এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • প্রান্তিকের চিত্রায়ন : আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির শিল্পসামগ্রী আজ বিপন্ন অথবা বিশ্বায়নের পণ‍্য।

    Manali Moulik লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৭০ বার পঠিত
  • “আমাদের সমাজের যে বিশ্ববীক্ষা,তা আগামীর বুনিয়াদ বই আর কিছুই নয়”।
    .....ভিল কবি জিতেন্দ্র বাসব

    মাটির টান ও সুর যখন প্রাচীন আদিবাসী গোষ্ঠীর তুলির টানে ধরা পড়ে,তখন তা হয়ে ওঠে আদিবাসী শিল্পকলা।এই শিল্পসামগ্রী হলো এমনকিছু যা কোনো আদিম জনগোষ্ঠীর ইতিহাস,সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বস্তুগত চেতনাকে বহন করে।
    উন্নয়নশীল বিশ্ব, বিশেষতঃ এশিয়া -আফ্রিকায় বহুল পরিমাণে প্রাচীন জনগোষ্ঠীর পরিচয় পাওয়া যায়। যাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও শিল্পকলা রয়েছে। ‘আদিম শিল্পসামগ্রী’ বলাটা বোধহয় ঔপনিবেশিক মানসিকতার পরিচয়। যা একটি বৃহৎ মানবসমাজকে ছোট করতে শেখায় ও ইউরোপ-কেন্দ্রিক ধ‍্যানধারণাকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে তুলে ধরে।প্রমাণ হয়, ‘আদিম শিল্পকলা’ বলতে কতিপয় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাজকে পাদপ্রদীপের আলোয় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেগুলি হয়তো মূলধারার শিল্পের তুলনায় নিম্নমানের ও অর্থহীন প্রকৃতির। এতে সেই জনগোষ্ঠী ও তাদের চিন্তাধারাকে অপমান করা হয়। যাইহোক, আমাদের মাতৃভূমি ভারতবর্ষ হলো ‘নৃতত্ত্ব ও পুরাতত্ত্বের জাদুঘর’, এই বহুল বৈচিত্র‍্যময় আদিবাসী শিল্পের সন্ধানের জন‍্য ভারত একটি আদর্শক্ষেত্র। একই কথা আফ্রিকা মহাদেশের জন‍্য প্রযোজ‍্য। যে মহাদেশের বহু মানবগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় অবহেলার কালো অবগুন্ঠনের নীচে আজো অপরিচিত  আছে।
    ◆ পরিচিত কিছু আদিবাসী
    শিল্পকলা
    অজস্র আদিবাসী শিল্পকলার মধ‍্যে কিছু আমাদের কাছে বেশ পরিচিতির দাবী রাখে।
    ভারতের ক্ষেত্রে অন্ত‍্যজ গ্রামীণ শ্রেণীর পটচিত্র(বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের সবং জেলায় প্রচলিত),বিহারের আদিবাসী গোষ্ঠীর মধুবনী চিত্রকলা, মহারাষ্ট্রের গ্রামের ওয়ারলি চিত্রশিল্প,ঝাড়খন্ডের আদিবাসী সাঁওতাল অধ‍্যুষিত গ্রামের রঙিন দেয়ালচিত্র ইত‍্যাদি।
    ◆ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এরূপ ঐতিহ‍্য বহমান। উদাহরণ হিসাবে চিনের সরু-তুলিনির্ভর চিত্রকলা,ইন্দোনেশিয়া,শ্রীলঙ্কার উজ্জ্বল চিত্রাবলী যাতে প্রাচীন তামিলাকামের প্রভাব স্মরণীয়—ইত‍্যাদি উল্লেখযোগ‍্য।
    ◆ আফ্রিকা যেমন বহুসংখ‍্যক প্রাচীন জনগোষ্ঠীর বাসস্থান,তেমনই বৈচিত্র‍্যপূর্ণ তাদের শিল্পসংস্কৃতি। বিখ‍্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো স্বয়ং আফ্রিকার আদিম চিত্রকলার ভক্ত ছিলেন এবং দক্ষিণ সমুদ্রেয অনির্বচনীয় সৌন্দর্য দেখে নিজের চিত্রাঙ্কনে পরিবর্তন আনেন। ইউরোপীয় চিত্রকলায় ‘Cubism’ -এর প্রয়োগ,উজ্জ্বল ও পার্থক‍্যকারী রঙের ব‍্যবহার কিছুটা আফ্রিকার লোকশিল্পের দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছিলো।
    এই তালিকা এতই দীর্ঘ যে স্বল্প পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয়। এখানে মূলত: ভারতবর্ষ ও আফ্রিকার লোকশিল্পের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ করা হয়েছে। শিল্পীর তুলির টান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভ্রম জনমানসে কীভাবে বিভ্রান্তি তৈরী করছে তাও প্রণিধাণযোগ‍্য। এগুলিকে ‘সাংস্কৃতিক শোষণ’ বললেও অত‍্যুক্তি হয় না।
    ◆ ভারতের আদিবাসী শিল্পকলা ও বিশ্বমঞ্চে গ্রহণযোগ‍্যতা
    ভারতের আদিবাসী গোষ্ঠীর মতোই তাদের শিল্পকলার সংখ‍্যা ও বিভিন্নতা অগণিত। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটির বিষয়ে আলোকপাতের চেষ্টা করা হলো।

    ১) তাঞ্জোর চিত্রকলা : ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী দেখতে গেলে দক্ষিণভারত মূলত আর্যাবর্ত(উত্তরভারত) থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন ছিলো। বিন্ধ‍্য পর্বত দাক্ষিণাত‍্যের প্রহরী ও নর্মদা নদী পরিখা হিসাবে কাজ করায় চোল রাজবংশের আমলে তাঞ্জোর চিত্রশিল্পের বিকাশ ঘটে। যা তৎকালীন তামিলরাজ‍্যের রাজধানী হিসাবে গণ‍্য হলেও এখন তাঞ্জাভুর জেলা হিসাবে পরিচিত। তাঞ্জোর চিত্রকলা আদিবাসীদের দ্বারাই অঙ্কিত হয় মূলতঃ হিন্দুধর্মের দেবদেবী ও কৃষ্ণরাধার কাহিনী নিয়ে।তবে শিখ,ইসলাম,জৈন ইত‍্যাদি ধর্মনিরপেক্ষ কাহিনীর রচনাও দেখা যায়। কাঁচ ও কাঠের চালচিত্র যা স্থানীয় তামিলভাষায় ‘পালাগাঈ পাদম’ নামে পরিচিত তার উপরেই চিত্র অঙ্কিত হয়। রঙিন পাথর, কাটা কাঁচ, সোনালী সুতো ইত‍্যাদির সমন্বয়ে অপূর্ব চিত্রকর্ম ফুটিয়ে তোলা হয়। ২০০৭-০৮ সালে GI ট‍্যাগ পেয়ে তাঞ্জোর শিল্প জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে গ্রহণযোগ‍্য হয়েছে।
    ২) ওয়ারলি দেয়ালচিত্র : মারাঠা-গুজরাট সীমান্তের আদিবাসী ও উপজাতি গোষ্ঠীর মধ‍্যে এই চিত্রশিল্প প্রচলিত। কাঠ ও কাদা নির্মিত প্রেক্ষাপটের উপর এই চিত্রকলা ফুটিয়ে তোলা হয়। লাল,হলুদ,বাদামি রঙের দেয়ালের উপর সাদা রঙের সাহায‍্য ওয়ারলি চিত্র অঙ্কন করা হয়। সাধারণত, মানুষের নিত‍্যদিনের কার্যক্রম,নৈর্ব‍্যক্তিক ঘটনাবলি,সমষ্টিগত কাজ ইত‍্যাদি সাদা চকের রেখার দ্বারা ফুটিয়ে তোলা হয়। এগুলি উৎসর্গ করা হয় ‘পালঘাট দেবীর’  উদ্দ‍েশ‍্যে। তাঁকে কৃষিজমির উর্বরতা ও সমৃদ্ধির দেবী হিসাবে পূজা করা হয়।
    ৩) সৌরা চিত্রকলা : ওড়িশার দক্ষিণের জেলাসমূহে সৌরা চিত্রশিল্প সুপরিচিত। নৃবিজ্ঞানী ভেরিয়ার এলউইন প্রথম ওড়িশার আদিবাসীদের এই চিত্রকলার বিষয়ে বিশ্বকে অবগত করেন। এটিও দেয়ালচিত্রের পর্যায়ে পড়ে। লাল ও বাদামী রঙের দেয়ালে সাদা,নীল,কালো ইত‍্যাদি বর্ণময় রেখার সাহায‍্যে সৌরা দেয়ালচিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। বিবাহ,অন্নপ্রাশন,ফসল তোলার পর সামাজিক আনন্দ অনুষ্ঠানের উপলক্ষ্যে  এই দেয়ালচিত্র অঙ্কিত হবার প্রচলন আছে।
    ৪) গোন্ড চিত্রকলা : মধ‍্যপ্রদেশের গোন্ড উপজাতির অসামান‍্য দেয়ালচিত্র গোন্ড চিত্রকলা হিসাবে প্রসিদ্ধ। রানী দুর্গাবতী ও গন্ডোয়ানাল‍্যান্ডের যুদ্ধের কাহিনীও এতে পরোক্ষভাবে স্থান পেয়েছে। এই আদিবাসী শিল্পকলাটিতে অনেক বিন্দু ও রেখার সঙ্গে প্রাণবন্ত রঙের ব‍্যবহার ছবিগুলিকে উজ্জ্বল করে তোলে। বিখ‍্যাত ‘মান্ডালা চিত্রকলার’  আদি উৎস এটিকে বলাই যেতে পারে। উদ্ভিদের রস, কাঠকয়লা,পাতা,রঙিন মাটি ইত‍্যাদি পৌরাণিক দেবদেবী,কৃষ্ণলীলা ছাড়াও আদিবাসী দেবতার ছবি আঁকা হয়। যেমন – মারাহী দেবী, ফুলওয়াড়ি দেবী, ফুলচুক্কি পাখি,সানফাদকি সাপ ইত‍্যাদিও ফুটে ওঠে।
    ৫) পটচিত্র : পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশা হলো পটচিত্রের পীঠস্থান। পট বা কাপড়ের উপর কাদামাটির ক‍্যানভাস তৈরী করে উদ্ভিদের রঙ, কাঠকয়লা,চালগুঁড়ো,আলতা,কাজল,হলুদ দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় অপরূপ নান্দনিক সৌন্দর্যময় চিত্রগুলি। সপ্তদশ শতকে ‘গাজীর পট’ মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘কালীঘাটে পট’ ব্রিটিশ শাসনের প্রথমদিক থেকে ঊনবিংশ শতকের শেষপর্যন্ত এক অনন‍্য শিল্পনিদর্শন হিসাবে ছিলো। কলকাতার বাবুকালচার, মোহন্ত ও এলোকেশী,খাঁচায় পোষা ময়না ইত‍্যাদি সমসাময়িক চিত্রের মাধ‍্যমে পটচিত্র সমাজসচেতনতার দাবী পূরণ করেছিলো।

    ◆ আফ্রিকার আদিবাসী শিল্প ও
    গ্রহণযোগ‍্যতা

    অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ আফ্রিকার আবরণ উন্মোচনে ১৮৭৬ সাল থেকে উদ‍্যোগ নেন বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড। তবে তা  ছিলো আফ্রিকা মহাদেশকে ইউরোপীয় সাম‍্রাজ‍্যবাদী শক্তিগুলির মধ‍্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে নেবার প্রয়াসমাত্র। অজস্র আদিম জনগোষ্ঠী ও প্রান্তিক জনগণের সৃষ্টিশীল সামগ্রীর উপর আলোকপাত হয়েছে অনেক পরে।
    আফ্রিকা মহাদেশে আনুমানিক ৩০০০ ভূমিজ মানবগোষ্ঠী রয়েছে। সুতরাং, আফ্রিকার আদিম চিত্রকলা নিয়ে তথ‍্যনিষ্ঠ রচনা করতে যাওয়া নুনের পুতুলের সাগর মাপতে যাওয়ার সমতুল‍্য।
    ◆ আফ্রিকার উপজাতীয় শিল্প কেবল রেখা ও রঙের মধ‍্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুখোশ, কাঠের সামগ্রী, ব‍্যবহার্য গৃহস্থালির সরঞ্জাম, অলংকার, ঝিনুকের মালা,অস্ত্র ইত‍্যাদির মধ‍্যে বহু সাংস্কৃতিক নিদর্শন রয়েছে।
    আফ্রিকার শিল্পসামগ্রীর অনেকটাই আবিষ্কৃত হয়েছে ১৮০০ – এর পর। ইউরোপীয় মিশনারিগণ কৌতুহলবশত যেগুলি সংগ্রহ করে দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন সেগুলিই খুলে দেয় সামাজিক ইতিহাসবিষয়ক তথ‍্যেয রত্নভান্ডার। মরক্কোয় মার্শাল লিয়াউতে প্রমুখ এবিষয়ে স্মরণীয়। বিশ্বের দরবারে আফ্রিকার চিত্রশিল্পের সামগ্রী বহু আন্তজার্তিক প্রদর্শনশালায় সংরক্ষিত আছে। যেমন—
    Single nkishi sclupture, DRC Trevuren museum
    Ngumoi mask,Tribal gallery – University of IOWA
    Benin plaque, Honinman museum, London.
    Statue by Mambila folk (আফ্রিকার নাইজেরিয়া থেকে সংগৃহীত) musée du quai Branly (Paris)
    আফ্রিকার চিত্রশিল্পের বিশ্বব‍্যাপী পরিচিতি যথেষ্ট উল্লেখযোগ‍্য ও প্রমাণিত সত‍্য।

    ◆ প্রান্তিক শিল্প বিপন্ন অথবা বিশ্বায়নে পণ‍্য

    উন্নয়নশীল বিশ্বের আদিবাসী গোষ্ঠীর শিল্পসামগ্রী নিয়ে বর্তমানে আলোচনা বৈঠকি-স্তরে হয়েই থাকে। কনকনে অডিটোরিয়াম বা টি.ভি. ধারাবাহিকের দৌলতে আদিবাসী সংস্কৃতি নিয়ে এক অদ্ভুতুড়ে ও অসম্পূর্ণ ধারণা মধ‍্যবিত্তের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
    ‘লাখার’ পত্রিকার জাতীয় খ‍্যাতিসম্পন্ন ভিলগোষ্ঠীর কবি জিতেন্দ্র বাসবের কথায় –
    “ আমাদের জল, আমাদের জমিন,নিন নিন, সবই লুটে নিন। তবে মনে রাখবেন, সেই আমরাই কিু লড়ে মরবো আপনাদের আগামী প্রজন্মের জন‍্য। জল – জঙ্গল – জমিনের তরে এ যুদ্ধ কিন্তু আমাদের একার নয়”।
    প্রকৃত অর্থে আদিবাসী চিত্রকলা কেবল নান্দনিকতা ও বিনোদনের মাধ‍্যম নয়। দীর্ঘ ইতিহাসের পালাবদলের সঙ্গে এর সুর একতন্ত্রীতে বাঁধা। তাই বিহারের ভাগলপুর থেকে রাজমহল পাহাড়ের পাদদেশে আজো শোনা যায় সিধু-কানহোর তিরধনুকের বজ্রনির্ঘোষ – ইতিহাস যাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীর মর্যাদা দিলো না কোনোদিন। রাঁচী, তামার,বুন্দু,বোকারো অঞ্চলের তপ্ত বাতাসে বীরসা মুন্ডার উলগুলানের হুংকার একবিংশ শতকেও কান পাতলেই শোনা যায়।  তুলির টান ও ভাস্কর্যেও এসব অমরগাথা উঠে এসেছে। আদিবাসী শিল্প ও চরম আধুনিকতাবাদের দ্বন্দ্বকে আপাত মধুর করে দেখানোই যায়। কিন্তু বাজার অর্থনীতি ও শিল্পীর একনিষ্ঠ স্বাধীনতা কোনোদিনই গান্ধর্ববিবাহসূত্রে বাঁধা পড়তে পারে না। যেসব সমস‍্যা দেখা যায় সেগুলি হলো ---
    ১) সাংস্কৃতিক শোষণ : আদিবাসী শিল্প আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিতি পাবার সঙ্গে সঙ্গেই বাজার অর্থনীতির থাবা বসেছে। এতোদিন তা ‘নেহাৎ মুখ‍্যু’ বলে অবহেলা করা হতো। মূলমঞ্চে গোষ্ঠীগত শিল্পচেতনার প্রায় স্থান ছিলো না। এখন একটি আদিম শিল্পের মূল শিকড়ের বাইরে থেকে এসে একই শিল্পের নকল করার প্রবণতা দেখা যায়। বহুলমাত্রায় প্রচার পাওয়ার লোভে স্থানীয় চিত্রশিল্পের নকল করে প্রদর্শনীতে আনাও চলছে। শিল্পীর প্রতি ন‍্যূনতম শ্রদ্ধা যেমন নেই, তেমনই দায়িত্ববোধ নেই শিল্পের প্রতি। বেখাপ্পা প্রেক্ষাপটে ব‍্যবহার করে আদিবাসী শিল্পের অপব‍্য‍াখ‍্যা ও পণ‍্যায়িতকরণ হয়েছে।
    ২) আর্থিক শোষণ : আদিবাসী শিল্পীরা অধিকাংশই দরিদ্র। শিল্পসামগ্রী নিয়ে তাদের শোষণ করায় প্রক্রিয়া প্রচলিত হয়ে পড়েছে। দারিদ্র‍্যের জন‍্য উপযুক্ত আইনি সাহায‍্যও তারা নিতে পারেনা। নির্মম বাণিজ‍্যিকীকরণের ফাঁদে শিল্পীর শ্বাসরোধ হয়ে আসে। যা কেবল আর্থিক শোষণ নয়, অবমাননাকরও বটে।
    ৩) বৌদ্ধিক চেতনার অধিকার : আদিবাসী শিল্প গোষ্ঠীগত স্মৃতির উপর নির্ভরশীল। এর কোনো তথাকথিত আবিষ্কারক বা শিল্পীবর্গ নেই। বহুপ্রজন্ম ধরে লোকগাথা, নারীদের অবসরের শিল্পচর্চা ইত‍্যাদির ধারা ছড়িয়ে পড়েছে। তাই অনুমতি ছাড়া অপব‍্যবহার করা হলেও কোনো ব‍্যক্তি এককভাবে বিরোধিতা করতে পারেন না।
    ◆ সুরক্ষার স্বার্থে পদক্ষেপ
    সাংস্কৃতিক ঐতিহ‍্য ও লোকশিল্পকে আন্তজার্তিক সমর্থন ও সুরক্ষার লক্ষ‍্যে UNESCO -এর উদ‍্যোগ স্মরণীয়। এক্ষেত্রে দুটি আন্তর্জাতিক আইন হলো –
    1.UNESCO Convention For The Safeguarding Of Intangible Cultural Heritage (2003)
    2. UNESCO Convention On The Protection and Promotion Of the Diversity Of Cultural Expression (2005)
    ভারতীয় সংবিধানের 29(1) নং ধারা প্রতিটি গোষ্ঠীকে নিজস্ব সংস্কৃতি,আচার-ধর্ম ও শিল্প সংরক্ষণের অধিকার দেয়। 51A(f)  মৌলিক কর্তব‍্যের তালিকা অনুযায়ী প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের কর্তব‍্য হলো ভারতের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতিকে গুরুত্বসহকারে রক্ষা করা। এছাড়া GI ট‍্যাগ (Geographical Indication of goods ) registration and protection Act 1999- এর দ্বারা আংশিকভাবে উন্নতির ব‍্যবস্থা করা হয়েছে।

    ◆ ◆ তবে ক্রমাগত যান্ত্রিক উন্নতির ফলে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহজলভ‍্য। যার দ্বারা বহুবছরের চেষ্টাসাধ‍্য শিল্পকলা কয়েকমুহূর্তে এঁকে ফেলা যায়। AI চিহ্নিত করার সফট্ওয়‍্যার আবিষ্কৃত হলেও তা আদিবাসী শিল্পীর কাছে সহজসাধ‍্য নয়। ঐতিহ্যবাহী শিল্পের ওপর গড়ে তোলা কোম্পানিগুলি চটকদার কথা বললেও আদিম শিল্পকলার স্রষ্টাদের শ্রমিকের স্তরেই রাখতে চায়। কোনো সামান‍্য পদ দিয়ে বাণিজ‍্যিক কৌশল নেয় যাতে ওই গোষ্ঠীর কেউ আর সেই সংস্থার বিরুদ্ধে কৃতজ্ঞতাবশত কথা না বলে।
    তাই আদিবাসী শিল্পসামগ্রীকে মূলধারার আলোয় আনতে গিয়ে ও বিপন্নতা রোধ করার কথা বলে আসলে তাকে পণ‍্য করে তোলা হচ্ছে কিনা তার উত্তর সময় দেবে।
    তথ‍্যসূত্র
    ১.http://bhattandjoshiassociates.com
    ২.People’s Archive of Rural India-Tribal art and history.
    ৩.Contemporary-african-art.com
    ৪. Tribal painting in India – Importance and current status.
    ৫.Dutton Denis,Tribal art and artifact, The journal of aesthetics and art criticism, No.1 (Winter,1993) pp. 13 -21

     *******************

        
                       

       
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | 2607:fb91:4c1f:10de:3989:5bab:4904:***:*** | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:০৫738634
  • আমার বেশ ভালোই লাগলো লেখাটা। সঙ্গে কিছু ছবি দিলেও মন্দ হত না।
  • Manali Moulik | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:০৭738635
  • ধন‍্যবাদ। ছবি ইনপুট করার টুল কর্ম করছে না।
  • dc | 2402:e280:2141:1e8:d1c:988a:fe6b:***:*** | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:০৯738636
  • ইন্টারেস্টিং ব্যপার। এ সম্বন্ধে কিছুই জানতাম না, তাই পড়তে ভালো লাগলো। তবে আমার মনে হয় "আদিবাসী শিল্প" কে ঠিকমতো মার্কেটিং করে গ্লোবাল ব্র‌্যান্ড বানানো যায়, তাতে আদিবাসীদেরও লাভ হতে পারে। ওনাদের মধ্যে থেকেও একজন র‌্যাল্ফ লরেন বা কার্ল লাগরফেল্ডের সমতূল্য কেউ উঠে আসতেই পারেন! 
  • r2h | 165.***.*** | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:২৮738637
    • dc |  ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:০৯
    • ... ঠিকমতো মার্কেটিং করে গ্লোবাল ব্র‌্যান্ড বানানো যায়, তাতে আদিবাসীদেরও লাভ হতে পারে। ...
     
    হ্যাঁ। আপনারা যদি ত্রিপুরার অথেন্টিক শুয়োর ভর্তা, গোদক, বাঙ্গুই আর সঙ্গে কয়েক চুমুক লাঙ্গি খান তাহলে দিল তর হয়ে যাবে সে কথা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়। লাঙ্গি আর গোদক তো সাকে আর সুশিকে যে কোনদিন কঠিন প্রতিযোগিতায় ফেলার মত পোটেনশিয়াল রাখে।

    কিন্তু হায় মার্কেটিং না হলে সেসব হারিয়ে যাবে, লোকে ম্যাকডির বাসি বার্গার খেয়ে মজে থাকবে।
  • dc | 2a02:26f7:d6c1:680d:0:e000::***:*** | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৩০738638
  • একদম। ভালোভাবে মার্কেটিং করা দরকার। 
  • Manali Moulik | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৪১738639
  • কিন্তু মার্কেটিং-এর চক্করে আদিবাসীরাই না হারিয়ে যায়! রাষ্ট্রের Institutional discrimination আর mainstream isolation তো আছেই সঙ্গে দোয়ার দিতে!
  • আ খোঁ | 2402:3a80:1969:a62c:378:5634:1232:***:*** | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:২৮738641
  • কনসার্নটি সাধুবাদযোগ্য কিন্তু লেখক লেখার আগে ট্রাইবাল আর্ট কারে বলে আর ফোক আর্ট কারে বলে, এই নিয়ে একটুখানি পড়াশোনা করে নিলে ভালো করতেন এই আর কি।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন