একবার কোনো এক ড্রাই স্টেটে গেছেন এক কবি, অর্থাৎ মাতাল। সেখানে গিয়ে জানা গেছে, মদ পাবার একটাই উপায়, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। তিনি আর কী করেন, প্রচুর দৌড়ঝাঁপ করে, শহরের এপার ওপার ঘুরে তো একজন সহানুভূতিশীল ডাক্তার জোগাড় করলেন। ডাক্তার প্রেসক্রিপশনও দিলেন। সেই প্রেসক্রিপশন নিয়ে ওষুধের দোকানে দৌড়নোও হল। সেখানে লম্ব লাইন। লাইন যখন পৌঁছল, দোকান তখন বন্ধ হব হব। দোকানদার বিরক্ত মুখে, বললেন, কই, দিন। তারপর প্রেসক্রিপশন দেখে, না মদ না, একতাড়া কাগজ বাড়িয়ে দিলেন। কবি খুলে দেখেন, সেই বহু পাতার ফর্মের প্রথম পাতায় লেখা, "শরাবীকা নাম"। তারপর শরাবীর পাতা, ফোন নম্বর, প্যান কার্ড, অ্যাপেন্ডিক্সের সাইজ, ইত্যাদি। এবং তারপর শরাবীকা বাপ কা নাম, পাতা, ঐ ঐ ঐ ঐ। কবি দুপাতা পড়েই ক্ষান্ত দিলেন। ফর্মের উপরে "মদ ছাড়ানোর অব্যর্থ উপায়" লেখা ছিল কিনা অবশ্য জানা নেই।
গপ্পোটা আমার নয়, মূল জিনিসটা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের, আমি একটু রঙ চঙ দিয়ে লিখলাম। অন্নপূর্ণা যোজনার বারো পাতার ফর্ম দেখে এটাই মাথায় এল। প্রথমে ভোটের আগের ফর্মে ছিল অন্নপূর্ণার নাম-ধাম। লাইন দিয়ে সে সব ভরানো হল। ভোটের পর শোনা গেল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে অটোমেটিক ট্রান্সফার হবে। তখন পড়ল ব্যাঙ্কে ডিবিটির লাইন। সবশেষে এখন এল বারো পাতার ফর্ম। সে এক মহাভারত। তাতে প্রথমে হেড-অফ-দা-ফ্যামিলির নাম, হেড-অফ-দা-ফ্যামিলির পাতা, জন্মদিন, আধার, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ট্যাক্স, দলিল। তারপর টেল-অফ-দা ফ্যামিলিদেরও ঐ ঐ ঐ। মানে যা যা চাওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে শুধু ডেথ সার্টিফিকেটটা যোগ করলেই গোটা পরিবারের জীবনীপঞ্জি লেখা হয়ে যাবে।
এর সঙ্গে ওই আগের গল্পের দুটো তফাত। এক, ওটা নেশার ব্যাপার ছিল, এটা জীবনধারণের। আর ওখানে ধৈর্য ধরে ফর্ম ভর্তি করলে মদটা পাওয়া যেত। পরে 'শরাবীকা বাপ'কে ফোন করে নালিশ করা হলেও হতে পারত। আর এখানে, নিয়ম যেভাবে বদলাচ্ছে, মনে হচ্ছে ভাতা নয়, পরীক্ষা হচ্ছে। তাও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। সেখানে কোনো কাট-অফ থাকে না। যতগুলো সিট থাকে, উপর থেকে ততগুলো নেওয়া হয়। আমাদের মাস্টাররা এই জন্যই বলতেন, শুধু ভালো হলেই হবেনা, অন্যের চেয়ে ভালো হতে হবে। নইলে জয়েন্টে পাওয়া যাবে না। ওঁরা শুধু জয়েন্ট জানতেন, নিট তখন ছিল না। থাকলে অন্য উপায়ও বাতলাতেন নিশ্চয়ই।
এই লিস্টিতে অবশ্য অসাধু ব্যাপার থাকবে বলে মনে হয় না। নতুন সরকারের জমানায় কোনো কিছুই অসাধু না, সব লাইনে দাঁড় করানোই আইনী। খোদ সুপ্রিম কোর্ট বলে দিয়েছে। এবং এদের কর্মদক্ষতা অসম্ভব ভালো। যাঁরা এসআইআরের লাইনে দাঁড়িয়েছেন, যদি না ভুলে গিয়ে থাকেন, প্রথমে ছিল ফর্ম ফিল-আপ। তারপর এল লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি। তারপর আন্দাজ ৩৫ লক্ষ একদম ট্রাইবুনালের দরজায়। দেখেশুনে মনে হয়, ভোটার লিস্টে নাম তোলা নয়, বাদ দেওয়াটাই লক্ষ্য। সেসব চুকে-বুকে গেছে, তাদের কী হল, সে খোঁজ আর কেউ রাখে না। এখন নতুন করে বাংলাদেশী আর রোহিঙ্গা খুঁজে পোরার জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে।
নতুন ফর্মের লাইনও মনে হচ্ছে বাদ দেবার জন্যই তৈরি। কিন্তু সেরকম হবেই কিনা বলতে পারব না। উনিজি ১৫ লক্ষ টাকা তো দেবেন বলেইছিলেন, হতেই পারে, সেইটাই হয়তো এবার মাসে-মাসে দেওয়া হবে। উনিজি হ্যায় তো সব কিছুই সম্ভব হ্যায়।
সত্যি বলছি, ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যে নিজেদের কর্মদক্ষতা এরকম হাট করে দেখিয়ে দিতে আর কোনো সরকারকে দেখি নি। সরকারের প্রথম কাজ হয়, মন্ত্রীসভা তৈরি, সেটাই এঁরা করে উঠতে পারেননি, কিন্তু বাকি কাজ করে চলেছেন বিস্তর। গরুর বার্থ সার্টিফিকেট, হকার উচ্ছেদ, এবং অন্নপূর্ণা যোজনায় ১২ পাতার ফর্ম -- প্রথম ১ মাসের কাজ হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কিন্তু এই নিয়ে হট্টগোল করবেটা কে। তৃণমূল নেত্রী কবিতা লিখছেন আর মণীষীদের সম্মান প্রদর্শন করে চলেছেন। তাঁর দলের লোকেরা কে যে ওয়াশিং মেশিনে ঢুকে ভালো হচ্ছেন, টের পাওয়া যাচ্ছে না। খুচরো বিরোধী যাঁরা আছেন, মনে হচ্ছে জোট সরকারে আছেন। আইএসএফ নেতা গরু নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখবেন, আর সিপিএমের বিধায়ক শুধু চিঠি নয় দেখাও করবেন বলে কোথায় যে গেলেন, কেউ জানে না।
এর মধ্যে তৃণমূলের দামাল ছেলেরা অর্ধেক ভালো হয়ে গেছে। অর্ধেক জেলে। বাকি যে অর্ধেক থাকে, তাদের কুনাল ঘোষ আকুল আবেদন জানিয়েছেন, এখন সমালোচনা না করতে। বুদ্ধিমান রাম-বামরা এত ঝক্কি নেন নি। শিরদাঁড়াযুক্ত বিখ্যাত ডাক্তার-আন্দোলনের নেতারা আগেই আটঘাট বেঁধে দুই নেতাকে পাঠাতে পেরেছেন বিধানসভায়। তাঁরাই এখন হইচই করে হকার-উচ্ছেদ করছেন। আখাম্বা ন্যায়বিচার হচ্ছে আর কি। এর মধ্যে একটা বিরোধিতা বামরা করে চলেছে, ছোটো স্কেলে হলেও, হকার উচ্ছেদের। ওইটাই একমাত্র কাজের বিরোধিতা। যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁরা আমার মতো ফেবু করছেন না, আর মিডিয়াতেও মুখ দেখাচ্ছেন না, এইটাও ভালো ব্যাপার। কেন ভালো, কারণ, সংবাদমাধ্যমের কথা না বলাই ভালো, তাতে এমনকি সাংবাদিকরাও লজ্জা পেয়ে যেতে পারেন।
এর পরেও কেউ অবশ্য গোদি মিডিয়া বয়কট করছে না। প্রচন্ড কমপ্লেন সত্ত্বেও সিপিএম এর পরেও নির্ঘাত গোদি মিডিয়ায় প্রতিনিধি পাঠাবে, "সবই আগের সরকারের দোষ" ন্যারেটিভকে শক্ত করতে। তৃণমূলনেত্রী "গোদি মিডিয়া" বলেও লোক পাঠাবেন, কাকে পাঠাবেন আর তিনি কী বলবেন অবশ্য কেউ জানে না। এগুলোকে ওঁরা জনসংযোগ বলেন, ফলে বন্ধ করতে বলে কোনো লাভ নেই। তবে একটা জনসংযোগ ওঁরা বন্ধ করতেই পারেন। এসআইআরের সময় তো বিজেপির বিএলএ বা স্বেচ্ছাসেবক ছিল ঘন্টা। পুরোটাই অন্যের ঘাড় দিয়ে চালিয়েছে। এবার এই বারো পাতার ফর্মটা নিজেরা ভর্তি করাক। ইশকুলে তো ইতিমধ্যেই ২ মাসের ছুটি, সেটাও নির্ঘাত আগের সরকারের দোষ, এবার মাস্টারদের দিয়ে অন্নপূর্ণা-আপিসারের কাজ করাক আর নিজেদের কর্মীদের দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক। সেটা যা হবে, ভেবেই গা শিউরে উঠছে। সংবাদমাধ্যমের হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও ওই বস্তু ধামাচাপা দেওয়া যাবে না।
নাকতলার একটি ইশকুলে শিশুমৃত্যু হয়েছে। অভিযুক্ত তিনজনকেই নাকি পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে। এই নিয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন অভিভাবকরা। সেখানে উপস্থিত হয়েছেন দেখলাম পাপিয়া অধিকারী। ভিডিওতে দেখলাম, অভিভাবকদের তিনি বলছেন গ্রেপ্তার হবে, হবে। আর অভিভাবকরা চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করছেন, কবে কবে। তিনি বলছেন, এভিডেন্স পেলেই হবে, এই জাতীয় কিছু একটা।
এতদিন বিরোধী দলে থেকে চিৎকার করেছেন, এবার তো এইসব ন্যায্য ক্ষোভ-বিক্ষোভ সামলাতে হবেই। দায়ও নিতে হবে। সে নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু তাঁর চারদিকে, ভিডিওয় দেখি কেবল কেন্দ্রীয় বাহিনী। ওই ছাপছাপ জলপাই জামা পরা। এরা কি বাংলার চিরস্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেল, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার-টারও পাবে? সংবিধানে পড়েছিলাম, আইনশৃঙ্খলা রাজ্য-তালিকাভুক্ত। সে হয়তো ভুল জানতাম। কিন্তু কথা হল পুলিশরা সব কোথায় গেল?
এই করতেই দেখি, না, পুলিশ তো আছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর ছায়াতলে, কিন্তু আছে। তারা অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। নানা জায়গায় নানা লোককে গ্রেপ্তার করে গেঞ্জি-জাঙ্গিয়া পরিয়ে কোমরে দড়ি দিয়ে হাঁটাচ্ছে। আগেরদিন ছিল হাওড়ায়। কালকের ভিডিওতে দেখি বনি নামের একজনকে কাঁচড়াপাড়ায় ঘোরানো হচ্ছে। পিছনে খাঁকি পোশাকে পুলিশ। তার সামনে গেঞ্জি-জাঙ্গিয়া পরা বনি। তারও সামনে বুম হাতে গাদা-গাদা মিডিয়া। আমি যে ভিডিওটা দেখলাম, তাতে মহিলাকণ্ঠে উচ্চস্বরে বলা হচ্ছে, হাঁটানো শুরু করা হল তার পাড়া থেকে, যেন কী দুর্ধর্ষ ব্যাপার হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে মিডিয়ার লোকেরা বুম ধরে জিজ্ঞাসা করছেন, তোমার এই অবস্থা কেন? নেতারা কোথায়? তোমার কি কোনো আক্ষেপ আছে? জোর তামাশা আর কি। এই বনি কী করেছে, তার বিন্দুবিসর্গ অবশ্য বুঝতে পারলাম না। আরেকটা ভিডিওতে দেখলাম, অতীতকালে এই লোকটি অর্জুন সিং এর সঙ্গে খুব চেঁচামেচি করে ঝামেলা করছিল। মিডিয়ার হাবভাব দেখে মনে হল, সেটাই অপরাধ।
ভারতীয় আইনের কোনো ধারায়, বিধায়কের সঙ্গে ঝগড়া করার অপরাধে কোমরে দড়ি বেঁধে গেঞ্জি জাঙ্গিয়া পরিয়ে রাস্তায় ঘোরানোর বিধান আছে, তায় আবার মিডিয়া ডেকে, সেটা আমার জানা নেই। অবশ্য হতেই পারে, এর চেয়েও বড় কোনো অপরাধ আছে, কিন্তু সেও তো বিচারাধীনই হবার কথা। পাবলিক ট্রায়াল তো উঠে গেছে বলেই জানতাম। মুঘল আমলে, আওরঙ্গজেব যুদ্ধে জেতার পর নাকি দিল্লির রাজপথে হাতে-পায়ে শিকল পরিয়ে দারা-শুকোকে হাঁটানো হয়েছিল। তখন সিংহাসনের লড়াইয়ের পর ওইটাই দস্তুর ছিল। গণতন্ত্রে এতদিন এরকম হয় বলে শুনিনি। ইন্দিরা, রাজীব, অটলবিহারি সবাই ভোটে হেরেছিলেন। রাজীবের বিরুদ্ধে স্লোগানই ছিল রাজীব গান্ধি চোর হ্যায়, বাজপেয়ির আমলে গুচ্ছ দুর্নীতি হয়েছিল। কিন্তু কাউকে বিনা বিচারে কোমরে দড়ি পরিয়ে ঘোরানো হয়েছে বলে শুনি নি। এগুলো ব্যতিক্রমী কিছু না, গণতন্ত্রে এটাই নিয়ম। কোমরে দড়ি পরিয়ে বিরোধীদের ঘোরানো গণতন্ত্র নয়। বিরোধী না হয়ে স্রেফ অপরাধী হলেও নয়।
মিডিয়া এবং কিছু প্রগতিশীলদের এসব জানেন না তা নয়। পাপিয়া অধিকারীও জানেন, গ্রেপ্তার করতে হলে এভিডেন্স লাগে, এমনি এমনি কোমরে দড়ি পরিয়ে ঘোরাও যায় না। তাঁরা এও জানেন, যে, এইরকম ঘটনা আগের কোনো জমানায় ঘটলেই কীরকম গেল-গেল রব পড়ে যেত। কিন্তু তাতেও দেখলাম, অনেকেই খুবই আনন্দিত। অনেকেই "কিস্যু এসে যায়না" মোডে। হতে পারে হয়তো মুঘল যুগই ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এবার থেকে এইরকমই চলবে। পাকিস্তানেও এইরকমই হয়। দুই ভুট্টো, ইমরান, নওয়াজ শরীফ, ক্ষমতা যাবার পর, পরের শাসকের আমলে প্রত্যেকেরই হাল খারাপ হয়েছে। মুঘল দারাশুকোও নাকি বলেছিলেন, আমি জিতলে ওই ব্যাটা আওরঙ্গজেবের সঙ্গেও একই জিনিস করতাম। যদি মনে করেন সেটাই আদর্শ ব্যবস্থা, তো ঠিকই আছে। নইলে কিন্তু এটা গণতন্ত্রের প্রতি অপরাধ হচ্ছে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।