

দীর্ঘ বিরতির পর ফেরা। সার সার করে ষাঁড়ের গুঁতোয় দেড় কোটি মানুষের জীবন তছনছ বাংলায়। পরিবারের সদস্যদের ধরলে সাড়ে তিন কোটি পার হয়ে যাবে। সারা দেশে ১০ কোটি।
এর মাঝেই -- কত কী হারিয়ে গেল? কত কত নাম!
টমেটোকে বলতাম, বিলিতি বেগুন, কেউ বলতেন, বিলাইতি বাইগন। বেগুন পোড়ার ভর্তাকে বলা হতো, আলু ছানা। আলু ভর্তা আলু ছানা আলু মাখা তিনটাই চলতো।
ওমলেটের নাম ডিম ভাজা। পোচের নাম, নিংড়ি।
ওমলেট না গড়ে কুচো কুচো করলে ডিম হয়ে যেত ডিম ভাজি।
আলু ভাজা এবং ভাজি দুটোই প্রচলন ছিল ।
একটু লঙ্কা আগুন পোড়া। আহা।
কুচো চিংড়ির টক তেঁতুল দিয়ে, সঙ্গে পেঁয়াজ বাটা আর চিনি বা গুড়-- গরম ঠাণ্ডা-- সবেতেই এক সোয়াদ।
ঠাণ্ডা হলে জমে ভালো।
বলার কথা শিবদাস ঘোষের জীবনে প্রেম নিয়ে। চলে গেছি খাওয়ায়।
বলে নিই।
আমার সবচেয়ে পছন্দের খাবার আলু ভর্তা আর সাধারণ মুসুর ডাল। সঙ্গে একটা পোচ হলে সোনায় সোহাগা। আলু ভর্তায় শুকনো লঙ্কা পুড়িয়ে মাখলে জব্বর।
দু একটি লঙ্কার ভাজা বীজ যখন কুট করে দাঁতের আদরে সমাহিত হয়, আহা তার সঙ্গে না দেখা (এবং চাখা) অমৃতই কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে।
আর দুটি প্রিয় খাবারের কথা এই সুযোগে বলে নিই।
সিঁদল শুঁটকি এবং মানকচু বাটা।
এইরকম এক ঠাণ্ডার দিনে মা জন্ম দিয়েছিলেন।
আজ সে দুটো খাব।
আগের খাবারগুলো মায়ের ও বড় মামার কল্যাণে পাওয়া।
সিঁদল ও মানকচু বাটা অর্জন ভ্রাম্যমাণ জীবনে।
বাগুইআটিতে থাকার সময় সৌম্যেন সেনগুপ্তের মা খাইয়ে ছিলেন মানকচু বাটা। তারপর তো সেটা শিখে আমি এত খেতে শুরু করলাম যে, ইউরিক অ্যাসিড হাঁপিয়ে উঠলেন, আমার শরীরে।
আজ খেতেই হবে।
মানকচু ফালি করে কেটে, নারকেল সর্ষে কাঁচা লঙ্কা আর নুন দিয়ে একসঙ্গে শিলে বেটে হাল্কা নুন দিয়ে মেখে -- তেল ছাড়াই সোহাগ সুন্দর।
সিঁদল খাই, আসামের হাইলাকান্দি গিয়ে।
রেল দুর্ঘটনার পর একটার পর একটা অপারেশন। অ্যান্টিবায়োটিক আর ওষুধের ঠেলায় কিছু খেতে রুচি নেই।
এই সময় সিঁদল খাওয়ান এক অধ্যাপক।
ওহ কী যে তার স্বাদ।
আমাকে খানিকটা দেনও আসার সময়।
কুড়ি দিন ধরে একটু একটু করে খাই।
এমনিতেই আমি ভালো জিনিস চেটেপুটে খাই, বিসমিল্লাহের পাগলা সানাইয়ের মতোই।
ছোটবেলায় বিশেষ করে পোস্তর কড়াই আমি ঘষে ঘষে তুলে খেতাম।
দাদি আর মা বলতেন, হাঁড়ি চেঁচে খেলে বৃষ্টি হবে বিয়ের সময়।
এক কথা শুনলাম, সেদিন এক পাঞ্জাবি ধারাবাহিকে।
পাঞ্জাবেও নাকি এই কহাবৎ চালু।
সিঁদল নিয়ে একটু বলা যাক:
সিঁদল এক বিশেষ ধরনের শুঁটকি। পুঁটি/ মৌরলা/ টাকি মাছ শুকিয়ে তাতে বিশেষ ধরনের মশলা সম্ভবত মানকচু বাটা/ হলুদ/ লঙ্কা/ তেল/ পেঁয়াজ/ রসুনের রস ( এগুলো আমি নিশ্চিত নই, গুগুলি জ্ঞান) মাখিয়ে মাটির হাঁড়িতে করে মাটির তলায় মাসখানেক রাখে।
তারপর বিক্রি।
কলকাতায় বৈঠকখানা রোডে ওবরে সবরে মেলে। ২০০০-২৫০০ টাকা কিলো।
একশো গ্রামের দাম দুশো থেকে আড়াইশো টাকা নেয়। বাংলাদেশে এখন হাজার টাকা কিলো। ত্রিপুরায় ৭০০--৮০০ টাকা। আসামের দাম ১২০০-১৪০০। ডাকে আনাই।
বাংলাদেশে চিপাও বলে।
সিঁদলের মাথা ফেলে দিয়ে ভিজিয়ে রান্না করতে হয়। আঁশ থাকলে ফেলে দিই। এরপর চারটে সিঁদল (৩০/৪০ গ্রাম) হলে অন্তত ২৫০ গ্রাম পেঁয়াজ ১০০ গ্রাম রসুন পরিমাণ মতো লঙ্কা হলুদ টমেটো দিয়ে কষা কষা করে আমি খাই।
চাটনি আমি বানাতে জানতাম না।
এখন একটু শিখেছি।
শিলচরের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব দীপক সেনগুপ্ত কলকাতা এলে বা তাঁর সহৃদয় ছেলে কলকাতায় এলে সিঁদলের চমৎকার চাটনি আসে। আমার জন্য। খেয়ে মুগ্ধ ও মাতাল হই।
বাংলাদেশ থেকে ফারুক আহমেদ ভাই এনেছিলেন শুকনো চাপা শুঁটকি। সেটাও জব্বর খেতে। নিজেই বানিয়েছি।
সিঁদল আরেকটু আলাদা।
এবার প্রতিশ্রুত শিবদাস ঘোষের গল্প।
শিবদাস ঘোষ এস ইউ সি দলের প্রতিষ্ঠাতা। দক্ষ সংগঠক। খুব পড়াশোনা করা মানুষ। তাঁর প্রেমে পড়েন এক অপূর্ব সুন্দরী এবং কলকাতার এক বিখ্যাত শিল্প প্রতিষ্ঠানের কন্যা।
বিয়ে তো হল।
সন্তানও।
কিন্তু শিবদাস ঘোষ ঘরছাড়া। কমিউনে থাকেন। বাড়ি যাওয়ার সময় নেই।
একদিন ছোট ছেলেকে নিয়ে শিবদাস ঘোষের স্ত্রী এলেন কমিউনে দেখা করতে। বিকেল থেকে শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টি আর থামে না।
সারা কলকাতা থইথই। ট্রাম বাস অচল।
স্ত্রী ফেরেন কী করে? এদিকে কমিউনে মেয়েদের থাকার নিয়ম তখন হয়নি।
দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক বসল। বিশেষ পরিস্থিতিতে আজকের জন্য এই নিয়মের ব্যতিক্রম হবে। শিবদাস ঘোষের স্ত্রী পুত্র আজ কমিউনে থাকতে পারবেন। কাল সবকিছু ঠিক হলে যাবেন।
বৈঠকর সিদ্ধান্ত নাকচ করে দিলেন শিবদাস ঘোষ। ভেটো দিলেন বলা যায়।
আমার জন্য এই নিয়ম শিথিল করলে ভবিষ্যতে অন্য কেউ করবেন। অতএব..
ওই বৃষ্টির মাঝে হেঁটে হেঁটে ছেলেকে নিয়ে ফিরতে হল বাড়ি। এই গল্প তাঁর ছেলের মুখে 'কমিউন কাহিনি'তে ১৯৯৬ এ লিখেছি। পরে বইও হয়েছে।
ওইজন্যই কিনা জানি না, তাঁদের বিচ্ছেদ হয়।
পরে এস ইউ সি কমিউনে সপরিবার থাকার নিয়ম চালু হয়। তবে নিয়ম হয়, কেউ নিজের ছেলেমেয়ের জন্য আলাদা করে কিছু কিনতে পারবেন না। কিনলে সব ছেলেমেয়ের জন্য কিনতে হবে।
শেষপর্যন্ত সব রক্ষা করা যায় নি।
কনজিউমারিজম কমিউনিজমকে প্রতিস্থাপিত করে বলে আক্ষেপ করেছিলেন কিছু কমরেড।
মাখন ঘোষ আর ননী ভট্টাচার্য ছিলেন আর এস পি দলের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁদের জীবনের কষ্টকর কাহিনি উপন্যাসের চেয়েও রোমাঞ্চকর।
সে কাহিনি পরের দিন।
পম্পা ঘোষ | 2409:40e0:50:53bd:8000::***:*** | ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:০৮737605