এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  •  ফাজি লজিক: রাজার নতুন শিক্ষানীতি  অধ্যায় ১: ফাজি লজিক কী? — AI

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৪৪ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • 1 | 2 | 3 | 4
    লিলির গরম-ঠাণ্ডার গল্প

    আগের বার রাজা সেট থিওরি আর বুলিয়ান বীজগণিত শেখার পর খুব খুশি হয়েছিলেন। লিলি আর মিমি এখন ওস্তাদ হয়ে গেছে। তারা বুঝতে শিখেছে, সত্যি আর মিথ্যা, ০ আর ১ — এই দুইয়ের মধ্যে পুরো পৃথিবীকে ফেলা যায় না। কিন্তু রাজা শুনলেন, পৃথিবীতে আরও এক ধরনের লজিক আছে — ফাজি লজিক। যেখানে সত্য আর মিথ্যার মাঝখানেও অনেক কিছু আছে।

    রাজা আবার শিক্ষামন্ত্রীকে ডেকে বললেন, "মন্ত্রী মহোদয়, এবার আপনি ফাজি লজিকের ওপর একটা বই বানান। ১৫টা অধ্যায় হবে, গল্পের মতো সহজ হবে, আর লিলি আর মিমি যেন সেটা পড়ে বুঝতে পারে। প্রথম অধ্যায়টা যেন খুব মজা হয়, যেখানে তারা বুঝতে পারে কেন আমাদের শুধু ০ আর ১-এর চেয়ে বেশি কিছু দরকার।"

    শিক্ষামন্ত্রী আবার সেই সেরা শিক্ষক আর গণিতবিদদের ডাকলেন। তারা মিলে বানালেন এই বইয়ের প্রথম অধ্যায়। চলুন দেখি, তাঁরা কী বানালেন।

     সন্ধেবেলার ঘটনা

    সেদিন সন্ধেবেলা লিলি তার মায়ের কাছে গিয়ে বলল, "মা, আমি এক কাপ চা খাব।"

    মা বললেন, "আচ্ছা, বানিয়ে দিচ্ছি।"

    লিলি বলল, "কিন্তু খুব গরম না, আবার খুব ঠাণ্ডাও না — ঠিক মাঝারি গরম হতে হবে।"

    মা হাসলেন। তিনি বললেন, "এই 'মাঝারি গরম' কথাটাই হলো ফাজি লজিকের শুরু।"

    ঠিক তখন মিমি ঘরে ঢুকল। সে বলল, "ফাজি লজিক? ওটা আবার কী?"

    মা বললেন, "তোরা বুলিয়ান বীজগণিত শিখেছিস, তাই না? সেখানে সব কিছুর মান হয় ০ আর ১ — হয় সত্যি, না হয় মিথ্যা। কিন্তু বাস্তব জীবনে অনেক জিনিসই পুরোপুরি সত্যি বা পুরোপুরি মিথ্যা হয় না। যেমন চায়ের তাপমাত্রা — সেটা 'একটু গরম', 'বেশি গরম', 'হালকা গরম' হতে পারে। এগুলো সবই মাঝামাঝি অবস্থা।"

    লিলি বলল, "মানে শুধু গরম-ঠাণ্ডা না, মাঝের কথাও বলা যায়?"

    মা বললেন, "ঠিক। ফাজি লজিকে যেকোনো মান ০ থেকে ১-এর মধ্যে হতে পারে। ০ মানে পুরোপুরি মিথ্যা, ১ মানে পুরোপুরি সত্যি, আর মাঝখানের মানগুলো আংশিক সত্যি।"

     চায়ের কাপের গণিত

    মা তাদের চায়ের কাপ দিয়ে বোঝাতে লাগলেন। তিনি বললেন, "ধরো, চায়ের তাপমাত্রা ০ ডিগ্রি মানে পুরোপুরি ঠাণ্ডা, আর ১০০ ডিগ্রি মানে পুরোপুরি গরম (ফুটন্ত)। এখন ৫০ ডিগ্রি হলো মাঝামাঝি — পুরোপুরি গরম না, আবার পুরোপুরি ঠাণ্ডাও না।"

    লিলি বলল, "বুলিয়ান লজিকে ৫০ ডিগ্রিকে কী বলব?"

    মা বললেন, "বুলিয়ান লজিকে তাকে ঠাণ্ডাও বলা যায় না, গরমও বলা যায় না। আসলে বুলিয়ান লজিক এই মাঝামাঝি জিনিসগুলো সামলাতে পারে না। সেজন্যই ফাজি লজিক দরকার।"

    মিমি বলল, "তাহলে ফাজি লজিকে ৫০ ডিগ্রির মান কত?"

    মা বললেন, "এটা নির্ভর করে তুই কীভাবে 'গরম' আর 'ঠাণ্ডা' ডিফাইন করছিস। যেমন তুই বলতে পারে, ০ ডিগ্রিতে ঠাণ্ডা = ১, গরম = ০; ১০০ ডিগ্রিতে ঠাণ্ডা = ০, গরম = ১; ৫০ ডিগ্রিতে ঠাণ্ডা = ০.৫, গরম = ০.৫।"

    লিলি লিখে ফেলল:
    - ০°C → ঠাণ্ডা = ১.০, গরম = ০.০
    - ২৫°C → ঠাণ্ডা = ০.৭৫, গরম = ০.২৫
    - ৫০°C → ঠাণ্ডা = ০.৫, গরম = ০.৫
    - ৭৫°C → ঠাণ্ডা = ০.২৫, গরম = ০.৭৫
    - ১০০°C → ঠাণ্ডা = ০.০, গরম = ১.০

    মিমি বলল, "ওহ! তাহলে ৫০ ডিগ্রি আধা গরম, আধা ঠাণ্ডা!"

    মা বললেন, "ঠিক। ফাজি লজিক এভাবেই কাজ করে।"

     ফাজি শব্দের মানে

    লিলি বলল, "মা, 'ফাজি' শব্দের মানে কী?"

    মা বললেন, "ইংরেজি 'ফাজি' মানে ঝাপসা, অস্পষ্ট, পরিষ্কার না। ফাজি লজিক হলো সেই লজিক যা অস্পষ্ট জিনিসগুলো নিয়ে কাজ করে। যেমন 'একটু গরম', 'বেশি ঠাণ্ডা', 'খুব লম্বা', 'সামান্য ছোট' — এই কথাগুলো অস্পষ্ট। তুমি 'খুব লম্বা' বললে কত সেমি বোঝায়? সেটা সবাই একরকম বুঝে না। ফাজি লজিক সেই অস্পষ্টতাকে গাণিতিক রূপ দেয়।"

    মিমি বলল, "মানে ফাজি লজিক আমাদের মনের মতো করে চিন্তা করতে পারে?"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক এভাবেই কাজ করে। তুমি যখন বলো 'আজ একটু গরম লাগছে', তখন তোমার মস্তিষ্ক একটা ফাজি মান বের করছে।"

    লিলি বলল, "বাহ! তাহলে ফাজি লজিক মানুষের কাছাকাছি!"

     জর্জ ভন নিউম্যান আর লোটফি জাদেহ

    মা তাদের ফাজি লজিকের ইতিহাস বলতে লাগলেন। তিনি বললেন, "বুলিয়ান লজিক আবিষ্কার করেন জর্জ বুল, প্রায় ২০০ বছর আগে। তারপর জর্জ ভন নিউম্যান আর অ্যালান টুরিং সেই লজিক দিয়ে কম্পিউটার বানান। কিন্তু তারা বুঝতে পারছিলেন, বাস্তব জগতের সব সমস্যা শুধু ০ আর ১ দিয়ে সমাধান করা যায় না।"

    মিমি বলল, "তাহলে কে আবিষ্কার করল ফাজি লজিক?"

    মা বললেন, "১৯৬৫ সালে আজারবাইজানি-আমেরিকান বিজ্ঞানী লোটফি জাদেহ ফাজি লজিকের ধারণা দেন। তিনি দেখান, কীভাবে অস্পষ্ট ধারণাগুলোকে গণিতের ভাষায় লেখা যায়। প্রথমে সবাই হেসেছিল, কেউ গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু এখন ফাজি লজিক বিশ্বের সব জায়গায় ব্যবহার হচ্ছে — ওয়াশিং মেশিন, ক্যামেরা, ট্রেন, লিফট — সব জায়গায়।"

    লিলি বলল, "তিনি অনেক বড় বিজ্ঞানী!"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। তিনি ২০১৭ সালে মারা যান, কিন্তু তার আবিষ্কার পৃথিবী বদলে দিয়েছে।"

     বুলিয়ান আর ফাজি — প্রথম তুলনা

    মা একটা ছক এঁকে তুলনা করলেন:

    | বিষয় | বুলিয়ান লজিক | ফাজি লজিক |
    |------|--------------|-----------|
    | মান | শুধু ০ আর ১ | ০ থেকে ১-এর যেকোনো মান |
    | সত্যতা | সম্পূর্ণ সত্য বা মিথ্যা | আংশিক সত্য |
    | ঠাণ্ডা-গরম | ঠাণ্ডা বা গরম | একটু গরম, বেশি গরম, হালকা গরম |
    | লম্বা-খাটো | লম্বা বা খাটো | খুব লম্বা, মাঝারি লম্বা, সামান্য খাটো |
    | দূরত্ব | কাছে বা দূরে | একটু কাছে, অনেক দূরে, হাতের কাছে |

    মিমি বলল, "বুলিয়ান লজিক কঠিন সিদ্ধান্তের জন্য, আর ফাজি লজিক নমনীয় সিদ্ধান্তের জন্য?"

    মা বললেন, "ঠিক। দুই জায়গায় দুই ধরনের লজিক লাগে।"

     লিলির নিজের উদাহরণ — বন্ধুত্বের মাত্রা

    লিলি তার নিজের জীবন থেকে ফাজি লজিকের উদাহরণ বের করতে লাগল।

    সে লিখল:
    "আমার বন্ধুদের মধ্যে কেউ খুব কাছের, কেউ মাঝারি, কেউ শুধু পরিচিত। বুলিয়ান লজিকে বন্ধু মানে হয় বন্ধু (১) না হয় বন্ধু না (০)। কিন্তু বাস্তবে তো এরকম না।"

    সে তার বন্ধুদের একটা তালিকা বানাল:
    - রিয়া: খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু → ১.০
    - মিতা: ভালো বন্ধু → ০.৮
    - সুমি: মাঝারি বন্ধু → ০.৫
    - তিথি: সামান্য পরিচিত → ০.২
    - নিশা: শুধু নাম চেনে → ০.১
    - পলি: শত্রু → ০.০

    মিমি বলল, "এটাকে ফাজি সেট বলে?"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। ফাজি সেট হলো এমন সেট যেখানে প্রত্যেক উপাদানের একটা মাত্রা থাকে, কতটুকু সে সেটের মধ্যে আছে। এই মাত্রাকে বলে মেম্বারশিপ ডিগ্রি।"

    লিলি বলল, "তাহলে রিয়ার মেম্বারশিপ ডিগ্রি ১.০, নিশার ০.১?"

    মা বললেন, "ঠিক।"

     আরও উদাহরণ — লম্বা হওয়ার মাত্রা

    মিমি তার নিজের উদাহরণ দিল:

    "আমরা স্কুলে লম্বা ছাত্রদের দলে নেওয়া হয়। কিন্তু 'লম্বা' মানে কত? ১৪০ সেমি কি লম্বা? ১৫০ সেমি কি লম্বা?"

    সে একটা মেম্বারশিপ ফাংশন বানাল:
    - ১৪০ সেমি → ০.০ (একদম লম্বা না)
    - ১৫০ সেমি → ০.৩ (একটু লম্বা)
    - ১৬০ সেমি → ০.৬ (মাঝারি লম্বা)
    - ১৭০ সেমি → ০.৯ (বেশ লম্বা)
    - ১৮০ সেমি → ১.০ (পুরোপুরি লম্বা)

    লিলি বলল, "এটা অনেকটা গ্রাফের মতো। আমরা যদি ছবি আঁকি, তাহলে একটা ঢালু রেখা পাব।"

    মা বললেন, "ঠিক। এই ঢালু রেখাটাই মেম্বারশিপ ফাংশন। এটা বলে দেয়, একটা ইনপুটের জন্য আউটপুট কত হবে।"

     আরেকটা উদাহরণ — বৃষ্টির সম্ভাবনা

    মা তাদের আরেকটা উদাহরণ দিলেন:

    "আবহাওয়ার খবরে বলে, 'আজ বৃষ্টির সম্ভাবনা ৭০%'। বুলিয়ান লজিকে বৃষ্টি হয় (১) না হয় না (০)। কিন্তু ৭০% মানে পুরোপুরি না, পুরোপুরি হ্যাঁ-ও না। এটা একটা ফাজি মান।"

    মিমি বলল, "তাহলে ৭০% মানে ০.৭?"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। ফাজি লজিকে সম্ভাবনাকে ০ থেকে ১-এর মধ্যে প্রকাশ করা যায়।"

    লিলি বলল, "তবে কি সম্ভাবনা আর ফাজি একই জিনিস?"

    মা বললেন, "না, একদম না। সম্ভাবনা বলে একটা ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কতটুকু। ফাজি বলে একটা জিনিসের ধর্ম কতটুকু সত্যি। যেমন 'বৃষ্টি হচ্ছে' — এটা একটা ধর্ম, আর 'বৃষ্টি হবে' — এটা একটা সম্ভাবনা। দুটো আলাদা।"

     ফাজি লজিকের দর্শন

    মা তাদের ফাজি লজিকের দর্শন বুঝাতে লাগলেন। তিনি বললেন, "প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল বলতেন, একটা বক্তব্য হয় সত্যি না হয় মিথ্যা। এর মাঝে কিছু নেই। এটা হলো দ্বি-মূল্য যুক্তি। বহু শতাব্দী ধরে পাশ্চাত্য দর্শন এই ধারণায় চলেছে।"

    মিমি বলল, "কিন্তু এরিস্টটল কি ভুল ছিলেন?"

    মা বললেন, "ভুল না, কিন্তু অসম্পূর্ণ। পৃথিবীর অনেক জিনিসই দ্বি-মূল নয়। যেমন 'সুখী' — তুমি কি পুরোপুরি সুখী নাকি পুরোপুরি অসুখী? নিশ্চয়ই মাঝামাঝি কিছু।"

    লিলি বলল, "প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে তো 'নেহি নেহি' বলে কিছু আছে — 'এটাও না, ওটাও না'। সেটা কি ফাজি?"

    মা বললেন, "হ্যাঁ, অনেকটা সেরকম। বৌদ্ধ দর্শনে 'মধ্যম পন্থা'র কথাও আছে — চরমের মাঝে পথ। ফাজি লজিকও তাই।"

     বাস্তব জীবনে ফাজি

    মা তাদের বাস্তব জীবনের আরও কিছু উদাহরণ দিলেন:

    ১. রান্না: "একটু লবণ দাও", "আরেকটু ঝাল দাও" — এসব নির্দেশনা ফাজি।

    ২. পোশাক: "একটু ঢিলে", "একটু টাইট" — ফাজি।

    ৩. স্বাস্থ্য: "একটু জ্বর", "বেশি কাশি" — ফাজি।

    ৪. আবহাওয়া: "হালকা বৃষ্টি", "মাঝারি কুয়াশা" — ফাজি।

    ৫. অর্থনীতি: "সামান্য মূল্যস্ফীতি", "মন্দা" — ফাজি।

    মিমি বলল, "আমরা প্রতিদিনই ফাজি ভাষায় কথা বলি, অথচ বুঝতে পারতাম না!"

    লিলি বলল, "হ্যাঁ। আমাদের ভাষার বেশিরভাগ শব্দই আসলে ফাজি।"

     ফাজি লজিকের প্রয়োজনীয়তা

    মা বললেন, "এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ফাজি লজিক কেন দরকার? বুলিয়ান লজিক দিয়ে তো কম্পিউটার চলে।"

    লিলি বলল, "কম্পিউটার তো বাইনারি ০ আর ১ দিয়ে চলে। তাহলে ফাজি লজিক কোথায় লাগে?"

    মা বললেন, "কম্পিউটারের প্রসেসর বাইনারি, সেটা ঠিক। কিন্তু কম্পিউটার যখন বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তখন তার ফাজি জিনিস বুঝতে হয়। যেমন — স্মার্ট ওয়াশিং মেশিন। ওয়াশিং মেশিনের সেন্সর কাপড়ের নোংরামি মাপে। নোংরামি একটা ফাজি ধারণা। মেশিন সেই ফাজি মান নিয়ে হিসেব করে, কত মিনিট ধোয়া দরকার, কত পানি দরকার।"

    মিমি বলল, "তাহলে ফাজি লজিক মেশিনকে 'মানুষের মতো' চিন্তা করতে সাহায্য করে?"

    মা বললেন, "ঠিক। মেশিনকে মানুষের কাছাকাছি আনার জন্যই ফাজি লজিক।"

     ফাজি লজিকের প্রথম গাণিতিক রূপ

    মা এবার একটু গাণিতিক রূপ দেখালেন। তিনি বললেন, "ফাজি লজিকে একটা ভেরিয়েবলের মান ০ থেকে ১-এর মধ্যে হয়। যেমন তাপমাত্রা T = ০.৬ মানে 'একটু গরম'। এই মান নিয়ে আমরা কাজ করতে পারি।"

    তিনি লিখলেন:
    - যদি A = ০.৭ আর B = ০.৮ হয়, তাহলে:
       A AND B = min(A, B) = ০.৭
       A OR B = max(A, B) = ০.৮
       NOT A = ১ - A = ০.৩

    লিলি বলল, "মিন আর ম্যাক্স দিয়ে AND-OR করা যায়?"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। এটা ফাজি লজিকের সবচেয়ে সহজ রূপ। কিন্তু আরও অনেক উপায় আছে।"

    মিমি বলল, "এটা বুলিয়ান লজিকের মতোই, কিন্তু সংখ্যাগুলো ০ আর ১-এর মধ্যে।"

    মা বললেন, "ঠিক। ফাজি লজিক বুলিয়ান লজিকের বর্ধিত রূপ।"

     লিলির প্রথম ফাজি হিসেব

    লিলি নিজে একটা ফাজি হিসেব করল। সে ধরল:
    - চায়ের তাপমাত্রা = ০.৬ (একটু গরম)
    - চায়ে দুধের পরিমাণ = ০.৪ (একটু কম দুধ)

    সে বের করল:
    - চা গরম আর দুধ আছে কিনা (AND) = min(০.৬, ০.৪) = ০.৪
    - চা গরম অথবা দুধ আছে (OR) = max(০.৬, ০.৪) = ০.৬
    - চা গরম না (NOT) = ১ - ০.৬ = ০.৪

    মিমি বলল, "তাহলে চা গরম আর দুধ আছে — এর মান ০.৪, মানে 'মাঝারি সত্যি'?"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। ফাজি লজিকে সত্যি কেবল ০ আর ১ না, মাঝামাঝিও সত্যি হতে পারে।"

     রাতের খাবারের মজা

    রাতে খাবার টেবিলে লিলি আর মিমি তাদের বাবাকে ফাজি লজিক শেখাতে লাগল।

    লিলি বলল, "বাবা, তুমি কি জানো ফাজি লজিক কী?"

    বাবা বললেন, "না তো, বলো দেখি।"

    লিলি বলল, "ফাজি লজিক হলো অস্পষ্ট জিনিসের গণিত। যেমন তুমি বললে 'আজ একটু ক্লান্ত লাগছে' — এই 'একটু ক্লান্ত' হলো ফাজি। বুলিয়ান লজিকে ক্লান্ত (১) না ক্লান্ত না (০) — মাঝামাঝি কিছু নেই।"

    মিমি বলল, "আমরা আজ শিখলাম, ফাজি লজিকে ০ থেকে ১-এর মধ্যে যেকোনো মান হতে পারে। যেমন ০.৫ মানে আধা-ক্লান্ত!"

    বাবা হাসলেন। তিনি বললেন, "তা হলে আমি আজ ০.৭ ক্লান্ত!"

    সবাই খুব আনন্দ করল।

     শোওয়ার আগে

    রাতে শোওয়ার আগে লিলি আর মিমি তাদের আজকের পড়া রিভাইজ করল।

    লিলি লিখল:
    - ফাজি লজিক = অস্পষ্ট জিনিসের গণিত
    - লোটফি জাদেহ ১৯৬৫ সালে আবিষ্কার করেন
    - এখানে মান ০ থেকে ১-এর মধ্যে হয়
    - ০ = পুরোপুরি মিথ্যা, ১ = পুরোপুরি সত্যি
    - মাঝের মান = আংশিক সত্যি
    - ফাজি সেট = প্রত্যেক উপাদানের মেম্বারশিপ ডিগ্রি থাকে
    - ফাজি AND = min(A,B)
    - ফাজি OR = max(A,B)
    - ফাজি NOT = ১ - A

    মিমি লিখল:
    - উদাহরণ: চায়ের তাপমাত্রা (০.৬ গরম), বন্ধুত্বের মাত্রা (রিয়া ১.০, নিশা ০.১)
    - বাস্তব জীবনের অনেক জিনিস ফাজি: একটু গরম, সামান্য লম্বা, খুব বেশি
    - ফাজি লজিক মেশিনকে মানুষের কাছাকাছি আনে

    লিলি বলল, "কাল আমরা ফাজি সেট নিয়ে বিস্তারিত শিখব। সেটা আরও মজা হবে।"

    মিমি বলল, "মানে কীভাবে সব জিনিসের মাত্রা বের করতে হয়?"

    লিলি বলল, "হ্যাঁ।"

    তারা ঘুমিয়ে পড়ল।

    টিপস

    তোমরাও লিলি আর মিমির মতো ফাজি লজিকের প্রথম অধ্যায় শিখে ফেললে। এখন তুমি জানো, পৃথিবীটা শুধু সাদা-কালো না — অনেক ধূসরও আছে।

    তোমার চারপাশ থেকে ফাজি ধারণার উদাহরণ বের করতে পারো। যেমন:

    - তুমি আজ কতটা খুশি? (০ = একদম না, ১ = পুরোপুরি, মাঝে = ০.৩, ০.৭ ইত্যাদি)
    - তুমি আজ কতটা ক্লান্ত?
    - তোর প্রিয় খাবারটা কতটা পছন্দ?
    - আজকের রোদ কতটা তীব্র?
    - তোর বন্ধুটা কতটা ভালো?

    এভাবে প্রতিদিন ১০টা করে ফাজি মান বের করার অভ্যাস করো। তাহলে ফাজি লজিক তোমার জন্য খুব সহজ হয়ে যাবে।

    মনে রেখো:
    - ফাজি মানে অস্পষ্ট, ঝাপসা
    - ফাজি লজিকে ০ আর ১-এর মাঝের সব মান বৈধ
    - ফাজি সেটে প্রত্যেক জিনিসের একটা মাত্রা থাকে
    - ফাজি AND = ছোট মান
    - ফাজি OR = বড় মান
    - ফাজি NOT = ১ থেকে বিয়োগ

     শেষ কথা

    এই অধ্যায়ে আমরা শিখলাম ফাজি লজিকের মৌলিক ধারণা। আমরা জানলাম, এটা শুধু ০ আর ১-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না — এখানে অসংখ্য মাঝামাঝি মান থাকতে পারে। আমরা জানলাম লোটফি জাদেহর কথা, যিনি এই অস্পষ্ট জগতকে গণিতের ভাষায় লেখার পথ দেখিয়েছিলেন। আমরা দেখলাম, বাস্তব জীবনের কত জিনিস আসলে ফাজি — বন্ধুত্ব, লম্বা হওয়া, গরম-ঠাণ্ডা, এমনকি আমাদের অনুভূতিও।

    পরের অধ্যায়ে আমরা শিখব ফাজি সেট। সেখানে আমরা দেখব, কীভাবে একটা সেটের মধ্যে জিনিসগুলোর বিভিন্ন মাত্রা থাকতে পারে।

    ততক্ষণে, তোমরা নিজেরা নিজেদের জীবন থেকে ফাজি ধারণার উদাহরণ বের করতে থাকো। 
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    1 | 2 | 3 | 4
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Anindya Rakshit | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:১৬738707
  • আমার মতো কম্পিউটার-আকাটের মাথায়ও একটু যেন ঢুকছে। 
  • albert banerjee | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৪738708
  • বাচ্চা গুলো বুজতে পারবে তো? তাদের হাতে যাবে তো 
     
  • Anindya Rakshit | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:০৫738710
  • বাচ্চারা কম্পিউটর ব্যাপারটা আমার থেকে অনেক বেশি ভালো বোঝে। আমার তো মনে হয়, এই লেখা তাদের কাছে joy learning হবে। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন