিও সাভারকর রচিত শ্লোকে রক্তধারার কথা বলা হয় নি, কিন্তু সাভারকর ব্যাখ্যা করেছেন যে অর্থে কেবল ভূখন্ড নয়, একই রক্তধারার ঐতিহ্যও বুঝতে হবে।

    আবার পূণ্যভূ বা পূণ্যভূমি অর্থে কেবল ধর্ম অথবা ধর্মীয় আচার নয়, সেটা হিন্দুত্বের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা হবে।

    বরং ধর্ম, রাষ্ট্রনীতি, শাসনপ্রণালী, জীবনযাপন পদ্ধতি মিলিয়ে সম্পূর্ণ সংস্কৃতির ইতিহাসকে ধরতে হবে। তাতে বিশেষ করে হিন্দু রাজাদের বীর্য এবং তার জোরে সাম্রাজ্যের বিস্তারের ইতিহাসের বিশেষ প্রাধান্য থাকবে।

    এই কারণেই তিলকের দেওয়া সংজ্ঞাটি, সাভারকরের মতে, হিন্দুধর্মের জন্যে সবচেয়ে কার্যকরী হলেও ‘হিন্দুত্ব’এর জন্য সংকীর্ণ।
    ‘ প্রামাণ্যবুদ্ধির্বেদেষু সাধনানামনেকতা,
    উপাস্যানামনিয়ম এতদ্ধর্মস্য লক্ষণম্‌’।
    বেদে আস্থা, পূজার্চনার বিবিধতা এবং কোন এক বাঁধাধরা নিয়মের অভাব—এই হল হিন্দুধর্মের বৈশিষ্ট্য।

    এইজন্যেই বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যকে খারিজ করতে হবে। এই বিশ্বধর্ম যতই মহান হোক, অহিংসার ভুল নীতিশিক্ষা দিয়ে তলোয়ারের বদলে জপমালা ধরিয়ে আমাদের অসহায় নিবীর্য করে দিয়েছিল। তাই রাজনৈতিক কারণেই বৌদ্ধধর্ম এদেশ থেকে উঠে গেল।

    সাভারকর উদ্ধৃত করছেন একেবারে অন্যপ্রসংগে লেখা বিদ্যাসাগরের সতীর্থ বাংলার তারানাথ তর্কবাচস্পতির একটি লাইন যাতে উনি হিন্দু ও যবনকে একেবারে বিপরীত মেরুর ধরেছেন—“ শিব শিব! না হিন্দুর না যবনের!”

    পিতৃভূমি বোঝা গেল—রাষ্ট্র এবং জাতির বসবাসের জন্যে পরম্পরাগত ভূখণ্ড।

    কিন্তু রক্তধারা?

    সাভারকর এই পরিচ্ছেদের নাম দিয়েছেন Bond of Common Blood, বলছেন বুঝতে হবে কেন হিন্দু হতে গেলে বাপ-পিতামোর আমল থেকে ভারত নামের একটি নির্দিষ্ট ভুখণ্ডে বসবাস করছি পরিচয় যথেষ্ট নয়, হতে হবে একই শোণিতাস্রোতের বন্ধনে বাঁধা।

    ‘হিন্দুরা মাত্র ভারতের নাগরিকই নয়, এবং শুধু মাতৃভূমির ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধই নয়, তারা একই রক্তধারার ঐতিহ্যের বন্ধনে আবদ্ধও বটে। They are not only a Nation but also a race (jati)।

    উল্লেখযোগ্য, যে একই সময়ে, মানে ১৯২০-৪০ কালখণ্ডে জনৈক অ্যাডলফ হিটলার-- আর্যজাতি, আর্যরক্তের বিশুদ্ধতা এবং তার সঙ্গে রাষ্ট্রের বিকাশ এবং সুরক্ষা নিয়ে তথা বীর্যবান রাষ্ট্রের অবধারণা নিয়ে-- ইউরোপ এবং ক্রমশঃ গোটা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।

    সাভারকরের মতে সমস্ত হিন্দুজাতি সেই সিন্ধুদেশ এবং বৈদিক কাল থেকে পিতৃপুরুষ ক্রমে একই রক্তধারার বন্ধনে আবদ্ধ। যদি কেউ প্রশ্ন করে যে সত্যিই কি সমস্ত হিন্দুদের শিরায় একই রক্তের ধারা বইছে? তাদের কি একটি জাতি বলা যায়? তো সাভারকরের উত্তর হল— আজকের বিশ্বে ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, জার্মান বা চাইনিজদের রক্তও কি আগের মত শুদ্ধ রয়েছে? ওরা যদি জাতি হয় তো হিন্দু কেন নয়?

    তারপর সাভারকর মনুস্মৃতির উদাহরণ দিয়ে বললেন যে প্রাচীন অনুলোম এবং প্রতিলোম বিবাহের নিয়মে উচ্চবর্ণের পুরুষ নিম্নবর্ণের নারীকে বিয়ে করতে পারত এবং উল্টোটাও হত। কিন্তু সবাই তো বৃহৎ হিন্দুজাতিই। ব্রাহ্মণ থেকে চণ্ডাল সবার মধ্যে একই রক্তের ধারা বইছে।

    ওই জাতপাতের আঁটাপত্তি ছিল বিদেশীদের রক্ত (ম্লেচ্ছ, যবন) ঢুকতে না দেওয়ার জন্যে। তাই বৌদ্ধধর্মও দেশ থেকে জাতিভেদ দূর করতে পারেনি। আর ইউরোপিয় পণ্ডিতরা ভারতের জাতপাতের ভূমিকাটি ঠিক ধরতে পারে না।

    ব্রাহ্মণ এবং চণ্ডাল, দ্রাবিড় এবং নমশূদ্র—সব হিন্দু। মহাভারত থেকে উনি নিয়োগ প্রথা, কর্ণ, বভ্রুবাহন, ঘটোৎকচ এবং বিদুরের জন্মবৃত্তান্তের উল্লেখ করে বললেন—সবই হিন্দু রক্ত।
    রাক্ষস, যক্ষ, বানর, কিন্নর, শিখ, জৈন , আইয়ার –সবই হিন্দু রক্ত। আমরা শুধু নেশন নই, আমরা একটি জাতি।

    এরপর উনি কিন্তু বিরাট ডিগবাজি খেলেন।

    “আসলে সমগ্র বিশ্বে একটাই জাতি—মানব জাতি। একটাই শোণিত বহমান –মানব রক্ত। বাকি সব রক্তের বন্ধন কাজচালানোর জন্যে--provisional, a make shift and only relatively true. Nature is constantly trying to overthrow the artificial barriers between race and race. To try to prevent the commingling of blood is to build on sand. Sexual attraction has proved more powerful than all the commands of all the prophets put together”।

    যা বাব্বা! তাহলে এতক্ষণ ধরে কী সব বলছিলেন? কিন্তু উনি থামতে পারেন না। বললেন—আন্দামানের আদি বাসিন্দেদের শরীরেও কয়েক ফোঁটা আর্য রক্ত রয়েছে এবং এর উল্টোটাও সত্যি। ইতিহাসের সাক্ষ্য আমাদের শুধু এইটুকু বলার অধিকার দেয় যে আমাদের শরীরে সমস্ত মানবজাতির রক্ত বহমান। এক মেরু থেকে অন্য মেরু পর্য্যন্ত মানবজাতির এই মৌলিক ঐক্যটুকুই সত্য। বাকিসব আপেক্ষিক সত্য।

    এত একেবারে ঘেঁটে ঘ!

    কিন্তু পরিচ্ছেদের শেষে গিয়ে ফের কেঁচে গণ্ডুষ।

    কিন্তু আপেক্ষিক অর্থেও, বিশ্বে শুধু হিন্দুদের , হয়ত ইহুদিদেরও, রক্ত অন্য সমস্ত জাতির চেয়ে শুদ্ধ। হিন্দুর ছেলেমেয়েরা অন্য জাতিতে বিয়ে করলে জাত খোয়াতে পারে, কিন্তু ধর্ম খোয়ায় না। সেই জন্যে পিতৃভূমি সপ্তসিন্ধুতে যুগ যুগান্তর থেকে নিবাস করা হিন্দুদের জন্যে --একই রক্তের ধারার শর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    (আগামী পর্বে সমাপ্ত)


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Faruk Munshi | ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:৩৬737689
  • উনার এজেন্ডা টা তাহলে কি ছিলো শেষপর্যন্ত ?
    এরকম ডক্টর জেকিল এন্ড মিস্টার হাইড সিনড্রোম কেনো ? 
  • albert banerjee | ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৩৯737705
  • আমার দৃষ্টিতে ভারতের বর্তমান ধর্মীয় সংকট কেবলমাত্র আধ্যাত্মিক বা সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব নয়; এটি মূলত একটি গভীর, ব্যবহৃত এবং প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণীসংকটেরই প্রকাশ। আমি মনে করি, ধর্ম এখানে একটি মাধ্যম, একটি ভাষা এবং একটি রাজনৈতিক অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা দেশের প্রকৃত বস্তুগত বৈষম্য, সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং উৎপাদন সম্পর্কগুলোর সংকটকে আড়াল করে, বিকৃত করে অথবা বৈধতা দেয়। আমি এই প্রবন্ধে যুক্তি দিতে চাই যে, হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের উত্থান থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতিকরণ এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা—এই সমস্ত কিছুই ভারতীয় পুঁজিবাদের বিকাশের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে শ্রেণীগত দ্বন্দ্বের প্রকাশভঙ্গি মাত্র, যেখানে ধর্মকে হেজিমনি নির্মাণ ও রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

    ১. তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট: ধর্ম, শ্রেণী এবং হেজিমনি

    আমার বিশ্লেষণের ভিত্তি হলো এই উপলব্ধি যে, সুপারস্ট্রাকচার (যেমন ধর্ম, সংস্কৃতি, জাতীয়তাবাদ) প্রায়ই বেস স্ট্রাকচারের (অর্থনৈতিক সম্পর্ক, উৎপাদন পদ্ধতি) প্রতিফলন ও সুরক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে। কার্ল মার্কসের "আফিম" এর সংজ্ঞাকে আমি সরলায়তন মনে করি না; বরং আমি এটাকে দেখি একটি জটিল সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে। অ্যান্টনিো গ্রামশির 'হেজিমনি' তত্ত্ব আমার এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক বলে আমি মনে করি। গ্রামশি যুক্তি দেন যে, শাসক শ্রেণী কেবল বলপ্রয়োগের (রাষ্ট্র, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা) মাধ্যমেই নয়, বরং সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য স্থাপনের মাধ্যমেও তার আধিপত্য বজায় রাখে। তারা এমন মূল্যবোধ, বিশ্বাস এবং ‘স্বাভাবিকতা’ এর ধারণা তৈরি করে, যা পুরো সমাজে ছড়িয়ে দেয় এবং যার ফলে তাদের আধিপত্য চ্যালেঞ্জ ছাড়াই মেনে নেওয়া হয়।

    ভারতের প্রেক্ষাপটে, আমি দেখি যে, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ এই হেজিমনি নির্মাণের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি একটি 'সর্বভারতীয়' হিন্দু পরিচয় তৈরি করতে চায়, যা অসংখ্য জাতি, বর্ণ, ভাষা, আঞ্চলিকতা এবং এমনকি শ্রেণীগত বিভাজনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের একত্রিত কর্পোরেট পরিচয় দেয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায়, এটি সমাজের গভীরে নিহিত শ্রেণীগত ও বর্ণগত বৈষম্যকে অস্পষ্ট করে দেয়। একজন দলিত কৃষক এবং একজন উচ্চবর্ণের পুঁজিপতির মধ্যে বিরাট বস্তুগত স্বার্থের সংঘাত থাকলেও, 'হিন্দু ঐক্য' এর ধারণা সেই সংঘাতকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু (মুসলমান, খ্রিস্টান) এর বিরুদ্ধে একটি 'সাধারণ শত্রু' তৈরির মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত করে। ফলে, উৎপাদন সম্পর্কের আসল সংকট (জমি, মজুরি, কাজের নিরাপত্তা) থেকে জনগণের রোষ ঘুরে যায় ধর্মীয় 'অপর' এর দিকে।

    ২. ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতিকরণ: শ্রেণীগত ভিত্তি

    আমার মতে, সমস্যার শিকড় ঔপনিবেশিক যুগে প্রোথিত। ব্রিটিশ রাজ তাদের ' ডিভাইড এন্ড রুল' নীতির অংশ হিসেবে হিন্দু ও মুসলমানকে পৃথক ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে শনাক্ত ও শক্তিশালী করে। কিন্তু আমি মনে করি, এই বিভাজন কেবলমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে ছিল না; এর একটি শক্তিশালী শ্রেণীগত মাত্রা ছিল। উদাহরণস্বরূপ, অনেক ক্ষেত্রে জমিদার শ্রেণী (হিন্দু ও মুসলমান উভয়ই) তাদের স্থানীয় শ্রেণীগত আধিপত্য বজায় রাখতে ঔপনিবেশিক শাসনের সাথে সহযোগিতা করে। আবার, শিক্ষা ও সরকারি চাকরির সুযোগ তৈরি হওয়ায়, একটি নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব হয়, যারা চাকরি ও সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা করতে থাকে। ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী এই প্রতিযোগিতাকে ধর্মীয় গোষ্ঠীগত প্রতিযোগিতায় রূপান্তরিত করার সুযোগ নেয়। এইভাবে, ধর্মীয় পরিচয়ের মাধ্যমে শ্রেণীগত অভিলাষ এবং ভয় চ্যানেলাইজড হতে থাকে। স্বাধীনতা সংগ্রামেও, আমি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থানকে সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় উন্মাদনা হিসেবে দেখি না; বরং আমি এটিকে বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর স্বার্থের সংঘাতের প্রকাশ হিসেবে দেখি, যা ধর্মের মুখোশ পরেছে।

    ৩. সমকালীন ভারত: নব্য-উদারবাদ, হিন্দুত্ব ও শ্রেণীসংকট

    ১৯৯০-এর দশক থেকে ভারতের অর্থনৈতিক নীতি আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। নব্য-উদারবাদী সংস্কার, বাজারমুখীকরণ এবং বিশ্বায়ন বিপুল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এনেছে, কিন্তু সেই সাথে নিয়ে এসেছে চরম বৈষম্য, কৃষি সংকট, এবং অস্থায়ী ও অনানুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রের ব্যাপক বিস্তার। আমি দেখি, এই অর্থনৈতিক পরিবর্তন একটি গভীর শ্রেণীসংকট তৈরি করেছে:

       বিপুল বৈষম্য: ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম বৈষম্যমূলক অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। দেশের সম্পদের একটি বিশাল অংশ হাতে কয়েকজনের। এই বৈষম্য সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয়।
       কৃষক ও গ্রামীণ সংকট: কৃষি ক্ষেত্র সংকটাপন্ন, লাখো কৃষক ঋণে জর্জরিত। তাদের রোষ এবং হতাশা একটি রাজনৈতিক প্রকাশ খুঁজছে।
       যুব বেকারত্ব: শিক্ষিত যুবকেরা উচ্চাশা নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে দেখেন পর্যাপ্ত চাকরি নেই। এই হতাশা এবং অনিশ্চয়তা একটি শক্তিশালী সামাজিক গতিশীলতা।
       নতুন মধ্যবিত্ত: নব্য-উদারবাদ একটি বৃহৎ, উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরি করেছে, যারা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত এবং সামাজিক অবস্থান নিয়ে শঙ্কিত।

    এখন, আমার প্রশ্ন হলো: এই প্রকট শ্রেণীগত সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার রাজনৈতিক প্রকাশ কীভাবে হচ্ছে? আমার পর্যবেক্ষণে, এটি সরাসরি 'শ্রেণী' এর ভাষায় প্রকাশ পাচ্ছে না; বরং প্রচণ্ডভাবে 'ধর্ম' ও 'জাতীয়তাবাদ' এর ভাষায় প্রকাশ পাচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এই শ্রেণীগত হতাশা ও ক্রোধকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের জারিতে ট্যাপ করে। তারা একটি বার্তা দেয়: "তোমাদের সমস্যার কারণ মুসলমানরা, যারা 'জাতির শত্রু'; কারণ খ্রিস্টান মিশনারিরা, যারা ধর্মান্তর করাচ্ছে; কারণ 'বহিরাগতরা'। তোমাদের প্রকৃত শত্রু বিপুল বৈষম্য বা বেকারত্ব নয়, বরং 'অসহিষ্ণু' সংখ্যালঘুরা এবং 'স্বাধীনতাবিরোধী' বুদ্ধিজীবীরা।"

    এভাবে, একজন বেকার যুবকের রোষ তার প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে পরিচালিত হওয়ার বদলে, একজন মুসলমান বা দলিত বা 'উদারপন্থী' এর বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। একজন ক্ষুদ্র কৃষকের ঋণের বোঝা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উন্মাদনায় ভুলে থাকার একটি সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়। কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিবর্তে, মানুষ 'লাভ জিহাদ' বা 'গো-হত্যা' এর বিরুদ্ধে মিছিলে নামে। আমি এটাকে দেখি একটি সুপরিকল্পিত 'প্রতিস্থাপন' কৌশল হিসেবে, যেখানে বস্তুগত বাস্তবতার সংকট প্রতিস্থাপিত হয় সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় সংকট দ্বারা।

    ৪. ধর্মীয় উগ্রবাদ বনাম শ্রেণী-বাস্তবতা: কিছু দৃষ্টান্ত

    আমি কয়েকটি ঘটনার মাধ্যমে আমার যুক্তি ব্যাখ্যা করতে চাই:

       সিএএ-এনআরসি বিতর্ক: নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) এর তীব্র বিরোধিতা ও সমর্থন আমি শুধুমাত্র ধর্মীয় বৈষম্যের লেন্স দিয়ে দেখি না। আমি দেখি এর একটি শক্তিশৈলী শ্রেণীগত মাত্রা। এনআরসির ভয়ে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ার কথা ছিল গরিব, অশিক্ষিত, প্রান্তিক মানুষ—হিন্দু, মুসলমান, দলিত, আদিবাসী সকলেরই, যাদের কাছে দলিল-দস্তাবেজের অভাব। কিন্তু রাজনৈতিক আলোচনা শুধুমাত্র ধর্মীয় বৈষম্যের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। এর মাধ্যমে, সকল ধর্মের গরিব মানুষের সাধারণ শ্রেণীগত দুর্বলতা ঢাকা পড়ে যায় ধর্মীয় বিভাজনের আড়ালে।

       গো-রক্ষা আন্দোলন: গো-হত্যা ও গো-রক্ষার নামে যে হিংসা, আমি তাতে কেবল ধর্মীয় সংবেদনশীলতা দেখি না। আমি দেখি একটি সংগঠিত অর্থনৈতিক লবির শক্তি, যা চামড়া ও মাংসের ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এছাড়াও, গরুকে কেন্দ্র করে হিংসা প্রায়ই মোবারক আনসারির মতো মুসলমান কসাই ও চামড়া শিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিকদের টার্গেট করে, যা একদিকে যেমন একটি পেশাগত শ্রেণীকে আক্রমণ, অন্যদিকে তাকে ধর্মীয় রূপ দেওয়া।

       দলিত-মুসলিম সম্পর্ক: প্রায়ই দেখা যায়, দলিত ও মুসলমান—উভয়ই ভারতের সবচেয়ে নিপীড়িত ও প্রান্তিক গোষ্ঠী—পরস্পর বিরোধী অবস্থানে থাকে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি উচ্চবর্ণের হিন্দুদের শোষণ থেকে দলিতদের রোষ ঘুরিয়ে দেয় মুসলমানদের দিকে। দলিতদের কাছে বার্তা দেওয়া হয় যে, তারা হিন্দু সমাজের 'অংশ', শুধু কিছু 'সংশোধন' প্রয়োজন; কিন্তু মুসলমানরা 'অন্য'। এভাবে, নিপীড়িতদের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শ্রেণীভিত্তিক জোট গড়ে উঠতে দেওয়া হয় না।

    ৫. উপসংহার: প্রকৃত সংকটের মুখোমুখি হওয়া

    সুতরাং, আমার দৃষ্টিতে, ভারতের ধর্মীয় সংকট একটি উপসর্গ মাত্র। প্রকৃত অসুখটি হলো শ্রেণীসংকট—একটি অসম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠকে বাদ দিয়ে চলেছে, একটি কৃষি ব্যবস্থা যা ভেঙে পড়ছে, এবং একটি উন্নয়ন মডেল যা কাজ ও মর্যাদার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা এই সংকটের জন্য একটি মিথ্যা, কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর সমাধান দেয় শাসকগোষ্ঠীর জন্য। এটি জনগণের দৃষ্টি ভিন্নদিকে ঘুরিয়ে দেয়, তাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে, এবং একটি কর্পোরেট-সহায়ক, উগ্র জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের জন্য জনসমর্থন জোগাড় করে, যা অর্থনৈতিক সংস্কারগুলোকে আরও গভীর করতে পারে।

    এই বিশ্লেষণ থেকে আমার কাছে যে সিদ্ধান্ত উঠে আসে, তা হলো: ভারতের ধর্মীয় সংকটের দুর্বিষহ রূপ মোকাবেলা করতে হলে, কেবল আন্তঃধর্মীয় সংলাপ বা সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের ডাকই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বস্তুগত বাস্তবতার সংকটের মুখোমুখি হওয়া। প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক ভাষা ও সংগঠন গড়ে তোলা, যা শ্রেণীগত ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টন, এবং সকলের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবনের দাবিকে সামনে আনতে পারে—হিন্দু, মুসলমান, দলিত, আদিবাসী, নারী, পুরুষ সকলেরই। যতদিন না শ্রেণীগত প্রশ্নগুলি প্রাধান্য পাচ্ছে, ততদিন ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি তার মারণাস্ত্র খুঁজে পেতেই থাকবে। ভারতের প্রকৃত সংকট মন্দির-মসজিদে নয়, বরং ক্ষুধা, বেকারত্ব, বৈষম্য এবং ন্যায়বিচারহীনতার খাতে প্রবাহিত হচ্ছে। সেটাকেই চিহ্নিত করা এবং মোকাবেলা করা আজ সবচেয়ে জরুরি কাজ।
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন