

আর এস পি দলের প্রতিষ্ঠাতা দুই সদস্য মাখন পাল ও ননী ভট্টাচার্য ছিলেন জমিদার বাড়ির সন্তান। ১৯৪৬ এ কলকাতায় চলে আসেন পূর্ব বঙ্গ থেকে। থাকতেন এখন রবীন্দ্র কানন বলে পরিচিত চিৎপুরের কাছে কোম্পানি বাগানে। সেখানেই তাঁদের কমিউন জীবনের শুরু। ভাড়া দেওয়ার ক্ষমতা নেই। খাটালের একপাল গোরুর সঙ্গেই বাস। ভাড়া লাগত না। গৌতম রায় ও আমার লেখা 'কমিউন কাহিনি' থেকে কিছুটা তুলে দেওয়া যাক। বইটা বাজারে অমিল।
ভাড়া লাগতো না 'কিন্তু গৃহকর্তার পরিকল্পনা হয়ত ছিল অবলা জীবেরা যখন ভোরবেলা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে গোময় আর চোনা ত্যাগ করবে তখন দুই তরুণ বিপ্লবীর ঘুম ভেঙে গিয়ে তাঁরা যে হাঁকডাক করবেন তাতেই দোহনকালের উপস্থিতি টের পাওয়া যাবে। সেই সময়ের একটুকরো দৃশ্য হাজির করে মাখনবাবু জানান, আমি বলতাম ননী, পিঠটা যে ভিজে যাচ্ছে রে। ননী ওর মধ্যেই শুয়ে থাকত। ননী বলত, ফিরে শো।
এর পর মাখনবাবুরা চলে আসেন অধুনা মহাত্মা গান্ধী রোডে (তৎকালীন ৫৭, হ্যারিসন রোডে) যেটা আর এস পি-র দ্বিতীয় কমিউন। এখানে চারপাশে পাইস হোটেল থাকায় খাওয়া-দাওয়ার ভারি সুবিধা হয়ে গেল। শুধু মাছ নয়, মাঝে মাঝে ঝোলের সঙ্গে দু-এক টুকরো মাংসও থাকত। সে-সব খেতে খেতে মাখন একদিন ননীকে 'বাহবা' দিয়ে বললেন, ব্যবস্থা তোর ভালই, তো পাস কোথা থেকে। দু-পয়সা এক পয়সার বেশি তো বরাদ্দ নেই। ননী বললেন, ধুর এতে পয়সা লাগে নাকি। খাওয়া থামিয়ে মাখনবাবু বললেন, তোকে বলতেই হবে। পয়সা না দিয়ে খাবার তুই পাস কোথা থেকে। ননীবাবুর জবাব, আগে খেয়ে নে...। তারপর বলব। খাওয়ার পর মাখনবাবুর সেই একই জিজ্ঞাসা। ননীবাবুর অকপট স্বীকারোক্তি: ঝোলটুকু হোটেল থেকেই দিয়ে দেয়। বাকিটুকু সব পাতকুড়ানো।
এই কৃচ্ছসাধনের কাহিনী মাখন পালের কাছেই শোনা। নোয়াখালির বেগমগঞ্জ থানার সোনাইমুড়ি গ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান, কৃতী ছাত্র মাখন পালের জবানবন্দি: ননীর মুখে মাছ-মাংসের এই ইতিহাস শুনে মনে হল বমি করে দিই।
প্রশ্ন রাখলাম, বমি কি শেষ পর্যন্ত করেছিলেন? মাখনবাবুর জবাব: নারে ভাই, তখন আমাদের চালচুলো নেই। পার্টির অনেক কাজ। পয়সা-কড়ি কিছুই ছিল না। ফলে, বাধ্য হয়ে জেনেশুনে পাতকুড়ানো খেয়ে কাটিয়ে দিলাম। এর পরের কমিউন ৪৯, হ্যারিসন রোডে। ১৯৪৮ সাল। সেখানেও জীবন একইরকম চলত। তবে সেখানে বৈচিত্র্য এনেছিল অমিয় পাল নামে এক কমিউন সদস্য। কিছুদিন সকালবেলা ঘি-কাঁচালঙ্কা-পেঁয়াজ সহকারে পান্তাভাত খাওয়া হত।
কমিউনে আবাসিক বেড়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যে রান্না করে খাওয়ার চল হয়ে গেছে।এখন যেখানে মহেন্দ্র দত্তর ছাতার দোকান, সেখানকার এই কমিউনে থাকতেন মাখন পাল, বিজয় বিশ্বাস এবং পরবর্তীকালের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অরবিন্দ পোদ্দার। নিখিল দাসও তখনও ঢাকায়। এই কমিউন চলত মূলত অরবিন্দ পোদ্দারের রোজগারে।
অরবিন্দ পোদ্দার পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। ৮০ টাকা করে পেতেন। এই টাকায় চলত আর এস পি-র কমিউন। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অরবিন্দ পোদ্দার, যাঁর লেখা 'বঙ্কিম মানস' সত্তর আশি এমনকী নব্বইয়ে অবশ্যপাঠ্য ছিল, চলে গেছেন বছরখানেক আগে, নব্বই পেরিয়ে, অনেকটাই সামাজিক অবহেলায়।
আজ কমিউন কলকাতায় প্রায় নেই। শ্রমিক ভবনে থাকতেন শ্যামল চক্রবর্তী, বিনয় কোনার। এখন কে থাকেন জানতে হবে। তবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র কমিউন স্টাইলে থাকেন। বর্ধমানের রায়নায় সত্তরের শেষ থেকে আশির মাঝামাঝি পর্যন্ত একটা কমিউন ছিল। ছাত্রনেতারা থাকতেন। আমাদের মতো কিছু কিশোর তরুণ চাল ডাল নিয়ে যেতাম দাদাদের জন্য।
খিদে ভাগ করা একটা বড় ব্যাপার। তা যেখানে থাকবে, আদর্শ-ও থাকবে। কনজিউমারিজম প্রতিস্থাপিত করতে পারবে না কমিউনিজমকে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়েছি। ছিনিয়ে খায়নি কেন? আজ সত্যি সত্যি চোখের সামনে একদিন দেখলাম, খাবার ছিনিয়ে নেওয়া। এক বুকস্টলের সামনে।
প্রতি বছরের অভ্যাসে পূজা কমিটির কাজ সামলানোর ফাঁকে কোনো না কোনো বই মণ্ডপ থেকে বই কিনি। বই উপহার দিই। পড়িও। এখন নতুন বই কম। চির পুরাতন বই। তবু কিনি। উপহার দিই।
নিজে জগৎ চিনেছি এই ধরনের বই পড়ে। মার্কসিয় সাহিত্য পড়ে। আজ সন্ধ্যায় একটা কাজ ছিল। একসঙ্গে অনেক দই দরকার। করোনা কাল। এক সঙ্গে বসে খাওয়া বন্ধ। দুপুরের মধ্যাহ্নভোজনে বাড়ি বাড়ি পাঠানোর জন্য দই কেনা। সামাজিক কাজে তো কাউকে না কাউকে ধরতে হয়, দাও ভাই। কেউ মাছ জোগান, কেউ দই/ মিষ্টি/আইসক্রিম। তাঁরাও কর্মকর্তা। অনেকেই স্বেচ্ছায় দেন। একজন আমাদের আবদারে আইসক্রিম খাওয়ালেন। দশমীতে বাঙালি মাছ খাবে না। হয়?
দই দেবো আমি, ঠিক করলাম। দই স্থানীয় দোকান একসঙ্গে হঠাৎ ৪০০ টি দিতে পারবেন না। এদিক ওদিক করে ফোন করলেন। শেষে বললেন, একটু দূরে একটি দোকান দিতে পারে।বলে দিচ্ছি যান। সে-কারণে যাওয়া। যাওয়ার পথে একটা বইয়ের স্টল। দই অর্ডার দিয়ে গেছি বইয়ের দোকান।
বই কিনেছি। দাম দিচ্ছি।
হঠাৎ শোরগোল। পালাল পালাল।
কে পালাল?
এত আলো? এত মানুষ? অদূরেই চিকেন চাউমিন পকোড়ার দোকান।
দেখি রাস্তা তড়িঘড়ি পার হচ্ছে প্রায় গাড়ি চাপা পড়ে একজন মানুষ।
আর হা হুতাশ করছেন তিনজন সুবেশা মহিলা। সঙ্গে একটি বাচ্চা। হাতে একটি সাদা রঙের খাবারের প্যাকেট।
তাদের আক্ষেপ খাবারের প্যাকেট ছিনিয়ে নিয়ে পালাল।
অভিযোগ করলেন, আমাদের উদ্দেশে। বিশেষ করে স্টলে বসে থাকা কমরেডদের উদ্দেশে। কিছু বললেন, না, আপনারা।
কী বলব, আমরা তো ভাবলাম, ইয়ার্কি চলছে। আপনাদের সঙ্গেই তো আসছিল।
মহিলাদের একজন বললেন, ঠিক বলেছেন, আমাদের পাশে বসেছিল, দোকানে যখন চিকেন পকোড়া অর্ডার দিচ্ছি। বারবার দেখছিল ভাজা।
আমি শুনছি আর দেখছি আর দেখছি।
আমি দেখছি লোকটা চলে যাচ্ছেন, গলির মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছেন।
পরনে পোশাক যদিও আলোয় উজ্জ্বল।
নবমী কি সমাগত বাঙালি মধ্যবিত্তের?
ছিনিয়ে খেতে হবে চিকেন পকোড়া?
নাকি তিনি তাঁর বাচ্চাদের জন্য নিয়ে গেলেন কেড়ে?
ওরা খেতে চেয়েছিল। দিতে পারেন নি।
তাই বসে বসে বেপরোয়া হওয়া, কাজহীন হওয়া প্রায় প্রৌঢ় ভদ্র বাবার!
ভয় করছে ভয়।
আপনার করছে না?
পুনশ্চ: ঘটনাটি ঘটেছে ২৫ অক্টোবর রাত আটটা ৪৬ মিনিট নাগাদ। আমি লিখেছি তার অল্প পরে।
এখন বাড়ি ফিরেছি। মনে করার চেষ্টা করছি পুরো চেহারাটা। বাবরি চুল। পোশাক বিয়ের বরের বা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসলে কিংবা যন্ত্রশিল্পীর পরনে তা মেলে তেমন।
আর বেশি লিখতে চাই না।
কেউ চিনুক মানুষটিকে চাই না। তাঁর কষ্টের যন্ত্রণায় আরো নুন দিতে চাই না।
ফটো ভিডিও তুলতে পারতাম। ভাইরাল হতো। তুলি নি। লজ্জায়। সামাজিক লজ্জায়।
ছুটে গিয়ে ধরতে পারতাম। ধরি নি। হীনতায়।
এমন সময়ে বাস করছি। প্রতিবাদে ফেটে পড়তে পারছি না।
পয়সা দিতে চেয়েছিলাম, মহিলাদের। আর একটা প্যাকেট কিনে নিন।
নিলেন না।
তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, অনেকক্ষণ ধরে তোর পাশে বসেছিল, বুঝলি না।
কী করে বুঝব। ভাবলাম, উনিও কিনবেন।
আর একজন বললেন, হয়তো খিদে পেয়েছিল।
খিদে পেয়েছিল তো বটেই।
কার?
মানুষটির সন্তানদের নয়তো!
উনি ঝুলিয়ে নিয়ে গেলেন।
বুকের কাছে ধরে নয়।
বাড়ির লোক জানবে, লোকটা অপদার্থ নয়, ছেলেমেয়েকে এই বাজারে এক প্যাকেট চিকেন পকোড়া কিনে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
কতজন ৭০ টাকার এক প্যাকেট এইভাবে এই প্রখর আলোয় বেপরোয়া হয়ে ছিনতাই করতে পারে।
মহিলাদের গায়ে কিন্তু সোনা ছিল।
অলঙ্কার ছিল একাধিক। সে-সব ছিনতাই করে নি। 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে দস্যুরা বলেছিল, সোনার গয়না নিয়ে কী করবো খাবার দাও খাবার।
অনেকেই সমস্যার গভীরতা বুঝতে পারছেন না!
বিশ্বাস হচ্ছে না, স্টলের কমরেডদের একজনের ফোন নম্বর দিতে পারতাম চাইলে।
ঘটনাটা ২৫-১০-২০২০-র।
যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি। যত দেখি তত শিখি। শেখার কোনো শেষ নাই। এত বছর দোলে মঠ গুড়ের বাতাসা মুড়কি কিনতাম। এবার দীপাবলির জন্য মাটির প্রদীপ আর সলতে কিনতে হঠাৎ হাজির বাইপাসের কাছে কাদাপাড়া ক্ষুদিরাম বাজারে। এত বৈচিত্র্যময় বাজার। এখানে দুর্গাপূজার সময় অভয় মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে শুকনো বোঁদে কিনেছিলাম।
যার যেটা খেতে মানা তার তো সেটাতেই হামলে পড়া।
করোনাকালের সকালেও ইচ্ছে হল শুকনো বোঁদে দিয়ে মুড়ি খাবো। ২০ টাকার বোঁদে কিনতে চালক ১০০ টাকার পেট্রল খরচ করে দৌড়াল। ফিরল বিফল হয়ে।
ওটা দুর্গাপূজা স্পেশাল। আর হয় না। আজ নিজেই ছুটলাম কতোটা কিনলে ওরা বানিয়ে দেবেন জানতে। চারশো টাকার কিনলে হতে পারে। শুনে একটু দমে যাই।
করোনাকালে খুব এর্তুগ্রুল ছবি দেখেছি। রাত জেগে। ১৭০ টা অধ্যায় দেখে ফেলেছি। সবাই কথায় কথায় বলছে -- ইনশাল্লাহ।
আমার এ-সব আসে না।
মনে হল বলি।
দেখি খই মুড়কি নকুলদানা গুড়ের বাতাসা মঠ ঢেলে বিক্রি হচ্ছে। দোকানের পর দোকান। হিন্দভাষী মানুষ দীপাবলিতে কেনেন।
বাতাসা আর নকুলদানা তো গ্রামের ঘরে ঘরে মিলাদ হলেই মিলতো।
কতকাল এ-সব দেখি না।
সেদিন দেখলাম অঢেল।
কিনলাম।
বুঝলাম খাদ্যে বাঙালি মুসলমান আর বিহারি হিন্দু ও বাঙালি হিন্দু এক।
উপলক্ষ্য শুধু আলাদা।
জয় নকুলদানা জয় গুড় বাতাসা।
পম্পা ঘোষ | 2409:40e0:1037:774b:8000::***:*** | ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:৪৯737786
পম্পা ঘোষ | 2409:40e0:1037:774b:8000::***:*** | ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:২৭737787