এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা  শনিবারবেলা

  • মধুবাতা ঋতায়তে

    শারদা মণ্ডল
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ১৪ মার্চ ২০২৬ | ১১৫ বার পঠিত
  • ছবি - Imagen 3


    মিদুবান্দাকে পিছনে রেখে সেই বেহাল পথে নেচে নেচে বাস চললো পরের গন্তব্যে। কিছুটা পরে পাকা রাস্তা। চার পাঁচ কিলোমিটার যাওয়ার পরে, আবার বাঁদিকে লাল ধুলোয় ঢাকা পথ, তবে আগের বারের থেকে ঢাল কম, অনেকটা সোজা। একটু পরেই পাহাড়ের কোল ঘেঁষে হাঁটা শুরু হল। এখানে পাহাড়ের গা রুক্ষ, গাছপালা কম, আর বিশাল বিশাল বোল্ডার। আচ্ছা সামনে নদী আছে তাহলে। বোলপুরের কাছে মামা ভাগ্নে পাহাড়ের মতো বড় বড় পাথর রয়েছে ছড়িয়ে। ওমা সৌরভ কই? আমরা যাচ্ছি নিচে দিয়ে, ও যাচ্ছে ওপর দিয়ে! কখন ঢাল বেয়ে পাহাড়ে উঠে পড়েছে। বেশ খানিকটা হেঁটে দেখি সামনে এক বিরাট খোলা জায়গা। না কোনো মাটি নেই। তাই গাছও নেই। বিরাট এক প্রাকৃতিক মুক্ত পাথুরে চাতাল। মাঝে মাঝে হাতির মতো বড় বড় বোল্ডার। একটা জিনিস নজর কাড়ল, পাথরের রং এখানে লাল নয় সাদা। তাই, বিকেলের আলোতেও চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। চাতালের ধার দিয়ে বইছে চঞ্চলা নদী, নাম ডুলুরি। জায়গাটা হল দারিংবাড়ির লাভার্স পয়েন্ট পিকনিক স্পট। পাথরে ঘিরে নদীর জল কোথাও কোথাও জলাশয় হয়ে আছে। ওপর থেকে দেখে মনে হচ্ছে স্নান করা যাবে, মিদুবান্দার মতো অপরিচ্ছন্ন নয়। কিন্তু লাভার্স পয়েন্ট নাম কেন? একটা গাছ নেই, ছায়া নেই, নিভৃতি নেই। মুক্ত প্রাঙ্গণ। গ্রীষ্মের দুপুরে, খোলা তপ্ত পাথরের উপর যুগলের কল্পনা, তায় আবার ধুলো মেখে এতটা ট্রেক করে, এতো কষ্ট! লাভারদের দুঃখে চোখে জল চলে এল আমার, আর ভিতর থেকে অট্টহাসি। এখানে বোধহয় নেচার লাভারদের কথা বলা হয়েছে। বোল্ডারের তলায় তলায় তিরতিরে জলের ধারা যাচ্ছে। তাই পাথরগুলো খুব পিছল। একটু অসতর্ক হলেই পপাত চ মমার চ হয়ে যাবে। আচ্ছা যুগল যদি আনমনা হয়, তখন কী হবে? লাভার্স পয়েন্টে অস্থিভঙ্গ? এ-ই-ই যাঃ সৌরভ পড়ে গেল। না না ও আনমনা হয়নি। পাহাড় চড়ে অতি উৎসাহী হয়ে পড়েছিল। আমি আর অগ্নিশা একটা বড় বোল্ডারে পা ঝুলিয়ে বসে ছিলাম। ওখানে উঠতে গেলে পিছন দিয়ে ঘুরে আসতে হবে। ও অত না ঘুরে সামনে দিয়ে এক লাফ মেরে উঠতে গিয়েছিল। নিচের জলে পা স্লিপ করে গেল। ভগবান বাঁচিয়েছেন, বেশি কিছু হয়নি। এবার ফেরার পালা। কিন্তু সৌরভ ওপরে গুহা দেখে এসেছে। ছেলেমেয়েদের দেখাতে নিয়ে যেতে চায়। ওরা স‍্যার পড়ে গেছেন দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল, হাসিও গোপন করছিল। এখন স‍্যারের ডাকে ওনার পিছনে দৌড় লাগালো। আমি বসে রইলাম অন্য একটা বোল্ডারের ওপরে। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে লেডি ব্রেবোর্ন থেকে ফিল্ডে গিয়ে আমরা বন্ধুরা মিলে পাঁচমারীর চৌরাগড় পাহাড়ের মাথায় উঠে গিয়েছিলাম। আমাদের ম্যামেরা উঠতে পারেননি। কে না জানে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়।

    একা বসে বসে নদীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে মনের মধ্যে ভাবনার স্রোত চলে। এই জায়গাটা দেখে আর একটা স্মৃতি মনে আসে। অমরকন্টকের মাঈ কি মণ্ডপ। একই রকম ভূদৃশ‍্য। ছেলেমেয়েরা গুহা দেখতে পাহাড়ে চড়ছে, ফিরতে একটু তো সময় লাগবে। এই ফাঁকে গল্পটা বলি। একই রকম পাথুরে চাতাল, পাথরে ঘেরা জলাশয়, মধ্যপ্রদেশের মৈকাল (মহাকাল) পর্বতের কন্দরে গুহা আর দুরন্ত নদী। চাতালের ওপরে পটহোলের মতো গর্ত। কোমল শিলাগুলো ক্ষয়ে গিয়ে বোধ করি অমন গর্ত হয়েছে। অবাক কান্ড গর্তগুলো মাথার দিকে চওড়া আর তলার দিকে সরু। হাতা, খুন্তির মতো দেখতে। দারিংবাড়ির এই লাভার্স পয়েন্টেও চাতালে গর্ত আছে। আমি খুঁজে দেখেছি। আকৃতিতে গোল। যা হোক অমরকন্টকের কথায় আসি। বিন্ধ্য, সাতপুরা আর মহাকাল - তিনটি পর্বত শ্রেণী যেখানে মিশেছে সেই অমরকন্টক হল নর্মদা, কুমারী (জুহিলাও বলে কেউ) আর শোনভদ্র এই তিনটি নদীর উৎস ভূমি। শোন তো উত্তর ভারতের সমভূমির দিকে গড়িয়ে গিয়ে গঙ্গায় মিশেছে। কুমারী গিয়ে মিশেছে শোনভদ্রে। আর নর্মদা একই স্থানে জন্ম নিলেও চ‍্যুতিরেখা ধরে নাকবরাবর চলে গেছে ভূমি ঢালের উল্টো দিকে আরব সাগরে। কোনো উপনদীর সঙ্গম ছাড়া একাকী। এই অসামান্য ঘটনার ভূপ্রাকৃতিক ব‍্যাখ‍্যা যাই হোক, এক জমজমাট পৌরাণিক থ্রিলার শুনেছিলাম মাঈ কি মণ্ডপ ঘিরে, যে মাঈ কি মণ্ডপ আর লাভার্স পয়েন্ট একই রকম। পৌরাণিক কাহিনী বলে - শিব ঠাকুর একবার বহু বছর ধরে এই অমরকন্টকের পর্বত শৃঙ্গে এক কঠিন তপস্যা করছিলেন। প্রখর সূর্যালোকে টানা তপস্যা করতে করতে ভগবান শিবের গা ঘামে ভেসে যাচ্ছিল। আর সেই ঘামই জড়ো হয়ে সৃষ্টি হলেন অপরূপা দেবী নর্মদা। জন্মানোর পরে জন্মদাতা পিতার কলুষ মুক্তির প্রতীক এক স্বচ্ছতোয়া স্রোতস্বিনী হয়ে তিনি বয়ে গেলেন ধরাতলে - যাতে তাঁর দর্শনেই যুগযুগান্ত ধরে পাপী তাপীরা পাপমুক্ত হয়। তাই সোজা কথায় নর্মদা হলেন শিবের পুত্রী এবং গঙ্গা নদীর সৎ কন্যা। তবে মা মেয়েতে বনিবনা একেবারেই নেই। মেয়ে মায়ের মুখ দেখেননা। তাই মাকেই সময় করে দেখা করতে আসতে হয় মেয়ের মন ভেজাতে, মেয়ের দেমাকই আলাদা। কুমারী হলেন তাঁর সখী। এহেন নর্মদা অল্প বয়সে প্রেমে পড়লেন শোনভদ্রের। এখানে ভৌগোলিক চিত্রটা স্পষ্ট করা দরকার। পর্বতের একটি বিশেষ জলবিভাজিকা বিন্দুতে রয়েছে তিনটি প্রাকৃতিক কুন্ড যেখান থেকে তিনটি ভৌমজলের ঝর্না মাটির ওপরে বেরিয়ে আসছে। স্থানটির নাম হল মাঈ কি বাগিয়া। তিনটি ধারার মধ্যে জলের পরিমাণ অনুযায়ী দুটি অপেক্ষাকৃত বেশি শক্তিশালী - শোন আর নর্মদা। কিন্তু জলবিভাজিকা বিন্দুতে উৎপন্ন হবার ফলে এই দুটি ধারা এগিয়েছে পরস্পরের বিপরীত মুখে। শোন একটুখানি এগিয়েই বিশাল জলপ্রপাত তৈরি করে নিচের গাঙ্গেয় সমভূমিতে ঝাঁপ দিয়েছে। এদিকে নর্মদা একটু আলাদা প্রকৃতির। আমাদের জনক দুহিতা সীতার মতোই সে পৃথিবীর কন্যা, কারণ তার উৎপত্তিও ভূগর্ভস্থ জল থেকে।‌ তবে আশেপাশের পাহাড়ের বেশ কিছু ক্যাচমেন্ট বেসিনের বৃষ্টির জলও সে নির্দ্বিধায় গ্রহন করে। ওগুলো হল নর্মদার হেড ওয়াটার। স্থানীয় সুন্দর সুন্দর নাম আছে ঐ ধারাগুলোর, কোনটার নাম সাবিত্রী, আবার কোনটা গায়ত্রী। যাই হোক নর্মদা যখন বালিকা তখন সে, আর দুটি বালক বালিকা মানে শোন আর কুমারীর সঙ্গে ঐ মাঈ কি বাগিয়াতে খেলা করত। তিন বন্ধুর মধ্যে কত না ভাব আর কতই না গলাগলি। একটু বড় হতে খেলার সাথীকে মনে ধরল। ভরা যৌবনে শোনভদ্রের পৌরুষ নর্মদার মনে অনুরাগের রঙ ধরালো। একথা জানতে পেরে বাবা হিসেবে শিব ঠাকুর তখন শোনভদ্রের সঙ্গে কন্যার বিবাহ স্থির করলেন। আর কী? নীল আকাশ, সবুজ বনানী, পশু পাখি, দেব দেবী, পর্বত কন্দর, কিন্নর গন্ধর্ব সবাই সেই আসন্ন বিবাহের আয়োজনে মেতে উঠল। বিবাহের দিন এগিয়ে এল। মহা ভোজন প্রস্তুত করার জন্য চারিদিক থেকে বড় বড় কড়া, হাতা খুন্তি এনে রাখা হতে লাগল। সূপকারের দল পর্বত প্রমাণ আটা মাখতে শুরু করল। চারিদিকে তুরী ভেরী কাড়া নাকাড়া বেজে উঠল। দেবী নর্মদা, স্রোতস্বিনী নর্মদা আজ নববধূর সাজে অপরূপা হয়ে উঠলেন। এদিকে কেউ জানেনা, কুমারী নদীও মনে মনে শোনকে ভালোবাসে, শুধু কাউকে বলতে পারেনা। নর্মদা আর শোনের বিবাহের আয়োজন সম্পূর্ণ। স্বর্গের দেবতারা নিমন্ত্রিত, মহাভারতের পান্ডবেরা নিমন্ত্রিত। নর্মদা অপেক্ষা করছেন বধূ বেশে। নিবিড় রাত্রি আরও গভীর হয়। চাঁদের আলো ঝিমিয়ে আসে। কিন্তু এ কী কান্ড! বর যে আর আসেনা। অপেক্ষায় ক্লান্ত, বিষন্ন নর্মদা নিজেই সেই ঘোর রাতে সন্ধান করে বেড়ান শোনভদ্র কোথায়? বেশ খানিক দূরে গিয়ে দেখেন কুমারী গিয়ে মিশেছে শোনের বুকে। দুজনে মিলে চলেছে গঙ্গার উদ্দেশে। নর্মদার মতো সাজ পোশাক নকল করে উতলা কুমারী নদী মরিয়া হয়ে চুপিচুপি দাঁড়িয়েছিল, বরবেশে শোন যেদিক দিয়ে আসবে সেই পথে। অন্ধকারে না বুঝে শোনভদ্র গ্রহণ করেছে তারই দেয়া বরমালা। তারপর বরবধূ যুগলে বয়ে গেছে গঙ্গার আশীর্বাদ নিতে। প্রতারিত নর্মদার বিষাদ ক্রোধে পরিণত হয়, ঘৃণাভরে শোনভদ্রের বিপরীত দিশায় সে পশ্চিম মুখে ধাবিত হয় আরব সাগরের দিকে। আর কাউকে এ জীবনে গ্রহণ সে করেনি, তাই কোন বিশেষ উপনদী তার নেই, আজও সে একাকিনী। গঙ্গা শিবের স্ত্রী, সম্পর্কে নর্মদা নদীর সৎমা। তবু কেন আশ্রয় দিল প্রতারক শোন আর কুমারীর মিলিত ধারাকে? উত্তর তো মায়ের কাছে নেই। তাই আজও অভিমানী মেয়ের মন ভেজাতে শ্রাবণ মাসে লিঙ্গরূপী শিবের গা জড়িয়ে, ভূঅভ‍্যন্তরের ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসেন তিনি, দেখা করে যান মেয়ের সাথে। বিয়ে তো হলনা। মাঈ কি মণ্ডপ পড়ে রইল তার আয়োজন নিয়ে। কোনো বোল্ডারের গায়ে রং দিয়ে লেখা ভীম কা আটা। ভীম খাবে বলে মাখা হয়েছিল। একসারি বোল্ডারের গায়ে লেখা নাগাড়া অর্থাৎ বিয়ের বাদ‍্য। বিশাল বিশাল গোলাকার জলাশয়গুলিকে দেখানো হয় ডালের আর সব্জির কড়া হিসেবে। লম্বাটে লেজওয়ালা গোল মাথার পটহোলগুলিকে বলা হয় হাতা, চামচ, খুন্তি। নিজের মনেই হা হা করে হাসি। দারিংবাড়িতে এই সবধরণের প্রাকৃতিক ঘটনা গুলোই আছে। কিন্তু নেই ব্লকবাস্টার কাহিনীর মিশেল। মাঈ কি মণ্ডপ প্রেম পেরিয়ে বিরহে উত্তীর্ণ হয়। লাভার্স পয়েন্ট নামেই প্রেমের কথা বলে, জানিনা উত্তীর্ণ হবে কিনা। ছেলেমেয়েরা এক এক করে ফিরছে। এবারে আমিও দৌড় লাগাই। সূর্য ঢলছে পশ্চিমে। বিদ্যুৎ বাবুকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছি, ছুঁয়ে দেখার জন্য আরও পাঁচটা পয়েন্ট এখনও বাকি। লাভার্স পয়েন্ট থেকে দু কিলোমিটারের মধ্যেই এমু ব্রিডিং ফার্ম, লাগোয়া নেচার ক‍্যাম্প। সুন্দর সাজানো পার্ক আর থাকার কুটির আছে। এখানে ঢুকতে গিয়ে আবার সালমা পড়ে গেল ঠোক্কর খেয়ে। আমি দেখেছি ফিল্ডের শেষে যখন ফূর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ হয়, তখনই সব দুর্ঘটনা ঘটে। তাই নিজে খুব সতর্ক থাকার চেষ্টা করি। বাস চলছে, এবার কফি আর গোলমরিচের বাগান। পাইন গাছের সারির ফাঁকে কফি গাছের সারি। আর পাইন গাছের গা জড়িয়ে আকাশে উঠেছে গোল মরিচের লতা। সূর্য আরও ঢলে পড়েছে। এখানে থামলে বাকি তিনটে পয়েন্ট আর ঘোরা হবেনা। সূর্য ডুবে যাবে। তাই বাগানের সামনে দিয়ে বাস চলল খুব ধীরে ধীরে। বাইরে থেকে দেখেই সন্তুষ্ট হতে হল। এবারে দৌড়ে দৌড়ে নেচার পার্ক। নয়নাভিরাম ফুলের মেলা। ভিতরে বাটারফ্লাই পার্ক মানে ব্রিডিং গ্রাউন্ড। কপাল খারাপ এখন একটাও প্রজাপতি নেই। কারণ তাদের জন্ম নেবার নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেছে। পার্ক ছেড়ে তারা উড়ে গেছে যেযার সংসারে। তবে এখানে দেখতে না পেলেও ক্ষতি নেই কিছু। ডুয়ার্সে যা প্রজাপতি দেখেছি তা প্রাণমন আজও আমার ভরিয়ে রেখেছে। এতদিন পরেও চোখ বুজলেই দেখতে পাই।

    বাংলায় প্রজাপতি জন্মানো দেখার অপূর্ব জায়গা হল জয়ন্তী নদীর পাড়ের নিচু পাহাড় আর জঙ্গল। তবে খুব সময় বুঝে যেতে হবে। আমার ভাগ্যে একবারই শিকে ছিঁড়েছিল। ডিসেম্বরের প্রথম হপ্তায় জয়ন্তী রিভার বেডের ওপর দিয়ে বন বিভাগের জিপে চড়ে আমরা ছাত্রছাত্রী নিয়ে রওনা দিয়েছিলাম ছোটা মহাকালের পথে। ছোটা, বড়া দুটোতেই ওপরে উঠতে পারলে দেখা যায় চুনাপাথরের গুহা। চুঁইয়ে পড়া জলের ধারা, জলপ্রপাত আর প্রাকৃতিক শিবলিঙ্গ। তবে বড়া মহাকালের পথ তখন ছিল বন্ধ, সে পথটা আবার জানুয়ারি থেকে নতুন করে তৈরি শুরু করেন সেনাবাহিনীর জওয়ানরা। বর্ষা এলে ভূটান পাহাড় ভেঙে আবার নুড়ি পাথর, বোল্ডারের ঢল নামে, রাস্তা গুঁড়িয়ে যায়। পরের বছর আবার শুরু প্রথম থেকে। এসব গল্প করছিলেন আমাদের জিপের চালক মশাই। ফাল্গুন মাসে শিবরাত্রিতে দেশি বিদেশি শিব ভক্ত আর পর্যটকের ঢল নামে। খুবই দুর্গম সে পথ। সুউচ্চ পর্বত কন্দরে বড়া মহাকালকে অর্চনা করে উপবাসী পুণ্যার্থীরা যখন নেমে আসেন, তখন বহু মানুষ নদী বক্ষে অপেক্ষা করে বসে থাকেন, ঐ পুণ্যার্থীদের পুণ্যের ভাগ নেবেন বলে। ভাগ নেবার পদ্ধতিও অদ্ভুত। ভাগ প্রত্যাশীরা নানারকম খাবার সাজিয়ে বসে থাকেন বিনামূল্যে উপবাসী ভক্তজনকে পেটভরে ভোজন করাবেন বলে। কে কাকে খাওয়াবে টানাটানি কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। আবার পুণ্যের ভাগ দেবেননা বলে এমন খাওয়া এড়িয়েও যান কেউ কেউ। কেউ আবার মহাকাল দর্শন না করেই খেতে বসে যান। যত জন, তত মন, যত মত, তত পথ। বন পাহাড়ের কোলে সে এক মহা হট্টমেলা বসে।

    জয়ন্তী নদীর বুকে পথ যে ভারি অমসৃণ, জিপের ঝাঁকুনি বড় তীক্ষ্ণ। শিরদাঁড়া, কোমর, পাঁজর বুঝি খুলে যায় যায়। তা হোক ফিল্ডে সবার হাল্কা ফুরফুরে মন - এদিকে কথকের গল্পের বাঁধুনি এমন ঘাড় মাথা যত এদিক ওদিক ছিটকে যায়, গল্প শুনে পেট থেকে তত গুড়্গুড়িয়ে হাসি আসে। এমন সময়ে সেই চালক চেঁচিয়ে ওঠেন ওই দেখুন বাঁদিকে প্রজাপতি। হুড খোলা জিপে রোদ পড়েছে চোখে, নদীর চিকচিকে সাদা বালিতে সে আলোয় চোখ ঝলসায়, শনশন হাওয়ায় হাড় পর্যন্ত শীতের কামড়। জিপের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে চমকে দেখলাম আমার নাক, কান, গাল, শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে উড়ে যাচ্ছে রঙ বেরঙের ছোট ছোট অজস্র প্রজাপতি। হলুদ, টিয়াপাখি রং, কালো,কমলা, সাদা আরও কত। পাখির ঝাঁকের মত একসাথে গোল গোল বাঁক নিয়ে মাটির কাছাকাছি ঘুরছে। আবার জলের ধারে কোথাও বেশ ঘন হয়ে বসছে। ছোট ছোট বাচ্ছা প্রজাপতি। বেশি ওপরে ওঠেনা। দেখলেই একটু হাত বুলিয়ে দিতে, আদর করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সে উপায় নেই, ওরা নিজের খুশিতে আমাদের ছোঁবে, কিন্তু আমরা কাছে যেতে গেলে উড়ে পালাবে। জিপের পথ একসময়ে শেষ হয়, এবারে হেঁটে চড়াই পথ। এইসময়টায় আরও অনেক প্রজাপতির দলের সঙ্গে দেখা হয়। তবে তাড়াহুড়োয় ওদের সঙ্গে ভাব করার ঠিক সুযোগ হয়না।

    দারিংবাড়িতে কীজানি কেমন প্রজাপতিরা থাকে। আসলে একবারেই তো সব দর্শন হয়না, বাকি থাকে কিছু বলেই আবার ফিরে আসতে হয়। তা প্রজাপতি না থাক, চারিদিকে অসংখ্য ওষধি গাছের মেলা। মাঝে প্রাচীন চিকিৎসক সুশ্রুতর মূর্তি। কুটিয়া কন্ধ উপজাতি মানুষের মডেল সাজানো আছে মিউজিয়ামের মতো। উল্টো দিকে হিলটপ পার্ক। এখানে অজস্র ফুলের মাঝে বাচ্চাদের দোলনা, স্লিপ, ঢেঁকি এইসব সাজানো। একটা উঁচু টাওয়ার আছে পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগের জন্য। সূর্যদেব পাটে বসেছেন, আমরা পৌঁছে গেছি সানসেট পয়েন্টে। সিমেন্টের গ‍্যালারির মতো করা আছে। সামনে অসংখ্য পর্বত শ্রেণী। সাগরের ঊর্মিমালা যেন স্থবির হয়ে অপেক্ষা করছে কারো নির্দেশের। এ জায়গাটা আমাকে পাঁচমারীর ধূপগড়ের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছে। নেচার পার্কের কমলা সূর্য এখন টকটকে লাল। দূরের শ্রেণীগুলি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হচ্ছে। দারিংবাড়ি চলেছে ছায়াবৃত্ত পেরিয়ে রাতের গর্ভে, আবার পরের দিনের ভোর দেখবে বলে। পর্বত চূড়ায় যখন রক্তরাগের শেষ রেশ, তখন আমাদের অবাক করে দিয়ে পিছনে বেজে উঠল মাদল। তাকিয়ে দেখি এক কন্ধ পুরুষের হাতের বোলের তালে তালে তাকে ঘিরে নাচছে একদল কন্ধ নারী। আমাদের ছাত্রীরাও যোগ দিল তাদের সঙ্গে। গোলমরিচের বাগানে আমরা ঢুকতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু এটা বাড়তি পাওনা হল।

    দারিংবাড়িতে সন্ধ্যা নেমেছে। আমরা হোটেলে ফিরছি। ঘরে গিয়ে ব‍্যাগ গোছাবো। আগামী কাল দারিংবাড়িকে বিদায় জানাতে হবে। তপ্ত পানি, গোপালপুর হয়ে ফিরে যাব যে যার ঘরে। হয়তো অনেক কিছুই জানা হলনা। যেটুকু জানলাম সেটাও অনেক। অমরকন্টক, পাঁচমারী, উটি এসব বিখ্যাত পর্যটনক্ষেত্রের মতো সম্পদ এখানেও আছে। কিন্তু সাজান গোছান কম। ভারি আটপৌরে আর আন্তরিক। দারিংবাড়িতে আর একবার আসা যেতেই পারে।



    চলবে...
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ধারাবাহিক | ১৪ মার্চ ২০২৬ | ১১৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক প্রতিক্রিয়া দিন