এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  রাজনীতি

  • পাউডার বনাম ধুলো ঘাম

    মালবিকা মিত্র
    আলোচনা | রাজনীতি | ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩৬ বার পঠিত
  • আমার ছেলেবেলায় এক সিপিএম নেতা, পরে জেনেছিলাম, তিনি পার্টির জেলা কমিটির সদস্য, বলেছিলেন -- সোভিয়েত ইউনিয়নে স্তালিন পরবর্তী যুগের অধঃপতনের জন্য প্রধানত দায়ী নাকি স্তালিন নিজেই। তার যুক্তি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের জার্মান বাহিনীরে আটকানির জন্য স্তালিন যেভাবে উঁচু থিকা নিচু, ব্যাবাক পার্টি নেতাদের সরাসরি জনযুদ্ধে নামাইয়া দিছিলেন, সেইডা ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। হ্যার লইগ্যাই স্তালিনের কোন যোগ্য উত্তরাধিকারী বাইচ্যা ছিল না। হ্যার লইগ্যাই ক্রুশ্চেভ বুলগানিনগো উত্থান সম্ভব হইছিল। -- অসাধারণ সিপিএম ব্যাখ্যা। এখন সেই নেতার যুক্তিটা মনে পড়লে, সলিল চৌধুরীর লেখা একটা ব্যঙ্গ গীতি মনে পড়ে যায় :

    আমি খাইনি বটে গুলি গোলা, যাইনি বটে জেলে -- কিন্তু সেটা এই ভেবে যে, আমি মারা গেলে, কি হবে? দেশে রইবে কেবা আর, কে করবে দেশোদ্ধার,
    তাই মরতে আমি বলি সদাই, নিজে মরি নাই।
    ও ভাইরে ভাই, মোর মত আর দেশপ্রেমিক নাই।

    যেখানে আমরা বলে থাকি বিশেষ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নেতৃত্বকে উপর তলা থেকে নিচে মাটিতে নেমে আসতে হয়। উপর থেকে নির্দেশ দিয়ে জনগণকে বুস্টিং দেওয়া যায় না। নিজেকে সামনে দাঁড়িয়ে স্পীয়ার হেড হিসেবে কাজ করতে হয়। এটা না করলে জনযুদ্ধ রূপায়ণ করা সম্ভব হতো না। হিটলার কে প্রতিহত করাও সম্ভব হতো না। সেখানে ওই ব্যাখ্যা শুনে নেতাটির ওপর করুণা হতো।

    এতদিন পরে "উদিলো স্মরণে বালক কালের কথা" -- কথাটা উঠলো কেনো বলি। এস আই আর নিয়ে শুরু থেকেই রাজ্যের বিরোধী দলনেতা দেড় কোটি দুই কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার হাঁক দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন নয়, বিজেপি নেতা বলে দিচ্ছেন নির্বাচন কমিশন কি করবে। যাই হোক প্রথম দফায় মৃত, স্থানান্তরিত, দু জায়গায় নাম থাকা, এই সমস্ত মিলিয়ে প্রায় ৫৮ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেল। এটা খুব অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু বিজেপি নেতা তো বলে দিয়েছেন, সীমা বেঁধে দিয়েছেন, দেড় কোটি দু কোটি নাম বাদ যাবে। অতএব এরপর শুরু হল নাম বাদ দেওয়ার নতুন কৌশল। ভোটার তালিকায় যে সমস্ত ক্ল্যারিক্যাল মিসটেক, ক্লারিকেল ডিস্ক্রিপেন্সি ছিল, সেগুলোকে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি আখ্যা দিয়ে ভোটারদের নোটিশ ধরানো শুরু হলো।

    একটু উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে। বহু ক্ষেত্রেই ভোটার তালিকায় নামের মধ্যভাগ চন্দ্র, দেব, নাথ, কুমার, এগুলো অনুপস্থিত। কিন্তু সার্টিফিকেটে, জমির দলিলে, আধার কার্ডে, সেগুলো উপস্থিত। অতএব এই ক্লারিকেল ডিস্ক্রিপেন্সি মাথামোটা নির্বাচন কমিশনের চোখে লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেনসি। বহু ক্ষেত্রে ব্যানার্জি - বন্দ্যোপাধ্যায়, চ্যাটার্জি - চট্টোপাধ্যায়, মুখার্জি - মুখোপাধ্যায়, রায় এবং রয়, পাল এবং পল, বসু এবং বোস, এর মধ্যে অসংগতি দেখতে পেয়েছেন। পাঁচ বা ছয়জনের পিতার নাম এক হলে সেটাও এদের চোখে অসংগতি। পিতা মাতার সাথে সন্তানের বয়সের ফারাক নিয়েও এদের চোখে অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। এভাবে হাজারো অসংগতির দোহাই দিয়ে। প্রায় এক কোটি ৫৩ লক্ষ মানুষকে নোটিশ ধরানো হলো।

    এরপরেই রাজ্য জুড়ে দিশেহারা ভোটার, দিশাহীন বিএলও, তাদের একের পর এক আত্মহত্যা, পরিস্থিতিকে প্রতিদিনই ভয়ংকর করে তুললো। শুরু থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এসআইআর কে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে উপেক্ষা ও প্রশ্রয় দিয়েছেন। এগুলো তো হয়েই থাকে, অর্থাৎ ভোটার তালিকার সাধারণ সংশোধন হিসেবে দেখেছেন। একমাত্র তৃণমূল দল ও তার নেত্রী ঘোষণা করেন -- এরাজ্যে এসআইআর হতে দেব না। সারা রাজ্যজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ কে তৃণমূল দল পথে নামালো এসআইআর এর প্রতিবাদ। স্বীকার করতেই হবে লিবারেশন শুরু থেকেই বিহারের অভিজ্ঞতা থেকেএসআইআর এর প্রতিবাদ করে। কিন্তু ফল অর্শায় নি। কারণ বিজেপি নেতৃত্ব আগেই নাম বাতিলের সীমা রেখা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে -- দু কোটি মানুষের নাম বাদ যাবে। অতএব নির্বাচন কমিশন তার লক্ষ্য মাত্রা অর্জন করতে বদ্ধপরিকর।

    সহজ উদাহরণ দিই। ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় ভোটারের নাম স্পন্দন বসু। ২০২৫ সালের ভোটার তালিকায় ওই ব্যক্তির নাম স্পন্দন কুমার বসু। কমিশনের চোখে এটা অসঙ্গতি। ঠিকই তো, এটা অসঙ্গতি। প্রশ্ন হলো, দুটো নামের এন্ট্রি তো নির্বাচন কমিশনেরই করা। ওই ব্যক্তি ২০০২ সালের পর নাম সংশোধনের ফর্ম পূরণ করে জমা দিয়েছিলেন। তবেই তো সংশোধিত নাম উঠেছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটা কমিশন নিজেই করেছে। এখন ভোটার তার আধার কার্ড, প্যান কার্ড, মাধ্যমিক এডমিট কার্ড, যা কিছু নিয়ে হাজির হচ্ছেন। সর্বত্র তিনি স্পন্দন কুমার বসু, কমিশন এতে খুশি নয়। কারণ ২০০২ এর ওই স্পন্দন বসু যে এই স্পন্দন কুমার বসু, সেটা প্রমাণ হবে কিভাবে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন একটি ভুল করেছিল সেই ভুলের খেসারত দিতে হবে ভোটারকে।

    উদাহরণ বাড়াবো না। এক মহিলার এসআইআর ফর্মে বাবার নাম রমেশ দাস। ওই ফর্মেই স্বামীর নাম লেখা আছে রমেশ দাস। কমিশনের মাথা ঘুরে গেল। নোটিশ গেল। ভদ্রমহিলার মাধ্যমিক এডমিট কার্ডে পিতার নাম রমেশ দাস। ব্যাংকের পাস বইয়ের স্বামীর সাথে জয়েন্ট একাউন্টে স্বামীর নাম রমেশ দাস। ঘটনা হলো মেয়েটির পিতার নাম রমেশ দাস এবং স্বামীর নামও প্রকৃতই রমেশ দাস। আমরা মজা করে ওকে বলতাম, " কার্তিক ইজ কলিং কার্তিক "। বলতাম খুব ভালো হয় ছেলের নামও রাখবি রমেশ দাস। হতেই পারে দুজনের একই নাম, এটা কে কাকে বোঝাবে?

    একে তো গবেট মাথা মোটা কমিশন, সে তো আবার সরকারের যো হুজুর। বুদ্ধি বন্ধক রেখেছে, ফলে আরও মাথামোটা। সে সব কাজটা করাচ্ছে এআইকে দিয়ে। এআই টেকনোলজি বরুণ ঘটক কে একবার পড়ে ঘাতক, তারপর ঘটাক, অবশেষে ঘটক। সুবোধ কপাট কে পড়ে কপট, কাপাট। আমি তাকে একটা বাংলা বাগধারা দিয়ে বলেছিলাম প্লিজ ট্রান্সলেট ইন্টু ইংলিশ। এআই উত্তর দিয়েছিল I don’t understand Bengali yet, but I’m working on it. I will send you a message when we can talk in Bengali. এআইকে বলেছিলাম Please elaborate about INK Hospital in Bengali. এআই এর উত্তরে জানালো -- "কালি হাসপাতাল কলকাতার পার্ক সার্কাসে অবস্থিত....." ইত্যাদি ইত্যাদি। এআইকে প্রশ্ন করলাম -- ভাইজ্যাগ কি? তার উত্তর কপি পেস্ট করছি -- ভাই, জ্যাক একটা আই আই টি ছাত্র ছিল। যে বাইরে থেকে এসেছিল পড়াশোনা করতে। সে একটা হোস্টেলে থাকত। হোস্টেলের মেসে খেত। সে খুব ভালো ফুটবল খেলত। একদিন সে ফুটবল খেলতে গিয়ে আপসেট হয়ে যায়। আর তারপর থেকে সে আর ফুটবল খেলেনি।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন