

আগের কিস্তিতেই বলেছিলাম যে এই সংজ্ঞাটি সাভারকরের রচনা, কিন্তু খুব মৌলিক নয়। এতে মনুস্মৃতির একটি শ্লোককে, যাতে আর্যাবর্তের ক্ষেত্র কতটা তার বর্ণনা রয়েছে, সামান্য বদলে নেওয়া হয়েছে এবং হিন্দু শব্দ জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
‘পূর্ব এবং পশ্চিম সাগরের অন্তর্বতী যে ভূমি দুই পর্বতের মধ্যে অবস্থিত, তাহাকেই বিদ্বদজ্জনেরা আর্যাবর্ত বলিয়া থাকেন’,(মনুস্মৃতি ২/২২)।
এবার উনি ‘পিতৃভূমি’ এবং ‘পুণ্যভূমি’র তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন।
সাভারকর বলছেন -- পিতৃভূমি অর্থ যে অঞ্চলে (সিন্ধুনদ থেকে সমুদ্র পর্য্যন্ত) পিতৃপুরুষ পরম্পরায় একটি জনগোষ্ঠী বাস করছে এবং যাদের মধ্যে একই রক্তধারা প্রবহমান তারাই হিন্দু। যদিও সাভারকর রচিত শ্লোকে রক্তধারার কথা বলা হয় নি, কিন্তু সাভারকর ব্যাখ্যা করেছেন যে অর্থে কেবল ভূখন্ড নয়, একই রক্তধারার ঐতিহ্যও বুঝতে হবে।
আবার পূণ্যভূ বা পূণ্যভূমি অর্থে কেবল ধর্ম অথবা ধর্মীয় আচার নয়, সেটা হিন্দুত্বের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা হবে।
বরং ধর্ম, রাষ্ট্রনীতি, শাসনপ্রণালী, জীবনযাপন পদ্ধতি মিলিয়ে সম্পূর্ণ সংস্কৃতির ইতিহাসকে ধরতে হবে। তাতে বিশেষ করে হিন্দু রাজাদের বীর্য এবং তার জোরে সাম্রাজ্যের বিস্তারের ইতিহাসের বিশেষ প্রাধান্য থাকবে।
এই কারণেই তিলকের দেওয়া সংজ্ঞাটি, সাভারকরের মতে, হিন্দুধর্মের জন্যে সবচেয়ে কার্যকরী হলেও ‘হিন্দুত্ব’এর জন্য সংকীর্ণ।
‘ প্রামাণ্যবুদ্ধির্বেদেষু সাধনানামনেকতা,
উপাস্যানামনিয়ম এতদ্ধর্মস্য লক্ষণম্’।
বেদে আস্থা, পূজার্চনার বিবিধতা এবং কোন এক বাঁধাধরা নিয়মের অভাব—এই হল হিন্দুধর্মের বৈশিষ্ট্য।
এইজন্যেই বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যকে খারিজ করতে হবে। এই বিশ্বধর্ম যতই মহান হোক, অহিংসার ভুল নীতিশিক্ষা দিয়ে তলোয়ারের বদলে জপমালা ধরিয়ে আমাদের অসহায় নিবীর্য করে দিয়েছিল। তাই রাজনৈতিক কারণেই বৌদ্ধধর্ম এদেশ থেকে উঠে গেল।
সাভারকর উদ্ধৃত করছেন একেবারে অন্যপ্রসংগে লেখা বিদ্যাসাগরের সতীর্থ বাংলার তারানাথ তর্কবাচস্পতির একটি লাইন যাতে উনি হিন্দু ও যবনকে একেবারে বিপরীত মেরুর ধরেছেন—“ শিব শিব! না হিন্দুর না যবনের!”
পিতৃভূমি বোঝা গেল—রাষ্ট্র এবং জাতির বসবাসের জন্যে পরম্পরাগত ভূখণ্ড।
কিন্তু রক্তধারা?
সাভারকর এই পরিচ্ছেদের নাম দিয়েছেন Bond of Common Blood, বলছেন বুঝতে হবে কেন হিন্দু হতে গেলে বাপ-পিতামোর আমল থেকে ভারত নামের একটি নির্দিষ্ট ভুখণ্ডে বসবাস করছি পরিচয় যথেষ্ট নয়, হতে হবে একই শোণিতাস্রোতের বন্ধনে বাঁধা।
‘হিন্দুরা মাত্র ভারতের নাগরিকই নয়, এবং শুধু মাতৃভূমির ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধই নয়, তারা একই রক্তধারার ঐতিহ্যের বন্ধনে আবদ্ধও বটে। They are not only a Nation but also a race (jati)।
উল্লেখযোগ্য, যে একই সময়ে, মানে ১৯২০-৪০ কালখণ্ডে জনৈক অ্যাডলফ হিটলার-- আর্যজাতি, আর্যরক্তের বিশুদ্ধতা এবং তার সঙ্গে রাষ্ট্রের বিকাশ এবং সুরক্ষা নিয়ে তথা বীর্যবান রাষ্ট্রের অবধারণা নিয়ে-- ইউরোপ এবং ক্রমশঃ গোটা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।
সাভারকরের মতে সমস্ত হিন্দুজাতি সেই সিন্ধুদেশ এবং বৈদিক কাল থেকে পিতৃপুরুষ ক্রমে একই রক্তধারার বন্ধনে আবদ্ধ। যদি কেউ প্রশ্ন করে যে সত্যিই কি সমস্ত হিন্দুদের শিরায় একই রক্তের ধারা বইছে? তাদের কি একটি জাতি বলা যায়? তো সাভারকরের উত্তর হল— আজকের বিশ্বে ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, জার্মান বা চাইনিজদের রক্তও কি আগের মত শুদ্ধ রয়েছে? ওরা যদি জাতি হয় তো হিন্দু কেন নয়?
তারপর সাভারকর মনুস্মৃতির উদাহরণ দিয়ে বললেন যে প্রাচীন অনুলোম এবং প্রতিলোম বিবাহের নিয়মে উচ্চবর্ণের পুরুষ নিম্নবর্ণের নারীকে বিয়ে করতে পারত এবং উল্টোটাও হত। কিন্তু সবাই তো বৃহৎ হিন্দুজাতিই। ব্রাহ্মণ থেকে চণ্ডাল সবার মধ্যে একই রক্তের ধারা বইছে।
ওই জাতপাতের আঁটাপত্তি ছিল বিদেশীদের রক্ত (ম্লেচ্ছ, যবন) ঢুকতে না দেওয়ার জন্যে। তাই বৌদ্ধধর্মও দেশ থেকে জাতিভেদ দূর করতে পারেনি। আর ইউরোপিয় পণ্ডিতরা ভারতের জাতপাতের ভূমিকাটি ঠিক ধরতে পারে না।
ব্রাহ্মণ এবং চণ্ডাল, দ্রাবিড় এবং নমশূদ্র—সব হিন্দু। মহাভারত থেকে উনি নিয়োগ প্রথা, কর্ণ, বভ্রুবাহন, ঘটোৎকচ এবং বিদুরের জন্মবৃত্তান্তের উল্লেখ করে বললেন—সবই হিন্দু রক্ত।
রাক্ষস, যক্ষ, বানর, কিন্নর, শিখ, জৈন , আইয়ার –সবই হিন্দু রক্ত। আমরা শুধু নেশন নই, আমরা একটি জাতি।
এরপর উনি কিন্তু বিরাট ডিগবাজি খেলেন।
“আসলে সমগ্র বিশ্বে একটাই জাতি—মানব জাতি। একটাই শোণিত বহমান –মানব রক্ত। বাকি সব রক্তের বন্ধন কাজচালানোর জন্যে--provisional, a make shift and only relatively true. Nature is constantly trying to overthrow the artificial barriers between race and race. To try to prevent the commingling of blood is to build on sand. Sexual attraction has proved more powerful than all the commands of all the prophets put together”।
যা বাব্বা! তাহলে এতক্ষণ ধরে কী সব বলছিলেন? কিন্তু উনি থামতে পারেন না। বললেন—আন্দামানের আদি বাসিন্দেদের শরীরেও কয়েক ফোঁটা আর্য রক্ত রয়েছে এবং এর উল্টোটাও সত্যি। ইতিহাসের সাক্ষ্য আমাদের শুধু এইটুকু বলার অধিকার দেয় যে আমাদের শরীরে সমস্ত মানবজাতির রক্ত বহমান। এক মেরু থেকে অন্য মেরু পর্য্যন্ত মানবজাতির এই মৌলিক ঐক্যটুকুই সত্য। বাকিসব আপেক্ষিক সত্য।
এত একেবারে ঘেঁটে ঘ!
কিন্তু পরিচ্ছেদের শেষে গিয়ে ফের কেঁচে গণ্ডুষ।
কিন্তু আপেক্ষিক অর্থেও, বিশ্বে শুধু হিন্দুদের , হয়ত ইহুদিদেরও, রক্ত অন্য সমস্ত জাতির চেয়ে শুদ্ধ। হিন্দুর ছেলেমেয়েরা অন্য জাতিতে বিয়ে করলে জাত খোয়াতে পারে, কিন্তু ধর্ম খোয়ায় না। সেই জন্যে পিতৃভূমি সপ্তসিন্ধুতে যুগ যুগান্তর থেকে নিবাস করা হিন্দুদের জন্যে --একই রক্তের ধারার শর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
(আগামী পর্বে সমাপ্ত)