

কোথায় পাড়ি? দারিংবাড়ি!
কয়েক বছর ধরেই কখনও উড়িষ্যার দার্জিলিং, আবার কখনও উড়িষ্যার কাশ্মীর নামে দারিংবাড়ি নামটা শুনছিলাম। হঠাৎ একদিন আমাদের প্রাক্তন ছাত্র প্রদীপ এসে বলল, বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে ও ফিল্ডে গিয়েছিল দারিংবাড়ি। প্রদীপ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ স্কলার। জায়গাটার যা বর্ণনা ও দিল, ঠিক করলাম এবারে যেতেই হবে। চারমাস আগে রেলের বুকিং শুরু হয়ে যায়। সময়মতো তারিখ না বেছে রাখলে বুকিং পাবোনা। দলবল তো কম নয়। পঁয়ত্রিশ জন ছাত্রছাত্রী। সঙ্গে আমরা মিলে মোট ঊনচল্লিশ। কিন্তু এতদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সূচী স্পষ্ট নয়। হাজারো চিন্তা ভাবনা, ঝক্কি শেষে একটা দিন নির্দিষ্ট করা গেল। জানুয়ারির শেষে।
দারিংবাড়ির অদ্ভুত বাড়ি
হাওড়া স্টেশন থেকে রাতে ট্রেন। সকালবেলা ব্রহ্মপুর। সেখান থেকে প্রাতরাশ সেরে পাহাড়ি রাস্তায় ঘন্টা চারেকের পথ। আমি এর আগে বিশাখাপত্তনম, আরাকু ঘুরেছি, তাই পূর্বঘাট পর্বতমালা আমার একেবারে অচেনা নয়। কিন্তু এদিকের ভূদৃশ্য বেশ কিছুটা আলাদা। রাস্তা কিছুটা ভালো, কিছুটা আবার খুবই এবড়ো খেবড়ো। তবে দুপাশের অপরূপ সবুজে চোখ জুড়িয়ে যায়। ব্রহ্মপুর থেকে পুরো রাস্তায় একটা বিশেষ ব্যপার নজরে পড়ছিল। সেটা হল প্রতিটি বসতিতে বাড়ির অদ্ভুত নক্সা। আমরা দারিংবাড়ি পৌঁছলাম দুপুর দুটো নাগাদ। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে হোটেলের সামনে আমাদের বাসটা দাঁড়ালো, সেই হোটেলের সামনের বিল্ডিংটাও ঐ একই নক্সায় তৈরি। নক্সাটা হল বাড়িগুলি আয়তাকার। অনুপাতে প্রস্থ খুব কম আর লম্বায় খুব বেশি। বাড়িগুলোর সামনের অংশ হল আয়তক্ষেত্রের প্রস্থ। এখানে একটি দরজা ও সরু জানলা থাকে। লম্বায় টানা দেওয়াল এবং সেই দেওয়ালে কোনো জানলা নেই। নেই মানে নেই। আমি এর আগে কখনো এমন বাড়ি দেখিনি। দরজার সোজাসুজি করিডোর উলটোদিকে মুখোমুখি আর একটি দরজা পর্যন্ত। বাকি অংশে পাশাপাশি ছোট ছোট ঘর। করিডোরের দিকে তাদের দরজা খুলছে। দরজার মাথায় করিডোরের দিকে জালকাটা ভেন্টিলেশন। বাইরের দিকে কোনো জানলা নেই। আর কোনো দিক দিয়ে বাইরের আলো বাতাস ঢোকার পথ নেই। হোটেলের সামনের দিকের বিল্ডিংটা এমন হলেও পিছনের নতুন বিল্ডিং যেখানে আমরা ছিলাম, সেটার প্ল্যান আধুনিক। কিন্তু প্রথম দর্শনে খারাপ লাগলো, হোটেলের ক্যাম্পাসের ভিতরের জমিটা আগাছা, জঙ্গল আর সিমেন্ট বালির রাবিশে ভর্তি। এতটা জায়গা সুন্দর বাগান করা যেত। তবে ঘরগুলো সুন্দর। আমাদের জানলা দিয়ে পাহাড় দেখা যাচ্ছিল। ডাইনিং হলটাও প্রশস্ত, আর বেশ সাজানো। আশপাশের ছোটোখাটো হোটেলগুলোর নক্সাও ঐরকম আয়তাকার। কাজ শুরুর তাড়া তো আছেই, কিন্তু বাড়ির এরকম নকশার কারণ কী, ব্যাপারটা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছিনা। ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য কী? উঁহু, জায়গাটা তো উপকূল থেকে বেশ কিছুটা ভিতরে। তাছাড়া বিশাখাপত্তনমের কাছে বঙ্গোপসাগরের বুকে যেখানে ঘন সবুজ রঙের ঢেউ ভাঙে, সেখানে পাহাড়ী গ্রামে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে আমার, সেখানে বাড়ি, গোয়াল, রান্নাঘর সব গোলাকার, আর চালটা নেমে এসেছে শঙ্কু আকৃতিতে একেবারে মাটির কাছাকাছি। হামাগুড়ি দিয়ে বাড়িতে ঢুকতে হয়। তবে সমুদ্রের ধারে, পাহাড়ের ওপর সাইক্লোনের ধাক্কা সয়ে নেয় ঐ ধরণের ঘর। আর ওসব হল, ছিটেবেড়া, বাঁশ বা মাটি দিয়ে তৈরি, বড় বড় পাতার ছাউনি ঘেরা ঘর, যার মাঝখানটা খুব উঁচু। এখানেও পাহাড়ি এলাকা, মাটির বাড়ি নেই তা নয়, তবে পাকা দেওয়ালই তো বেশি দেখছি। জানলা ছাড়া অন্ধকার টানা লম্বা পাকা বা আধপাকা বাড়ি - এ আবার কেমন ধারা রে বাবা! আমাদের মুর্শিদাবাদে পদ্মা পারে বা নীল সাগরের কোলে সাগর দ্বীপে দেখেছি, ঝড়ের ধাক্কায় বাড়ির চাল যাতে উড়ে না যায় তার জন্য বাড়ির দুপাশে একটু দূরে মাটিতে লোহার মোটা আঙ্গট পোঁতা থাকে। আর একটা মোটা কাছি দড়ি চালের ওপর দিয়ে শক্ত করে টেনে দুপাশে লোহার রিঙে বাঁধা থাকে। তাছাড়া বছরে কয়েকদিন ঝড় হবে বলে পাকা বাড়িতে পাকাপাকিভাবে আলো বাতাস বন্ধ এটা তো হয় না। নাঃ আমার এতদিন ধরে জানা বোঝার বাইরে এখানকার এই নকশা।
কাজ শুরু
বেলা হয়ে গিয়েছিল, সবার খিদে পেয়ে গেছে। ঘড়ি ধরে পাক্কা দেড়ঘন্টার মধ্যে খেয়ে দেয়ে সামান্য বিশ্রামের পর কাগজপত্র নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। হাতে সময় কম, জায়গাটা চিনতে হবে, সার্ভের কাজ শুরু করতে হবে।
পথে নেমে দেখি একটাই ঢালু রাস্তা নেমে গেছে পাহাড়তলির দিকে। দুপাশে কয়েকটি হোটেল, দোকান। পাকা দোকান কিছু আছে। বেশিরভাগ দোকান বেড়া, খড় আর টালি দিয়ে তৈরি। আনাজ, খাবার জিনিস খোলা রাস্তার ধারে মাটিতে বসে বিক্রি হচ্ছে। আদিবাসী মহিলারা নানা রঙের, নানা রকমের বীজ আর ডালের পসরা সাজিয়ে বসেছেন, বেশিরভাগই অচেনা। উৎরাই পথে নামতে নামতে সরকারি অফিসও দেখলাম। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি দুরকম ব্যাঙ্কেরই বেশ কয়েকটি শাখা রয়েছে। এ টি এম কাউন্টারও আছে। নিচের দিকে জিপ আর অটো রিক্সা স্ট্যান্ড রয়েছে বটে। বহুক্ষণ অপেক্ষা করে ভর্তি হলে তবে রওনা দেবে। দেখে মনে হল সবই দূরের যাত্রী। কাজ শেষে হোটেলে ফিরতে হলে, যতটা উৎরাই নেমেছি, ততটাই চড়াই পার হতে হবে। মাঝপথে পা ব্যথা করলে, বাস, অটো, জিপ কিছুই পাওয়ার জো টি নেই। সাইকেল রিক্সাও চোখে পড়লনা। বেশ কিছুটা নেমে চারমাথার মোড় দেখতে পেলাম। এবারে সামনে বেশ ফাঁকা। চারিদিকে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। পূর্ব দিকে ঢালু পথ গড়িয়ে গেছে এলাকার একমাত্র বাস ডিপোর দিকে। খবর পেলাম ওদিকেই বনবিভাগ ও ব্লকের অফিস আছে। আজ আর যাওয়ার সময় নেই। পশ্চিমের আকাশে লাল ফাগের হোলি। লালচে সোনালি রোদের আভায় লাল মাটি আর বাদামি ঘাস জ্বলজ্বল করছে। দূরে পাহাড়ের রং লালে, ধূসরে মাখামাখি। আমার প্রিয় রং নীল। লাল নয়, তবু মাটি থেকে আকাশ সবার এই রংখেলা দেখে কেমন নেশা ধরে যায়। কীকাজে এসেছি এখানে, তা ভুলে যেতে ইচ্ছে করে।
ছেলেমেয়েদের ট্রাফিক সার্ভে, রোড মরফোলজি ড্রয়িং, হোটেল সার্ভে আর মার্কেট সার্ভে শেষ হল। ক্লাসে টেকনিক যতই শেখানো হোক, তা বাস্তবে প্রয়োগ করতে সাহস আর উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োজন হয়। এখানে গ্রুপে ভাগ করে দিতে, ওরা বেশ সুচারু ভাবে চারটে কাজই সম্পন্ন করেছে। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা গ্রামের ছেলেমেয়ে হলেও, বেশ স্মার্ট আর বুদ্ধিমান। ওদের দলে দলে হোটেলের দিকে রওনা করিয়ে দিলাম। কাউকে একা না ফিরতে হয়। পায়ে হেঁটে ফিরতে হবে চড়াই এর দিকে। চারমাথা থেকে পশ্চিম দিকে রাস্তা উঁচু। ওদিকে সামনেই উৎকল সরকারের ট্যুরিস্ট বাংলো। লোহার গেটের আড়ালে বড় সাজানো ক্যাম্পাস। দেখে খুব লোভ হচ্ছিল একবার ঢোকার জন্য। কিন্তু হলনা। মনের কথা মনেই রাখাই ভালো, কারণ কাজে এসেছি, আর কাজের নাইকো শেষ। ট্যুরিস্ট বাংলো পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে ডানদিকে জঙলা মেঠো পথ দিয়ে ঢুকলে জাগ্রুতি NGOএর অফিস। এঁদের কাজ সম্পর্কে অনেক কিছু শুনে এসেছি, একবেলা সময় করে যেতেই হবে। আজ পথটা চিনে রাখলাম। ধীরে ধীরে আমি আর আমার দুই সহকর্মী অগ্নিশা আর সৌরভ উপরে উঠছি। মানে আমার জন্য ওরা ধীরে উঠতে বাধ্য হচ্ছে। অগ্নিশা আজ কলিগ হলেও আসলে আমার প্রাক্তন ছাত্রী। আর সৌরভও কলিগ তবে বয়সে ছাত্রসম। পথটা দেখে আরাকুর সঙ্গে খুব মিল পাচ্ছি, তবে ওখানে রাস্তা তুলনায় চওড়া আর জমজমাট। নামার সময়ে পথ দ্রুত পেরিয়ে গিয়েছিল, তবে এখন ওঠার সময়ে পথের দুপাশটা বেশ রয়ে সয়ে দেখতে দেখতে কথা বলতে বলতে উঠছিলাম। দোকানে দোকানে ‘এটা কী, ওটা কী, বাড়ি কোথায়, ওমা! এত সুন্দর জিনিসগুলো কোথা থেকে নিয়ে আসেন? - আগ বাড়িয়ে এইসব খেজুরে আলাপ জমাচ্ছিলাম দোকানিদের সঙ্গে। তখনই নজরে পড়ল ব্যাপারটা। ঢালু রাস্তার ওপরদিকে সব পাকা দোকান, পসরা বলতে বড় বড় বাসনপত্রের দোকান, জামাকাপড়ের দোকান, মোবাইল বা ক্যামেরা সারানো, টর্চ - ব্যাটারি বা অন্য মণিহারী জিনিসের বিপণি। দোকানি সব উত্তর বা পশ্চিম ভারতীয় পুরুষ মানুষ। তাঁরা ব্যবসার প্রয়োজনে পালা করে এখানে থাকেন, পরিবার সব মোটামুটি দেশে, মোটকথা দাড়িংবাড়িতে তাঁদের পরিবার কেউ থাকেনা। মাঝারি উচ্চতায় পথের দুপাশে আবার কালচারাল ল্যান্ডস্কেপটা পুরো বদলে যাচ্ছে। এখানে প্রধান পশরা হল ফল, আর ঘরে তৈরি রকমারি বড়ি, পাঁপড়, আচার ইত্যাদি। দোকান বলতে প্রধানত সাইকেল ভ্যানের ওপর বা ট্রলির ওপরে অস্থায়ী ছাউনি খাটিয়ে যেমন তেমন করে সাজানো বিপণন দ্রব্য। স্বামী স্ত্রী একসঙ্গে বসে জিনিস বিক্রি করছেন। তাকিয়েই বোঝা যায় উত্তর ভারতীয় দোকানগুলোর সঙ্গে ঠমক চমকে পাল্লা দেবার সাধ্য এঁদের নেই। এঁরা এসেছেন দাড়িংবাড়ির আশপাশের অন্য জেলাগুলির থেকে। এখানে বাসা ভাড়া করে থাকেন, সপ্তাহান্তে নিজের বাড়ি ঘুরে আসেন। আর একেবারে পাহাড়তলির দিকে যেখানে অস্তরবির আলোয় বনের লম্বা ছায়া পড়ে, সেখানে ধূলির আসনে বসে আছে কন্ধ উপজাতির আদিবাসী মেয়েরা। না, কাছে পিঠে কোন পুরুষ অভিভাবকের চিহ্নমাত্র নেই। নিজেরা ধূলিতে বসে সামনে কাপড় বিছিয়ে নানা রঙের নানা আকৃতির বীজ বিকিকিনি করছেন। পথের ধারে এই তিন স্তর বাজারের একটা চমৎকার সোশ্যাল এরিয়া অ্যানালিসিস করা যায়, কারণ, ঢাল বরাবর জমির উচ্চতা অনুযায়ী তিনটে ধাপে দোকানিদের পশরা, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, সংস্কৃতি, পরিবার, মুখের ভাষা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা - সবই আলাদা আলাদা।
দুদিকে দেখতে দেখতে মন থেকে যেটা খুঁজছিলাম, সেটা দেখতে পেলাম। একটি বাড়ির ছোট রকে তিনটি ছোট, মাঝারি সরস্বতী প্রতিমা। আসলে চারমাস আগে যখন অনেক হিসেব কষে দিন ঠিক করা হয়েছিল, তখন কারোরই খেয়াল হয়নি, মাঝে সরস্বতী পুজো পড়ে গেছে। আসার দিন এগিয়ে আসাতে বাড়িতে মান অভিমান, অশান্তি। বাড়িতে পুজো। প্রতিমা সাজিয়ে লাগেজ ঘাড়ে নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। সব বাড়িতেই মোটামুটি গল্প এক। ছেলেমেয়েরা আজ কাজে বেরোনোর সময়ে তাদের মনের ইচ্ছে জানিয়েছিল যে আজ যদি কোথাও সরস্বতী পুজোর মন্ডপ চোখে পড়ে তো ওরা কাজের ফাঁকে আগামীকাল পুজোয় অঞ্জলি দিয়ে আসবে। আমাদের আপত্তি তো কিছু নেই। কিন্তু আজ এত ঘুরেও মন্ডপ খুঁজে পাওয়া গেলনা। এটাতো বাংলা নয় ওড়িশা। তায় আদিবাসী অঞ্চল। এঁরা সকলে খৃষ্টান। অনাদিবাসীরাও থাকেন। প্রতিমা বিক্রি হচ্ছে, মানে পুজো হয়, বাড়িতে হয়। কিন্তু বাড়িতে যাওয়ার মতো যোগাযোগ কারোর সঙ্গে নেই, থাকলেও চল্লিশ জন মিলে যাওয়া সম্ভব হতনা। তিনজন মিলে চকিত সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরাই হোটেলের ঘরে পুজো করব। প্রতিমা থাকলেও কেনা সম্ভব নয়। অচেনা জায়গায় ভাসান দেব কোথায়? আমার ব্যাগে মা সরস্বতীর ছবি ছিল। ঠিক হল ঐ ছবিতেই পুজো হবে। এবারে এক প্যাকেট ধূপ, একটা ধূপদানি, মোমবাতি, দেশলাই আর কিছু ফল কিনতে হবে। এগুলোই হবে আমাদের পুজোর উপকরণ। এগুলো কেনার জন্য আমরা দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। হোটেল ব্যবসা যাঁরা করছেন তাঁরা বেশিরভাগই গঞ্জাম জেলার মানুষ। ব্রহ্মপুরের সমতল থেকে পাহাড়ি পথে দারিংবাড়ি ওঠার সময়ে আমরা গঞ্জাম জেলা পেরিয়ে এসেছি। তবে কি ঐ অদ্ভুত বাড়ি গঞ্জাম জেলার বৈশিষ্ট্য? একটা জিনিস স্পষ্ট বুঝলাম। দারিংবাড়ি ওড়িশার পর্যটন মানচিত্রে এসেছে ২০১৫ সালে। এখন ২০২০। ব্যবসা বাণিজ্য, নতুন যানবাহন, নানান কারণে এই আদিবাসী অধ্যুষিত পাহাড়ি জনপদে অনাদিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে। পথে ঘাটে প্রচুর আবর্জনা ছড়িয়ে রয়েছে, ঠিক আমাদের হোটেলের চারপাশের মতো। সদ্য উন্নয়নের ধাক্কা লেগেছে, পরিপক্ক হতে সময় লাগবে। অনেক খুঁজেও ফুল পাওয়া গেলনা। গাছের ফুলও যে বিকিকিনির জিনিস, সেটা এখনও স্থানীয় মানুষের ধারণায় আসেনি। ফল কি কেনা যায়! ফলকাটার সময় নেই, কেটে রাখার ও জায়গা নেই। এমন কোনো ফল চাই যা পকেট ফ্রেন্ডলি, কারণ ফিরে গিয়ে সব টাকার পাইপয়সা হিসেব দিতে হবে। পাঁচদিন ফিল্ডের খরচ চালাতে হবে। আবার প্রত্যেকের ভাগে যাতে একটা গোটা ফল পড়ে, সেটাও ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথমে আপেল দর করে পিছিয়ে আসতে হল। পকেটের থেকে ভারি ফলে পকেট ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। নজর পড়ল স্থানীয় উৎপাদন মোলায়েম হলুদ পুরুষ্টু পাকা কলার কাঁদির দিকে। মা সরস্বতী সবই দেখছেন, বুঝছেন। শস্তায় পুষ্টিকর দিশি কলায় অরুচি তাঁর হবেনা নিশ্চিত। আমরা ঊনচল্লিশ, ভ্রমণ সংস্থার কর্ণধার বিদ্যুৎবাবু ও তাঁর দল আছেন। পুজো হবে, আর হোটেলের কর্মীদের মধ্যে সামান্য কিছু বিলি হবেনা, তাতো হয়না। তাঁদের সহযোগিতাও তো দরকার। এক কর্তা গিন্নির দোকানে ষাটটা কলা বেঁধে দিতে বললাম। এই অভাবনীয় খরিদ্দারির প্রস্তাবে তাঁদের চোখে উপচে পড়ে আনন্দ ও বিস্ময়, মুখে অনাবিল হাসি। বাঙালির স্বভাব বাইরে গেলেই হিন্দি বলা। এখানে হিন্দি বলে সুরাহা হলনা। আকার ইঙ্গিত সহকারে বাংলাটাই ওনারা বুঝতে পারলেন। অবশ্য উড়িষ্যায় সেটা স্বাভাবিক। এই পূর্বঘাটের ঢালে একবার আরাকু ট্রাইবাল মিউজিয়ামের পথের পাশে লম্বা লম্বা শিমের বিচির মতো সাদা রঙের বীজ দেখে অন্ধ্রপ্রদেশের আদিবাসী মহিলাদের জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিলাম এটা কি খাওয়া হয়? তেলেগু জানিনা। ওঁরা হিন্দি বোঝেননা। হাত পা নেড়ে অভিনয় করে কিছুই হলনা, শেষে পরিষ্কার বাংলায় বললাম, "রান্না হয়?" ওঁরা মাথা নেড়ে একগাল হেসে বললেন - “রান্না রান্না” - মহানন্দে দুমুঠো বীজ ব্যাগে ভরে বাড়ি এনেছিলাম, তড়কা বা রাজমার মতোন রান্নাও করেছি বেশ স্বাদ।
কলা, ধূপ আর ধূপদানি নিয়ে তাড়াতাড়ি পা চালাই। অন্ধকার পথ, দোকানের আলো মিলিয়ে এসেছে। সবাইকে বুঝিয়ে কিভাবে সব সুষ্ঠুভাবে আয়োজন হবে জানিনা। তবে ভাব দেখে বোঝা যাচ্ছে, সৌরভ খুবই উত্তেজিত। হতেই হবে, শিক্ষক হিসেবে এটা ওর প্রথম ফিল্ড, আর অগ্নিশার দ্বিতীয়। প্রথমবার ও জড়োসড়ো ছিল। এবারে সেটা নেই। কিন্তু আমি যেহেতু ওর ডাইরেক্ট টিচার, তাই খাপ খুলছেনা। দু দশকের ওপর পড়ানোর চাকরি রে বাবা, আমার চোখ এড়ানো কি অতই সহজ!
জয় জয় দেবী
হোটেলে ঢোকার মুখে কাচের দরজার বাইরে দেখি রিসেপশনের ছেলেটি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে। সৌরভ তাকে দেখেই উদগ্রীব প্রশ্ন করে বসে, আপকে পাস্ ঘন্টা হ্যায়? আরে, সত্যিই তো, রিসেপশনে গণেশ মূর্তি আছে। সৌরভের বেশ বুদ্ধি। ছেলেটি কী উত্তর দিল শোনার আগেই দেখি অগ্নিশা দৌড়ে একটু দূরে চলে গেল। আমিও ওর কাছে চলে এসেছি। সৌরভও দৌড়ে এসেছে। অগ্নিশা মুখ চেপে হাসছে। সৌরভকে দেখিয়ে দুহাতের বুড়ো আঙুল তুলে ঠোঁট উল্টে আমাকে বলছে, "আপকে পাস্ ঘ-ন্-টা হ্যায়"। ও হরি, সৌরভের প্রশ্নটা affirmative করে বললে অর্থটা বদলে যায়। তিনজন মিলে খুব একচোট হেসে নিলাম। অগ্নিশার স্নাতকোত্তর হিন্দি বলয়ে। হিন্দিতে ও আমাদের থেকে অনেক বেশি চোস্ত। একটু আগেই দেখেছি এটা হিন্দির জায়গা নয়। বাংলায় বললেই ছেলেটি বুঝতে পারতো। যা হোক চারিদিকে টেনশনের মাঝে এগুলোই অক্সিজেন।
হোটেলে ফিরে সবাইকে ডেকে বুঝিয়ে দেওয়া হল আগামীকাল সকাল সাড়ে সাতটায় প্রাতরাশ। সাড়ে ছটার মধ্যে সকলকে স্নান সেরে রেডি থাকতে হবে। আধঘন্টার মধ্যে আমরা ঘরেই পুজো সেরে নেব। প্রসাদ এবং প্রাতরাশ খেয়ে আটটার মধ্যে সার্ভেতে বেরিয়ে পড়তে হবে। রোদ চড়ে গেলে কষ্ট বাড়ে। আজ বিকেলে যা যা কাজ হয়েছে, সেগুলো এবার ফাইনাল করতে হবে। ছেলেমেয়েদের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আমরা বসলাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে।
আজ বিকেলে যখন আমরা কাজ করছিলাম, তখন বাজারে একটা জিপ ঘুরে ঘুরে মাইকে ঘোষণা করছিল। ওড়িয়াতে হলেও কেতাবি ঢঙে ধীরে ধীরে বলছিল বলে পুরোটাই আমরা বুঝতে পেরেছি। তবে বুঝে কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়েছে আমাদের, তবে ছেলেমেয়েদের কিছু বুঝতে দিইনি। বিদ্যুৎ বাবু আমাদের কাছাকাছি আদিবাসী গ্রামের মৌজা ম্যাপ যোগাড় করে দিয়েছিলেন, সেখানে কাজ করার জন্য। ঐ ঘোষণা শুনে সেদিকে পা না বাড়িয়ে আমরা সার্ভের কাজ করার জন্য দারিংবাড়ি মিউনিসিপ্যালিটি আর বাজারের মধ্যেই থাকব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামীকাল বাড়ি বাড়ি ঘুরে হাউসহোল্ড সার্ভে হবে। ডাম্পি লেভেলে টেরেন প্রোফাইল আর কনট্যুরিং হবে। নতুন সি বি সি এস সিলেবাস অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গার মাটি আর জল পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল সংগ্রহ হবে। আবার সরকারি অফিসগুলো থেকে যথাসম্ভব সেকেন্ডারি তথ্য যোগাড় করতে হবে। একটা দিনের জন্য হারকিউলিয়ান টাস্ক। কখন কী হবে আর কতজন থাকবে, কে কোন কাজে উপযুক্ত, সব কিছু ছকে ফেলতে হবে। আসলে বাজারের ঘোষণায় বলা হচ্ছিল আগামীকাল এন আর সি এবং সি এ এ - র বিরোধিতায় বন্ধ ডাকা হয়েছে, কোনো দোকান খুলবেনা, কোনো গাড়ি চলবেনা। এলাকায় উত্তেজনা থাকলে ছেলেমেয়েরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের জীবন, জীবিকা, অসুখ বিসুখ, খাওয়া দাওয়া, বিভিন্ন মতামত - এত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবে কিকরে? লোকে যদি সন্দেহের চোখে দেখে, যে এরা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে খবর যোগাড় করতে এসেছে, তখন কী হবে? এর আগে বিমল গুরুংয়ের আন্দোলনের সময়ে বিপদের অভিজ্ঞতা আছে আমার। সেবার ফিল্ড হয়েছিল সিকিমের রাবাংলায়। ফেরার দিন ভোরে বেরিয়ে, রাতে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ট্রেন ধরার কথা ছিল আমাদের। গাড়ি বলা ছিল। হঠাৎ আগের দিন বিকেলে জিপের ড্রাইভারেরা এসে জানালেন যে আগামীকাল তাঁরা যেতে পারবেননা, কারণ দার্জিলিংয়ে চব্বিশ ঘণ্টা বন্ধ ডাকা হয়েছে। সেফটি সিকিউরিটির কোন দায়িত্ব তো তাঁরা নিতে পারবেনইনা আর জিপ ভাঙচুর হলে সেই ঝুঁকিও নিতে পারবেননা। আমরা তখন চারদিন কঠিন ফিল্ড ওয়ার্ক সেরে খুবই ক্লান্ত ছিলাম। সেই অবস্থায় রাবাংলা থানা, এস ডি ও অফিস ছুটে ছুটে, অফিসারদের কনভিন্স করিয়ে হাজার রকম নথিপত্র তৈরি করে নাজেহাল হতে হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের সমস্যায় তাঁদের হাত পা বাঁধা, এই বলে প্রথমে তাঁরা কাঁধ থেকে আমাদের ঝেড়ে ফেলতেই চাইছিলেন। আসলে জায়গাগুলো তো আর সমতল ক্ষেত্র নয়। চড়াই উৎরাই ভেঙে ভেঙে তখন আমাদের হাড়গোড়গুলো আর সোজা নেই সব বেঁকে নুয়ে পড়েছে। কাগজপত্র দেখে শেষে আমাদের পাঁচটা জিপের চালকেরা একটু নরম হলেন। কিন্তু শর্ত দিলেন যে ভোরের আলো ফোটার আগে বেরোতে হবে। কারণ অবরোধকারীরা ঘুম থেকে উঠে লাঠি সোঁটা নিয়ে বেরোনোর আগেই ওঁরা অশান্ত এলাকাগুলি পেরিয়ে যেতে চান। আমরা রাজি হলাম। না হয়ে উপায় কী? কিন্তু বাস্তবে তা হলনা। টেনশনে এক ছাত্রী হোটেলে অজ্ঞান হয়ে গেল। তাকে নিয়ে রাত কাটল সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। তাকে রিলিজ করাতে করাতে সূর্য উঠে আকাশে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেলেন। আর আমরা যতদিন রাবাংলায় ছিলাম খুব কুয়াশা ছিল। সেদিনই ভোরে আকাশ পরিষ্কার। হৈ হৈ করে দেবতাত্মা হিমালয়ের বিখ্যাত শায়িত মহাদেব আত্মপ্রকাশ করলেন, চারিদিক ঝকঝক করতে লাগলো। পাইনের পাতায় জমা হিমের ওপর সোনালি রোদের খেলায় কমল হীরে ঝিলমিল করতে লাগলো। আর সিকিম দার্জিলিং সীমান্তে জনা কুড়ি লাঠি ও কুকরি ধারী ছেলে আমাদের জিপ আটকে দাঁড়ালো।