প্রথম পর্ব
দুপুরের চড়া রোদে আত্রাই নদীর পারের বালুচর একেবারে গরমের তাওয়া হয়ে আছে। চৈত্র মাসের ভরা দুপুর। বাতাস নেই, যেন আকাশের নীলচে আগুন সরাসরি বালুর উপর নেমে এসেছে। সেই উত্তপ্ত বালুর উপর পায়ের ছাপ পড়ছে, আর মুহূর্তেই মুছে যাচ্ছে—যেন সময় নিজেই হাঁপিয়ে উঠেছে। এই বালুচরের সঙ্গে পরেশ মাঝির চেনাজানা বহু দিনের। বছরভর সে এই নদীতেই নৌকা বায়, জাল ফেলে, মাছ ধরে। কিন্তু গাজনের এই পনেরো দিন সে আর শুধু মাঝি থাকে না—সে হয়ে ওঠে শিবের বাহক। পাট ঠাকুর কাঁধে নেওয়ার পর মানুষ বদলে যায়—এ কথা সে বহুবার শুনেছে তার বাবার কাছে। আজ সে নিজেই সেই কথার প্রমাণ।
পাট ঠাকুর সারা বছর পরেশ মাঝির বাড়ির মন্দিরেই পূজিত হন। প্রতি চৈত্র মাসের প্রথম শনিবার থেকে তিনি বাড়ির বাইরে বেরোন পরেশ মাঝির বাহক ও তাঁর দলবলের সঙ্গে। এই সময়কালে তিনি আর বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করেন না; দিনের বেলায় গৃহস্থের বাড়ি বাড়ি ঘুরে পূজা গ্রহণ করেন এবং রাত্রে অন্য কোনো গৃহস্থের বাড়িতে অবস্থান করেন, যা ‘পতিত’ নামে পরিচিত। সেখানে সকল আচার-অনুষ্ঠান বিধি মেনে সম্পন্ন হয়। পরেশ মাঝির দলের সকল সদস্যকেই লাল শালু পরিধান করে বেরোতে হয়—এটাই প্রাচীন প্রথা ও নিয়ম। গাজনের চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন পাট ঠাকুর পুনরায় বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করেন এবং অনুষ্ঠিত হয় হাজরা পূজা। তার পর সংক্রান্তির দিন শ্মশানে পূজা প্রদান করে চরক ঘুরিয়ে আবার বাড়িতে ফেরা হয়। এরপর শুরু হয় আগামী চৈত্র মাসের অপেক্ষা। পরেশ মাঝি তাঁর পিতার কাছ থেকেই এই সকল নিয়ম ও আচার-অনুষ্ঠান শিক্ষা লাভ করেছেন এবং আজও গভীর নিষ্ঠা ও ভক্তিভরে সেগুলি পালন করে চলেছেন। তাঁর এই সাধনা ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে ভগবানের আশীর্বাদ সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
গতকাল কোনো পতিত জোটেনি। বেলগাছের তলায় রাত কেটেছে। শুকনো মুড়ি আর গুড় খেয়ে দিন পার। দলবল ক্লান্ত, কিন্তু নিয়ম ভাঙার উপায় নেই। গাজন মানে শিবের পথ, আর সেই পথে শরীরের ক্লান্তি বলে কিছু থাকে না। আজ সকালে খবর এসেছে—আখিরা পাড়ায় সুবল মহন্তের বাড়িতে পতিত মিলেছে। পরেশ দেরি করেনি। দশজনের দল নিয়ে সে নামল আত্রাইয়ের জলে। একে একে সবাই স্নান সেরে উঠল। তারপর পরেশ নামল ঠাকুর কাঁধে নিয়ে। বেলকাঠের পাটঠাকুর—মাঝখানে শিব-পার্বতী, দুই পাশে নন্দি-ভৃঙ্গি, এক কোণে গণেশ। কাঠে সিঁদুরের লাল, বছরের পর বছর ভক্তির ছাপ। পরেশ ধীরে ধীরে ঠাকুরকে জলে ডুবিয়ে স্নান করাল। ঠোঁটে মন্ত্র, চোখে একাগ্রতা। জলের ঢেউয়ে রোদ ঝিলমিল করে উঠল—যেন নিজেই প্রণাম জানাল। ভিজে কাপড় শরীরে লেপ্টে আছে। নিয়ম—ভিজেই উঠতে হবে।
বেলা প্রায় দুটো, যখন তারা সুবলের বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়াল।“শিব পার্বতীতে… দেবের-দেব, মহা-দেব! জয়-শিবশঙ্কর !” দুয়ারে দাঁড়িয়ে উমা উলুধ্বনি দিল। তার পাশে দশ বছরের রতন। ছেলেটার চোখে বিস্ময়, কৌতূহল, আর অদ্ভুত টান। ঠাকুরঘরে পাট ঠাকুর বসানো হল। সুবল বাড়িতে নেই। মাঠে গেছে। কিন্তু উমা যেন বহুদিনের অভিজ্ঞ গৃহস্থের মতো সব প্রস্তুত করে রেখেছে—ফল, ফুল, ধূপ, প্রদীপ, আতপ চাল, কলাপাতা, জল, বসবার জায়গা। পরেশ একবার তাকাল উমার দিকে। মনে হল, এই মেয়েটার ভক্তি আলাদা রকমের। পুজো শুরু হল। ধূপের গন্ধে ঘর ভরে উঠল। শঙ্খের ধ্বনি উঠল। ঢাকের তাল রতনের বুকের ভেতর ধকধক করতে লাগল। ঠিক তখনই বাইরে ঝোড়ো হাওয়া উঠল। এই নিস্তব্ধ দুপুরে হাওয়া? দরজার কাপড় উড়ল। উঠোনের ধুলো উড়ল। পরেশ জোরে ধ্বনি দিল—“হর হর মহাদেব!” উমার গায়ে কাঁটা দিল। তার মনে হল, এই ঘরে আজ সত্যিই কেউ উপস্থিত। ঠিক তখনই দরজায় এসে দাঁড়াল সুবল। ঘেমে-নেয়ে ক্লান্ত। ভেতরে ঢুকে থমকে গেল। তার বাড়ির ভেতর এই আবহ সে কখনও দেখেনি। পুজো শেষে প্রসাদ বিলি হল। বিকেলের দিকে দল বিশ্রাম নিল।
সন্ধে নামতেই শুরু হল দ্বিতীয় পর্বের পুজো। ধূপ-ধুনোর গন্ধে চারদিক ভরে গেল। শিবের জয়গান উঠল। সুবলের বহুদিনের মানত ছিল, একদিন বাবাকে রাখবে। আজ সেই দিন। পুজো দেখতে দেখতে তার চোখে জল এসে গেল। রাত এগারোটায় পুজো শেষ হল। তারপর শুরু হল নাটক। শিব নটরাজ! গান, নাচ, হাসি, ছড়া—“শিব গেল মাঝ ধরতে, নিয়ে আসলো চাঙ, আর, দুই সতীনে যুক্তি করে, শিবের ভাঙল ঠ্যাং!” হাসিতে ভরে উঠল উঠোন। তারপর রান্না। তুলাই পাঞ্জি চালের ভাত, নতুন আলুর তরকারি, কড়াইশুঁটি দিয়ে। খাওয়া শেষ হতে হতে রাত দুটো।
ভোরের আলো ফুটতেই পরেশ মাঝির দল ঠাকুর কাঁধে নিয়ে রওনা দিল। সুবল আর উমা দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। তাদের চোখে একটাই প্রার্থনা—“আবার যেন বাবা আসে।”
কিন্তু সেই রাতের পর থেকেই সুবলের বাড়িতে কিছু বদলে গেল। ভোরবেলা উমা উঠে দেখল—ঠাকুরঘরে ধূপের গন্ধ। সে তো ধূপ দেয়নি! রতন বলল, “মা, রাতে কে যেন গান করছিল…” সুবল অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতে লাগল—বালুচরের আগুনরোদে পরেশ দাঁড়িয়ে বলছে, “প্রস্তুত থাকিস… বাবা আবার আসবেন…” সন্ধের পর বাড়ির পাশের বেলগাছটায় সোঁদা গন্ধ ছড়াতে লাগল। এক রাতে রতন চিৎকার করে উঠল—“বাবা! ঠাকুরঘরে আলো!” সবাই গিয়ে দেখল—প্রদীপ নিজে নিজেই জ্বলছে। গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ল। কেউ বলল অলৌকিক। কেউ বলল কাকতালীয়। কিন্তু সুবল, উমা, রতন জানল—সেই রাত কিছু রেখে গেছে। কয়েক মাসের মধ্যে অনাবাদি জমিতে ফসল হল। রতনের বহুদিনের অসুখ সেরে গেল।
একদিন আত্রাইয়ের বালুচরে দাঁড়িয়ে সুবল দেখল—রোদের ঝিলমিলে যেন দশজন মানুষের ছায়া হাঁটছে। সে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝল—পাট ঠাকুর কাঠের মূর্তি নয়। তিনি থাকেন বিশ্বাসে, স্মৃতিতে, মানুষের জীবনের বাঁকে। চৈত্রের সেই রোদ আর তাওয়া নয়—এখন তা আশীর্বাদের উষ্ণতা।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।