আমার প্রথম সরস্বতী পূজার কথা মনে এলে মনে আসে এক ভোরবেলার কথা। আলো তখনও ফোটেনি, কুয়াশায় ভরে আছে চারদিক, গাছের পাতায় ফোঁটা ফোঁটা জলের বিন্দু ঝরে পড়ে। একটা তোবড়ানো বালতি, গরম জলে নিম আর হলুদ—স্নান সেরে আমার খুব শীত এলো, সারা গায়ে কুসুম ফুটেছে। এ এক মুশকিল—ছোটবেলার স্মৃতি একটানা মনে থাকে না, ছেঁড়া ছেঁড়া; একটা ঘটনার আগে-পরে আরেকটা এসে পড়ে। তবু এই ছোটো ছোটো ছবি কোলাজের মতো মাথার ভিতর থেকে যায়, যেন এসব ঘটনা ঘটেছিল, হয়তো ঘটেনি কিংবা আমি শুনেছি কিছু গল্প—মিলে-মিশে এক স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।
আমার এই স্মৃতিকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে। আমি বিশ্বাস করি, সেদিন বাবার সাইকেলের সামনে আমি আর পিছনে দাদা—আমরা একসঙ্গে গিয়েছিলাম রামকৃষ্ণ আশ্রমে। এক শিল্পশহরে, কিছু অপরিষ্কার রাস্তার পাশে এক মরুদ্যান এই স্কুল—চন্দ্রমল্লিকার বাগান, মায়ের মন্দির, শিবলিঙ্গে ফুল—সে এক ম্যাজিক স্কুল। সব সুন্দর মেয়েরা শাড়ি পরে এসেছে, ধুতি পরে সিনিয়র স্কুলের ছেলেরা ব্যস্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের কিসের যে এত তাড়া ঠিক বোঝা যায় না। তাদের ব্যস্ততা পেরিয়ে জীবনবাবুর কণ্ঠ ভেসে আসে—“বেদ, বেদাঙ্গ, বেদান্ত, বিদ্যাস্থানেভ্য এব চ।”
এই জীবনবাবুকে পরে আবারও দেখি আশ্রমে ভর্তি হওয়ার পরীক্ষার সময়, যখন তিনি ‘নাইফ’ বানান জিজ্ঞেস করেন। ততদিনে আমি জেনে গেছি, ‘নাইফ’-এর ‘কে’ উচ্চারণ হয় না। জীবনবাবু আমায় কোলে বসিয়ে স্লেটে লেখাচ্ছেন—অ আ এ বি সি ডি। সামনে দেবী আমার দিকে ঝুঁকে আছেন, ধূপের ছাই পুড়ে পুড়ে বড় হচ্ছে। দেবী বলছেন—বড় হও, মানুষ হও, পড়াশোনা করে বড় হও—বিদ্যাস্থানেভ্য এব চ! হয়তো অন্য কেউ বলছিল, কিংবা কখনও বলেনি, বা বলেছে অনেক পরে—স্মৃতির মধ্যে তালগোল পাকিয়ে যায়। আজ যে স্মৃতি আছে তা বলে, সেদিন দেবী আমায় এই কথাই বলেছিলেন। যা আমি রাখিনি, কিংবা রেখেছি।
আশ্রমে ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়ে যখন শিশুশিক্ষায়নে ভর্তি হলাম—একটা তিনতলা বাড়ি, যা আমার স্কুল বলে ভাবতে বেশ কষ্ট হতো—তবু এখানেও পূজা হতো। প্রতিবছর খিচুড়ি ভোগ। বাবা আমায় দিয়ে আসতেন, নাকি তখন রিকশা করে যেতাম—মাসভাড়ার হারুদার রিকশা। দেবীর মূর্তি এখানেও আমায় বলত—বল, কী চাস? আমি ততদিনে পড়ে ফেলেছি সচিত্র বিবেকানন্দের জীবন। দারুণ অর্থকষ্ট নরেনের, ঠাকুর পাঠাচ্ছেন—“যা বোকা, মার কাছে টাকা-পয়সা চেয়ে নে।” বারবার তিনবার। নরেন চাইছে—বিদ্যা দাও, বুদ্ধি দাও, জ্ঞান দাও। এর থেকে আর কী বেশি চাইবার আছে? আমিও চিরকাল চোখ বুজে এই একই বাসনা করে গেছি। ‘নাইফ’ শব্দের ‘কে’ অনুচ্চারিত থাকে, এমনকি ‘নলেজ’ শব্দেও, তবু ওই এক ‘কে’ ছাড়া ‘নাইফ’, ‘নলেজ’ শুরু হয় না।
ক্লাস ফাইভে আশ্রমে ভর্তি হই। এবার নিজের স্কুলের পূজা। সকালবেলা স্কুলে পৌঁছে সারাদিন। দেবী, তোমাকে কি ভুলে গেলাম? নইলে কেন আমার এত খিদে পেত? প্রতিবার অঞ্জলি দিতে দেরি হয়। পূজা শেষ, গান হচ্ছে, এরপর অঞ্জলি। ওদিকে পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টেপাল্টে জানান দিচ্ছে। একটু খেতে পারলে ভালো হতো। অথচ মা তোমার মুখ যে বারণ করে—বলে বস, ধৈর্য ধর, সামনে পরীক্ষা আসছে, পাস করতে হবে না? আর কুল? লাল লাল টোপা টোপা, মুখে দিলে টুপ করে বীজ বেরিয়ে আসে আর মুখ ভরে যায় রসে। কই, আমি তো একটাও মুখে দিইনি। এই যে এক মাস ধরে স্কুলের সামনে ঝুড়ি সাজিয়ে বসছে, কই আমি তো একদিনও খাইনি। এবার পূজোর পর সবুজ নারকেল কুল উঠবে—তার কী স্বাদ বলো? স্বাদ তো ওই লাল টোপা কুল, যা হাতছানি দিয়ে ডাকে।
আশ্রমে পাঁচ বছর—ফাইভ থেকে টেন। প্রতিবার সরস্বতী পূজোর সকাল ফিরে এসেছে। স্কুলের মাঠে বেড়া ভাঙা বাখারি দিয়ে একসঙ্গে প্রায় কুড়ি-পঁচিশটা টিম খেলছে। কেউ পাঁচিলের পিলার, কেউ বা সম্পূর্ণ মনে মনে বানিয়ে নিয়েছে উইকেট। দারুণ গতিতে বল আসছে, ছিটকে পড়ছে, সবাই হাসছে, কলকল শব্দে সকাল ভরে যাচ্ছে। পাশের ছাপাখানা বন্ধ রেখে রান্না হচ্ছে খিচুড়ি আর আলুর দম। মৃত্যুঞ্জয়বাবু রান্না ছেড়ে মাঝে মাঝে এসে দাঁড়াচ্ছেন, আমাদের এই খেলা দেখছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন, আবার ফিরে যাচ্ছেন আলুর দমের বিশাল কড়াইতে লম্বা খুন্তির হাতল ধরে নাড়া দিতে। আমাদের প্রশ্নের উত্তরে একটাই উত্তর—হচ্ছে, হচ্ছে।
এইখানে আমাদের প্রতিবছর আলোচনা হতো—সামনের বছর খিচুড়ির বদলে লুচি করা যায় না? আমরা না হয় কিছু বেশি চাঁদা দেব! আলোচনার শেষে আমরা প্রতিবার সকলে এক সিদ্ধান্তে আসি—পরের বার নিশ্চিত খিচুড়ির বদলে লুচি হচ্ছে। কেউ কেউ মন্তব্য করে—বোঁদের বদলে একটা মিষ্টি দিলে হয় না? আলোচনা তীব্র হয়—মিষ্টি কী হবে তাই নিয়ে। আলোচনা চলে, মাইকে ডাক পড়ে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার। আমরা দৌড় দিই। আমাদের আলোচনা শেষ হয় না। পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে খেতে বসি। পাতে পাতে খিচুড়ি আর আলুর দম পড়ে। আমরা বলি—রানিং খিচুড়ি আর স্টোনিং পটেটো। খিচুড়ি পাতে পড়ামাত্র গড়িয়ে যায় পাশের পাতে। আমরা দ্রুত খেতে থাকি, গরম—তাতে মুখ পোড়ে। হু হা করতে করতে আমরা এ-ওর গায়ে হাসিতে গড়িয়ে পড়ি। এত হাসি কোথায় থাকে? কেউ বলে—“বোঁদে নেবেন, বোঁদে, বাটি নিয়ে ধরুন…” আমাদের হাসি রানিং খিচুড়ির মতো গড়িয়ে যায়। লুচি আর কোনোবার হয় না। ‘নাইফ’ শব্দের ‘কে’ অনুচ্চারিতই থাকে।
স্কুলে সরস্বতী পূজা পাল্টে যায় ক্লাস টেনে উঠলে। কারণ দুটো জিনিস ঘটে, যার জন্য এতটা বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছি আমরা সবাই। এক—সরস্বতী পূজোর আগের দিন বাজার করতে যাওয়া, আর দুই—হ্যাঁ, দুই… পূজোর চিঠি গার্লস স্কুলে পৌঁছে দেওয়া। একচোট সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট-এর পর যারা থাকে, তারা পৌঁছে যায় স্কুলে স্কুলে। হাফপ্যান্টের নিচে পায়ে তখন উঁকি দিচ্ছে লোম। আমরা তখন কেবল সামান্য সচেতন হচ্ছি। কেউ কেউ লুকিয়ে ফুলপ্যান্ট পরে আসে, খুলে ফেলে স্কুলে ঢোকার আগে। মিশন স্কুলের মেয়েরা আমাদের স্কুলে আসে—কুইজ কনটেস্ট জমে ওঠে। আঁকনা গার্লসে চিঠি দিয়ে কেন যে এত বুক কাঁপে—এরা কি আসবে পূজোর দিন? পাঞ্জাবি আর ধুতি পরে আসি। সদ্য দাড়ি—কেউ কেউ একটু রেজারও বুলিয়ে নেয়। পূজা হয় পূজোর মতোই—কেউ আসে না, আবার আসে। শাড়ি পরে যে মেয়েটি ঘুরে বেড়ায়, সে বুঝি সামনে থাকে, কিংবা অমুক স্যারের মেয়ে—আরে, তুই জানিস না! গা-টেপাটেপি। দূর থেকে একটু আমার দিকে তাকিয়েছে—এর বেশি আর কিছু না। পাপ দিও না মা, সামনে মাধ্যমিক…
বাজারের আলাদা আনন্দ—জীবনে প্রথম শেওড়াফুলি হাটে যাওয়া। শৈলেনবাবুর সঙ্গে ‘সবচেয়ে ভালো পা-গাড়ি’ এই গানে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফেরা। ভ্যানে বাজার তোলা। আর চুরি করে শাঁখ-আলু, বাদাম-চাকতি খাওয়া। গোটা হাটে একটা সাড়া পড়ে যায়—সবাই আজ কেমন অন্য মন। ডালা থেকে তুলে ছেলেগুলো খাচ্ছে, অথচ কেউ কিছু বলছে না। স্কুল ছাড়ার পরেও এক-দু বছর স্কুলে গেছি অঞ্জলি দিতে।
ক্রমে বুঝলাম, এদিন সবাই হলুদ শাড়ি পরে, আর হলুদ শাড়ি পরলে সবাইকে এক অদ্ভুত সুন্দর লাগে। মাফ করো মা, তোমায় অঞ্জলি দিতে বারবার আমার চোখ চলে যায় ওই চপল বালিকার দিকে। আর কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারে—আমার কী হবে দেবী? বিদ্যা দাও, বুদ্ধি দাও, জ্ঞান দাও… প্রেম দাও। তখনও ভ্যালেন্টাইন ডে আসেনি, আর্চিস দোকান খোলেনি। গ্রিটিংস কার্ড আমরা তখনও হাতে এঁকে বানাতাম। তারই একখানা একদিন কাঁপা কাঁপা হাতে তার হাতে তুলে দিলাম—বিশাল বুক কাঁপানোর মধ্যে। আর উত্তরের অপেক্ষায় সকল রাতদিন। তখনও মোবাইল আসেনি, ফোন বলতে এসটিডি বুথ। চিঠি এলো, কোনও এক সরস্বতী পূজোর দিন। হলুদ শাড়ি—চোখ অন্ধ করা আলো। অঞ্জলি দিতে সেদিন ভুলে গেছি। তখনও জানি না ‘নাইফ’ শব্দের ‘কে’ অনুচ্চারিত থাকে, কিন্তু সে নিঃশব্দেই গেঁথে থাকে বুকের ভিতর।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।