এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  লঘুগুরু

  • গণতন্ত্র কি খায়, না চিবোয়? – পর্ব ৪

    প্যালারাম
    ধারাবাহিক | লঘুগুরু | ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫ বার পঠিত
  • ১৯৫৩ সাল, একদিকে, মার্চ মাসে স্তালিনের মৃত্যু হয়েছে, অন্যদিকে আমেরিকায় ম্যাকার্থি জমানা তার কম্যুনিস্ট ধরপাকড়ের শীর্ষে। এরই মধ্যে, সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাচওয়র্থ প্রেস থেকে বেরোয় Bertrand Russell-এর লেখা ‘What is Democracy?’ বইটি। লেখাটির কয়েক খণ্ডে অনুবাদ…

    অলংকরণ: রমিত



    বিকেন্দ্রীকরণের প্রশ্নে আবার ফেরত যাওয়া যাক। আমরা দেখেছি – কোনো গোষ্ঠী যদি কোনো এক ভৌগোলিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ না থেকে জনমধ্যে ছড়িয়ে থাকে, তবে বিকেন্দ্রীকরণে সমস্যা আছে। তবে আমার মনে হয়, কিছু ক্ষেত্রে এমন নির্বাচনী কেন্দ্র (constituency) তৈরি করা সম্ভব—এবং অবশ্যই দরকারি—যেগুলির ভৌগোলিক সীমা নেই, কিন্তু কর্মক্ষেত্র বা আদর্শগত সীমা আছে। উদাহরণ হিসেবে ধরুন, কোনো একটি দেশ – যার প্রতিটি ভৌগোলিক নির্বাচনী কেন্দ্রে পাঁচ শতাংশ মানুষ ইহুদি। এখনকার নিয়মে চললে ইহুদিরা সর্বত্র ভোটে হারবেন, আর সংসদে তাঁদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব যথোচিত হবে না। তাঁরা আলাদা ভোট দিলে এর একটা সুরাহা হতে পারে, আর তাঁদের জনসংখ্যার অনুপাতে সংসদে তাঁদের কিছুসংখ্যক প্রতিনিধি থাকবে। ইহুদিবিদ্বেষ যেখানে তীব্র, সেরকম অঞ্চল ছাড়া এই প্রস্তাবের পক্ষ নিয়ে কিন্তু আমি সওয়াল করবো না। তার চেয়ে বরং শিল্পক্ষেত্রে এই ধরনের নীতির প্রয়োগ বেশি করে দরকার।

    সমাজবাদীরা চিরকাল রেলওয়ে আর খনিগুলিকে রাষ্ট্রায়ত্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। আগের লেবার সরকার এই প্রস্তাব প্রয়োগও করেছিলেন; কিন্তু তাতে সমাজতন্ত্রীরা যতটা ভেবেছিলেন, কর্মচারীদের অবস্থার পরিবর্তন ততটা হয়নি। পুঁজিবাদীদের জায়গা নিয়েছিল সরকারি অফিসাররা, আর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কর্মচারীদের সংঘাতের সম্ভাবনাও প্রায় একইরকম ছিল। আমি চাই, রেলওয়ে বা খনিগুলির মতো যে কোনো বৃহৎ শিল্পসংস্থার অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলি—সরকার নয়, ওই শিল্পের কর্মচারীদের মাধ্যমে—গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্ধারিত হোক, যাতে কেবল শিল্পটির বহিরঙ্গের বিষয়গুলি সরকারের হাতে থাকে। আধুনিক রাষ্ট্র এতটাই বড় হয়ে গেছে, আর গণতন্ত্রের মধ্যেও অফিসাররা ভোটারদের থেকে এতটাই দূরের, যে, খুব বড় কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কর্মচারীদের চোখে ব্যক্তিগত উদ্যোগের তেমন কোনো মানে আর থাকে না।

    আমার মতে, আধুনিক জগতের এক বড় বিপদ হল ব্যক্তিগত উদ্যোগের সুযোগের অভাব। এর থেকে জন্মায় অনীহা, অক্ষমতার বোধ, আর তার থেকে তৈরি হয় হতাশা। যারা তেজিয়ান আর দৃঢ় প্রত্যয়ের অধিকারী, তাদের জন্যে—ছোট হোক, বড় হোক—কোনো একটা জায়গা থাকা দরকার, যে বৃত্তে তারা নিজেদের কার্যকরী প্রমাণ করার আশা রাখতে পারে, আর এমনটা হতে হলে এখন যা, তার চেয়ে অনেক বেশি বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে একটু আলাদা ভঙ্গিতে এই ধারণাটির পক্ষেই সওয়াল করতেন ফ্রান্সের সিন্ডিকালিস্ট (Syndicalist) আর ইংল্যান্ডের গিল্ড সমাজবাদীরা, কিন্তু এই সময়ই রুশ বিপ্লব তাঁদের কল্পনার পাখায় হাওয়া দেয়; রাষ্ট্রব্যাপী সমাজতন্ত্র এবং আমলাতান্ত্রিক স্বৈরাচারের পক্ষ নিতে গিয়ে তাঁরা সবটাই ঘেঁটে ফেলেন। তাঁরা বেশ বোকার মতোই ভেবেছিলেন – নতুন সরকারে একদা-বিপ্লবীদের আমলা বানালেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এর ফলে শুধু যে রাশিয়ার স্বৈরাচার জন্ম নিয়েছিল তা-ই নয়, পশ্চিমে বামপন্থীরা আগে যে মূল্যবোধগুলিকে গুরুত্ব দিতেন, তাদের সমর্থনে আন্দোলনের চেষ্টাও সম্পূর্ণ বিফল হয়। রুশ বিপ্লবের আগে প্রগতিশীল মানুষ নিজেদের যে লক্ষ্যগুলি স্থির করেছিলেন, তাদের আবার ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে। পশ্চিমা গণতন্ত্রের পক্ষে কতটা গণতান্ত্রিক থাকা সম্ভব, তা নির্ভর করছে এ কাজ কতটা ভালোভাবে করা যাবে – তার ওপর।


    বিশ্বব্যাপী সরকার


    বিশ্বব্যাপী কোনো সরকারের প্রশ্নে বিকেন্দ্রীকরণ এক জরুরি প্রশ্ন। এইটুকু পরিষ্কার – যদি কোনো বিশ্বজোড়া সরকার তৈরি হয়, তবে তার কার্যকলাপ খুবই অল্প কিছু বিষয়ে সীমিত থাকবে, আর দেশগুলি বর্তমানে সরকার চালাতে যা যা করে, তার অধিকাংশই সেই দেশের হাতেই থাকবে। এই বিশ্ব-সরকারের ধারণাটিকে অযথা ইউটোপিয়া বলে মনে হতেই পারে, কারণ পূর্ব-পশ্চিমের এই চাপা টানাপোড়েন যদি চলতেই থাকে, তবে এমন সরকারের কল্পনা করা বৃথা। কিন্তু এ প্রশ্নটি ভয়ানক জরুরি, কারণ এর সমাধান অন্তত পরের প্রজন্মের মধ্যে না হলে মানবজাতির টিকে থাকার আশা কম। এই রকম কথা হয়তো খুবই বিরক্তিকর শোনায়, কারণ কেউই তার চিন্তায় প্রোথিত গতানুগতিক অভ্যেসগুলো বদলাতে পছন্দ করে না, আর তাদের মধ্যে গভীরতম হল ভিনদেশি কিছু সরকারকে ঘেন্না করার অভ্যেস। পুরোনো অভ্যেসগুলি যে উদ্বর্তনের বা টিকে থাকার পক্ষে ক্ষতিকর – এমন ভাবতে কেউ পছন্দ করে না, আর এমন মানুষ খুব কমই আছেন, যাঁরা টিকে থাকা আর চিন্তা না করার মধ্যে প্রথমটিকে বেছে নেন।

    এঁদের মনে কিন্তু এই প্রশ্নটি এইভাবে মোটেও দেখা দেয় না। সচেতনে চটজলদি যে বিশ্বাসটি তৈরি হয়, তা হল – যে কোনো অ-স্বাভাবিক চিন্তাই আসলে উদ্ভট। এই প্রত্যয়টি এতই জলদি, এতই দৃঢ়ভাবে বাসা বাঁধে, যে, চিন্তাটির পিছনে আদৌ যুক্তি আছে কিনা – সে প্রশ্ন তাদের মনে আসে না। আমার মনে হয়, যারা এই প্রবৃত্তিকে রোধ করতে পারে, তারা স্পষ্ট বুঝতে পারবে – যুদ্ধের অবলুপ্তির ওপরেই মানবজাতির টিকে থাকা নির্ভর করছে, আর কেবলমাত্র এক বিশ্বজোড়া সরকার প্রতিষ্ঠা করেই এই অবলুপ্তি সম্ভব।

    এমন এক সরকারের হাতে কী কী ক্ষমতা থাকা দরকার? প্রাথমিকভাবে, সেইসব ক্ষমতা – যাদের সঙ্গে যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নটি জড়িয়ে আছে। সবচেয়ে জরুরি – যুদ্ধাস্ত্রগুলির ওপর তাদের একচ্ছত্র মালিকানা থাকতে হবে। দুই দেশের মৈত্রীচুক্তি সংশোধন করার অধিকার তাদের থাকতে হবে, আর যে সব আঁতাতকে তারা সমর্থন করে না, তাদের মানতে অস্বীকার করার অধিকারও। তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে বা অন্য কোনো রাষ্ট্রের ওপর হিংসাত্মক আক্রমণ করেছে – এমন যে কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এই সরকারের থাকতে হবে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের যে কোনো রকম অভ্যন্তরীণ বিষয়, যেমন, অর্থনৈতিক উন্নতি, শিক্ষা, ধার্মিক প্রতিষ্ঠান – এসবের ওপর এই সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

    আসলে এই সরকার কোনো রাষ্ট্রের কোন ক্ষমতাটা কেড়ে নেবে জানেন? সেই অধিকার, যা বহুদিন হল কোনো এক ব্যক্তির আর নেই – হত্যা করার অধিকার। পড়শি একটু বেশি আওয়াজ করে পিয়ানো বাজালেই তাকে গুলি করার অধিকার নেই – এ কথা জেনে কোনো ব্যক্তির স্বাধীনতার বোধ খর্ব হয় না – যদি না সে গুন্ডা হয়।

    স্বাধীনতার এই সীমারেখাটি যে মোটেই আপত্তিকর নয় – এ কথা প্রতিটি রাষ্ট্রকে বুঝতেই হবে। নিজের স্বার্থ নিজে বুঝে নেওয়ার অধিকারটুকু নিয়েই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে – আপন খেয়ালে যখন-তখন কোনো ভিনদেশিকে গুলি করার সুযোগ চাওয়া যাবে না। শুধু এই সুযোগটুকুই ওই বিশ্ব-সরকারকে কাড়তে হবে, একজন ভদ্রলোক যে যে স্বাধীনতা চান – তা কেড়ে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।



    গানপাউডার ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত জেস্যুইটদের ঝুলিয়ে, ঘোড়া দিয়ে ছেঁচড়ে, আর চার টুকরোয় কেটে ফেলে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। ১৯১৫ সালের কাঠখোদাই – ‘গাই ফক্সের মৃত্যুদণ্ড’। সূত্র: উইকিমিডিয়া

    শাসন যখন বাড়াবাড়ি


    একটি জাতীয় রাষ্ট্রের ভিতরে কিছু বিষয় সরকারের আওতার বাইরে থাকাই দস্তুর। মোটামুটি মেনে নেওয়া হয়েছে – ধর্ম তার একটি। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে এমনটা ভাবা হত না, আর ধর্মের অভিন্নতা বজায় রাখতে ভয়ানক নিপীড়ন চালানো হত।

    আধুনিক যুগে নিপীড়ন-স্পৃহা ধর্ম তৈরি করে না, করে রাজনীতি। রাশিয়ায় এই ভাবখানা পূর্ণ দখল জারি করেছে। আমেরিকাতেও এর দখল প্রয়োজনাতিরিক্ত। স্বভাবতই, এক্ষেত্রে অজুহাত হল – রাজনৈতিক বিরুদ্ধাচরণ রাষ্ট্রের বিপদ ডেকে আনে, অথচ এই একই অজুহাত ষোড়শ বা সপ্তদশ শতকেও ছিল! রানী এলিজ়াবেথ জেস্যুইটদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন, কিন্তু জেস্যুইটদের বক্তব্য ছিল – রানীর সর্বময় ক্ষমতা আসলে বেআইনি এবং তারা স্পেনীয়দের পক্ষ নিয়ে ঘরশত্রু বিভীষণ (fifth columnist)-এর কাজ করতো [১৪]

    যে সব দেশ নিজেরা কম্যুনিস্ট নয়, সে সবখানে এই একই যুক্তিতে অধুনা কম্যুনিস্টদের বিরুদ্ধাচরণ করা চলছে। কিন্তু যেদিকেই দেখো না কেন, একদিকে মানুষ বিদ্রোহী হয় নিপীড়নের ফলে আর ওদিকে নিপীড়ন বাড়ে মানুষের বিদ্রোহের কারণে। একটি কমলে, অন্যটিও কমে। আজকের কোনো ইংরেজ জেস্যুইট এখনকার রানী এলিজ়াবেথকে সরিয়ে কোনো জ্যাকোবাইট উত্তরাধিকারীকে সিংহাসনে বসাতে চায় না, আর নিঃসন্দেহে এর একমাত্র কারণ – আজকাল আর জেস্যুইটরা অত্যাচারিত নয়।


    গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা


    গণতন্ত্রের সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতার যোগ যতটা ঘনিষ্ঠ বলে মাঝেমধ্যে ভাবা হয়, ততটা মোটেই নয়। তাত্ত্বিকভাবে সংজ্ঞা যাচাই করে দেখলে, সংখ্যালঘুদের স্বাধীনতার সম্পুর্ণ অনুপস্থিতির সঙ্গে গণতন্ত্রের কোনো বিরোধ নেই। যে দেশে সংখ্যাগুরু কম্যুনিস্টদের অপছন্দ করে, সেখানে কম্যুনিস্টদের সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করাও সেদিক থেকে অগণতান্ত্রিক নয়।

    নিউ ইংল্যান্ডের ঔপনিবেশিক জনপদগুলিকে একসময় গায়ের জোরেই ধর্মীয়ভাবে সমসত্ত্ব বানানো হয়েছিল [১৫], আর এর ফলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বললে গোড়ায় গলদ হবে। তা সত্ত্বেও, ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে গণতন্ত্রের এক মানসিক যোগাযোগ আছে, কারণ যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা লঙ্ঘিত হয়, সেখানে জনতার সশস্ত্র বিদ্রোহ করার সম্ভাবনা বাড়ে, আর যেখানে অনেক মানুষ সশস্ত্র বিদ্রোহপন্থী, সেখানে সরকারের গণতান্ত্রিক কার্যকলাপের ধোপে টিকে থাকা মুশকিল।

    সমাজের স্বার্থে করা যেসব কাজের গুরুত্ব আনাড়ি জনতার পক্ষে বোঝা মুশকিল, গণতন্ত্রে সেইসব কাজের স্বাধীনতা বজায় রাখাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। আনকোরা ধরনের বৌদ্ধিক কাজ সবসময় জনগণের অপ্রিয় হয়, কারণ তা মনের গভীরে লালিত কুসংস্কারগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখায়, আর অশিক্ষিত মন সেই কাজগুলিকে দুশ্চরিত্রের নষ্টামি হিসেবে দেখে। লুথারের ধারণা ছিল – কোপার্নিকাস নেহাতই সাধারণ এক ঘোলাটে ধাঁধাঁপ্রেমী (paradox-monger) মানুষ, নিজের খামখেয়ালী চেহারাটিকে জনমধ্যে প্রচার করাই যাঁর মূল উদ্দেশ্য। কেলভিনেরও তা-ই মনে হয়েছিল, আর গ্যালিলিও-র ক্ষেত্রে চার্চও ঠিক একই কথা ভেবেছিল। গণতন্ত্র গ্যালিলিও-কে বাঁচাতে পারতো না।

    আজকের আমেরিকায় যদিও একজন শিক্ষক তাঁর ধ্যানধারণার কারণে আইনের হাতে শাস্তি পাবেন না, কিন্তু—খুব সম্ভব—যদি তিনি অর্থনীতির ইতিহাস বা সমাজবিজ্ঞান পড়ান, আর অজ্ঞ, অসহিষ্ণু লোকজনের সঙ্গে তাঁর মতে না মেলে, তবে তাঁকে ভয়ানক আর্থিক দণ্ড দিতে হবে। অতীতে বহুবার এমন হয়েছে – গুরুত্বপূর্ণ লোকজনকে জনরোষ থেকে বাঁচিয়েছেন কোনো অগণতান্ত্রিক শাসক। আলেক্সান্ডার যতদিন বেঁচে ছিলেন, আরিস্তোতল এথেন্সে দিব্যি নিরাপদ ছিলেন, কিন্তু আলেক্সান্ডারের মৃত্যুর পর তাঁকে সেখান থেকে পালাতে হয়। আভেয়ারোইজ় (ল্যাটিন উচ্চারণ, আসলে ইব্‌ন রশিদ)-কে তাঁর জীবনের প্রায় শেষ পর্যন্ত মুসলিম শাসকরা জনগণের ক্রোধের হাত থেকে—যতটা পেরেছিলেন—বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, তারপর একসময় জনতার চাপের কাছে তাঁদের নতিস্বীকার করতে হয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট যখন সিদ্ধান্ত নিল – দার্শনিক হব্‌স্‌-এর ভক্তির অভাব ঈশ্বরকে ক্রুদ্ধ করেছে বলেই মহামারী শুরু হয়েছে, তখন তাঁকে বাঁচাতে সম্রাট দ্বিতীয় চার্লস তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছিলেন। যখন টেনেসি-র বিচারের সিদ্ধান্ত বিবর্তন তত্ত্বের বিপক্ষে গিয়েছিল, তখন তা অগণতান্ত্রিক ছিল না। বৌদ্ধিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে গণতন্ত্র যে কাফি নয় – তা বোঝাতে আশা করি এই উদাহরণগুলি যথেষ্ট।



    ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব ইশকুলে পড়ানো নিয়ে টেনেসি-র বিখ্যাত স্কোপ্স মামলার হলিউডি চিত্রায়ণ – Inherit the Wind. বিবর্তনের পক্ষের উকিল ড্যারোর অনুপ্রেরণায় তৈরি হেনরি ড্রামন্ডের চরিত্রে অভিনেতা স্পেন্সার ট্রেসি, আঙুল তুলে, বাঁদিকে। সূত্র: উইকিমিডিয়া


    কিন্তু অগণতান্ত্রিক শাসনে বৌদ্ধিক স্বাধীনতা বেশ নিরাপদ থাকে – এমন বললে ইতিহাসের খেলাপ হবে। আলোকপ্রাপ্ত স্বৈরাচারীর কিছু উদাহরণ ইতিহাসে আছে ঠিকই, কিন্তু স্বৈরাচারীদের এক বিশাল বড় অংশ আলোর মুখ দেখেননি, আর—সবচেয়ে খারাপ গণতন্ত্রের থেকেও—কড়া হাতে বৌদ্ধিক স্বাধীনতা খর্ব করতে তৈরি থাকতেন। বর্তমানে, রাশিয়া তার নিখুঁত উদাহরণ। স্তালিনের ধারণা ছিল – কোনো জেনেটিসিস্ট-এর থেকেও তাঁর জেনেটিক্সের জ্ঞান বেশি, আর যারা তাঁর বিরোধিতা করার চেষ্টা করেছিল, তাদের কপালে চরম শাস্তি জোটে।



    ১৯৩৫ সালে ক্রেমলিনে বক্তৃতা দিচ্ছেন ত্রোফিম লাইসেঙ্কো, পিছনে একেবারে ডানদিকে স্তালিন। বিবর্তন আর জেনেটিক্সকে অগ্রাহ্য করে লাইসেঙ্কো ল্যামার্কের পথের প্রচার করেছিলেন, ‘বিজ্ঞানসম্মত কৃষি’-ও এই চেষ্টারই উপজাত তত্ত্ব। সূত্র: উইকিমিডিয়া


    অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সে সরকার সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন, প্রগতিবিরোধী ছিল। যেমন, এর ফলে বুফোঁ তাঁর তত্ত্ব (যত পর্বত দেখা যায়, সকলেই যে পৃথিবীর জন্মের সময়ে তৈরি – তা ঠিক নয়) সর্বসমক্ষে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন।



    [চলবে…]


    [১৪] ক্যাথলিক পুরুষ (পাদ্রি)-দের সবচেয়ে বড়ো ক্লাব হল সোসাইটি অফ জিসাস; তৎকালীন পোপের আশীর্বাদ নিয়ে ১৫৪০ সালে রোমে তৈরি হয়। এর সদস্যরাই জেস্যুইট। ওদিকে এর কিছুদিন আগে, ১৫২৭-এ, ইংল্যান্ড-অধীশ্বর অষ্টম হেনরি নতুন-বিয়ে-পাগলা হয়ে আগের রানীর সঙ্গে বিবাহটি অবৈধ ঘোষণা করতে চার্চকে চাপ দিতে শুরু করেন। পোপ পাত্তা না দেওয়ায় খচে গিয়ে তিনি পার্লামেন্টে আইন পাশ করালেন – ব্রিটিশ খ্রিস্টানদের ওপর আর পোপের কোনো ক্ষমতা নেই, এখন থেকে ব্রিটিশ রাজত্বে সম্রাটই চার্চের প্রধান। তেনার ছেলের রাজত্বের সময় এই ‘সংশোধিত’ (reformed) ব্রিটিশ চার্চ বেশ ভালোরকম প্রোটেস্টান্ট হয়ে যায় (১৫১৭-য় লুথার তাঁর ৯৫-দফা দাবি পেশ করেছিলেন চার্চের বিরুদ্ধে)। মাঝে কিছুদিনের জন্যে ক্যাথলিক প্রভাব বাড়লেও, ১৫৫৮ সালে রানী এলিজ়াবেথ ক্ষমতা পেয়ে ইংরেজ রিফর্মেশনের কাজ সম্পূর্ণ করেন ও ক্যাথলিক কফিনে শেষ পেরেকটি গাঁথেন। তাঁর সিংহাসনে বসার সময় ইংরেজ অভিজাত মহল বেজায় রক্ষণশীল ছিল, আর ইংল্যান্ডের প্রধান মিত্র ছিল ক্যাথলিক স্পেন। তরুণী রানী তাতে মোটেও না দমে নিজের সরকার প্রোটেস্টান্ট দিয়ে ভরে ফেললেন, আর তারপর একের পর আইন পাশ করে ইংল্যান্ডের রিফর্মেশনের রাস্তা পাকা করলেন। এরই মধ্যে একটি হল ১৫৮৪-র জেস্যুইট আইন, যাতে বলা হল – ৪০ দিনের মধ্যে সমস্ত রোমান ক্যাথলিক পুরোহিত হয় দেশ ছাড়বেন, নইলে রানীর আনুগত্য স্বীকার করবেন আর ইংরেজ রিফর্মেশনে যোগ দেবেন, নইলে রাষ্ট্রদ্রোহে অভিযুক্ত হবেন। যেসব ব্রিটিশ দেশের বাইরে জেস্যুইট মঠে শিক্ষালাভ করছিলেন, তাঁদের ছ-মাসের মধ্যে দেশে ফিরে, ফেরার দু-দিনের মধ্যে আনুগত্যের ও চার্চ বদলের মুচলেখা জমা দিতে হবে, নইলে ওই – রাষ্ট্রদ্রোহ। যারা ফেরার পাদ্রিদের আশ্রয় দেবে, শাস্তি হবে তাদেরও। এতেই শেষ নয়, শুধু মুখের কথায় রানী ভুলবেন না (প্রাণে তো বাঁচতে হবে, যা হোক)। যারা আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দেবে, তারা এর পরের ১০ বছর, রানীর সরাসরি অনুমতি ছাড়া তাঁর ১০ মাইলের মধ্যে এলেও একই শাস্তি। এর পরের ইতিহাস আবার সেই অত্যাচার আর দাঙ্গা-বিদ্রোহে ভরা। আজ থাক। শুধু মনে করিয়ে দিই, বিখ্যাত ‘গানপাউডার প্লট’ (V for Vendetta পড়া বা দেখা থাকলে গাই ফক্সের নাম মনে পড়বে) এই জেস্যুইট বিদ্রোহীদেরই বানানো।

    [১৫] ইংল্যান্ডে এলিজ়াবেথের শাসনকালে প্রোটেস্টান্টিজ়মের রমরমার সময় যে ক্যাথলিক-ঘেঁষা পুরোনোপন্থী মতবাদ বেড়ে উঠেছিল, তার অনুগামীদের বলে পিউরিটান। সপ্তদশ শতকের শুরুতে প্রথম চার্লসের রাজত্বে অত্যাচার থেকে বাঁচতে তাঁরা নতুন উপনিবেশ আমেরিকায় দলে দলে যাত্রা করেন। উত্তর-পূর্ব আমেরিকার যে অঞ্চলে তাঁরা ডেরাপত্তন করেন, তাঁর নাম হয় নিউ ইংল্যান্ড – আজকের ৬টি রাজ্য: কানেটিকাট, মেইন, ম্যাসাচ্যুসেট্‌স, নিউ হ্যামশায়ার, রোড আইল্যান্ড, আর ভার্মান্ট। নিজেরা অত্যাচারের হাত থেকে পালালেও, এঁরা ভয়ানক গোঁড়া ধর্মীয় জীবন পালন করতেন এবং খ্রিস্টধর্মেরই অন্যান্য শাখার ওপর অকথ্য অত্যাচার করতেন। এদের মধ্যে কোয়েকারদের কথা আগের পর্বে হয়েছে।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ধারাবাহিক | ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে প্রতিক্রিয়া দিন