

অলংকরণ: রমিত
পনেরশো উনচল্লিশের বাইশে সেপ্টেম্বর প্রাণত্যাগ করেন শিখগুরু নানক। মৃত্যুর আগেই তাঁর হিন্দু-মুসলমান শিষ্যদের মধ্যে আকচা-আকচি, এক দল চায় তাঁর মরদেহ দাহ করতে, অন্যদল কবর দেবে তাঁকে। শিষ্যদের ডেকে নানক বললেন, তোমরা এক-রাত্তির চাদর দিয়ে আবৃত করে রেখো আমার মরদেহ। আবরণের আগেই মুসলমানরা আমার বাঁয়ে রাখবে একগুচ্ছ ফুল, আর হিন্দুরা ডানদিকে। আবরণ পরের দিন তুলে নেবার পর যাদের দেওয়া ফুল তাজা থাকবে বেশি, তারাই আমার সৎকারের অধিকার পাবে।
সবাই হাজির পরের দিন সকালে দুরুদুরু বক্ষে, আবরণ উন্মোচনের সময়। উন্মোচিত হল আবরণ, বিবদমান শিষ্যরা অবাক হয়ে দেখল গুরুজির মরদেহ উধাও, মুসলমান আর হিন্দু শিষ্যদের দেওয়া পুষ্পগুচ্ছ স্তবক হয়ে পড়ে আছে শয্যার কেন্দ্রস্থলে, সব ফুলই সমান তাজা!
হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন? – না-হিন্দু না-মুসলমান অথবা হিন্দুও মুসলমানও – যাঁর একমাত্র পরিচয় শুধু বাঙালিই – বাঙালি এবং কবি – সেই কাজি নজরুল ইসলাম সারা জীবন এই সম্প্রদায়গত বিভাগ মেনেই নিতে পারেননি। তবুও একদিকে পাকিস্তান তর্ক আর অন্যদিকে উনিশশো বিয়াল্লিশের সাত আর আটুই জুলাই কংগ্রেসের বোম্বাই অধিবেশনে গান্ধীর ভারত ছাড় প্রস্তাব গৃহীত হবার পর কলকাতায় দাঙ্গা লাগল পরের দিনই, নয়ই জুলাই। কলকাতার আকাশে তখন জুলাইয়ের কালো মেঘের ঘনঘটা। সেই মেঘের আবরণ উন্মোচনের প্রয়োজন হল না, গার্স্টিন প্লেসের রেডিও অফিসে ছিলেন নজরুল। মেঘ বাসা বাঁধল তাঁর বিশ্বখ্যাত ঈষৎ রক্তিমাভ ডাগর চক্ষুদ্বয়ের মধ্যে। কোনও তাজা ফুলের স্তবক পুষ্পাঞ্জলি হয়ে ঝরে পড়ল না তাঁর পদযুগলে; সবাই দেখল, সকলের চোখের সামনে অশ্রুপাত করতে করতে তিনি প্রাণ নয়, মন ত্যাগ করলেন। সেই থেকে উনিশশো ছিয়াত্তরের উনতিরিশে আগস্ট, কিঞ্চিদধিক চৌত্রিশ বছর, তাঁর মনের ঠিকানা খুঁজে পায়নি কেউ। জন্মলগ্নের মোমেন্টাম শরীরটাকে, শুধু শরীরটাকেই, টেনে নিয়ে গেছে সাতাত্তর বছর!