এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  রাজনীতি

  • পাউডার বনাম ধুলো ঘাম

    মালবিকা মিত্র
    আলোচনা | রাজনীতি | ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২৫০ বার পঠিত
  • পাউডার বনাম ধুলো ঘাম
    মালবিকা মিত্র

    আমার ছেলেবেলায় এক সিপিএম নেতা, পরে জেনেছিলাম, তিনি পার্টির জেলা কমিটির সদস্য, বলেছিলেন -- সোভিয়েত ইউনিয়নে স্তালিন পরবর্তী যুগের অধঃপতনের জন্য প্রধানত দায়ী নাকি স্তালিন নিজেই। তার যুক্তি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের জার্মান বাহিনীরে আটকানির জন্য স্তালিন যেভাবে উঁচু থিকা নিচু, ব্যাবাক পার্টি নেতাদের সরাসরি জনযুদ্ধে নামাইয়া দিছিলেন, সেইডা ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। হ্যার লইগ্যাই স্তালিনের কোন যোগ্য উত্তরাধিকারী বাইচ্যা ছিল না। হ্যার লইগ্যাই ক্রুশ্চেভ বুলগানিনগো উত্থান সম্ভব হইছিল। -- অসাধারণ সিপিএম ব্যাখ্যা। এখন সেই নেতার যুক্তিটা মনে পড়লে, সলিল চৌধুরীর লেখা একটা ব্যঙ্গ গীতি মনে পড়ে যায় :

    আমি খাইনি বটে গুলি গোলা, যাইনি বটে জেলে -- কিন্তু সেটা এই ভেবে যে, আমি মারা গেলে, কি হবে? দেশে রইবে কেবা আর, কে করবে দেশোদ্ধার,
    তাই মরতে আমি বলি সদাই, নিজে মরি নাই।
    ও ভাইরে ভাই, মোর মত আর দেশপ্রেমিক নাই।

    যেখানে আমরা বলে থাকি বিশেষ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নেতৃত্বকে উপর তলা থেকে নিচে মাটিতে নেমে আসতে হয়। উপর থেকে নির্দেশ দিয়ে জনগণকে বুস্টিং দেওয়া যায় না। নিজেকে সামনে দাঁড়িয়ে স্পীয়ার হেড হিসেবে কাজ করতে হয়। এটা না করলে জনযুদ্ধ রূপায়ণ করা সম্ভব হতো না। হিটলার কে প্রতিহত করাও সম্ভব হতো না। সেখানে ওই ব্যাখ্যা শুনে নেতাটির ওপর করুণা হতো।

    এতদিন পরে "উদিলো স্মরণে বালক কালের কথা" -- কথাটা উঠলো কেনো বলি। এস আই আর নিয়ে শুরু থেকেই রাজ্যের বিরোধী দলনেতা দেড় কোটি দুই কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার হাঁক দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন নয়, বিজেপি নেতা বলে দিচ্ছেন নির্বাচন কমিশন কি করবে। যাই হোক প্রথম দফায় মৃত, স্থানান্তরিত, দু জায়গায় নাম থাকা, এই সমস্ত মিলিয়ে প্রায় ৫৮ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেল। এটা খুব অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু বিজেপি নেতা তো বলে দিয়েছেন, সীমা বেঁধে দিয়েছেন, দেড় কোটি দু কোটি নাম বাদ যাবে। অতএব এরপর শুরু হল নাম বাদ দেওয়ার নতুন কৌশল। ভোটার তালিকায় যে সমস্ত ক্ল্যারিক্যাল মিসটেক, ক্লারিকেল ডিস্ক্রিপেন্সি ছিল, সেগুলোকে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি আখ্যা দিয়ে ভোটারদের নোটিশ ধরানো শুরু হলো।

    একটু উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে। বহু ক্ষেত্রেই ভোটার তালিকায় নামের মধ্যভাগ চন্দ্র, দেব, নাথ, কুমার, এগুলো অনুপস্থিত। কিন্তু সার্টিফিকেটে, জমির দলিলে, আধার কার্ডে, সেগুলো উপস্থিত। অতএব এই ক্লারিকেল ডিস্ক্রিপেন্সি মাথামোটা নির্বাচন কমিশনের চোখে লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেনসি। বহু ক্ষেত্রে ব্যানার্জি - বন্দ্যোপাধ্যায়, চ্যাটার্জি - চট্টোপাধ্যায়, মুখার্জি - মুখোপাধ্যায়, রায় এবং রয়, পাল এবং পল, বসু এবং বোস, এর মধ্যে অসংগতি দেখতে পেয়েছেন। পাঁচ বা ছয়জনের পিতার নাম এক হলে সেটাও এদের চোখে অসংগতি। পিতা মাতার সাথে সন্তানের বয়সের ফারাক নিয়েও এদের চোখে অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। এভাবে হাজারো অসংগতির দোহাই দিয়ে। প্রায় এক কোটি ৫৩ লক্ষ মানুষকে নোটিশ ধরানো হলো।

    এরপরেই রাজ্য জুড়ে দিশেহারা ভোটার, দিশাহীন বিএলও, তাদের একের পর এক আত্মহত্যা, পরিস্থিতিকে প্রতিদিনই ভয়ংকর করে তুললো। শুরু থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এসআইআর কে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে উপেক্ষা ও প্রশ্রয় দিয়েছেন। এগুলো তো হয়েই থাকে, অর্থাৎ ভোটার তালিকার সাধারণ সংশোধন হিসেবে দেখেছেন। একমাত্র তৃণমূল দল ও তার নেত্রী ঘোষণা করেন -- এরাজ্যে এসআইআর হতে দেব না। সারা রাজ্যজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ কে তৃণমূল দল পথে নামালো এসআইআর এর প্রতিবাদ। স্বীকার করতেই হবে লিবারেশন শুরু থেকেই বিহারের অভিজ্ঞতা থেকেএসআইআর এর প্রতিবাদ করে। কিন্তু ফল অর্শায় নি। কারণ বিজেপি নেতৃত্ব আগেই নাম বাতিলের সীমা রেখা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে -- দু কোটি মানুষের নাম বাদ যাবে। অতএব নির্বাচন কমিশন তার লক্ষ্য মাত্রা অর্জন করতে বদ্ধপরিকর।

    সহজ উদাহরণ দিই। ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় ভোটারের নাম স্পন্দন বসু। ২০২৫ সালের ভোটার তালিকায় ওই ব্যক্তির নাম স্পন্দন কুমার বসু। কমিশনের চোখে এটা অসঙ্গতি। ঠিকই তো, এটা অসঙ্গতি। প্রশ্ন হলো, দুটো নামের এন্ট্রি তো নির্বাচন কমিশনেরই করা। ওই ব্যক্তি ২০০২ সালের পর নাম সংশোধনের ফর্ম পূরণ করে জমা দিয়েছিলেন। তবেই তো সংশোধিত নাম উঠেছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটা কমিশন নিজেই করেছে। এখন ভোটার তার আধার কার্ড, প্যান কার্ড, মাধ্যমিক এডমিট কার্ড, যা কিছু নিয়ে হাজির হচ্ছেন। সর্বত্র তিনি স্পন্দন কুমার বসু, কমিশন এতে খুশি নয়। কারণ ২০০২ এর ওই স্পন্দন বসু যে এই স্পন্দন কুমার বসু, সেটা প্রমাণ হবে কিভাবে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন একটি ভুল করেছিল সেই ভুলের খেসারত দিতে হবে ভোটারকে।

    উদাহরণ বাড়াবো না। এক মহিলার এসআইআর ফর্মে বাবার নাম রমেশ দাস। ওই ফর্মেই স্বামীর নাম লেখা আছে রমেশ দাস। কমিশনের মাথা ঘুরে গেল। নোটিশ গেল। ভদ্রমহিলার মাধ্যমিক এডমিট কার্ডে পিতার নাম রমেশ দাস। ব্যাংকের পাস বইয়ের স্বামীর সাথে জয়েন্ট একাউন্টে স্বামীর নাম রমেশ দাস। ঘটনা হলো মেয়েটির পিতার নাম রমেশ দাস এবং স্বামীর নামও প্রকৃতই রমেশ দাস। আমরা মজা করে ওকে বলতাম, " কার্তিক ইজ কলিং কার্তিক "। বলতাম খুব ভালো হয় ছেলের নামও রাখবি রমেশ দাস। হতেই পারে দুজনের একই নাম, এটা কে কাকে বোঝাবে?

    একে তো গবেট মাথা মোটা কমিশন, সে তো আবার সরকারের যো হুজুর। বুদ্ধি বন্ধক রেখেছে, ফলে আরও মাথামোটা। সে সব কাজটা করাচ্ছে এআইকে দিয়ে। এআই টেকনোলজি বরুণ ঘটক কে একবার পড়ে ঘাতক, তারপর ঘটাক, অবশেষে ঘটক। সুবোধ কপাট কে পড়ে কপট, কাপাট। আমি তাকে একটা বাংলা বাগধারা দিয়ে বলেছিলাম প্লিজ ট্রান্সলেট ইন্টু ইংলিশ। এআই উত্তর দিয়েছিল I don’t understand Bengali yet, but I’m working on it. I will send you a message when we can talk in Bengali. এআইকে বলেছিলাম Please elaborate about INK Hospital in Bengali. এআই এর উত্তরে জানালো -- "কালি হাসপাতাল কলকাতার পার্ক সার্কাসে অবস্থিত....." ইত্যাদি ইত্যাদি। এআইকে প্রশ্ন করলাম -- ভাইজ্যাগ কি? তার উত্তর কপি পেস্ট করছি -- ভাই, জ্যাক একটা আই আই টি ছাত্র ছিল। যে বাইরে থেকে এসেছিল পড়াশোনা করতে। সে একটা হোস্টেলে থাকত। হোস্টেলের মেসে খেত। সে খুব ভালো ফুটবল খেলত। একদিন সে ফুটবল খেলতে গিয়ে আপসেট হয়ে যায়। আর তারপর থেকে সে আর ফুটবল খেলেনি। মুম্বাই - বোম্বাই, তিরুবনন্তপুরম - ত্রিবান্দ্রম, ব্যাঙ্গালোর - বেঙ্গালুরু, বরোদা - ভাদোদরা এ সবই তো তবে লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেনসি। কী সর্বোনাশ।

    ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ঢক্কা নিনাদে এআইকে দিয়ে ভোটার তালিকা বানানোর এই পরিণতি অনিবার্য। ভাবতে অবাক লাগে গ্রিক পণ্ডিতদের লেখায় সুতলেজ, বিয়াস, ইন্ডু, হাইদাস্পাস, সাণ্ডাকোস্তা, এই সমস্ত ঘেঁটে ঐতিহাসিকরা শতদ্রু, বিপাশা, সিন্ধু, ঝিলাম, চন্দ্রগুপ্ত, নামগুলি উদ্ধার করেছিলেন। আধুনিক ডিজিটাল যুগের এআই হলে মৌর্যদের ইতিহাস রচনা করাই যেত না। সে যাই হোক এই পাহাড় প্রমান ইলজিক্যাল, টেকনোলজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি কে নির্বাচন কমিশন লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বলে চালাতে চাইছে। আমরা চিরকাল জেনে এসেছি ভোটার তালিকার বয়সটা কখনোই ব্যক্তির বয়সের প্রমাণপত্র নয়। ২০০১ সালে যে ভোটারের বয়স তালিকায় ৩৫ বছর ছিল ২০১০ সালেও তার বয়সটা ৩৫ থেকে গেছে। এভাবেই থেকে যায়, যতদিন না পূর্ণাঙ্গ রিভিশন না হয়। সেই কারণে বয়সের অসংগতি লক্ষ্য করা যায়।

    মুখ্যমন্ত্রী এই অযৌক্তিক ইলজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বা অসঙ্গতি গুলিকে তুলে ধরতে সশরীরে বেশ কিছু প্রমান, সাক্ষী সহ সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত হয়েছিলেন। এটা নিয়ে বিজেপি, সিপিএম, এমন কি কংগ্রেস, গেল গেল রব তুলেছে। যে কাজ আইনজীবীদের, সে কাজে মুখ্যমন্ত্রী গেলেন কেন? মুখ্যমন্ত্রীর এই ভূমিকা নাটক বাজি বলে তাদের অভিমত। মল্লিকার্জুন খাড়্গে, লিবারেশনের দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, এরা অনেকেই, এমনকি সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য মানিক সরকার মুখ্যমন্ত্রীর এই ভূমিকা কে সমর্থন করেছেন। সমালোচকরা ভুলে যাচ্ছেন যে, এসআইআর বিরোধী লড়াই রাস্তায়, আদালতে, সংসদে, সর্বত্র সর্বাত্মক করা প্রয়োজন। সেই সর্বাত্মক লড়াইয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি আদালতে উপস্থিত হওয়া বাড়তি উদ্যম ও উন্মাদনা তৈরি করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ গুলিও সেই কথাই প্রমাণ করছে।

    বিরোধী নেত্রী হিসেবে মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বত্র নিজেই হাজির হয়ে যেতেন অন্য সবার চেয়ে আগে ভাগে। তখন তার প্রোটোকলের বালাই ছিল না। পার্ক স্ট্রিটের কাছে প্রদীপ কুন্দলিয়ার বেআইনি বহুতল ভেঙে পড়ার পর উদ্ধার কার্যের সময়ে কতগুলি মৃতদেহ উদ্ধার হলো, কিভাবে উদ্ধার কার্য চলছে, যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে বসে থেকে তার তদারকি করেছেন দেখেছি। হুগলির পুলিশ বলাগড়ের একজন তৃণমূল কর্মীর মৃতদেহ বাড়ির লোকের হাতে অর্পণ করতে রাজি হয়নি। এই খবরটা শোনার পর বাঁকুড়া থেকে ফেরার পথে শ্রীমতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি চুঁচুড়ায় আদালতে উপস্থিত হন। কোনো গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে গিয়ে সিপিআইএম কর্মীদের বাধার সামনে, তিনি কোন কর্মীর মোটর বাইকের পেছনে উঠে পড়েন। যে কোন মূল্যে তাকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। এভাবেই তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন ২০০৬ এর সেপ্টেম্বর মাসে সিঙ্গুরে অনিচ্ছুক চাষীদের কাছে।

    মনে রাখবেন, ২০০৪ সালে নির্বাচনে তৃণমূলের মাত্র একজন সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর ২০০৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের মাত্র ২৯ জন বিধায়ক। গোটা দল ভেঙে পড়েছে, মুষড়ে পড়েছে। এই আঁধারে, থমথমে নৈঃশব্দে আলো দেখতে পাওয়া, আশার বাণী শুনতে পাওয়া বড়ই দুঃসাধ্য। সেই সময়ে সিঙ্গুরে নেত্রীর হাজির হওয়া গোটা দলকে চাগিয়ে তুললো। মনে রাখবেন, এই সময়েই বিষ্ণুপুর পশ্চিম কেন্দ্রের উপনির্বাচনে মদন মিত্রের জয়লাভ দিয়ে শুরু হল ঘুরে দাঁড়ানো। এরপর পঞ্চায়েত লোকসভা সে ইতিহাস সবার জানা। বাংলার মেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার মানুষের মনকে পড়তে জানেন, চেনেন। তিনি আপদমস্তক বাংলার মেয়ে বাংলার মা।

    কেন তিনি সকলের মা সকলের দিদি জানেন? দলীয় বা সরকারি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী ভাব গম্ভীর মুখে, থুতনিতে তর্জনী ঠেকিয়ে, মঞ্চ আলোকিত করে বসে থাকেন না। বরং মাননীয়া সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় কে হাত ধরে মঞ্চে তুলে আনেন। চা এগিয়ে দেন। দুর্বিনীত হাউস স্টাফদেরও বলেন, বৃষ্টি তে ভিজো না, ঘরে এসে বসে অন্তত একটু চা খেয়ে যাও। নবান্নে একাকী অপেক্ষা করেন জুনিয়র ডাক্তার দের অপেক্ষায়। সরাসরি পৌঁছে যান জুনিয়র ডাক্তারদের অবস্থান মঞ্চে। ২০১৯ এ দেখেছি মহাজোটের ব্রিগেডের পর, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, ওমর আবদুল্লাহ দের তিনি নিজের হাতে চা খাওয়াচ্ছেন। হ্যাঁ আপদমস্তক একজন বাঙালি, বাংলার মেয়ে, বাংলার মা।

    লক্ষ্য করুন আচমকা ভোর বেলায় ফিরহাদ হাকিম সহ ছয় জন নেতার বাড়িতে সিবিআই হানার সেই দিন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৎক্ষণাৎ সরাসরি পৌঁছে যান নিজাম প্যালেসে। তিনি জানেন এই গ্রেফতারের ঘটনা একদিকে যেমন বাংলার সাধারণ জনমানসে চরম অসন্তোষ ও পরিণতিতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে। তেমনি মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি সিবিআই অফিসারদের সংযত থাকতে বাধ্য করবে, দলীয় কর্মীদেরও। আবার ভাবুন আইপ্যাক এর অফিসে ইডি হানা, নেত্রী এক মুহূর্ত দেরি না করে সরাসরি উপস্থিত হলেন আইপ্যাক এর দপ্তরে। সোজাসুজি অফিসারদের কাছ থেকে চেয়ে নিলেন নির্দিষ্ট ফাইল ও কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক। দিল্লির বঙ্গভবনে দিল্লী পুলিশ সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বাংলা থেকে যাওয়া কিছু মানুষকে গৃহবন্দী করে তল্লাশি চালিয়ে এস আই আর হয়রানির প্রয়োজনীয় সাবুদ নষ্ট করতে প্রয়াস চালায়। নেত্রী সেসময় একটুও কাল বিলম্ব না করে ঘরে থাকা আটপৌরে শাড়িতে বেড়িয়ে এসে সোজাসুজি দিল্লী পুলিশকে বাধা দেয়। একইভাবে তিনি কত অবলীলায়, অসম সাহসে, প্রবল আত্মবিশ্বাসে, তীব্র মানবিক আবেগে, সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করলেন নিজেই। যে সওয়ালে ইংরেজি গ্রামার প্রাধান্য পায় না, মানবিক আবেগ ও যুক্তির প্রাধান্য ও বঙ্গবাসীর প্রতি আকুতি ছিল বেশি। আমার মনে পড়ছিল --
    উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত"
    (ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না)। ইংরেজি গ্রামার নয়, সত্যের মুখোমুখি হবার জন্য সাহস অবলম্বন করো।

    ঠিক কখন কোন সময়ে পথে নামতে হবে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে, কখন নিজেকে সংযত রাখতে হবে, এই জ্ঞান বাংলার মেয়ে, বাংলার মাকে শিখতে হয়েছে বাংলার পথ ঘাট থেকেই। বহু অনুকরণের চেষ্টা চলছে। বহু বিরোধীদল আর একটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জেরক্স কপি খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু জেরক্স কপি তো আর মূল কপি নয়। মনে রাখবেন ১৯৮৪ সালে রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাস্ত করেছিলেন সিপিআইএম দলের সর্বশক্তিমান সাংসদকে এবং সিপিআইএমের শক্তিশালী গড় যাদবপুরে। এর পাশাপাশি তুলনা করুন সিপিআইএম দলের বর্তমান উদীয়মান ক্যাপ্টেন তিনি নন্দীগ্রামে শুধু জমানত খুইয়েছেন তাই নয়, সম্ভবত বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআইএম দলের সবচেয়ে কম পরিমাণ ভোট পেয়েছিলেন। সম্ভবত কমবেশি ৬২০০ মাত্র। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে একমাত্র তুলনা পাই সিপিএমের বিমান বসু, সুনীত চোপড়ার। পথে মাঠে ময়দানে যাঁরা স্বচ্ছন্দ।

    দলের মধ্যে থেকে লড়াই, দলের বাইরে এসে লড়াই, একইসঙ্গে প্রবল প্রতিপক্ষ সিপিএম এবং সেই সাথে প্রদেশ কংগ্রেস দলের কেষ্ট বিষ্টু নেতারা। তাঁর আটপৌরে নিম্নবিত্ত পরিচয়কে দলের মধ্যেই খোঁচা দিয়েছেন কিছু নেতা "বেদের মেয়ে জোছনা" বলে। লড়াইয়ের মধ্য থেকেই তার জন্ম। কোন বংশপরিচয়, পারিবারিক বৈভব, ঐতিহ্য অবলম্বন করে নয়, পথের লড়াই এর মধ্য দিয়ে তিনি এগিয়ে গেছেন। আর পথে না নামলে কে কবে নির্দিষ্ট ঠিকানায় কবেই বা পৌঁছতে পেরেছে? পথই তাকে পথের দিশা দেখিয়েছে। এই রাজ্যের বিরোধীরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে থাকুন -- মুখ্যমন্ত্রীর এভাবে এগিয়ে যাওয়া সমীচীন কিনা। আলোচনা করুন তিনি কি কি ভুল ইংরেজি বলেছেন। ততদিনে মুখ্যমন্ত্রীর ঝটিকা উপস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে একটি পর একটি ভুল করে চলবে। নতুন করে শুনানির দিন পেছবে। ডমিসাইল সার্টিফিকেট, মাধ্যমিক এডমিট কার্ড, নথি হিসেবে স্বীকৃত হবে। সম্পূর্ণ না হলেও বাংলার আরও কিছু মানুষ তার অধিকার অনেকাংশেই ফিরে পাবেন। মুখ্যমন্ত্রীর প্রথম ঘোষণা ছিল কোন বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দিতে দেব না। শেষ অবধি মানুষ দেখবে, ইতিহাস জানবে, সকলে ওয়াক ওভার দেননি, ময়দান ছেড়ে পালাননি। অন্তত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সশরীরে ময়দানে নেমে, সকলের না হোক, বহুজনের ভোটাধিকার সুরক্ষিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২৫০ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    এলি - Emanul Haque
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • :|: | 2607:fb90:bd99:8e47:a5c6:57c4:9209:***:*** | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৪:০৫738547
  • শেষটা পুরো গুল্প। এখনই জিজ্ঞাসা করলাম চ্যাটজিকে তো বললো,
    "ভাইজ্যাগ (Vizag) হলো Visakhapatnam শহরের সংক্ষিপ্ত ও জনপ্রিয় নাম।
    এটি ভারতের Andhra Pradesh রাজ্যে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় শহর, যা বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত।
    ভাইজ্যাগের বিশেষত্ব:
  • aranya | 2601:84:4600:5410:bcaf:82ed:b40f:***:*** | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৪:১৫738548
  • 'একমাত্র তৃণমূল দল ও তার নেত্রী ঘোষণা করেন -- এরাজ্যে এসআইআর হতে দেব না' - বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের স্ট্যান্ড কি ছিল? 
  • dc | 2402:e280:2141:1e8:606b:4350:8b8a:***:*** | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:১৮738550
  • ভাইজাগের বর্ণনা পড়ে অনেকক্ষন হাসলাম laugh তবে না, আমারও মনে হচ্ছে ওটা মানুষেরই লেখা, চ্যাটজিপিটির না laugh
     
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন