
সাধারণত কোনো সমস্যার গভীরে বুঝতে বা বোঝাতে শুধু অভিজ্ঞতার উপাখ্যান যথেষ্ট নয়, তথ্যপ্রমাণ বা পরিসংখ্যান ইত্যাদিরও প্রয়োজন আছে। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিসংখ্যান নেই, সেখানে এইসব অভিজ্ঞতার কাহিনী দিয়ে কিছুটা হলেও অবস্থাটা উপলব্ধি করা ছাড়া খুব কিছু উপায় হাতে থাকেনা। এদেশে কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের ক্ষমতায়নের গল্পটা যেভাবে পরিবেশন করা হয়ে, অনেকাংশেই সেসব মূল্যায়নকে সঠিক বলা ঠিক হবেনা। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সাধারণভাবে দৃষ্টিকোণের হেরফের নাম দিয়েও চালিয়ে দেওয়া যায়না। তাই কোথাও হয়ত আমাদের মত কর্মজীবী মেয়েদের কথা, শোনার মত লোক না থাকলেও ক্রমাগত বলে যাওয়া উচিত বলে মনে করি, অন্ততঃ যতদিন না চারিদিকে যে প্রতীকী ক্ষময়াতনের গল্প চলে তা বন্ধ হয়ে সত্যিকারের চোখে পড়ার মত পরিবর্তন হয়। তথ্য ও পরিসংখ্যান যেটুকু হাল আমলে পাওয়া যাচ্ছে তাতেও মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতির ক্ষেত্রে আমদের দেশ বিশ্বে তালিকার একেবারে নীচের দিকে আছে, বেশ কয়েক বছর ধরে।
২০০৬ সাল থেকে, ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম লিঙ্গ বৈষম্যের উপর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করছে, মূলত বিশ্বজুড়ে লিঙ্গ বৈষম্যের মাত্রা ধরা এবং সময়ের সাথে সাথে এই ক্ষেত্রে অগ্রগতির দিকে নজর রাখার জন্য। প্রতিবেদনটি চারটি বিষয়ভিত্তিক মাত্রা - অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং সুযোগ, শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন, স্বাস্থ্য এবং জীবনসীমা, ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। 0 (অসমতা) থেকে 1 (সমতা) এই মাপদন্ডে লিঙ্গভিত্তিক সমতার দিকে তাদের অগ্রগতির উপর দেশগুলিকে মানদণ্ড দেয় এবং এমন দেশগুলির র্যাঙ্কিং প্রদান করে যা রিজিওন এবং ইকনমিক গ্রুপে কার্যকরী তুলনা করার অনুমতি দেয়। সমস্ত কর্মজীবী মহিলা পেশাদারদের কর্মক্ষমতা এবং অগ্রগতি “অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং সুযোগ” শিরোনামের অধীনে আসবে।
এই রিপোর্ট অনুযায়ী, ঐতিহাসিক ভাবে আজ প্রায় দু’দশক ধরে ভারতের স্থান বরাবর তালিকার নীচের দিকে থেকেছে। একেবারে নীচে যায়নি শুধুমাত্র মেয়েদের শিক্ষাক্ষেত্র বিশেষ করে উচ্চতর শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণে অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো অবস্থায় থাকার জন্যে। অন্য দুটি উপ-সূচক, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে অংশগ্রহনের ক্ষেত্রে ভারতের স্থান সবসময় একেবারে নীচের দিকে থাকে।
২০১৮ সালের রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে বেশিরভাগ দেশ নারীদের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ এবং সুযোগের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী গড়ের চেয়ে বেশি সংখ্যা অর্জন করেছে। কিন্তু ভারত এবং মেক্সিকোর মতো জনবহুল দেশগুলির গড় পারফরম্যান্সের কারণে বিশ্বব্যাপী গড় স্কোর হ্রাস পেয়েছে। ভারতের সামগ্রিক অবস্থান প্রায় একই রয়ে গেছে কিন্তু ব্যবধান বা এই ক্ষেত্রে জেন্ডার গ্যাপ বেড়েছে ৩৩%।
সেবার অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ এবং সুযোগের উপ-সূচকের স্কোর ছিল ০.৩৮২। ১৪৯টি দেশের মধ্যে ভারত এটিতে ১৪২তম স্থানে ছিল। পেশাদার ও কারিগরি কর্মী বিভাগে ভারতের স্কোর ০.৩৩৮-এ আগের বছরগুলির মত অপরিবর্তিত থাকলেও, তার র্যাংক কমে ১৩৩-এ নেমে এসেছে, যার অর্থ এই বিভাগে অন্যান্য দেশগুলি উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নতি করেছে, কিন্তু ভারতে সেরকম কোনো উন্নতি দেখা যায়নি।
২০২১ সালে, মহামারী পরিস্থিতির মাঝামাঝি এক বছরেরও বেশি সময় কাটানোর পর রিপোর্ট প্রকাশিত হয় এবং দেখা যায় যে স্বাস্থ্যে জরুরি অবস্থা এবং সেই সম্পর্কিত অর্থনৈতিক মন্দা, কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের বেশি প্রভাবিত করেছে। জেন্ডার গ্যাপ যা আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তা আবার খুলে গেছে। "অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ এবং সুযোগ"-এর গ্যাপ বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাপ হিসাবে রয়ে গেছে এবং মহামারীর কারণে এটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একটি প্রাথমিক গবেষণার অনুমান অনুসারে, বিশ্বব্যাপী ৫% নারী তাদের চাকরি হারিয়েছিলেন, যেখানে ৩% পুরুষ মহামারীর কারণে তাদের চাকরি হারিয়েছিলেন। এছাড়াও, সেবছর লিঙ্কডইনের তথ্য দেখায় যে পূর্ববর্তী বছরগুলির প্রবণতার বিপরীতে, নেতৃত্বের ভূমিকায় নারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হ্রাস ঘটেছে!
সাম্প্রতিককালের রিপোর্টে, ২০২৪-২৫ সালে বিশ্বে লিঙ্গ বৈষম্য ৬৮.৮% কমেছে। বলা হচ্ছে যে এই হারে চলতে থাকলে আগামী ১২৩ বছর লাগবে পুরোপুরি জেন্ডার প্যারিটির লক্ষ্যে পৌঁছতে। ভারতের স্থান এবছর ১৩১, বিশ্বের ১৪৮ টি দেশের মধ্যে। “ইকনমিক পারটিসিপেশন এন্ড অপরচুনিটি” তে ভারত এখনো বটম ফাইভে, এবং “ফিমেল লেবার ফোরস পারটিসিপেশন” বা শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহন উপ-সূচক টিতে ভারতে কোনো উন্নতিই হয়নি। সিনিয়র ভূমিকা এবং কারিগরি পদে নারীর অংশগ্রহণ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিগত বছরগুলিতে, ভারত নারীদের উচ্চশিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষার সুযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করলেও, এই শিক্ষাগত অর্জন বা দক্ষতাকে অর্থপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সুযোগে রূপান্তরিত করা এখনও একটি ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ। নারীর শ্রমশক্তিতে ক্রমাগত কম অংশগ্রহণ, ব্যাপক আয় বৈষম্য, এবং নেতৃত্বের ভূমিকায় অপ্রতুল প্রতিনিধিত্ব আজকের দিনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা যা ভারতের লিঙ্গ বৈষম্যকে সত্যিকার অর্থে পূরণ করার জন্য নীতিগত মনোযোগ এবং পদ্ধতিগত পরিবর্তনের দাবি রাখে।
তবে এই সমস্ত ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিক হল যে অন্তত WEF-এর জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট আজকাল ভারতের বিভিন্ন বেসরকারি বা আধা-সরকারি ক্ষেত্র, কোম্পানিগুলি দ্বারা স্বীকৃতি পাচ্ছে। কিন্তু গভীর অধ্যয়ন বা এই সমস্যা মোকাবেলায় আত্মনিরীক্ষণ, যথেষ্ট পরিমাণে করা হচ্ছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। পলিসি এবং ব্যবস্থাগুলিতে এখনও বেশীরভাগ জায়গা কিছু প্রতীকী পদক্ষেপ ছাড়া খুব কিছু দেখা যায়না। সব থেকে যা অবাক করে, সরকারী, বেসরকারী, সব জায়গাতেই এমন একটা ভাব করা হয় আজকাল যেন মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তির জন্যে করনীয় সব কিছু সবার তরফে হয়ে গেছে, বাকী যা হচ্ছেনা তার দায় এখন পুরোটাই মেয়েদের নিজেদের!
প্রসঙ্গ আসছে কারণ কয়েকদিন পরেই শুরু হবে বিভিন্ন পাতায় আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে উপলক্ষ্য করে নানান উৎসব উদ্দীপনা, উদযাপনের বচ্ছরকার ঢেউ। অথচ যে দিবসের সূত্রপাত শ্রমজীবি নারীদের অধিকারের লড়াইয়ে, সেই দিনে উপরোক্ত রিপোর্ট বা সেইসব তথ্য অনুযায়ী যে সমস্যাগুলি উঠে আসছে তা নিয়ে আলোচনা যথেষ্ট পরিমাণ হচ্ছে কি?
সাম্প্রতিক কালে যেমনটা দেখা যাচ্ছে তাতে আরো অন্য কিছু দিবসের মত এই দিনটারও বাণিজ্যিকীকরণের ষোলোকলা প্রায় পূর্ণ হয়েছে। গত শতাব্দীতে এই দিনটি পালন করা শুরু হয়েছিল শ্রমজীবি নারীদের দাবিদাওয়ার কথা মনে করে, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অধিকারের লড়াইয়ের অংশ হিসেবে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই দিবস পালনের সূচনা, তার কতটা কী আজ বিশ্বসমাজের মনে আছে বা মনে রাখার দরকার আছে তা যেন হাল আমলের জমকালো সেলিব্রেশন দেখলে বোঝার উপায় নেই। তাই এই শতবর্ষের এপারে, ইতিহাস স্মরণ করার জন্যে একটু পিছনে তাকানো যাক।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ধারণাটির সূত্রপাত হয়েছিল বিশের দশকের গোড়ার দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নারী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনের অংশ হিসেবে। ১৯০৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে নিউ ইয়র্ক সিটিতে পোশাক শিল্পে নিযুক্ত, কারখানার হাজার হাজার নারী শ্রমিকেরা ধর্মঘট করে, কর্মক্ষেত্রে নানা বৈষম্য, অস্বাস্থ্যকর এবং অমানবিক পরিবেশ, যৌন হয়রানি, ইত্যাদির বিরুদ্ধে, শ্রমজীবি নারীদের অধিকারের দাবীতে। এক বছর ধরে নানাভাবে চলা এই ধর্মঘটের বার্ষিকী উদযাপনে, ১৯০৯ সালে আমেরিকার সোশ্যালিস্ট পার্টি ২৮ শে ফেব্রুয়ারী দিনটি জাতীয় নারী দিবস হিসেবে পালন করে। এরপরে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত প্রত্যেক বছর আমেরিকায় ফেব্রুয়ারীর শেষ রবিবারটি জাতীয় নারী দিবস হিসেবে পালন করা হয়েছে।
এদিকে এই একই সময়ে, সাগরপারে, ইউরোপের নানা দেশেও শ্রমজীবি মেয়েরা সরব হয়েছে তাদের অধিকারের লড়াইয়ে। ১৯০৭ সালে ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে জার্মানির স্টুটগারটে অনুষ্ঠিত হয় কর্মজীবী নারীদের প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ক্লারা জেটকিন ছিলেন জার্মানিতে নারীদের সোশ্যালিস্ট আন্দোলনের এক প্রধান মুখ। দীর্ঘদিন তার নিজের প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা “Die Gleichheit (Equality)” তে তিনি শ্রমজীবি নারীদের সমস্যা, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের যে সব বৈষম্যের সম্মুখীন হতে হয় তা নিয়ে, নারীর অধিকার নিয়ে লেখালেখির মাধ্যমে সচেতনতার প্রসার করেছেন।
তিনবছর পরে ১৯১০ সালে, কোপেনহেগেনের আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারীদের সম্মেলনে, আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক শ্রমজীবি আন্দোলনের নারী দিবস উদযাপনের ধারণায় অনুপ্রাণিত হয়ে জার্মান প্রতিনিধি লুইস জিয়েটজ প্রথম প্রস্তাব দেয় বিশ্বব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক শ্রমজীবি নারী দিবস পালন করার। তার এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানায় ক্লারা জেটকিন স্বয়ং এবং সতেরোটি দেশের প্রায় একশ প্রতিনিধিরা। নারী দিবসের যে রেজোলিউশন নেওয়া হয়েছিল এই সম্মেলনে, তা ছিল,
“সমস্ত দেশের সমাজতান্ত্রিক নারীদের, নিজ নিজ দেশের শ্রেণী-সচেতন রাজনৈতিক ও ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলির (প্রলেতারিয়েতদের জন্যে) সাথে একজোট হয়ে, একটি বিশেষ নারী দিবসের (Frauentag) আয়োজন করতে হবে, যা সর্বোপরি নারীর ভোটাধিকারের দাবীর প্রচার করবে। সমাজতান্ত্রিক ধারণা অনুসারে, সামগ্রিক ভাবে ভোটাধিকারকে নারীদের অন্য দাবীদাওয়ার প্রশ্নের সাথে এক করে আলোচনার আওতায় আনতে হবে।”
এইসব প্রতিনিধিদের কাছে, "সমাজতান্ত্রিক ধারণা" সমর্থন করার অর্থ শুধু নারীর ভোটাধিকার ছিলনা। কর্মজীবী মহিলাদের জন্য শ্রম আইন, মা ও শিশুদের জন্য সামাজিক সহায়তা, একক মায়েদের সাথে সমান আচরণ, নার্সারি এবং কিন্ডারগার্টেনের ব্যবস্থা, স্কুলে বিনামূল্যে খাবার এবং বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বিতরণ এবং আন্তর্জাতিক সংহতি প্রচার করা, এরকম আরো অধিকারের দাবী এর অন্তর্গত ছিল, যার ফলে বিশ্বজনীন ভোটাধিকার মূল দাবী হলেও, নারী দিবস আদতে ছিল শ্রমজীবি নারীদের অধিকারের আন্দোলনের একটি বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ।
এরপরে ১৯১১ সালের ১৯শে মার্চ পালন করা হয় প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস, মূলত ইউরোপের কিছু দেশজুড়ে, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে। যেহেতু জার্মানি এর মূল উদ্যোক্তা ছিল, দিনটি স্থির হয়েছিল ১৮৪৮ এর বার্লিন রিভোলিউশনকে স্মরণ করে। ধীরে ধীরে অন্যান্য আরো দেশের সমাজতান্ত্রিক সংগঠনেরা নারী দিবস পালনে যোগ দিতে থাকে।এই দিনটিতে দেশে দেশে লক্ষ লক্ষ নারী পুরুষ প্রতিবাদে বিক্ষোভে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন, নারীদের বিভিন্ন অধিকারের দাবীতে। ১৯১৩ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে রাশিয়ায় মেয়েরা প্রথম নারী দিবস পালন করে তাদের দাবীদাওয়া ছাড়াও বিশ্বশান্তির উদ্দেশ্যে, ফেব্রুয়ারী মাসের শেষ রবিবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারী, রাশিয়ান ক্যালেন্ডারের হিসেবে, যা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ছিল ৮ই মার্চ।
১৯১৪ সালে, ইউরোপ জুড়ে নারীরা এই দিনে প্রতিবাদ আন্দোলন করে মূলত বিশ্বযুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং নারীদের ভোটাধিকারের পক্ষে। ব্রিটেন, রাশিয়া ও ইউরোপের নানা জায়গায় এই আন্দোলন প্রতিহত করতে ব্যপক ধরপাকড় হয়, দিকে দিকে নারী আন্দোলনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে চরম খাদ্য ঘাটতি ও অন্যান্য সমস্যার বিরুদ্ধে, ১৯১৭ সালে এই দিনে রাশিয়ায় মেয়েরা নারী দিবস উপলক্ষ্যে বিপুল সংখ্যায় বাইরে এসে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করে। “ব্রেড এন্ড পীস” দাবিতে এই ধর্মঘট ছড়িয়ে গিয়ে ক্রমশ সমস্ত স্তরের শ্রমিকের দৈনিক গণ ধর্মঘটে পরিণত হয় এবং পরে বিপ্লবের আকার ধারণ করে।রাশিয়ান বিপ্লব পরবর্তী কালে নারীরা আবার ভোটাধিকারের দাবীতে পথে নামলে তাদের সেই দাবী পূরণ হয়। বিশ্বের প্রধান দেশগুলির মধ্যে রাশিয়াই প্রথম নারীদের ভোটাধিকার দেয়, এর একবছর পরে ব্রিটেন এবং তিনবছর পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের ভোটাধিকারের আইন প্রণয়ন করা হয়।
এর পরে দীর্ঘকাল ৮ই মার্চ নারীদিবস হিসেবে আন্তর্জাতিক ভাবে পালিত না হয়ে বিচ্ছিন্ন ভাবে পালিত হতে থাকে বিভিন্ন দেশে ও বিভিন্ন সংগঠন দ্বারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত অনেক দেশ এটিকে কম্যুনিস্ট আর সোশ্যালিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসের একটি অংশ বলে আখ্যা দিয়ে, দিনটিকে বা নারীদের অধিকারের আন্দোলনের এই ইতিহাসকে কোনোরকম বিশেষ গুরুত্ব দিতে অস্বীকার করে।
১৯৭৫ সালে ইউনাইটেড নেশনসের একটি প্রস্তাবনায় আবার উঠে আসে নারীদিবস পালন করার কথা। নারীদের অধিকার এবং বিশ্বশান্তির কথা বলার জন্যে বছরের একটি নির্দিষ্ট দিন হবে নারী দিবস। প্রত্যেক সদস্য দেশকে বলা হয় তাদের নিজ নিজ ঐতিহাসিক ও জাতীয় ঐতিহ্য অনুসারে বছরের যে কোনো একটি দিন তারা যেন নারী দিবস হিসেবে পালন করে। ততদিনে যেহেতু বেশ কিছু দেশে ৮ই মার্চ ইতিমধ্যেই নারী দিবস হিসেবে চালু ছিল, শেষ অবধি ইউনাইটেড নেশনসও ৮ই মার্চ কেই নারী দিবস হিসেবে স্বীকার করে নেয়।
তবে এর পরেও নারী দিবসের উদযাপন খুবই সীমিত থাকে এবং দিনটিকে তার ঐতিহ্য অনুযায়ী নারীর অধিকারের, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূরীকরণের আলোচনা, বিশ্লেষণ, বিচ্ছিন্ন ভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অবদানকে স্বীকার করা ইত্যাদি কর্মসূচীর মাধ্যমে সাদামাটা ভাবেই পালন করা হত।
১৯৯৬ সালে ইউনাইটেড নেশনস প্রথম নারী দিবসের উদযাপনের হেতু বার্ষিক থিম ঘোষণা করে, “Celebrating the past, Planning for the Future”। এরপর থেকে প্রতি বছর নিয়মিত একটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে সারাবছর ধরে নানা কর্মসূচী পালনের মাধ্যমে উদযাপিত হয় সেই বছরের নারীদিবস।
২০২৬ শে ইউনাইটেড নেশনসের নারী দিবসের থিম হল “Rights. Justice. Action. For ALL Women and Girls”। মেয়েদের আইনি অধিকার (লীগ্যাল রাইটস)হল এবছরের থিমের মূল বিষয়। এদের বক্তব্য হল, “বর্তমানে, বিশ্বব্যাপী পুরুষদের আইনি অধিকারের মাত্র ৬৪ শতাংশ আইনি অধিকার নারীদের রয়েছে। জীবনের মৌলিক ক্ষেত্রগুলিতে, যথা কর্মক্ষেত্র, অর্থনৈতিক অবস্থা, সুরক্ষা, পারিবারিক অবস্থান, সম্পত্তি, গতিশীলতা, বাণিজ্য এবং অবসরকাল – এই সবকিছুতে পদ্ধতিগতভাবে আইন নারীদের সপক্ষে নেই অথবা অসুবিধাজনক অবস্থায় আছে। বিভিন্ন ক্ষতিকারক সামাজিক নিয়মনীতি এবং বৈষম্যমূলক নানা আইন নারীদের সমান ন্যায়বিচার অর্জনের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছে অথবা অনেক ক্ষেত্রে তাদের অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে। যদি নারীদের অগ্রগতি বর্তমান গতিতে চলতে থাকে, তাহলে নারীর আইনি সুরক্ষার ব্যবধান পূরণ করতে ২৮৬ বছর সময় লাগবে। এটি কোনও সময়সীমা নয়, এটি আত্মসমর্পণ।”
যেসব অধিকার নিয়ে লড়াই শুরু হয়ে নারী দিবস এসেছিল, সেইসব দাবীদাওয়া পেতে অনেক দেশেই একশ বছর পেরিয়ে গেছে, হয়ত অনেক জায়গায় এখনো পাওয়া হয়ে ওঠেনি।
ইউনাইটেড নেশনস এই দিনটির ঐতিহ্য অনুসারে প্রতি বছরই বিশ্বব্যাপী নারীদের অধিকারের দাবী, সমানতা ও সামগ্রিক অগ্রগতি হেতু থিম ও সেই অনুযায়ী নানা কর্মসূচী নিলেও, মূল উদযাপন এখন অনেকটাই বাণিজ্যিক “ব্র্যান্ড”এ পরিণত হয়েছে বলে সমাজ বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন। অনেক ক্ষেত্রেই এটিকে কিছুদিন আগে হয়ে যাওয়া ভালোবাসা দিবসের একটি বিস্তারের মত মনে হয়। নারীদের জরুরী বিষয়গুলি থেকে সরে গিয়ে এই দিনটি যেন একটি ভাসা ভাসা প্রতীকী উদযাপনে পরিণত হয়েছে, কর্পোরেট ও বাণিজ্যিকীকরনের হাত ধরে।
তাই আজকের দিনে সরকার বা বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা দ্বারা নারী দিবসের উদযাপনকে অনেকে “পিংক ওয়াশিং”ও বলছে। অনেক বড় বড় কম্পানি ও এধরণের সংস্থাগুলি নিজেদের প্রচার ও প্রসারের জন্য সামাজিক মাধ্যমে এই দিনটিকে ব্যবহার করে, সাধারণত খুবই মামুলী কিছু জেশচার বা প্রোগ্রামের মাধ্যমে। কিন্তু ভালো করে খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, আভ্যন্তরীন লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে বা মহিলা নেতৃত্বর প্রসারে বেশীরভাগদেরই সেরকম কোনো জরুরী উদ্যোগ, কম্পানি পলিসিতে থাকেনা। এছাড়াও আছে প্রতীকবাদ বা সিম্বলিজম। কয়েকটি সাফল্যের গল্প বার বার তুলে ধরে “নারী ক্ষমতায়নের” এক সংকীর্ণ সংজ্ঞা প্রচার করা হয়, যা আদতে বৃহত্তর নারীসমাজের কর্মক্ষেত্রে যে দৈনন্দিন সমস্যা ও আইডেন্টিটি বজায় রাখার যে সংগ্রাম তাকে অনেকটাই লঘু করে দেয়।
এইধরনের অনেক জায়গাতে দু একজন মহিলারা এমন থাকে যাদের অগ্রগতি কেরিয়ার ল্যাডারে ঠিকঠাক, এবং যখন বৈষম্যের কথা ওঠে, তখনই কুমীরছানার মত কম্পানিগুলিতে এদের দেখানো হয়। শুধু কম্পানি গুলি কেন, আমাদের দেশের কথা ধরলে সরকার বা চারপাশের মিডিয়া সবার হাতেই এইসব বিভিন্ন সরকারী বা বেসরকারী সংস্থা, বিভা্গ, বা প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া কুমীরছানার তালিকা হাতে মজুদ থাকে যা তারা নারীর ক্ষমতায়নের হাতেগরম প্রমাণ হিসেবে দরকারমত দাখিল করে থাকে।
সেইসব পাতাজোড়া ঝাঁ চকচকে জ্বলজ্বলে মুখের আলোতে চাপা পড়ে যায় বেশীরভাগ মেয়েদের কর্মক্ষেত্রের সমস্যা, পলিসি ইত্যাদি বাস্তবায়নের আসল গল্প, বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেয়েরা সত্যিই কতটুকু এগিয়েছে, কীরকম বেড়েছে তাদের যোগদানের হার, তার যাবতীয় পরিসংখ্যান। এই মহিলারা, তাদের সাফল্যকে এতটুকু খাটো না করেও বলতে পারি যে এরা বেশীরভাগ এদের ফিল্ডের অন্যান্য মেয়েদেরকে সঠিক প্রতিনিধিত্ব করেন না। এদের কথা শুনলে যা মনে হয় তা হল, মেয়েদের সমস্যা ও তা কাটিয়ে ওঠার দায়দায়িত্ব মেয়েদের নিজের। ইন্দ্রা নুয়ি, কিরণ শ অথবা অরুন্ধতী ভট্টাচার্য, এরা সফল ব্যক্তিত্ব, শুধু মাত্র সফল মহিলা নন। তাই এদের মত কিছু মহিলাকে দিয়ে দেশের কর্মজীবী পেশাদার মেয়েদের উন্নতির পরিমাপ করা আর আম্বানী আদানীর ব্যাঙ্ক ব্যালান্স দিয়ে দেশের আর্থিক অবস্থা নির্ণয় করা প্রায় একই লাগে আমার, দুটোই অবাস্তব, অথচ প্রথমটা হরদম হয়।
এই প্রসঙ্গে আমি এতকাল যে সেক্টরে যুক্ত ছিলাম তার কথা উদাহরণ হিসেবে দেখা যাক। মেয়েদের সংখ্যার হার সেখানে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছরের উপস্থিতির পরেও এখনো শতকরার হিসেবে দ্বিতীয়াংকেও পৌঁছয়নি, অর্থাৎ দশের নীচে আছে দীর্ঘ দিন ধরে। এবং যা পরিসংখ্যান পাওয়া যায় তাতে এই সংখ্যাটিতে সবরকম বিভাগ ও সব লেভেলের মেয়েই আছে, অর্থাৎ এইচ আর, ফাইনান্স, বা এরকম অন্যান্য বিভাগের মহিলাদের আলাদা করলে, দেখা যাবে আসলে বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির মেয়েদের সংখ্যা খুবই কম। এটি একটি ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টর বলেই ইঞ্জিনিয়র বা বিজ্ঞানের মেয়েদের উপস্থিতির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করছি। এছাড়া সেখানে পুরুষদের অনুপাতে মেয়েদের সংখ্যার বাড়ের হারও বেশ কম।
অথচ দেখা যায় শিক্ষাক্ষেত্রে গত এক দশকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগগুলিতে মেয়েদের উপস্থিতি বেড়েছে একশ শতাংশেরও বেশী। STEM এডুকেশনে যে দেশগুলি বিশ্বে প্রথম সারিতে আছে ভারতবর্ষ তাদের মধ্যে অন্যতম। ২০২৪-২৫ শে ভারতে মেয়ে STEM গ্র্যাজুয়েটের হার ৪৩%, আর ওয়ার্কফোরস ২৭% এবং এই সংখ্যাটাও মূলত আইটি সেক্টরের কারণে।ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টর ও বিজ্ঞান বা গবেষণা সম্পর্কীয় সেক্টর গুলি সমাজের উন্নতির এই ধারার ফসলের ভাগ পাচ্ছে না কী কারণে?
আমাদের সময়কার কলেজের ক্লাসপিছু হাতে গোণা কজন মেয়ে থেকে সাতাশ বছরে সংখ্যাটা বেড়ে অর্ধেক বা হালে কখনো তারও বেশী হওয়া সত্বেও, আমাদের কাজের জায়গায় সংখ্যাটা অনুপাতে সেরকম ছেড়ে প্রায় একেবারেই বাড়ে নি কেন, এতবছর পরেও!
প্রধান কারণ হিসেবে সচরাচর যা বলা হয়ে থাকে তা হল মেয়েরা সহজ কাজ চায়, কোর ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরে এসে কষ্ট করতে চায় না, বিশেষ করে যেখানে আই টির মত সাদা কলার ওয়ালা চাকরির বাজার যথেষ্ট ভালো সেখানে।
কিছুটা হয়ত ঠিক, কিন্তু ঠিক হলেও তা অনেকাংশে অনেক ছেলেদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। পরিস্কার কাজের ক্ষেত্র, বিদেশে যাওয়ার সুযোগ, শহরের পোস্টিং, বিভিন্ন কারণে অনেক ছেলেরাও আজকাল আই টি বা সমান গোত্রের কাজ বেছে নেয়, কোর ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর ছেড়ে। তাহলে শুধু মেয়েদের বিরুদ্ধেই এই ধরণের স্টেরিওটাইপিং কেন?
এমনি এমনি নয়, কিছু কারণ আছে নিশ্চয়, তবে ওই যে মেয়েরা ফাঁকিবাজ, পরিশ্রম করতে চায় না বা পারেনা, বাড়ি ছেড়ে দূরে যেতে চায়না, অথবা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মানসিকতা নেই, এগুলো অনেকাংশেই সত্য নয় অথবা হলেও তা ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে কোনো ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে সত্যি হতে পারে কিন্তু সাধারণ নারীসমাজ যে এভাবেই গড়া, তা ঠিক নয়। সুযোগ পেয়ে মেয়েরাও আজ দিকে দিকে নানা ঝুঁকিভরা ও পরিশ্রমের কাজ পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে, দরকারে ও ভালোবাসায়, এ তো সে তুলনায় কিছুই নয়। অথচ উপরোক্ত প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে সমস্ত মেয়েদের এই বাঁধাধরা গতে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকে সর্বত্র, খুব সহজেই।
কারণগুলো যদিও ভিন্ন জনের জন্যে ভিন্ন হয়, তবু সাধারণ ভাবে এও সত্যি যে অনেক মেয়েরাই সম্ভব হলে পেশা বেছে নিতে বাছবাছাই করে থাকে বা করতে বাধ্য হয় কিছুটা পারিবারিক কারণে, সাংসারিক প্রয়োজনে, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে।
সামাজিক নির্মাণের জেরে এখনো পরিবারের দৈনন্দিনের অনেকটা দায়িত্ব মেয়েদের ঘাড়ে পড়ে বিশেষ করে সন্তানের ভার। ওয়ার্ক লাইফ ব্যালান্স যদিও নারী পুরুষ দুজনের জন্যেই প্রযোজ্য কিন্ত এদেশে কর্মরতা নারীদের প্রসংগেই এটি সবচেয়ে বেশী আলোচিত! মেয়েদের জন্যে এই ব্যালান্স হল কীভাবে তুমি প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী একাধারে আদর্শ মা, পত্নী, বধূ, কন্যা সমস্তকিছু হয়েও কর্মক্ষেত্রে একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হতে পারো, সমক্ষেত্রের পুরুষদের ওয়ার্ক লাইফ ব্যালান্সের সংজ্ঞার সাথে যা ঠিক মেলে না।
আজকাল সন্তানের ভার বা পরিবারের অন্য দায়িত্ব অনেকাংশেই বাবারাও নিচ্ছেন, পালা করে, সমানভাগে। তাহলে কেন মেয়েদের সংখ্যা বাড়ছেনা বা আরো মেয়েরা কর্মক্ষেত্রে সেভাবে ওপরে উঠছে না কেন? চাকরির শুরুতেই তো আর মেয়েরা মা হচ্ছেনা, তাহলে তো অন্ততপক্ষে শুরুতে মেয়েদের আরো বেশী আসা উচিত, মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে চলে যাক, না সামলাতে পেরে, সে কথা আলাদা!
মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া মহিলাদের ডেটা এদেশে কোথাও সরকারীভাবে নেই, এবং সরকারী বা আধা সরকারী সংস্থা গুলিতে সাধারণত এই সংখ্যা বেশ কম হয়, সেখানে তাহলে মেয়েদের ওপরে ওঠার সংখ্যাটা বেশী হওয়া উচিত।
এতকাল ধরে অনেক মেয়েই এভাবে ভাবতে শিখেছে যে কাজে ভালো করলে বা উন্নতি করলেই হয় না, তাদের সাফল্যর মাপকাঠিতে পারিবারিক মেট্রিক্স গুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এটিও এক ধরণের নির্মাণ, এবং এর জেরে অনেকসময় মেয়েদের হয়ত দুকূল রাখতে গিয়ে আপস করতে হয়। ফলে হয় মেয়েরা কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে নাহলে দুদিক সামলাতে গিয়ে নিজেকে প্রায় নি:শেষ করে দেয়। এছাড়াও অনেক কাজের জায়গায় মেয়েদের একটা বাঁধাধরা ছাঁচে ফেলে তাদের অগ্রগতিকে রোধ করার প্রবণতাও দেখা যায় । কাজের জায়গায় সহকর্মী বা উপরওয়ালা যারা তারাও তো আসলে সমাজেরই লোক, এদের অনেকেরই মনে মেয়েদের সম্বন্ধে, তাদের ক্ষমতা সম্বন্ধে কিছু প্রাচীন ধারণা বা সংস্কার রয়ে গেছে, যা তাদের মহিলা কর্মীদের প্রতি ব্যবহারে, কাজে, নির্ণয়ে প্রভাব ফেলে।
এ সবই আদতে গিয়ে বৈষম্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বা দাঁড়াতে পারে। এবং ঐতিহাসিক ভাবে এইসব নির্মাণের প্রভাব এতটাই গভীর যে অনেক সময় মেয়েরাও এই বিভেদ বুঝতে পারেনা বা যখন বোঝা যায় তখন হয়ত দেরী হয়ে গেছে।
এই বিভেদ বা বৈষম্য মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে চলার পথে, এগোনোর পথে বাধা সৃষ্টি করে এটি একটি স্বীকৃত তথ্য, সারা বিশ্ব জুড়ে। এই বাধাকে অতিক্রম করেও মেয়েরা যে এগোয় না তা নয়, অনেকেই এগোয় কিন্তু সেক্ষেত্রে সেটা তো ন্যায় হলনা। একটা রেসে একজন প্রতিযোগী অন্যজনের থেকে অনেক পরে শুরু করে যখন, তার রেস জেতার সম্ভাবনা শুরুতেই খুব ক্ষীণ থাকে। এবার হয়ত অন্য প্রতিযোগী একদমই দৌড়তে পারেনা, বা গতি এর তুলনায় বেশ কম, বা সেদিন কিছু একটা অঘটন ঘটল, পরে শুরু করে জিতে গেল কেউ, কিন্তু সেটাকেই স্বাভাবিক মেনে নিলে অন্যরা যারা এরকম পরে শুরু করবে তাদের ওপর চাপ পড়বে অপরিসীম, এবং খুব সম্ভব তাদের অনেকেই দৌড়টা ঠিকমত দৌড়তে পারবেনা।
তাই যেসব মহিলারা যাদের কোন বৈষম্যর সম্মুখীন হতে হয়নি (অত্যন্ত ভালো কথা), তারা যদি বলেন বা ভাবেন যে আদতে বৈষম্য নেই, মেয়েরা হয়ত বা সামাজিক নির্মাণের কারণে, নিজেদের চিন্তাধারা বা উপলব্ধিতে কর্মক্ষেত্রে সেভাবে পুরুষদের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারছেনা বলে পিছিয়ে পড়ছে, এবং কারণ হিসেবে বৈষম্যকে দায়ী করছে, তাদের সেই চিন্তাধারা ভুল।
এধরণের ভাবনা আমি অনেক মহিলাদের মধ্যে দেখেছি বিশেষ করে শিক্ষিত পেশাদার মহিলাদের মধ্যে। আমরা উইমেন ইন এনার্জির পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে এনার্জি সেক্টরের বিভিন্ন মহিলাদের কাহিনী লিখি, তাদের সাথে কথা বলে, অন্যরা যাতে অনুপ্রেরণা পায় এদের কথা শুনে বা নতুনরা যাতে এই সেক্টরে আসতে আগ্রহী হয় সেই ভেবে। এখানেও যারা খুব সফল দু একজন তাদের মুখে আমি এরকম মতামতই শুনেছি, মেয়েরা ওপরে উঠছেনা বা আগে আসছেনা তার কারণ বৈষম্য নয়, কারণ তারা যোগ্য নয়, নিজেদের কাজ ও কেরিয়ারের প্রতি আন্তরিক নয়, নিবেদিতপ্রাণ নয়। সত্যিই যোগ্য হলে তাহলে তাদের কেউ আটকাতে পারবেনা।
এতে কিন্তু খুব আশ্চর্যের কিছু নেই। যে কোন কারণেই হোক, এই সব মহিলারা যারা ওপরে উঠেছেন তারা ওইসব যাকে বলে কিছুটা নির্দিষ্ট ছিলেন প্রথম থেকেই, সে যে কোন কারণেই হোক, এবং তার ফলে এদের কোনদিনই লড়াইটা সেভাবে লড়তে হয়নি। যারা লড়াই লড়েছেন বা এখনো লড়ছেন তারা সেই জায়গায় আসতে পারেননি যেখানে এলে তাদের কথা সবাই শুনবে। এই জন্যে যে গুটিকয়েক মহিলারা উপরে এসেছেন বা আছেন, তাদের উপস্থিতিতে মেয়েদের খুব একটা উপকার সাধন বা তাদের পথ সুগম হচ্ছে না। এরা ওপরে গিয়ে কম্পানি পরিচালনায় কোন বৈশিষ্ট্য বা বৈচিত্র্য আনেনা যা আসলে ভাবা হয়েছিল যে মেয়েরা আনবে।
মুশকিল হচ্ছে এই সব একজন দুজন মহিলারা শুধু যে উপকার কিছু করছেনা তা না, তারা অন্যান্যদের লড়াইটাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। যেসব জায়গায় মেয়েরা বৈষম্যের সম্মুখীন হচ্ছে সেখানে কর্তৃপক্ষ এদের বক্তব্যকে দৃষ্টান্তস্বরূপ ব্যবহার করছে এবং সমস্যাটা এড়িয়ে যাচ্ছে।
অনেক জায়গাতেই এমনও কথা উঠছে যে শিক্ষিত পেশাদার মহিলারা যাদেরকে শুধু মেয়ে বলে যেসব সুযোগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, মাতৃত্বের ছুটি, চাইল্ড কেয়ার লীভ, এগুলো কতটা সমীচীন। চাইল্ড কেয়ার লীভ এদেশে খুব হালের ব্যাপার, আগে ছিল মেটারনিটি লীভ। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি প্রায় অলিখিত নিয়ম থাকে যে মেটারনিটি লীভে গেলে মেয়েটির পরবর্তী প্রোমোশন সময়ে পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে গেল। ব্যতিক্রম থাকেনা যে তা নয় তবে তার সংখ্যা কম এবং এরকম হলে বা মেয়েটির ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে সে যাত্রায় হয়ত তার মাঠ ফাঁকা অর্থাৎ প্রতিযোগী ওই লেভেলে কেউ ছিলনা।
অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি শেষের শুরু। প্রায়ই মেয়েদের বাচ্চা হওয়ার পর ধরে নেওয়া হয় সে আর তেমন কাজের থাকবেনা। এবং এই যে প্রোমোশন দেওয়া হলনা সেই নির্ণয়টিকে মান্যতা দিতে এরকমই একটি বাঁধা গতের অজুহাত দেওয়া হবে এবং পরবর্তীতেও হতেই থাকবে। বাচ্চা ছোট, ও হয়ত এটা করতে পারবেনা, তাই ওকে দায়িত্ব দেওয়া গেলনা, তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে হবে, বাচ্চা ছোট, ট্যুরে যেতে পারবেনা বাচ্চা ছোট। কিছু মেয়েদের হয়ত সত্যিকারের সমস্যা ছোট বাচ্চা নিয়ে হয় বা হয়েছে, কিন্তু বাকীরা যাদের পরিবারে ভালো ব্যবস্থা আছে, সাহায্যকারীরা রয়েছে, বাচ্চার জন্য তার কাজের কোন সমস্যা হচ্ছেনা, তাদের ক্ষেত্রেও সেসব না জেনেই ধরে নেওয়া হবে সে অনেক কিছু পারবে না কারণ তার বাচ্চা ছোট। এবং এমত অবস্থায় টীমের যে ছেলেটিকে এইসব দায়িত্ব দেওয়া হবে মেয়েটির পরিবর্তে, পরবর্তী অ্যাপ্রেজালে সে অবশ্যই মেয়েটির থেকে আগে থাকবে, এইভাবে চার পাঁচ বছর চললে মেয়েটির পিছিয়ে পড়া সম্পূর্ণ হবে। পরিচিত এক ভদ্রমহিলার কাছে শুনেছি বিদেশে ট্রেনিংয়ের জন্যে তাকে না জিজ্ঞেস করেই তার বস ওপরে বলে দিয়েছিল, ওর বাচ্চা ছোট, তাকে ছেড়ে বিদেশ যাবে কী!আজ অবধি সেই নিয়ে ওনার ক্ষোভ যায়নি, কারণ ওর বাড়িতে সাপোর্ট সিস্টেম অত্যন্ত ভালো ছিল, এবং মতামত নিলে উনি যেতেন, ওর জায়গায় ওনার জুনিয়রকে পাঠানো হয়েছিল, এবং সে পরে ওকে টপকে যায়!
এবার নির্মাণ এমনিই যে এতেও কোন মেয়ের বা মেয়েদের মনে হতে পারে বস ঠিকই করেছেন, ভালোই ভেবেছেন, আহা, কী বিবেচক বস!
আজকাল চাইল্ড কেয়ার লীভ নিলেও একই ধরণের অবস্থা দেখা যাচ্ছে। যারা নিচ্ছে তারা ধরেই নিচ্ছে যে এরপরে অন্তত পরবর্তী প্রোমোশনের দৌড়ে তারা থাকবেনা। অনেকে সেজন্যে খুব জরুরী দরকার না হলে এধরণের ছুটি যত কম নেওয়া যায় তার চেষ্টা করে। এবং এও একটা জাহির করার মত ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে যে এইসব ছুটি আমি নিইনি, দ্যাখো, আমি কী নিবেদিত প্রাণ! তাহলে এসব ছুটি চালু করার পিছনে যে উদ্দেশ্য সেটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কোন কাজের কাজই হচ্ছে না।
কেন্দ্রে বর্তমান শাসক দলের তখন শুরুর দিক। রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রী কোন একটি ব্যাঙ্কের এক সভায় গেছেন। সেখানে নানা বিষয়ের পরে উনি ঘোষণা করেন যে সরকারী ব্যাংকে মেয়েদের সুবিধের জন্য তাদের পোস্টিং তাদের পরিবার বা স্পাউসের পোস্টিংয়ের কাছাকাছি দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হবে। সাধারণত বাইরে পোস্টিং বা বদলি সম্ভবত অফিসারদেরই হয়ে থাকে। সেসময় তো এই ঘোষণার খুব প্রশংসা হল সর্বত্র। উনিও নিশ্চয়ই সেই মেয়েদের পরিবারজনিত সামাজিক নির্মাণের দৃষ্টি থেকেই এরকম একটা পদক্ষেপের কথা বলেছেন, এর দরকার মনে করেছেন। বাস্তবিক ক্ষেত্রে পরে শুনেছি যে অনেক ব্যাঙ্কের ওপরওয়ালারা বলেছেন যে এটা সম্ভব নয়, মেয়েরা যদি প্রোমোশন চায় বা কাজে উন্নতি করতে চায় তাহলে তাদের প্রতিষ্ঠানের দরকার অনুযায়ী, ম্যানেজমেন্ট যে জায়গায় পাঠাবে সেখানে যেতে হবে। কেউ আর্জি জানালে তারা ব্যাপারটা যে খতিয়ে দেখবেন না তা নয়, তবে কোন বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
এভাবেই এর আগে মহিলা রাষ্ট্রপতির নির্দেশে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রালয় থেকে নির্দেশিকা জারি করে প্রতিটি সরকারী সংস্থা ও বিভিন্ন মন্ত্রালয়ের অধীনস্থ সমস্ত পাবলিক সেক্টর কম্পানিদের কর্মস্থলে মেয়েদের জন্যে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা আবশ্যিক করতে বলা হয়, যার মধ্যে বাচ্চাদের জন্যে ক্রেশ এবং স্পাউস পোস্টিং ইত্যাদি ছিল। এগুলোর বাস্তবায়নের ব্যাপারে সরকার থেকে কোনরকম ফলো আপ করা হয় কিনা জানা নেই, তবে অনেক জায়গাতেই এসব ঠিক মেনে চলা হয়না। বেসরকারী সংস্থা গুলির জন্যে কোনরকম বাধ্যবাধকতা একেবারেই নেই, তবু অনেকে কিছু কিছু সুবিধে নিজেদের পলিসিতে রেখেছে, কিন্তু সে সবই সামনের সারির কম্পানিরা, অজস্র মাঝারি বা ছোটখাটো ব্যবসারা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। এসব নিয়ে বিশদ আলাদা করে লিখতে হয়।
এখানে আমি এই প্রসঙ্গ উল্লেখ করলাম কারণ মেয়েদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য যে কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধে দেওয়া দরকার, এটা অনেকেই, আমাদের দেশের মাথারা সহ, অনুভব করেন বা জানেন। সারা পৃথিবী জুড়ে অনেক এরকম দেশ বা প্রতিষ্ঠান আছে যারাও অনুরূপ মনে করেন এবং ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। আবার অনেকে কিছু করেন না, এরকমও কম নেই।
কিন্তু বাস্তবে কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের সুবিধের জন্যে যে সব পলিসি চালু করা হয়েছে বা হওয়া উচিত বলে মনে হয় সেসবের সুফল তেমন কিছু পাওয়া যাচ্ছেনা, বিশেষ করে যেসব জায়গায় মেয়েদের সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় অনেক কম, সেখানে। উলটে এজন্যে মেয়েরা কর্মীদের মূল স্রোত থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। মহিলারা সুযোগ পাচ্ছে বলে ওপরওয়ালা বা বসেদের রোষে পড়ছে, নানাধরণের মন্তব্য শুনতে হচ্ছে, ইচ্ছে করে তাদের কাজে দায়িত্ব সীমিত করা হচ্ছে যাতে তারা অকর্মণ্য প্রতিপন্ন হয়, এসব কম বেশী অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়।
এভাবে সব দিক থেকে যোগ্য হলেও অনেকে শুধু মেয়ে বলেই বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, এও দেখা গেছে। একটা কথা বুঝে নেওয়া ভালো যে যেসব জায়গায় এতদিন পুরুষদের আধিপত্য ছিল ও এখনো আছে, সেখানে পুরুষ সহকর্মীদের কাছে তাদের মহিলা সহকর্মীদের গ্রহণযোগ্যতার কোন নির্দিষ্ট মাপকাঠি সেভাবে নেই। কেউ ভালো হলে তারও নানা কারণ হতে পারে, খারাপ হলে তারও।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য নিয়ে প্রতি বছর প্রচুর লেখা বেরোয়, পরিসংখ্যান, তথ্য ভরা রিপোর্ট পাওয়া যায়, এই উদ্যোগগুলির উদ্দেশ্য থাকে যাতে দেশ ও সরকার এ সম্বন্ধে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারে, বৈষম্য দূর করতে। এবং এতকিছু শুধু এইজন্যে যে মেয়েদের বাইরে রাখলে পৃথিবীর অর্ধেক সম্ভাবনা অব্যবহৃত থেকে যায়। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের বিভিন্ন রিপোর্ট বলে যে কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ দেশের জিডিপির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে থাকে। ক্যাটালিস্টের স্টাডিতে বার বার দেখা গেছে যে সব কম্পানির বোর্ডে একাধিক মহিলা আছে তাদের পারফর্মেন্স একই ফিল্ডের অন্যদের থেকে লাভদায়ক প্রমাণ হয়েছে। এই স্টাডি গুলির ওপর ভিত্তি করেই আমাদের দেশেও প্রতিটি কম্পানির বোর্ডে কমপক্ষে একজন মহিলা সদস্য আবশ্যিক করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের সময় দেখা গেছে যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি একটি নিয়মমাফিক আলংকারিক পদ হয়ে রয়ে গেছে, সত্যিকারের কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
মেয়েদের অংশগ্রহণ ও উন্নতি শুধু যে দেশের যে ট্যালেন্ট রিসোর্স আছে তার সম্পূর্ণ উপযোগ নিশ্চিত করে তাই না, কাজে নানা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও আঙ্গিক নিয়ে আসবে, যা হয়ত ভবিষ্যতের উদ্যোগে লাভজনক হতে পারে। অন্তত বিভিন্ন স্টাডি ও গবেষণা এরকমটাই অনুমান করছে।
কিন্তু এটা করতে গেলে, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করতে হবে। মেয়েদের সংখ্যা বাড়া দরকার ও তাদের এগোনো দরকার। উপরে উঠে পলিসি মেকিং, ডিসিশন মেকিং ইত্যাদি কাজে বেশী করে মেয়েদের আসা দরকার। আর তার জন্যে মেয়েদের সমান লেভেলে আনতে গেলে, বৈষম্য দূরীকরণ প্রচেষ্টাগুলিকে এমন করতে হবে যাতে সেগুলি সত্যিকারের ফলদায়ী হয়, এবং এও খেয়াল রাখতে হবে যেন এগুলির প্রয়োগ শেষ পর্যন্ত পুরুষ সহকর্মীদের সাথে মহিলাদের দুরত্ব বাড়িয়ে না দেয়, কাজের সুস্থ পরিবেশ নষ্ট না হয়।
মহিলাদের জন্য কর্মক্ষেত্রে যেসব সুযোগ সুবিধার বন্দোবস্ত আছে, তার মধ্যে যেগুলি পুরুষদের উপযোগী সেইসব সুবিধে পুরুষদের জন্যেও চালু করা যেতে পারে। মেটারনিটি লীভের সঙ্গে পেটারনিটি লীভের চলন হয়েছে অনেক জায়গায়, তবে এটির মেয়াদ বেশী নয়। অনেকে সময়মত নেয়ও না, পরে ভাগ ভাগ করে নেয়। এটির মেয়াদ বাড়িয়ে সন্তানের জন্মের সময় নিতে বাধ্য করা যেতে পারে। চাইল্ড কেয়ার লীভ শুধু মেয়েরা পায়, এটি ছেলেদেরও দেওয়া হোক। ইউরোপের অনেক দেশে এটি বাবা ও মা দুজনের জন্যেই সমান এবং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে সন্তান পালনে যে মহিলা ও পুরুষ দুজনেরই সমান দায়িত্ব, সমাজে সেই স্বীকৃতি কায়েম হতে সাহায্য করবে। আবার স্ত্রী ও পুরুষ দুজনেই যখন চাইল্ড কেয়ার লীভ পাচ্ছে বা নিচ্ছে, সেই কারণে শুধু মেয়েদের প্রতি বৈষম্য কমবে। মোটামুটিভাবে শুধু বৈষম্য কম করা নয়, প্রচেষ্টা হওয়া উচিত দিনের শেষে একটি অল ইনক্লুসিভ ওয়ার্কফোরস নির্মাণ করা।
এছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে মেয়েদের পলিসি ও তার প্রভাবের নিয়মিতরূপে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন আছে, তথ্য ও পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে। অধিকাংশ কম্পানির বার্ষিক রিপোর্টে আমাদের দেশে মেয়েদের কোন পরিসংখ্যান থাকেনা, বা থাকলেও খুব দায়সারা ভাবে থাকে। অনেক জায়গায় দেখলে দেখা যাবে উইমেন এম্পাওয়ারমেন্ট এই হেডিংয়ে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটির অন্তর্গত কাজকর্ম ও উইমেন এমপ্লয়ীদের ব্রেস্ট ক্যান্সারের জন্যে মেডিক্যাল ক্যাম্পের হিসেব সব একসাথে দেওয়া আছে। অথচ অনেক আন্তর্জাতিক কম্পানিতে তাদের বার্ষিক রিপোর্টে মহিলা এমপ্লয়ীদের নিয়ে বিশদ (কত সংখ্যা বাড়ল, কোন লেভেলে কজন, কী কী বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে মহিলাদের জন্য)দেওয়া থাকে। আজকাল আমাদের আশেপাশে বিভিন্ন কম্পানিরা তাদের মহিলাদের জন্যে লীডারশিপ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে থাকে, এমনকি যেখানে মহিলাদের উপস্থিতি হাতে গোণা সেখানেও। সেসব খবর এইসব ট্রেনিং দেনেওয়ালা কম্পানিরা ফলাও করে ছাপায়। এদিকে এন্ট্রি লেভেলে মেয়েদের নেওয়ার জন্যে আলাদা কোন উদ্যোগ কিন্ত সেভাবে দেখা যায়না।
এমন হতে পারে ক্ষেত্র বিশেষে কোন একটি সুবিধে অদরকারী আবার অন্য কোন সুবিধে মেয়েদের জন্য সেই কাজে বিশেষ করে জরুরী। যেমন অনেক জায়গায় ওয়ার্ক ফ্রম হোম করলেও চলে, সেক্ষেত্রে হয়ত মেয়েদের চাইল্ড কেয়ার লীভ বা মেটারনিটি লীভ কম করে দরকার মত ওয়ার্ক ফ্রম হোমের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। অনেক ছোটখাটো কম্পানি আজকাল নিজেদের অফিসের সেটআপ সেরকম বিস্তৃত না করে মহিলা কর্মচারীদের বাড়ি থেকে কাজ করতে বলে। সরকারী ও বেসরকারী কম্পানিরা এই ধরণের সুবিধা চালু করতেই পারে, বিশেষ করে আজকের যুগে যেখানে অনেক কাজ অন লাইনে হয়ে যায়, দরকারে যোগাযোগের জন্যে ইমেল ফোন ভিডিও কল ইত্যাদি তো থাকেই।
আবার যেখানে দৈহিক পরিশ্রমের কাজ আছে, সেখানে মেয়েরা কাজ করতে গেলে মেন্সট্রুয়েশন লীভ দেওয়াটাও একটা খুব কার্যকরী পদক্ষেপ হবে। মেয়েদের জন্যে পরিস্কার টয়লেটের বন্দোবস্ত, পার্সোনাল হাইজিন কত জরুরী সে সবার জানা। তবু অনেক কাজের জায়গায় কর্তৃপক্ষ এমন উদাসীন থাকে বা সামান্য খরচ করতে কৃপণতা করে সে আর বলার কথা নয়। যেসব জায়গায় রাতে কাজ করতে হয় সেসব জায়গায় মেয়েদের জন্যে পর্যাপ্ত সুরক্ষার বন্দোবস্ত রাখা আইনত বাধ্যতামূলক।কিন্তু সেই কারণেই অনেক কর্মক্ষেত্রে রাতের কাজে মেয়েদের রাখতে চায়না, সঠিক সুরক্ষার বন্দোবস্তের জন্যে খরচ বাড়াতে চায়না বলে। এর ফলে শ্রমশক্তির একটা বড় এরিয়া থেকে মেয়েরা বাদ পড়ে যায়।কথা হোক এই নিয়ে।
ছোট ছোট অনেক পদক্ষেপ আছে, উপায় আছে, যেগুলো মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে তাদের অনেকটা একসাথে এগোতে সাহায্য করতে পারবে। কিন্তু সবথেকে যা জরুরী তা হল সর্বক্ষেত্রে যেসব ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা দায়িত্বে রয়েছে তাদের সদিচ্ছা। কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে এড়িয়ে না গিয়ে বা দু চারটে প্রতীকী ব্যবস্থা নিয়ে হাত ধুয়ে ফেললে যে কাজের কাজ কিছু হয়না। আজ প্রায় দু দশক ধরে প্রকাশিত জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের অর্থনীতিতে, শ্রমশক্তিতে, কর্মক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতির হার একইভাবে নিম্নগামী রয়ে গেছে, এই আলোচনা হোক এদেশের নারী দিবসের প্রধান বিষয়, অন্তত প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে, আবশ্যিক ভাবে। একইসাথে চলুক উৎসব, ফুল ও কেক, সব নারীদের জন্যে, শুধু স্ব স্ব ক্ষেত্রের জরুরী আলোচনা না ভুলে, ক্ষমতায়নের গাড়ি যাতে বেলাইন না হয়!