

তারপর আর কী? কীভাবে সেদিন রক্ষা পেলাম, ট্রেন ধরলাম সে এক কান্ড, তবে কখনোই চাইবোনা যে ঐ ধরণের ঘটনার কোনোভাবে পুনরাবৃত্তি হোক। এই ফিল্ডের শুরুতে একটা ঘটনা ঘটেছিল। দার্জিলিংয়ে তখন হামেশাই বন্ধ ডাকা হত বলে সিকিমে ওঠার সময়ে বিদ্যুৎ বাবু সিকিম থেকেই জিপ বুক করেছিলেন। কথা ছিল তারা শিলিগুড়ি থেকে আমাদের নিয়ে যাবে। কিন্তু আন্দোলনের আবহে স্থানীয় গাড়ি চালক সঙ্ঘ আমাদের গাড়িগুলো রাস্তায় অবরোধ করে রেখেছিল। কিছুতেই ছাড়ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের শিক্ষকদের শিলিগুড়ি থানা আর মাটিগাড়া থানায় ছোটাছুটি করতে হয়েছিল। দীর্ঘক্ষণ পরে যখন গাড়ি ছাড়লো, তখন থানা থেকেই ওনারা বলেছিলেন এসব রাজনৈতিক ব্যাপার, আমাদের সতর্ক হয়ে চলতে হয়। তবে এক্সকারশনের সময়ে কোন যদি সাহায্য লাগে একটা ফোন নম্বর দিচ্ছি সেখানে যোগাযোগ করবেন। নম্বরটা ছিল কালিম্পং পুলিশের কোন উচ্চ আধিকারিকের নম্বর। কিন্তু যাঁর নম্বর তাঁর নাম আমরা জানতাম না। সারা ফিল্ডে ঐ বিশেষ নম্বরটার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু ফেরার দিনে ঐ পরিস্থিতিতে আমরা সেখানে ডায়াল করলাম। এর ফলশ্রুতিতে পুরো পাহাড়ে খবর হয়ে গেল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন একটি কলেজ গ্রুপ পাহাড় থেকে নামছে। এই নামার দীর্ঘ পথে যতগুলো থানা পড়ল, সেখান থেকে বন্দুক উঁচিয়ে আলাদা আলাদা এসকর্ট ভ্যান এসে আমাদের সেই থানার অংশটুকু পার করিয়ে দিল। যত সহজে বলে দিলাম, বাস্তবে ব্যাপারটা ততটাই কঠিন ছিল। প্রতিটি থানা সীমান্তে, রাস্তার মুখে, সেতুর মুখে রক্তচক্ষু অস্ত্রধারী দল, অনুনয় বিনয়, নথি পরীক্ষা, গাড়ি পরীক্ষা, যাত্রী পরিচয় পরীক্ষা, কটুকাটব্য, দীর্ঘ অপেক্ষা, রেসকিউ ভ্যান, আংশিক অগ্রগতি এবং বারংবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সকালে বেরিয়ে ক্লান্ত, অবসন্ন, ক্ষুধার্ত অবস্থায় এক চুলের জন্য ফেরার ট্রেনটা আমরা পেয়ে গিয়েছিলাম। সেই অজানা আধিকারিককে আমরা আজও বারবার মনে করি আর শ্রদ্ধা জানাই যিনি আমাদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। তিনদশকের শতেক ফিল্ড সার্ভের অভিজ্ঞতা সবটাই যে পজিটিভ তা তো নয়, কিছু নেগেটিভও আছে। আলোর অভাব না বুঝলে, আলোর দাম কেউ দেবে কি? বলতে বাধা নেই যে রেলগাড়িতে বিহার অতিক্রম করার সময়ে নানা বিরূপ অভিজ্ঞতা হয় বলে ফিল্ড এরিয়া নির্বাচনে আমরা অনেক সময়েই বিহারকে এড়িয়ে যাই। তবে আশ্চর্যজনকভাবে আমার জীবনে এখনও অবধি খারাপ অভিজ্ঞতা উড়িষ্যায় বেশি হয়েছে। চাকরি জীবনের প্রথমদিকে নিজের রাজ্যেই বন্ধ ডাকার দাপাদাপি বেশি ছিল। একবার আমরা দক্ষিণ পূর্ব রেলে ফিল্ড সেরে ফিরছি, এদিকে হঠাৎ বাংলা বন্ধ। ট্রেন বোধহয় চব্বিশ ঘন্টা খুব সম্ভবত রাজঘাট হল্টে দাঁড়িয়েছিল। ট্র্যাভেল এজেন্ট স্থানীয় বাজার থেকে সবজি এনে প্ল্যাটফর্মে রান্না করেছিলেন, ট্রেনের অন্য সহযাত্রীরাও কেউ কেউ ওনাকে বলে আমাদের সঙ্গে খেয়েছিলেন। কিন্তু বিপদ যেটা হল, যে দলে দলে দুষ্টপুং ট্রেনে উঠে হাহা হিহি, বেছে বেছে মেয়েদের বার্থ নম্বর খাতা পেনে টোকা, জানলার বাইরে থেকে টিটকিরি - এমন নানাবিধ কুকর্ম করতে লাগল। তখন কোথায় স্মার্টফোন, কোথায় রেলমন্ত্রকের টুইটার, আর কোথায় পুলিশের ফেসবুক। এই আমিই এককালে সবার শুনে শুনে কত সোহাগ করে বলতাম বাঙালির আদরের দীপুদা (দীঘা - পুরী - দার্জিলিং)। আজ ফিল্ড সার্ভে বুকে পিন গেঁথে বুঝিয়ে দিয়েছে, দার্জিলিং সব সময়ে নিরাপদ নয়, পুরী সব বাঙালির জন্য ইনক্লুসিভ নয় - একেবারে একটি খন্ডিত অংশের জন্য। তাই কলেজ ছাত্রছাত্রীদের মতো মিশ্র কম্পোজিশন নিয়ে সেখানে যাওয়া যায়না। একদল যাব যাব করে বায়না করে আর একদল ভাষাহীন তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। ভিতরে লজ্জিত আমি প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে নাকচ করে দিই। আসলে দীপুদা থাকুক না, সার্কিট অনুযায়ী অন্যরকম মজার মজার আদিখ্যেতা যদি শুরু করা যায়, মন্দ কী? যেমন ধরা যাক বাঙালির ‘গবাদাদু’ - গনগনি - বাগমুন্ডি - দামোদর নদ - দুয়ারসিনি, কিংবা ‘পাঁচুমামু’ - পাঁচমুড়া - চুরুলিয়া - মামাভাগ্নে পাহাড় - মুকুট মণিপুর, অথবা হাতুকাকু - হাসিমারা - তুফানগঞ্জ - কার্শিয়াং - কুলিক। এগুলো যদি পছন্দ না হয়, তাহলে অন্ততপক্ষে সপ্তাহান্তে বনভোজনের জন্য ‘বগাপিসো’ তো চলতে পারে, মানে - বকখালি - গাদিয়াড়া - পিয়ালী দ্বীপ (সুন্দর বন) - সোনাঝুরি হাট? যাইহোক, কী বলতে বসেছিলাম, আর কীসব বলে ফেলছি। বয়স তো হচ্ছে আমার, কন্ট্রোল থাকেনা আজকাল, নইলে এসব কথা কি মুখে বলার! শুধু ভালো ভালো কথাগুলোই বলতে হয়। যাই দারিংবাড়ি যাই।
আদিবাসী অঞ্চলে এন আর সি/ সি এ এ বিরোধিতার আঁচ যখন পেয়ে গেছি সাবধান হয়ে মাঠে নামতে হবে। তিনজন শিক্ষক মিলে প্রথমেই যুক্তি করে রেসপন্ডেন্টদের পরিচয়, পরিযান, আদি বাসস্থান সংক্রান্ত যে সব বিশদ প্রশ্ন থাকে, সব কেটে বাদ দিয়ে দিলাম। প্রশ্নপত্র একেবারে ছোট করে ছেঁটে ফেলা হল, এবারে ক্যাপ্টেনদের ডেকে বলে দিতে হবে, ডিনারের পর ঘরে না গিয়ে সবাই যেন ডাইনিং হলে আধঘণ্টা থেকে যায়, আগামীকালের কাজ নিয়ে আলোচনা হবে। দরজা খুলে বেরোতে যাব দেখি ছেলেরাই আমাদের ডাকতে এসেছে। ছোট ঘর গুলোতে তিনজন করে আছে। একটা বড় ঘরে ছজন ছেলে আছে, অভিজিৎ, অনিত, অর্পন, ইভান, সায়ন, নাজিবুল। কাল পুজোর জন্য ওদের ঘরেই ঠাকুর সাজানো হয়েছে। আমাদের দেখতে যেতে হবে। ঘরে ঢুকে আমি তো অবাক। ছেলেমেয়েরা অসাধ্য সাধন করেছে। খাট ওপাশে ঠেলে দরজার সামনে লম্বা মেঝে, পরিষ্কার মোছা। মাঝখানে একটি প্লাস্টিকের চেয়ার।ইন্সট্রুমেন্ট মোছার সাদা পেপার টাওয়েল দিয়ে চেয়ার ঢাকা দেওয়া। তার ওপরে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো সরস্বতী ঠাকুরের ছবি। ছবিতে কাগজের মালা। সামনে মেঝেতে খবরের কাগজ পেতে কলার কাঁদি, ধূপের প্যাকেট, ধূপদানি, দেশলাই, মোমবাতি, পিতলের ঘন্টা ও পঞ্চপ্রদীপ। সব আমাদের পারমিতা সাজিয়েছে। শুনলাম শেষের উপকরণদুটি যোগাড় হয়েছে, হোটেলের রিসেপশন থেকে। এতেই শেষ নয়। হোটেলের পুরোনো বাড়ির ছাদে ফুলের টব আছে। সকালে সেখান থেকে ফুল পাড়ার অনুমতি পাওয়া গেছে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সরস্বতী পুজোর মন্ত্রোচ্চারণ হোয়াটস্ অ্যাপে পেয়ে ডাউনলোড করা হয়ে গেছে। গান শোনার ফোন স্পিকার সেট করা হয়ে গেছে। অঞ্জলি দেওয়ার মন্ত্র ইন্টারনেটে পাওয়া যাচ্ছেনা। তাই অরগানাইজারেরা যথেষ্ট চিন্তিত। সবার একটা আর্জি আছে, কাল মিষ্টি আনতে হবে। মিষ্টিমুখের প্রস্তাবে না করা কি যায়? তবে কাল যে বন্ধ্! শুনলাম হোটেলের ছেলে কথা বলে দোকান খুলিয়ে দেবে। লাড্ডু পাওয়া যাবে। ব্যস আয়োজনের পনেরো কলা পূর্ণ, কেবল অঞ্জলির মন্ত্রটুকু। ঘরটা বেশ পুজো পুজোই লাগছে, এটা স্বীকার করতেই হবে।
ডিনারের পর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া হল যে কাল আমরা কী কী করব এবং কী কী করবনা। ঘরে ফিরে এসে আবার নিজেদের মধ্যে একদফা প্ল্যান, যুক্তি তর্ক সেরে অবশেষে বিছানা। বিকেলে যে জানলা দিয়ে পাহাড় দেখা যাচ্ছিল, এখন সেখানে কাচের ওপারে জমাট বাঁধা অন্ধকার। গতরাতে ট্রেনে ছিলাম। সকালে বাস জার্নি, এখানে পৌঁছনো ইস্তক এত কাজ হয়ে গেল, মনে হচ্ছে আজ নয়, বেশ কিছুদিন দারিংবাড়িতে আছি। কাল কী যে হবে। একে তো দিন কে দিন যাতায়াত আর হোটেল খরচ বাড়ছে। তার ওপর কখনো প্রাকৃতিক, কখনো সামাজিক নানা কারণে ফিল্ড করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। আগে আটদিনের কমে ফিল্ড হবে এটা কল্পনাও করা যেত না। একটা জায়গার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে না উঠলে তাকে অনুভব করা যায়না। অনুভব না থাকলে পরিবেশ আর মানুষ সম্পর্কের বোধ জন্মায় না। বোধ তৈরি না হলে, কুঁড়ি ফোটা ভৌগোলিকেরা প্রস্ফুটিত হবে কেমন করে। এবারে তো সব জলাঞ্জলি দিয়ে পাঁচদিনের ফিল্ডে এসেছি। আসা যাওয়া, মাঝে তিন দিন। একদিন বন্ধ পড়ে গেল। মা সরস্বতী মাথায় আছেন, তিনিই দেখবেন। একরাশ চিন্তা মাথায় নিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, জানিনা।
ঘুম ভাঙলো বেশ ভোরে। শীতকাল, এখনো ভালো করে আলো ফোটেনি। আজকের সার্ভের জন্য দরকারি কাগজপত্র ফাইলে গুছিয়ে নিলাম। কুয়াশা ভেজা কাচের জানলা দিয়ে সকালের নরম রোদ ঢুকে অগ্নিশার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে। শাল গায়ে জড়িয়ে দুজনে করিডোরের কমন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। নিচে ভ্রমণ সংস্থার রন্ধন কর্মীরা অতি দ্রুত প্রাতরাশ তৈরি করছেন। এতবছর ধরে দেখছি, এঁরা যে কখন ঘুমান, কখন ওঠেন হিসেব করা মুস্কিল। সবই ঘড়ির কাঁটা ধরে চলে, নড়চড় নেই। বলতে বলতে চা বিস্কুট হাজির। অন্যদিন হলে চায়ের কেটলি নিয়ে ঘরে ঘরে নক করে ঘুম ভাঙাতে হয়। আজ সব উত্তেজনায় ফুটছে, করিডোর দিয়ে সেজেগুজে এঘর ওঘর হুড়োহুড়ি করছে। কালকের দুশ্চিন্তা আর মনে আসছেনা। অঞ্জলি দিতে হবে তো, চা বিস্কুট ফেরত পাঠালাম। ফিল্ডের নিয়ম হলো একই পোশাকে যতদিন কাটানো যায়, সেই চেষ্টা করা। কিন্তু আজ সে নিয়ম চলবেনা। জ্যাকেট আর সোয়েটারের তো বদল হবেনা, কারণ স্টকে একটি মাত্রই আছে। কুর্তি আর মোজাটা নতুন পরে নিয়েছি। পুজোর ঘরে ফুল সাজানো শেষ। ছাদের টবে সাকুল্যে পাঁচটি ফুল পাওয়া গেছে। হালকা কমলা রঙের বড় পঞ্চজবাটি চেয়ারে ঠাকুরের সামনে মাঝখানে। সবচেয়ে লোভনীয় বাক্স ভর্তি লাড্ডু। ও বাবা সৌরভ একেবারে রেডি হয়ে চলে এসেছে, আবার পরনে উজ্জ্বল বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি। কিন্তু অঞ্জলির মন্ত্রের কী হল? খবর পেলাম, আমাদেরই এক ছাত্রীর বন্ধুর বাবা পুজো করেন। সেই বন্ধু খাতায় মন্ত্র লিখে ছবি তুলে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাই আয়োজনের ষোল কলা পূর্ণ। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ছটা পেরিয়ে পৌনে সাতটার দিকে। মেঝেয় সবার দাঁড়ানোর জায়গা হচ্ছেনা বলে বাকিরা খাটে উঠে পড়েছে। তিল ধারণের জায়গা নেই। মোবাইল ধরে ক্যামেরাম্যানেরা রেডি। আমাদের অগ্নিশা সব্যসাচী। বামহাতে ঘন্টা নেড়ে ডানহাতে পঞ্চপ্রদীপের আরতি করতে পারে। ভ্রমণ সংস্থার রান্নাঘর থেকে সর্ষের তেল যোগাড় হয়েছে। তুলো সঙ্গেই ছিল, সলতে তেলে ভেজানো আছে। স্পিকারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র পাঠ শুরু করেছেন। বিদ্যুৎ বাবুও এসে দাঁড়িয়েছেন পুজোর ঘরের দরজায়। পঞ্চপ্রদীপের আগুনের আভা সকলের চোখে। সঙ্গে ঘন্টাধ্বনি বলছে আমরা সবাই এক। এই অনুরণন ঢেউ হয়ে ভেসে যাক পাহাড়ে জঙ্গলে, ছড়িয়ে পড়ুক আসমুদ্র হিমাচলে। ফুল তো নেই, মোবাইল দেখে অগ্নিশার উচ্চারণের সাথেই সকলে চোখ বুজে অঞ্জলি দিলাম নিজেদের ভক্তি। প্রসাদ বিতরণ সারা হল। এবার ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়। ছেলেমেয়েরা বেশিরভাগ হাউসহোল্ড সার্ভে করবে হোটেলের চারপাশের বাড়িগুলিতে। দূরে যাবেনা। একটা ছোট দল আর ইন্সট্রুমেন্টের ট্রলি নিয়ে আমরা রওনা হলাম চারমাথার মোড়ের দিকে। বেরোনোর মুখে দেখি দুপুরের খাবারের যোগাড় চলছে। আজ আর মাছের ঝোল নয়। আমাদের আবদারে মেনু বদল। খিচুড়ি, লাবড়া, ধোঁকার ডালনা, চাটনি, পায়েস। মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছে। একটা প্রত্যয়ের অনুভূতি, সবাই তো আছি। যা হবে দেখা যাবে।
চারমাথার মোড়টা ইন্স্ট্রুমেন্ট সার্ভের পক্ষে বেশ উপযোগী। বন্ধ থাকার জন্য শাপে বর হয়েছে। নিরিবিলিতে কাজ করা যাচ্ছে। ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে নৈনিতালে একবার লোকজন আর যানবাহনের চাপে খুব অসুবিধে হয়েছিল। সব শেষ হল বেলা বারোটা নাগাদ। এবার অফিসগুলোতে যেতে হবে। হাউসহোল্ড সার্ভে যারা করছে, সৌরভ ওদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রেখেছে। জল আর মাটির স্যাম্পল যারা সংগ্রহ করছে, তাদের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়ে গেল। যানবাহন অমিল। তাই হন্টন বিনা গতি নেই। সব কিছু শেষ করে, পায়ের দড়ি ছিঁড়ে হোটেলে যখন ফিরলাম, ঘড়িতে বাজল তিনটে। সেকেন্ডারি ডাটা যোগাড় হয়েছে। হাউসহোল্ড সার্ভেও শেষ। ছেলেমেয়েরা স্থানীয় মানুষজনের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পেয়েছে। অনেক ঘুরেছে। তারা বেশ সন্তুষ্ট। লাঞ্চ করে ডাইনিং হল ছেড়ে যখন বেরোলাম, তখন বিকেলের রোদ পড়েছে গাছের মাথায়। বিশ্রামের সময় নেই, এবারে একটি বেসরকারি অফিসে মানে সেই জাগ্রুতিতে যেতে হবে, প্রথম দিন যেটা বাইরে থেকে দেখে এসেছিলাম। আমাদের বাস ড্রাইভার বন্ধ বলে বেরোতে ভয় পাচ্ছেন। শেষে হোটেলের অ্যামবাসাডরের ব্যবস্থা হল বটে, সকলের যাওয়াটা গেল আটকে।
আমাদের গাড়ি চলল চারমাথার মোড় পেরিয়ে ডানদিকে। মনে অনেক কথা ভিড় করে আসে। আজকে ছেলেমেয়েরা যে ভালো ব্যবহার পেয়েছে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের দেশ এমনই। আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি আন্তরিক আর আপন ব্যবহার পেয়েছি মধ্যপ্রদেশ আর ছত্তিশগড়ের পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা আদিবাসী অঞ্চলে। তাছাড়া যে কোন পাহাড়ের মানুষের সরল ব্যবহারে উত্তরাখণ্ড আর লাভা লোলেগাঁওয়ে পার্থক্য হয় না। ধর্ম ভাষা জাতি কোন বাধাই নয়। অচানক মারের জঙ্গলে চোখের ভাষা পড়ে ছাত্রীদের প্রাকৃতিক প্রয়োজনের আড়াল দেখিয়ে দিয়েছিলেন আদিবাসী বধূ। রানীক্ষেত আলমোড়ার রাস্তায় যখন আমি খুব অবসন্ন, প্রবল অস্বস্তি, গা গোলাচ্ছে তখন পথের ধারে নাম না জানা এক মন্দিরের পূজারী একমুঠো মশলা মাখা কাবলি ছোলা আর পাহাড়ি লেবুর রস খাইয়ে ম্যাজিকের মত আমায় সুস্থ করে দিয়েছিলেন।
হঠাৎ একটা ঝাঁকুনিতে চিন্তা সূত্র ছিন্ন হল। এদিকে রাস্তা ফাঁকা। ভুল করে আমরা এগিয়ে এসেছি অনেক দূরে। দুপাশে ঘাসের দৈর্ঘ্য বাড়ছে। সোনালি রোদ লালচে হয়ে আসছে। একি আমরা তো পাহাড়ে উঠে পড়েছি। অনেক দূরে ছোট একটা আদিবাসী গ্রাম দেখা যাচ্ছে। জাগ্রুতির অফিসে ঢোকার পথটা মিস হয়ে গেছে। গাড়ি ঘুরিয়ে চললাম ফিরতি পথে। আজ অফিসে কাজ করার সময়ে এক স্থানীয় ইস্কুলের হেডমাস্টার মশায়ের সঙ্গে আলাপ হল। তিনি গবেষকও বটে। বাংলাতেও যান বক্তৃতা দিতে। তাঁর কাছে শুনছিলাম এই এলাকায় ইংরেজ আমল থেকে আদিবাসী অনাদিবাসীদের সম্পর্কের জটিল অন্তর্জাল। আমার ইতিহাস জ্ঞানের দৌড় মাধ্যমিক পর্যন্ত। সিধু কানু বিরসার কথা পড়েছি। তবু মনে হয় তখন সিলেবাসে আদিবাসী বিদ্রোহ বিশদে ছিলনা। এখন মেয়ের ক্লাস টেনের বইতে জঙ্গলমহলের কোল বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ অনেক বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা আছে। সামাজিক ভূগোল বুঝতে গেলে ইতিহাসের বোধ জরুরী। ওড়িশার কন্ধ উপজাতির কাহিনী যা শুনলাম, তাও ঐসব বিদ্রোহের কাহিনীর সমতুল্য, আর সেটাই স্বাভাবিক। ইংরেজ মিশনারিরা উপজাতি মানুষদের খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করেছেন, যা আজও মূলধারার স্থানীয় সমতলের বেশিরভাগ মানুষের থেকে স্বতন্ত্র। আজ ঐ সমতলের মানুষ পাহাড়ি পরিবেশের সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন ব্যবসা বাড়াতে চায়। তার জন্য লাগবে বাড়তি জমি। কে না জানে জমির অধিকারের লড়াই হল খাদ্য আর বাসস্থানের জন্য মানুষের আদিম লড়াই। ভদ্রলোকের কথাগুলো ভুলতে পারছিনা। আজকের হোটেল আর দোকানগুলো জনজাতির মানুষের জমিতেই তৈরি হয়েছে। তাঁরা সরে গেছেন পাহাড়ের আরও উঁচু ঢালে। পূ্র্বঘাট বেশি তো উঁচু নয়। টপকে গেলে দেশের মধ্যকার জমি, আরও বেশি জনবহুল। সরতে সরতে আর কোথায়? কোথায় ভূমিকন্যা ও পুত্রদের পরিযানের শেষ? দারিংবাড়ির ঘাসের, পাহাড়ের, রোদের লাল রং মানুষের শিরার ভিতরের লাল রংটার কথা কি আমায় বলতে চাইছে? আরও একটা অদ্ভুত কথা জানলাম ঐ মাস্টার মশাইয়ের কাছে। দেবী খরাখাই - স্থানীয় ভাষায় খরা মানে সূর্যের আলো বা রোদ্দুর। যে দেবীর খাদ্য হল খরা, তিনিই খরাখাই। ইনি পরমা শক্তি বা দেবী দুর্গারই লোকরূপ। এই দেবীর ভক্তরা আরাধ্যা দেবীকে রোদের আলো তাপ উৎসর্গ করে দেন, তাই নিজেদের ঘরে রোদ ঢোকা বন্ধ রাখেন। দেবীর উপাসনা স্থলে ছাদ থাকেনা। ভারি অদ্ভুত ব্যাপার তো! এই বিশাল দেশের আনাচে কানাচে কত না বিস্ময় ছড়িয়ে আছে। তবে যেকোন লোক বিশ্বাস তৈরি হবার পিছনে কিছু না কিছু প্রাকৃতিক কারণ তো থাকবেই। এইসব এলাকার জলবায়ু হল চরমভাবাপন্ন। শীতে যেমন ঠান্ডা, গ্রীষ্মে তেমন গরম। জানলা ছাড়া মোটা দেয়াল আসলে তাপের কুপরিবাহী হয়ে ইনসুলেশন করে। আবার তাপ যেমন আটকায়, হয়তো বা সাপও। কী জানি চাঁদ সওদাগরের বাড়ি কোথায়! এই বাড়িগুলো কি তবে বেহুলার বাসরঘরের মত নাকি? একথাটা ভেবে খানিক আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম। "চলুন ম্যাডাম", সম্বিৎ ফিরল সৌরভের ডাকে। গাড়ি থেমেছে। আমরা এখন ঈপ্সিত অফিসের সামনে। কেরলের এক ভদ্রলোক গত শতকের আটের দশকে এই সংস্থা তৈরি করেছিলেন আদিবাসী কল্যাণে কাজ করার জন্য। এঁদের একটা লাইব্রেরি আছে। স্থানীয় স্কুলের ছেলেমেয়েরা বই নেয়। একটা চলমান বিজ্ঞান ল্যাবরেটরিও রয়েছে দেখলাম - গ্রামে গ্রামে বিজ্ঞান চেতনার প্রসারে কাজ করে। অনেক রকম স্থানীয় শস্যের নমুনা দেখলাম। একটা কথা শুনলাম, ২০০৮ সালে জাতি সম্পর্ক মান অভিমানের সীমা পেরিয়ে সরাসরি শারীরিক ঘাত প্রতিঘাতে পৌঁছেছিল। তখন থেকে সরকারি ব্যবস্থা অতি সতর্ক। একথাগুলো নির্দিষ্টভাবে জানার আগেই ভৌগোলিকের চেতনা আমাকে জানান দিচ্ছিল। মানুষের যন্ত্রণা মনে বাজে, কাঁটার মতোন বিদ্ধ করে।
Aditi Dasgupta | 43.25.***.*** | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৯:০৪738478
হীরেন সিংহরায় | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৯:৩৮738479