এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • অন্তর্বাসঃ গল্প 

    রানা সরকার লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৬০ বার পঠিত
  • সময়টা তখন গত শতাব্দীর নয়ের দশকের শুরুর দিক। মাষ্টারমশাইদের মাইনে তখনও ততো বাড়েনি যার জন্য সমাজে ও বিবাহের ক্ষেত্রে তাদের অর্থনৈতিক মূল্য বৃদ্ধি পাবে। আর প্রাইমারীতে তো মাইনে আরও কম ছিল।

    হ্যাঁ, তখন যদিও অনেকে তাদের মান্যিগুন্যি করতেন বটে, দরকারে অদরকারে সাহায্য সহযোগিতা, এমনকি এলাকাগতভাবে নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ বা তবলা সঙ্গত করেও কেউ কেউ আদায় করে নিতেন প্রাপ্য সম্মান ও সম্ভ্রম। তার মধ্যে কিছু মাষ্টারমশাই আবার তাঁদের সৃষ্টিশীল লেখনীর জোরে কোনও কোনও বৃহৎ প্রকাশনার শারদীয়া সংখ্যায় লিখে লিখে যুগপৎ কাঞ্চন লাভ ও নায়কোচিত সম্মান আর খ্যাতি অনেক বেশি মাত্রায় পেতেন এলাকার শিক্ষিত মানুষজনদের থেকে।

    ফেসবুক, অর্কুট, ইন্সটাগ্রাম তো দুরস্থান, কেবল টিভির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়নি তখনও। ছিল, বেশ কিছু বাড়িতে কালার টিভি সঙ্গে কেবলের লাইন ছিল; ক্লাবে। তখন একসঙ্গে খেলা দেখবার একটা চল ছিল।  

    তবে তার মধ্যে কারু কারু হাত থেকে এমনসব গল্প, উপন্যাস বেরিয়ে আসছিল, যে মাষ্টারি করার থেকে গল্প-উপন্যাস লেখা, লাইব্রেরীতে তৎসংক্রান্ত বইপত্র দীর্ঘ সময় ধরে পড়া, চাকরির সুবাদে বা ছুটির দিনে নানান জায়গায় ঘুরে ঘুরে সেখানকার লোককথা উপকথা থেকে শুরু করে নানান ধর্মের, বর্ণের, বিত্তের, শিক্ষার মানুষজনদের সঙ্গে মিলেমিশে গিয়ে আশ্চর্য সব গল্প উপন্যাস তুলে এনে তাঁরা চমকে দিচ্ছিলেন পাঠকবর্গকে।
     
     সেইরকমই ছিলেন আমাদের প্রাইমারী স্কুলের মাষ্টার শ্যামলবাবু; শ্যামল সরকার।

    পোশাক আশাকে বাহুল্যমাত্র নেই। মেদবহুল চেহারা। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মাথায় ঢেউ খেলানো চুল। থেকে থেকে পান চিবোনো আর সিগ্রেট ফোঁকা, আর গরম বা পূজোর ছুটিতে অফবিট জায়গায় ঘুরতে গিয়ে সেখানকার ছবি আর গালগল্প জুড়ে দিতেন টিচার্স রুমে। আর আমরা অবাক হয়ে সেসব গিলতাম।

    আমি তখন সেই স্কুলের করণিক হিসেবে কাজ করতাম। অন্যসব শিক্ষক শিক্ষিকারা যেখানে হপ্তায় অন্তত তিন-চারবার তাদের কটা ছুটি বাকি আছে, সি এল, ই এল, তারপর ক্লাসের সংখ্যা কেন অন্যের থেকে বেশি হল, সঙ্গে আরও নানান বিষয় নিয়ে অভিযোগ অনুযোগ জানাতেন, সেখানে শ্যামলবাবু সেসবের ধার দিয়েও যেতেন না। 
     
    জিজ্ঞাসা করলে বলতেন – চুরি তো আর করছি না। মাঝেমধ্যে ডুব দিচ্ছি, এই যা। কারণ মাঝেমধ্যে ডুব দেওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। আর যদি চাকরি চলে যায়, আর কী করা যাবে? লিখে আর গৃহ শিক্ষকতা করে সংসার চালাতে হবে।

    শ্যামলবাবুর সংসারে বৃদ্ধা মা ছাড়া আছেন বউ আর তিনজন ছেলেমেয়ে। ছেলেমেয়েরা কাছেই অন্য একটি স্কুলে যথাক্রমে চতুর্থ, ষষ্ঠ, আর প্রথম শ্রেনিতে পড়ে। শ্যামলবাবু বউ, মাধুরীবৌদিকে ঘরের কাজ থেকে শুরু করে বাজার-হাট, ডাক্তারখানা – সব সামলাতে হয়।

    না। বৌদির তেমন কোনও বায়না বায়নাক্কার কথা শুনিনি শ্যামলবাবুর কাছে। তবে মাঝেমধ্যে তারাপীঠ, দক্ষিণেশ্বর, কামারপুকুর আর টুকটাক সিনেমা দেখতে যাওয়ার কথা বলতেন। আর এইসব শুনলেই শ্যামলবাবু কখনো শিবরামের গল্প বা বাট্রান্ড রাসেলের থেকে অনুবাদ করে নয়তো বিজ্ঞানের নানা গালগল্প আর আবিষ্কারের আশ্চর্য সব ঘটনার কথা বলে বলে সেসব জায়গায় যাওয়া থেকে বউদিকে নিরস্ত করতেন।

    বাড়িতে গেলেই দেখতাম শীত, গ্রীষ্ম বা বর্ষা যাই থাকুক না কেন, নিচে একটা লুঙ্গি বা ধুতি আর ফতুয়া বা তার ওপরে চাদর জড়িয়ে নিবিষ্ট মনে টেবিলের ওপর বসে লিখে চলেছেন। আলাদা করে শখের মধ্যে বই কেনা আর কাছের সিনে ক্লাবে বিদেশি সিনেমা দেখা ছাড়া তেমন কিছু আর দেখিনি শ্যামলবাবুর।

    আমাদের স্কুলের টিচার ইনচার্জ মইদুলবাবু কিন্তু শ্যামলবাবুকে বেশ সমীহ করে চলতেন। একে শ্যামলবাবু শিক্ষিত মানুষ, তার ওপর বড় প্রতিষ্ঠানে লেখা প্রকাশিত হয় বলে কথা, কত মান্যিগুণ্যি লোকের সঙ্গে ওঠা-বসা, ফলে শ্যামলবাবু যখন দুমদাম ডুব মারতেন বা দেরি করে স্কুলে আসতেন, তাকে কিছুই বলতেন না।

    তার বদলে মনীষীদের জন্মবার্ষিকীতে কোন্‌ লেখককে আনা হবে বা অনুষ্ঠান সূচী কী হবে, বিদ্যালয়ের পত্রিকা, হাতের কাজ ইত্যাদি নানান বিষয়ে শ্যামলবাবুর থেকে সাহায্য, সহযোগিতা আর তার চেনা বিজ্ঞাপণদাতাদের থেকে ডোনেশন আদায় করে নিতেন।

    সঙ্গে শুনেছিলাম, মইদুলবাবু আবার কীসব গল্প কবিতা লেখবার চেষ্টা করেছিলেন আর শ্যামলবাবুকে আরও ছাড় দিতে চাইছিলেন যাতে সেই কৃতজ্ঞতার ঋনে আবদ্ধ হয়ে শ্যামলবাবু যদি তার লেখাগুলো কোনও ভালো পত্রিকায় ছাপিয়ে দেন। শ্যামলবাবু অবশ্য ছাড়গুলো নিয়েছিলেন, কিন্তু লেখা ছাপান নি। বলেছিলেন যে এইসব আবর্জনা তিনি ছাপানোর জন্য কাউকে বলতে পারবেন না। আর কী করে আরও ভালো লেখা যায় তার পরামর্শও দিয়েছিলেন মইদুলবাবুকে।

    অপরদিকে, আমাদের সাহিত্যের মাষ্টার শুভজিতবাবু আর অঙ্কের মাষ্টার সৌম্যবাবু কিন্তু এইসব একদম বরদাস্ত করতে পারতেন না। সামনে কিছু না বললেও শ্যামলবাবুর পেছনে তাকে নিয়ে নানান কটুকথা বা শ্যামলবাবুর প্রতি মইদুলবাবুর এহেন বদান্যতার জন্য তাকেও দু’চার কথা ঠারে ঠারে দিতেন বলে।

    এমনকি ব্যাপার এমন গুরুতর হয়ে গেছিল যে একবার স্কুল পরিদর্শক বা কিছু অভিভাবকদের কাছেও তারা কায়দা মতো নালিশ করেছিলেন শ্যামলবাবুর বিরুদ্ধে।       

    কিন্তু খ্যাতির যেমন বিড়ম্বনা আছে, তেমনি আছে সন্মোহন। ফলে পরিদর্শকের কাছে চিড়ে তো ভেজেইনি, আর অভিভাবকরাও কয়েকজন যারা এসেছিলেন শ্যামলবাবু তাদের সিলেবাস, লেখাপড়া, শেখা, হাতে কলমে শেখা – এইসব নিয়ে এতো জ্ঞানগর্ভ কথা বলেছিলেন যে তারাও বেগতিক দেখে ঐ প্ররোচনায় আর পা দেননি।

    পরে ব্যাপারটা কানে গেলেও শ্যামলবাবু অবশ্য শুভজিতবাবু বা সৌম্যবাবুকে কোনও তিরস্কার করেন নি। শুধু বলেছিলেন – দেখুন, আমার প্রতি আপনাদের যে অভিযোগ, তা একাধারে সত্যি এবং মিথ্যা। আমি যে স্কুলে দেরী করে আসি বা মাঝসাঝে ডুব দিই একথা যেমন সত্য, তেমনি ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা ছাড়াও গান, আবৃত্তি শেখানো, ওদের নিয়ে নাটক করা, বিভিন্ন নতুন নতুন বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করানো…। ফলে ওদের জন্য আমি যতটুকু খাটি, তা আপনাদের থেকে অনেক বেশি। আর যে সমস্ত বিষয়কে কাজে পর্যবসিত করতে আপনারা যত বেশি সময় নেন, আমি নিই ঠিক তত কম। আর শিক্ষক হিসেবে ওদের বোধের বিকাশ আর ওরা প্রশ্ন করছে কী না, হ্যাঁ, প্রশ্ন করছে কী না – এটা দেখাই মূল কর্তব্য বলে মনে করি। আপনারাও সেভাবে…। প্লিজ ভাব্বেন না যে গায়ে পড়ে জ্ঞান দিচ্ছি।

     
    এর হপ্তা খানেক বাদে টিফিন চলাকালীন টিচার্স রুমে শুভজিতবাবু আর সৌম্যবাবুকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন – আপনারা নিশ্চয়ই মারিয়া মন্তেশ্বরী, যিনি বিখ্যাত মন্তেশ্বরী পঠনপাঠন প্রথার উদ্ভাবক, বা সাবিত্রী বাঈ ফুলে, এমনকি বিখ্যাত হওয়ার আগে জে.কে. রাউলিং – এঁরা সকলে প্রাইমারী স্কুলেই পড়াতেন।
     
    - তাই নাকী! – আমি বিস্মিত হয়ে বলেছিলাম।
     
    - আচ্ছা, আপনারা 1984 বা অ্যানিম্যাল ফার্ম পড়েছেন? শুভজিতবাবু? আহ! অ্যানিম্যাল ফার্ম তো দারুণ! ‘All animals are equal, but some animals are more equal than others’ বা 1984-এর সেই বিখ্যাত লাইন – ‘War is peace. Freedom is slavery. Ignorance is strength’. তারপর সাইমন অ্যান্ড গারফাংকেলের সেই গান – Sound of Silence. শোনেন নি? 
     
    শুভজিতবাবু ঘাড় নাড়িয়ে জানালেন যে না। সৌম্যবাবু মুখটা গম্ভীর করে ঘাড় গোঁজ করে খবরের কাগজ পড়বার ভান করছিলেন; কিন্তু কানটা ছিল এদিকেই।
    এবার তার দিকে শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে শ্যামলবাবু বললেন – শ্রীনিবাস রামানুজম, নাম শুনেছেন তো? ও সৌম্যবাবু? আর জর্জ বুল তো নিজেই একটা প্রাইমারি স্কুল খুলেছিলেন। তারপর রবীন্দ্রনাথ…

    -সত্যি! আপনার তুলনা আপনিই! – সপ্রশংস দৃষ্টিতে শ্যামলবাবুর দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন মইদুলবাবু।

    - আসলে দুনিয়াদারী নিয়ে যারা থাকেন, তারা বুঝতে পারেন না এসব। একমাত্র আসমানদারীর লোকজনই…। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন – আত্মদ্বীপ ভবো। আত্মদ্বীপ ভবো।
    - আপনার এবারের ধারাবাহিকটা, চমৎকার। যেভাবে পরতে পরতে ইতিহাস আর মানুষের ষড়রিপুকে তুলে ধরেছেন…, আমি তো মুগ্ধ। বইমেলায় নতুন কিছু?
    - হ্যাঁ। একটা গল্প সংকলন আর একটা উপন্যাস।
    - ঐতিহাসিক নাকি?
    -আরে ওভাবে কি আর ভাগ হয়? সব কিছুই আছে; তবে পরিমিত। পরিমিতি জ্ঞান না থাকলে লেখাই বলুন, আর সংসার…, সবই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। রান্নাও। সব।

    তবে মইদুলবাবুর সঙ্গে আমি এইসব কথা গিললেও শুভজিতবাবু বা সৌম্যবাবুর সেদিকে মন ছিল না। শ্যামলবাবু আর মইদুলবাবু ক্লাস নিতে বেরিয়ে যেতেই সৌম্যবাবু বলে উঠলেন – দেখলেন? কেমন শুধু খানিকটা জ্ঞানগর্ভ বক্তিমে দিয়ে…
     
    - হ্যাঁ। ঐ তো এক সম্বল। ছাত্র-ছাত্রীদের দৈহিক বিকাশ, খেলাধুলা, স্কুলের ডিসিপ্লিন, সেসবের দিকে তো…, আর এইভাবে যদি ওকে ভজনা করে যেতে হয়, নিজেদের মানসম্মান বলে তো… - বলেই আমার দিকে তাকালেন শুভজিতবাবু।
     
    - হ্যাঁ, খাপেখাপ পেলেই বুঝিয়ে দেবো, টের পাবেন, কে অরওয়েল আর কে মন্তেশ্বরী।
    - যা বলেছেন। হু।
     
    এবং এক বছরের মধ্যেই সেই সুযোগও চলে এল শুভজিতবাবুদের। নতুন হেড মাষ্টারমশাই অ্যাপয়েন্টেড হয়ে এলেন স্কুলে। নাম মৃত্যুঞ্জয় হাজরা। অসম্ভব জেদী আর রাগী। কথার নড়চড় হলেই তাকে পেড়ে ফেলেন একেবারে।

    তা প্রথমদিন তার অভ্যর্থনা সভায় সবার সঙ্গে পরিচয় করলেন হেডু। বিশেষ করে সময় দিলেন শ্যামলবাবুকে। বললেন – আপনার খুব খ্যাতি শুনেছি। আজ সম্যক পরিচয় হল। তারপর? শুনলাম স্টুডেন্টদের নানারকম নাকি তালিম দেন? নিজে হেড মাষ্টারের জন্য অ্যাপ্লাই করেন নি? 
     
    - না। বিরস বদনে বললেন শ্যামলবাবু। - আসলে এতো কাজের চাপ…। আর নতুন করে…
    - হুম। ঠিক আছে। আর এটা জানেন তো যে আমি খুব স্ট্রিক্ট। খ্যাতিট্যাতি সব স্কুলের বাইরে রেখে আসবেন, কেমন? স্কুলের ডিসিপ্লিন আমার কাছে সবচেয়ে আগে, বুঝলেন?
     -হুম। ঠিক আছে।
     
    সেদিন একটু তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেলেও পরে শুনেছিলাম শুভজিতবাবু আর সৌম্যবাবু থেকে গিয়েছিলেন আর আমাদের তিনজনের অনুপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে শ্যামলবাবুর বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ জানিয়ে হেডস্যারের মাথার পোকা দিয়েছিলেন নাড়িয়ে।

    পরদিন যখন দেখলেন এগারোটা বেজে যাওয়ার পরও শ্যামলবাবু এলেন না, তখন ভেতরে ভেতরে আগ্নেয়গিরির মতো ফুঁসতে থাকলেন হেড স্যার। তার মধ্যে হাওয়া দিয়ে গেলেন সৌম্যবাবু।     

    প্রায় ১১টা ৩৫ মিনিট নাগাদ সাইকেল নিয়ে ফুরফুরে মেজাজে হাজির হলেন শ্যামলবাবু। সাইকেল যথাস্থানে রেখে টিচার্স রুমে ঢুকে আমাদের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী বিভাসদাকে হাঁক মারতেই তিনি এসে জানালেন যে হেডস্যার ওকে ডাকছেন।

    শ্যামলবাবু খুব স্মার্টলি হেডের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।তার মুখে পান। চিবোচ্ছিলেন। হাজরাবাবু একবার রোষ কষায়িত চোখে এমনভাবে শ্যামলবাবুর দিকে তাকালেন যেন এক্ষুনি ভস্ম করে দেবেন। বললেন – ডিসিপ্লিন শব্দটা কি আপনার ডিকশনারিতে আছে?
    -কেন স্যার? সামনের চেয়ার টেনে বসলেন শ্যামলবাবু। বললেন – আমার আজকে এগারোটা পঁয়তাল্লিশে ক্লাস। তার আগেই এসেছি।
    -এটা কি আপনার জমিদারি পেয়েছেন? হেড স্যারের গলা তখন সপ্তমে। বললেন – কারুর যদি প্রথম ক্লাসটা না থাকে, তাহলে কোন রুল বুকে লেখা আছে যে তিনি দেরী করে আসবেন? বা শেষের ক্লাস না থাকলে আগে বেরিয়ে যাবেন, অ্যাঁ?
    - আসলে একটা লেখা আর আমি তো ঐভাবেই অভ্যস্ত। ঐ বাকিদের জিজ্ঞাসা করুন না।
    -অভ্যাস পাল্টে ফেলুন। নয়তো আপনাকে পাল্টে ফেলা হবে। ঠাণ্ডা চোখে শ্যামলবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন হাজরা স্যার। বললেন – দেখুন, আমি এই স্কুলের হেড স্যার। কোনও কৈফিয়ত আপনাকে দেবো না। আপনার মতো অনেক জেদি স্যার আমি ঢিট করেছি। আজকে ওয়ার্নিং দিলাম। আবার হলে কিন্তু লাল কালির দাগ পড়বে।

    বিরস বদনে শ্যামলবাবু ক্লাস করাতে চলে গেলেন। টিফিন আওয়ার্সে শুভজিতবাবু আর সৌম্যবাবু ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে এমনভাবে মুখ ভ্যাংচাচ্ছিলেন, যেন বলতে চাইছিলেন –এবার হয়েছে তো? দ্যাখ কেমন লাগে। some animals are more than equal ঘুচে গেছে।

    শ্যামলবাবুর অবশ্য তাতে কোনও হোলদোল নেই। পরের দিনও যথারীতি লেট করলেন। এবার হেড স্যার খাতায় লাল কালির দাগ গিয়ে ইত্তেলা করে কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। শ্যামলবাবু ইতস্তত করছিলেন। 
     
    তারপর হেডের চাপাচাপিতে বেশ শান্ত গলায় বললেন – কী আর বলবো স্যার, একে গরীব মানুষ। তায় বাড়িতে বৃদ্ধা মা। তার মেডিসিনের খরচ। ছেলেমেয়ে নিয়ে ছ’টা পেট। জামাকাপড়, ঘোরাফেরা, বই কেনা, সমাজ সামাজিকতা, আত্মীয়স্বজন…
     
    - Come to the point.
    - আমার স্যার ঐ একটাই স্যান্ডো গেঞ্জি স্যার। তা স্কুল থেকে সরাসরি ক’টা টিউশন পড়াতে যাই। প্রায় রোজই। তারপর বাড়ি ফিরে লেখালেখি। এখন বর্ষাকাল। তাই রাতে গিন্নি ধুয়ে দিলেও সকালে শুকোয় না।
    - গেঞ্জি ছাড়াই আসবেন।
    - না স্যার। অসহ্য লাগে। গা কুটকুট করে।
    - তাহলে নতুন কিনে নিন।
    - টাকা নেই স্যার। লোন আছে। বাড়িটা দোতলা করেছিলাম। মায়ের কোমরে চোট লাগলো। তার ডাক্তার, ওষুধ, আয়া। তারপর বিদেশি বই কিনতে হয়। ঐ মাইনেতে কি আর চলে?
    - আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না। আপনি টাইম মতো না এলে আমি CI, তারপর SI…, মানে স্কুল দপ্তর পর্যন্ত যাবো। হ্যাঁ। এ ব্যাপারে আমার রেকর্ড আছে। অনেক বেয়াদব মাষ্টারকে আমি ঢিট করেছি। তাই…
    - বেশ কথা। কিন্তু পরে আমাকে কিছু বলবেন না আবার। আর আজ মাফ করে দিন…, প্লিজ।
    - ওকে। লাস্ট ওয়ার্নিং।
     
    তবে শ্যামলবাবুর কথাটা – ‘পরে আমাকে কিছু বলবেন না আবার’ - শুনে হেড স্যার একটু অবাক হলেন। উনি যে ঠিক কীসের ইঙ্গিত করলেন সেটা বুঝতে পারলেন না তিনি।

    এদিকে এই খবর শুনে টিচার্স রুমে শুভজিতবাবু আর সৌম্যবাবু তো দারুণ খুশি। সৌম্যবাবু বললেন – কেমন? গেল তো হাওয়া বেরিয়ে? 
     
    -একদম। শ্যামলবাবু এবার বাঘা তেঁতুলের পাল্লায় পড়েছেন। গলা চুলকুনি ফুল স্টপ। হা হা হা হা।
    -হা হা হা হা।
     
    এদিকে ছুটির সময় আমি মইদুলবাবুকে জিজ্ঞাসা করলাম – এবার? কী হবে?
    মইদুলবাবু বললেন – ও শ্যামলবাবু ঠিক ট্যাকল করে নেবেন। অভিজ্ঞ আর শিক্ষিত বলে কথা। বড় বড় লোকের সঙ্গে, অনেক অনেক বিষয়ের সঙ্গে ওঠা বসা। ও …

    শ্যামলবাবু অবশ্য অম্লান বদনে আমাদের সঙ্গে কথা বলে তার সাইকেলে চড়ে বেরিয়ে গেলেন টিউশনি করতে।
     

    তবুও আমার মনে একটা দ্বন্দযুদ্ধের আসন্ন মেঘ জমতে থাকল। পরদিন ছিল ছুটি আর তার পরের দিন রবিবার। ফলে দিন দুই খুব উশখুশ করে কাটল। একবার ভেবেছিলাম যে শ্যামলবাবুর বাড়ি যাই। গিয়ে কিছু মন্ত্রণা দিই। কিন্তু তারপর আবার ভাবলাম যে তাতে উনি যদি কিছু আবার মনে করেন।

    সোমবার আমরা সকলেই সকাল সাড়ে দশটায় এসে অধীর আগ্রহে বসে আছি। মুখের কাছে পেপার খোলা থাকলেও শুভজিতবাবু আর সৌম্যবাবুর চোখ রয়েছে ঘড়ি আর দরজায়। মিনিট পাঁচ পরেই হেড স্যার এসে ঘরে একবার উঁকি মেরে দেখে গেলেন। আজ আবার ক্লাস টেস্ট রয়েছে।

    প্রায় দশটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে বিভাসদা এসে জানালেন যে শ্যামলবাবু এসে গেছেন। তবে কথাটা বলবার পর এমন করে হাসলেন যে আমাদের সবার পিলে চমকে গেল।

    শুভজিতবাবু আর সৌম্যবাবু বলে উঠলেন – এখন? কোথায় অরওয়েল? কোথায় গারফাংকেল? অ্যাঁ?

    শ্যামলবাবু এসে দরজাতে সামান্য ঢুকে ঘরে উঁকি দিলেন। আমি জানালাম – রেজিস্টার হাজরা স্যারের ঘরে। তবে দেখলাম যে শ্যামলবাবুর পরণের পাঞ্জাবীর বুকের জায়গাটা কেমন যেন মহিলাদের মতো উঁচু হয়ে আছে।

    হেড স্যার প্রথমে শ্যামলবাবুর ঠিক সময়ে আসবার খবরে খুব খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু ওর হুলিয়াটা দেখেই রাগে ফেটে পড়লেন। চিৎকার করে বললেন – এটা! কী পড়েছেন মশাই? অ্যাঁ! 
     
    -কেন? অন্তর্বাস। তবে আমারাটা ভিজে বলে বউয়েরটা পরে এসেছি।
    - ছিঃ! ছিঃ! ছিঃ! ছিঃ! এইভাবে আপনি ক্লাসে যাবেন! অ্যাঁ?
     
    ততক্ষণে আমরা সবাই হেডুর ঘরে। মইদুলবাবু একবার হেড স্যার আর একবার শ্যামলবাবুকে দেখে হাসতে হাসতে ঘরে বাইরে গিয়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে থাকলেন। আমি আবার হাসি চাপতে গিয়ে কাঁদতে থাকলাম আর শুভজিতবাবু আর সৌম্যবাবু মুখ কালো করে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন শ্যামলবাবুর দিকে। ফুল হতভম্ব।

    আর শ্যামলবাবু অম্লান বদনে ডিবের থেকে একটা পান বের করে চিবোতে চিবোতে বললেন – ক্লাস ফোর তো আমার? 
     
    -আপনি, আপনি এক্ষুনি বাড়ি যান। হেড স্যারের গলা এবার অক্টেভের প্রথম সা-তে এসে ঠেকেছে। - ছিঃ! ছিঃ! ম্যাগো!
    - তাহলে লালকালি?
    - পড়বে না। গেঞ্জি শুকিয়ে পরে আসুন।
     
    সেদিন সেই দেরী করেই আবার এলেন শ্যামলবাবু।মুখে স্মিত হাসি। স্কুল শেষের পর হেড স্যার কাঁচুমাচু হয়ে শ্যামলবাবুকে ডেকে হাতে টাকা দিয়ে বললেন – ফেরত দিতে হবে না। প্লিজ আর একটা গেঞ্জি কিনে নেবেন।

    কিন্তু তার পরের দিনও দেরী। জানা গেল হেড স্যারের টাকাটা দিয়ে বৌদির জন্য নতুন একটা অন্তর্বাস কিনেছেন। সেদিন ওটা ছিঁড়ে গেছিল!

         
          
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৬০ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ভাষা  - Tanima Hazra
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan | 2001:999:408:bf12:ab7d:203c:f7d2:***:*** | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:১০738675
  • চলুক চলুক l
     
    লাস্ট লাইন ফাটাফাটি!
  • রানা সরকার | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:২২738679
  • গল্পটা কিন্তু সত্যি ঘটনা অবলম্বনে লেখা। ভালো থাকবেন রঞ্জনবাবু। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে প্রতিক্রিয়া দিন