খ্রিষ্টাব্দ ৩৯৮৭। মহাশূন্যের আগন্তুকরা পৃথিবীর পূর্বাঞ্চলে পশ্চিমবঙ্গ নামক এক লুপ্ত প্রদেশের ধ্বংসাবশেষ খুঁড়ে বের করল। এখানে বাস করত এমনই এক বিচিত্র মানবগোষ্ঠী, যারা অবান্তর বিষয়ে দিবারাত্রি কোন্দল করাকে নিজেদের সাংস্কৃতিক চর্চা বলে মনে করত। এবং নানান বিষয়ে খোপবাজি করে অতিষ্ঠ করে তুলত অন্যের জীবন। জীবজগতে ছারপোকা যেমন অতি তুচ্ছ প্রাণী হয়েও বিছানায় সেঁধিয়ে থেকে মানুষের ঘুম ও রতিক্রিয়ার বারোটা বাজানোর ক্ষমতা রাখে, তেমনই এই অদ্ভুত জনগোষ্ঠীও তাদের অবিরাম নাকগলানো স্বভাব ও অনন্ত মতামত-উৎপাদনের মাধ্যমে গোটা পৃথিবীকে ক্লান্ত, বিরক্ত এবং ক্ষিপ্ত করে রাখত।
ঠিক কী হেতুতে এই বিচিত্র জাতির বিদায়ঘণ্টা বাজে, তা নিয়ে ভিনগ্রহী গবেষকদের মনে ছিল উদগ্র কৌতূহল। তাঁরা আন্দাজ করেছিলেন, এত প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু এক সভ্যতার পতনের পিছনে নিশ্চয়ই মহামারি, খাদ্যসংকট কিংবা জলবায়ু-বিপর্যয়ের মতো কোনও অবশ্যম্ভাবী কারণ নিহিত থাকবে। কিন্তু বিস্তীর্ণ সমভূমির ছাতি বরাবর কোপাকুপি করতেই মাটির নিচ থেকে উঠে আসতে থাকে এমন সব নমুনা, যা দেখে ভিনগ্রহী প্রত্নতাত্ত্বিকদের চক্ষু চড়কগাছ।
পলির আস্তরণ ভেদ করতেই মিলল: তিন কোটি ফর্দাফাঁই হওয়া আকাশি-সাদা জার্সি, দেড় কোটি শতচ্ছিন্ন লাল-সবুজ হেডব্যান্ড এবং কোটি কোটি স্মার্টফোনের কঙ্কাল। তবে সবচেয়ে বড় চমকটি অপেক্ষা করছিল মাটির আরেকটু গভীরে। গভীর পলি খুঁড়ে উদ্ধার হলো একটি অবিনশ্বর প্লাস্টিকের ঝান্ডা - যাতে লেখা, “মেসি মানে কাব্য, রোনালদো মানে মাংসপেশি”। তার ঠিক পাশেই, পুঁতে রাখা ছিল প্রতিপক্ষের পাল্টা ধ্বজা- “রোনালদো মানে শ্রম, মেসি মানে জোচ্চুরি”।
লিপি উদ্ধার করা গেলেও, এই গূঢ় বাক্যের অর্থ বুঝতে গিয়ে এলিয়েন গবেষকদের রীতিমতো ল্যাজেগোবরে হওয়ার জোগাড়! এই 'মেসি' বা 'রোনালদো' বস্তুটি আসলে কী? এরা কি প্রাচীন কোনও দেবতা? ভয়ংকর কোনও দলপতি? নাকি কোনও প্রতাপশালী সামন্তপ্রভু?
এতকিছু শুরুতেই বোধগম্য না হলেও, অন্তত এটুকু জলের মতো সাফ হয়ে গেল যে, এই লুপ্ত জাতিটি ছিল ঘোরতর 'প্লাস্টিক-পাগল'। তারা যেমন প্রতিবাদের প্যামপ্লেটে প্লাস্টিক ব্যবহার করত, তেমনই মুখেভাতের মেনুকার্ডেও। এত শতাব্দী পরেও মাটির নিচে অক্ষত ঝাণ্ডার মূল কারণ এই অবিনশ্বর পলিমার যৌগটি।
ডিজিটাল ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষকেরা প্রথম দিকটায় মুহুর্মুহু “GOAT” শব্দের ব্যাপক অভিঘাতে রীতিমতো ভিরমি খাচ্ছিলেন। তাঁদের স্থির বিশ্বাস জন্মেছিল, এই 'GOAT' নিশ্চয়ই মিশরীয় শেয়াল-দেবতা আনুবিসের মতোই ছাগল-মুখো প্রাচীন কোনও স্থানীয় উপাস্য। কারণ এত উত্তেজনা, এত খেয়োখেয়ি, এমন অনন্ত খিস্তি-খেউড়, প্রকাশ্য ল্যাং-মারামারি, এমনকি অনায়াস বন্ধুত্ব-বিয়োগ -এসব প্রলয়কাণ্ড যে স্রেফ চামড়ার একটি বল লাথানোর বিনোদন থেকে জন্মাতে পারে, সে কথা আকাশচারী গবেষকদের সুস্থ প্রত্ন-মস্তিষ্কে কিছুতেই ধরছিল না।
পরবর্তী গবেষণায় অবশ্য আরও বিচিত্র সব তথ্যের হদিশ মেলে। ডিজিটাল ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার হয় “ফেসবুক” নামের এক প্রকাণ্ড ভার্চুয়াল খোঁয়াড়, যেখানে আক্ষরিক অর্থেই বাঁধা পড়েছিল গোটা জনজাতি। সেখানকার 'লাইক'-মুদ্রা অর্জন করে তারা খরিদ করত সামাজিক প্রভাব ও প্রতিপত্তি। হাসিল করত বন্ধু বান্ধবী।
এছাড়া “হোয়াটসঅ্যাপ” নামের এক নর্দমা-সদৃশ গোপন পরিসরের শিলালেখ পরীক্ষা করে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, এই ভয়ংকর গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আদপে মানুষের পায়ে লাথির নানারকম কৃৎকৌশল ও তার বিন্যাসকে ঘিরেই আবর্তিত। অর্থাৎ, বিষয়টি ‘ফুটবল’ নামক এক আদিম ক্রীড়া মাত্র!
এই ফেসবুক-খোঁয়াড়ের সবচেয়ে মূল্যবান আবিষ্কার ছিল “কমেন্ট থ্রেড”। গবেষকেরা প্রথমে ভেবেছিলেন, এগুলি হয়ত এই জাতির প্রাচীন কোনও বংশলতিকা। পরে বোঝা যায়, এগুলি আদপে তাদের প্রাত্যহিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গৃহযুদ্ধের জ্বলন্ত প্রামাণ্য নথি। শান্তিকামী কোনও নির্বোধ দৈবাৎ সেখানে শান্তিপ্রস্তাব দিয়ে বসলে, পরবর্তী সাতশো বিয়াল্লিশটি মন্তব্যে অত্যন্ত সযত্নে তার চোদ্দো গুষ্টি উদ্ধার করে দেওয়া হত।
তাঁরা আরও জানলেন, GOAT বলতে এই জাতি বুঝত “সর্বকালের শ্রেষ্ঠ”। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের জন্য খেলার নিরেট পরিসংখ্যানের বদলে তারা ঢের বেশি ব্যবহার করত মা-বোন-তোলা গালি এবং চোয়াল-ফাঁক-করা কুৎসিত হাসি, বা রাগে-জ্বলতে-থাকা ডিজিটাল মুখভঙ্গি!
লাগাতার প্রত্নখনন এবং ফেসবুক-কমেন্টের ASCII কোড ভেঙে ইতিহাসবিদেরা যে-সব দাহ্য নথি উদ্ধার করেছেন, তা থেকে জানা যায়—ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এক সন্ধ্যায়, এক অখ্যাত চায়ের দোকানেই বেজে উঠেছিল সর্বনাশের প্রথম ঘণ্টা। এক মেসিভক্ত ভাঁড়ের চা’এ সড়াৎ চুমুক মেরেই বলে ওঠে, “মেসির পায়ে বল থাকলে মনে হয় ঈশ্বর অলস বিকেলে ক্যালিগ্রাফি করছেন।” পাশের বেঞ্চ থেকে তক্ষুনি পাল্টা ঝাপট মারে এক রোনাল্ডোপ্রেমী, “ক্যালিগ্রাফি না হাতি, মনে হয় ক্যানভাসে কাদা লেবড়ে দিচ্ছে”।
কথার পিঠে কথা তার পিঠে কথা থেকে শুরু হয় খণ্ডযুদ্ধ। পরের দিনই গঠিত হয় “আর্জেন্টিনীয় নন্দনরক্ষা মঞ্চ”। পাল্টা নির্মাণ হয় “রোনালদীয় আত্মনির্মাণ সংগ্রাম পরিষদ”। প্রথম দল হাঁকড়ায়, ফুটবল হল অনায়াসের শিল্প। দ্বিতীয় দল চেল্লায়, অনায়াস আসলে অলসের ষড়যন্ত্র। এইভাবে ফুটবল ক্রমে খেলা থেকে জীবনদর্শনে, জীবনদর্শন থেকে গৃহযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু বাঙালির জাতিগত দুর্ভাগ্য ছিল, সে একখানা খোপে স্থির থাকতে পারত না। একটিমাত্র সাদামাটা বিরুদ্ধ খোপে নিজেকে আটকে না থেকে এদের বিভাজনের জাল বিস্তৃত হত বহুদূর। যে কোনও বিষয়কে মুহূর্তে পক্ষ-বিপক্ষ, শুদ্ধ-অশুদ্ধ, দেবতা-দানব এইসব তুচ্ছ অথচ রক্তগরম করা খোপে সাজিয়ে ফেলতে তারা ছিল সিদ্ধহস্ত। দল, জোট, মোর্চা, টিম, ফ্রন্ট, লিগ, আঞ্জুমান, পরিষদ, সভা, ক্লাব, সংস্থা, সমিতি, বৃন্দ, মণ্ডলী – কী ছিল না সেখানে।
মেসি-শিবিরের ভিতরেই দ্রুত বিভাজন দেখা দিল। একদল বলল, “মেসি আসলে রবীন্দ্রনাথীয়। আরেকদল বলল, অসম্ভব! তিনি জীবনানন্দীয়।” প্রত্যেকেই নিজেকে একমাত্র প্রকৃত মেসি-পন্থী বলে দাবড়ে ঘোষণা করল। রোনালদো শিবিরেও চলছিল ধারাবাহিক অশান্তি। কেউ বলল, রোনালদো পুঁজিবাদী আত্মনির্মাণের প্রতীক। অন্যরা রায় দিল, শ্রমিকশ্রেণির ঘামকে বিশ্বমঞ্চে তোলা যুগনায়ক তিনি। এই কলহরত দলগুলি মাঝে মধ্যেই কিন্তু খেই হারিয়ে ফেলত, কেউ হয়ত মেসিপন্থী, অথচ সে সত্যজিৎ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান। তখন অন্য এক মেসিপন্থীর মাথায় সে মুগুর বসিয়ে দিতেই পারে। কারণ মুগুর খাওয়া যে আবার ঋত্বিক পরিষদের সভাপতিও বটে।
এভাবেই একদিন শ্যামবাজার পাঁচমাথায় চলছিল ‘বিশ্ব মেসীয় সম্মেলন’। ঠিক তখনই পাশের রাস্তা দিয়ে ‘রোনালদীয় ইচ্ছাশক্তি যাত্রা’ কুচকাওয়াজ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল। দুই শিবিরের সদস্যরা একে অন্যকে উপেক্ষা করলেই ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু বাঙালি আরও অনেক কিছুর মতই উপেক্ষা করার বিদ্যেটি তেমন রপ্ত করতে পারেনি। রাজ্যজুড়ে শুরু হল গৃহযুদ্ধ ; অতঃপর প্রশাসনিক অচলাবস্থা। আগে বিষয়টি চায়ের দোকান, ফেসবুক, পাড়ার ক্লাব এবং জামাইষষ্ঠীর টেবিল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ক্রমে দেখা গেল, হাসপাতালের আউটডোরে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন দেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করছেন, আপনি মেসি না রোনালদো? স্কুলে ভর্তি হওয়ার ফর্মে নতুন ঘর: অভিভাবকের ফুটবল-আদর্শ। এমনকি পাড়ার মুদি বাকিতে চাল দেবে কি না, তা নির্ভর করছে ক্রেতা ৭ বলছে, না ১০।
অতএব প্রশাসন বাধ্য হয়েই গঠন করল “GOAT নির্ধারণ কমিশন।” কমিশনের কাজ ছিল বৈজ্ঞানিক ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া - কে বড়। কমিটিতে রাখা হল এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, দুই প্রাক্তন ফুটবলার, চারজন কবি, চারজন জিম ট্রেনার, সাতজন পাড়ার ক্লাবসচিব, বারোজন ইউটিউব-বিশেষজ্ঞ, এবং একজন মানুষ যিনি জীবনে কোনোদিন ফুটবল দেখেননি - তাঁকেই নিরপেক্ষ সদস্য বলা হল। অনেক বিচার-বিশ্লেষণ, নথিপত্র, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সাত কাপ লাল চা খরচের পর কমিশন শেষমেষ এক আপশ-প্রস্তাব দিল: মেসি শিল্প, রোনালদো শ্রম; দু’জনেই মহৎ। এই বিপজ্জনক নিরপেক্ষতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের নানা প্রান্তে আগুন জ্বলে ওঠে, এবং প্রশাসন বাধ্য হয় জরুরি অবস্থা জারি করতে।
কারণ, এই জনজাতি ছিল জন্মগতভাবে আপোশহীন। “দু’জনেই বড়”—এই মধ্যপন্থা মেনে নেওয়ার অর্থ হলো এতদিনের জমানো খিস্তিখেউড়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্লক-আনফ্রেন্ড, শ্বশুরবাড়ি বর্জন, পাড়ার ক্লাব ভাগ, এমনকি বাপ-ব্যাটার বাক্যালাপ বন্ধ—সবই যে চূড়ান্ত বৃথা! তাদের চিরায়ত দর্শনই ছিল: একজনকে ভালোবাসলে অপরজনকে ঘৃণা করতেই হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার ময়দানে এরা প্রত্যেকেই ছিল একেকটি ভয়ংকর কাগুজে বাঘ, যারা রক্তক্ষয়ী তর্কে ঝাঁপিয়ে পড়তে বিন্দুমাত্র পিছপা হতো না।
তাই, আপোশ-প্রস্তাবের পরদিনই ওই লুপ্ত প্রদেশে নতুন আন্দোলনের বীজ রোপিত হলো—“আপোশ মানি না।” ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মেসি ও রোনালদো-পক্ষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে মিছিল করল শান্তি-কমিশনের বিরুদ্ধে। তাদের আকাশভেদী যৌথ স্লোগান ছিল: “শত্রু চাই, শান্তি নয়!” আসলে, শত্রু ছাড়া এই জাতিটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই মণিহারা ফণীর মতো দিশেহারা।
এলিয়েন গবেষকদের অনুমান, সেই অভূতপূর্ব যৌথ মিছিলটি মোড়ের মাথায় গিয়ে বাঁয়ে ঘুরবে নাকি ডানদিকে—তা নিয়েই সম্ভবত নতুন করে অশান্তির সূত্রপাত হয়। ফলস্বরূপ, শুরু হয় গৃহযুদ্ধের অন্তিম পর্যায়। এই সমস্ত ডিজিটাল ও পারিপার্শ্বিক ঘটনাচক্র বিশ্লেষণ করে গবেষকরা এই অকাট্য সিদ্ধান্তেই উপনীত হন যে, নিছক এই 'খোপবাজি' বা আত্মঘাতী মেরূকরণের ফলেই আস্ত জাতিটি পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নিকেশ হয়ে গেছে।
ধ্বংসস্তূপের একেবারে তলদেশ থেকে উদ্ধার হওয়া সর্বশেষ প্রাসাশনিক বিজ্ঞপ্তিটিই ছিল এই ট্র্যাজেডির সর্বশেষ পুনরুদ্ধারিত নথি। যার বয়ান খানিকটা এরকম:
“নাগরিকদের জানানো যাচ্ছে, রাজ্যের সার্বিক শান্তি রক্ষার স্বার্থে প্রত্যেকে আগামী সোমবারের মধ্যে নিজের জন্য অন্তত একজন স্থায়ী শত্রু নির্বাচন করুন। নিরপেক্ষদের রেশন সাময়িক ভাবে স্থগিত থাকবে।”
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।