এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আমি তার লাগি পথ চেয়ে আছি

    manibarna mahanti লেখকের গ্রাহক হোন
    ১০ মার্চ ২০২৬ | ৩৬ বার পঠিত
  • খোলা ছাদে মাদুরের ওপর বাবার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদের খেলা দেখতে দেখতে শুনতাম রেলগাড়ি আর তার ছোটো ভাই ট্রামের গল্প। কলকাতা‌ নামের একটি শহরের নামও শুনেছিলাম তখনই।‌ তার আবার একটা ভালো নামও আছে "ক্যালকাটা"। জাদু ঘর, মনুমেন্ট, প্রিন্সেপ ঘাট, তারামন্ডল, বিধানসভা, রাইটার্স বিল্ডিং, হাওড়া ব্রিজ- আরও কত কিছু - জানতাম বাবার ওই ছবি আঁকার মতো করে গল্প বলার কৌশলে। গড়ের মাঠ, ময়দান, ব্রিগেড এই তিনটি মাঠই নাকি ভিক্টোরিয়ার উল্টোদিকে। ময়দান তো এত্তোবড়ো যে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত দেখাই যায় না।
    - "ব্রিগেডের সমাবেশে জ্যোতি বাবুর বক্তৃতা শুনলি?"
    - "শীতকালে কলকাতা যাচ্ছিস গড়ের মাঠ দেখে আসিস কিন্তু।"
    গ্রামে থাকাকালীন এই ধরনের কথা নিত্য কানে আসত। ময়দান, ব্রিগেড আর গড়ের মাঠ যে একই মাঠ এটা জানতে আমার বহুবছর লেগে গেছিল।

    আর একটা গল্প বারবার শুনতাম। বইমেলা।

    আমাদের গ্রামে কোনো বই এর দোকান ছিলো না। তাই গ্রামে আমার সমবয়সীদের মধ্যে খুব কমজনেরই দোকান ভর্তি বই দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। তাদের মধ্যে আমিই একটি 'তালেবর' ছিলাম। আমাদের গ্রাম থেকে পাঁচ কিলোমিটার দুরে এগরা বলে একটি বড়ো সড়ো বাজার আছে। সেখানে আমার মেসোমশাই এর "জানা বুক স্টল" বলে একটি বই এর দোকান ছিলো। বেশ খানিকটা রঙ চড়িয়ে সেই বই এর দোকানের গল্প বাকিদের শুনিয়ে নিজেকে জ্ঞানী প্রমান করার সুযোগ আমি মোটেই হাত ছাড়া করতাম না। ওই 'জানা বুক' স্টলের চেয়ে আর একখানাও বেশি বই যে থাকতে পারে এই ধরিত্রীতে সে সম্বন্ধে আমার কোনও ধারণাই ছিল না।

    বই এর মেলা? এ আবার কেমন জিনিস?

    আমাদের বাড়িতে পঁচেটের সাড়ে তিনশ বছরের পুরোনো রাসমেলা মেদিনীপুরের প্রথম সারির মেলা গুলোর মধ্যে একটি। মেলা নিয়ে জ্ঞানের দৌড় আমার ওই রাসমেলা পর্যন্তই ছিল। বাবা বলল, একটা মেলা আছে যেখানে জিলিপি ফুলুরি ভাজা হয় না, মাদুর বিক্রি হয় না, শাঁখ-বটি-গামছা এসবের দোকান নেই, নেই অমর্ষির তাঁত, না আছে কাঠের নাগরদোলা, না থাকে সার্কাসের তাঁবু, যাত্রা হয় না, কীর্তনীয়ারা খোল বাজিয়ে কীর্তন করে না, কবি গানের আসরও বসে না সেখানে নাকি শুধুই বই এর দোকান। তাই দিয়েই নাকি মেলা। আবার এক আধটা বই এর দোকান নয়। কয়েক'শ বই এর দোকান।
    সারল্যে মাখানো কচি ঘিলুতে যাইই দেওয়া হয় - কল্পনার মাধুরী মিশিয়ে একটা ছবি তৈরি করে নেওয়া বোধহয় সব শিশু মনেরই ধর্ম। আমিও আমার কল্পনায় বই বিছানো নক্সী কাঁথা বুনে নিয়েছিলাম ।

    ছ বছর বয়স - বাবা আর বড়দার হাত ধরে প্রথম কলকাতা‌ এলাম বইমেলা দেখবো। বিধানসভায় নির্বাচিত জন প্রতিনিধি হওয়ার সুবাদে দুই নম্বর কীড স্ট্রীটের এম.এল.এ. হোষ্টেলে একটা ঘর বাবার জন্য বরাদ্দ ছিল। সেখানেই উঠলাম। মনে আছে পৌঁছতে রাত হয়ে গেছিল।‌ ভোর না হতেই এমন চিল‌ চিৎকার জুড়ে দিয়েছিলাম "এক্ষুনি বাড়ি যাবো" বলে যে এম এল এ হোস্টেলের পাশের দুটি অতি পুরনো অশ্বত্থ আর বট গাছে কয়েক পুরুষ যাবৎ বসবাসকারী বাসিন্দারা (কয়েক শ কাক আর চিল) পরের কয়েকদিনের জন্য ঠিকানা বদল করে নেওয়াটা যুক্তি সংগত বলে মনে করেছিল।

    মনে আছে বড়দা আমাকে নিয়ে সোজা চলে গেছিল ভিক্টোরিয়া তে। ছোটো ছোটো সাদা রঙের পাথরের নুড়ি বিছানো রাস্তায় হাঁটতে যেমন মজা পেয়েছিলাম তার থেকেও মজা পেয়েছিলাম গোটা পাঁচেক পাথর সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম বলে।

    ভিক্টোরিয়ার গেটের বাইরে গাছ গাছালি সহ একটি মাঠ খুব মন কেড়েছিল। যদিও সেই মাঠের সাথে আমার পরিচয় বহু পরে হয়েছিল।

    দুপুরে গেলাম বইমেলা। প্রথম বইমেলার অভিজ্ঞতা যা ছিল এখন মনে পড়লে নিজেরই নিজেকে "গন ধোলাই" খাওয়াতে ইচ্ছে করে। ছোটো করে বলি। গিল্ড এবং সাহিত্য জগতে বাবার প্রচুর খাতির ছিল। মেলায় ঢুকে প্রথমে গেলাম গিল্ডের অফিসে। বেশ কয়েক জন উপস্থিত ছিলেন সেখানে। তাঁদের প্রত্যেকের পায়ের ধুলো নেওয়া শেষ হতে একজন ভদ্রমহিলা আমাকে কাছে টেনে নিয়ে তাঁর কোলে বসালেন। অনেক আদর টাদর করে তাঁর ঝোলা থেকে আমার জন্য একটি বই বের করলেন। বইএর প্রথম পাতায় কিছু একটু লিখতে যেতেই আমি সাথে সাথে চেঁচিয়ে উঠলাম "বই এর পাতায় লিখতে নেই। মা সরস্বতী রাগ করেন"। তিনিও কিছু না লিখে বই টি আমার হাতে দিয়ে দিলেন। পরে জেনেছিলাম তিনি লীলা মজুমদার। পরে ওনার অটোগ্রাফ নিয়েছি অন্য কোনও অনুষ্ঠানে যখন তিনি এসেছেন। কিন্তু বইমেলা তে ওনার অটোগ্রাফ আর পাই নি। এ দুঃখ আমার জীবনে যাওয়ার নয়।‌ ভাবুন একবার লীলা মজুমদারের কোলে বসে তাঁর অটোগ্রাফ না করে দিলাম ! শাস্তি হিসেবে তো সাতদিনের ফাঁসি হওয়া উচিৎ আমার!

    একদিকে কৈশোরের বাঁধন কালের নিয়মে আলগা হচ্ছে অন্যদিকে 'তরুণী বেলার' হাতছানি। ঠিক এই সময়টা কিছু পারিবারিক কারনে, প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও কলকাতায় পাকাপাকি ভাবে চলে আসতে হল আমাকে। এম এল এ হোস্টেল হয়ে গেল আমাদের ঠিকানা।‌

    কলকাতায় এসে আমার দম বন্ধ হয়ে আসত। অবাক হয়ে দেখতাম এ শহরের ব্যস্ততাকে। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করতাম এই রকম একটা ইট কাঠের জঙ্গলে থাকবো কি করে আমি?

    কোথায় পাবো আমার সেই বকুল তলা? যেখানে খই এর মতো ছড়ানো বকুল ফুলের সুগন্ধে মৌমাছির সাথে সাথে মাতাল হতাম গ্রামের প্রতিটি অবাল বৃদ্ধ বনিতা?

    শরৎ এর আগমনে কি শুধুই এক জোড়া অপু দূর্গাই কাশবনে ছুটেছে? গ্রাম বাংলার এমন লক্ষ লক্ষ অপু দূর্গার দল শরতের কাশ ফুলের হাওয়ায় ঢাকের কাঠির তালের সাথে কুমোর কাকার হাতের কেরামতি তে প্রতিদিন মাটির তালকে মা দূর্গার রূপে বদলে যেতে দেখেছে।

    এ শহর তো জানেই না - ঘাটের পাশের আম গাছের ছায়ায় বসে পুকুরের জলের ওপর বাতাসের এঁকে যাওয়া আলপনা দেখতে দেখতে কত গ্রীষ্মের দুপুর সাক্ষী থেকেছে গোধূলি সন্ধির আশ্চর্য গীতি নাট্যের। ভোরবেলার গোবর জলে নিকোনো উঠোনের সুগন্ধিতে পবিত্র হয়েছে এ শহর? ওই যে দুরে, আল ধরে হেঁটে যেতে যেতে কচি ধানের মাতাল করা গন্ধ - পাগল হয়েছে? ভরা বর্ষায় ধান জমিতে মাছের সন্ধানে কাদায় মাখামাখি হয়ে উদাত্ত গলায় গেয়েছে "আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে"? বা হাড় কাঁপানো শীতের ভোরে - ততধিক কনকনে ঠাণ্ডা খেজুর রসের স্বাদে কেঁপে কেঁপে উঠেছে কোনোদিন? অবাক হয়েছে এ শহর - যখন হাওয়াতে নারকেল গাছের তরঙ্গ ধ্বনি সিম্ফনির সুর কেও হার মানিয়েছে?

    যেখানেই চোখ যায় সেখানেই মানুষের ভীড়, অথচ কেউ কাউকে চেনে না। আমাদের গ্রামে তো একে অন্যের নাম, গোত্র, ঠিকুজি প্রত্যেকের নখের আয়নায় থাকে। সবকিছুই যেন একটু বেশিই সাজানো। পেশাদারিত্বে মোড়া। এই শহরে কোথাও কোন প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পেতাম না আমি ।

    ঠিক তখনই তুমি এসে হাত ধরলে। এগারো বছরের বন্দী দশায় তুমি আমকে আগলে রাখলে জীবনের প্রতিটা আঘাত থেকে। বেঁচে থাকার অক্সিজেন যোগালে, লড়াইয়ে অনুপ্রেরণা, গেঁয়োর‌ তকমা লাগিয়ে দেওয়া শহুরে উপহাসের বিরুদ্ধে টিকে থাকার জেদ তৈরি করে দিলে। আর দিলে এই "ভূতের দলটি" কে। দশজনের এই দল টি তে আমরা প্রত্যেকেই ছিলাম রাজ্যের বিভিন্ন গ্রাম থেকে উপড়ে আনা সেই চারা গাছ গুলো যাদের শরীরের ভাষায় যেমন ছিল মাটির গন্ধ, মনে ছিল শেকড় ছেঁড়ার যন্ত্রণা।‌ আর একটু সরলীকরণ করলে যাদের 'গেঁয়ো ভূত' বলে।

    আজ তোমাকে খুব মনে পড়ছে জানো? না তুমি আমার প্রেমিক নও। কোনো বিশেষ পুরুষও নও। কোনও হারিয়ে যাওয়া বন্ধুও নও। তুমি আমার "কলকাতা ময়দান"।

    এম এল এ হোস্টেল থেকে পায়ে হেঁটে মাত্র ছ মিনিটে পৌঁছে যেতাম তোমার কাছে।

    মন ভার করা ভোরবেলাই হোক, দম বন্ধ করা দুপুর বা কান্না মাখা বিকেল সবকিছুতেই তুমি। তোমার কাছে শুধু পৌঁছে যেতে হত। ব্যস তুমি তোমার ম্যাজিক দেখিয়ে দিতে নিমেষে, সব মন খারাপ উধাও করে দিয়ে।

    ভিক্টোরিয়া থেকে পার্ক স্ট্রিটের মুখ পর্যন্ত এমন কোনও হকার ছিল না, এমন কোনও হঠলদারী পুলিশ ছিল না‌ যারা আমাদের চিনত না। "ভুতের দল" নামটা এক পুলিশ অফিসারেরই দেওয়া। কয়েকদিন দেখতে না পেলে হকারদের কাছে জানতে চাইতেন "ভুত গুলো কোথায় রে"?

    তোমারই হাত ধরে ক্লাব গুলোর সাথে পরিচয়। মেয়ো রোডের শুরু থেকে ইডৈন পেরিয়ে এই যে বিশাল অঞ্চল জুড়ে মোহন বাগান, টালিগঞ্জ অগ্রগামী, জর্জ টেলিগ্রাফ, ইষ্টবেঙ্গল, সি এফ সি, কালিঘাট এই সব ক্লাবগুলো ছড়িয়ে ছিল। সকালের প্র্যাকটিস হোক বা লীগ ম্যাচ - পৌঁছে যেতাম এই দশ ভূতের দলটি প্রায় প্রতিদিন। ম্যাচগুলোর জন্য টিকিট বা পাশ অনেক সময় কম পড়ত। তখন ফার্স্ট হাফ সেকেন্ড হাফ ভাগাভাগি করে দেখতাম।

    অনেকেই জানতে চাইতো - আজও জানতে চায় এমন একটা জায়গায় থেকে ভিক্টোরিয়ায় গিয়ে প্রেম করিস নি? নন্দন - রবীন্দ্র সদন - অ্যাকাডেমি তে প্রেম করতে যাস নি? এই অর্বাচীনদের কোন ভাষায় বলি বলো তোমার নেশা কি যে নেশা বুঝবে কি আর আনজনে? আমার এই বিগড়ানো থোবড়া তে যে প্রেম আসবে না জানা কথাই ছিল। কিন্তু বাকিরা যারা প্রেমে পড়ত তাদের দেখতাম মাস না ঘুরতেই ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি বলে ঝাঁকের কই ঝাঁকে ফিরত।

    নিজেরা প্রেম করি নি ঠিকই। ওখানে প্রেম করতে আসা বহু যুগল বন্দীকে দেদার বৈষ্ণব পদাবলী থেকে প্রেমের গূঢ় তত্ত্ব বুঝিয়েছি। তবে এই কাজটা যার তার সাথে করা যেতো না।

    প্রথমে যুগলদের চোখে মুখে ভয়টাকে মেপে নিতে হত। দ্বিতীয় ধাপ ছিল বাদাম ওয়ালা দাদা গিয়ে হাল্কা করে পুলিশের থেকে সাবধান করে আসত (ভয় দেখিয়ে আসত)। পুলিশের ভয়ে যেই উঠে পালাতে যাবে অমনি আমরা ত্রাতার ভূমিকায় হাজির হয়ে বক্তৃতা শুরু করতাম। বেশিরভাগই পালাত। একটা আধটা জালে আটকাও পড়ত। আর যেদিন আটকা পড়ত সেদিন আমরা বাংলা সাহিত্যের এক একটি "ভজহরি মান্না" হয়ে উঠতাম। শরৎচন্দ্রের "পরিণীতা"র ফোড়নে বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা কৃষ্ণের বিরহকে কড়ায় তুলে পথের দাবীর বিদ্রোহী মশলায় মাখো মাখো করে কষিয়ে নষ্টনীড়ের গরম মশলার ভুরভুরে গন্ধে যা একখান তেল কষকষে প্রেমের উপাখ্যান নামাতাম না! সেই অনন্য প্রতিভার কথা আজও মনে পড়লে লোকচক্ষুর আড়ালে নিজেদের পিঠটা নিজেরাই চাপড়ে নিই।

    মিতা ছিল আর্ট কলেজের ছাত্রী। স্কেচের জন্য সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হত হামেশাই। হকারদের কোনো বাচ্চাকে মডেল বানিয়ে বসিয়ে দিত সেখানে। যেই না ও মাথা নিচু করে আঁকাতে মন দিতো আমরা চোখের ইশারায় বাচ্চা টাকে সরে যেতে বলতাম। চোখ তুলে যেই দেখত মডেল উধাও আর বাকি ন জন মিতার চোখেমুখের ভাব ভঙ্গি দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছি। তখন মিতা তার সবচেয়ে গাঢ় জল বা তেল রঙের বোতলটা থেকে মোটা তুলি রঙে ভিজিয়ে নিয়ে প্রত্যেকের মুখ জামা কাপড়ে রঙ লাগাতো দেদার। সঙ্গে একটা ডায়লগ থাকত "বাবার পয়সায় কেনা রঙ আয় তোদেরকে ভুত বানাই।"

    এমন কত কত যে দুষ্টুমির সাক্ষী আছো তুমি! কখনও মেঘটাও ভেসে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ত নিচে আমাদের নাটক দেখে। কখনও আবার মেঘ হয়ে থাকতে না পেরে জল হয়ে ঝরে পড়তো আকাশ থেকে হাততালির মতো শব্দ করে। চোখেমুখে সুশীতল বারিবিন্দুপাতের সুখস্পর্শে সচকিত এবং পুলকিত আমাদের মুখমণ্ডলে যে আনন্দজনিত আভা বিচ্ছুরিত হত। তার নেশায় উদ্বেল হয়ে উঠতো আষাঢ়ের আনন্দধারা।

    জানুয়ারির শুরু থেকেই তোমার সারা শরীর জুড়ে থাকতো একটি চাপা উত্তেজনার ছাপ। একটু একটু করে সেজে উঠতে তোমার প্রেয়সীর জন্যে। বইমেলার জন্য। আমাদের চিন্তা-চেতনা জুড়ে বইমেলার তখন একছত্র আধিপত্য। দুপুর হলেই ঢুকে পড়তাম বইমেলায়। থাকতাম একদম বন্ধ হওয়া পর্যন্ত। চারিদিকে ধুলো উড়ছে, মাইকের আওয়াজ একেবারেই মন্দ লাগত না। হাল্কা শীতের ছোঁয়ায় চারিদিকে নতুন বই এর সুবাসে কি এক অদ্ভুত শিহরন আর অদ্ভুত রোমাঞ্চ অনুভব করতাম। ভালোলাগার স্পর্শে হৃদয় থাকত কানায় কানায় ভরা।

    এই বইমেলাতেই প্রথম দেখি আমার প্রিয় সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ কে। খুব সম্ভবত দে'জ এর স্টলে ছিলেন। সই দিচ্ছিলেন সবাইকে। টপ করে একটা বই কিনে নিয়ে সোজা চলে গেলাম তাঁর কাছে। প্রণাম করে সই নিলাম। তার আগে বুদ্ধদেব গুহর কত বই পড়েছি। কত কথা যে জমা ছিল। এত কাছে থেকেও এবং সুযোগ থেকেও কিছুই বলতে পারিনি। একটুখানি পায়ের ধুলো আর একটি সই এর সাথে একরাশ মুগ্ধতাকে বুকে চেপে ফিরে এসেছিলাম। আর একজন ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যের নক্ষত্র হিসেবে তাঁর সৃষ্টির সাফল্য যদি আকাশচুম্বী হয় তবে ব্যক্তি হিসেবে মাটির এত কাছাকাছি মানুষ আমি আমার জীবনে খুব কম দেখেছি। তাঁকে যেখানে দেখতাম পা ছুঁয়ে প্রণাম করতাম। নিজেদের মুগ্ধতা মেলে ধরতাম। এত খুশি হতেন। চোখে মুখে শিশুর সারল্য মাখা হাজার ওয়াটের লাইট জ্বলত।

    ওই তো জয় গোস্বামী! দুর থেকে উনি সুচিত্রা ভট্টাচার্যই তো! পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী না! এভাবেই প্রতি বছর একটু একটু করে মুগ্ধতা পূর্ণ করত তৃপ্তির ঘড়া।

    সেই সর্বনেশে বছর? যখন তোমার সাথে আপামর বাঙালিও কেঁদেছিল বই পোড়ার শোকে। আজও মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। রোজকার মতো সেদিনও মেলায় গেছি। গ্রাম থেকে দিদি এসেছিল তাকে নিয়ে আমি, মিতা, আর ত্রিদিব। হঠাৎ ঘোষণা হল মেলাতে আগুন লেগেছে। জানিনা কোন যাদু বলে আমরা তিনজনেই খুব শান্ত হয়ে গেলাম। কোনও ভয় নেই, কোনও আতঙ্ক নেই আগুন কোথা দিয়ে আসছে দেখে নিয়ে বই বাঁচাতে হবে। ত্রিদিব দিদিকে মেলা থেকে বের করে দিতে গেটের দিকে গেল। আমি আর মিতা দৌড়োলাম ছোটো স্টল গুলোর দিকে। কারন তাদের লোকবল খুব কম। এম এল এ হোস্টেলেকে বা কারা খবর দিয়েছে সেখান থেকে ততক্ষনে চলে এসেছে বড়ো বড়ো ত্রিপল। পুলিশের আর দমকলের দেখিয়ে দেওয়া জায়গাতে অপেক্ষা করছে কয়েকজন ত্রিপল‌ নিয়ে। বাঁচিয়ে আনা বইগুলো যাতে মটি তে পড়ে নষ্ট না হয়ে যায় তাই এ ব্যাবস্থা। বাকি বন্ধুরাও ততক্ষণে হাজির হয়ে গেছে। আগুনের সাথে পাল্লা দিয়ে দোকানের কর্মচারী সহ আমরা সব ভলিন্টিয়াররা যে যার মতো করে ব্যাগ ভর্তি বই কেউ মাথায় কেউ কাঁধে নিয়ে দৌড়োচ্ছি আগুনের লেলিহান শিখার নাগালের বাইরে। কেউ দুটো কেউ তিনটে কিস্তি তে বই বের করে আনতে পেরেছিলাম শুধু। আগুনের সাথে পাল্লা দেবো আমরা‌? এতো সাধ্য কোথায় আমাদের? চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। আমাদের মধ্যে স্বরূপ সবচেয়ে বেশি বিপদ মাথায় করে বই বাঁচিয়েছিল।‌

    স্বজন হারানো যন্ত্রণায় সেদিন বোবা হয়ে গেছিলাম। বিশ্বভারতী অথবা মিত্র এদের মধ্যে কোনও একটি পাবলিশার্সের এক কর্মকর্তা সবার সামনেই স্বরূপকে বেশ কড়া ধমকের সুরে বলেছিলেন "কাজটা তুমি মোটেই ঠিক করো নি। যদি কিছু একটা হয়ে যেতো?" স্বরূপ কাঁদতে কাঁদতে চেঁচিয়ে উঠে উত্তর দিয়েছিলো "চোখের সামনে প্রিয়জনকে পুড়তে দেখবো"? ভদ্রলোক স্বরূপকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন।আশেপাশের প্রকাশক, গিল্ড কর্মকর্তা, কর্মচারীদের যে ভীড়টা এতক্ষন কান্না চেপে রেখেছিল সকলে তখন কাঁদছেন।

    পরের দিন খবর‌ এলো মেলায় কাজ শুরু হয়েছে। দৌড়োলাম হুড়মুড়িয়ে। ভয়াবহ ধ্বংসাবশেষের মধ্যে থেকে স্বেত-শুভ্র কোনও দেবদূতকে উঠে আসতে দেখেছেন কোনও দিন আপনারা? আমি দেখেছি। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কে। তাঁর নেতৃত্বে কান্তি গাঙ্গুলীর তত্বাবধানে কিভাবে সেই ধ্বংসস্তুপে প্রান প্রতিষ্ঠা হল,‌ নিজের চোখে দেখেছি। মেলা প্রাঙ্গণ তখন পোড়া বইয়ের গন্ধে ভরা।এই গন্ধ চাপা দেওয়ার জন্য বুদ্ধদেব বাবু গিল্ডকে বললেন সুগন্ধি ফুলের টব দিয়ে ভরিয়ে দিন মেলা প্রাঙ্গণ।বহু জায়গা থেকে ফুল এসেছিল।পোড়া গন্ধকে হারিয়ে রজনীগন্ধা আর গোলাপের গন্ধের আতর মেখে বইমেলা সেজে উঠলো আবার নতুন করে।

    কত সময় গড়িয়ে গেল। সেই বইমেলাই তোমার থেকে দুরে সরে গেল। কখনও স্টেডিয়াম, কখনও মিলন মেলা, কখনও করুনাময়ী। দু একবার গেছিলাম। কিন্তু সেই আবেগটা কোথাও কিছুতেই খুঁজে পাই নি।। বইমেলা কেমন যেন কর্পোরেট হয়ে গেছে। কেমন অচেনা একটা জায়গা। অথচ এমনটা তো চাই নি।

    ময়দানে বইমেলা হলে নাকি দূষন হয়! যেন আর কোনো কারণে দূষন হয় না? দূষনের এক লক্ষ একশ একষট্টিটা কারন চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। আহাম্মক গুলোকেকে বোঝায় বই এর দূষন মানুষের চিন্তা এবং চেতনার জন্য ক্ষতিকারক তো নয়ই বরং মানব সভ্যতার জন্য অনেক বেশি উপকারী এবং রোমাঞ্চকর।

    বইমেলা আছে অথচ তার সাথে তুমি জুড়ে নেই এতবছর পরেও কেন জানিনা মেনে নিতে পারি না কিছুতেই। হয়ত আমার মত বহু বাঙালিও এমন টাই চান। কিন্তু সেই দাবিকে কোথায় পৌঁছে দেবে কেউ জানে না।

    বইমেলা বাংলার সেরা মেলা ছিল - আছে - থাকবে। কিন্তু তার সাথে তুমিও থেকো!

    তুমিও কি ভালো থাকতে পারো বইমেলা ছাড়া!

    ফিরে এসো, প্রিয় ময়দান। আর একবার বেঁচে উঠি তোমার বুকে আশ্রয় নিয়ে। ফিরে এসো তুমি!!!!
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন