

গ্রাম ছেড়ে বর্ধমান শহরে পড়ার জন্য পাকাপাকি চলে আসতে সাহায্য করেছিল আমাকে, একটা বৃত্তি।
মাধ্যমিক পরীক্ষায় স্কুলে প্রথম হওয়ায় পরেশনাথ সরকার বৃত্তি পাই।
১৫০ টাকা। ১৫০ টাকা ১৯৮৩তে অনেক না হলেও ভালোই টাকা। জনতা হোটেলে ১৫০ টা মাছ ভাতের থালা।
এই টাকার ভরসায় বর্ধমান শহর চলে এসেছিলাম জানুয়ারি মাসে। পৌষ সংক্রান্তির পরদিনের পরদিন। লোকে পয়লা মাঘের মেলা দেখতে এসেছিল। আমি দোসরা মাঘ শহরে এলাম। ২৩ কিলোমিটার রাস্তা সাইকেল চড়ে।
পিছনে ১৫ কেজি চাল আলু পেঁয়াজ ডানদিকের হ্যান্ডেলে ঝোলানো মুড়ির টিন। সামনের রডে বিছানা লেপ চাদর জামাকাপড়। বয়স কম। তাই পেরেছি। মনে মজাও। কাল থেকে আর ভোর তিনটায় উঠে শিশিরে পা ভিজিয়ে কনকনে ঠান্ডায় ৩৫ মিনিট হেঁটে তিনটা পঁয়তাল্লিশে ফার্স্ট বাসে উঠে খাসকানি চালের বস্তায় বসে বা বাসের ছাদে উঠে হাওয়া খেতে খেতে বর্ধমান শহরের কার্জন গেটে নেমে আরও ৪০-৪৫ মিনিট হেঁটে বাবুরবাগে অঞ্জনদার কাছে পড়তে যেতে হবে না। সাইকেল আছে। সকালে উঠে অঞ্জনদার কাছে সাড়ে ছটায় পৌঁছে যাবো ঠিক।
আজ খারাপ লাগে, ভুলোকে ছেড়ে এলাম কী করে? ভুলো আমাকে পাগলের মতো ভালবাসতো। সেহারাবাজারে নবম দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার সঙ্গে সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরের স্কুলে হেঁটে হেঁটে চলে যেত। বিডিআর ট্রেনে চাপলে ট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়াত। সারাদিন স্কুলের গেটে বসে থাকতো। সহপাঠীরা আওয়াজ দিত, তোর বন্ধু বসে আছে।
বর্ধমান শহরে পড়তে আসার সময় তাই সতর্ক থাকতাম। চুপিসারে আসতাম যাতে ভুলো টের না পায়।
কিন্তু ভুলো সন্ধ্যায় ফেরার সময় নুরপুর ক্যানেল ধারে বসে থাকতো। আমাকে নিয়ে ফিরবে!
বর্ধমান শহরে আসার সময় ভুলোকে ছেড়ে আসা কঠিন ছিল। তবু তো পেরেছি। আজ আর পারি না। আমার সিরো এবং পাড়ার পাঁচটি কুকুরকে ছেড়ে এখন বাইরে রাত কাটাতে খুব কষ্ট পাই।
ভুলোর প্রতি অন্যায় করেছি মনে হয়।
আমি চলে না এলে ভুলোকে কাটারি ছুঁড়ে কেউ মারতে পারতো না!
কে সেই নিষ্ঠুর লোক, আজও জানতে পারি নি।
তখন তো জানতাম না, কুকুর যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের গায়ে কুকুরের গন্ধ লেগে থাকে। অন্য কুকুর তাঁদের পছন্দ করে।
আমি একটা নলকূপের জলে স্নান করতাম বর্ধমান শহরের গোলাহাটায়। সেখানে চারটি কুকুরের বাচ্চা ছিল। আমার পায়ে পায়ে ঘুরতো। নিজে রান্না করতাম। ওদের খেতে দিতাম। একজন তখন খুব ছোট কলতলায় আমার পায়ে কামড়ে দেয়। আমিই অন্ধকারে পা লাগিয়ে ফেলেছিলাম বোধহয়। এরজন্য হাসপাতালে গিয়ে ১৪টা ইঞ্জেকশন নিতে হয় পেটে। পেট শক্ত হয়ে যেত। বরফ ঘষতে বলতেন ডাক্তাররা। তখন তো এত ফ্রিজ ছিল না বাড়িতে বাড়িতে। ফলে খুব কষ্ট পেয়েছি।
প্রথমদিন রান্না করেছিলাম খিচুড়ি। সেই খিচুড়ির মতো ভালো খিচুড়ি রান্না করতে আজও পারিনি। মুগ্ধ নিজের রান্নায়। তখনও ঠাণ্ডা পড়তো। শীতে একবেলার রান্না দুবেলাই বাইরে রেখে খাওয়া যেত।
আমি তো গরমকালেও দুবেলা তরকারি খেয়েছি। বিকেলে গরম করতে হতো এই যা।
জীবনে সবার প্রথম রান্নাই শুনেছি ডিমের ঝোল। সেটা পরদিন করি। টমেটো আলু দিয়ে ডিমের ঝোল।
লিখতে লিখতে জিভে জল আসছে। আর কেন প্রথম দিনের মতো ভালো রান্না করতে পারি না!
সেই স্বাদ আর আসে না!
আমাদের সবার দরকার, নিজের নিজের স্কুলে বিশেষ করে গ্রামের বা মফস্বলের স্কুলে একটা বৃত্তি দেওয়া।
বাইরে মানে বড় শহরে পড়তে যেতে সুবিধা হবে ছেলেমেয়েদের।
বাবা মা বা অন্য কারও স্মৃতির জন্য এটুকু করাই যায়।
পরেশনাথ সরকার বৃত্তি আমাকে শহরে আসতে সাহস যুগিয়েছিল। কারণ নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি না করায় আমার মনে মনে বেশ রাগ হয়েছিল বাবার ওপর। বাড়ি থেকে পয়সা নেবো না। তাই প্রথম সুযোগেই বাড়ি থেকে পয়সা নেওয়া বন্ধ করি।
এর ফলও খুব ভুগেছি। পেটে আলসার বাধিয়েছি।
না খেয়ে দেয়ে। অথচ এমন হওয়ার কথা ছিল না। আমি টিউশনি পেয়ে গিয়েছিলাম শহরে আসার মাস খানেকের মধ্যেই। তখন তো সব বিষয় পড়াতে হতো। অঙ্ক ইংরেজি থেকে বিজ্ঞান ইতিহাস বাংলা-সবই।
৫০ টাকা মাসে পেতাম টিউশন পিছু। সপ্তাহে পাঁচদিন। চিত্রা আমার প্রথম ছাত্রী। তারপর বিধান ভট্টাচার্য সহ আরও অনেকেই। মাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিশন পাওয়া একটা বিরাট ঘটনা ছিল সেসময়। ফার্স্ট ডিভিশন গ্যারান্টি ছিল। ফাঁকিবাজ ছাত্র হিসেবে বুঝে গিয়েছিলাম কীভাবে পড়ালে ফার্স্ট ডিভিশন সম্ভব।
চিত্রার মা বিধানের মা বাবুজির মা এঁরা খুব ভালো মনের মানুষ ছিলেন। ভালো টিফিন খাওয়াতেন। আমি যখন হাসপাতালে ভর্তি। একমাস পড়াতে যেতে পারিনি। চিত্রার মা এসে হাসপাতালে ৫০ টাকা জোর করে দিয়ে গিয়েছিলেন। সদরের ছাত্র নেতা দিলীপদার নিজের দিদি। বড়মাপের মানবী। ৫০ টাকা আর একটা হরলিক্স দিয়ে গিয়েছিলেন হাসপাতালে।
এইসব মানবীদের অবদান ভোলার নয়।
তেমনি ভুলবো না সীতা মাসির কথা। অমিত সেন অতনুর মায়ের কথা। রুণার ঠাকুমার কথা। এখন সেচ দপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার সুব্রত চ্যাটার্জির মায়ের কথা, কৌশিক লাহিড়ীর মায়ের কথা, সৌমিত্র সামন্তের মায়ের কথা, পিঙ্কির মা ছোট-র কথা। বাপ্পার মায়ের কথা তো ভোলা অসম্ভব।
মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় ম্যালেরিয়ার জ্বরে ভোগা একটা ছেলেকে তিনি যে অসীম মমতায় আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়েছিলেন তা ভোলার নয়।
আমাদের দেশ যে মিশ্র সংস্কৃতির দেশ-- তা শিখিয়েছেন এঁরা জীবন দিয়ে।
মাসিমার এক দেওর ছিলেন। আমরা বলতাম কাকু। সেনাবাহিনীর বড় পদে ছিলেন। বিয়ে থা করেননি। একাই থাকতেন বিরাট বাড়ির একটা ঘরে। তিনি প্রচুর বই পড়তেন। টিভি দেখতেন না। পড়তেন মূলত ইংরেজি বই।
আরভিং স্টোনের খুব ভক্ত ছিলেন। পড়িয়েছিলেন লাস্ট ফর লাইফ (ভ্যান গখের জীবন অবলম্বনে), মাইকেলএঞ্জেলোর জীবন নির্ভর উপন্যাস 'অ্যাগনি অ্যান্ড দ্য এক্সটাসি', আব্রাহাম লিংকনের জীবনকাল নিয়ে 'লাভ ইটারনাল', এরিখ মারিয়া রেমার্কের 'থ্রি কমরেডস' এবং রেবেকা।
সত্যি বলতে ইংরেজি উপন্যাস পড়তে তত স্বচ্ছন্দ বোধ করতাম না। বাংলা পড়েই বেশি আনন্দ। তবু আরভিং স্টোনের ছোট ছোট অসাধারণ বাক্য গঠন মুগ্ধ করে দিয়েছিল।
'রেবেকা' উপন্যাসে রেবেকার আগমন ঘটছে অনেক পরে।
একটা ছোট বাক্যে-- হি স্যাট অন দ্য চেয়ার।
মাসিমার কর্তা বাইরে চাকরি করতেন। অবসরের পর এলেন বাড়িতে। একদিন কথা বলতে বলতেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর কাকা ছিলেন বর্ধমানের সুবিখ্যাত চিকিৎসক চন্দ্রশেখর চ্যাটার্জি।
একটা ইঞ্জেকশন আনতে ছুটলাম সাইকেল নিয়ে। জীবনদায়ী ইঞ্জেকশন। কাছের দোকানে ছিল না। খোসবাগান পাড়ায় অজস্র দোকান।
নেই। রানিগঞ্জ বাজারে মোবারক বিল্ডিংয়ের তলায় একটা দোকানে মিলল।
নিয়ে আধঘণ্টার মধ্যে ফিরে দেখি, মেসোমশাই নেই। তিন ছেলে এক মেয়ে।
অকালে চলে গেলেন। মাসিমার সিঁথি সাদা হয়ে গেল। পুরো সংসারের সব দায়িত্ব তাঁর। কী করে যে চালিয়েছেন। আগে সবসময় হাসি ছিল। এখন একটু চাপা বিষণ্ণতা।
মেসোমশাইয়ের গায়ের রঙ ছিল তপ্ত কাঞ্চন বর্ণ। মাসিমাও তেমনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার খুব ভক্ত। তাঁর কল্যাণে, 'সঞ্চয়িতা' পুরোটা পড়া হয় আমার।
মেসোমশাইয়ের মৃত্যুর পর মাসিমা আরও বেশি করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আশ্রয় করলেন।
মেসোমশাইকে নিয়ে যাওয়া হল বর্ধমান শহরের প্রধান শ্মশান নির্মল ঝিলে। সোনার বরণ গায়ে মাখানো হল গাওয়া ঘি। জ্বলে উঠল আগুন।
পায়ের চামড়া ফেটে গেল।
আমি সহ্য করতে পারলাম না। একটু আগেই কথা বলছিলেন মানুষটি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলামের কবিতা নিয়ে। এত তাড়াতাড়ি অতীত হয়ে গেলেন।
সরে এলাম। একটু দূরে।
এরপর থেকে অন্তত ২২৫ বার আমি শ্মশানে দাহ করতে বা গিয়েছি। নিয়ম কানুন অনেকের চেয়ে বেশি না হলেও কম জানি না।
মুখে আগুন দেওয়ার পর আর দাঁড়াই না। চলে আসি একটু দূরে।
বিয়ের সাতপাকের আগুন ছিল আমার খুব প্রিয়। সেই আগুন এমন কষ্টেরও হয়!